মৃত জ্যোৎস্নার রাত্রি – ৩
তিন
টলিপাড়ায় ঘটে গেল মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। মৃত্যুর মুখে অভিনেত্রী আত্রেয়ী সেন। খুনের দায়ে গ্রেপ্তার পরিচালক মিহির সরখেল। বোলপুরে একটি বেসরকারি চ্যানেলের নতুন সিরিয়ালের প্রোমোর শুটিং করতে গিয়েছিলেন আত্রেয়ী সেন। সেখানেই শুটিং সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে তুমুল অশান্তির সৃষ্টি হয় পরিচালক মিহিরের সঙ্গে অভিনেত্রীর। বন্ধ থাকে শুটিং। তারপর চ্যানেলের মধ্যস্থতায় শুটিং শুরু হয়। পুলিশের সন্দেহ শুটিঙে বচসার জেরেই এই হত্যার পরিকল্পনা। মধ্যরাতে আত্রেয়ী যখন ছাদের ওপর নিরিবিলিতে নিজের মতো সময় কাটাচ্ছিলেন, তখনই সুযোগ বুঝে মিহির সরখেল ছাদে গিয়ে অভিনেত্রীকে ঠেলে ফেলে দেন।’
রিপোর্টার আরও বলে যাচ্ছিল। শব্দে, বর্ণে সাজিয়ে-গুছিয়ে থ্রিলার গল্পের মতো চ্যানেলে-চ্যানেলে প্রচার করা হচ্ছে মিহির আর আত্রেয়ীর ঘটনা। টেবিলের ওপর থেকে রিমোটটা তুলে কনফারেন্স রুমের টিভির সাউন্ডটা কমিয়ে দিল সম্রাট দাশগুপ্ত, ইউনিভার্স বাংলা চ্যানেলের বিজনেস হেড। সম্রাটের সঙ্গে উপস্থিত ছিল মিহিরের কলিগ বোধিসত্ত্ব, পরাগ, ধৈবত। মিহিরের ইমিডিয়েট বস সংগ্রামজিৎ। প্রোগ্রামিং হেড মল্লিকা গত ছয়মাস আগেই টাটা বাই বাই করে মুম্বই চলে গেছে। তার জায়গায় এসেছে নন্দিনী। সবাই চুপ। বড়ো কনফারেন্স রুমটায় এক থমথমে ভাব। কে কী বলবে কিচ্ছু বুঝতে পারছে না। ধৈবত মুখ খুলল, ‘এখন আমাদের কী করণীয় স্যার? বিজনেস হেডের কাঁধ নাচিয়ে সপাটে উত্তর, ‘আই ডোন্ট নো।’ উপস্থিত সকলে এমন উত্তরটাই আশা করেছিল সম্রাটের কাছ থেকে, কারণ সম্রাটের ট্যাগ-লাইনই এটা, আই ডোন্ট নো।’ এই ভদ্রলোক যে কোন ব্যাপারটা জানেন সেটাই কেউ জানে না। তবে ধমকানিতে ওস্তাদ। এই যেমন এক্ষুনি সংগ্রামজিৎকে ধমকাতে শুরু করল, ‘পই পই করে বলেছিলাম সংগ্রাম, মিহিরের ওপর এত বড়ো একটা শুটিঙের দায়িত্ব দিয়ো না। তুমি নিজে যাও।’
— কিন্তু সম্রাটদা ও যে এরকম একটা কাজ করবে সেটা তো ধারণারও বাইরে। আর এখানে যদি আমি যেতামও, আটকাতে পারতাম কি? ওখানে তো এতগুলো লোক ছিল। আটকাতে তো তারাও পারত।
— এইভাবে নিজের দায়িত্ব এড়িয়ে যেয়ো না সংগ্রাম।
আবার ধৈবত বলল, ‘ওরকম শান্ত একটা ছেলে এরকম একটা কাজ কী করে …!’
সম্রাট বলল, ‘না করার কী আছে? মিহির তো আর দেবতা নয়। মানুষ। নিজের রাগ কন্ট্রোল করতে না পেরে এরকম একটা জঘন্য কাজ করেছে।’
নন্দিনী বলল, ‘যতদূর শুনেছি এর আগে এই অফিসে হওয়া ওই প্যারানরমাল ইনসিডেন্টটা আটকাতে মিহিরই নাকি ইনিশিয়েটিভ নিয়েছিল।’
টেবিলের ওপর ঝুঁকে বসেছিল সম্রাট। নন্দিনীর কথা শুনে ঝপাং করে চেয়ারের ওপর শরীরটা হেলিয়ে দিয়ে সম্রাট বলে উঠল, ‘তবে আর কী? সাত খুন মাফ! দ্যাখো এবার তোমরা কী করবে।’ কথাটা শেষ করেই উঠে চলে যাচ্ছিল। ঠিক এই সময় বোধিসত্ত্ব বলে উঠল, ‘মিহিরকে ছাড়াবার কোনো ব্যবস্থা কি আমরা …!’ কথাটা সম্পূর্ণ করার আগেই সম্রাট ঘাড় ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে বলল, ‘আই ডোন্ট নো। সিইও-র সঙ্গে মিটিং সেরে ডিসিশান নিতে পারব।’ কাচের দরজাটা খুলে বেরিয়ে গেল ইউনিভার্স বাংলা চ্যানেলের বিজনেস হেড।
