মৃত জ্যোৎস্নার রাত্রি – ২৩
তেইশ
মধ্যরাতের উল্লাস উৎসবে শ্যাম্পেনের ফোয়ারা উঠল সেদিন। আত্রেয়ী সেন নিজে খুলল শ্যাম্পেনের বোতল। সেই উপলক্ষ্যে সমবেত করতালিতে মুখরিত হয়ে উঠল নামি হোটেলের ব্যাংকোয়েট। তন্ময় আপ্লুত উচ্ছ্বসিত হয়ে গলা চড়িয়ে সকলের উদ্দেশ্যে বলে উঠল, ‘বন্ধুগণ, আজকের রাত আমাদের সবার জীবনে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। যে মানুষ ফলের রস ছাড়া আর কিছু খান না, তিনি আজ তার বিয়াল্লিশ তম জন্মদিনে…’ আত্রেয়ী অমনি রে রে করে উঠল। ‘এই এই এই এই, কী করছ তন্ময়! হিরোইনের বয়স কখনোই বাইশের থেকে বাড়ে না। আর তুমি কি না আমায় বিয়াল্লিশ বানিয়ে দিচ্ছ? হিপোক্রিট!’ হাতে-ধরা বোতলটা দিয়ে তন্ময়ের কাঁধে ঠোকা মারল। উপস! সরি সরি সরি সেনোরিটা।’ কান ধরে মাথা ঝুঁকিয়ে খানিক ন্যাকামি করে বলল তন্ময়। তারপরেই গলা তুলে সবার উদ্দেশ্যে আবার বলে উঠল, ‘আমাদের মোস্ট অ্যাডরেবল হিরোইন তার মাত্র বাইশ বছরের জন্মদিনে একবারের চেষ্টায় খুলে ফেললেন শ্যাম্পেনের বোতল।’ হো হো করে সবাই উল্লাসধ্বনি দিয়ে উঠল। তন্ময় বলল, ‘শুধু খুললেনই না, বটল নাড়িয়ে সবাইকে শ্যাম্পেনে স্নান করালেন।’ বলেই হো হো করে হেসে আবারও হাততালি দিয়ে উঠল। আত্রেয়ী তন্ময়ের দিকে আড়চোখে চেয়ে হাসল। এত আলোর ঝিকিমিকি, এত বৈভবের বাঁধ-ভাঙা উন্মাদনা সামনে থেকে কোনোদিন দেখেনি বন্দনা। দূরে দাঁড়িয়ে একমনে সব দেখছিল। ও বরাবরই মুখচোরা। নাম করা অভিনেত্রীর পিএ হলেও সে নিয়ে বন্দনার মধ্যে বিন্দুমাত্র মাত্রাতিরিক্ত উচ্ছ্বাস ছিল না। সে দেখল সকলের সামনে তন্ময় হালদার বন্দনার গলায় পরিয়ে দিল হিরে-খচিত প্ল্যাটিনামের হার। লোকের মুখে কানাঘুষোয় শুনল ওই হারে নাকি বাইশটা হিরে বসানো আছে। বন্দনার চোখদুটো চকচক করে উঠল। ভাবল মানুষের এত পয়সাও হয়? পরক্ষণেই নিজের মনকে সান্ত্বনা দিল। না হবার কী আছে? আত্রেয়ী সেনের সব ছবিতেই তন্ময় হালদার ক্যামেরাম্যান। ভিড়ের মধ্যে থেকে কে যেন জিজ্ঞাসা করল, ‘অ্যাই আত্রেয়ীদি, শান্তনুদা কই গো?’ উঠতি কোনো নায়িকাই হবে। তখন থেকে খুব দিদি দিদি করছে। আদিখ্যেতা করে দিল একখানা মোক্ষম প্রশ্ন ছুড়ে। বন্দনার মনে হল, নেচে চলা নানা রঙের আলো আত্রেয়ীর মুখে এসে হঠাৎ করেই যেন নিভে গেল। বুকের ওপর একটু বেশি উঠে যাওয়া শাড়ির আঁচলটা বেশ খানিকটা নামিয়ে আত্রেয়ী জবাব দিল, ‘ওর কথা আর বলিস না। বেছে বেছে আজকেই ওর শরীরটা খারাপ হল। বললাম, আজকের পার্টিটা তাহলে ক্যানসেল করি। সে শুনলে তো আমার কথা। না না, এত লোককে বলেছ। এরকম পাগলামি কোরো না। আমি ঠিক থাকব।’ এ ক-দিনে টালিগঞ্জে বিচরণ করে বন্দনা ভালোই বুঝেছে যে শান্তনু স্যারের খবর নেওয়া উঠতি নায়িকা এক্ষুনি এসে অন্য কারও কাছে ম্যাডামের ভেঙে চলা দাম্পত্য সম্পর্ক নিয়ে মুখরোচক আলোচনায় মাতবে। মনে মনে হাসল বন্দনা। বেচারা শান্তনু স্যার। বাড়িতে বসে হয়তো মদে চুর হয়ে আছে। তার নামেও তো ইন্ডাস্ট্রিতে কত কথা! একসময়ে সেই নাকি আত্রেয়ী সেনের খাস ক্যামেরাম্যান ছিল। তবে সেটা স্টিল। শান্তনুর ছবি দেখেই প্রথম ছবিতে সিলেক্টেড হয় আত্রেয়ী। তখন শান্তনুর প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে আরও দুজন নিউকামার। কিন্তু তাদের মধ্যে থেকে আত্রেয়ীকেই বেছে নেয় শান্তনু স্যার। বিয়ের আগেই আন্দামান, প্যারিস, ব্যাংকক কত জায়গায় যে প্রি-হানিমুন হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। অবশেষে বিয়ে। তারপর দশ বছর যেতে না যেতেই তন্ময়ের প্রবেশ। বন্দনা এসব কিচ্ছু জানত না। ম্যাডামকে মেকআপ করে দেবার পর যখন ফ্লোরে চলে যায় তখন ফ্লোরের একধারে বসে ফিশফিশ করে থার্ড অ্যাসিস্ট্যান্ট পূজা অথবা মেকআপ রুমে ড্রেসার শিবানী কিংবা কখনও ম্যাডামের ড্রাইভার নন্দনের কাছ থেকে অবসর সময়ের পিএনপিসিতে এইসব গোপন খবর বেরিয়ে এসেছে।
.
যাইহোক, জন্মদিনের রাতে মোটামুটি সবাই যখন টলতে টলতে ফাঁকা হচ্ছে তখনই তন্ময় আসে বন্দনার কাছে। নেশা-জড়ানো গলায় তন্ময় জিজ্ঞেস করে, ‘পেট ভরে খেয়েছ তো?’ বন্দনা কোনের দিকের একটা টেবিলে বসে মোবাইল ঘাঁটছিল। তন্ময়ের আকস্মিক প্রশ্নে চমকে উঠে তাকায়। মুখে সৌজন্যমূলক হাসি টেনে ঘাড় নাড়ে বন্দনা। তন্ময় বন্দনার এক্কেবারে মুখের সামনের একটা চেয়ারে বসে পড়ে। বন্দনা দেখে আত্রেয়ী বেশ খানিকটা দূরে ইন্ডাস্ট্রির নামকরা পরিচালক সৌপ্তিক গাঙ্গুলির সঙ্গে হেসে হেসে কথা বলছে। এঁর ছবিতে অভিনয় করেই আত্রেয়ী বিএফজেএ অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে। ঠিক বুঝতে পারছে না, ম্যাডামকে ছেড়ে খামোখা বন্দনার সামনে এসে কেন বসতে গেল তন্ময়। হাতে মদের গ্লাস, শরীরে মদের গন্ধ আর দামি সেন্টের গন্ধ মিশে একটা অদ্ভুত গন্ধ তৈরি হয়েছে। কাচের গ্লাসে একটা চুমুক দিয়ে তন্ময় আবার জিজ্ঞেস করে, ‘আচ্ছা বন্দনা, তোমায় আমি শুটিঙেও দেখেছি, বড্ড চুপচাপ থাকো। কেন? আমাদের ভালো লাগে না?’
— এ মা! না না। তা কেন হবে? আসলে আমি ঠিক গুছিয়ে কথা বলতে পারি না।
ঠোঁট বেঁকিয়ে হাসতে গিয়ে ফুস করে একটা শব্দ বেরিয়ে আসে তন্ময়ের মুখ দিয়ে। গালদুটো বেলুনের মতো অল্প ফুলে উঠেই চুপসে যায়। ‘কয়েকটা এরকম পার্টি-ফাটি অ্যাটেন্ড করো। দেখবে বুলি আপনা থেকেই ফুটছে। তন্ময়ের কথা শুনে হাসল বন্দনা। আত্রেয়ীকে একবার দেখে নিল তন্ময়। তারপর গলাটা একটু চেপে তন্ময় বলল, ‘বাড়ির কী অবস্থা? বরটা হেবি বাওয়াল দিচ্ছে না?’
— সরি!
দুম করে এমন একটা প্রশ্নের জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না বন্দনা।
— আরে শান্তনু নিয়োগী। হেবি বাওয়াল দিচ্ছে আমায় নিয়ে? আত্রেয়ী তো অর্ধেক সময়েই মনমরা হয়ে থাকছে। শটও ঠিক মতো দিতে পারছে না আজকাল।
এবার বেশ অস্বস্তিতে পড়ল বন্দনা। ঠিক কী উত্তর দেবে সেটা ভেবে পেল না। চট করে ভেবে সব দিক রক্ষা হয় এমন উত্তরই দিল, ‘আসলে আমি এসব ব্যাপারে থাকি না। সবসময় আমার সামনেও কিছু হয় না।’
— আরে থামো থামো। শাক দিয়ে কি মাছ ঢাকা যায়? তুমি হলে আত্রেয়ীর পিএ। মানে ছায়া। ও যেখানে তুমিও সেখানে। আর তুমি বলছ কিছুই জানো না?
— না সত্যিই আমি জানি না। ম্যাডামের পার্সোনাল স্পেসে আমি কক্ষনো ঢুকি না। তন্ময়ের নেশাতুর চোখ বন্দনার মাথা থেকে পা পর্যন্ত একবার মেপে নিল। ঠিক তখনই এগিয়ে এল আত্রেয়ী, তন্ময় তুমি এখানে বসে বন্দনার সঙ্গে গল্প করছ? আর আমি তোমায় সারা ব্যাংকোয়েটে খুঁজছি!’
— অ্যাই ছিঃ! জন্মদিনের দিন মিথ্যে কথা বলতে নেই।
— মানে?
— তুমি তো সৌপ্তিক গাঙ্গুলির সঙ্গে এক্কেবারে লেগে-লেগে আছ। আমায় কোথায় খুঁজলে বাপু?
বন্দনার সামনে এমন একখানা চড় খেয়ে বেজায় লজ্জায় পড়ল আত্রেয়ী। অবশ্য পরক্ষণেই যা হল তাতে বন্দনা বুঝল যে, আত্রেয়ী আর যাইহোক, কখনোই লজ্জায় পড়তে পারে না। কারণ ওই নামের কোনো বস্তুই ওর শরীরে নেই। ‘ডোন্ট টক রাবিশ তনু। একটু গায়ে গা না ঠেকালে পুরস্কারপ্রাপ্ত ছবিতে কাজ জোটে কখনও?’
— শুধু গায়ে গা তো?
বন্দনা উঠে দাঁড়িয়ে পড়ে। যে বিষয়ের কথা শুরু হয়েছে তাতে সেখানে শালগ্রাম শিলা হয়ে বসে থাকার কোনো মানেই হয় না। ‘ম্যাডাম আপনারা কথা বলুন। আমি গাড়িতে আছি।’
— দাঁড়াও। ওপাশে আমার গিফটের প্যাকেটগুলো আছে। ওগুলো নন্দনকে বলে বাড়িতে ড্রপ করে দিতে বলো। আর ওই গাড়িতেই তুমি আজ বাড়িতে ফিরে যেয়ো।
— আপনি ফিরবেন না ম্যাডাম?
নো। আমি আজ এই হোটেলেই থাকব।
— ও।
সঙ্গে সঙ্গে তন্ময় আত্রেয়ীর পেটের ওপর মুখ রেখে ন্যাকা সুরে বলল, ‘আর আমি? আমাকেও ড্রপ করে দাও না।’ আত্রেয়ী অমনি তন্ময়ের পিঠে একটা আদুরে চড় মেরে বলে ওঠে, ‘খালি ন্যাকামি! তুমি জানো না রাতে আমার একা ভয় করে! বন্দনার কানের সামনে কেউ যেন একশোটা কাচের গ্লাস একসঙ্গে আছাড় মেরে ভেঙে ফেলল। এরা ঠিক কোন ধাতুতে গড়া? দুনিয়ার সামনে বলে বেড়ায় ‘উই আর ভেরি গুড ফ্রেন্ডস।’ আবার দুনিয়ার সামনেই এক ঘরে রাত কাটাবার কথা বলে? নিতান্ত মধ্যবিত্ত ছাপোষা বন্দনার মাথার দশ হাত ওপর দিয়ে বেরিয়ে যায় বিত্তশালীদের সম্পর্কের সমীকরণ। আর-এক মুহূর্তও সেখানে না দাঁড়িয়ে দ্রুত পায়ে সেই স্থান ত্যাগ করল বন্দনা।
.
পরের দিন বন্দনাকে গেট খুলে দেবার সময় ধানুয়া বলল, ‘সাবধান দিদি। আজ ফিরসে ফাইট স্টার্ট হুয়া।’ গেটের সামনে দাঁড়িয়েই আত্রেয়ী আর শান্তনুর গলার আওয়াজের কণিকামাত্র আগুনপোড়া ছাইয়ের মতো উড়ে ভেসে আসছিল। যদিও বন্দনা মনে মনে এটার জন্যে তৈরিই ছিল। কাল পার্টিতে যাবার আগেই শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেটা যখন হল না, শান্তনু যখন বেরোবার সময় ম্যাডামের দিকে তাকিয়েও তাকাল না, তখনই বুঝেছিল এই গুমরানো মেঘ আজ না হোক কাল ভেঙে পড়বেই। যাইহোক, বন্দনাকে বাড়িতে ঢুকতেই হবে। তাই সে গুটিগুটি পায়ে কাচ দিয়ে সাজানো বাহারি দরজাটা ঠেলে ঢুকতেই উত্তপ্ত কথাগুলো আরও ভালো করে কানে আসতে লাগল। শান্তনু চিৎকার করে বলছে, ‘তুমি তো মহাসতী শালা। সারারাত পরপুরুষের সঙ্গে মাড়িয়ে এসে বাড়িতে ভালো মানুষ সাজছ।’ উত্তরে আত্রেয়ীর সরু গলাটা চচ্চড় করে শব্দ করে জানাল, ‘বেশ করেছি। আমি আমার পয়সায় যা করার করেছি। তুমি কোন সাহসে আমার বাড়িতে বসে নোংরামি করো?’
— শাট আপ।
বলেই একটা কাচের কিছু ভাঙল। ধক করে উঠল বন্দনার বুকটা। আজ কি তবে শুধু আর মুখ নয়! হাতও চলছে? সিঁড়ি বেয়ে উঠতে থাকে বন্দনা। আত্রেয়ী চিৎকার করে ওঠে, তুই হারামজাদি দাঁড়িয়ে কী করছিস? খুব শখ হয়েছে না আত্রেয়ীর পোষা ভেড়াটাকে ধরে দু-পয়সা কামাবার?’ শান্তনুর গলা ফাটিয়ে ধমক, ‘আত্রেয়ী!’ দূরে চলে যাওয়া কারওর উদ্দেশে যেমন করে বলে তেমনি উচ্চস্বরে আত্রেয়ী বলে উঠল, ‘এখানে এসেছিস কেন মাগি? সোনাগাছি আছে তো?’ কথাটা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বন্দনা দেখল হট প্যান্ট পরা একটি লিকলিকে মেয়ে কাঁদতে কাঁদতে দৌড়ে আসছে সিঁড়ির দিকে। খানিকক্ষণের জন্য সিঁড়ির রেলিং ধরে থমকে দাঁড়াল সে। মেয়েটি চোখের জল মুছতে মুছতে বন্দনার সামনে দিয়ে মাথা নীচু করে এক দৌড়ে বেরিয়ে গেল। অবাক কাণ্ড! এ তো পাশা উলটে গেল মনে হচ্ছে! বউ তন্ময়ের সঙ্গে রাত কাটাচ্ছে জেনে শান্তনু বাড়ি মাথায় করবে এটাই ধারণা ছিল বন্দনার। কিন্তু যা কথাবার্তা ভেসে এল এবং এখনও আসছে তাতে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে শান্তনুও বাইরের এই মেয়েটিকে বাড়িতে এনে একসঙ্গে কাল রাত কাটিয়েছে। সকালে সেটা হাতেনাতে ধরেছে আত্রেয়ী। হঠাৎ চটাস করে একটা শব্দ। এক মুহূর্তের নীরবতা। তারপরেই আর্তনাদ করে আত্রেয়ী বলে উঠল, ‘তোমার এত্ত বড়ো স্পর্ধা তুমি আমার গায়ে হাত তোলো?’ ঠিক এরপরেই শান্তনুর দাঁতে দাঁত চিপে কথা, ‘আর-একটা ফালতু কথা বললে গলা টিপে এখানেই শেষ করে দেব হারামির বাচ্চা।’ আত্রেয়ী গোঙানির স্বরে বলতে থাকে, ‘ছাড়ো ছেড়ে দাও। লাগছে, ছাড়ো।’ আরও দু-তিনটে চড়ের আওয়াজের সঙ্গে কয়েকটা চুড়ি ছনছন করে আর্তনাদ করে উঠে। আত্রেয়ীর হাতও যে একই সঙ্গে চলতে বাধ্য হচ্ছে তা বেশ ভালোই টের পায় বন্দনা। স্যার কী এমন করছে যাতে আত্রেয়ীকেও হাত দিয়ে প্রতিরোধ গড়তে হচ্ছে! বন্দনার বুকটা ধুকপুক করতে থাকে। স্যার রাগের মাথায় ম্যাডামকে মেরে ফেলতে চাইছেন? ওর কি যাওয়া উচিত?
— মরতে এত ভয় কেন তোর?
— অক অক।
— দিনের পর দিন আমায় যে মারছিস তুই। তখন কষ্ট হয় না?
— ছাড়ো। অক।
বন্দনা বুঝতে পারে আজ একটা সর্বনাশ হয়ে যাবে। যাই হয়ে যাক ওকেই আটকাতে হবে। আর কিচ্ছু না ভেবে দৌড়ে ঘরের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। চমকে ওঠে। শান্তনু বিছানার ওপর আত্রেয়ীকে চিত করে শুইয়ে তার ওপর চেপে বসেছে। শক্ত হাতটা ম্যাডামের গলা টিপে ধরেছে গায়ের জোরে।
— গলায় নাগরের দেওয়া হিরের হার ঝুলিয়েছিস না মাগি? সেই গলা টিপেই —
— স্যার। কী করছেন আপনি?
দৌড়ে ভেতরে এসে গায়ের জোরে ধাক্কা মারে শান্তনুকে। শান্তনু তা-ও নড়ে না। বন্দনা এবার পেছন দিক থেকে শান্তনুর গলায় হাত পেঁচিয়ে টান মারে। তাতে শান্তনু হেলে যায়। আত্রেয়ীর গলা থেকে হাতটা নরম হতেই গায়ের সব জোর এক করে ঠেলা মারে শান্তনুকে। শান্তনু এবার বিছানায় আত্রেয়ীর পাশেই পড়ে যায়। সেই ফাঁকে বন্দনা ম্যাডামকে তুলে ধরে। গলায় হাত দিয়ে খকখক করে কাশতে থাকে আত্রেয়ী। বন্দনা ধমকে বলে ওঠে, ‘আপনারা কি পাগল হয়ে গেছেন? কী করছেন এসব? ম্যাডাম তো এক্ষুনি মরে যেতেন। রাগের বিস্ফোরণে তড়াক করে উঠে দাঁড়ায় শান্তনু। ‘এই শালা চামচা, তুই কেন এসেছিস আমাদের মধ্যে?’
— আমি ম্যাডামের পিএ। সবদিক থেকে ম্যাডামকে রক্ষা করা আমার কর্তব্য। শান্তনু হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে হাত তুলে তেড়ে আসে বন্দনার দিকেও, এই চোপ শালা। ম্যাডামের সঙ্গে তোকেও জ্যান্ত পুঁতে দেব।’ মুখচোরা বন্দনাকে কে যেন ভেতর থেকে ঠেলে দিল। সে-ও শান্তনুর চোখে চোখ রেখে মারমুখী হয়ে তেড়ে গেল আত্মরক্ষার্থে। দাঁত চিপে ঠান্ডা স্বরে বলে, ‘এইইই!’ সাধারণ মেয়ের আকস্মিক ফুঁসে ওঠাতে শান্তনু থমকে যায়। আত্রেয়ীও অবাক। কঠোর চোখে তাকিয়ে বন্দনা বলে, ‘ক্যারাটেতে ব্ল্যাক বেল্ট। পয়সা ছিল না তাই স্টেট লেভেলে যেতে পারিনি। ভেবে-চিন্তে গায়ে হাত তুলবেন।’ শান্তনুর শরীরটা রাগে-ক্ষোভে থরথর করে কাঁপছে। দু-তিন পা করে পিছিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
আত্রেয়ী চোখ ভরা জল নিয়ে এতক্ষণ বসে ফুঁসছিল। ‘আমি ওকে কিছুতেই ছাড়ব না। এক্ষুনি পুলিশকে ফোন করব।’ বিছানার ওপর থেকে মোবাইলটা হাতে তুলে নেয় আত্রেয়ী। ‘না ম্যাডাম এটা করবেন না।’ বাধা দেয় বন্দনা।
— একশোবার করব। তুমি আমায় বাধা দেবে না। ওই হারামির বিষদাঁত আজকেই আমি উপড়ে নেব।
বন্দনা আত্রেয়ীর হাত থেকে ফোন কেড়ে নেয়। ক্ষোভে খেপে ওঠে আত্রেয়ী, ‘হাউ ডেয়ার ইউ? আমার হাত থেকে ফোন কেড়ে নাও তুমি?’ বন্দনা শান্ত গলায় বলে, ‘আই অ্যাম সরি ম্যাডাম।’ বলে ম্যাডামের পাশে বসে বন্দনা। ‘কিন্তু এই কাজ আপনি কিছুতেই করবেন না।’ বন্দনার কথায় অবাক আত্রেয়ী। সে তো নিজেই দেখেছে শান্তনুর ব্যবহার। তাহলে কেন পুলিশকে ফোন করতে বাধা দিচ্ছে?
— ঠান্ডা মাথায় একটু ভাবুন ম্যাডাম। সামনেই আপনার দু-দুটো সিনেমা রিলিজ। যার মধ্যে একটা ঋতম ঘোষের অন্নপূর্ণার সংসার। ছবিটার গল্পটা কী? একজন মহিলা, যে কিনা একদিকে মা হয়ে সন্তানকে মানুষ করছে, অন্যদিকে অত্যাচারী স্বামীকে সামলে আদর্শ স্ত্রী-এর দায়িত্ব পালন করছে।
আত্রেয়ী মাথা ঝাঁকিয়ে বলে, ‘হ্যাঁ তাতে কী? সে তো সিনেমা।’
— জানি সেটা সিনেমা। কিন্তু সাধারণ মানুষ অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সিনেমার ক্যারেক্টার দিয়েই বিচার করে। ভালোবাসে। ওরা তো আপনার মমতাময়ী রূপের একটা কাট আউটও শহরের নানান জায়গায় লাগিয়ে প্রচার শুরু করেছে। যে কি না হাসিমুখে সব সহ্য করে চলেছে শুধুমাত্র তার সংসার বাঁচিয়ে রাখার জন্য। সিনেমার ক্যাপশনও দিয়েছে, ভেঙে ফেললে ফেলাই যায়, জুড়তে পারে ক-জন? ঠিক এই মুহূর্তে যদি সেই নায়িকাই তার স্বামীর বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দায়ের করে তাহলে তো মিডিয়া ঝাঁপিয়ে পড়ে আপনার পার্সোনাল লাইফ নিয়ে কাদা ছোঁড়াছুড়ি শুরু করবে। সেটা আপনার কেরিয়ার বা সিনেমা কোনো কিছুর জন্যেই ভালো নয়। তাই বলছিলাম ঘরের ঝামেলা ঘরের মধ্যেই থাক।
আত্রেয়ীকে আগের চেয়ে অনেকটা শান্ত দেখায়। এই মুহূর্তে অহংকার, বদমেজাজ, ক্ষোভ কোনো কিছুই বন্দনা খুঁজে পায় না তার ম্যাডামের চোখে-মুখে। আত্রেয়ী শুধু বলে, ‘মাত্র তো ক-টাদিন ইন্ডাস্ট্রিতে এসেছ। এর মধ্যে এত কিছু বুঝে গেছ?’ বন্দনা হাসে। বলে, ‘সবই আপনার জন্য ম্যাডাম। আপনার কাজ করতে করতেই সব বুঝেছি, শিখেছি।’ এরপর একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে আত্রেয়ীর মুখ দিয়ে।
বন্দনা এক গ্লাস জল এনে দেয় তার ম্যাডামকে। আত্রেয়ী ঢকঢক করে গলায় ঢোলে ফাঁকা কাচের গ্লাসটা বন্দনার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে, ‘তুমি ক্যারাটে জানো?’ ম্যাডামের হাত থেকে গ্লাসটা দু-হাতের মধ্যে নিয়ে বন্দনা বলে, হুম। ছোটোবেলা থেকে যেমন সাজতে ভালোবাসতাম, তেমনি খেলাধুলোতেও নেশা ছিল। সাতশো মিটার পর্যন্ত একটানা দৌড়োতে পারতাম। প্রাইজও আছে। লং জাম্প, হাইজাম্পেও মন্দ ছিলাম না।’ বলে চলে যেতে যাচ্ছিল। কিন্তু আত্রেয়ীর কথায় থামল, ‘তাহলে সেগুলোই করলে না কেন?’
— মধ্যবিত্ত বাড়ির মেয়ে। বাবাও অকালে চলে গেলেন। কে চালাবে এত খরচ? তাই আর হল না।
টেবিলের ওপর গিয়ে গ্লাসটা রাখতে রাখতে বন্দনা বলল, ‘ম্যাডাম আজ বিকেলে আর সন্ধেবেলায় আপনার দুটো ইন্টারভিউ আছে। চারটের সময় আনন্দবাজার আর সন্ধে সাতটায় টোয়েন্টি ফোর ইন্টু সেভেন টিভি চ্যানেল।’ বন্দনা দেখল ম্যাডামের যেন কোনো ভ্রূক্ষেপই নেই। সে তন্ময়ের দেওয়া গলার দামি হারটা খুলতে ব্যস্ত। আত্রেয়ী বলল, ‘বন্দনা এই হারটাকে যত্ন করে আলমারির লকারে রেখে দাও তো।’ চমকে উঠল বন্দনা। যতই পিএ হোক, লাখ লাখ টাকার হার বন্দনার মতো সাধারণ এক মেয়ের দায়িত্বে ম্যাডাম লকারে রাখতে বলছে এ যেন অবিশ্বাস্য। একটু তুতলিয়ে বন্দনা বলল, ‘ম্যা-ম্যাডাম আমি?’
— এখানে বন্দনা নামের আর কী কেউ আছে? শোনো, আমার ব্যাগটা খোলো, ওখানে এই হারের বাক্সটা আছে। ওটার মধ্যে সুন্দর করে সাজিয়ে রাখো। আর বিছানার নীচে আলমারির চাবি আছে।
নিমেষের মধ্যে চোখের সামনে চলকে ওঠে বন্দনার সঙ্গে আত্রেয়ীর প্রথম দিনের ব্যবহার। সেইদিন আর এই দিনের মধ্যে এত পার্থক্য যে কিছুতেই মেলাতে পারছিল না বন্দনা। কী হল? কী ভাবছ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে? রেখে দাও।’ এক আকাশ বিস্ময় নিয়ে বন্দনা বাক্সের মধ্যে হারটা ভরে আলমারি খোলে। আত্রেয়ী বলে, ‘ওপরের তাকে ভেতর দিকে হাত চালিয়ে দাও। একটা বাক্স পাবে। সেখানে লকারের চাবি আছে।’ বুকের ভেতরে অনেকটা ভয়ও কাজ করছে এবার বন্দনার। বড়োলোকের খেয়াল। কখন কী হবে, বেমালুম দায় চাপিয়ে দেবে বন্দনার ঘাড়ে। লকার খোলা কি ঠিক হবে? ম্যাডাম, লকারে আপনার কত দামি জিনিস থাকে। সেখানে আমার হাত দেওয়া ঠিক হবে না। আপনি খুলে রেখে দিন।’ শাট আপ’ ঢুলুঢুলু চোখে মুখ তুলে বলল আত্রেয়ী। ‘কাল সারা রাত ঘুম হয়নি। তার ওপর তোমার স্যারের অসভ্যতা! আমার খুব ঘুম পেয়েছে। আর শোনো, তুমি আমার পিএ। এইটুকু বিশ্বাস তোমায় আমি করতেই পারি। আমার প্রাণ বাঁচানোর জন্য এটা তোমার পুরস্কার। হারটা রেখে ঘরের দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে যেয়ো। আর হ্যাঁ, এই বারান্দার দিকের পর্দাগুলো টেনে দিয়ো আর মাটি থেকে কাচগুলো স্বপ্নাকে বলো তুলে পরিষ্কার করে দিতে।’
— আপনি রেস্ট করুন। আমি সব করে দিচ্ছি।
— ইসসস! আমার সাধের ক্রিস্টাল গ্লাসগুলো ভেঙে গেল। শালা হারামখোর।
বলেই চাবুকের মতো শরীরটা বিছানায় এলিয়ে দিল আত্রেয়ী। বন্দনা হারটাকে যত্ন করে রেখে আত্রেয়ীর হুকুম পালন করল পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে।
.
অনেকক্ষণ একটানা কথা বলে ক্লান্ত বন্দনা। সায়ন চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ল। ওরও কোমর ধরে গেছে। সোমদত্তা বন্দনাকে জিজ্ঞেস করল, ‘কিছু খাবেন? ফল-টল জাতীয় কিছু?’ এত খাতির পেয়ে বন্দনা একটু অস্বস্তিই বোধ করল। সূর্য বলল, ‘নির্দ্বিধায় বলতে পারেন। আমরা বড়ো একটা খাতির-টাতির কাউকে করি না। কিন্তু আপনার শরীরের কথা ভেবেই বলছি।’
— না। কিছু লাগবে না।
সোমদত্তা বাঁ-দিকের ভ্রূটা তুলে বলল, ‘আপনি তো ছুপা রুস্তম বন্দনা! ক্যারাটে, দৌড়, লং জাম্প, হাই জাম্প সাবাশ!’ সূর্য তাল ঠুকল, ‘ওই জন্যেই সেদিন হসপিটাল থেকে আমরা ফলো করার পরেও ভ্যানিশ হয়ে গিয়েছিলেন। কত জোরে দৌড়েছিলেন আপনি তা-ও আবার এই অবস্থায়!’ বন্দনা আড়চোখে সূর্যর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘সঙ্গে সঙ্গে ট্যাক্সিটা পেয়েছিলাম বলেই আমার নাগাল কেউ পাননি।’
— অও।
সায়ন হাত উলটে ঘড়ি দেখল। বিকেল সাড়ে পাঁচটা বেজে গেছে। সময়টা মেপেই সায়ন বলে উঠল, ‘তার মানে শান্তনু নিয়োগীও ধোয়া তুলসীপাতা নন।’ বন্দনা বলল, ইন্ডাস্ট্রিতে ধোয়া তুলসীপাতা বলে কিছু হয় না ইনস্পেক্টর। ম্যাডাম যে তন্ময়ের সঙ্গে রাত কাটাতে শুরু করেন সেটা শুধু প্রেম বা অন্য কিছুর জন্য নয়।
— তবে? উনি কী শোবার জন্য পয়সা নেন নাকি?
কথাটা খটাস করে বন্দনার কানে লাগল। কঠিন গলায় বলল, ‘না।’ সোমদত্তা বলল, ‘ঝেড়ে কাশুন তো।’
— ম্যাডামের কেরিয়ারের শুরুর দিকের ঘটনা। লোকজনের কাছ থেকেই শুনেছি। ম্যাডাম তখন কাজের খোঁজে প্রোডিউসারের দোরে দোরে ঘুরছেন। কিন্তু তখন ম্যাডামের কোনো ভালো ছবি ছিল না। এমন কিছু পয়সাও ছিল না যে পোর্টফোলিয়ো বানাবেন। লোকের দরজায় সাধারণ স্টুডিয়োয় তোলা ছবি নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে আত্রেয়ী সেন যখন ক্লান্ত, কেউ কোনো কাজ দিচ্ছে না, তখন ঠিক করলেন সবার আগে উনি বেশ কিছু ভালো ভালো ছবি তুলবেন। পোর্টফোলিয়ো বানাবেন। তার জন্য প্রয়োজন ভালো ফটোগ্রাফার। কিন্তু তাদেরও তো বিশাল খাঁই। হাজার হাজার টাকা চাইছেন। তখন কোনোভাবে স্টুডিয়ো পাড়া থেকে খবর পেয়েই ম্যাডাম পোর্টফোলিয়ো নামে একটি নাম করা স্টুডিয়োতে যান। যেখানে তখন একচেটিয়া কাজ করছেন শান্তনু স্যার।
