মৃত জ্যোৎস্নার রাত্রি – ১৬
ষোলো
আঁচলটা মুখে চাপা দিয়ে ডুকরে কেঁদে ওঠে মৃন্ময়ী। একে তো নার্সিংহোমে ঢোকার সময় প্রায় মুখ আড়াল করে পুলিশ নিয়ে এল। টিভিতে এখন ব্রেকিং নিউজ, ‘অবশেষে পুলিশ গ্রেপ্তার করল মিহির সরখেলকে। যে স্বনামধন্য অভিনেত্রী আত্রেয়ী সেনকে খুনের চেষ্টা করেছে। শুটিং ইউনিটের বৃষভানুকেও মিহিরই খুন করেছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।’ গাড়ি থেকে নেমে যখন ড্যাফোডিলে ঢুকছিল মৃন্ময়ী তখনই ছেঁকে ধরা রিপোর্টাররা চিৎকার করে প্রশ্ন করছিল, ‘আপনি কি বিশ্বাস করেন আপনার স্বামী আত্রেয়ী এবং অন্যান্যদের খুন করেছে?’ মৃন্ময়ীর মনে হচ্ছিল ধরণী দ্বিধা হয়ে যাক। এখন আইসিইউর দরজার কাছে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে এর চেয়ে বোধহয় মরণও ভালো ছিল। দুজন নার্স বসে আছে। সর্বক্ষণ মনিটরে পিক পিক করে শব্দ হয়ে চলেছে। নাকে নল, পায়ে, বুকে আর মাথায় ব্যান্ডেজ নিয়ে প্রায় অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে মিহির। মৃন্ময়ীর ছাপোষা সাধারণ মধ্যবিত্ত মিহির। যার কাছে তার স্ত্রী আর ছেলেই ছিল একমাত্র শান্তির জগৎ। গাল-ভরতি দাড়ি। চোখের কোলে কালি। রক্তের জোগাড় করা গেছে। এক ঝটকায় ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এল মৃন্ময়ী। চেয়ারের কাছে এসে শরীরটা তার ছেড়ে দিল। ধপ করে বসে পড়ল। সায়ন দৌড়ে কাছে এল। হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলল মৃন্ময়ী। শব্দ হল না কোনো। সায়ন চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। একজন নার্স কাছে এসে বলল, ‘এত ভেঙে পড়বেন না। উনি কিন্তু ট্রিটমেন্টে রেসপন্স করছেন। এইভাবে চললে আশা করছি ওঁকে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরিয়ে দিতে পারব।’ বাড়ির ফেরার কথা শুনে সায়নের দিকে চেয়ে মৃন্ময়ী বলল, ‘ও সুস্থ হলেও কি আর বাড়ি ফিরতে পারবে সায়ন?’ কথার সারমর্মটা বুঝতে পেরে নার্স সায়নের দিকে একবার তাকিয়ে ভেতরে চলে গেল। সায়ন মৃন্ময়ীর পাশে বসে শান্ত গলায় বলল, ‘আমি আপ্রাণ চেষ্টা করছি বউদি দাদাভাই যাতে সুস্থ হয়ে বাড়িতে ফিরতে পারে। মুশকিলটা অন্য জায়গায়।’ নাকের ওপর গড়িয়ে পড়া চোখের জলটা মুছে মৃন্ময়ী বলল, ‘কোথায়?’
— সবাই বুঝতে পারছে একটা সাধারণ মানুষ এমন অস্বাভাবিক কাজ করতে পারে না। অথচ কেউ প্রমাণ পাচ্ছে না। তদন্তে দাদাভাইকেই অপরাধী মনে হচ্ছে। পুলিশ যে চোখের সামনে দেখেছে দাদাভাই ওই তন্ময় হালদারকে মাথার ওপর তুলে দেয়ালে আছড়ে ফেলল।
কথাটা শুনেই আঁতকে উঠল মৃন্ময়ী। পরক্ষণেই সায়নের হাতটা শক্ত করে ধরে বলে উঠল, ‘তোমরা কেউ বাঁচাতে পারবে না ওকে। প্লিজ কিছু একটা করো সায়ন। নীলাম্বরবাবু কোথায় গেছেন খুঁজে বের করো।’
— আমি চেষ্টা করেছি বউদি। ওদের প্যারানরমাল সোসাইটিতে আমি খোঁজ নিয়েছি। ওরাও কেউ জানে না। নীলাম্বরবাবুর টিমের ছেলেরা বলল, স্যার মাঝেমাঝেই এইরকম উধাও হয়ে যান। সাধারণত হিমালয়ের দিকেই যান। কিন্তু কাউকে জানিয়ে যান না ঠিক কোথায় যাচ্ছেন।
সায়নের ফোনটা বেজে ওঠে। একটা আননোন নম্বর দেখে ফোনটা কেটে দিল। ‘চলো এবার ফিরতে হবে। তোমায় নামিয়ে দিয়ে একটু আত্রেয়ী সেনের বাড়িতে ঢু মারব।’ কথাটা শেষ হতেই ফোনটা আবার ভাইব্রেট করে উঠল। একটু বিরক্ত হয়েই ফোনটা ধরল সায়ন, ‘হ্যালো হ্যাঁ বলছি। ও আচ্ছা বলুন… হুম…!… হুম! দেখুন কেসটা কিন্তু সলভ হয়নি ম্যাডাম। অথচ আপনার কথা শুনে বুঝতে পারছি মিহির সরখেলের বিরুদ্ধে আপনারা কোনো বড়ো স্টেপ নিতে চলেছেন। আমরা কি আপনাদের জানিয়েছি যে মিহির সরখেল দোষী?… তাহলে? উইদাউট এনি ইনফরমেশন আপনারা একটা লোককে স্যাক করতে পারেন না।’ কথাটা মুখ ফসকে বলেই মৃন্ময়ীর দিকে চোখ পড়ে। মৃন্ময়ী ভাষাহীন চোখে চেয়ে থাকে সায়নের দিকে। তারপর মুখ ঘুরিয়ে নেয়। মনে মনে ভাবে এই সর্বনাশটা হওয়াই বাকি ছিল। সায়ন বলে চলেছে, ‘আচ্ছা একটা কথা বলুন, আপনারা এই শহরের একটা নামকরা চ্যানেল। আপনাদের অফিসের একটা লোক চ্যানেলেরই একটা কাজ করতে গিয়ে মারাত্মক বিপদে পড়েছে। এতে আপনারা ঠিক কী ইনিশিয়েটিভ নিয়েছেন? আদৌ কি কোনো ইনিশিয়েটিভ নিয়েছেন লোকটাকে বাঁচাবার জন্য?… সরি ম্যাডাম! একটু ভুল করছেন। তদন্তটা আমরা করছি। আপনারা নন। নিউজ চ্যানেলের খবর শুনে একটা লোকের চাকরি খাবার কথা ভেবে ফেলছেন।… না না বলেননি ঠিকই। কিন্তু আপনার যা কথার ধরন দেখছি তাতে সেটাই মনে হচ্ছে। শুনুন ম্যাডাম, হাজার রকমের মানুষ চড়িয়ে আমরা খাই তো তাই কে কী ভেবে বলছে আমরা সব বুঝি। অবাক হচ্ছি আপনাদের রেসপন্সিবিলিটি দেখে।… লিসন লিসন ম্যাডাম, একটা কথা ভালো করে শুনে রাখুন, অপরাধ প্রমাণ হওয়ার আগেই যদি মিহির সরখেলের কোনো ক্ষতি হয় চাকরিক্ষেত্রে তাহলে আমরা কিন্তু আইনি-ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হব।… ম্যাডাম প্লিজ, আমাকে কিছু বোঝাবেন না। আপনাদের কীসব জিআরপি, টিআরপি আছে না? সে সবের নিরিখে এখন তো আপনারা চার নম্বর। তাই তো?’ একটু তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে ওঠে সায়নের ঠোঁটে। তারপর বলে, ‘কেন বলুন তো আপনারা চার নম্বর? কারণ আপনাদের কোনো দায়িত্বজ্ঞানই নেই। এতক্ষণ আমার সঙ্গে কথা বললেন অথচ একবারও জিজ্ঞেস করলেন না মিহির সরখেল কেমন আছেন? যে কিনা আপনাদের এমপ্লয়ি।… ম্যাডাম আপনি রাখুন এবার। আমার যা বলার স্পষ্টভাবে বলেছি। এখন আমাদের কাজ আছে। নার্সিংহোমে দাঁড়িয়ে এত কথা বলা যায় না। রাখলাম।’ বলেই কান থেকে মোবাইলটা নামিয়ে নিল সায়ন। মৃন্ময়ী একটা পাথর মূর্তির মতো চুপ করে বসে আছে। উলটোদিকের দেয়ালে চোখের মণিদুটো আটকে আছে। সায়ন এসে দাঁড়াল পাশে। কথা বলতে বলতে খানিকটা এগিয়ে গিয়েছিল। বলল, ‘চ্যানেলের এইচআর ফোন করেছিল। আচ্ছা করে ধুনে দিয়েছি। কিচ্ছু ভেবো না। দাদাভাইয়ের চাকরি এই মুহূর্তে কেউ খেতে পারবে না।’ মৃন্ময়ী তাকাল সায়নের দিকে। দুটো চোখের তারায় তার যেন মহাশূন্যের ছবি ফুটে উঠল।
.
সায়ন নার্সিংহোমের রিসেপশনের সামনে আসতেই রিসেপশনিস্ট মেয়েটি বলল, ‘স্যার, এখুনি একজন এসে তন্ময়বাবুর খোঁজ করছিলেন।’ সায়ন জিজ্ঞেস করল, ‘বাড়ির লোক?’ মেয়েটি ঘাড় নাড়ল। বলল, ‘না সেরকম তো কিছু বললেন না। ম্যাডাম জিজ্ঞেস করলেন…’
— ম্যাডাম!
সায়ন আর সূর্য দুজনেই অবাক। মেয়েটি জানাল, ‘হ্যাঁ স্যার। জিজ্ঞেস করলেন তন্ময়বাবুর অবস্থা কীরকম? উনি বাঁচবেন তো? তা আমি বললাম সেটা তো এক্ষুনি বলা যাচ্ছে না? ট্রিটমেন্ট চলছে। জিজ্ঞেস করলাম আপনি কে হন। তার উত্তরে শুধু একটা থ্যাংক ইউ দিয়ে চলে গেলেন।’ সূর্য দ্রুত প্রশ্ন করল, ‘কখন এসেছিলেন উনি? আগে কেন জানাননি আমাদের?’ মেয়েটি একটু ঘাবড়ে গিয়ে বলল, ‘উনি তো এই জাস্ট বেরোলেন।’ সায়ন এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে মৃন্ময়ীকে রিসেপশনেই অপেক্ষা করতে বলে মেয়েটিকে বলল, ‘চলুন আমাদের সঙ্গে। কী পরেছিল?’ মেয়েটি তড়িঘড়ি রিসেপশনের ডেস্ক থেকে বেরোতে বেরোতে বলে, ‘নীল রঙের চুড়িদার।
— চলুন ফাস্ট।
নার্সিংহোম ভরতি লোক। ওয়েটিং করিডরে যে সেই মহিলা অপেক্ষা করবে না সে ভালোই বুঝেছিল সায়ন আর সূর্য। তাই সেখানে খোঁজ না করে সোজা বাইরে। খানিক দাঁড়িয়ে এপাশ-ওপাশ ভালো করে দেখল। সামনেই রাস্তা। গাড়ি যাচ্ছে। অটো এসে থামছে। এর মধ্যেই রিসেপশনিস্ট মেয়েটি বলল, ‘ওই তো স্যার। ওই মেয়েটি।’ রাস্তার উলটো ফুটে একটি মেয়ে নীল চুড়িদার পরেই হেঁটে যাচ্ছিল। সায়ন আর সূর্য সেই দিকেই ধেয়ে যায়। সঙ্গে দুজন মহিলা পুলিশ। পেছন থেকে দেখে বোঝা যাচ্ছে সাদা ওড়না দিয়ে মাথা থেকে মুখ আপাদমস্তক মোড়া। পুলিশের দল রাস্তা পার করে উলটো ফুটপাথে যেতেই নীল চুড়িদার পরা মেয়েটির হাঁটার গতি বেশ বেড়ে যায়। সায়ন আর সূর্যও তাদের লোকজনকে ঠেলে দিয়ে দ্রুত এগোতে থাকে। দূরের মেয়েটি টুক করে পাশের গলিতে ঢুকে পড়ে। সায়ন গলা তুলে বলে, ‘সূর্য ফাস্ট। ও বুঝতে পেরেছে আমরা ওকে ফলো করছি।’ ফুটপাথ দিয়ে এরাও এঁকেবেঁকে ছুটতে থাকে। গলিতে ঢুকতেই সামনে পর্যন্ত শুনশান। দূরে দু-একটা লোকের হাঁটা চলা। রাস্তার পাশে একটা ভাঙা গাড়ি। সায়ন গাড়িটার মধ্যে মুখ ঢুকিয়ে ভালো করে দেখে। রাস্তার পাশে বেশ কিছু বাড়ির বারান্দা। কয়েকটা দোকানে লোক বসেছিল। তাদের জিজ্ঞেস করাতে সবারই এক উত্তর, কেউ নীল চুড়িদার পরা মেয়েকে দেখেনি। আজব তো। দিনেদুপুরে একটা মেয়ে চোখের সামনে দিয়ে উধাও হয়ে গেল? আশেপাশে প্রায় ঘণ্টাখানেক তন্নতন্ন করে খুঁজেও নীল চুড়িদারের দেখা মিলল না। সায়ন হুকুম করল, ‘সূর্য, ইমিডিয়েট তন্ময়ের কল লিস্ট চেক করো।’
— অলরেডি সেটা চলছে স্যার।
— পারলে কল রেকর্ডিং যদি জোগাড় করা যায় দ্যাখো।
— ওকে স্যার।
— তন্ময় তো বিবাহিত নয়। যতদূর জানি। কলকাতায় একা থাকে। মেদিনীপুরে বাড়ি। তাহলে এই মহিলাটি কে? তন্ময়ের বাড়িও সার্চ করতে হবে।
— আত্রেয়ী সেনের বাড়ি সার্চ করে আমরা বেরিয়ে যাব তন্ময়ের বাড়ির দিকে।
— না সূর্য। আগে তন্ময়ের বাড়ি। এই মেয়েটি এমন একজন মেয়ে যে কিনা তন্ময় বাঁচবে কিনা সে নিয়ে ভীষণ কনসার্ন। আগে নার্সিংহোমে চলো। সিসিটিভি ফুটেজ চেক করতে হবে।
.
সিসিটিভি ফুটেজ দেখেও মুখটা বোঝা গেল না মেয়েটির। ভালোভাবেই নিজেকে আড়াল করে এসেছিল সে। ভ্রূ দুটো কুঁচকে সূর্য প্রশ্ন করল, ‘স্যার, কেউ কারওর খবর তো নিতেই পারে। সেখানে তো কোনো অন্যায় নেই। তাহলে নিজেকে এইভাবে আড়াল করল কেন মেয়েটি?’
— ডাল মে কুছ কালা না থাকলে আর কেন আড়াল করবে?
সায়ন নার্সিংহোম কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দেয় তন্ময় এবং মিহিরের কেউ খোঁজ করলে তৎক্ষণাৎ যেন থানায় জানানো হয়। মোতায়েন করা পুলিশবাহিনীকেও একই নির্দেশ দেওয়া হয়।
.
পুলিশের একটা অন্য গাড়ি করে মৃন্ময়ীকে বাড়ি পাঠিয়ে সূর্যকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে সায়ন। গন্তব্য তন্ময় হালদারের বাড়ি। মুকুন্দপুরের ভেতরে হাইরাইজ সিটিতে পুলিশের গাড়ি এসে থামে। ফোর্থ ফ্লোরে তন্ময়ের ফ্ল্যাট। তালা ভাঙতে হয়নি সায়নদের। তন্ময়ের জিনসের পকেট থেকে পাওয়া পার্সেই ফ্ল্যাটের চাবি ছিল। সেটা দিয়ে অনায়াসেই ফ্ল্যাটের দরজা খুলে অন্দরে। ডাইনিঙের গ্লাস-উইন্ডো দিয়ে বেশ ভালোই আলো আসছিল। দরজা দিয়ে ঢুকেই বসার ঘরটা এক ঝলকে ভালো করেই দেখে নেওয়া যায়। পরিপাটি করে সাজানো সোফাসেট। আর-একটু ভেতরে যেতে টেবিল। তার ওপর ফাঁকা গ্লাস আর মদের বোতল রাখা। গ্লাস দেখেই বোঝা যাচ্ছে মদ খেয়ে গ্লাসটা ধোয়াও হয়নি। দেয়ালে তন্ময়ের একটা শুটিঙের ছবি। বড়োসড়ো ক্যামেরা নিয়ে বেশ কেতা মেরে ছবিটা তোলা। সায়ন সেই ছবিটা একটু নাড়িয়ে-চাড়িয়ে দেখল। ছবিটা সরিয়ে ভালো করে সেই দেয়ালটা পরখ করল। সন্দেহের কিছুই পেল না। ঘরে বাকি জায়গাগুলো সূর্য দেখতে থাকে। মাটিতে শুয়ে সোফার নীচে চোখ চালিয়ে দেয়। আরও দুজন পুলিশ কনস্টেবল ঘরের ভেতর, রান্নাঘর ভালো করে দেখে। বেডরুমে ঢুকে গেল সায়ন আর সূর্য। চাদর তোশক তুলে, খাটের নীচে দেখতে থাকল। কয়েকটা ক্যামেরার স্ট্যান্ড, একটা কাপড় মোড়া ডিএসএলআর ক্যামেরা ছাড়া আর কিছু পেল না। সূর্য বলল, ‘স্যার, এই তন্ময় ভিডিয়ো ছেড়ে মাঝেমধ্যে স্টিল ছবিও তোলেন। দামি ডিএসএলআর।’ সায়ন অন্য কিছু একটা চেক করতে করতে বলল, ‘ছবি তুলতেন। এখন আর তোলেন না।’
— কী করে বুঝলেন স্যার?
খাটের পাশে হাঁটু গেড়ে বসে থাকা সূর্যের দিকে তাকিয়ে সায়ন বলে, ‘এখনও স্টিল তুললে ক্যামেরাটা কাপড়মোড়া অবস্থায় খাটের নীচে থাকত না।
— সে তো এই স্ট্যান্ডগুলোও খাটের নীচে।
— স্ট্যান্ড আর ক্যামেরা এক হল না সূর্য। যারা ছবি তোলে ক্যামেরার প্রতি তাদের একটা আলাদাই প্রেম থাকে। শোকেসের দিকে তাকাও, দ্যাখো ভিডিয়ো ক্যামেরাটা কীরকম যত্ন করে রাখা। কারণ তন্ময় ওটা ইউজ করে। কিন্তু স্টিল ক্যামেরার আর প্রয়োজন পড়ে না এখন। তাই ব্যাটাকে খাটের তলায় পাঠিয়ে দিয়েছে।
.
শোকেসে সাজানো নানা ধরনের চার-পাঁচরকমের লেন্স। সঙ্গে ক্রিস্টালের শো পিস। বাকি রইল বড়ো উডেন ফার্নিশের আলমারি। কিন্তু সেটার চাবি কোথায়? সারা বাড়ি তো তন্নতন্ন করে খোঁজা হল। কোথাও তো চাবির একটা রিঙের সন্ধানও মেলেনি। সূর্য বলল, ‘তন্ময় নিশ্চয়ই আলমারির চাবি সঙ্গে নিয়ে ঘুরবে না! যদি ঘোরে তাহলে আত্রেয়ী সেনের বাড়িতে কোথাও পড়ে যেতে পারে।’ চোখগুলো ছোটো করে তীক্ষ্ণ নজরে চারদিক দেখতে দেখতে সায়ন বলল, ‘সেটা হওয়ার সম্ভাবনা দুই কি তিন শতাংশ। চাবি এখানেই কোথাও আছে।’ সায়ন আলমারির গায়ে লাগানো হাতল ধরে দু-বার টান দিল। পাল্লা খুলল না। ‘ভেঙে ফেলি স্যার?’ সূর্য বলল। সায়ন ঠোঁট উলটে বলল, ‘এত সুন্দর একটা আলমারি ভেঙে ফেলব!’ বলেই সূর্যের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। মুহূর্তে কিছু একটা দেখে সায়নের মুখ থেকে হাসি মিলিয়ে গেল। সূর্য ঠিক শোকেসটার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। সায়ন এগিয়ে গেল। কাচের পাল্লাটা সরিয়ে খুব সন্তর্পণে একটা বড়ো লেন্স বের করল। সূর্য বেশ অবাক। সায়ন লেন্সটাকে দু-বার ঝাঁকাতেই তার মধ্যে থেকে ঝনঝন করে ভারী শব্দ বেরিয়ে এল। ঠিক চাবির ঝনঝনানি যেমন হয় তেমন। সায়ন ঠোঁট বেঁকিয়ে হাসল। লেন্সের মাথার দিকটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে খুলে ফেলল। তারপর হাত ঢুকিয়ে একটা চাবির গোছা বের করে আনল। বাপ রে বাপ! এ তো মহা ধুরন্ধর মাল!’ সূর্যের কথা শুনে সায়ন বলল, ‘নইলে আত্রেয়ী সেনকে চড়িয়ে খেতে পারে?’
— আপনি বুঝলেন কী করে স্যার? আমি তো লেন্সই ভেবেছিলাম।
— ভালো করে লক্ষ করো। তুমি নিজেই লেন্সের সঙ্গে এর পার্থক্য বুঝতে পারবে। লেন্সের মুখ যেদিকে হয় সেদিকটা সরু হয় আর উলটোদিকটা মোটা। কারণ উলটোদিকটা ক্যামেরার বড়ির সঙ্গে লাগানো হয়। প্রতিটা লেন্সের সরুদিকটা ওপর দিকে করে রাখা আছে আর মোটা দিকটা নীচে। এতে লেন্সে চাপ পড়বে না। একমাত্র এই লেন্সটারই সরু দিকটা নীচে আর মোটা দিকটা ওপরে। কারণ এটা একটা কফি মাগ। তাই চাপ পড়ার কোনো কারণ নেই। মোটা দিকটা ঠোঁটে ঠেকিয়ে কফিতে চুমুক দেওয়া হয়। এবার চলো আলমারি অভিযানে নেমে পড়া যাক।
— ইয়েস স্যার।
সূর্য হাসল।
.
আলমারি খুলতেই বেশ কিছু জামাকাপড় হুড়মুড় করে সায়নের গায়ে এসে পড়ল। ‘বোঝা যাচ্ছে ব্যাচেলারের ঘর।’ সূর্য বেশ ভাবুক চোখে চেয়ে বলল, ‘অনেকটা আমার আলমারির মতো।’ এবার সায়ন হেসে ফেলল। একে একে জামাকাপড়গুলো বিছানায় ছুড়ে ফেলতে থাকে। খানিকবাদেই একটি বস্ত্র হাতে তুলে একটু থমকে গেল সায়ন। দুটো আঙুলের ডগায় ধরে সেটিকে সূর্য ও কনস্টেবলদের সামনে মেলে ধরে। একটি ব্রা। সায়ন বলল, ‘তোমার আলমারিতেও বুঝি এসব থাকে সূর্য!’ সূর্য বেচারা ভাবতেও পারেনি তার কথাটা এইভাবে গোলাবারুদের মতো তার দিকে বাউন্স ব্যাক করবে। জিভ কেটে দু-পাশে মাথা ঝাঁকালো বেচারা। সায়ন বলে উঠল, আত্রেয়ী সেন এখানেও আসতেন।’ কথাটা শুনে সূর্যের ভ্রূটা একটু কুঁচকে যায়। সে ব্রাটা নিজে হাতে ধরে বলে, ‘আত্রেয়ী সেন!’ সূর্যের গলায় একটু সন্দেহের আঁচ পেয়ে সায়ন বলে, ‘এতে অবাক হবার কী আছে সূর্য! তন্ময়বাবু যে আত্রেয়ী সেনের বর্তমান পার্টনার সে তো দুনিয়ার লোক জানে।’
— না স্যার, সে তো আমিও জানি। কিন্তু এটা সম্ভবত আত্রেয়ী সেনের নয়। সায়ন রীতিমতো চোখ পাকিয়ে সূর্যের দিকে তাকায়, ‘কেন বলো তো?’
— আত্রেয়ী সেনের মতো হাই প্রোফাইল মহিলা এই সাধারণ ব্র্যান্ডের ইনার গারমেন্টস ইউজ করবেন কি?’
চোখে-মুখে বেশ একটা রসালো ভাব এনে সায়ন বলল, ‘আরিত্তারা! এটা সাধারণ ব্র্যান্ড বুঝি?’
— ইয়েস স্যার। হাই প্রোফাইল মহিলারা ট্রাইয়াম্ফ বা এই জাতীয় কিছু…
সায়নের চোখে সূর্যের চোখ পড়াতে কথাটা শেষ হয় না। পাশের কনস্টেবলগুলো মুচকি মুচকি হাসছে। সায়নের তিরছি নজর যে সূর্যের গভীরে ঢুকে আরও অনেক কিছু পড়ে ফেলছে সে ভালো করেই বুঝল। ‘না মানে স্যার, ওই…
— বিয়েটা কী গান্ধর্ব মতে হয়েছে ভায়া? তা নামটা কী?
সূর্য ঢক করে মুণ্ডুটা নামিয়ে ঝরঝর করে চারবার ঝাঁকিয়ে নেয়। সায়ন গলায় রহস্য এনে বলে, ‘হুমম! এর পরের সার্চটা তোমার বাড়িতে করতে হবে দেখছি।’ সূর্য হেসে ফেলে। লজ্জায় গালদুটোয় লালচে আভা ফুটে ওঠে। সায়ন এবার আলমারির মধ্যে থেকে একটা প্যান্টি বের করে আনে। এবার সূর্যের মুখে কুলুপ দেখে সায়ন নিজেই বলে, ‘এটাও কী সাধারণ?’ বলেই প্যান্টিটা সূর্যের হাতে ধরিয়ে দেয়। সূর্য বলে, ‘হ্যাঁ স্যার। দুটো একই কোম্পানি।’ ঠাট্টা করে সায়ন বলে, ‘কী অভিজ্ঞ কমেন্ট!’ সূর্য এবার পালাতে পারলে বাঁচে। ‘নির্মলবাবু, এগুলো যত্ন করে ব্যাগে ভরুন’, সায়ন গলা তুলে কনস্টেবলকে নির্দেশ দেয়। তারপর নিজের মনে বিড়বিড় করে বলে, ‘তার মানে তন্ময় হালদারের জীবনে আত্রেয়ী সেন ছাড়াও অন্য নারীর আনাগোনা আছে।’
— শুধু আনাগোনাই নয় স্যার, যথেষ্ট গভীর যাওয়া-আসা। হয়তো ওই নীল চুড়িদার!
সায়ন মাথা নাড়ল। আলমারির মধ্যেই বেশ খানিকটা ভেতরে ছোট্ট একটা বাক্স খুঁজে পায়। যার মধ্যে ক্যামেরার বেশ কয়েকটা মেমরি কার্ড পাওয়া যায়। সেগুলোকে সূর্যের হাতে দিয়ে আলমারিটা আরও ভালো করে দেখে। একদম নীচের তাকে একটা ছিদ্র চোখে পড়ে। চোখটাকে ছিদ্রের কাছে নিয়ে যেতেই সায়নের মনে হয় ওটা একটা চাবি ঢোকাবার জায়গা। তার মানে এই আলমারির গোপন সিন্দুক ওটাই। সদ্য খুঁজে পাওয়া চাবিগুলো দিয়ে খোলবার চেষ্টা করতে থাকে। একটি ছোটো চাবি গর্তটার খাপে বসে অনায়াসেই ঘুরে যায়। সূর্য বলে, ‘স্যার সরুন আমি দেখছি।’ সায়ন বলে, ‘না আমি ডালাটা তুলছি তুমি বরং এর ভেতরে যা যা আছে বের করো।’ সায়নের নির্দেশ মতো কাজ হয়। কয়েক বান্ডিল টাকা বেরিয়ে আসে আর বেশ কতগুলো ফাইল। টাকাগুলো নেড়েচেড়ে যথাস্থানে রেখে দেয়। ফাইলগুলো খুঁটিয়ে দেখতে থাকে সায়ন আর সূর্য। দু-তিনটে ফাইলের পর সায়নের হাত থেমে যায় গোলাপি রঙের একটি বিশেষ ফাইলে। সূর্য, এ তো সাংঘাতিক ব্যাপার!’
— কী হয়েছে স্যার?
একটা কাগজ সূর্যের দিকে বাড়িয়ে দেয় সায়ন। সূর্য সেটা দেখতে থাকে। কাচের জানলা দিয়ে আসা দিনের আলোয় সায়ন তুলে ধরে ফাইলের মধ্যে থাকা আরও কিছু কাগজ। দেখে সায়নের চোখ কপালে ওঠে। কেসের জট যত খুলতে যাচ্ছে, ততই সেটা যেন প্রকাণ্ড এক অজগরের প্যাচে জড়িয়ে ফেলছে সায়নকে।
