মৃত জ্যোৎস্নার রাত্রি – ২০
কুড়ি
কান থেকে ফোনটা নামিয়ে চুপ করে বসে আছে মৃন্ময়ী। ঘরে রাখা খাট আর জানলার মাঝে সরু ফালি জায়গাটায় বসে বল নিয়ে নিজের মনে খেলছে সোনাই। তবে একটু আগে যেরকম দুরন্তপনা করছিল তার চেয়ে এখন অনেকটাই চুপ। মৃন্ময়ী যতক্ষণ ফোনে কথা বলে গেল সোনাই বলটাকে হাতে নিয়ে শূন্য চোখে চুপটি করে সব শুনল। কী বুঝল সে শুধু ওই জানে। ছোটো একটা টাওয়েলে হাত মুছতে মুছতে ঘরে ঢুকে এল মুনাই। রান্না চাপিয়ে এসেছে। কী ভাবছ বউদি?’ মুনাইয়ের কথায় চটক ভাঙল মৃন্ময়ীর। মুনাই আবার বলল, ‘দাদার কোনো খবর পেলে?’
— হুম।
— কেমন আছে?
— একই কথা বলল। স্টেবল। মেডিসিনে রেসপন্স করছে। আজকেও সকালে রক্ত দিয়েছে।
মৃন্ময়ীর গায়ে হাত রেখে মুনাই বলে, ‘আমার মন বলছে, দেখো দাদা ভালো হয়ে যাবে। বাড়ি ফিরে আসবে!’ একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল মৃন্ময়ীর গলা ফুঁড়ে। ‘অনেক বেলা হল। সোনাইকে স্নান করিয়ে দিই।’ মৃন্ময়ীর কথা শুনে মুনাই বলল, ‘শুধু সোনাই নয়। তুমিও স্নান করে নাও। ততক্ষণে আমি ডালটা নামিয়ে দুটো ডিম ভেজে নিচ্ছি। তারপর আমিও স্নান করতে যাব।’ মৃন্ময়ী হাসল। তারপরেই কী যেন মনে হতে মৃন্ময়ী জিজ্ঞেস করল, ‘হ্যাঁ গো, সায়ন বাড়ি ফিরেছে? কাল থেকে যা যাচ্ছে ওর ওপর দিয়ে!’
— বাড়িই ফেরেনি। থানায় খেয়েছে কিনা জানি না।
— সে কী কথা! একবার ফোন করে কথা বলো না।
— বারণ করেছে। কী জরুরি কাজ আছে। তবে একটা ভালো খবর। কমিশনার ওর সব কথা বিশ্বাস করেছে। প্রমাণও নাকি পেয়েছে। সিসিটিভিতে খুনিকে দেখাই যায়নি। অথচ খুনটা হয়েছে। সায়ন সেই স্পটেই ছিল না। পুরোটাই অলৌকিক কাণ্ড।
— তুমি কী করে জানলে?
সায়ন লালবাজার থেকে থানায় যাবার পথে ফোন করেছিল। তখনই বলল।
মৃন্ময়ী আবার আনমনা হয়ে যায়। নিজের মধ্যে ডুবে গিয়ে বলে, ‘সবটাই অলৌকিক। কী করে যে এর সমাধান হবে জানা নেই।’
.
মৃন্ময়ী বাথরুমে ঢুকে সোনাইয়ের গায়ের জামা খুলে দেয়। ‘বাবা! আজ যে বড়ো লক্ষ্মী ছেলে! কী হয়েছে সোনাইবাবা?’ মায়ের কথায় ছেলে চুপ করে জল ভরা বালতিগুলোর দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। মৃন্ময়ী ভাবে হয়তো বাবার জন্য মনখারাপ। যাক, একদিকে ভালো যে আজ স্নান করাতে কোনো ঝামেলা পোয়াতে হবে না। মৃন্ময়ী সোনাইয়ের প্যান্টটা খুলতে যায়। সঙ্গে সঙ্গে সোনাই খপ করে মায়ের হাতদুটো ধরে ফেলে। কিছুতেই প্যান্ট খুলতে দেয় না। মৃন্ময়ী দু-বার টান দেয় কিন্তু কোমর থেকে প্যান্টটা এক চুলও নামাতে পারে না। তাই ভাবি, সোনাই তো আমার এত লক্ষ্মী নয়। কিছু না কিছু দুষ্টুমি করবেই।’ বলে আর-একবার চেষ্টা করে প্যান্টটাকে কোমর থেকে নামানোর। সোনাই এখনও মায়ের হাতদুটো ধরে আছে। ‘বাবু আজ আর দুষ্টুমি কোরো না সোনা। তাড়াতাড়ি স্নান করে খেয়ে নেবে কেমন? দেখি চলো।’ বলে সোনাইয়ের হাত ছাড়াতে গিয়েও মৃন্ময়ী অপারগ হয়। অবাক কাণ্ড! এইটুকু ছেলের এত শক্তি যে এক চুলও হাত নড়াতে পারছে না? সোনাইয়ের হাতটা অত্যধিক ঠান্ডা লাগছে। শক্ত পাথরের মতো ধরে আছে মৃন্ময়ীর হাতদুটো আর একভাবে ঘাড় বেঁকিয়ে নীচে জলভরতি বালতিগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ করেই অস্বাভাবিক মনে হয় সোনাইকে। বালতিগুলোতে কী এমন আছে সেটা দেখার জন্য মৃন্ময়ীও বালতির দিকে তাকায়। চমকে ওঠে। দেখে প্রতিটা বালতি ভরতি জল অজানা কোনো মন্ত্রবলে প্রচণ্ড গরম হয়ে টগবগ করে ফুটছে। একটা নয়, দুটো নয়, পরপর চারটে বালতির জল একইভাবে ফুটছে। ধূসর ধোঁয়ায় ভরে উঠছে বাথরুম। তার থেকেও যেটা ভয়ংকর সেটা হল বালতিগুলোর কানা টপকে জল বাথরুমের মেঝেতে পড়ছে। খানিক্ষণের মধ্যেই সেটা মৃন্ময়ী ও সোনাইকে স্পর্শ করবে।
.
গ্যাসের ওপর একটা ওভেনে কড়াইতে ডাল ফুটছে। পাশেরটাতে প্রেশার কুকার বসানো। সেখানে ভাতের সিটি পড়ছে। কিছু ফোড়ন ডালে দিয়ে খন্তি দিয়ে নাড়ছে মুনাই। হঠাৎ মৃন্ময়ীর চিৎকার। ‘বাঁচাও, মুনাআআআআই, বাঁচাও।’ আঁতকে ওঠে মুনাই। ‘কী হল বউদি?’ বলে দৌড়ে যায় বাথরুমের কাছে। যেতেই থমকে যায় বাথরুমের বন্ধ দরজার তলা দিয়ে বেরিয়ে আসছে জল। সেখান থেকেও ধোঁয়া উঠছে। মুনাইও চিৎকার করে ওঠে, ‘বউদি দরজা খোলো। এত গরমজল এল কোত্থেকে?’ দরজার কাছে যেতে গিয়েও ফিরে আসছে মুনাই। ভেতর থেকে ঝুপঝাপ আর মৃন্ময়ীর চিৎকার শুনতে পাচ্ছে।
.
ঝুপঝাপ শব্দটা হচ্ছে মৃন্ময়ীর পা থেকে। ফুটন্ত জলে দাঁড়াতে পারছে না মুনাই। পাগলের মতো লাফাচ্ছে। বাথরুমের মেঝে জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে গরম জল। কিন্তু কোনো বিকার নেই সোনাইয়ের। সে তার মায়ের হাত শক্ত করে চেপে ধরে রেখেছে। সোনাইয়ের পায়ের পাতাও গরম জলে ডুবে গেছে। তবু কাঁদছে না। মুনাই চিৎকার করে বলে, ‘দরজা ভেঙে ফ্যালো মুনাই। পুড়ে মরে যাব আমরা।’ কথাটা শুনে মুনাইয়ের পাগল হবার দশা। কী করবে? কিচ্ছু বুঝতে পারছে না। মৃন্ময়ী চিৎকার করছে, ‘সোনাই ছাড়। কী হল তোর? সোনাইইইই!’ জল বেড়েই চলেছে। পাশের কল খুলে গেল নিজে থেকেই। সেখান থেকেও হু হু করে বেরিয়ে আসছে গরম জল। পায়ের পাতা জ্বালিয়ে দিচ্ছে। বাথরুমে জল জমার কথাই নয়। নর্দমা দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া উচিত। কিন্তু কোথাও দিয়েই জল বেরোচ্ছে না। কেবল দরজার তলা দিয়ে জল বেরিয়ে ডাইনিং ভিজিয়ে দিচ্ছে। মৃন্ময়ী ভয়ে, জ্বালায়, ছেলের সর্বনাশ চিন্তা করে হাউহাউ করে কাঁদছে। মুনাই বাথরুমের দরজার কাছে যেতে পারছে না। গরম জলে পা পুড়ে যাচ্ছে। শেষমেশ একটা লাঠি দিয়ে দূর থেকে দরজায় জোরে মারতে থাকে। দু-তিনবার মারার পরেই একটা হাত মুনাইয়ের হাত ধরে আটকে দেয়। চমকে ওঠে মুনাই।
.
বন্ধ বাথরুমে ধোঁয়া ভরতি হয়ে গেছে। মৃন্ময়ী সব জ্বালা উপেক্ষা করে প্রাণপণে ছেলেকে ওপর দিকে তুলে ধরার চেষ্টা করে। গলা চিরে আর্তনাদ বেরিয়ে আসছে তার, ‘মুনাআআআআআই দরজা ভাঙো, প্লিইইইজ।’ আর পেরে উঠছে না মৃন্ময়ী। এমন সময় হঠাৎ খেয়াল করে সোনাই ছটফট করে উঠছে। সে-ও লাফাতে থাকে। মৃন্ময়ীর মনে হল সোনাইয়ের পায়ে বোধহয় এবার সাড় ফিরেছে। মায়ের হাতটা ছেড়েও দিল চট করে। পরিত্রাহী চিৎকার করে কাঁদতে থাকে। ঘটনার আকস্মিকতায় মৃন্ময়ীর মস্তিষ্ক খানিকক্ষণের জন্য শূন্য হয়ে যায়। সংবিত ফিরতেই গরম জল থেকে একটানে ছেলেকে কোলে তুলে নেয়। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ছেলের কচি কচি পা থেকে গরম জলের বিন্দুগুলো সরিয়ে দিতে থাকে। লাল হয়ে উঠেছে কচি কচি পা দুটো। বাথরুম থেকে ধোঁয়া উধাও হতে থাকে। পায়ের নীচে জলও ঠান্ডা হতে থাকে। কে যেন বাথরুমের দরজায় দুমদুম করে মারতে থাকে। দরজায় আঘাত করার প্রবল শব্দগুলো বাথরুমের মধ্যেই প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। ছেলেকে বুকে আঁকড়ে ভীষণ ভয়ে চোখদুটোকে বিস্ফারিত করে দাঁড়িয়ে থাকে মৃন্ময়ী। মুনাই চিৎকার করে ওঠে, ‘বউদি, বেরিয়ে আসার চেষ্টা করো।’ মৃন্ময়ী দরজার দিকে যেতে যায়। কিন্তু বেরোবার চেষ্টা তাকে করতে হল না। কান ফাটানো শব্দে দরজাটা প্রচণ্ড জোরে দড়াম করে খুলে যায়। আঁতকে ওঠে মৃন্ময়ী। এখনও অনেকটা ধোঁয়া দরজার চারপাশে ভেসে ছিল। সেইটা সরে যেতেই মৃন্ময়ী দেখতে পায় রুদ্রাক্ষ জড়ানো একটা হাত মাটিতে গড়িয়ে যাওয়া গরম জলের ওপর রাখা। হাঁটু মুড়ে চোখ বন্ধ করে এক মনে মন্ত্র পড়ে চলেছে এক বয়স্ক মানুষ। মৃন্ময়ী কি ভুল দেখছে? মুনাই বলে ওঠে, ‘দেখছ কী? বেরিয়ে এসো।’ মৃন্ময়ীর চটক ভাঙে। গোড়ালি ডোবা জল ঠেলে বাথরুমের চৌকাঠ টপকে ডাইনিঙে এসে দাঁড়ায় মৃন্ময়ী। সোনাই কেঁদেই চলেছে। বয়স্ক লোকটি গলা তুলে গম্ভীরনাদে বলে ওঠে, ‘ছেলের পায়ে এখুনি ভালো করে পেস্ট লাগিয়ে দাও।’ মুনাই দৌড়ে পেস্ট নিয়ে আসে। মৃন্ময়ীর বুকের ভেতরটা নদীর বানে ধসে যাওয়া মাটির মতো ভেঙে ভেঙে পড়ছে। মৃন্ময়ী কি ঠিক দেখছে? যে মানুষটার আসার অপেক্ষা করে গেছে সর্বনাশের প্রথম দিন থেকে আজ কি সেই এসেছে তাদের রক্ষা করতে? মন্ত্র পড়া শেষে উঠে দাঁড়াল নীলাম্বর ব্যানার্জি। গম্ভীর অথচ শান্ত গলায় বলল, ‘পা-টা তো জ্বলে যাচ্ছে, তুমিও ভালো করে পেস্ট লাগিয়ে নাও। নইলে তো ফোসকা পড়ে যাবে আর কাছেপিঠে ডাক্তার থাকলে ডেকে পাঠাও।’ এতক্ষণ অঝোরে কাঁদার পরেও এই মুহূর্তে যে নোনা জলের ধারাদুটো গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল মৃন্ময়ীর, তার স্বাদ একদম অন্যরকম। অন্ধ পাতালে তলিয়ে যেতে যেতে একটা আলোমাখা হাত যেন কেউ বাড়িয়ে দিল তার দিকে।
