মৃত জ্যোৎস্নার রাত্রি – ২৪
চব্বিশ
লাল টকটকে সালোয়ার। বুকের কাছটা একটু বেশিই কাটা। বাঁ-কাঁধের ওপর ফেলা ঘিয়ে রঙের ওড়না। স্টুডিয়োর বাইরে ছোট্ট রিসেপশনে অপেক্ষা করছে আত্রেয়ী। প্রায় ঘণ্টা দুয়েক হয়ে গেল। আজকে নিয়ে দু-দিন হল। আগেরদিন শান্তনু কথাই বলেনি। এত তাড়া ছিল তার। আজ আত্রেয়ী তার কথা মতো সময়ে এসেছে। খুব দরকার। কিন্তু তাতেও কোনো পাত্তা নেই। অবশেষে লাঞ্চ টাইমে বেরোল শান্তনু। সঙ্গে একটি স্বল্পবসনা মেয়ে। দুজনেই সমানতালে হাসছে। শান্তনু যেন আত্রেয়ীকে দেখতেই পেল না। গলা তুলে রিসেপশনিস্টকে জিজ্ঞাসা করল, ‘মধু আমার টিফিনটা ক্যান্টিনে পাঠিয়ে দে।’ আত্রেয়ী কিছুক্ষণ বলবে কী বলবে না করে সবে বলতে যাচ্ছিল অমনি পাশের স্বল্পবসনা শান্তনুর হাতটাকে বগলদাবা করে বলল, ‘হেইইইই, তুমি কি এই ক্যান্টিনে লাঞ্চ করবে নাকি? পাশেই গোল্ডেন জয়। আজ আমি তোমায় লাঞ্চ করাব।’ শান্তনু একটু লজ্জা-লজ্জা ভাব করে মুখে ‘না না’ বলল বটে। তবে তার নেতিবাচক সুরে ইতিবাচক ইচ্ছেটা ঝলমল করে উঠল। দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে ঠিক এমন সময় পথ আটকে দাঁড়াল আত্রেয়ী। ‘স্যার, স্যার একটু কথা ছিল।’ শান্তনুর মুখটা মুহূর্তে পালটে গম্ভীর হয়ে গেল। চোখ দিয়ে একবার আত্রেয়ীকে আদ্যোপান্ত মেপে জিজ্ঞাসা করল, ‘কী চাই?’
— আপনিই আমায় আসতে বলেছিলেন। আমার ছবি তুলে দেবেন বলে।
— অ্যাঁ। আমি আপনার ছবি তুলব! কেন?
স্বল্পবসনা কাঁধ নাচিয়ে চোখ ঘুরিয়ে কিছু একটা করল। কিন্তু সেদিকে নজর দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করল না আত্রেয়ী। মুখ ফসকে কী বলতে কী বলে ফেলেছে তাই তাড়াতাড়ি সামলে নিয়ে বলল, ‘না স্যার মানে ছবি তোলা নিয়ে কথা বলার জন্য ডেকেছিলেন।’ পাশের স্বল্পবসনা প্যাংলা মেয়েটা ঠোঁট উলটে বলল, ‘দেখছেন তো শান্ত এখন লাঞ্চ করতে যাচ্ছে। কেন ডিসটার্ব করছেন?’ আত্রেয়ীর চোখের মণিতে একটা বিষাক্ত কেউটে ফণা তুলে ফোঁস করে উঠল, ‘শুনুন, আমি আপনার কাছে ছবি তুলতে আসিনি। আর উনি যে খেতে যাচ্ছেন সেটা আমিও দেখতে পাচ্ছি। অসুবিধে থাকলে উনি বলুন না। মুখ তো ওঁরও আছে।’ রিসেপশনিস্ট মধু হকচকিয়ে উঠে দাঁড়ায়। শান্তনুও থ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। স্বল্পবসনা লালচুলো প্যাংলা মেয়েটা শান্তনুকে ঠেলা মেরে বলে ওঠে, ‘বাআবাআ! ঢোঁড়া সাপ আবার ফণাও তোলে?’
— আপনাকে দেখে তো বেদেনি বলে মনে হচ্ছে না। তা কী করে বুঝলেন, আমি ঢোঁড়া না চন্দ্রবোড়া?
— হাউ ডেয়ার ইউ?
মাটিতে হিল ঠুকে তড়পে ওঠে মডেলসুন্দরী। আত্রেয়ী পাত্তাও দেয় না। শান্তনুর দিকে চোখ ফিরিয়ে বলে, ‘আপনি খেয়ে আসুন স্যার। আমি এখানে অপেক্ষা করছি। আগের দিন দু-ঘণ্টা করেছি। আজকে আড়াই ঘণ্টা করেছি। কাজটা না হওয়া অবধি অপেক্ষা করেই যাব। কিন্তু ছবিটা আমি তুলবই।’
শান্তনু আরও একবার আগাপাস্তলা আত্রেয়ীকে মেপে নেয়। তারপর মেয়েটাকে নিয়ে বেরিয়ে যায়। আত্রেয়ী শুনতে পায় মেয়েটি শান্তনুকে বলছে, সে যেন কোনোভাবেই আত্রেয়ীর ছবি না তুলে দেয়। মনে মনে মেয়েটির উদ্দেশ্যে ‘হুঁঃ’ শব্দ করে মুখ বেঁকাল আত্রেয়ী।
.
লাঞ্চ করে ফিরে এল। আত্রেয়ী উঠে দাঁড়াল। পাশ দিয়ে প্রচণ্ড ব্যস্ততার অজুহাত দেখিয়ে স্টুডিয়োর ভেতরে ঢুকে গেল শান্তনু। সেদিন বিকেলে সিনেমার নামকরা পরিচালক ত্র্যম্বকেশ্বর মুখোপাধ্যায় এলেন শান্তনুর সঙ্গে মিটিং করতে। আত্রেয়ী দু-চোখে মুগ্ধতা নিয়ে দেখল তাকে। মনে মনে পল-অণুপল গুণে চলল সে। কবে? এমন দিন কবে আসবে তার জীবনে? খানিকক্ষণের জন্য চোখ লেগে গিয়েছিল আত্রেয়ীর। চোখ যখন খুলল তখন সন্ধে গড়িয়ে রাত। ঘড়িতে ন-টা। রিসেপশনিস্ট জানাল, শান্তনু খানিকক্ষণ আগেই বেরিয়ে গেলেন। নিজের ওপর রাগে, ক্ষোভে ফেটে পড়ল আত্রেয়ী। তবে সবটাই অন্তরে সুপ্ত রইল, তার অধরা স্বপ্নের মতো। এখন বুঝতে পারছে শান্তনুর অ্যাসিস্ট্যান্টকে খোলাখুলি কথাগুলো বলাটাই ভুল হয়েছে তার। আসলে প্রথমদিন যখন শান্তনুর সহকারীর সঙ্গে কথা হয়, তখনই সে বলেছে শান্তনুর যা রেট সেটা এই মুহূর্তে দিতে পারবে না। খুব সামান্য কিছু সে দেবে। তবে কথা দিচ্ছে, প্রয়োজনে তারা কাগজে-কলমেও চুক্তি করে নিতে পারেন যে, প্রথম যে কাজই পাক সেখান থেকে টাকা পেলে সবটা শোধ করে দেবেন। এখন শুধু ভালো ছবি তুলে একটা কাজ চাই।
.
আত্রেয়ী পরেরদিন স্টুডিয়োতে গিয়ে শোনে শান্তনু ত্র্যম্বকেশ্বরের একটা ফিল্মের ফটোশুট করতে গেছে। ঠিকানা নিয়ে আত্রেয়ীও সেখানে ছোটে। শান্তনুর সহকারী তো তাকে দেখে অবাক। ‘আপনি এখানেও পৌঁছে গেছেন?’
আমি একটু পার্সোনালি দেখা করতে চাই স্যারের সঙ্গে। কথা বলতে চাই। আপনাকে তো আমি কিচ্ছু লুকোইনি। সব বলেছি। প্লিজ একটা সুযোগ করে দিন না।
সেদিন ভেতর থেকে সহকারী একটা চিরকুট নিয়ে এল। সেখানে একটা ঠিকানা। সহকারী বলল, ‘আজ রাত দশটায় এই ঠিকানায় পৌঁছে যাবেন।’ এইটুকু বলেই চলে যাচ্ছিল কিন্তু আত্রেয়ী বলে উঠল, ‘এক মিনিট! এটা কোথাকার ঠিকানা?’ রেলা নিয়ে সহকারী জানাল, ‘আপনি লাকি। স্যার এত তাড়াতাড়ি কাউকে বাড়িতে ডাকেন না। স্পেশালি কাজের জন্য। আপনাকে ডেকেছে।
— কিন্তু রাতে কেন?
— কারণ সারাদিন উনি ভীষণ ব্যস্ত থাকবেন। রাতে বাড়ি ফিরে আপনার সব কথা শুনবেন। আপত্তি থাকলে বলে দিন। জানিয়ে দিচ্ছি।
— না না। আপত্তি কীসের? ওঁকে বলবেন আমি ঠিক দশটায় পৌঁছে যাব। এক মিনিটও দেরি হবে না।
মনে আর বুকে সহসা বিদ্যুতের আলো চিড়িক করে উঠলেও আত্রেয়ী সেটা বাইরের লোকটাকে বুঝতে দিল না। ‘অশেষ ধন্যবাদ’ জানিয়ে বেরিয়ে এল।
.
রাত ন-টা পঞ্চান্ন। বাঁশদ্রোনীর ঠিকানায় পৌঁছে গেছে আত্রেয়ী। বেলটা তিনবার বাজাতে হল। দরজা খুলে লম্বা বারান্দাতে বেরিয়ে এল স্বয়ং শান্তনু নিয়োগী। আত্রেয়ীকে দেখে মুচকি হাসল। গেট খুলে ভেতরে আসতে বলল। ঘরের ভেতর ঢুকতেই মদের গন্ধটা ভক করে আত্রেয়ীর কান মাথা ঝাঁঝিয়ে দিল। এই গন্ধটা একদম নিতে পারে না আত্রেয়ী। তা-ও সহ্য করে নিল। কিন্তু যেটা ওকে অস্বস্তিতে ফেলল তা হল বাইরের ঘরটায় আর-একটি মেয়ের উপস্থিতি। আত্রেয়ী ভালো করে বুঝতে চেষ্টা করল এই মেয়েটিই সেই আগের দিনের প্যাংলা সুন্দরী কিনা। কিন্তু কালো রঙের জামার নীচে গোদা গোদা ফরসা থাইদুটো আত্রেয়ীকে নিশ্চিত করল যে, এ সে নয়। এই মেয়েটির ভ্রূতে দুল, নাকের মাঝে নোলক, কানে চারটে করে মোট আটটা সিলভার কালারের দুল। মদের গ্লাস হাতে নিয়ে সোফায় এলিয়ে আছে। বুকের জামা থেকে ঠেলে উঠেছে সুডৌল স্তনের মোলায়েম হাতছানি। হাবেভাবে শান্তনু নিয়োগীর মতো যে-কোনো পুরুষের ঘুম উড়িয়ে দেবে।
— বসুন।
শান্তনুর কথায় হালকা করে হেসে সোফায় বসল আত্রেয়ী। শান্তনু ড্রিংক অফার করল।
— থ্যাংক ইউ। খাই না।
শান্তনু ভ্রূ উঁচিয়ে অবাক হল। ভাবখানা এমন যেন এই প্রথম কোনো মেয়ে মদ খাবে না বলল। ‘কোল্ড ড্রিংকস?’ আত্রেয়ী আবারও বেশ সংকোচের সঙ্গে বলল, ‘না। আসলে আমার ভীষণ মোটা হওয়ার ধাত। কোল্ড ড্রিংকস মানেই ফ্যাট। ভাই যতটা পারি এড়িয়ে যাই। আমি জাস্ট আপনার সঙ্গে কথা বলেই চলে যাব।’
কাচের গ্লাসে একটা চুমুক দিয়ে শান্তনু বলল, ‘আমার একটু সময় লাগবে মিস…
— আত্রেয়ী সেন।
— মিস আত্রেয়ী। আসলে সারাদিন এত হেকটিক শিডিউল ছিল আমার মাথা থেকে পা পর্যন্ত পুরো জ্যাম হয়ে গেছে। শরীরটা জাস্ট কোনো কাজ করছে না।
এত রাতে ডেকেও ন্যাকামো। আত্রেয়ীর বিরক্ত লাগলেও মুখে হাসিটাকে স্টিকারের মতো মেরে রেখেছে। পাশে বসা মেয়েটার দিকে চোখের ইশারায় দেখিয়ে বলল, ‘ও রোজি। আমায় মাঝেমধ্যেই মাসাজ করাতে আসে। অফফফ,
কী বলব আত্রেয়ী, রোজির হাতে জাদু আছে। ও তো আমায় পুরো স্বর্গে নিয়ে যায়।’ সেই কথা শুনে রোজি আবার ঘাড় বেঁকিয়ে ফিচফিচ করে হাসল। চোখ নেশায় ঢুলুঢুলু। ও করাবে মাসাজ! আড়চোখে তাকিয়ে আত্রেয়ী তার কিছুটা হাসি রোজির দিকেও ছুড়ে দিল।
— এখানে কত রাত পর্যন্ত গাড়ি পাওয়া যায় স্যার?
— যত রাত চাও।
— ও।
— তুমি আজ আমায় অবাক করে দিয়েছ। ভাবিনি এত রাতে তুমি আসবে।
— অ্যাক্টিঙে চান্স আমায় পেতেই হবে স্যার। এতে আমায় যত রাত জাগতে হয়, তত রাতই জাগব।
কথাগুলোর মধ্যে স্বপ্নসত্যির যে আগুন আগ্নেয়গিরির মতো বেরিয়ে এল আত্রেয়ীর গলা দিয়ে তার আঁচ রোজি আর শান্তনু দুজনকেই স্পর্শ করল। ‘বেশ। অপেক্ষা করো তাহলে। আমি আর বসতে পারছি না। রোজি, কাম টু মাই বেড।’ কথাটা বলে হাত বাড়িয়ে দিল শান্তনু। রোজি কোঁকড়ানো চুল ঝাঁকিয়ে শান্তনুর গায়ে ঢলে পড়ে ভেতরে ঢুকে গেল। আত্রেয়ী অবাক চোখে চেয়ে দেখল।
.
ঘড়ির কাঁটা ঘুরে চলল। ঘরের বাইরে গাড়ির আওয়াজ কমে গেল। মাঝেমধ্যে দু-একটা সাইকেল বা ভ্যান টিংটিং করে হর্ন দিয়ে ছুটে যাচ্ছিল। এখন সেটাও শোনা যাচ্ছে না। ভেতর থেকে দু-তিনবার মেয়েটার গলার আওয়াজ ভেসে এল। আত্রেয়ী একটু সজাগ হয়ে বসল। কী করবে? ভেতরে গিয়ে দেখবে? না থাক। যাদের ব্যাপার তারা বুঝুক। ঘড়ির কাঁটা বারোটা ছুইছুই। অনেকক্ষণ ধরে চেপে আছে আত্রেয়ী। একবার বাথরুম না গেলেই নয়। শান্তনুবাবুকে ডাকবে? ঠিক হবে কী? নাহ্! নিজেই একটু ভেতরে গিয়ে দেখুক বরং। নিশ্চয়ই সামনেই বাথরুম থাকবে। আত্রেয়ী ভেতরের ঘরে ঢুকল। ডাইনিং রুম। আলোটা জ্বলছে। সোজাসুজি একটা বন্ধ দরজা দেখল। ওটাই বোধহয় বাথরুম। এগিয়ে গিয়ে দরজা ঠেলতেই দেখল ও ঠিকই ভেবেছিল। আলো জ্বালিয়ে বাথরুমে ঢুকে গেল। বেরিয়ে এসে আলো নিভিয়ে এগোতে যাবে আবার মেয়েটার গলা। তীক্ষ্ণ স্বরে উহ! আঃ!’ করছে। আত্রেয়ী বুঝল এই শব্দের মধ্যে কোনো যন্ত্রণা নেই। আছে অপার্থিব সুখ। শব্দটা যেন আত্রেয়ীকে টানছে। সে এড়িয়ে যেতে চাইলেও পারছে না। ডাইনিঙের পাশেই সরু প্যাসেজ। ওদিকটা খানিক অন্ধকার। সেখানে বন্ধ দরজা। তার ভেতর থেকেই রোজির সরু গলাটা নিশির ডাকের মতো আত্রেয়ীকে টানছে। বন্ধ দরজাটার কাছে এগোতেই আত্রেয়ী বুঝল রোজির গলাটার সঙ্গে মিশে আছে শান্তনুর ঘন ঘন শ্বাস। দরজায় কান পাততেই আত্রেয়ীর সামনে মাসাজের ছবিটা স্পষ্ট হয়ে উঠল। ঘরের ভেতরে শীৎকারধ্বনিতে চরমতম শরীরী খেলায় মেতে উঠেছে দুটো শরীর। দরজার বাইরে আত্রেয়ীর নিশ্বাস ঘন হয়ে এল। বুকটা ঘন ঘন উঠছে আর নামছে। গলায়, কপালে ঘাম ফুটে উঠেছে। দরজার ওপর কান পাততে গিয়ে কখন যে আত্রেয়ীর কাঁধ লেগে ভেজানো দরজাটা খানিকটা খুলে গেছে সেটা প্রথমে টের পায়নি। শব্দের অভিঘাতটা বাড়তেই আত্রেয়ীর চোখ পড়ে দরজার দুটো পাল্লার ফাঁকে। ঘরের ভেতর বিছানায় যে রতিতাণ্ডব চলছে তা দেখে আত্রেয়ীর শরীরটা টলে যায়। আর এক মুহূর্তও সেখানে না দাঁড়িয়ে বাইরের ঘরে এসে সোফা থেকে ব্যাগটা তুলে নেয়। বুঝতে পারে, শান্তনু আত্রেয়ীকে ফাঁসাতে চাইছে। ন্যায্য পয়সা দিতে পারবে না বলে অন্যভাবে টাকাটা উশুল করবে। নিমেষের মধ্যে দরজা খুলে বারান্দায় এসে দাঁড়ায় আত্রেয়ী। গেটটা খোলাই আছে। ইচ্ছে করলেই বেরিয়ে যেতে পারে। কিন্তু এই মাঝরাতে যাবেটা কোথায়? রাস্তা শুনশান। দূরে একটা মাতাল জড়ানো গলায় আবোল-তাবোল গান গাইছে। দু-একটা কুকুর ডাকছে। এই সময় রাস্তায় একা বেরোলে অন্য বিপদ যে আসবে না তা কে বলতে পারে? গাড়িও নেই। অতএব এখান থেকে বাড়ি ফেরা অসম্ভব। কান্না পেয়ে যায় আত্রেয়ীর। আবার ঘরের ভেতর চলে আসে। সোফায় বসে কেঁদে ফ্যালে। কী করবে সে এখন? পরক্ষণেই নিজেকে প্রশ্ন করে, আচ্ছা, ও কী দুর্বল হয়ে পড়ছে? না না। ভেঙে পড়লে তো একদম চলবে না। ও তো সব কিছু জেনেশুনেই এই জগতে আসতে চায়। বাবার সঙ্গে মুখ দেখাদেখি বন্ধ। সংসারে একটা পয়সাও দিতে পারে না আত্রেয়ী। দিনরাত টাকার খোঁটা। চরিত্রের খোঁটা তো আছেই। ভালো জিনিস মানুষ ভুলে যায়। কিন্তু কলঙ্ক একবার লেগে গেলে আমরণ পিছু ছাড়ে না। ছাব্বিশ বছরের জীবনে আত্রেয়ী এটা ভালো মতন বুঝে গেছে। মরুক গে যাক, লোকে কী বলল তাতে কবেই-বা ওর কিছু যায় এসেছে? সে তো আর কারও প্রাণ নিচ্ছে না। নিজের বিবেক ছাড়া কাউকে খুনও করছে না। তাই আততায়ী আর শিকার যখন একজনই তখন চিন্তা কী? ক্ষণিকের আবেগে যেটুকু নোনতা জল আত্রেয়ীর চোখ ঠেলে উপচে পড়েছিল সেটুকুর চিহ্ন মুহূর্তে মুছে ফেলল সে। পায়ের ওপর পা তুলে শরীরটাকে নরম সোফায় এলিয়ে দিল। মাথার ওপর সিলিঙে ভাসিয়ে দিল চোখদুটোকে। আত্রেয়ী জানে, সাপ তার বিষ একবার উগরে দিলে সে নিস্তেজ হয়ে পড়বে। সঙ্গে এটাও নিশ্চিত, আজ রাত তার এই বাড়িতে এই সোফাতেই কাটবে। লম্বা শ্বাস নিল আত্রেয়ী।
.
ঘড়ির কাঁটা অনিশ্চয়তার রাত পেরোচ্ছে। চোখের পাতাগুলোকে কিছুতেই এক হতে দিচ্ছে না আত্রেয়ী। ক্লান্তিতে ঘুমে ভেঙে আসছে শরীর। কিন্তু না, এখন মনের চেয়ে শরীরের দামটাই বেশি। তাই তাকে ভেঙে পড়তে দিলে চলবে না। একসময় মনে হল বাইরে পাখি ডাকল। দু-একটা সাইকেল, রিকশার টিংটিং বেজে উঠেছে। হাত উলটে ঘড়ি দেখল আত্রেয়ী। ভোর সাড়ে পাঁচটা বেজে গেছে। হঠাৎ ঠক খটাস করে শব্দ হওয়াতে সোজা হয়ে বসল আত্রেয়ী। চোখ দরজার ওপর পড়তেই দেখল রোজি সেজেগুজে বেরোচ্ছে। পিছনে শান্তনু। দুজনেই আত্রেয়ীকে দেখে হকচকিয়ে গেছে। আত্রেয়ী রীতিমতো শান্তনুর চোখে চোখ রেখে ঠায় চেয়ে রইল। শান্তনু ও বুঝল নবাগতা এই মেয়েটির চোখে গতরাত পর্যন্ত যে বিনয়, কাকুতি-মিনতি ছিল সেসব উধাও। বলতে বাধ্য হল শান্তনু, ‘ও হো! এক্সট্রিমলি সরি মিস আত্রেয়ী। আপনাকে…’
আর কিছু বলার আগেই আত্রেয়ী বলে উঠল, ‘না না সরি বলছেন কেন? সারা রাত চূড়ান্ত বডি মাসাজের পর আমার নামটা যে আপনার মনে আছে এই তো অনেক!’ শান্তনুর মনে হল, কোনো কামারশালায় ধাতব কিছুতে শান দেওয়ার শব্দ হল। কথা না বাড়িয়ে রোজিকে বলল, ‘রোজি বাই। সময় মতো চলে এসো তাহলে।’ রোজিও হেলেসাপের মতো কোঁকড়াচুলো মাথা হেলিয়ে বলল, ‘ওকে শান্তনু। বাই। শান্তনুর মুখের সামনে কতগুলো রাক্ষুসে নখওয়ালা আঙুল নেড়ে বেরিয়ে গেল। শান্তনু দরজাটা বন্ধ করে দিল। ‘চা খাবেন?’ শান্তনুর খাতিরদারিতে হাসি পেল আত্রেয়ীর। সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। এগিয়ে গেল শান্তনুর সামনে। চোখের ওপর চোখ রেখে বলল, ‘সারা রাত জাগিয়ে রেখে সকালে শুধু চা?’ শান্তনু আমতা-আমতা করে বলল, ‘না না, বলুন না আর কী খাবেন? স্যান্ডউইচ, ম্যাগি, পাস্তা আর
এবার আর হাসি চেপে রাখতে পারল না আত্রেয়ী। শরীর দুলিয়ে ঝাঁকিয়ে খলখলিয়ে হেসে বলল, ‘ব্যাস ব্যাস, এই যে বলেছেন আপনার এতেই কত লস হয়ে গেল বলুন তো? একেই আমি আপনার রেট দিতে পারছি না বলে আমায় হেনস্থার পর হেনস্থা করে চলেছেন তার ওপর আবার এসব খাবার খেলে যে বিল হবে সেটা তো আমাকে বেচেও পাওয়া যাবে না।’ শান্তনুর গালদুটো জ্বলে উঠল। মনে হল কেউ কষিয়ে দুটো থাপ্পড় মারল। গলায় একটু ঝংকার তুলে শান্তনু বলল, ‘শুনুন, ওটা আমার প্রফেশন। সেখানে কোনো কম্প্রোমাইজ করি না আমি।’
— কম্প্রোমাইজ করেন না। কম্প্রোমাইজ করান। বেশ।
বলেই গায়ের ওড়নাটা পাশের সোফায় ছুড়ে ফেলে দেয় আত্রেয়ী। শান্তনুকে চমকে দিয়ে গায়ের কামিজ ঝট করে খুলে ফেলে। বেচারা কামিজটা নরম সোফায় আত্রেয়ীর লজ্জাটুকু সম্বল করে কুঁকড়ে পড়ে থাকে। শান্তনু দু-পা পিছিয়ে বলে ওঠে, ‘এ-এসব কী করছেন?’
— অ্যাডভান্স করছি। ওটা ছাড়া তো আপনি কাজ করেন না।
কথাটা বলতে বলতে এগিয়ে যায় শান্তনুর দিকে। দু-হাত দিয়ে খামচে ধরে শান্তনুর দুটো পেশিবহুল হাত। শান্তনু চূড়ান্ত অপ্রস্তুত। কল্পনাতেও ভাবেনি এই মেয়ে এত সহজে এত দূর পর্যন্ত যেতে পারে।
— ইন্ডাস্ট্রিতে তো এত ক্যামেরাম্যান আছে। তা সত্ত্বেও আমি কেন আপনার পেছনে পড়ে আছি বলুন তো?
আত্রেয়ীর গলাটা সাপের মতো হিসহিস করছে। ‘কেন?’ শান্তনু জিজ্ঞেস করল।
— ত্র্যম্বকেশ্বর মুখোপাধ্যায়, ঋতম ঘোষ, অনিন্দিতা সেন এরা প্রত্যেকে আপনার কাছ থেকে নায়িকা তোলে। কারণ তাদের সঙ্গে আপনার দারুণ খাতির। আমি সেইসব পরিচালকের ছবিতেই কাজ করতে চাই। কাজ আমায় পেতেই হবে। আমার কাছে তো পয়সা নেই। থাকার মধ্যে আছে শুধু এই…
.
বলে নিজের প্রায় অনাবৃত শরীরের দিকে ইশারা করে। তারপর নাগিনীর মতো খল-হাসি হেসে বলে, ‘নিন, অ্যাডভান্সটা গ্রহণ করুন!’ শান্তনু ঘন ঘন দু-বার নিশ্বাস ছেড়ে বলে, আত্রেয়ী কুল।’
— বিলকুল। আমি ফুল্লি কুল। কিন্তু আপনার কী হল শান্তনুবাবু? রাতে একবার বিষ ঢেলেই টোড়া সাপ হয়ে গেলেন?
শান্তনুর ভ্রূ দুটো কুঁচকে গেল। কথার আঁচ ভালোই বুঝল সে। আত্রেয়ী ছুরির মতো গলার স্বরে শান দিয়ে বলল, ‘দ্বিতীয়বার করার মুরোদ যখন নেই তখন ইন্ডাস্ট্রির কচি মেয়েগুলোকে বগলে চেপে ঘোরেন কেন? রাতে মাসাজ নেবার জন্য?’
কথার চাবুক পড়া মাত্রই শান্তনু তার পেশিবহুল দক্ষিণ বাহুপাশে ঝপাৎ করে বেঁধে নিজের বুকের ওপর চেপে ধরল আত্রেয়ীকে। দাঁতেদাঁত দিয়ে আত্রেয়ীর মুখের সামনে হিসহিস করছে সে-ও। আলতো আলোমাখা নরম সকালে এমন আগুনে কক্ষনো শরীর সেঁকেনি শান্তনু। আত্রেয়ীও জ্বলে উঠেছে। আজ সে স্বেচ্ছায় তার সর্বস্ব পুড়িয়ে ছারখার করে দেবে। শান্তনুর ঠোঁটে তর্জনী রেখে আত্রেয়ী বলে, ‘শুধু একটা রিকোয়েস্ট, অন্য কারও ধামসানো বিছানায় আত্রেয়ী সেন উঠবে না। শান্তনুর ঠোঁটে বাঁকা হাসি। নরম সুরে ফিশফিশে গলায় আত্রেয়ীকে বলল, ‘কাল সকাল দশটায় পোর্টফোলিয়ো স্টুডিয়ো। দেরি কোরো না।’
— বুঝলাম। শান্তনুর ওপর প্রতিশোধ নিতেই তন্ময়ের সঙ্গে…
সূর্যর কথা শেষ করতে না দিয়েই সায়ন বলে উঠল, শরীরের খিদে আর কেরিয়ারে টপে যাওয়ার খিদে এই দুটোকে অত লঘু করে দেখো না সূর্য। আত্রেয়ী সেনের কেরিয়ার গ্রাফটা শুধু খেয়াল করো। প্রথমে শান্তনুকে পাকড়াও করলেন যে কিনা ছবি তোলে। কারণ ওঁর অভিনয়ে প্রবেশ করতে একজন স্টিল ক্যামেরা পার্সন প্রয়োজন। শুধু প্রবেশই নয়। ভালোভাবে প্রবেশ। যতদূর মনে হয় ওঁর প্রথম ছবিই ছিল ত্র্যম্বকেশ্বরের বিজয়িনী। কী তাই তো বন্দনা ম্যাডাম?’
বন্দনা ওপর নীচে ঘাড় নাড়ে। বলে, ‘স্যারই কন্ট্যাক্ট করিয়ে দিয়েছিলেন। তখন আত্রেয়ী সেন আর শান্তনু নিয়োগীর তুমুল প্রেম।’
আবার সায়ন বলতে শুরু করল, ‘খবর আছে আত্রেয়ী সেন আর শান্তনু দীর্ঘ ছয় বছর লিভ ইন রিলেশনে ছিলেন। সেই সময় ব্যাংকক, পাটায়া, আন্দামান, প্যারিস হানিমুনের পর হানিমুন। কী তাই তো বন্দনা ম্যাডাম?’ বন্দনা আবারও ঘাড় নেড়ে ‘হুম’ বলে। আরও বলে যে বাড়িতে মাঝ সিঁড়িতে যে বিশাল ছবিটি আছে সেটা শান্তনু স্যারেরই তোলা। আন্দামানে। ছবিটার কথা ওঠাতে এক ঝলক দৃশ্য সায়নকে নাড়িয়ে দিল নতুন করে। দেয়াল জোড়া অত বড়ো ছবিটার ওপর থেকে নীচ পর্যন্ত লাল কালি দিয়ে কোনো মানুষের পক্ষে কী ক্রস আঁকা সম্ভব? কোনো একটা মানুষ মই নিয়ে খেটেখুটে এই কাজটা করবে এই যুক্তি গ্রহণ করার মতো একেবারেই নয় যদি না সে উন্মাদ হয়।
— স্যার। স্যার।
সূর্য দু-বার ডাকল সায়নকে। ভাবনার ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে নিজে একটু সোজা হয়ে বসে পড়ল। ‘কিছু ভাবছেন?’ প্রশ্ন করল সূর্য।
— না না। যা বলছিলাম। আত্রেয়ী সেন একজন নামজাদা অভিনেত্রী হবেন বলে শান্তনুর মতো একজন মেয়েবাজ দুশ্চরিত্র লোকের সঙ্গে প্রেম করতেও দ্বিধা করেননি। এমনকি বিয়েও করেছেন। আর তারপরে দিন এগোল। আত্রেয়ী সেন নাম করলেন। এবার আর স্টিল নয়, একেবারে সিনেমাটোগ্রাফারকে পাকড়ে ফেললেন। হলই-বা সে তার থেকে বয়সে বছর সাতেকের ছোটো। এবার তাকে স্বনামধন্য অভিনেত্রী তার মোহের জালে বেঁধে সাইড করতে থাকেন স্টিল ক্যামেরাকে ওরফে তার স্বামীকে।
— আচ্ছা আপনারা যখন সবটাই জানেন তাহলে খামোখা আমাকে এখানে বসিয়ে রাখার মানেটা কী?
রীতিমতো খেপে উঠল বন্দনা। সায়ন, সূর্য আর সোমদত্তা অবাক। সোমদত্তা বলল, ‘বাবা! গায়ে লাগল নাকি?’ সূর্য ঠাট্টা করল, ‘বটেই তো বটেই তো। এতকাল ম্যাডামের নুন খেয়ে তার নামে বদনাম নিজের কানে শোনা… ছি ছি… এ পরম পাপ’!
রাগে বন্দনার সারা গা রি রি করে ওঠে। সায়ন জিজ্ঞেস করে, ‘আচ্ছা একটা কথা বলুন দেখি, এই তন্ময় হালদার লোকটা কবে থেকে ঠিক কোন কোন সময়ে আপনার প্রণম্য ম্যাডামের বাড়িতে আসতেন?’
— আমি ক্যালেন্ডার দেখিনি। তাই এক্স্যাক্ট বলতে পারব না।
সূর্য উত্তেজিত হয়ে বলে ওঠে, ‘আরে বাবা একটা সময় তো খেয়াল আছে আপনার? সেটাই বলুন না। সবথেকে বড়ো কথা শান্তনু থাকাকালীন কি আসতেন আত্রেয়ী সেনের বাড়ি?’
বন্দনা কিছুক্ষণ চুপ থেকে মুখ নীচু করে ভাবে। তারপর সামনে ঝুলন্ত আলোতে চোখ মেলে বলে, ‘প্রথম দিকে আসত না।’
