মৃত জ্যোৎস্নার রাত্রি – ১৭
সতেরো
শরীরে আর মনে মৃন্ময়ীর ভীষণ ক্লান্তি। দুপুরে ছেলেকে পাশে নিয়ে বিছানায় পিঠ ঠেকাতেই দু-চোখে ঘুম নেমে এল। মুনাই ঘরে এসে একবার দেখে গেল বউদি আর সোনাইকে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘর থেকে সবে বেরিয়ে যাচ্ছিল অমনি মৃন্ময়ীর মোবাইলটা বেজে উঠল। মুনাই যেতে গিয়েও থমকে দাঁড়াল। মৃন্ময়ী ঘুমের অতল থেকে থাড়িমাড়ি খেয়ে উঠে বসল। মুনাই গলা চেপে জিজ্ঞেস করল, ‘কে গো?’ মৃন্ময়ী দেখল আননোন নম্বর। ‘হ্যালো। হ্যাঁ বলছি। কে?’ এখন যে-কোনো ফোন এলেই মৃন্ময়ী ভীষণ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। কী জানি কখন কী খবর আসে! মৃন্ময়ী বলল, ‘ও হ্যাঁ কাকিমা বলুন।’ মুনাই ইশারায় আবার জিজ্ঞেস করল কে ফোন করেছে? ফোনের স্পিকারে হাত চাপা দিয়ে ফিসফিসে গলায় মৃন্ময়ী বলল, ‘পাশের বাড়ির কাকিমা।’ বলেই ফোনের ওপারে থাকা মানুষটার উদ্দেশে বলল, ‘হ্যাঁ কাকিমা শুনতে পাচ্ছি, বলুন।’
— তোমরা কি বাড়িতে নেই? তালা দেখলাম মনে হল।
— না কাকিমা। আমি ননদের বাড়ি। কেন কিছু হয়েছে?
— আমার সেটাই মনে হল বলেই ফোন করলাম বউমা। তোমরা বাড়ি নেই অথচ তোমাদের বাড়ি থেকে নানারকম শব্দ পাওয়া যাচ্ছে।
— মানে?
— হ্যাঁ গো। শব্দগুলো বেশ জোরে জোরে হচ্ছে। প্রথমে তো তোমার কাকু ভাবল চোর-টোর এল নাকি। পাশের বাড়ির টুবানের বাবাকে নিয়ে তোমার কাকু গেল। বাড়ির চারপাশটা ঘুরে এসে বলল, নাহ্! কোত্থাও কিছু ভাঙা নেই। দরজা জানলা সব বন্ধ। তালা দেওয়া। অবিশ্যি কাকুরা তোমাদের বাড়ির কাছে যেতেই শব্দ বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু ফিরে আসার পর আবার দু-তিনবার একই শব্দ।
পড়শি কাকিমার কথা যত কানে যাচ্ছে ততই বুকের ভেতরে ভয়টা কামড়ে ধরছে। আগের দিন রাতে চেয়ার টেবিল এলোমেলো হয়ে পড়েছিল। নানানরকম শব্দও মৃন্ময়ী পেয়েছে।
— হ্যালো বউমা। শুনতে পাচ্ছ?
— হ্যাঁ কাকিমা পাচ্ছি।
মৃন্ময়ী নিজেকে সামলে বলে, ‘চিন্তা করবেন না কাকিমা। আমি আসছি। রাখছি।’ কান থেকে ফোন নামিয়ে মুনাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘আমাদের ও বাড়িতে যেতে হবে মুনাই।’
— কেন? কী হয়েছে?
ফোনে শোনা সব কথা মুনাইকে জানায় মৃন্ময়ী। মুনাই বউদিকে একা ছাড়ে না। সে-ও বেরিয়ে পড়ে। সায়নকে ফোনে সবটা জানায়। সব শুনে সায়ন ঠিক কোন দিকে যাবে বুঝতে পারে না। মুনাই বলে, তুমি ওপাশটা সামলাও। আমি এদিকে দেখছি। পারলে সন্ধেবেলা একবার এসো।’
দুপুর সবে বিকেল হচ্ছে। মৃন্ময়ী, মুনাই আর ছোট্ট সোনাইকে বাড়ির গেটের কাছে ছেড়ে দিয়ে গাড়িটা চলে গেল। ঘুমন্ত সোনাই মুনাইয়ের কোলে। মৃন্ময়ী দোতলা বাড়িটাকে এক চোখে দেখে নিল। এমন করে দেখা তো আগেও বহুবার দেখেছে। কিন্তু আজ বুকের ভেতরটা কেমন যেন খাঁ খাঁ করে উঠল। বারান্দার গেট খুলে দরজার তালাটা খুলে ফেলল। বড়ো করে একটা নিশ্বাস নিয়ে দরজাটা ঠেলে খুলে দিল মৃন্ময়ী। ভেতরে উঁকি দেওয়ামাত্রই মুনাই উৎকণ্ঠিত হয়ে বলে উঠল, ‘ও কী গো? দেখে পা ফেলো বউদি।’ মৃন্ময়ীর চমক লাগল না। বরং ও এখন শুরু থেকেই সাবধানী। নীচের ডাইনিং জুড়ে সারা মেঝেতে কাচ-ছড়ানো। জানলার পাশে রাখা ফাঁকা অ্যাকোয়ারিয়ামটা ভেঙে চুরচুর হয়ে গেছে। মৃন্ময়ী মুনাইকে বলল, ‘যাই ঘটে যাক মুনাই, সোনাইকে কোল থেকে নামাবে না। ছাড়বেও না। সেরকম বুঝলে ওকে নিয়ে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাবে।’
— এসব কথা কেন বলছ বউদি?
কাঁদো-কাঁদো হয়ে বলল মুনাই।
— কেন বলছি বুঝতে পারছ না? কে করল বাড়ির এমন অবস্থা?
— কে?
বলামাত্রই চোখের সামনে রাখা ফ্রিজের পাল্লাটা খুলেই দড়াম করে বন্ধ হয়ে গেল। আঁতকে উঠল মৃন্ময়ী আর মুনাই। ঘুম ভেঙে গেল সোনাইয়ের। ছটফট করে উঠল। আধো আধো স্বরে বলে উঠল, ‘দুধ খাব, দুধ খাব, দুধ দাও না।’ মুনাই বাবাবাছা করে বোঝাবার চেষ্টা করছে। মৃন্ময়ী আতঙ্কিত দুটো চোখ মেলে ঘরের চারপাশ দেখে চলেছে। হঠাৎ সিঁড়ির তলার ঘরের দিকে চোখ গেল। দরজার ছিটকিনিটা ভেঙে ঝুলছে। ‘আচ্ছা মুনাই, সায়ন সিঁড়ির ঘরের দরজা দিয়ে গিয়েছিল না?’ সোনাইকে সামলাতে সামলাতেই বলল, ‘হ্যাঁ মনে হয়। ওই টেডিটা সিঁড়ির ঘরে রেখে দরজা বন্ধ করে…’ কথাটা শেষ করার আগেই মুনাইয়েরও চোখ যায় সিঁড়ির ঘরের দরজার দিকে। দুজনেই গিয়ে দেখে সিঁড়ির ঘরে কোনো টেডি নেই। মৃন্ময়ী মুনাইয়ের দিকে তাকাতে গিয়ে দেখে নীচের শোবার ঘরের দরজা হাট করে খোলা। মৃন্ময়ীর চোখদুটো ভয়ে লাল হয়ে উঠছে। ঘরের দিকে এগিয়ে গেল সে। মুনাইও পিছু নিল। ঘরে ঢুকেই ‘আঁক’ করে মুখ দিয়ে একটা শব্দ করে দু-পা পিছিয়ে গেল মৃন্ময়ী। মুনাই চমকে উঠে বলল, ‘কী হল বউদি?’ বলেই সে বিছানার দিকে তাকাতেই এক অত্যাশ্চর্য কাণ্ড প্রত্যক্ষ করে। দেখল মৃত্যুর মতো কালো দুটো চোখ নিয়ে বিছানার ওপর টেডিটা বসে আছে। মুনাই মৃন্ময়ীকে আঁকড়ে ধরে। ‘এসব কী হচ্ছে বউদি? এটা এখানে কী করে?’ ঠিক এইসময় সোনাই প্রচণ্ড ছটফট করে ওঠে মুনাইয়ের কোলে। সে কিছুতেই তার পিসির কোলে থাকবে না। পা দুটো সটান মাটির দিকে ঝুলিয়ে জোর করে মুনাইয়ের কোল থেকে নেমে দ্রুত গতিতে বিছানায় উঠে পড়ে। কেউ কিছু বোঝার আগেই দু-হাতে জাপটে ধরে টেডিটাকে। মৃন্ময়ী চিৎকার করে ধমক দিয়ে ওঠে। মুনাই ঝট করে ঘরের আলোটা জ্বালিয়ে দেয়। সোনাই দুধের কথা ভুলেই গেছে। সে এখন টেডি নিয়ে খেলতে ব্যস্ত। মুনাই বলে, ‘ওটা দিয়ে দাও সোনাই। এটা বাজে হয়ে গেছে। তোমাকে আর-একটা ভালো টেডি এনে দেব বাবা। ওটা দাও।’
— না। এটা দেবে না। আমি খেলু কব্বো।
মুনাই অসহায় চোখে মৃন্ময়ীর দিকে তাকায়।
.
— বন্দনা দত্ত কে?
ধানুয়ার চোখের ওপর চোখ রেখে প্রশ্ন করল সায়ন।
— মেডামের খাস লোক ছিল।
— খাস লোক মানে? আর এখনই-বা নেই কেন?
ধানুয়া ঢোঁক গিলল। বলল, ‘খাস লোক মানে এখন মিতালি যো কাম করে মানে মেডামের পিএ। উও কাম বন্দনা দিদি করত।
— এখন কেন করে না?
— সবকুছ তো জানি না সাব। একদিন রাত মে বন্দনা দিদি আপনা সামান লে কর চলে গয়ে। ফির মিতালি আয়া।
— রাতে গেল কেন? সেটা কী জানো?
— নাহি সাব। উও সব হামি ক্যায়সে…
সায়ন সোজা হয়ে চেয়ারে বসে প্রশ্ন করল, ‘আচ্ছা ধানুয়া, বন্দনা যেদিন যাচ্ছিল সেদিন ওর মধ্যে বিশেষ কিছু খেয়াল করেছিলে?’
— মতলব?
— মতলব বন্দনা কি খুব রেগেছিল? বা কাঁদছিল?
— নাহি। রেগে তো ছিল না। পর উও দিখ নে মে থোড়ি উদাস লাগি। ওউর মাথা থেকে মুখ চোলি মে ঢাকা ছিল।
সায়ন অমনি সূর্যের দিকে চাইল। দুজনেরই আজ নার্সিংহোমে তন্ময়ের খবর নিতে যাওয়া মেয়েটির কথাই মনে হল। তবে সূর্য পট করে প্রশ্ন করল, ‘মাথা থেকে মুখ যদি ঢাকাই থাকে তাহলে বন্দনা উদাস ছিল কী করে বুঝলে?’ ধানুয়া বিন্দুমাত্র না ঘাবড়িয়ে বলল, ‘যব যা রহে থে তব ম্যায়নে পুছা ইতনি রাত তুম কাঁহা যা রহি হো? বন্দনাদিদি বলল, চলে যাচ্ছি ধানুয়াদাদা। শরীর খুব খারাপ। ম্যাডামকে দেখে রেখো। হামি তো তাজ্জব বনে গেলাম। অ্যায়সা ক্যায়া হুয়া কুছ সমঝ মে নেহি আয়া।’ ‘হুম’ বলে চেয়ারে শরীরটাকে হেলিয়ে দিল সায়ন। সেই ফাঁকে সূর্য ধানুয়াকে জিজ্ঞেস করল, ‘অত রাতে গেল কীসে?’
— দূরে একটা গাড়ি দাঁড়িয়েছিল।
সায়ন জিজ্ঞেস করল, তন্ময়বাবুর সঙ্গে বন্দনাদিদির কেমন সম্পর্ক ছিল?’ ধানুয়া বলল, ‘আচ্ছা থা।’
— ম্যাডাম বাড়ি না থাকলে তন্ময়বাবু বাড়িতে আসত বন্দনাদিদির কাছে?
— মেডাম ঘর না থাকলে বন্দনাদিদি ভি থাকবে কী করে? উও তো মেডামকা পিএ থা।
— তোমার ম্যাডাম কী সবসময় বন্দনাকে নিয়েই ঘুরত?
— নাহি। মাঝে তিন-চারবার বন্দনাদিদি ঘর মে থা। একদিন বহুত বারিষ হুয়া। উসদিন তন্ময়সাব ঘর মে আয়ে থে।
— পথে এসো বাপ।
সায়ন যেন এবার একটা পয়েন্ট পেয়েছে হাতে। ‘সেদিন তোমার বন্দনাদিদিও বাড়িতে ছিল তাই তো?’
— বন্দনাদিদি পরে আসে। উও ছুট্টি মে থি। আগে থেকে তন্ময়সাব আকেলা ছিল।
সঙ্গে সঙ্গে সূর্য বলল, ‘ম্যাডামকে ছাড়া বন্দনাদিদি একা কখনও বেরোত?’
— আগে যেত না। তবে করিব ছ্যায় সাত মাহিনা মে অনেকবার বেরিয়েছে। উও মেডামকে পাস যাতে থে স্টুডিয়ো মে।
— এই তো বললে বন্দনাকে নিয়েই ম্যাডাম ঘুরত। আবার এই বলছ বন্দনা
একা ম্যাডামকে পাস যাতে থে।
পেঁচিয়ে ধরার মতো করে সূর্য কথাটা বলে উঠল। ‘আহাহা! উও বাত নাহি আছে ধানুয়া মুখের সামনে দু-হাত নেড়ে বলল, ‘কভি কভি মেডাম পারসোনাল কামে বাহার যেত। তব বন্দনাদিদিকো বলতো কী অমুক টাইম ইন্দ্রপুরী চলে যাস, টেকনিশিয়ান চলে যাস। বন্দনাদিদি ভি টাইম পে চলে যেত।’
— বন্দনা এখন থাকে কোথায়?
— উও মালুম নাহি।
— ঠিক তো?
— মা কসম সাব।
— সূর্য, তন্ময়ের ক্যামেরা থেকে যা যা ছবি পাওয়া গেছে সেগুলো ধানুয়াকে দেখাও। তার মধ্যে যদি বন্দনা থাকে তাহলে তো সোনায় সোহাগা।
সূর্য জানাল, কোনো কার্ডেই কোনো ছবি নেই। সায়ন এটা এক্সপেক্ট করেনি একদমই। লড়াইটা আরও কঠিন হয়ে গেল। বাইরে থেকে একজন ঘরের ভেতর মুখ বাড়িয়ে বলে, ‘আসব স্যার?’ সায়ন বলল, ‘আসুন দত্তবাবু।’ বেঁটেখাটো লোকটা ঢুকে এসে বলল, ‘স্যার আপনার কথা মতো তন্ময় হালদারের ফোনের কল রেকর্ড চেক করা হয়েছে। সন্দেহজনক একটাই নাম উঠে এসেছে।’
— কী নাম?
— নামটা ‘ডি বি’ বলে সেভ করা।
সায়নের ভ্রূ কুঁচকে গেল। নামটা নিজেই আওড়াল ‘ডি বি!’ অমনি সূর্য বিড়বিড় করে বলে উঠল, ‘বন্দনা দত্ত, দত্ত বন্দনা।’ সূর্যের পিঠের বদলে টেবিল চাপড়ে প্ৰশংসা করে উঠল সায়ন, ‘এক্সেলেন্ট সূর্য।’ দত্তবাবুকে সায়ন বলল, ‘ফোন লাগান।’
— করা হয়েছে স্যার। সুইচড অফ।
খানিকক্ষণের জন্য চুপ করে গেল সায়ন। কীসব যেন ভেবে ধানুয়াকে বলল, ‘ধানুয়া, আপনাকে কিছুদিন আমাদের হেফাজতে থাকতে হবে।’ শোনামাত্ৰই ধানুয়া তো হাউমাউ করে উঠল, ‘ম্যায়নে কুছ নাহি কিয়া সাব। বিসওয়াস কিজিয়ে সাব।’ ইত্যাদি ইত্যাদি। সায়ন জোর গলায় ধমকে উঠে বলল, ‘আপনাকে আমরা গ্রেপ্তার করছি না ধানুয়া। বরং আপনার ভালোর জন্য আমরা আপনাকে আমাদের হেফাজতে রাখব। যাতে আপনার কোনো ক্ষতি না হয়।’ প্রায় কেঁদে ফেলেছিল ধানুয়া। কিন্তু সায়নের কথা শুনে কী বলবে ভাবতে ভাবতেই সায়ন ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল সূর্য আর দত্তকে নিয়ে। বাইরে গিয়ে বলল, ‘দত্তবাবু, লাস্ট এক মাসে ওই ডিবি নম্বর থেকে যতবার ফোন এসেছে সেগুলো কোন কোন জায়গা থেকে এসেছে ট্র্যাক করার ব্যবস্থা করুন।’
— ওকে স্যার।
— মনে রাখবেন ম্যাক্সিমাম আধঘণ্টা আপনাকে আমি দিতে পারি। এই সূর্য, তুমি বিকেলে এখন ক-টা অবধি ডিউটি দিচ্ছ?
সূর্য বুদ্ধিমান ছেলে। ফিক করে হেসে সায়নের ঠাট্টার আড়ালে থাকা আসল প্রশ্নের জবাব দিল, ‘কাজের চাপ চলছে তো স্যার, তাই সন্ধে সাড়ে ছটা তো বেজেই যায়।
সায়ন ভ্রূ তুলে বলল, ইম্প্রেসিভ! তার মানে আজ হলেও হতে পারে।’
— পারে। কিন্তু কীভাবে?
— বন্দনা ম্যাডাম কখনও না কখনও ঘরে বসে ফোন তো করবেই। অন্তত এই সময় মেয়েরা তো সেটাই করে।
সূর্য বেশ ভালোই বুঝল সায়ন কী বলতে চাইছে।
.
মৃন্ময়ী অত্যন্ত সন্তর্পণে ঝাঁটা দিয়ে মাটিতে ছড়িয়ে থাকা কাচগুলো এক জায়গায় জড়ো করছে। ঘর থেকে মুনাই গলা তুলে জিজ্ঞেস করল, ‘বউদি তুমি সোনাইয়ের কাছে বোসো না। আমি করে দিচ্ছি।’
— না গো। তুমি সোনাইকে দ্যাখো। আমি করে নিচ্ছি।
গুঁড়ো কাচের সঙ্গে বড়ো বড়ো কাচের টুকরোও রয়েছে। সেগুলো একসঙ্গে জড়ো করতে করতে হঠাৎ মৃন্ময়ীর হাত আটকে গেল। মুহূর্তে মনে হল জড়ো করা কাচের টুকরোতে কারও যেন ছায়া এসে দাঁড়িয়েছে। আঁতকে উঠে পাশে তাকাতেই দেখে কেউ নেই। সিলিঙের দিকে তাকায়। সেখানে পাখাটা নিজের মতোই ঘুরছে। চোখের সামনে ঝলসে উঠল টিভিতে দেখা মিহিরের মুখের ওপর বসানো সাদা দুটো ভয়ানক চোখের ছবি। মেরুদণ্ড বেয়ে হিমস্রোত নেমে গেল। পরক্ষণেই মনে হল মিহির এখন দশটা ডাক্তার আর নার্সের তত্ত্বাবধানে নার্সিংহোমে শুয়ে আছে। মৃন্ময়ী ঝাঁটাটাকে বুকের কাছে ধরে দাঁড়িয়ে ছিল এতক্ষণ। এবার মাটিতে হাঁটু মুড়ে বসে একটা বড়ো কালো প্যাকেটে কাচগুলোকে ভরতে থাকে। কিন্তু তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বারবার বলছিল, ওর পাশে বা পেছনে কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে। একভাবে মৃন্ময়ীর সব কাজ লক্ষ করছে সে। হাত কাঁপছে মৃন্ময়ীর। তবু মনে মনে সে একটাই কথা আওড়ে চলেছে, এ বাড়ি ছেড়ে কোথাও নয়। নীলাম্বর ব্যানার্জি বলেছিল যে, ভয় পেলেই হেরে যাবে তুমি।
.
মুনাই অনেকক্ষণ ধরে লক্ষ করছে সোনাইকে। টেডিটা বুকে ধরে ছেলেটা কেমন যেন নিস্তেজ হয়ে গেছে। টেডির খোবলানো চোখে সোনাই তার ছোট্ট ছোট্ট আঙুল গলিয়ে দিয়ে চুপ করে খেলে চলেছে। ‘কী দেখছ সোনাই? টেডিটার চোখটা নষ্ট হয়ে গেছে? আমি আবার একটা নতুন টেডি এনে দেব তোমায়, কেমন?’ সোনাই চুপ করে থাকে। কথাটা শোনামাত্রই মুনাই খেয়াল করে সোনাইয়ের তর্জনীটা গর্তের মধ্যেই খেলা করতে করতে থেমে যায়। তারপর বলে, ‘আমার নতুন টেডি চাই না।’ চমকে ওঠে মুনাই। এর আগে সোনাইয়ের মুখে এত পরিষ্কার কথা সে শোনেনি। মুনাই বলল, ‘কেন সোনাই? এই টেডিটার তো চোখ নেই। নতুন টেডির কী সুন্দর বড়ো বড়ো চোখ থাকবে!’ এরপর আর কোনো সময় দেয় না সোনাই। যন্ত্রচালিত মানবের মতো খটাস করে মুনাইয়ের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে সোনাই বলে, ‘আমার মতো চোখ হবে টেডির?’ বিছানার ধারে বসেছিল মুনাই। বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো ছিটকে মাটিতে নেমে চিৎকার করে বলে, ‘ও মা গো! সোনাআআআই।’সোনাইয়ের চোখ দুটো ঠিক টেডিটার মতো গোল আর বড়ো হয়ে গেছে। সেখানে লাল রক্তের দাগ। মুনাইয়ের চিৎকার শুনে মৃন্ময়ী দৌড়ে আসে। ‘কী হয়েছে মুনাই?’
— বউদি সোনাইয়ের চোখ!
— চোখ! কী হয়েছে চোখে?
মৃন্ময়ী দৌড়ে এসে সোনাইকে বুকে জড়িয়ে ধরে। সে কিছুই বুঝতে পারে না। কারণ সোনাইয়ের চোখে কোনো অস্বাভাবিকত্বই দেখতে পায় না মৃন্ময়ী। ‘ওর চোখ তো ঠিকই আছে মুনাই।’ মুনাইও এবার ভালো করে দেখে সোনাইকে। সত্যি সোনাইয়ের চোখে কিছুই নেই। তাহলে তখন কেন সে অদ্ভুত চোখ দুটো সোনাইয়ের চোখে দেখল?
