মৃত জ্যোৎস্নার রাত্রি – ১৪
চোদ্দো
শব্দটা ঠিক কীসের হল বুঝতে পারল না মৃন্ময়ী। কিন্তু ঘুমটা ভেঙে গেল তার। দোতলা বাড়িতে তিন বছরের সোনাইকে নিয়ে একা সে। চিন্তায় ভাবনায় এমনিতেই ঘুমটা পাতলা হয়ে গেছে। মশারির মধ্যে খানিক চুপ করে বসে রইল মৃন্ময়ী। একবার নেমে দেখবে? না থাক, কী-না-কী শব্দ তার ঠিক নেই। সোনাইয়ের পাশে শুয়ে পড়ল। সবেমাত্র বালিশে মাথা ঠেকিয়েছে। অমনি আবার শব্দ। এবার কাঠে কাঠে ঠোকা লাগার এবং সেটা ঘরের দরজাতেই হয়েছে। তড়াক করে উঠে বসল মৃন্ময়ী। ঘরের দরজায় খিল দিয়ে শুয়েছে। দরজা আর খিলের মাঝে একটা ফাঁকা অংশ রয়েছে। বাইরে থেকে এই অবস্থায় কেউ দরজা ঠেললে দরজাটা ঠকাস করে খিলের গায়ে লাগে এবং একটা আওয়াজ হয়। এখন অনেকটা সেরকমই শব্দ হল। বাইরে ডাইনিং রুম। সেখান থেকে কে দরজা ঠেলবে? বুকের ভেতরটা ধুকপুক করছে মৃন্ময়ীর। বিশেষত ওই কাগজটা খুঁজে পাওয়ার পর থেকে ভীষণ ভয়ে আছে সে। এই মুহূর্তে বাড়িতে ঢোকা তো দূর, আসারও কোনো লোক নেই। মশারির মধ্যে বসে আকাশ-পাতাল ভেবে সত্যি কোনো লাভ নেই। মাটিতে নেমেই পড়ল মৃন্ময়ী। দরজার দিকে এগিয়ে গেল। আস্তে করে খিলটা নামিয়ে দরজার পাল্লাটা খুলতে থাকল। বুকের মধ্যে রক্ত ঠান্ডা হয়ে আসছে। ও যা ভাবছে যদি সত্যিই তেমন কিছু ঘটে তাহলে কী করবে? দরজাটা প্রথমে খানিকটা খুলে মুখ বাড়াল। ডাইনিঙে একটা সবুজ আলো জ্বলছে। এই আলোতে ঘরটাকে স্পষ্ট দেখা যায়। টিভি, ফ্রিজ, চেয়ার, এমনকি ফাঁকা অ্যাকোয়ারিয়ামটাও যথাস্থানেই আছে। সাহস করে বেরিয়ে ডাইনিঙের আলোটা জ্বালিয়ে দেয় মৃন্ময়ী। সারা ঘরে চোখটা ঘোরাতে ঘোরাতে দু-তিন পা সিঁড়ির দিকে এগোতে যায়। ঠিক তখনই ‘আঃ’ বলে দাঁড়িয়ে পড়ে সে। পায়ে কী যেন ফুটল। হাত দিয়ে তুলে নিল জিনিসটা। ‘ছিটকিনি’ নিজের মনেই বিড়বিড় করল মৃন্ময়ী। চট করে জানলার দিকে তাকাল। কারণ এই ছোটো ছিটকিনিগুলো জানলারই। টেবিলের পাশের জানলাগুলো সব বন্ধ। কিন্তু পেছনের দিকে জানলাটায় চোখ পড়তেই চমকে উঠল। জানলার একটা পাল্লা খোলা। এগিয়ে গিয়ে দেখল সেই পাল্লারই ছিটকিনিটা ভেঙে ছিটকে মাটিতে পড়েছে। কিন্তু লোহার গ্রিলগুলো তো ঠিকই আছে। এই জানলার বাইরে বারান্দা। সেটাও ঘেরা। কোনো মানুষ ঢুকলে সবার আগে বারান্দার জানলা বা দরজা ভাঙতে হবে। জানলাটা ঠেলে খুলে গ্রিলের কাছে মুখ এনে দেখল বাইরের কাচের জানলার একটা পাল্লা খোলা। ওটা এমনিতেই পুরো বন্ধ হয় না। লকে সমস্যা আছে। কিন্তু বারান্দার গ্রিলগুলোও অক্ষত। কোনো ট্যারাব্যাকা কিচ্ছু হয়নি। তাহলে কোনোভাবেই কোনো মানুষ এ-বাড়িতে ঢোকেনি। বাইরের জানলা খুলে কোনো কিছু দিয়ে ডাইনিঙের জানলার ছিটকিনি ভাঙা সম্ভব নয়। অথচ সেটাই হয়েছে। এদিকে ঘরের দরজাতেও এত রাতে…! আর কিছু ভাবতে পারছে না মৃন্ময়ী। অজানা এক আতঙ্ক কাঁকড়া বিছের মতো মৃন্ময়ীর গলাটাকে টিপে ধরছে। ঝট করে সে জানলাটা বন্ধ করে দেয়। বাড়ির মধ্যের বাতাসটা বেশ ভারী হয়ে উঠেছে। বুকে চাপ লাগছে মৃন্ময়ীর। কোথাও কোনো শব্দ নেই। কেবল দেয়াল ঘড়ির টিক টিক শব্দটা কানের মধ্যে যেন দূর থেকে ভেসে আসা চাবুকের মতো লাগছে।
.
বড়ো আলোটা নিভিয়ে দিল। ঘরময় কচিপাতা রঙের আলোটা ঘুম ঘুম চোখে চেয়ে রইল। ডাইনিঙের সবুজ আলোর আভাটুকু সিঁড়ির দিকে গিয়ে শেষ হয়ে গেছে। মৃন্ময়ী ঘরের দিকেই ফিরছিল। ফিরতে গিয়েই মনে হল খানিকটা অন্ধকারের ড্যালা যেন নড়ে উঠল। ওদিকে নড়ে ওঠার মতো কোনো বস্তু নেই। তবু কেন মনে হল? মৃন্ময়ী সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল। নীচ থেকে ওপরের দিকে চোখটা চালিয়ে দিল। কিছু নেই। শুধু একটা শব্দ হল যেন দোতলায়। কেউ চেয়ার টানলে যেমন হয় এ ঠিক তেমনি আওয়াজ। গায়ের লোম খাড়া হয়ে উঠল। ছেলেটা ঘরে একা ঘুমোচ্ছে। ওকে ছেড়ে ওপরে যাওয়া কি ঠিক হবে? আবার ঘুমন্ত ছেলেকে তুলে নিয়েও যাওয়াটা সম্ভব নয়। মৃন্ময়ীর ভাবনার মধ্যেই আরও একবার শব্দটা হল। হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে। একবার ওপরে গিয়ে না দেখলেই নয়। মৃন্ময়ী এক পা, দু-পা করে ওপরে উঠতে থাকে। মৃন্ময়ী দেখতে পেল না, ঠিক ওর পিছনে সিঁড়ির অন্ধকার কোণটা থেকে কেউ একজন নিঃশব্দে বেরিয়ে নীচের ঘরের দিকে চলে গেল। যে ঘরে সোনাই অঘোরে ঘুমোচ্ছে।
.
মৃন্ময়ী দু-চোখে ভয় নিয়ে দোতলার ডাইনিঙে চলে এল। সেখানে ছোট্ট টেবিল। সেই টেবিল ঘিরে চারটে চেয়ার। এই টেবিল-চেয়ারগুলো নীচের ডাইনিঙেই থাকত। কিন্তু সরস্বতী পুজোর আগের দিন মিহির এগুলো ওপরে নিয়ে আসে। কারণ পুজোটা নীচের খাবার ঘরে হয়। তাই জায়গাটা ফাঁকা করাটা জরুরি ছিল। পুজোর পর-পরই শুটিঙের ব্যস্ততার জন্য এগুলো আর নীচে নিয়ে যাওয়া হয়নি। অদ্ভুতভাবেই চারটে চেয়ার সম্পূর্ণ এলোমেলো। একটা শোবার ঘরের দরজার সামনে। একটা বাথরুমের দিকে। একটা উলটে পড়ে আছে আর অন্যটা উধাও। এই দৃশ্যটা দেখার পর মৃন্ময়ীর শরীর আর নড়তে চাইল না। কারণ এটা এই বাড়িতে হওয়া অসম্ভব। বাড়িতে কেউ ছিল না। আজকেই ফিরেছে মৃন্ময়ী। যাবার আগে সব গোছানোই ছিল। তাহলে কে এই সাজানো সংসার ছত্রখান করে দিল? কান্না পেল মৃন্ময়ীর। ভেতর থেকে একটা ফোঁপানো আতঙ্ক ঘূর্ণিঝড়ের মতো পেটের ভেতর থেকে পাক খেতে খেতে গলার কাছে উঠে এল। এই মুহূর্তে সে মনে মনে একটিবার প্রশ্ন করে উঠল, ‘নীলাম্বরবাবু, কোথায় আপনি? তেরো নম্বর ফ্লোরের ঘটনার চেয়েও যে এবারে আরও বড়ো সর্বনাশ হতে চলেছে। সেটা তো আপনি জানেন। তাহলে এখানে নেই কেন?’ মৃন্ময়ী বুঝতে পারল প্রশ্নটা তার মনের মধ্যেই চাপা রইল। কেউ শুনল না। শুনবেই-বা কী করে? নীলাম্বরবাবুর ফোনটাই যে বন্ধ। সাহস করে এলোমেলো চেয়ারগুলোর দিকে এগোতে থাকল। সবেমাত্র একটা চেয়ার বাথরুমের সামনে থেকে এনে টেবিলের কাছে রেখেছে অমনি নীচ থেকে ভেসে এল সোনাইয়ের চিলচিৎকার। দমকা ভয়টা ছেলের কথা প্রায় ভুলিয়েই দিয়েছিল। সোনাইয়ের কান্না কানে পৌঁছোতেই কেঁপে উঠল মৃন্ময়ী। মুহূর্তে চোখের সামনে ঝলসে উঠল এর আগের আয়া শম্পার ওপর ভর করা তিলোত্তমার ক্ষত-বিক্ষত মুখটা। দেড় বছরের সোনাইকে নিয়ে শূন্যে ঝুলেছিল ভয়ংকরভাবে। তাহলে কি আবার কেউ…! এইসব ভাবতে ভাবতেই হুড়মুড় করে নীচে নেমে এল মৃন্ময়ী। বাঁধভাঙা বন্যার মতো দড়াম করে ভেজানো দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকে থমকে গেল। ঘরের মধ্যে হালকা নীল আলোয় কোনো অস্বাভাবিকত্বই চোখে পড়ল না। মশারির মধ্যে বসেই ছেলেটা পরিত্রাহী কেঁদে চলেছে। রাতে মাঝেমধ্যে উঠে সোনাই কাঁদে। কিন্তু এমন বুক-ফাটানো কান্না সোনাই কখনও কাঁদেনি। মশারি তুলে ঝটপট ছেলের কাছে যায় মৃন্ময়ী। ‘কী হয়েছে সোনাই? কাঁদছ কেন এভাবে? পেট ব্যথা করছে?’ মায়ের কথা শুনে কাঁদতে কাঁদতেই মাথাটা দু-পাশে নেড়ে না’ বলে।
— তাহলে কাঁদছ কেন? ভয় পেয়েছ সোনা? আমি কোথাও যাইনি তো।
ছেলেটা ডানহাতটা তুলে সামনের দিকে দেখায়। কিছু বলে না। শুধু কেঁদে চলে। মৃন্ময়ী অবাক হয়ে সোনাইয়ের হাত লক্ষ্য করে তাকায়। উলটোদিকের দেয়ালে শোকেস আর আলমারি। মৃন্ময়ী বুঝতে পারছে না ছেলে ঠিক কী দেখাচ্ছে! কী দেখাচ্ছ বাবু? কিছু তো নেই। ওটা তো শোকেস। ওই টেডিটা দেখে ভয় পেয়েছ? তুমি তো ওটা নিয়ে খেলা করো।’ মৃন্ময়ী তার মতো বলে যাচ্ছে। ছেলেকে বুকে জড়িয়ে সান্ত্বনা দিচ্ছে। কিন্তু ছেলের কান্না থামছে না। সে মা-কে শক্ত করে জড়িয়ে একটা নির্দিষ্ট দিকে আঙুল তুলে আছে। ছেলেটা ছোটো থেকেই এই ঘরে একই খাটে শোয়। কোনোদিন এমন করে না। হাত তুলে দেখায়ও না কাউকে। দোতলায় এমন একটা অদ্ভুত কাণ্ড! আবার নীচে ছেলে কিছু দেখাবার চেষ্টা করছে। সত্যিই কি কেউ আছে? যাকে খালি চোখে দেখতে পাচ্ছে না মৃন্ময়ী? ভাবনাটা মাথার মধ্যে আসতেই ছ্যাঁৎ করে উঠল বুকটা। ছেলেকে কোলে নিয়েই মশারি থেকে বেরিয়ে এল। আলোটা জ্বালল। ভালো করে ঘরটা দেখল। কোলে জাপটে থাকা ছেলের কান্নাটাও কমল। কিন্তু ফুঁপিয়ে চলেছে। মৃন্ময়ী ছেলেকে কোলে নিয়েই দুটো পা ছড়িয়ে বসে থাকা টেডি বিয়ারটার কাছে গেল। অমনি ছেলেটা ছটফট করে উঠল। শরীরটা ঝটকাতে লাগল। কিছুতেই সে থাকবে না সেখানে। ছেলের এই অস্বাভাবিক ব্যবহার মৃন্ময়ীর মাথায় যেন বিস্ময়ের পাহাড় হয়ে চেপে বসল। টেডিটার সামনে দাঁড়াল না। চলে এল। ঘরের আলোটাও নেভাল না। ফ্যাটফ্যাটে টিউবলাইটের আলোটা জ্বেলেই ছেলেকে জাপটে শুয়ে রইল। টেডিটাও এক দৃষ্টে তাকিয়ে রইল মৃন্ময়ী আর সোনাইয়ের দিকে। মৃন্ময়ী যখন প্রায় ঝিমিয়ে পড়েছে এবং ছেলেটাও মায়ের বুকে মুখ গুঁজে ঘুমের কোলে ঢলে পড়েছে ঠিক তখনই টেডির দুটো বাহারি প্লাস্টিকের চোখ ভেঙে দুমড়ে ভেতরদিকে ঢুকে যায়। চোখের জায়গায় তৈরি হয় ভয়ংকর কালো দুটো গর্ত।
