মৃত জ্যোৎস্নার রাত্রি – ১৮
আঠারো
শরীরটা আর চলছে না। শুধুমাত্র মনের জোরে শরীরটাকে টেনে নিয়ে চলেছে সারাদিন ধরে। কতবার ভেবেছে, কিছুতেই যাবে না নার্সিংহোমে। গেলে বিপদের আশঙ্কা নব্বই শতাংশ। তবু নিজেকে ঘরের মধ্যে ধরে রাখতে পারেনি। সর্বনাশের বিশ বাঁও জলে ফেলে দিয়ে সে পালিয়ে গেল কিনা জানাটা ভীষণ জরুরি ছিল। কিন্তু এইটুকু সময়ের মধ্যে যে পুলিশ তার পিছু নেবে তা ভাবতেও পারেনি। ওরা মুখটা কী দেখে ফেলেছিল? দেখার তো কথা নয় কোনোভাবেই। যারা পাহারা দিচ্ছিল তারা কি নার্সিংহোমের অতগুলো মুখের মধ্যে একটা বিশেষ মুখ মনে রাখতে পারবে? কি জানি? ভাগ্যিস রাস্তার মোড় ঘুরতেই হলুদ ট্যাক্সিটা পেয়ে গেছিল। নইলে কীভাবে পুলিশের হাত থেকে নিজেকে বাঁচাত বন্দনা নিজেও জানে না। তারপর ওখান থেকে শ্রীতমার বাড়ি ঘুরে সময় কাটিয়ে ইচ্ছে করেই সন্ধে করে ঘরে ফিরছে সে। সন্ধের অন্ধকারে নিজেকে আড়াল করাটা বেশ সহজ। রাস্তায় যদি পুলিশ ধরেও তাহলেও থানায় নিয়ে যেতে পারবে না। যদিও সে সম্ভাবনা প্রায় নেই। যারা বন্দনার মুখটাই দেখেনি তারা কী করে বাড়ি চিনে আসবে? সাদা ওড়নায় মুখটা অনেকটা ঢেকেই আবাসনের গেট দিয়ে ঢুকে লিফটের বোতামটা টিপে দিল। কালিকাপুরের কাছে ছোট্ট জায়গা সাপুইপাড়া। সেখানেই চারতলার সাধারণ একটা ফ্ল্যাট। সবসময় গেটে পাহারাদারও থাকে না। গা-টা বেশ গুলোচ্ছে। সঙ্গে জলও নেই। খিদে পেলেও গা গুলোয় বন্দনার। এবার ঘরে ঢুকে খেয়ে, স্নান করে সোজা ঘুম দেবে। কিন্তু চোখে কী আদৌ ঘুম আসবে তার?
তিনতলায় উঠে ফ্ল্যাটের দরজায় দু-বার বেল দিতেই দরজা খুলে গেল। বয়স্কা মহিলা দরজা খুললেন। ‘কোথায় ছিলিস সারাদিন? ওঁরা সেই কখন থেকে বসে আছেন!’
— কারা?
হাতে ধরা রুমালে মুখের ঘাম মুছুতে মুছতে একটু থমকে গেল বন্দনা। বয়স্কা মানুষটা মুখের সামনে থেকে সরে যেতেই দেখল ডাইনিঙে বসে আছে দুজন মহিলা এবং দুজন পুরুষ পুলিশ অফিসার। পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল বন্দনা। সায়ন আর সূর্য সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। বন্দনা বয়স্কা মানুষটার দিকে তাকাতেই বুঝল তার চোখদুটোয় অজস্র প্রশ্ন। খানিকটা না-জানার ভান করেই বলল, ‘কী-কী ব্যাপার! আপনারা?’
— আপনিই বন্দনা দত্ত তো?
— হ্যাঁ। ব্যাপারটা কী?
সায়ন নিজের সঙ্গে বাকি সকলের পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলল, ‘একটু আলাদা কথা বলতে চাই আপনার সঙ্গে।’ বন্দনা বয়স্কা মানুষটার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তুমি একটু ভেতরে যাও মা।’ ষাটোর্ধ্ব মহিলাটি মেয়ের দিকে জুলজুল করে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কী হয়েছে রে বাণী? কোনো বিপদে পড়েছিস?’
— না মা আমি কিছুই জানি না। কথা বলি আমরা। তুমি চিন্তা কোরো না। ঘরে যাও।
বন্দনার মা সায়নদের দিকে তাকিয়ে ভেতরে চলে যায়। ঘরের দরজা বন্ধ করে দেয়। সকলেই যে যার আসন গ্রহণ করে। বন্দনা বেশ বিরক্তি নিয়েই বলে, কী হয়েছে বলুন তো? এইভাবে দলবল নিয়ে বাড়ি বয়ে এসেছেন।’ সায়ন বলল, ‘ও মা! রাস্তায় অত করে ডাকলাম। সাড়া দিলেন না। মানে শুনতে পেয়েও শুনতে পেলেন না। হঠাৎ করে দৌড়োতে শুরু করলেন।’
— এক মিনিট মিস্টার…
— সায়ন মল্লিক।
— হুম। আমাকে ডেকেছেন মানে? কোথায় ডেকেছেন?
— ওই যে ড্যাফোডিল হসপিটালের সামনে। তন্ময়বাবুর খবর নিতে গিয়েছিলেন তো?
একটু ইতস্তত করে বন্দনা বলল, ‘কে বলল? আমি ওখানে গিয়েছিলাম! কোনো প্রমাণ আছে আপনাদের কাছে?’
— যাক। তন্ময়বাবুকে যে চেনেন সেটা যে অস্বীকার করেননি এই ভালো।
বন্দনা থমকে গেল। স্মার্ট হতে গিয়ে প্রথম চোটে একটু পিছলেই গেল। তা-ও নিজেকে সামলে বলল, ‘আমি অনেক তন্ময়কে চিনি। আপনি কোন তন্ময়ের কথা বলছেন?’ সূর্য মুখ কুঁচকিয়ে বলল, ‘স্যার ইনি কিন্তু বেকার ফুটেজ খাচ্ছেন।’ সায়ন বলল, ‘আহাহাহা! অভিনেত্রীর সঙ্গে এত বছর ওঠাবসা করেছেন একটু তো ফুটেজ খাবেনই। ধৈর্য হারালে চলবে?’ সায়ন আড়চোখে বন্দনার হাতের দিকে তাকায়। দুটো হাত কচলেই চলেছে। শান্তস্বরে সায়ন বলে, ‘বন্দনা দেবী, আত্রেয়ী সেনের বিশেষ ঘনিষ্ঠ ক্যামেরাম্যান, ইন্ড্রাস্ট্রির ভাষায় যাকে ডিওপি বলে আমরা সেই তন্ময় হালদারের কথা বলছি। আশা করি এবার বুঝেছেন।’ বন্দনা ভাঙবে তবু মচকাবে না। একটুও না ভেবে বলে বসে, ‘ওখানে যে আমিই গেছিলাম তার কী প্রমাণ আছে আপনাদের কাছে? আপনাদের মধ্যে কেউ কি দেখেছেন আমাকে?’
— বাবা! আপনি তো দেখছি প্রমাণ ছাড়া এক পা-ও চলেন না! বেশ বেশ! তাহলে বলি শুনুন ..
বন্দনা একটু সোজা হয়ে বসল। সায়ন ঠিক কী বলতে চলেছে? পুলিশের কাছে কী প্রমাণ আছে যে ওটা বন্দনাই ছিল! সায়ন বন্দনার চোখের দিকে খানিক চেয়ে থেকে বলল, ‘কাল আপনাকে একবার বিধাননগর থানায় আসতে হবে।’
নে?
— হ্যাঁ। সকাল এগারোটার মধ্যে বিধাননগর থানা। যদিও আপনি থাকেন কালিকাপুরে। তবুও আপনাকে বিধাননগর থানাতেই আসতে হবে।
— ইনস্পেক্টর, আমার মনে হয় আপনারা আপনাদের সীমা লঙ্ঘন করছেন।
কড়া গলায় বলা বন্দনার অপমান দাঁতে দাঁত চিপে হজম করল সায়ন। এক মহিলা পুলিশ তড়পে উঠলে সায়ন তাকে থামিয়ে দেয়। গলা নামিয়ে সায়ন বলে, ‘মিস বন্দনা দত্ত! আত্রেয়ী সেনকে খুন করার চেষ্টা, তন্ময় হালদারকে মারার চেষ্টা। পুলিশের সন্দেহ, এই দুটো ঘটনার সঙ্গে আপনার জড়িয়ে থাকাটা স্বাভাবিক আমাদের হাতে অনেক প্রমাণ এসেছে বলেই এই কথা বলছি। সঙ্গে আপনি তো দীর্ঘ আট বছর আত্রেয়ী সেনের পিএ ছিলেন। তাই এই সম্পূর্ণ ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আপনাকে থানায় আসতে বলা হচ্ছে। বাড়িতে এটা বলা সম্ভব নয়। কারণ ঘরের দরজায় আপনার বয়স্কা মা কান পেতে দাঁড়িয়ে আছেন।
.
বলার সঙ্গে সঙ্গেই বন্দনা ঘাড় ঘুরিয়ে ঘরের দিকে তাকায়। সঙ্গে সূর্য এবং দুজন মহিলা পুলিশও খেয়াল করে যে ব্যাপারটা সত্যি। দরজার দিকে সকলের সতর্ক হয়ে তাকানো এবং হঠাৎ চুপ করে যাওয়ায় বন্দনার মা দরজার পাশ থেকে সরে যান। সায়ন বন্দনার দিকে মুখ এগিয়ে এনে খুব নীচু স্বরে বলে, ‘আশা করি আপনার জীবনে এখন কী ঘটে চলেছে সেটা সম্পর্কে আপনার মা যথেষ্ট ওয়াকিবহাল নন। এই বয়সে কোনো বড়ো আঘাত উনি পান সেটা আমরাও চাই না। তাই আপনাকে থানায় আসতে বলা।’
বন্দনার মনে হল সহস্র তির যেন তার দিকে ধেয়ে এসে এক আঙুল দূরত্বে থেমে গেল। পুলিশ ঠিক কতটা জানে কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছে না বন্দনা। অবশ্য এর পরেই সায়ন যে কথা বলল, তাতে বন্দনার বুকের ভেতরের পাখিটা এক্কেবারে স্তব্ধ হয়ে গেল। সায়ন বলল, ‘আর হ্যাঁ, এই মুহূর্তে যদি আপনি কোনো মেডিসিন নিয়ে থাকেন তাহলে সেটাও সঙ্গে রাখবেন। কারণ সারাদিনের ব্যাপার তো!’ বন্দনার চমকে যাওয়া মুখটা দেখে সায়ন মনে মনে হাসল। ‘আসি’ বলে বেরিয়ে যেতে গিয়েও থমকে দাঁড়াল সায়ন। বলল, ‘পালাবার চেষ্টাও করবেন না, কেমন বাইরে সিভিল ড্রেসে পুলিশ আছে।’ ঠোঁট ছড়িয়ে সৌজন্যমূলক হাসি ছুড়েই সদলবলে বেরিয়ে গেল। দরজা বন্ধ করেই সোফায় গিয়ে বসে পড়ল বন্দনা। অনেকক্ষণের জল পিপাসা এতক্ষণ যেন উবে গিয়েছিল। পুলিশ চলে যেতে আবার তারা ঝাঁপিয়ে পড়েছে বন্দনার শুকনো গলায়। সোফা থেকে উঠে গেল টেবিলের কাছে। জগ থেকে ঢকঢক করে গলায় জল ঢালল বন্দনা। হাত উলটে মুখ মুছল। বুকের খাঁচায় হাঁফ ধরেছে তার। পাশে চুপ করে দাঁড়িয়েছিলেন বন্দনার মা, সুরভি। মেয়ের মুখ বুজে গুমরে মরা দেখে তারও বুকের ভেতর ধড়ফড় করছে। বন্দনা সোফায় এসে বসতেই সুরভি প্রশ্ন করলেন, ‘কী হয়েছে রে বাণী? কোনো বিপদে পড়েছিস? পুলিশ এল কেন? আর কেনই-বা তোকে থানায় যেতে বলছে?’ একদমে চাপা আশঙ্কা নিয়ে কথাগুলো বলে হাঁফাতে লাগলেন সুরভি। বন্দনা একটু খেঁকিয়েই উঠল, ‘আড়িপেতে শোনার অভ্যেসটা এবার ছাড়ো মা। কোনো বিপদ হয়নি।’
— তাহলে পুলিশ কেন? আত্রেয়ী সেনের খুনের ব্যাপারে কিছু?
— আমি জানি না। প্লিজ একটু একা থাকতে দাও।
— দিন দিন শুকিয়ে যাচ্ছিস। চোখের তলায় কালি পড়েছে। কাজেও যাচ্ছিস না। মাস গড়িয়ে গেল ঘরে বসে আছিস।
— উফফফ মা! একটু চুপ করো না।
— চুপ করেই তো থাকি। বলি কি কিছু? একজন তো চুপ করিয়ে রেখে নিজেই কেটে পড়ল। না সংসার গোছাতে পারল, না নিজের দিকে খেয়াল রাখল।
— আমার কিচ্ছু হয়নি। প্লিজ লিভ মি অ্যালোন।
বলেই সোফা ছেড়ে উঠে যাচ্ছিল বন্দনা। সুরভি বিড়বিড় করে উঠল, ‘আমারই ভুল। কেন যে যেচে আগুনের মধ্যে তোকে ঠেলে দিলাম! উফফফ ভগবান!’ মুখে হাতচাপা দিয়ে বসে রইলেন সুরভি। একটু নিশ্বাসের কষ্ট হচ্ছে মনে হয়। বন্দনা এক রাশ আতঙ্ক নিয়ে মায়ের দিকে আড়চোখে চেয়ে ঘরে চলে গেল।
.
রাত বেড়েছে। বন্দনার বাড়ি থেকে থানায় ফিরেছিল সায়ন। সেখানে কিছু কাজ সেরে বাড়ি ফিরছে। বাইপাসের রাস্তাটা এখন বেশ ফাঁকা। ড্রাইভারের পাশের সিটে বসে বালিগঞ্জ থানার ওসি অবনীশের সঙ্গে কথা বলছিল সায়ন। আত্রেয়ীর বাড়ি হয় কাল রাতে কিংবা পরশু সকালে দেখতে যাবে। অবনীশ অবশ্য জানায় তাতে কেস সলভ দেরি হয়ে যেতে পারে! সায়ন বলে বন্দনার কথা। কাল থানায় সকাল এগারোটা থেকে ইন্টারোগেশন। কথাগুলো বলতে বলতে গাড়ির সামনের মিররে চোখ পড়ে যায় সায়নের। পেছনের সিটে কে ওটা? কানে ফোনটা ধরেই পিছনে তাকায় সায়ন। মুখে বলে ওঠে, ‘কে?।’ ড্রাইভারও একটু চমকে ওঠে। জিজ্ঞেস করে ‘কী হয়েছে স্যার?’ ফোনের ওপার থেকে অবনীশ বলে চলে, ‘সায়নবাবু, হ্যালো হ্যালো শুনতে পাচ্ছেন?’ সায়ন একটু ধাতস্থ হয়ে কানে ফোন দিয়ে বলে, হ্যাঁ হ্যালো। বলুন।’
— এনি প্রবলেম?
— না না। আসলে হঠাৎ মনে হল গাড়ির পেছনে কাউকে যেন দেখলাম।
— কাকে?
— না না। কেউ না। ছাড়ুন। সারাদিন এত চাপে থাকি যে! বাদ দিন। তাহলে পরশুদিন একদম পাক্কা।
অবনীশ একটা নিশ্বাস ছেড়ে বলে, ‘ওক্কে ডান। বাড়ি ফিরছেন নাকি?’ মুখে জোর করে হাসি এনে বলে, ‘হ্যাঁ ওই রাত কাটাতে হবে তাই। আবার তো কাল সক্কাল সক্কাল!’
— কেসটা মিটে গেলে একটা লম্বা ছুটি নিন। গিন্নিকে নিয়ে ঘুরে আসুন কোথাও থেকে।
সায়ন হাসল। কিছু একটা জবাব দিতে যাবে অমনি গাড়িটা অদ্ভুত ঘড়ঘড়ে একটা শব্দ করতে থাকে। হেঁচকি তোলার মতো হোঁচট খেতে খেতে এগোতে থাকে। ড্রাইভার অনেক কষ্টে শুনশান বাইপাসের পাশে গাড়িটাকে দাঁড় করায়। ‘কী হল আবদুল?’ সায়ন জিজ্ঞেস করল। আবদুল ঠোঁট উলটে বলল, ঠিক বুঝছি না স্যার। নেমে দেখছি।’ গঁক করে হিক্কা তুলে গাড়িটা থামল। আবদুল নেমে সামনের বনেট তুলল। সায়ন অবনীশকে বলল, ‘মরার আগে আমাদের ছুটি নেই অবনীশবাবু। এই দেখুন না, সারাদিনের খাটাখাটনির শেষে বাড়ি ফিরে যে আরাম করব তার উপায় নেই। মাঝরাস্তায় গাড়ি গেল বিগড়ে।’
— এই রে! সবে ভাবছিলাম গুড নাইট বলব আপনাকে। সেটা আর হল না।
অবনীশের ঠাট্টায় হেহে করে হাসল সায়ন। তারপর ফোন রেখে জিজ্ঞেস করল, ‘কী বুঝছ আবদুল?’ বনেটের ওপার থেকে আবদুলের উত্তর এল, ‘একটু সময় লাগবে স্যার।’ হুঃ করে মুখ দিয়ে একটা শ্বাস ছেড়ে গাড়ি থেকে নেমে পড়ল সায়ন। মোবাইল আনলক করে সোশ্যাল সাইটে ঢুঁ মারতে মারতে গাড়ির পেছনের দিকে একটু এগিয়ে গেল। সারাদিন গরম থাকলেও এখন বেশ ফুরফুরে হাওয়া দিচ্ছে। সায়নের ইচ্ছে করছে শরীর থেকে পুলিশের উদিটা খুলে ফেলে একটু প্রাণখুলে শ্বাস নিতে। পাশ দিয়ে মাঝেমধ্যে দু-একটা চারচাকা ঝড়ের বেগে ছুটে যাচ্ছে। রাত অনেক। তাই আর স্পিডোমিটারের ধার ধারছে না কেউ। গাড়িটা যেখানে দাঁড়িয়েছে তার থেকে কয়েক হাত দুরেই একটা ল্যাম্পপোস্ট। সেই আলোর বেশ খানিকটা জিপের ওপর এসে পড়েছে। সায়নের আলো ভালো লাগছে না। তাই একটু অন্ধকার দেখে সরে দাঁড়িয়েছে। অনেকক্ষণ সিগারেট ধরায়নি। এমনিতে বড়ো একটা খায় না। মাঝেমধ্যে ক্লান্ত লাগলে একটু ধরায়। ডান হাতের দু-আঙুলের ফাঁকে জ্বলন্ত সিগারেট আর বাঁ-হাতে মোবাইল। বেশ খানিকক্ষণ কেটে যায়। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে পা-টা টনটন করছে সায়নের। ‘কী আবদুল আর কতক্ষণ?’ সায়ন উঁচু স্বরে জিজ্ঞেস করল। কিন্তু উত্তর এল না। আবার হাঁক পাড়ল, ‘আবদুউউল, কী হল?’ কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে সায়নের। এবারেও উত্তর না পেয়ে ভ্রূ কুঁচকে জিপের সামনের দিকে এগোতে থাকল। ‘আরে আবদুল, ঘুমিয়ে পড়লে নাকি?’ কথাটা বলতে বলতে জিপের সামনে এসে দাঁড়াতেই মনে হল মহাকাশ থেকে একটা ধূমকেতু যেন প্রচণ্ড বিস্ফোরণে ঝাঁপিয়ে পড়ল। মুহূর্তে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে খাক করে দিল সব। আবদুল মুখ থুবড়ে ইঞ্জিনের ওপর পড়ে আছে। কিন্তু তার মুখটা কে যেন ঘুরিয়ে এক্কেবারে পিঠের দিকে নিয়ে এসেছে। চোখদুটো যন্ত্রণায় ঠেলে বেরিয়ে এসেছে। সায়নের জীবনে এমন লাশ প্রথমবার দেখছে সে। আবদুলের নাম ধরে চিৎকার করে উঠল সায়ন। পুলিশ হয়েও সে প্রচণ্ড ভয়ে কাঁপছে। মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে এমন সর্বনাশ কে ঘটাল? আশেপাশে তো কেউ নেই। পাগলের মতো গাড়িকে কেন্দ্র করে সায়ন চিৎকার করছে। ‘কোন শুয়োরের বাচ্চা এ কাজ করলি? সাহস থাকলে সামনে আয় জানোয়ার।’ চিৎকার করাই সার। আগের মতো ফুরফুরে হাওয়া ছাড়া কেউ নেই। পাশ দিয়ে আরও দুটো গাড়ি ছুটে গেল। আর ঠিক তার পরেই সায়নের মনে হল দূরে রাস্তার ওপারে কেউ একজন দাঁড়িয়ে। আগন্তুককে চিনতে না পারলেও একটা জিনিস সে ভালো করেই চিনতে পারল। দূরে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটার দুটো চোখ। অন্ধকারেও সাদা রক্তশূন্য দুটো চোখ এক দৃষ্টে চেয়ে আছে সায়নের দিকে। সায়ন দৌড়ে রাস্তা পেরোতে গেল। দানবের মতো ছুটে এল একটা চারচাকা। বিকট শব্দে সে-ও চাকা ঘষে ছুটে গেল। দাঁড়াল না বা দাঁড়াবার চেষ্টাও করল না। সায়ন নিজেকে এগিয়ে দিয়েও ঝটিকার মতো পিছিয়ে এল। একটুর জন্য প্রাণ রক্ষা হল তার। গাড়িটা চলে গেল। রাস্তার ওপারে আর কেউ নেই। তবু দৌড়ে গেল সায়ন। ধু ধু করছে ফুটপাথ। দু-তিনটে বন্ধ দোকান। বুকের ভেতর হাপরে টান লাগছে। গুলিয়ে উঠছে কান্না। আবদুলের বীভৎস মৃতদেহটার পাশে দাঁড়াতে পারছে না সে। অনেক কষ্টে থানায় ফোন করে সে।
