মৃত জ্যোৎস্নার রাত্রি – ২৬
ছাব্বিশ
আজকে আকাশটা যেন ফালা ফালা হয়ে যাবে। ভোররাত থেকে সেই যে ঝাঁপিয়ে নেমেছে তার আর বিরাম নেই। কলকাতাবাসী অনেকদিন এমন বৃষ্টি দেখেনি। হাঁটুজল পেরিয়ে একটা ছাতাকে সম্বল করে আত্রেয়ীর বাড়ির গেটের সামনে এসে দাঁড়াল বন্দনা। ছাতাটা হাওয়ার তোড়ে আর বৃষ্টির এলোপাথাড়ি তাণ্ডবে বেঁকে গেছে। দু-তিনটে শিক ভেঙেও গেছে। গেটের কাছে আসতেই বন্দনা দেখে গেটের ভেতর থেকে তালা দেওয়া। ওই বৃষ্টির মধ্যে ধানুয়ার নাম ধরে ডাকতে থাকে। ধানুয়া আজ আর গেটে দাঁড়াতে পারেনি। গেটের পাশেই গুমটি ঘর করা আছে। সে সেখানেই চুপটি করে বসে বৃষ্টি দেখছিল। কখন যে চোখ লেগে এসেছে টের পায়নি বেচারা। বন্দনার ডাক কানে পৌঁছোতেই থাড়িমারি খেয়ে উঠে গেটের দিকে তাকায়। কালো রঙের ছাতাটা খুলে কোনোরকমে ছুটে আসে ধানুয়া। বন্দনা বলল, ‘তালা দিয়েছ কেন?’ চাবিটা তালার গর্তে ঘুরিয়ে দিয়ে বলল, ‘এই বারিষে যে তুমি আসবে মালুম নেহি থা।’ গেট ঠেলে ঢুকতে ঢুকতে বন্দনা বলল, ‘স্যার বাড়ি আছেন?’ ধানুয়া বলল, ‘না না, উও তো কাল কোথায় একটা গেছেন।’
— ও বাবা! তার মানে তো বাড়ি খালি। দাও চাবি দাও।’
— খোলা আছে। যাও।
— খোলা? ম্যাডাম শুটে যাননি?
হাঁ হাঁ। ম্যাডাম ভি আজ সুভা চলে গেছে। তন্ময়সাব অন্দর আছে। বৃষ্টিতে সব সাদা হয়ে গেছে। তিলেক দাঁড়ালেই একেবারে কাকভেজা হয়ে যাচ্ছে মানুষ। বন্দনারও একই দশা। নিজেই বিড়বিড় করে বলল, ‘তন্ময়দা এখানে!’ অবাক হল বন্দনা।
.
ভিজে শিক-ভাঙা ছাতাটাকে কোনোরকমে ভাঁজ করে বেলটা বাজাল। তন্ময় এসে দরজা খুলল। এরপর খানিকক্ষণ দরজার এপার-ওপার নীরবতা। তন্ময় হাঁ করে কাকভেজা বন্দনাকে দেখছে। তন্ময় তো এর আগেও বন্দনাকে দেখেছে। এইভাবে দেখার কী হল? এত ঝড়-জল মাথায় নিয়ে বন্দনা এসেছে দেখে সে কি একটু বেশিই অবাক হয়ে গেল! ‘সরুন!’ বন্দনার কথায় একটু নড়ে উঠল তন্ময়। ‘হ্যাঁ হ্যাঁ এসো এসো। আত্রেয়ী তো বলল তুমি আসবে না! তোমার মা নাকি অসুস্থ!’
— এখন বেটার আছে। আপনি বাড়িতে একা?
তন্ময় ঘাড় নেড়ে ‘হ্যাঁ’ বলল। ‘আজ মায়ের কাছেই থাকতে পারতে। এলে কেন?’ মুখের ওপর জমে থাকা বিন্দু বিন্দু জল মুছে বন্দনা বলল, ‘বেকার বাড়িতে থেকে কী করব? এখানে ম্যাডামের অনেক কাজ। সেগুলো করি। কাল থেকে বরং ম্যাডামের সঙ্গে আবার কাজে বেরোব।’
— ও।
তন্ময়ের ভাবভঙ্গি খুব একটা ভালো লাগল না বন্দনার। মুখে কিছু না বললেও ঢোকা থেকেই কেমন যেন হাঁ করে তাকাচ্ছেন ক্ষণে ক্ষণে। চুড়িদারটা গায়ের চামড়ার সঙ্গে মিশে গেছে। কাপড় ভেদ করে অন্তর্বাসের রেখা ফুটে উঠেছে। ইসসস, মাথা, বুক, পেট সব ভিজে গেছে।’ তন্ময়ের কথার সুরটা বন্দনার কানে খট করে লাগল। বন্দনা বলল, ‘ঘরে কাপড় আছে। ছেড়ে নিচ্ছি।’ আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। ভিজে পায়ের ছাপ ফেলে তরতর করে সিঁড়ির পাশ দিয়ে ঢুকে গেল নিজের ঘরে।
ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে বন্দনা। ঘরের কোনে রাখা ব্যাগটা খুলে একটা শুকনো জামা বের করে বিছানায় রাখে। ঠিক তখনই বাইরে থেকে তন্ময়ের গলা। বন্দনা বুঝতে পারে ডাইনিঙে বসেই গলা তুলে বলছে, ‘বন্দনাআআআ, টাওয়েল নিলে না তো। গায়ে জল শুকিয়ো না।’ সত্যিই তো, বন্দনা বেমালুম ভুলে গেছে। ভিজে কাপড়েই বেরিয়ে এল বন্দনা। নীচের বাথরুমে যেতে হলে ডাইনিং পেরোতে হয়। সেটা পেরোতে গিয়েই দেখে জায়গাটা খালি। তন্ময় গেল কই? এই তো ডাকল বন্দনাকে। তবে কী ওপরে চলে গেছে? যেতেই পারে। এই বাড়িতে তন্ময়কে অবাধ বিচরণের অধিকার ম্যাডামই দিয়েছে। ভাবতে ভাবতেই নাকটা সুরসুর করে উঠল বন্দনার। দু-বার হাঁচিও হল। আর দেরি না করে ঝটপট বাথরুমে ঢুকে টাওয়েলটা নিয়ে নিল। আরও তিনবার হাঁচতে হাঁচতে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করল। প্রথমে ভিজে চুড়িদারটা শরীর থেকে খুলে ফেলে। তারপর ব্রা। কোমরে বাঁধা দড়ির গিট আলগা করে প্যান্টটাও ছেড়ে ফেলে। জানলার পর্দাগুলো খানিকটা করে টানা। পুরোটা টানার দরকারও পড়ে না। বন্দনার ঘরের এপাশে ধানুয়া ছাড়া কেউ আসে না। এখন তো ঝমঝমে বৃষ্টিতে সব সাদা হয়ে আছে। ধানুয়া তার গুমটির মধ্যে সেঁধিয়ে বসে আছে। তা ছাড়া সবথেকে বড়ো আড়াল তো জানলার কাচগুলোই। প্রতিটাতে ফিল্টার লাগানো। ভেতর থেকে বাইরে সব দেখা যায়। কিন্তু বাইরে থেকে আলো রং পালটে ঘরের ভেতর এলেও মানুষ বা কোনো প্রাণীর চোখ এই কাচ ভেদ করে ঘরের ভেতর ঢুকতে পারে না। আরাম করে শুকনো টাওয়েলটা নিয়ে মাথা থেকে পা পর্যন্ত ভালো করে মুছে নিল। তারপর প্যান্টি আর ব্রা পরে বিছানা থেকে শুকনো কামিজটা যেই তুলতে গেল অমনি ছ্যাঁৎ করে উঠল বন্দনার বুক। পর্দাটা যেন নড়ে উঠল। ভালো করে তাকাতেই পলকে সরে গেল পেলমেট থেকে ঝুলে থাকা ভারী পর্দাটা। কামিজটা বুকে চেপে দু-পা পিছিয়ে গেল বন্দনা। ‘এ কী তন্ময়দা! এ কী করছেন আপনি?’
তন্ময় ঠোঁটে বাঁকা হাসি হেসে মোবাইলটাকে প্রায় নগ্ন বন্দনার দিকে তাক করে এগোতে থাকে। বন্দনা থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে গলা তুলে বলে ওঠে, ‘এ কী অসভ্যতা! কেন ঢুকেছেন আমার ঘরে?’ তন্ময় নির্বিকার চিত্তে উত্তর দেয়, ‘ফটোগ্রাফি করতে।’ বন্দনা আবার বলে, ‘আমি কিন্তু চিৎকার করে লোক ডাকব। বন্ধ করুন ক্যামেরা।’ এবার মুখের সামনে থেকে মোবাইল সরায় তন্ময়। গোবেচারার মতো মুখ করে তন্ময় বলে, ‘তাতে তোমারই ক্ষতি। এই ভিডিয়ো ভাইরাল হয়ে যাবে।’ দাঁতে দাঁত চেপে বন্দনা বলে, ‘এই ভিডিয়োতে আপনারও নাম আছে তন্ময়দা। ভিডিয়োটা কে করছে সেটাও জেনে যাবে সবাই।’ খিকখিক করে দু-পাশে ঘাড় দুলিয়ে তন্ময় বলে, ‘বোকা মেয়ে। অ্যাদ্দিন ইন্ডাস্ট্রিতে থেকেও এডিট কাকে বলে জানো না?’ দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায় বন্দনার। অঝোরে কেঁদে ফেলে। তন্ময় লোলুপ দৃষ্টি নিয়ে জিভ দিয়ে ঠোঁট চাটতে চাটতে এগিয়ে আসে বন্দনার দিকে। দম বন্ধ-করা আতঙ্কে বন্দনার চোখদুটো ছোটো হয়ে যায়।
ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেলে বন্দনা। কান্নার দমকে শরীরটাও তার কাঁপতে থাকে। সোমদত্তা দাঁতে দাঁত চেপে বলে ওঠে, শালা, খানকির ছেলে।’ বলেই খেয়াল হয় সামনে সায়ন আর সূর্য বসে আছে। বেশ অপ্রস্তুতে পড়ে বলে, ‘অ্যাম সরি স্যার।’
— কেন? যে যা তাকে তুমি সেটাই বলেছ। এতে লজ্জা পাওয়ার তো কিছু নেই।
বিকারহীনভাবে উত্তর দেয় সায়ন। গলাটা আরও ধরে গেছে সায়নের। সূর্য বলে, ‘তার মানে তন্ময় শুধু ভালো ডিওপিই নয়, দুর্দান্ত রেপিস্টও।’ বন্দনা এবার নিজেই মুখ খোলে। বলে, ‘এরপর থেকে ওই ভিডিয়োটা ভাইরাল করে দেবার ভয় দেখিয়ে বারবার আমার সঙ্গে সহবাস করেছে তন্ময়। ম্যাডাম পারসোনাল কাজে কোথাও গেলেই বাড়িতে চলে আসত। আমার বাধা দেবার কোনো রাস্তাই ছিল না। আমি মুখ বুজে সহ্য করি সব।’ সোমদত্তা জিজ্ঞেস করে, ‘এই শারীরিক সম্পর্কটা আপনাদের কতদিনের? সরি, মানে আমাকে এই প্রশ্নটা করতেই হচ্ছে।’ মুখ নীচু করে বন্দনা বলে, ‘বছর দুয়েক।’
— আপনারা কি সন্তান চেয়েছিলেন?
— না।
— তাহলে তো প্রিকোশন নিতে পারতেন।
— তন্ময় নিত। কিন্তু একদিন ওর ফ্ল্যাটে আমায় জোর করে মদ খাইয়ে দেয়। আমার নেশা হয়ে যায়। সেদিন ও বোধহয় নেয়নি। আমিও কিছু বুঝতে পারিনি।
কেঁদে ফেলে বন্দনা। দু-চোখে হাত চাপা দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে, যখন বুঝলাম, তখন সব…।’
সোমদত্তা একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। সায়ন বলে ওঠে, ‘আপনি তো স্বেচ্ছায় তন্ময়বাবুর ফ্ল্যাটে যেতেন। বেশ মুখটুক ওড়না দিয়ে ঢেকে। ওই যেমন নার্সিংহোমে দেখতে গিয়েছিলেন।’
বন্দনার কান্না থেমে যায়। চোখের ওপর থেকে হাত সরিয়ে অবাক হয়ে বলে, ‘কে বলল আপনাদের?’
সায়ন ফিক করে হাসল। সূর্য বলল, ‘সিসিটিভি। আপনি এই শেষ ছয়মাসে কতবার কোন কোন সময়ে তন্ময়ের ফ্ল্যাটে গেছেন সব ছবি আমাদের কাছে আছে। ইনফ্যাক্ট সেখানেই আপনাকে প্রথম দেখলাম। শিয়োর হলাম, আপনিই বন্দনা দত্ত।’
সিসিটিভি ফুটেজে মানুষের শরীর দেখা যায় শুনেছি। মনটাও যে দেখা যায় জানতাম না। আমি স্বেচ্ছায় না অনিচ্ছায় যাই সেটাও সিসিটিভি দেখিয়ে দিল?
সায়ন, সূর্য আর সোমদত্তা একটা ব্যাপার বেশ স্পষ্ট বুঝতে পারে, বন্দনা যতই ক্ষণিকের আবেগে ভেঙে পড়ুক, কান্নাকাটি করুক, ভেতর থেকে ভীষণ শক্ত। নইলে কান্নায় ভেঙে পড়ার পরেই কেউ ট্যাকস ট্যাকস করে জবাব দিতে পারে না।
— বাচ্চাটা আসার পর তন্ময়বাবুর কী রিঅ্যাকশন? অ্যাবরশনের কথা বলেননি?
সূর্য জিজ্ঞেস করল। বন্দনা বলল, ‘বলেছিল। আমি করতে চাইনি।’
— কেন?
— আপনি বুঝবেন না। শরীরের মধ্যে আমারই একটা প্রাণ বেড়ে উঠছে, ক-দিন পরে ছোট্ট ছোট্ট হাত-পা নেড়ে সে আমারই গর্ভে খেলবে। আমিও কারও মা হব। এই ভাবনাগুলো যখন মাথায় ভিড় করে তখন ভীষণ, ভীষণ আনন্দ হয়। সমাজ সংসার লোকলজ্জা সব মিথ্যে মনে হয়। নিজের সন্তানকে কী করে মারব আমি?
ঝুলন্ত আলোটায় মুহূর্তে যেন পালটে গেল বন্দনার মুখ। সায়নের মনে হল, বন্দনা তার সন্তানের মুখ দেখার জন্য অধীর অপেক্ষায় দিন গুণছে। এই কথাগুলো বন্দনা নয়, তার মাতৃত্ব বলছে। পরক্ষণেই নিজের গায়ের খাকি পোশাকটা যেন কামড়ে উঠল। সত্যি-মিথ্যে বিচার না করেই কি তার মনটা দ্রবীভূত হয়ে গেল! পলকের দুর্বলতায় কেন সে সোনাইয়ের মুখটা দেখতে পেল? না না, সে যখন আইনের বর্ম গায়ে চড়িয়েছে তখন তাকে কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে অনুসন্ধান চালিয়ে যেতে হবে। কারণ মুহূর্তের আবেগ অনেক সত্যিকে আড়াল করে দিতে পারে। নিজেকে একটু ঝেড়ে নিয়ে চেয়ারে সোজা হয়ে বসল সায়ন। ভাঙা ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলল, ‘মাতৃত্ব! নাকি প্রতিশোধ?’ কথাটা শুনে বন্দনা হকচকিয়ে গেল। ‘মানে?’ সায়ন ব্যাপারটা পরিষ্কার করে বলল, ‘মানেটা খুব সহজ বন্দনা ম্যাডাম। লুকিয়ে রেকর্ড করা ভিডিয়োর ভয় দেখিয়ে তন্ময় আপনার সর্বনাশ করেছে। এবার ঘুঁটি আপনার হাতে। এখন এই বাচ্চাটাকে শিখণ্ডী করে আপনি তন্ময়ের সর্বনাশ করবেন। মানে জাস্ট ব্ল্যাকমেল করে অনেক টাকা কামিয়ে নেওয়া এই আর কী।’
— যদি সত্যি সেটা করেই থাকি। অন্যায় করেছি কি? নিজের সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে যদি টাকা চাই-ই, তাহলে অন্যায়টা কোথায়?
—কাউকে কোনো পরিস্থিতিতে ব্ল্যাকমেল করাটা সর্বদাই অন্যায়। তন্ময়বাবুও একই দোষে দোষী। কিন্তু কেউ কাউকে খুন করেছে বলে সেই খুনিকে যদি আপনি খুন করে বলেন খুনিকে খুন করেছি তাই আমি অপরাধী নই, সেটা তো হয় না বন্দনা ম্যাডাম।
এই সময় সোমদত্তা সায়নকে উদ্দেশ করে বলল, ‘তার থেকে আমার আরও একটা খটকা লাগছে স্যার।’
— কী খটকা?
— বন্দনা সন্তান স্নেহে এতটাই বিভোর যে সে সমাজ, সংসার, লোকলজ্জা কিচ্ছু কেয়ার করছেন না। ভেরি গুড। একজন মায়ের এটাই হয়। কিন্তু তাহলে তিনি কেন তার মা-কে এই কথাগুলো জানাননি?
— গুড পয়েন্ট। কী বন্দনা ম্যাডাম! উত্তর দিন।
সোমদত্তা প্রশ্নটা করা মাত্রই চমকে ওঠা বিদ্যুতের মতো তাকাল বন্দনা, ‘আপনারা এই নিয়েও মায়ের সঙ্গে কথা বলেছেন?’
— না। এখনও বলিনি। কিন্তু আপনি বলেননি কেন? দু-দিন বাদে তো জানতেই পারবেন।
একটু যেন নিশ্চিন্ত হল বন্দনা। বেরিয়ে আসা ভয়টাকে সামলে নিয়ে বলল, মায়ের সঙ্গে কথা না বলেই বুঝে গেলেন যে মা এই ব্যাপারটা জানে না!’
সোমদত্তা হাসল। বলল, ‘মা যদি জানত তাহলে প্রেগনেন্সির রিপোর্ট, সোনোগ্রাফি এইসব কেন তন্ময়বাবুর বাড়ির আলমারিতে লুকিয়ে রাখতে গেলেন? বাড়িতেই তো রাখতে পারতেন।’
তিনদিক দিয়ে তিনটে কাঁকড়াবিছে যেন কামড়ে ধরেছে বন্দনাকে। কোথায় পালাবে কিচ্ছু বুঝতে পারছে না। বন্দনার উত্তর আসার আগেই টেবিলের ওপর আছড়ে পড়ল সূর্য-র কথা, ‘প্লিজ, এবার যেন দয়া করে বলবেন না যে আপনার বাড়িতেও রিপোর্টের কপি আছে। তাহলে এখুনি আপনার বাড়ি সার্চ করতে যাওয়া হবে আর নয় তো আপনার মা-কে ফোনে ধরা হবে।’
চেয়ারে বসেই বন্দনা ছটফট করতে থাকে। ‘আমি আর আপনাদের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারছি না। আপনারা কেন বিশ্বাস করছেন না। প্লিজ এবার আমায় ছাড়ুন।’
— এড়িয়ে যাবেন না। মা-কে কেন জানাননি?
কড়া গলায় আবার একই প্রশ্ন করল সোমদত্তা। বন্দনা একটা দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে সামনের দিকে ঝুঁকে বলল, ‘মায়ের বয়স হয়েছে। সুগার প্রেসার হাজারটা অসুখ। হার্টের অবস্থাও ভালো নয়। এই কথা জানলে জানি না মা কীভাবে রিঅ্যাক্ট করবে। তাই বলিনি। মা কিছু একটা সন্দেহ তো করেই। চোখের তলায় কালি, থেকে থেকে ক্লান্ত হয়ে পড়া এইসব দেখে বারবার বলে আমায় ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে। আমি এড়িয়ে যাই।’
— কিন্তু এটা তো লুকিয়ে রাখার…
সোমদত্তার কথার ওপর দিয়েই মাথা ঝাঁকিয়ে চিৎকার করে উঠল বন্দনা। ‘জানি না জানি না জানি না। আমি কিচ্ছু জানি না। যখন জানবে তখন মায়ের কী অবস্থা হবে আমি কিচ্ছু জানি না। এবার প্লিজ আমায় ছাড়ুন। আমার শরীর আর পারমিট করছে না বিশ্বাস করুন। পারছি না আমি আর। পারছি না।’ কান্না-জড়ানো গলায় কথাগুলো বলতে বলতে টেবিলের ওপর কপাল ঠেকিয়ে দেয় বন্দনা। ফুলে-ফেঁপে ওঠা কান্নার দাপটে শরীরটা কাঁপতে থাকে।
সোমদত্তা বন্দনার দিকে জল এগিয়ে দেয়। কিছু খাবে কিনা জিজ্ঞাসা করায় বন্দনা ঘাড় নেড়ে ‘না’ বলে। সায়ন শান্ত স্বরে বলে, ‘আপাতত আর-একটা কথা আপনার কাছ থেকে জানার আছে।’ ঠোঁটের কষ বেয়ে গড়িয়ে পড়া জল মুছে বন্দনা সায়নের দিকে তাকায়। সায়নও কিছুক্ষণ নীরব থেকে বন্দনার চোখের ভাষা পড়ে ফেলার চেষ্টা করছিল। এই মুহূর্তে বন্দনার দু-চোখে ভীষণরকম বিরক্তি প্রকাশ পাওয়ার কথা কিন্তু জল ভরা লালচে দুটো চোখ থেকে এত ভয় কেন উপচে পড়ছে বন্দনার? সায়ন জিজ্ঞেস করে, ‘আজ থেকে প্রায় মাসখানেক আগে আত্রেয়ী সেনের কাজ ছেড়ে দেন আপনি। কেন?’
হাত কচলাতে কচলাতে বন্দনা বলে, ‘আমার এই অবস্থার কথা ম্যাডামকে বলা সম্ভব ছিল না। তাই আমিই ম্যাডামকে জানাই, যে আমি আর এই কাজ করতে চাই না। ম্যাডাম ভাবেন আমি বোধহয় অনেক বেশি টাকায় অন্য কারুর কাজ পেয়েছি। তখন আমি বলি আমার শরীর ভালো নয়। লিভার আর কিডনির সমস্যা। প্রচণ্ড ক্লান্তি লাগে। ডাক্তার বেড রেস্ট নিতে বলেছেন। তা ছাড়া আমি আর এই ধরনের কোনো কাজই করতে চাই না। ভাবছি ট্র্যাক চেঞ্জ করব। ম্যাডাম তা-ও ছাড়ছিলেন না। জিজ্ঞেস করলেন, কী কাজ করতে চাই আমি। আমি বললাম, সেটা সুস্থ হওয়ার পর ডিসাইড করব। অগত্যা উনি আমায় ছাড়তে বাধ্য হলেন।’
— এগুলো নিশ্চই তন্ময় আপনাকে শিখিয়ে দিয়েছিল?
বন্দনা চুপ থেকে ঘাড় নাড়ে শুধু। সোমদত্তা জিজ্ঞেস করে, ‘তার মানে আপনার সংসারটা এখন তন্ময়বাবু চালান, তাই তো?
— হ্যাঁ।
— আপনি যে আত্রেয়ী সেনের কাজ ছেড়েছেন আপনার মা জানেন?
— জানেন।
— মা কখনও প্রশ্ন করেননি যে কাজ ছেড়েও টাকা পান কোথা থেকে।
— মা জানে আমি ইন্ডাস্ট্রিতেই ফ্রিল্যান্স করি।
— কিন্তু তার জন্য তো আপনাকে কাজে বেরোতে হয়। বেরোন?
— মাঝে মাঝে। আর কত প্রশ্ন আছে আমায় একটু বলবেন প্লিজ। আমি জাস্ট আর পারছি না। এবার আপনারা একটা প্রশ্ন করলেও আমি আর জবাব দেব না। তাতে জেলে দেবেন আমায়? দিয়ে দিন। আমি আর একটা প্রশ্নেরও উত্তর দেব না।
হেলান দেওয়া অবস্থা থেকে সায়ন সোজা হয়ে বসল। বলল, ‘বেশ। আজকের মতো আপনার ছুটি। কিন্তু একটা কথা মনে রাখবেন, আমাদের আবার প্রয়োজন হলে আপনাকে ডেকে পাঠাব। আর তখন কিন্তু আপনি আসতে বাধ্য। উত্তর দিতেও বাধ্য। আর আত্রেয়ী সেনের কেস যতদিন না মিটছে স্টেশন লিভ করবেন না।’
— ওকে। থ্যাংকস।
বলে সবে চেয়ার ছেড়ে উঠতে যাচ্ছিল বন্দনা, সায়ন বলল, ‘আর-একটা কথা, এবার থেকে নার্সিংহোমে গেলে মুখ ঢেকে যাবেন না।’ বন্দনা খুব আলতো করে মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়।
.
বুক চাপড়ে হাপুস নয়নে কাঁদছে আবদুলের বউ। কতগুলো মেয়ে-বউ তাকে ধরে রাখার চেষ্টা করছে। সামনেই আপাদমস্তক ঢেকে শোয়ানো আবদুলের শরীরটা। মুখ দেখাতে গেলে তো আবদুলকে উপুড় করে শোয়াতে হত। জানা নেই, ডাক্তাররা পিঠের দিকে ঘুরে যাওয়া মুখটাকে আবার সোজা করতে পেরেছেন কিনা। এই সুযোগে রিপোর্টার পুলিশের গুষ্টির ষষ্ঠীপুজো করে ছাড়ছে। টিভিতে খবরটা দেখতে দেখতে চোখ বন্ধ করে মাথাটা নীচু করে ফেলে সায়ন। রিপোর্টার তো ঠিক কথাই বলেছে। পুলিশ যদি তার কাছের মানুষ, তার কনস্টেবলদেরই সুরক্ষা না দিতে পারে তাহলে সাধারণ মানুষের কী হবে?
— এবার বাড়ি যান স্যার। শরীরে এত ধকল কিন্তু আর সইবে না।
সূর্যের কথার ওপর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে টিভির দিকে তাকায় সায়ন। পাশ থেকে সোমদত্তা বলে ওঠে, ‘কমিশনার তো বলেছেন ওপরমহলকে সামলে নেবেন। এতক্ষণে নিয়েছেনও। কিন্তু এই রিপোর্টারগুলো যে কী করে খবর পায় বুঝি না।’
— ওরা তো ওদের কাজ করবেই সোমদত্তা। আমিই আমার দায়িত্ব সামলাতে অপারগ। আমার জন্যেই আজ একটা অল্পবয়সি মেয়ে তার স্বামীকে হারাল।
বুকের ভেতর আপশোশ, দুঃখ, ক্ষোভ জমতে জমতে গম্ভীর স্বরে বেরিয়ে এল সায়নের গলা দিয়ে। অমনি সূর্য ব্যাপারটাকে সামাল দেবার জন্য বলে উঠল, ‘এখানে আপনার কিচ্ছু করার নেই স্যার। এসব নিয়ে আর আপনি ভাববেন না। চলুন আপনাকে আমি বাড়ি ছেড়ে দিয়ে আসি।’ কথাটা বলামাত্রই সায়ন ঝপ করে সূর্যের কাঁধে হাত রেখে বলে ওঠে, ‘না না, একদম না। তুমি বাড়ি যাও। আমি ক্যাব বুক করে আজ বাড়ি যাব।’
— কী বলছেন স্যার? আমাদের গাড়ি থাকতে…
— প্লিজ সূর্য। আমি একাই যাব।
সায়নের মুখের ওপর আজ অবধি সূর্য কোনো কথা বলেনি। সূর্য বুঝতে পারল সায়নের আতঙ্কের কারণ। গতরাতে আবদুল ওকে বাড়িতে পৌঁছে দিতে গিয়েই বেঘোরে প্রাণ হারায়। সায়ন ভাবছে আবার যদি সায়নের কারণে সূর্যের কোনো ক্ষতি হয়। সায়নের আপত্তি সত্ত্বেও সূর্য আবার বলল, ‘স্যার, আপনি যে ভয় পাচ্ছেন সেটা কিন্তু অন্য যে-কোনো মানুষের হতে পারে।’
— হোক। তবু তুমি যাবে না।
