মৃত জ্যোৎস্নার রাত্রি – ২৮
আটাশ
— মহিলার মধ্যে একটা আলাদা ব্যাপার আছে কিন্তু। কে বলবে এত বয়স!
বালিগঞ্জ থানার ওসি অবনীশের মুখ থেকে কথাটা বেরিয়েই এল। পাশে দাঁড়িয়ে সায়ন কিন্তু এখনও চুপ। বেশ খানিকক্ষণ ধরে সিঁড়ির চাতালে টাঙানো আত্রেয়ীর বিশাল ছবিটা এক দৃষ্টে দেখে চলেছে সায়ন। অবনীশ বেশ অবাক হয়েই বলল, ‘কী দেখছেন বলুন তো সায়নবাবু? কোনো ক্লু পেলেন নাকি?’ এরপরেও সায়ন অবনীশের দিকে তাকাল না। আত্রেয়ীর ছবিটার দিকে তাকিয়েই বলল, ‘আচ্ছা অবনীশবাবু, আপনার কী মনে হয়, এই ছবিটা ঠিক কত ফুট উঁচু?’ দুম করে এমন একটা প্রশ্নের তল খুঁজে না পেয়ে একটু ভেবে অবনীশ বলল, ‘তা ধরুন ফুট বিশেক তো হবেই।’ তক্ষুনি সায়ন আবার পালটা প্রশ্ন করে, ‘আর একটা সাধারণ মানুষ খুব বেশি হলেও কত লম্বা হতে পারে?’
— ম্যাক্সিমাম সাড়ে ছয় ফুট থেকে সাত ফুট।
‘ভেবে দেখুন’ বলে অবনীশের দিকে তাকিয়ে বাকি সন্দেহটা উগরে দিল সায়ন, ‘একজন ছয়-সাত ফুট মানুষ একটা বিশ ফুট উঁচু ছবির এক কোণ থেকে আর-এক কোণ পর্যন্ত লাল মার্কার দিয়ে লম্বা করে দাগ টানল। এবং সেটা ছবির দু-দিক দিয়েই। কীভাবে সম্ভব বলুন তো?’ সায়নের কথা শুনে অবনীশ বেশ অবাক। আত্রেয়ীর বিশাল ছবিটার দিকে আরও একবার ভালো করে চেয়ে দেখল অবনীশ। মই ব্যবহার করতে পারে?’
— বেশ, ধরে নিলাম মই ব্যবহার করেছে। তবু প্রশ্ন হল, মইটা কত বড়ো? আর যদি মই হয়ও তাহলে মানুষের হাত ওপর থেকে খানিকটা নীচ পর্যন্ত নেমে থেমে যাবে। কারণ মইয়ের ওপরে দাঁড়িয়ে নীচ পর্যন্ত তাঁর হাত পৌঁছোবে না। মাঝ সিঁড়িতে নেমে যদি লাইন টানেও তাহলে সেই লাইন সোজা হওয়া উচিত। কখনোই কোনাকোনি যাবে না। অতএব সে মইয়ের ওপরের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে লাইন টানা শুরু করল এবং মাঝপথে থেমে গেল। এরপর সে নেমে এল। এসে আবার সেই থেমে যাওয়া অংশ থেকে লাল দাগ কাটা শুরু করে নীচের দিকে এল। সেক্ষেত্রে দুটো লাইনে জয়েন্টের চিহ্ন থাকবে। আপনি ভালো করে লক্ষ করুন অবনীশবাবু, এই লাইনগুলো একবারে টানা হয়েছে। কোথাও কোনো জয়েন্টের চিহ্ন নেই। কী এমন হল যে আত্রেয়ীর ছবিতে এইভাবে ক্রস চিহ্ন এঁকে দিল। তার মানে ধরে নিতে হবে যে, যার আত্রেয়ীর ওপর প্রচণ্ড রাগ সে-ই এ কাজ করেছে। কিন্তু সে কে? সে কী কোনো সাধারণ মানুষ? যদি তা-ই হয় তাহলে এমন অসম্ভব একটা কাজ সামান্য মার্কার পেন দিয়ে কী করে করল? এটা তো নিশ্চিত যে, এই কম্মো আত্রেয়ী থাকাকালীন হয়নি। আত্রেয়ী শুটিঙে বেরিয়ে যাবার পর হয়েছে। আত্রেয়ী না-থাকাকালীন তন্ময়বাবু আর দাদাভাই মানে মিহির সরখেল এই বাড়িতে এসেছে। আমরা দুজনেই তাদের চাক্ষুষ দেখেছি। তাদের কত হাইট সেটাও দেখেছি। তাই কোনোভাবেই তাদের দুজনের পক্ষে এটা করা সম্ভব নয়। তাই না? বাকি রইল ধানুয়া। যার কাছে এই বাড়ির ভেতরে ঢোকার চাবি নেই। সেটা আপনাদের কাছে গচ্ছিত। আর তার হাইটও খুব বেশি হলে পাঁচ ফুট দুই কী তিন। অতএব এরা কেউ না।
এক দমে কথাগুলো সাজিয়ে বলে গেল সায়ন। এবার সায়নের কথার ওপর দিয়ে অবনীশ বলে উঠল, ‘তার মানে আরও অন্য কোনো ব্যক্তি আছে যার কাছে এই বাড়ির চাবি আছে?’
— অথবা নেই।
সায়ন বলল অবনীশের চোখে চোখ রেখে।
— মানে? তাহলে এ কাজ কে করল?
সায়ন গম্ভীর হয়ে বলল, ‘আপনি একটা শব্দ স্কিপ করে যাচ্ছেন অবনীশবাবু।’ অবনীশ ভ্রূ কুঁচকে তাকাল। সায়ন বলল, ‘তাহলে এই অসম্ভব কাজ কে করল! এইখানে ‘অসম্ভব’ শব্দটা ভীষণ জরুরি। একটা নয়। পরের পর এমন বেশ কিছু অসম্ভব ঘটনা আমাদের চারপাশে ঘটেছে খেয়াল করুন। শুটিঙের নিতান্ত নিরীহ ক্যাটারারের লোক বৃষভানু নৃশংসভাবে খুন হল। তার গলাটা কেউ হাতের চাপে হাড়-মাংস মিশিয়ে চিপে সরু করে দিয়ে গেছিল। মুণ্ডুটা শুধু ছিঁড়ে যায়নি এই যা। সেটা দেখল খাবার দোকানের তেঁতুল ওরফে পিন্টু ঘোষ। তার বয়ান অনুযায়ী লোকটার চোখদুটো ধবধবে সাদা। কোনো মানুষের চোখ এমন হয় না যদি না সে লেন্স পরে থাকে। যদিও সে লেন্সের ট্রেস আজ অবধি কেউ পাইনি। তারপর আপনার এলাকায় একটা রাস্তার কুকুরের ধড়-মুণ্ডু কেউ ছিঁড়ে আলাদা করে দিয়ে গেল উইদাউট এনি মোটিভ। এরপর খাবারের দোকানের তেঁতুল হাইটেনশনের তার ছিঁড়ে তাতে পেঁচিয়ে মরে গেল। জনমানবহীন রাতের রাস্তায় আমার গাড়ির ড্রাইভার আবদুলের মুণ্ডুটা জাস্ট ঘুরে পিঠের দিকে হয়ে গেল। সিসিটিভির ফুটেজ ওই সময়টুকু রেকর্ড করতে ব্যর্থ হল। পরে কাউকে দেখা গেল না শুধু আমার ছোটাছুটি আর আবদুলের লাশ ছাড়া। মিহির সরখেল দাগি পালোয়ান আসামির মতো লোহার গরাদ বেঁকিয়ে সবার চোখের আড়াল দিয়ে বেরিয়ে এল এবং ভীষণ কম সময়ে বোলপুর থেকে কলকাতায় চলে এল।’
— দাঁড়ান দাঁড়ান। এ তো ঘেঁটে ঘুগনি হয়ে যাবার দশা।
— শুধু এটাই নয় অবনীশবাবু। কাল নিজেদের বাড়িতে মিহির সরখেলের স্ত্রী আর সন্তান প্রায় পুড়ে মড়ার হাত থেকে বেঁচেছে।
— কী বলছেন? কী করে?
— রাতে বউদিকে ছাদের কার্নিশের ওপর থেকে টেনে নামানো হয়। ও তিন বছরের ছেলেকে কোলে নিয়ে নাকি দাঁড়িয়েছিল।
— আমি না কিচ্ছু বুঝতে পারছি না।
.
সায়ন আজ ভোরেই নীলাম্বর, মৃন্ময়ী আর মুনাইয়ের কাছ থেকে সব শুনেছে। তখন কাকও ডাকেনি ওরা তিনজন এসে হাজির। সায়ন তো বেশ টেনশনে পড়ে গিয়েছিল। তখনই সবটুকু শোনে, জানে। সেই সম্পূর্ণ ঘটনাটাই অবনীশকে জানায় সায়ন। অবনীশ থম মেরে সিঁড়ির রেলিঙে শরীরটাকে ঠেসিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। খানিক ভেবে সায়নের দিকে বিস্ময়ভরা চোখ তুলে অবনীশ বলে, ‘আত্রেয়ী সেনের হত্যা রহস্য কি তবে অলৌকিক?’
— তার সম্ভাবনা শতকরা পঁচানব্বই ভাগ। কিন্তু তা-ও প্রশ্ন থেকে যায়, সে কে?
— কিন্তু আইন তো এসব মানে না সায়নবাবু।
অফিসিয়ালি না মানলেও আনঅফিসিয়ালি মানতে বাধ্য। অন্তত ‘তেরো নম্বর ফ্লোর’-এর কেসটায় আমার সেই অভিজ্ঞতাই হয়েছে। আমিও কিছু মানতাম না অবনীশবাবু। কিন্তু আমি নিজে চোখের সামনে তিলোত্তমার আত্মাকে দেখেছি। তার অলৌকিক ভয়ানক কাণ্ড চাক্ষুষ করেছি এবং ওই আত্মার দেওয়া ক্লু ধরেই শয়তান বরেন রায়কে গ্রেপ্তার করতে পেরেছি। যে আজও জেল খাটছে। তখনও এই নীলাম্বর ব্যানার্জি তার তন্ত্র-মন্ত্রের দ্বারা অসম্ভব কাজ সম্ভব করেছিলেন।
অবনীশ প্রশ্ন করে, ‘নীলাম্বর কি তান্ত্রিক?’
— বেসিক্যালি প্যারানরমাল অ্যাক্টিভিটি নিয়ে কাজ করেন। তন্ত্রও জানেন। ওঁর বাবা কিংবা দাদু অঘোরী সাধক ছিলেন।
অবনীশ একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। সায়নকে জিজ্ঞেস করে, ‘আচ্ছা সায়নবাবু, আত্রেয়ী সেনের হাজব্যান্ড কোথায়? জানেন কিছু?’
সায়ন উত্তর দেবার আগেই সিঁড়ির দিকে চোখ পড়ল। নীচ থেকে উঠে আসছে দুজন কনস্টেবল। ‘কী ব্যাপার কিছু পেলে?’ সায়ন প্রশ্ন করল। একজন এগিয়ে এসে বলল, ‘তেমন কিছু না স্যার। শুধু খাটের নীচে এটা পেয়েছি।’ সায়নের দিকে হাতের তালু বাড়িয়ে দিল কনস্টেবল। গ্লাভস পরা হাতের তালুর ওপর একটা সাদা রঙের ট্যাবলেট। সায়ন আর অবনীশ দুজনেই দ্যাখে। কিন্তু বোঝা যায় না এটা ঠিক কীসের ওষুধ। অবনীশ জিজ্ঞেস করে এর সঙ্গে কোনো ওষুধের পাতা পাওয়া গেছে কি না। কনস্টেবল জানাল যে, তারা ওষুধের কোনো পাতা পায়নি। ‘এখুনি ল্যাবে পাঠাবার ব্যবস্থা করো।
— ওকে স্যার।
— শোনো।
কনস্টেবল দুজন যেতে গিয়েও ফিরে তাকাল। সায়ন বলল, ‘এটা কোন ঘর থেকে পেয়েছ?’ একজন আঙুল নির্দেশ করে একতলার সিঁড়ির পাশের একটা ঘরের দিকে দেখিয়ে চলে গেল। পকেট থেকে মোবাইল বের করল সায়ন।
— হ্যালো ধানুয়া। আমি সায়ন বলছি… বলছি তোমার ম্যাডামের বাড়িতে একতলায় সিঁড়ির ডানদিকের যে ঘর ওটাতে কে থাকত? কে? তুমি ঠিক জানো? ঠিক আছে।
ফোনটা কেটে দেয়। সায়নের ভ্রূ কুঁচকে যায়। অবনীশ জিজ্ঞেস করে কে থাকত ওই ঘরে? সায়ন বলে, ‘বন্দনা। আত্রেয়ী সেনের পিএ।
— আপনি তাকে জেরা করেছেন না?
— হুম।
সায়ন ভ্রূ কুঁচকে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর বলল, ‘চলুন ওপরটা একটু ভালো করে দেখি।’
.
ঝামেলাটা বেশ জোরদার লেগেছে। অনেকটা দূর থেকে একদল লোকের হম্বিতম্বি শোনা যাচ্ছে। দু-একটা মহিলার গলাও তীক্ষ্ণ স্বরে আপার অক্টেভে সুর ধরেছে। মর্গের কাছাকাছি এসে একটু থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন নীলাম্বর। এগোনোটা ঠিক হবে কিনা বুঝতে পারছেন না। মর্গের প্রবেশদ্বার আটকে একদল লোক প্রচণ্ড বচসা জুড়েছে। তার তীব্রতা এতটাই যে হাতাহাতি হলেও হতে পারে। ছেঁড়া-ছেঁড়া যেটুকু কথা উড়ে ভেসে নীলাম্বরের কানে এসে পৌঁছোচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে লাশকাটার টাকা দেওয়া-নেওয়া নিয়ে কোনো ঝামেলা। নাহ্! কাছে না গিয়ে একবার ফোনটা করেই দেখি, এই ভেবে পকেট থেকে মোবাইল বের করে একটা নম্বর ডায়াল করলেন। ‘হ্যালো আমি নীলাম্বর বলছি… অ্যাঁ কী?।’ ফোনের মধ্যে থেকেও চ্যাঁচামেচির আওয়াজ ভেসে আসছে। আবার এদিকে বাইরে থেকেও হইচই। অগত্যা ডান কানে মোবাইল ধরে বাঁ-কানটা আঙুল দিয়ে চেপে ধরে ওপারের গলাটা ভালো করে শোনার চেষ্টা করলেন নীলাম্বর।
— ও, ওকে। আচ্ছা। কোনদিক দিয়ে?
কথাটা বলে মুখ তুলে এদিক-ওদিক দেখতে দেখতে খানিকটা সামনের দিকে হেঁটে গেলেন। তারপর কান থেকে ফোন নামিয়ে ঝামেলা অধিকৃত অঞ্চলটা এড়িয়ে মর্গের পেছনের দিকটায় গেলেন। সেদিকে একটা বন্ধ বড়ো দরজার গায়ে ছোট্ট পাল্লাটা খোলা ছিল। সেখান দিয়ে মাথা গলিয়ে মর্গের চৌহদ্দিতে ঢুকে পড়লেন। দু-একটা মর্গের লোক এদিক-ওদিক থেকে ব্যস্তসমস্ত হয়ে ছোটাছুটি করছে। পাঁচিলের এক কোণে গিয়ে চুপ করে দাঁড়ালেন। এর মধ্যেই স্ট্রেচারে করে দুটো লাশ আপাদমস্তক প্যাকেটে মুড়ে উলটোদিকের দরজা দিয়ে ঢুকে পেছন দিয়ে ভেতরে চলে গেল। আশপাশটা যখন জনশূন্য তখন দূর থেকে একটি লোক নীলাম্বরের দিকে একটু দ্রুত পায়েই এগিয়ে আসছে। রোগা, কালো। পরনে ময়লা শার্ট, নীল ডোরাকাটা ট্রাউজার। ফুক ফুক করে বিড়ি ফুঁকছে। নীলাম্বরের সামনে আসার আগে বিড়িটা মাটিতে ফেলে পা দিয়ে ঘষে দিল। নীলাম্বর কয়েক পা এগিয়ে গেল লোকটির দিকে। লোকটা রোগা-পাতলা হলেও গাল দুটো ভরাট। চুলে অল্প অল্প পাক ধরেছে। গাল ভরতি খোঁচা খোঁচা দাড়ি। ‘ঝামেলাটা কীসের?’ লোকটা সামনে এসে দাঁড়াতেই নীলাম্বর জিজ্ঞেস করলেন। বাঁ-হাতে ঘাড় চুলকে নিয়ে লোকটি বলল, ‘ও শালা হারামি পার্টি। লাশ কাটিয়ে বলে পয়সা দেব না। বলে আমরা তো বলেছিলাম এসব কাটাকাটির দরকার নেই। বিষ খেয়ে মরেছে সবাই জানে। পুলিশই তো বলল পোস্টমর্টেম করতে হবে। এবার তাহলে পুলিশই পয়সা দিক। বুঝুন ঠ্যালা! এসব নিয়েই বাওয়াল। বাদ দিন, আপনি বলুন, এবার কী চাই? পায়ের হাড় নাকি হাতের? তবে ঝামেলা একটা আছে স্যার আগেভাগে বলে রাখি। এই মুহূর্তে বেওয়ারিশ লাশ কিন্তু শর্ট আছে। একটু চেক কত্তে হবে। তা আপনার পুজো কবে? মানে লাগবে কবে?’ একটানে কথাগুলো বলে লোকটার দমে ঘাটতি হল কিনা জানা নেই। তবে নীলাম্বর বাঁড়ুজ্যে একবার লম্বা শ্বাস নিয়ে খানিক চুপ থাকলেন। তারপর গলা নামিয়ে বললেন, ‘এবারে আমার কোনো হাড়ের প্রয়োজন নেই বাবলু।’ বাবলু অবাক, ‘তবে? গোটা লাশটাই লাগবে নাকি?’ চোখগুলো ড্যালা পাকিয়ে প্রশ্ন করে নীলাম্বরকে। উত্তরে নীরবে দু-পাশে ঘাড় নাড়লেন তিনি। বললেন, ‘অপঘাতে মৃত্যু হওয়া কোনো চণ্ডালের হার্ট চাই। তা-ও সেটা পুরোনো হলে হবে না। এক পক্ষকালের টাটকা হতে হবে।’ কথাটা শুনে বাবলুর নাড়ি বোধহয় কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। এক্কেবারে পাথর মূর্তির মতো নীলাম্বরের দিকে তাকিয়ে ছিল সে। না, জিনিসটা সে কীভাবে জোগাড় করবে সেই চিন্তার থেকেও তাকে স্তম্ভিত করে দিয়েছিল নীলাম্বর যে ভাষায় কথাগুলো বলল সেই ভাষাটা। গলাটাকে হেঁড়ে করে বাবলু মাথার ওপর নিজের ডানহাতটা নেড়ে বলে উঠল, ‘মাথার বিশ হাত ওপর দিয়ে বেরিয়ে গেল সব। চণ্ডাল, কীসব আঘাত, পক্ষকাল এসব কী স্যার?’ নীলাম্বর বাবলুর এক্কেবারে কাছে মুখ এনে বলল, ‘শোন, চণ্ডাল মানে চাঁড়াল, মানে ডোম বলতে পারিস। যারা মৃতদেহ পোড়ায়। পক্ষকাল মানে পনেরো দিন আর অপঘাত মানে যাঁদের মৃত্যু স্বাভাবিক হয়নি। মানে কোনো না কোনোভাবে আত্মহত্যা করেছে বা কোনো অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছে। আবার পুরোটা বলছি ভালো করে বোঝ…।’ নীলাম্বরকে থামিয়ে বাবলু দু-হাত মাথার দু-পাশে তুলে বলে উঠল ‘বুজে গেচি বুজে গেচি।
— কী বুঝেছিস বল তো?
বাবলু বলল, ‘এমন কোনো ডোমের ডেড বডি থেকে হার্ট বের করতে হবে যে শেষ পনেরো দিনের মধ্যে মরেছে। আর সে হয় আত্মহত্যা করেছে নয় তো অ্যাক্সিডেন্টে টপকেচে। কী ঠিক আছে তো?’ নীলাম্বরের মুখে ঔৎসুক্য, চাপা টেনশনও আছে। ঝট করে বলে উঠল, ‘পারবি তো?’ এইবার বাবলু ঠোঁট ওলটাল। ‘এমন মরা কোথায় পাব স্যার? তবু একবার রেজিস্টার দেখে আসছি।’ বলেই থমকাল। কী যেন ভাবল। তারপর বলল, ‘কিন্তু ডোম কিনা বুঝব কীভাবে? কোনো বিশেষ টাইটেল আছে?’ নীলাম্বর এবার বেশ অসুবিধেতেই পড়ল। আজকাল পদবি দেখে কার কোন পেশা বা সে কোন জাতের কিছুই বোঝার উপায় নেই। তাই মুখ ভার করেই তিনি বাবলুর প্রশ্নের উত্তরে ‘না’ বললেন। তবে নীলাম্বর দমবার পাত্র নন। বাবলুকে জোর দিয়ে বলে ওঠেন, ‘আমি কিছু জানি না বাবলু, তোকে এটা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব জোগাড় করে দিতেই হবে। নইলে একসঙ্গে অনেক প্রাণ শেষ হয়ে যাবে।’
— কিন্তু স্যার, এটা তো অসম্ভব কাজ। আমি কীভাবে ..
— তোদের সঙ্গে তো অনেক মর্গেরই জানাশোনা আছে। তোদের এখানে না হয় তো অন্য কোথাও দেখ না। তোদের এখানেও তো অনেক ডোমের যাতায়াত।
— দেখুন, একে তো এটা হেব্বি রিস্কি কাজ। ধরা পড়লে চোদ্দোগুষ্টি উদ্ধার হয়ে যাবে। তারপর ডোমেদের সঙ্গে আলাপ থাকলেই তো হবে না। তাদের ওইভাবে মরতে তো হবে। আমি কী করে…
কথাটা বলতে বলতে নিজেই থেমে গেল বাবলু। একটু দূরে চোখ গেল। বাবলুর চোখ লক্ষ করে নীলাম্বরও উলটোদিকে ঘুরে তাকালেন। দেখলেন একটি লোক এদিকেই আসছে। ছোটখাটো রোগা চেহারা। মাথায় কাঁচা চুলের সঙ্গে মিশে থাকা পাকা চুলগুলো দূর থেকেই বেশ ভালো বোঝা যাচ্ছে। লোকটা একটু কুঁজো হয়ে হাঁটে। নিজের মনে বিড়বিড় করতে করতে এগিয়ে আসছে। ঢোলা প্যান্ট আর গায়ে স্যান্ডো গেঞ্জি। ক-জন্ম যে সে গেঞ্জি কাচা হয় না কে জানে! লোকটার মুখের ভাবভঙ্গি
দেখে মনে হচ্ছে সে কারও ওপর রাগ ঝাড়বে বা ঝাড়তে না পেরে গজরে চলেছে। বাবলু গলা তুলল, ‘এই পরানদা।’ লোকটির ভ্রূক্ষেপ নেই। আবার ডাকল বাবলু। এবার পরান থমকাল। ‘এদিকে একটু এসো।’ পরান প্রায় দাঁত খিঁচিয়েই জবাব দিল দূরে দাঁড়িয়ে, ‘কেন আমায় কোন কাজে লাগবে তোর?’
— আরে এসো না। খুব দরকার।
জোর করে ডাকাতে পরানের মুখটা ভেঙেচুরে চূড়ান্ত বিরক্তিকর হয়ে উঠল। কী হয়েছে? তাড়াতাড়ি বল।’ বাবলু বলল, ‘শোন না, চুপিচুপি একটা কাজ করতে হবে। পয়সা পাবি।’ হলদেটে চোখ তুলে কামড়ে দেবার ভঙ্গিমাতে চেয়ে ছিল পরান। পয়সার নাম শুনে মুখের ভাবে খানিক পরিবর্তন এল যেন। ‘কী কাজ?’
— তার আগে বল, কারে গাল পাড়তে পাড়তে আসছিলি? নিশ্চয়ই তোর ভাইরে?
— তোর বাপে রে। কী বলবি বল।
বাবলু ফিক করে হেসে নীলাম্বরকে বলল, ‘ওর ছোটো ভাইয়ের সঙ্গে হেব্বি বাওয়াল চলছে পরানদার। সম্পত্তি নিয়ে। যাক গে, পরানদা শোন…’ বলে পরানকে সবটা খুলে বলল বাবলু। শুনে তো পরানের চক্ষু চড়কগাছে। এবড়ো-খেবড়ো উঁচু দাঁতগুলো বের করে খেঁকিয়ে উঠল, ‘শালা ঢ্যামনা। এই বয়সে আমারে হাজত বাস করাতে চাস? তোর জন্য এই বয়সে জেলের ভাত খাব নাকি রে?’ বাবলু হাত-পা নেড়ে জবাব দিতে যাচ্ছিল। কিন্তু নীলাম্বর তাকে থামিয়ে নিজেই বলে উঠলেন, ‘দেখুন দাদা, আমি পুজো-টুজো করি। ওই তান্ত্রিকরা যেমন করে। তাই আমার এই জিনিসটার ভীষণ দরকার। কোনো খারাপ কাজে নয়, আপনি যদি এই জিনিসটা আমায় দেন তাহলে অনেক মানুষের জীবন বাঁচবে। মা মহামায়ার নামে শপথ করে বলছি।’ কথাগুলো শুনে পরানের প্রাণে কিছু বোধহয় হল। মুখের ভাবটা কঠোর থেকে নরমের দিকে। তবে সে ঠিক নিশ্চিত হতে পারছে না। একবার বাবলুর দিকে, একবার নীলাম্বরের দিকে, বারকয়েক তার চোখদুটো এ মুখ থেকে ও মুখে ছোটাছুটি করল। নীলাম্বর ব্যাপারটা বুঝে আবার বললেন, ‘পরানবাবু, একটা জিনিস ভাবুন। আমরা কিন্তু কাউকে মারছি না। বরং যার জীবনটা শেষ হয়ে গেছে তার শরীরের মধ্যে থেকে বাতিল হয়ে যাওয়া একটা জিনিস বের করে এমন কিছু করছি যাতে অনেক মানুষের জীবন বাঁচে। এতে পাপ নয়, বরং পুণ্য আছে। আর কেউ ঘুণাক্ষরে জানতেও পারবে না। তা ছাড়া আপনি তো বিনা পয়সায় করছেন না।’ দু-হাত দিয়ে মাথার চুলগুলোকে খসখস করে ঘষে এলোমেলো করে ভাবল পরান। বাবলু বলল, তুই আর তোর ভাই সবাই তো ডোমের কাজ করিস। জাতটাও মিলে যাচ্ছে। দেখ না একটু। তোদের তো অনেক কন্ট্যাক্ট। পারলে তোরাই পারবি পরানদা। ফস করে পরান বলে উঠল, ‘বিশ হাজার লাগবে।’ বাবলু আর নীলাম্বর প্রায় চমকে গেল। নীলাম্বরের মুখের দিকে একবার তাকিয়ে অবাক হয়ে বাবলু বলল, ‘এই পরানদা, কী বলছিস রে? এরকম করিস না। পয়সা তুই পাবি। তা বলে বিশ হাজার? হাজার দশেক। বাবলুর মুখের কথাটা ফুরোতে দিল না পরান। গলা চেপে বলে উঠল, বিশের এক পয়সাও কম হবে না। লাগলে নাও নইলে যাও।’ বলেই সেই স্থান ত্যাগ করে চলে যেতে যায়। নীলাম্বর বলে ওঠেন, ‘পাবেন।’ পরান থমকে দাঁড়ায়। বিশ হাজারই আমি দেব আপনাকে। কিন্তু আমার ঠিক জিনিসটা চাই।’ পরান ঘুরে দাঁড়িয়ে বলে, ‘ঠিক জিনিসটাই পাবেন। একজন পাক্কা ডোমের হার্ট আপনি পাবেন। তবে টাকাটা জিনিস পাওয়ার আগেই চাই।’ বাবলু এবার তড়পে ওঠে, ‘এবার বড্ড বাড়াবাড়ি কচ্চিস পরানদা।’
— আমি কি তোদের সাধ করে হার্ট দেব বলেছি? তোরাই ডেকে চেয়েছিস। না লাগলে নিস না। একটা কথা খুপরিতে ঢুকিয়ে নে, এই পরান দাস মিথ্যে কথা বলে না। বেইমানিও করে না।
— কবে দিতে পারবেন?
নীলাম্বরের পালটা প্রশ্নে একটু চুপ করে থাকে পরান। তারপর বলে, ‘টাকাটা যদি আজ পাই তাহলে আগামী দু-দিনের মধ্যে আপনি মালটা হাতে পেয়ে যাবেন। তবে দেরি করলে হাতছাড়া হয়ে যাবে। আমার কিচ্ছু করার থাকবে না।’
— বেশ। আমি খানিকক্ষণের মধ্যেই এটিএম থেকে টাকা তুলে আপনাকে এইখানে দিয়ে যাচ্ছি। জিনিসটা আমার দু-দিনের মধ্যেই চাই।
— রেডি আছে। পেয়ে যাবেন।
বাবলুর চোখের সামনে কড়কড়ে এতগুলো টাকার রফা হওয়াতে তার বেশ আপশোশই হচ্ছে। নীলাম্বর তখনই টাকা তুলে এনে আধঘণ্টার মধ্যে পরানের হাতে তুলে দেন। পরান দু-হাত পেতে টাকাগুলো নিয়ে বুকের কাছে জাপটে নেয়। যাবার আগে হলদেটে চোখগুলো তুলে নীলাম্বরকে বলে, ঠিক সময়ে খবর চলে যাবে। সেই মতো চলে আসবেন।’ কোনো লিখিত প্রমাণ ছাড়াই বিশ হাজার টাকা নীলাম্বর তুলে দিলেন পরানের হাতে। লোকটি যদি অস্বীকার করে! আসল জিনিসটাই না দেয়। এটা এমন একটা জিনিস যে কাউকে নালিশও করতে পারবেন না। ঈশ্বরের ওপর সবটুকুর ভার সঁপে দিয়ে নীলাম্বর নিজের বাড়ি ফিরে এলেন।
