মৃত জ্যোৎস্নার রাত্রি – ২৫
পঁচিশ
মোম-জোছনায় গা ভিজিয়ে জানলার পাশে বসে আছে বিনোদিনী। পরনে বিধবার বরাদ্দ সাদা থান। মাথার মাঝে শূন্য আলপথের মতো খাঁ খাঁ করছে বিবর্ণ সিঁথি। বিয়ের অনতিকাল পরেই বিধবা হয়েছে সে। বাঞ্ছিত সম্মিলনে যৌবন তার সম্মান পায়নি। বিধবা হয়েও সর্বনাশা ভালোবাসা গ্রাস করেছে তাকে। নিতম্ব ছাপানো এলো চুল মাটিতে লুটোচ্ছে অনাদরে। অন্তরে তার প্রাণনাথের জন্য প্রতীক্ষা কিন্তু শেষ হয়নি এখনও। তাই তো ভর সন্ধেবেলা গান উঠেছে গলায়। ‘আমারে যে জাগতে হবে, কী জানি সে আসবে কবে/ যদি আমায় পড়ে তাহার মনে/ বসন্তের এই মাতাল সমীরণে। আজ জ্যোৎস্নারাতে সবাই গেছে বনে।’ এই এত বড়ো অংশের টেকটা এক শটে দিল আত্রেয়ী। তন্ময়ও সময় মেপে ক্যামেরা ট্রলি করল। পরিচালক ঋতম ঘোষ খুশি। হাততালি দিল সবাই। জোর গলায় লাঞ্চ ঘোষণা করলেন পরিচালক। ট্রলির ওপর বসেই মুগ্ধ চোখে আত্রেয়ীকে দেখছিল তন্ময়। দারুণ শট দেওয়ার জন্য সবাই প্রশংসা করছে। আত্রেয়ী হালকা হেসে থ্যাংক ইউ বলে এগিয়ে আসছিল। বন্দনা মনিটরের সামনে দাঁড়িয়েছিল। ম্যাডামকে নিয়ে মেকআপ রুমে যাবে। সে খেয়াল করল ম্যাডাম হেঁটে আসছে। আড়চোখে তন্ময়ের দিকে তাকিয়ে আর তন্ময় ঘাড় বেঁকিয়ে হাসিমুখে আত্রেয়ীকে দেখছে। পাশ দিয়ে যাবার সময় তন্ময়ের হাতে একটা চিমটি কেটে ফ্লোরের দরজার দিকে চলে গেল। বন্দনা মনে মনে হাসল। এত দিনে বুঝেছে, এই সোহাগি চিমটিটা ম্যাডামের ইঙ্গিত। মেকআপ রুমে আত্রেয়ী ঢোকার পরেই তন্ময় আসবে। কোনো ছুতোয় বেরিয়ে যেতে হবে বন্দনাকে। আর তারপর ভেতর থেকে ছিটকিনি দিয়ে খানিক অত্যন্ত গোপন আলাপচারিতা হবে দুজনের মধ্যে।
ফ্লোর ইপি ভিকি বিশ্ব হারামির এক হারামি। গোপন আলাপে কী হয় বন্দনাকে সে-ই দেখিয়েছিল একদিন। আড়ালে ডেকে বলেছিল, ‘তোর ম্যাডাম আর তন্ময় ঘরে ঢুকলেই তুই বেরিয়ে আসিস কেন রে?’ বন্দনা বলেছিল, ‘ম্যাডামের জুস নিতে আসি তো।’
— সে তো আগে থেকেই রুমে রেখে দিতে পারিস।
— আগে থেকে বললে তো রাখব। ম্যাডামের হঠাৎ হঠাৎ ইচ্ছে জাগে। ভিকি ফ্যাক করে হেসে ফেলে। বলে, ‘ওটাই তো কায়দা।’
— মানে?
— মানে? এই দ্যাখ।
বলেই ওর মোবাইলটা হাত দিয়ে আড়াল করে বন্দনার মুখের সামনে ধরে। বন্দনা দেখে আত্রেয়ীকে জড়িয়ে ধরে ঠোঁটের মধ্যে ঠোঁট ডুবিয়ে দিয়েছে তন্ময়। বন্দনা হাঁ করে মুখে হাত চাপা দেয়। দুজনে জড়াজড়ি করে গভীর চুমু খেতে খেতে মাঝে মাঝেই ব্যালেন্স হারিয়ে টলে যাচ্ছে। তন্ময়ের চুমুটা ঠোঁট থেকে গাল বেয়ে গলা পর্যন্ত নেমে এসেছে। আত্রেয়ী খামচে ধরেছে তন্ময়ের পিঠ। হাত দিয়ে টেনেটুনে যতটা পারে আত্রেয়ীর বুকের ওপরের জামা নামিয়ে নরম মাংসল স্তনের ভেতর মুখ ডুবিয়ে দিচ্ছে। বন্দনা দেখতে দেখতে লজ্জায় লাল হয়ে যাচ্ছে। গলা শুকিয়ে আসছে বন্দনার। ভিকি পাশে দাঁড়িয়ে দৃশ্যের উষ্ণতা আর বন্দনার লজ্জা পাওয়া তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছে। হঠাৎ মেকআপ রুমের দরজায় ধাক্কা। হাবুডুবু খেতে থাকা দুটো মানুষ চকিতে দরজার দিকে তাকায়। আত্রেয়ী চটপট ঘেঁটে যাওয়া চুল ঠিক করতে করতে আয়নার সামনে বসে পড়ে। তন্ময় চটজলদি রুমাল দিয়ে মুখে ফুটে ওঠা হালকা ঘাম মুছে নিয়ে দরজা খোলে। এরপর বন্দনার আরও লজ্জা করে। মোবাইলে দেখে আর কেউ নয়, সেদিন বন্দনাই ম্যাডামের জুস হাতে মেকআপ রুমে এসেছে। পাশ থেকে ভিকি বলে, ‘দেখেছিস পোড়ারমুখি, সেদিন কী সব্বোনাশটা ঘটিয়েছিলি? ভিডিয়োটা যেই গরম থেকে আরও গরম হচ্ছে অমনি তুই সবটা ভণ্ডুল করে…শালা!’
— আমি কী করে জানব? আর তুই-ই বা এটা পেলি কী করে?
— ভিডিয়োতেই আছে। দেখ।
বন্দনা অবাক চোখে আবার ভিডিয়োটা চালায়। দেখে ভিকি নিজে ঢুকে আত্রেয়ীকে বলল, ‘ম্যাডাম পরের শট রেডি। আপনি চলে আসুন।’ বলেই ক্যামেরার দিকে এগিয়ে এসে হাতটা বাড়ায়। তারপরেই ক্যামেরাসমেত গোটা দৃশ্যটাই তুমুল নড়েচড়ে ওঠে। ভিকি বন্দনাকে বলল, ‘আমার ব্যাগ আর মোবাইল তো থাকতেই পারে ওই ঘরে তাই না?’
— ইসসস! ছি ছি। এটা তোর একদম উচিত হয়নি। শিগগির ডিলিট কর।
ভিকি অমনি বন্দনার হাত থেকে মোবাইল কেড়ে নিয়ে আদ্যিকালের পিসিমাদের মতো বলে ওঠে, ‘ওরে মাগি ভাতারখাকি, আমি আমার মোবাইলে কী রেকর্ড করব না করব সেকি তোকে বলে করব নাকি র্যা? বজ্জাত মেয়েছেলে!’ বন্দনা হাসতে হাসতে ভিকির পিঠে চটাস করে চড় কষিয়ে বলে, ‘তুই মহা শয়তান। ম্যাডামের পিন্ডি চটকে আবার ম্যাডামেরই সিনেমার ডায়লগ ঝাড়ছিস?’
মেকআপ রুমে আয়নার সামনে আত্রেয়ী বসেছিল। তন্ময় ঘরে ঢুকেই পেছন থেকে জাপটে ধরে হাপুস-হুপুস চুমু খেতে থাকে। ‘আরে ছাড়ো ছাড়ো কী করছ? মেকআপ নষ্ট হয়ে যাবে। কন্টিনিউটি আছে তো।’ চুমু খেতে খেতেই তন্ময় বলে, বন্দনা আছে তো।’
— হোক। সরো।
বলে তন্ময়কে ঠেলে সরিয়ে দিল আত্রেয়ী। নীচু গলায় বলল, ‘দরজা খোলা তন্ময়।’
— তাতে কী? আমি আমার প্রেমিকাকে আদর করছি। কার বাপের কী?
— ইসসস! বীরপুরুষ একেবারে। বাড়িতে আসো না কেন? হুঁ?
তন্ময় সোফায় বসতে বসতে বলল, ‘সে-এ তো বাওয়াল চাই না তাই।’
— চুপ করো। আমার বাড়িতে তুমি আসবে বাওয়ালের কী আছে?
— কী দরকার? বেকার আমার জন্য তোমার অশান্তি বাড়বে।
— ছেঁটে ফেলব।
— অ্যাঁ?
অশান্তি ছেঁটে ফেলব। আর নেওয়া যাচ্ছে না। আমার সুখ আমার তন্ময়। অনেক কষ্ট করে অনেক কিছু মূল্য দিয়ে আজ সেটা অর্জন করেছি। কোনো গুড ফর নাথিঙের জন্য আমার লাইফটা হেল হয়ে যেতে দিতে পারি না।
— তাহলে যাব বলছ?
— ন্যাকা। আমি তো কবে থেকে বলছি এসো এসো। তুমিই তো খালি ধানাই-পানাই করছ।
— চলো না তুমি আর আমি বাইরে কোথাও থেকে ঘুরে আসি।
— এখন? ঋতমের চোখের বালি শেষ হলে মিন্টুর ছবিটার ডাবিং বাকি। সব মিলিয়ে মাসখানেকের ধাক্কা।
— তারপরেই না হয় যাব।
— এই শোনো, শটের পর সবাই আমার প্রশংসা করল। এমনকি ঋতমও। তুমি করলে না কেন গো?
তন্ময়ের ঠোঁটে প্রেমিক-প্রেমিক হাসি। ‘হাসছ যে?’
— সব কথা মুখে বলে বোঝাতে হবে?
আহ্লাদী সুরে আত্রেয়ী দাবি জানাল, ‘হ্যাঁ হবে।
— বেশ! সারপ্রাইজ থাক তবে।
বলেই সোফা ছেড়ে উঠে পড়ল। আত্রেয়ী বলল, ‘মানে?’ আবারও একটা রোমান্টিক হাসি ছুড়ে দিয়ে তন্ময় বলল, ‘লাঞ্চ করে নাও। পরের শটেও ফাটিয়ে দিতে হবে।’ কথাটা শেষ করেই মেকআপ রুমের দরজাটা ঝট করে টেনে খুলে বেরোতে গিয়েই থমকে গেল। বন্দনা দাঁড়িয়ে আছে। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল সে-ও। ‘এ কী তুমি? নক করোনি কেন?’ তন্ময়ের কথায় ঘাবড়ে গিয়ে প্রথম কথাটা জিভের ডগায় এসে পিছলে গেল, ‘এ-এই তো। নক করতেই যাচ্ছিলাম। ওই সময়েই আপনি… ম্যাডামের জুস এনেছিলাম।’ তন্ময় আর কথা বাড়াল না, ‘যাও’ বলে বেরিয়ে গেল।
সেই সপ্তাহের রবিবারেই এগারোটা-সাড়ে এগারোটা নাগাদ আত্রেয়ীর বাড়ি এল তন্ময়। হাতে একটা চকচকে গিফট র্যাপারে মোড়া বাক্স। আত্রেয়ী তো আপ্লুত। বন্দনা দূরে দাঁড়িয়ে দেখল শান্তনুর চোয়ালদুটো যত শক্ত হচ্ছে তন্ময়কে নিয়ে আত্রেয়ীর আদিখ্যেতা আরও বাড়ছে। বাড়ির নীচের বসার ঘরে বসেই ফোনে কথা বলছিল শান্তনু। কারওর কাছ থেকে ছবি তোলার কোনো অ্যাসাইনমেন্ট পাওয়ার কথা ছিল। সেই ব্যাপারেই কথা হচ্ছিল। তবে সেই কথায় যত না মন ছিল তার চেয়ে বেশি মন ছিল আত্রেয়ী ও তন্ময়ের পাশাপাশি বসে থাকার দিকে। তন্ময় যদিও ঢুকেই হাত নেড়ে মিষ্টি করে হেসেছে। কিন্তু তাতে শান্তনুর খুব একটা কোনো প্রত্যুত্তর অভিব্যক্তি চোখে পড়েনি। বাক্স দেখে আত্রেয়ীর প্রশ্ন, ‘এইটা কী?’ তন্ময় বলল, ‘এক-এর পর এক দুরন্ত শট দেওয়ার উপহার। বলেছিলাম না সারপ্রাইজ!’ অষ্টাদশীর মতো হাতদুটো গালে দিয়ে চোখ পাকিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করল আত্রেয়ী। উৎফুল্ল হয়ে তক্ষুনি র্যাপার খুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে সে। এইসময় ফোনটা কান থেকে নামিয়ে ফুট কাটে শান্তনু, শট ভালো দিয়েছে বলে ডিরেক্টরের থেকে ক্যামেরাম্যানের আনন্দটা একটু বেশিই মনে হচ্ছে!’ আত্রেয়ীর হাত থেমে যায়। ভ্ৰূটাও কুঁচকে যায়। প্রথমটা তন্ময় একটু থমকালেও মুহূর্তে সামলে নিয়ে হেসে হেসে জবাব দেয়, ‘ঠিক ধরেছেন শান্তনুবাবু, সত্যিই আমার আনন্দটা ডিরেক্টরের চেয়ে বেশি। কেন বলুন তো?’ কাঁধ নাচিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে শান্তনু জানতে চায়, ‘কেন?’
— কারণ ও শটগুলো এত ভালো দিয়েছে বলেই এক টেকে ওকে হয়েছে। আর ক্যামেরাম্যানের খাটনিও প্রচুর কমে গেছে। ওই চোদ্দোবার একই শট নিতে নিতে বড্ড ক্লান্ত হয়ে পড়ি। আত্রেয়ী আমায় সেই সুযোগই দেয়নি। তা ছাড়া ক্যামেরা পার্সনেরও তো একটা স্যাটিসফ্যাকশন থাকে, তাই না? আপনিও তো ক্যামেরা নিয়ে কাজ করেন, মডেল দুরন্ত পোজ দিলে আপনার ছবিটারই তো প্রশংসা হয় তাই তো?
কামড়ানোর সুযোগটা হাতছাড়া করল না আত্রেয়ী। তন্ময়কে একবার ঠেলে দিয়ে বলল, ‘কার সঙ্গে কার। তুমি পারোও তন্ময়। ও তো স্টিল ছবি তোলে। ও কী বুঝবে সিনেমাটোগ্রাফির ব্যাপারে?’ শান্তনুর পিঠটা চিড়বিড় করে উঠল। বজ্রের চাবুক মারল কেউ। তন্ময় একটু সৌজন্য-লজ্জা দেখাল বটে। তবে তার আড়ালে যে অপমানের অট্টহাসি লুকিয়ে ছিল সেটা ভালোভাবেই বুঝল শান্তনু। নিষ্প্রাণ মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল। আত্রেয়ী অপেক্ষা না করে উপহারের র্যাপারটা খুলে চমকে উঠল। আনন্দে প্রায় নেচে উঠল আত্রেয়ী। সপ্তমে স্বর চড়িয়ে ‘সোয়ারভস্কি! ও মাই গড! আই লাভ দিস তন্ময়। তুমি জানলে কী করে?’ আপ্লুত হয়ে কথা বলতে বলতে চটপট বাক্সটাও খুলে ফেলল। তন্ময় বলল, ‘কাছের বন্ধুর পছন্দ-অপছন্দ না জানলে আর বন্ধু হলাম কীসের?’ ধপ ধপ করে পা ফেলে আত্রেয়ীদের সামনে থেকে সিঁড়ির দিকে চলে গেল শান্তনু। বাক্সর মধ্যে থেকে বেরিয়ে এল চকচকে কাচের সুদৃশ্য বাহারি গ্লাস। ক্রিস্টালের ছোট্ট গোল চাকতির ওপর প্রিজম কাটিং ক্রিস্টাল দিয়ে লম্বা একটা ডাঁটি। তার ওপর গ্লাসের চোখটানা লম্বাটে মোলায়েম অবয়ব। খুশিতে আনন্দে দিগবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে তন্ময়কে জড়িয়ে ধরল আত্রেয়ী। উল্লাসের উত্তেজনা কানে যেতে শান্তনু চুপ করে ঘুরে তাকাল। মাথায় আগুন চড়ে গেল স্ত্রীর সঙ্গে আলিঙ্গনরত তন্ময়কে দেখে। শান্তনু দেখতে পেল, দূরে খাবার টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে পুরো ব্যাপারটা বন্দনা আর কাজের মেয়ে স্বপ্নাও খেয়াল করছে। সিঁড়িতে আরও জোরে শব্দ করে পা ফেলে উঠে গেল শান্তনু।
.
— এরপর থেকে ম্যাডামের বাড়িতে তন্ময়ের আনাগোনা লেগেই থাকত। স্যার মদ খেয়ে যেখানে-সেখানে পড়ে থাকত। মাঝেমধ্যে খবর আসত ম্যাডামের কাছে। এত বড়ো একজন নায়িকার স্বামী যেখানে-সেখানে মদ খেয়ে পড়ে আছে সেটা আত্রেয়ী ম্যাডাম কিছুতেই মেনে নিতে পারতেন না। মিডিয়া থেকে ফোনও আসতে শুরু করে। এ-বিষয়ে ম্যাডাম চিৎকার-চ্যাঁচামেচি করলে তন্ময় তাকে শান্ত করত। কখনও সেই শান্ত করার দৃশ্যটা ঘটত শান্তনুর সামনেই। তাতে আরও বেশি মাথা ঘুরে যেত শান্তনুর। এমন করে দিন কাটতে থাকে। তারপর একদিন তন্ময় আর ম্যাডাম প্ল্যান করেন নির্জন পাহাড়ি জায়গায় বেড়াতে যাবেন। অনেকদিন ধরেই যাব-যাব করছিলেন। কিন্তু কোনো-না-কোনো কাজ ঠিক এসে পড়ছিল।
— কোথায় গেলেন বেড়াতে?
বন্দনার কথার মাঝে সায়ন জিজ্ঞেস করল। অনেক মনে করেও ঠিক নামটা বলতে পারল না বন্দনা। ঠিক মনে নেই নামটা। খুব পরিচিত জায়গা নয়।’
সূর্য চাপ দিল, ‘জায়গাটা কোথায়? মানে সিকিম না ভুটান নাকি হিমাচল, উত্তরাখণ্ড!’
— হিমাচল। তন্ময়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলার সময় ম্যাডামকে এটা অনেকবার বলতে শুনেছি।
সায়ন বলল, হিমাচল তো বিশাল জায়গা। সেখানে কোথায় একটু মনে করুন না।’ দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ বুজে খানিক ভেবেও এক বর্ণ মনে পড়ল না। সোমদত্তা বলল, ‘একটা শব্দও মনে পড়ছে না? অ্যাটলিস্ট একটা লেটার!’ সোফায় বসে হাতগুলো কচলাতে কচলাতে চোখ বুজে ভাবে বন্দনা। ‘কী যেন মোর’! বন্দনা বলে। সায়ন বলে, ‘সে তো অনেক রাস্তার মোড়ই আছে। রাস্তার মোড়ে বেড়াতে গিয়েছিল?’ সূর্য বলে উঠল, ‘না স্যার, মোড় সাধারণত জনবহুল জায়গাতেই হয় জানি। তা ছাড়া হিমাচলে মোড় হবে না। ওরা চক বলে।’
— কারেক্ট। তাহলে?
— এক মিনিট স্যার।
সূর্য তৎক্ষণাৎ পকেট থেকে মোবাইল বের করে গুগুলে সার্চ দিল। কিন্তু তাতে এমন কোনো নামই বেরলো না যেখানে ‘মোর’ শব্দটি আছে। ‘সূর্য পেলে কিছু?’ সায়নের প্রশ্নে সূর্য ঘাড় নেড়ে বলল, ‘না স্যার।’
— একবার হিমাচল প্রদেশ ট্যুরিজমে ফোন কর।
— ওকে স্যার।
সূর্য ফোন করল। সেখানে প্রশ্নটা করা মাত্রই উত্তর ভেসে এল, ‘ভারমোর।’ বন্দনা মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল, ‘হ্যাঁ এই জায়গাটাই।’ বন্দনা বলতে শুরু করল, ‘ওরা ভারমোরে বেড়াতে গেল। এর ঠিক দু-দিন পর ভোরবেলা শান্তনু স্যার হঠাৎ একটা ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে গেলেন। সঙ্গে ক্যামেরার ব্যাগটাও নিতে ভোলেননি। জিজ্ঞেস করলাম, কোথায় যাচ্ছেন? বললেন, জাহান্নমে। আমি আবার বললাম, ম্যাডাম এলে যদি জিজ্ঞেস করেন কী বলব? স্যার বললেন, জিজ্ঞেস করবে না। বলেই হন্তদন্ত হয়ে চলে গেলেন। এর ঠিক দু-দিন পর ম্যাডাম ফিরে এলেন।
সোমদত্তা প্রশ্ন করল, ‘একা?’
— হ্যাঁ।
— তন্ময়বাবু?
— কলকাতা ফিরেছিলেন। কিন্তু সেদিন ম্যাডামের বাড়িতে আসেননি।
— আর শান্তনু?
ম্যাডামকে বললাম স্যারের কথা। বললেন স্যার আর এ-বাড়িতে আসবেন না। ইনফ্যাক্ট উনি কোথায় থাকবেন সেটাও ম্যাডামকে জানাননি। ওঁর সঙ্গে আর কোনো সম্পর্ক নেই ম্যাডামের।
সোমদত্তা অবাক হয়ে প্রশ্ন করল, ‘ওদের কি ডিভোর্স হয়েছিল?’
— বলতে পারব না।
সূর্য বলল, ‘তারপর থেকে শান্তনু আর কক্ষনো ফেরেননি?’
— না। ইন্ডাস্ট্রির কেউ কেউ স্যারের খোঁজ করেছিলেন। ম্যাডাম বলেছিলেন, শান্তনু কোথায় আছে কাউকে জানায়নি।
— আত্রেয়ীও খোঁজ করেননি?
উত্তরটা সায়ন দিল, ‘যার সঙ্গে সম্পর্কই নেই তার খোঁজ কেন করবেন? কিন্তু প্রশ্নটা হল অন্য জায়গায়!’ বলে একটু গলা ঝেড়ে নিল সায়ন। তারপর বলল, শান্তনু নিয়োগী কি আদৌ বেঁচে আছেন?’ বন্দনা চোখ নামিয়ে নেয়। মুখে তারও বোধহয় চিন্তার ছায়া। অন্তত সায়ন, সূর্য আর সোমদত্তার সেটাই মনে হল। সায়ন জিজ্ঞেস করল, ‘যে ক-দিন ওরা বাড়িতে ছিলেন না ততদিন আপনি কোথায় ছিলেন?’
— আমি… আমি আমার বাড়ি চলে গিয়েছিলাম।
— কোনো পুলিশ কেস হয়নি?
— না।
— একটা জলজ্যান্ত লোক উবে গেল তাকে নিয়ে কেস হল না?
— আমি যদি স্বেচ্ছায় বিবাগী হয়ে যাই আর বাড়ির লোক যদি আমায় পছন্দই না করে তাহলে কে করবে পুলিশ কেসটা?
— হুম! আচ্ছা, আত্রেয়ীরা কোন হোটেলে উঠেছিলেন?
বন্দনা সায়নের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল। বলল, ‘জানি না। আমাকে বলেননি।’
— বেশ। সূর্য শোনো…
বলে সূর্যের কানে কানে ফিশফিশ করে কীসব যেন বলল সায়ন। তারপরেই সবাইকে শুনিয়ে বলল, ‘এই কাজটা মিত্রকে করতে বলো। ডিটেলসে।’
— ওকে স্যার।
সূর্য জায়গা ছেড়ে উঠে বেরিয়ে গেল। প্রশ্নের বিরতি পেয়ে বন্দনা বলল, ‘এবার তাহলে আমি উঠি? আমার শরীর দিচ্ছে না আর।’ সায়ন আর সোমদত্তা দুজনেই একে-অপরের দিকে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল। সোমদত্তা বলল, ‘কোনো বিশেষ প্রবলেম হচ্ছে শরীরে? ডাক্তার ডাকব?
— না না। ভীষণ ক্লান্ত লাগছে। একটানা অনেকক্ষণ বসে আছি। পিঠে ব্যথা করছে।
সোমদত্তা বলল, ‘আপনি শোবেন? আমি পিলো আনিয়ে দিচ্ছি। রিল্যাক্স করে কথা বলুন কোনো অসুবিধে নেই।’ বন্দনা বিরক্ত। ‘আপনাদের এখনও আর কী জানার থাকতে পারে বলুন তো?’ সায়ন বলল, ‘ওমা! এখনও তো আসল কথাই জানা হল না। যেটা থেকে দেখে আমাদের মনে হয়েছে আপনি ভীষণভাবে আত্রেয়ী সেনের জীবনের গল্পের সঙ্গে জড়িত।’ বন্দনার মুখটা শুকিয়ে গেল। ভয় পেয়ে তুতলিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কী— কী দেখে মনে হল?’
সায়ন রহস্যময় একটা হাসি মুখে নিয়ে চেয়ারে হেলান দিল। সোমদত্তার দিকে ইঙ্গিত করল। সোমদত্তাও প্রশ্নটা করতে দেরি করল না, ‘ক-মাস চলছে?’ জেরার শুরুতেই বন্দনার সামনে যখন তন্ময়ের বাড়ি থেকে পাওয়া রিপোর্টগুলো ফেলেছিল তখনই বুঝেছিল এ নিয়েও প্রশ্ন উঠবে। তাই কোনো ভণিতা না করে বন্দনা জবাব দিল, ‘চার মাস।’
— তন্ময়বাবুর কী বক্তব্য?
বন্দনা চুপ করে থাকে। সোমদত্তা আবারও প্রশ্ন করে, ‘বিয়ে করবে?’
— সেসব নিয়ে কথা হয়নি।
— আবার মিথ্যে কথা।
— না। সত্যিই সেসব নিয়ে কথা হয়নি।
.
সায়ন সোমদত্তার দিকে একবার আড়চোখে তাকায়। তারপর পকেট থেকে নিজের মোবাইলটা বের করে। হঠাৎ সেখানে গান বেজে ওঠে। কলার টিউন, ‘আজ জ্যোৎস্নারাতে সবাই গেছে বনে।’ বন্দনার নিশ্বাসের গতি বেড়ে যায়। আত্রেয়ী ‘চোখের বালি’ ছবিতে যে গানে লিপ দিয়েছিল এ সেই গান। হাত কচলাতে শুরু করে বন্দনা। গান থামিয়ে বেশ কিচ্ছুক্ষণ পর একটা পুরুষকণ্ঠ একটু বিরক্তি নিয়েই বোধহয় বলে ওঠে, ‘হ্যালো।’ এবার মেয়ের গলা, ‘আমি বলছি।’
— কে?
— এখন গলাটাও চিনতে পারছ না? বন্দনা।
— ও শালা, এটা কার নম্বর?
গলা চিনতে এবং ফোন কলের সময়টা বুঝতে বন্দনার বিন্দুমাত্র অসুবিধে হল না। কাঁপা কাঁপা হাতে নিজের মুখ ঢেকে নেয় বন্দনা। চোখ বন্ধ করে বসে থাকে। ফোনে রেকর্ড করা কথা বাজতে থাকে। বন্দনা বলছে, ‘সে জেনে তুমি কী করবে? এতবার ফোন করছি, ফোন ধরছ না কেন?
— আরে বাবা আমি নার্সিংহোমে আছি তাই ধরতে পারিনি।
— অজুহাত রাখো তন্ময়দা। তোমার আত্রেয়ী বাঁচবে কিনা জানি না। কিন্তু আমাকে বাঁচতেই হবে। মায়ের জন্য। যে আসছে তার জন্য। একে আমি কিছুতেই
বন্দনার গলার ওপর দিয়েই তন্ময় বলে ওঠে, ‘আচ্ছা তোমার কী ধারণা বলো তো? আমি সারাদিনে কামকাজ কিছু করি না নাকি? সারাদিন তোমার ফোন রিসিভ করব বলে বসে আছি?
ঠিক তখনই দূর থেকে একটা মহিলার গলা ভেসে এল, ‘এখানে ফোন করবেন না প্লিজ। বাইরে গিয়ে কথা বলুন।’ এরপর শুধু খুটখাট শব্দ। এই ফাঁকে সূর্য আবার ইন্টারোগেশন রুমে ঢুকে আসে। ফোনে তখন আবার শুরু হয়েছে তন্ময়ের কথা। কথার প্রতিধ্বনি শুনে বোঝাই যাচ্ছে সে সিঁড়ি দিয়ে নামছে। ‘আমি বারবার একটাই কথা বলছি তোমায়, তুমি আর ফোন কোরো না। প্লিজ। দেখছ তো পুলিশি ঝামেলা চলছে। কে বলতে পারে আমার ফোন ট্যাপ করা নেই? আর সবাই সব কিছু জানলে সেটা তোমার জন্যেও খুব একটা ভালো কিছু হবে না তাই না? এখন রাখো।’
— বলো সেটা তোমার জন্য ভালো হবে না।
বন্দনার কথা শেষ হয় না। তন্ময় বলতে শুরু করে, ‘না না না। আর কোনো কথা নয়। সব সময়মতো পেয়ে যাবে। রাখছি।’
ফোন কেটে যায়। সায়নও মোবাইলটা বন্ধ করে পকেটে রাখতে রাখতে বলে, আমাদের খুব বেশি খাটতে হয়নি জানেন। তন্ময়ের মোবাইল ফোনেই কল রেকর্ডারটা অন করা ছিল। তাই আপনাদের প্রতিটা কল, প্রতিটা কথা আমাদের হেফাজতে।’ বন্দনা কোনো কথা বলে না। চুপ করে চোখ বন্ধ করে বসে থাকে। ‘বন্দনা ম্যাডাম, আমাদের কাছে কিছু লুকিয়ে লাভ নেই। এবার বলুন তো, সময় মতো কী পেয়ে যাবার কথা বলছিলেন তন্ময়বাবু? টাকা?’ মুখের সামনে থেকে আলতো করে হাত সরিয়ে বন্দনা বলে, ‘আমাদের সব কথাই যখন আপনাদের হেফাজতে তখন তো সবই জানেন। আমায় কেন প্রশ্ন করছেন?’ কড়া গলায় সোমদত্তা বলে, ‘বেশি কথা না বাড়িয়ে স্যার যা জিজ্ঞেস করছেন তার উত্তর দিন।’
— হ্যাঁ। টাকা।
জবাব দিল বন্দনা। সায়ন প্রশ্ন করল, ‘কত টাকা?’
— নির্দিষ্ট কিছু নেই। যখন যেরকম দরকার হবে। কেন? মানে সেটা কী যে আসছে তার জন্য?
— হ্যাঁ।
— আপনার কী মনে হয়? তন্ময়বাবু দায়িত্ব এড়িয়ে যাচ্ছেন?
— বুঝতে পারছি না। কিছু খোলসা করে বলছেও না। টেনশনে রাতে আমার ঘুম হয় না। যদি ও কোনো দায়িত্ব না নেয় তখন কী করব আমি?
সোমদত্তা জিজ্ঞেস করে, ‘আপনি তো ভালো করেই জানতেন যে তন্ময়বাবু আত্রেয়ী সেনের সঙ্গী। বয়সেও অনেকটা বড়ো আপনার চেয়ে। তা সত্ত্বেও এরকম একটা সম্পর্কে জড়ালেন কী করে?’
