মৃত জ্যোৎস্নার রাত্রি – ২১
একুশ
— আমি তখন ক্লাস এইট। বাবা চলে গেল। লাংস ক্যানসার। কোনো চিকিৎসা করায়নি। আমাদের কিছু জানতেই দেয়নি। সাধারণ একটা প্রাইভেট ফার্মে চাকরি করত। সেভিংস খুব একটা ছিল না। বাবা পয়সা জমাত শুধু আমার বিয়ের জন্য। থেকেই থেকেই বলত, আমার বাণী মায়ের বিয়ে আমি খুব ধুমধাম করে দেব। এই এত এত গয়না দেব। প্রচুর মেকআপের জিনিস দেব। আসলে আমি ছোটো থেকেই খুব সাজতে আর সাজাতে ভালোবাসতাম। খেলতেও ভালোবাসতাম। কিন্তু সেটা নিয়ে কিছু করব তখন ভাবিনি। মা বলত, তুই কি হিরোইন হবি নাকি রে? আমি বলতাম, উঁহু, হিরোইনদের সাজাব। একেকটা সিনেমায়, এক-একরকমের সাজ। একটা মানুষকে সম্পূর্ণ অন্য একটা মানুষ বানিয়ে দিয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেব। প্রথম প্রথম দেখতাম মায়ের মুখটা কেমন যেন চুন হয়ে যাচ্ছে। আমার কথা শুনে মা খুব চিন্তায় পড়ে যেত। বুঝতাম না। পরে একদিন আমার কথা শুনে মা বলল, বেশ তোর যখন এত শখ তখন হিরোইনের মেকআপই করিস তুই। আগে পড়াশুনোটা মন দিয়ে কর।
বলতে বলতে স্মৃতিবিধুর চোখে হাসল বন্দনা। সায়ন, সোমদত্তা আর সূর্য শানিত দৃষ্টিতে চেয়ে আছে বন্দনার দিকে। কোথাও একটু ফাঁক পেলেই চেপে ধরবে তাকে। বন্দনা বলে চলে, ‘শরীরের ভেতর যে একটা কঠিন রোগ পাকিয়ে উঠেছিল বাবা সেটা বুঝতে পেরেছিল। আমার বিয়ের টাকা যাতে কম না পড়ে তাই নিজের কোনো চিকিৎসা করায়নি। যখন বাড়াবাড়ি হল, আমরা ডাক্তারের থেকে সব কিছু জানলাম তখন সব হাতের বাইরে চলে গেছে। বাবা চলে যেতে সংসারের পুরো দায়িত্ব মায়ের ঘাড়ে। লোকের বাড়ি আয়ার কাজ নিল মা। বাচ্চা দেখার। আমি মাধ্যমিক পাস করলাম। উচ্চ মাধ্যমিকটাও উতরে গেলাম। তারপরে ঠিক করলাম আর নয়। এবার মায়ের পাশে আমায় দাঁড়াতেই হবে। আর নিজের স্বপ্নটাও পূরণ করতে হবে। আমি চুটিয়ে টিউশনি করতে শুরু করলাম। সঙ্গে ভরতি হলাম বিউটিশিয়ান কোর্সে। কোর্স করলাম। সঙ্গে টুকটাক কাজও করতে শুরু করলাম টালিগঞ্জ পাড়ায়। তাতে ক-টা টিউশনি আমার চলে গেল। সময় দিতে পারছিলাম না। হঠাৎ একদিন আত্রেয়ী সেনের সঙ্গে আলাপ হল। ম্যাডাম যে ছবিটার জন্য বিএফজেএ অ্যাওয়ার্ড পেলেন সেই ছবিতে যিনি মেকআপ করিয়েছিলেন তিনি আমায় ম্যাডামের কাছে নিয়ে গেলেন। ম্যাডামের তখন খাস কোনো লোক ছিল না। তখন তিনি মোটামুটি নাম করে গেছেন। ওই ছবিটার পর আরও নাম হল তাঁর। আমায় বাড়িতে ডাকলেন একদিন। বললেন, একটা ফোটোশুট আছে সেখানে মেকআপ করতে হবে। পয়সা দেবেন না। ভালো লাগলে কাজে নেবেন। অনেক আশা নিয়ে গেলাম।
সায়ন জিজ্ঞেস করল, ‘শুট কোথায় হয়েছিল?’
— ম্যাডামের বাড়িতেই। নীচের একটা ঘরে।
.
— তুমি কোথা থেকে মেকআপ শিখেছ?
কড়া সুরেই কথাটা বলল আত্রেয়ী। নবাগতা বন্দনা একটু ঘাবড়ে গেল। ‘কেন ম্যাডাম? কিছু ভুল হয়েছে?’
— হয়ই তো নি। হলে তো ঠিক-ভুল বলব।
বন্দনা ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না কেন এমন কথা তাকে শুনতে হল। আত্রেয়ী তেড়ে উঠে বলল, ‘আরে হাঁ করে দাঁড়িয়ে দেখছ কী? আমার আইল্যাশটা খুলে যাচ্ছে দেখতে পাচ্ছ না?’
বন্দনা তড়িঘড়ি ‘ওহ্ আমি এখুনি ঠিক করে দিচ্ছি ম্যাডাম।’ বলে আত্রেয়ীর চোখের পাতায় হাত ছোঁয়াল। ঠিক করতে করতে বলল, ‘আসলে ম্যাডাম আপনার চোখ দিয়ে এত জল কাটছে যে…
— শাট আপ। ননসেন্স।
ধমকের চোটে হাতটা সরিয়ে নিল বন্দনা। আত্রেয়ী খ্যাকখ্যাক করে বলে উঠল, ‘আমি কি আজ প্রথম আইল্যাশ লাগাচ্ছি? শোনো বন্দনা, মেকআপটা না একটা আর্ট। সবার দ্বারা হয় না। আর তুমি এসেছ আত্রেয়ী সেনের মেকআপ করতে! রাবিশ।’ বলে আয়নার দিকে তাকিয়ে চোখ টেনে টেনে ভালো করে দেখছে। ঠিক তখনই দরজা ঠেলে একজন মুখ বাড়াল। পুরুষ মানুষ। গলায় ক্যামেরা। গালে হালকা চাপ দাড়ি। সে-ও খানিক রেলা নিয়ে বলল, ‘আজ কি শুটটা হবে?’ আত্রেয়ী ঘাড় ঘোরাল না। আয়নার মধ্যে দিয়েই পেছনে দরজার কাছে দাঁড়ানো লোকটির দিকে চেয়ে বলল, ‘মেকআপ যা হয়েছে তাতে না হলেই ভালো হয়।’ এবার লোকটা ভেতরে ঢুকে আত্রেয়ীর কাছে এসে দাঁড়াল। আয়নার প্রতিবিম্বে চোখ রেখেই বলল, ‘খারাপটা কী হয়েছে? ভালোই তো লাগছে।’ নতুন একটা মেয়ের সামনে যে এমন করে একটা চড় এসে পড়বে সেটা বুঝতে পারেনি আত্রেয়ী। চোয়ালটা শক্ত করে বন্দনার দিকে তাকাল আত্রেয়ী। বন্দনা তক্ষুনি মাথা নামিয়ে নিল। দাঁতে দাঁত চেপে আত্রেয়ী লোকটার উদ্দেশে বলল, ‘ক্যামেরার টেকনিকাল দিকটা জানা থাকলেই ক্যামেরাম্যান হওয়া যায় না। সঙ্গে চোখটাও চাই। সেটাতে যে তোমার ছানি পড়েছে তা ভালোই বুঝছি। ডাক্তার দেখাও।’ পকেট থেকে গুটখার একটা প্যাকেট ছিঁড়ে মুখে ফেলে হাসল লোকটা। বলল, ‘আমার চোখে এখন ছানি তো পড়বেই। অন্য কারও চোখ যে তোমার চোখে পড়েছে।’
— এইসব আজেবাজে জিনিসগুলো খেয়ো না তো। গন্ধে আমার মাথা ধরে যায়। দাঁতগুলোরও তো বারোটা বাজিয়েছ।
তেড়েমেরে কথাগুলো বলে উঠল আত্রেয়ী। লোকটা গলা নামিয়ে বলল, ‘আমারই বারোটা বেজে গেছে আর দাঁতের কী দোষ। ওয়েট করছি এসো।’ আত্রেয়ী কটমট করে চেয়ে রইল লোকটার দিকে।
.
— লোকটার কী নাম?
সায়নের কথায় বাস্তবে এসে পড়ল বন্দনা। ঠান্ডা গলায় জবাব দিল, শান্তনু, শান্তনু নিয়োগী।’ সূর্য বলল, ‘তার মানে তখনও তন্ময়বাবুর এন্ট্রি হয়নি?’ সায়ন বলল, ‘উঁহু! কথা শুনে তো মনে হচ্ছে তাঁবুর মধ্যে অলরেডি উটের মুখ ঢুকে গেছে।’ উত্তরের আশায় দুজনেই বন্দনার দিকে তাকাল। বন্দনা বলল, ‘পরে ও বাড়িতে কাজ করতে গিয়ে জেনেছিলাম শান্তনুবাবু ম্যাডামের হাজব্যান্ড।’ তড়াক করে মেরুদণ্ড সোজা করে বসল সায়ন। বলল, ‘হাজব্যান্ড! তখন উনি ছিলেন?’
— হুম।
সোমদত্তা বলে ওঠে, ‘আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে আত্রেয়ী সেন আর শান্তনু নিয়ো… দাঁড়ান দাঁড়ান’ বলে খানিক থমকে আবার বলল, ‘আত্রেয়ীর পদবিটা তার মানে বাপেরবাড়ির?’ বন্দনা সোমদত্তার চোখ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ। মনে হয় তাই। সঠিক আমি জানি না।’
— সোমদত্তা তুমি বোধহয় স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্নটা করতে যাচ্ছিলে, তাই তো?
না-বলা কথা সায়ন কেমন অবলীলায় বুঝে যায়। সোমদত্তা হেসে বলল, ইয়েস স্যার! ওদের রিলেশনটা বেশ খারাপের দিকেই ছিল বলে মনে হচ্ছে।’ ‘ঠিকই ধরেছেন’ বন্দনা বলে ওঠে, ‘সেদিন শুটিঙেও সকলের সামনে ম্যাডাম ছোটো-বড়ো অনেক কথা শোনান স্যারকে।’
— স্যার?
সোমদত্তা বলে ওঠে।
— হ্যাঁ, আমি শান্তনুবাবুকে স্যারই বলতাম।
সূর্য উত্তেজিত হয়ে প্রশ্ন করল, ‘তারপর আপনার স্যার কোথায় গেলেন? মানে আমাদের কাছে খবর আছে তিনি নাকি নিরুদ্দেশ?’ সায়ন অমনি হাত তুলে বলে ওঠে, ‘আহাহা! সূর্য, তোমার মোটে নাইকো ধৈর্য। আস্তে আস্তে এসো ভাই।’
— সরি স্যার।
সায়ন জিজ্ঞেস করল, ‘বলছি আপনি ও বাড়িতে আত্রেয়ীর পিএ হলেন কী করে? মানে আপনাকে যা তেড়ে গালমন্দ করলেন তারপরেও আপনার চাকরিটা হল?’
.
বন্দনা ডুবে যায় অতীতে। শুটিংয়ের রাতে বাড়ি ফিরে নিজের ঘরে মুখ গুঁজে পড়ে রইল বন্দনা। ভেতর থেকে সে রাগে ফুঁসছে। এত অপমানিত সে জীবনে হয়নি। আত্রেয়ী সেনকে মানুষ বলেই মনে হয়নি বন্দনার। তার বারবার মনে হয়েছে সামান্য ক-টা টাকা আর একটা স্বপ্নকে সত্যি করতে সে এত অপমান, হ্যালাচ্ছেদ্দা সহ্য করতে পারবে না। কিন্তু সুরভি তখন মনের জোর দিয়ে বলেছে, ‘এইটুকুতেই ভেঙে পড়লি বাণী? এই জগৎটাই তো এমন রে। শোন, কিচ্ছু চিন্তা করিস না। আমি তোকে বলছি, ওই আত্রেয়ী তোকেই কাজে নেবে।’
— এটা অসম্ভব মা। আর ও ডাকলেও আমি যাব না।
— ভুল করবি। ওখানেই তোকে যেতে হবে। ওই আত্রেয়ীর কাছেই তোকে এঁটুলির মতো লেগে থাকতে হবে। তুই যে এতদিন ধরে এত কষ্ট করে এই কোর্সগুলো করলি, এর আগে এতো লোকের প্রশংসা পেয়েছিস, এসব কি মিথ্যে নাকি?
— আমার মেকআপ আত্রেয়ীর পছন্দ হয়নি মা। সেটা তো মুখের ওপর বলেই দিল।
সুরভি কথা বলল না। চুপ করে রইল।
.
বন্দনাও মাথা নীচু করে চুপ। সূর্য জিজ্ঞেস করল, ‘তারপর! চাকরিটা হল কীভাবে?’ বন্দনা কেঁদে ফেলে। চোখে হাত চাপা দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে, ‘পরেরদিন মা ম্যাডামের কাছে গিয়ে হাতে-পায়ে ধরে। কান্নাকাটি করে। বলে, মেয়ের কাজটা না হলে আমরা না খেতে পেয়ে মরব। তাতেও রাজি হচ্ছিল না। স্যার ম্যাডামকে রিকোয়েস্ট করেন আমাকে নিতে। আমার কাজ ওঁর খুব ভালো লেগেছিল। তারপর অনিচ্ছাসত্ত্বেও ম্যাডাম আমাকে কাজে রাখেন। সেই থেকে আমি আত্রেয়ী সেনের কাজ করছি।’ সায়ন বলল, ‘কিন্তু আমাদের কাছে খবর আছে ম্যাডাম আপনাকে ছাড়া এক পা-ও চলতেন না। আলাদা করে থাকার ঘর দেন আপনাকে। এই পরিবর্তনটা এল কী করে?’ মুখের সামনে থেকে হাত সরিয়ে সায়নের দিকে তাকায় বন্দনা। বলে, ‘ম্যাডামের কাছের বন্ধু-বান্ধবরা আমার কাজের প্রশংসা করতে শুরু করে। তারপর থেকেই ম্যাডামের মন বদলাতে থাকে।’ মনের গহিনে কিছু বুদবুদ শব্দ করে ওঠে সায়নের। অজান্তেই ভ্রূ দুটো কাছাকাছি চলে আসে তার। বন্দনাও সেটা খেয়াল করে। কিন্তু পরক্ষণেই সোমদত্তার প্রশ্নে পুরো ব্যাপারটা তলিয়ে যায় কথার অতলে। ‘আত্রেয়ী দেবী আর শান্তনুবাবুর মধ্যে কী নিয়ে ঝগড়া হত?’ সোমদত্তার প্রশ্নে বন্দনা জানায় সবসময় যে বড়ো কোনো কারণ থাকত তা নয়। টুকিটাকি জিনিস নিয়েই তাদের মধ্যে লেগে যেত। কিন্তু সব ঝগড়া শেষে একটা বিন্দুতে গিয়েই মিলত।
— কোন বিন্দু?
.
সেদিন খাবার টেবিলে পা দোলাতে দোলাতে কাগজের পাতায় চোখ বোলাচ্ছিল শান্তনু। পা দোলানোটা মুদ্রাদোষ। শান্তনু চুপ করে কখনোই বসতে পারে না। আত্রেয়ী উঁচু স্বরে হুকুম ছুড়তে ছুড়তে খাবার টেবিলে এসে বসে, ‘সোফিয়াআআআআ, আমার জুস কী হল?’ ভেতর থেকে উত্তর আসে ‘এই তো আনছি।’
— চাইতে হয় কেন?
শুটিঙে বেরোবার আগে আত্রেয়ীর ভ্রূটা কুঁচকেই থাকে। শান্তনু কাগজের পাতা থেকে চোখ না তুলেই বলে, ‘সোফিয়াআআআআ, অনেকক্ষণ হল বসে আছি।’ আবারও ভেতর থেকে গলা ভেসে এল, ‘হ্যাঁ দাদাবাবু, আনছি।’ আত্রেয়ী ডানদিকের ভ্রূটা তুলে প্রশ্ন করে, ‘বেরোেচ্ছ নাকি?’
— হুম!
— কাজ? নাকি প্রোজেক্টের খোঁজে।
আত্রেয়ীর শেষ কথায় বেশ একটা খোঁচা আছে সেটা ভালোই বুঝল শান্তনু। ইদানীং এটা নতুন নয়। শান্তনু উত্তর দিল, ‘যেটাই হোক, তাতে তোমার বিশেষ লাভ বা লোকসান কিছু আছে বলে তো মনে হয় না।’ হঠাৎ বন্দনা দু-হাতে দুটো শাড়ি ফেলে এনে বলে, ‘ম্যাডাম, পিঙ্ক আর হোয়াইট দুটো শাড়িই নিয়ে নিলাম। যা পাগলা ডিরেক্টর, হয়তো বলে বসবে কালকের সিনটা আর-একবার নেব। আড়চোখে শাড়িগুলো দেখে নিয়ে বলল, ‘ভালো করেছ।’ খানিকটা দূরে রাখা ছিল দুটো ব্যাগ। বন্দনা সেইদিকেই এগিয়ে যেতে থাকে। তার মধ্যেই কানে আসে ম্যাডামের কথা। তার স্বামীকে বলছে, ‘লাভ যে নেই সেটা আর বলে বোঝাতে হবে না। লোকে এসে আমায় ঠারেঠোরে বলে যায়, শান্তনুকে তো দেখলাম অমুক প্রোডিউসারের সঙ্গে। তার শোয়ের স্টিল ছবিগুলো যাতে উনি তুলতে পারেন তাই লেগে পড়ে আছেন।’ আরও একটু ন্যাকামো করে আত্রেয়ী বলে, ‘আচ্ছা, আপনি তো একটা ভালো কাজের সুযোগ করে দিতে পারেন আপনার হাজব্যান্ডকে। আপনার মতো একজন অভিনেত্রীর স্বামী এরকম ঘুরে ঘুরে কাজ চাইবে সেকি ভালো দেখায়?’ দূরে দাঁড়িয়ে বন্দনার হাতটা থেমে গেল। কাজের ছলে সে-ও স্বামী-স্ত্রীর মুখরোচক ঝগড়া গিলছে। খাবার টেবিলে এমন আগুন এখন হামেশাই জ্বলে। তার মধ্যে সোফিয়া এসে আরও খানিকটা ঘি দিয়ে দিল। শান্তনু সবে তৈরি হচ্ছিল আত্রেয়ীকে মোক্ষম জবাব দেবার জন্য। ঠিক সেইসময় সোফিয়া দিল মেজাজটা আরও বিগড়ে। এক গ্লাস অরেঞ্জ জুস এনে আত্রেয়ীর সামনে রাখল। ‘কী ব্যাপার? আমার স্যান্ডউইচ কই?’ তিরিক্ষে মেজাজ নিয়ে শান্তনু কথাটা বলে। মুখটা কাঁচুমাচু করে সোফিয়া বলে, ‘এই যে দাদাবাবু, আর পাঁচটা মিনিট। পাউরুটি স্যাঁকা হয়ে গেছে। শুধু…’ আরও কিছু বলার আগেই খবরের কাগজটা ঝাঁকিয়ে মেজাজ দেখায় শান্তনু। ‘আমি খাবার টেবিলে দশ মিনিট ধরে বসে আছি। এখনও পাঁচ মিনিটের গল্প শোনাচ্ছ?’
— আসলে বন্দনা দিদি এসে বলল ম্যাডাম এক্ষুনি বেরোবেন তার খাবারটাই আগে দিতে। তাই জুসটা বানাচ্ছিলাম।
টেবিলের ওপর সশব্দে একটা ঘুষি মেরে শান্তনু চিৎকার করে উঠে দাঁড়ায়, ‘শাট আআআআপ!’ দাঁত চেপে আত্রেয়ী বলে, শান্তনু বিহেভ ইয়োরসেলফ।’ আত্রেয়ীর মুখের সামনে আঙুল নাচিয়ে বলে, ‘জাস্ট শাট ইয়োর মাউথ। সবেমাত্র তো একটা পুরস্কার পেয়েছ আত্রেয়ী। তাতেই এত দেমাক? আরে তোমার মতো এমন অ্যাকট্রেস শয়ে শয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে ইন্ডাস্ট্রিতে।’
— তাই নাকি? নতুন কোনো অভিনেত্রী পেয়েছ বুঝি? তাহলে বেকার আত্রেয়ীর আশ্রয়ে পড়ে আছ কেন?
— আশ্রয়! তুমি আমায় আশ্রয় দিয়েছ?
আবারও টেবিল চাপড়ে দাঁতে দাঁত চিপে বলে ওঠে, ‘আরে এই বাড়িতে আমারও অধিকার আছে, ঠিক যতটা তোমার আছে। এই বাড়ির প্রতিটা ইটে আমার ঘামের দাগ আছে। তুমি হুকুম করেই খালাস। আমি দাঁড়িয়ে থেকে মনের মতো করে এই বাড়ি বানিয়েছি। তাই এ-বাড়িতে তোমার হুকুম যতটা চলবে ঠিক ততটাই চলবে আমার।’ আত্রেয়ী একদমই উত্তেজিত হচ্ছে না। বরং সে পরম তৃপ্তিতে জুসে চুমুক দিচ্ছে। খুব ঠান্ডা গলায় বলে আত্রেয়ী, ‘এখন থেকে তোমার কাজের শিডিউল আমার সঙ্গে যাতে ক্ল্যাশ না করে সেটা মেইন্টেইন করার চেষ্টা কোরো। কারণ এ-বাড়িতে রান্নার লোকের সেকেন্ড কোনো অপশন নেই। সোফিয়া আগে আমারটা রেডি করবে। তারপর তোমারটা।’ শান্তনু হাসল, চোখে আগুন নিয়ে বলল, ‘শিডিউল! কীসের?’
— শুটিংয়ে একটা কল টাইম বলে কথা আছে। সেটা আত্রেয়ী সেন কখনও ফেল করে না।
— হ্যাঁ জানি। শুধু শুটিং নয়, তুমি বেড কলটাইমও ফেল করো না।
চমকে ওঠা বিদ্যুতের মতো তাকাল আত্রেয়ী। ‘মানে? কী বলতে চাইছ তুমি?’ ঘটনাস্থলে এতক্ষণ চুপ করে পেটের কাছে হাত জড়ো করে দাঁড়িয়েছিল সোফিয়া। এবার আর সেটা সম্ভব নয় দেখে রান্নাঘরে চলে গেল। বন্দনা সালোয়ারের ওড়নাটা ঠিক করতে করতে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে গেল। শান্তনু কটমট করে আত্রেয়ীর চোখে চোখ রেখে বলল, ‘এবার থেকে যারা তোমায় বলবে, আমি প্রোডিউসারের পেছন পেছন ঘুরে বেড়াই কাজ পাওয়ার জন্য, তাদেরকে বলে দিয়ো, বেড শেয়ার করে কাজ পাওয়ার থেকে পেছু পেছু ঘুরে কাজ পাওয়া অনেক ভালো! আর শান্তনু নিয়োগী নিজে কাজ পাওয়ার জন্যে নয়, অন্যকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে বিছানা গরম করতে পারে। সেই এলেম তার আজও আছে।’
টেবিল চাপড়ে এক ঝটকায় দাঁড়িয়ে পড়ে আত্রেয়ী। গলা চেপে উগরে দেয় রাগ, ‘শান্তনুউউউউ।’ শান্তনু তার গুটখা খাওয়া ক্ষয়াটে দাঁতগুলো বের করে ঠোঁটের ওপর আঙুল ঠেকিয়ে ওঠে ‘সসসসসসস, তোমার শরীরের কোন অ্যাঙ্গেলটা সবচেয়ে ভালো সেটা একটা সময়ে আমি ছাড়া কেউ জানত না। আর এখন একমাত্র একজনই জানে, তন্ময় হালদার, তাই না?’ কথাটা বলেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় শান্তনু। রাগে থরথর করে কাঁপতে থাকে আত্রেয়ী। লাল হয়ে ওঠে চোখদুটো।
