মৃত জ্যোৎস্নার রাত্রি – ৩০
ত্রিশ
নিস্তব্ধ নিশুতি। কাঁধে দুটো ঝোলা ব্যাগ আর হাতে একটা বড়ো চেন টানা বিগ-শপার নিয়ে সরখেল বাড়ির গেটের সামনে এসে দাঁড়ালেন নীলাম্বর। ভালো করে আশপাশটা তাকিয়ে দেখলেন তিনি। যে কয়েকটা গাছ হাত-পা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে ছিল তারাও আজ কেমন যেন নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছে। একটা পাতাও নড়ছে না। কোনো জাদুমন্ত্রবলে আশেপাশের সব কিছুই প্রাণহীন। সবাই যেন নীলাম্বরের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছে। তিনি ঠিক কোন সর্বনাশের মারণখেলা শুরু করতে চলেছেন তা একমাত্র ঈশ্বরই জানেন। নীলাম্বর যে নীল সুতো দিয়ে গৃহবন্ধন করে গিয়েছিলেন সেটায় মাথা ঠেকিয়ে দু-হাতের টানে ছিঁড়ে ফেলেন। মুহূর্তে আলগা হয়ে গোটা বাড়িটাকে ঘিরে চারপাশের মাটিতে লুটিয়ে পড়ে সুতোটা। ক্রমে মন্ত্রপূত গেটের তালা খুলে ভেতরের দরজার দিকে এগিয়ে যান। সেখানেও আরও একটি তালায় লাল সুতো জড়ানো ছিল, যার খাঁজে আটকানো ছিল তিনটি বেলপাতা। শুকিয়ে যাওয়া সেই পাতা তিনটে জামার পকেটে পুরে তালাটা খুলে ফেলেন। কটমট করে বেশ কয়েকবার শব্দ ভেসে আসে নীলাম্বরের কানে। কতগুলো হাড় যেন এতক্ষণ একটার গায়ে আর-একটা আটকে ছিল। এবার তারা নিজেদের একে ওপরের থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে উঠে দাঁড়াচ্ছে। চোখের পাতাগুলো স্থির আর সজাগ হয়ে যায় নীলাম্বরের। তিনি মনে মনে বোঝেন, হয়তো সে-ও জেগে উঠল। নীলাম্বর জানেন, এবার তার আক্রোশ আরও দশগুণ বেড়ে গেছে। যে-কোনো মুহূর্তে যে কোনোভাবে সে নীলাম্বরকে আক্রমণ করবে। চরম বিপদের আশঙ্কা মাথায় নিয়েই ঘরের দরজা খুললেন। এক ঝাঁক সর্বগ্রাসী অন্ধকার ঝাঁপিয়ে পড়ল নীলাম্বরের ওপর। না, সুইচ টিপে আলো-জ্বালানো এখন মোটেও নিরাপদ নয়। তাই পকেট থেকে লাইটারটা বের করেই রেখেছিলেন নীলাম্বর। ঘরে ঢুকেই চিড়িক শব্দে লাইটারটা জ্বালিয়ে দিলেন। মুহূর্তে আগুনের স্ফুলিঙ্গ সমেত নীল-হলুদ শিখাটি নীলাম্বরের চারপাশটা আলোকিত করে তুলল। হাতের ব্যাগ মাটিতে নামাতে গিয়ে শরীরটা কোমর থেকে ভাঁজ করলেন। সঙ্গে সঙ্গে কাঁধের ব্যাগদুটোও খসে হাত বেয়ে ঝপ করে নেমে এল। মাটিতে পড়ার আগেই ধরে ফেললেন নীলাম্বর। তারপর খুব সন্তর্পণে ঝোলাদুটো মাটিতে স্পর্শ করিয়ে হাত থেকে নামালেন। ঝোলার মধ্যে থেকে ঠক করে খুব মৃদু একটা শব্দ হল। একটা ঝোলার মধ্যে সবে হাত গলিয়েছেন অমনি মাথার ওপর কে যেন ঘড়ঘড় শব্দ করে কিছু একটা সরিয়ে দিল। ঝট করে সিলিংয়ের দিকে তাকালেন নীলাম্বর। আওয়াজটা যে ওপর থেকেই এল তাতে কোনো সন্দেহ নেই। খুব দ্রুত হাতের মুঠোয় কয়েকটা মোমবাতি বের করে আনলেন। চটপট জ্বালিয়ে দিলেন। ঘরটা এবার বেশ আলোকিত ও ভয়ংকর হয়ে উঠল। কারণ অন্ধকার ঘরে কিছু দেখা যায় না। তাই ভয়টা থাকে শুধু মনের মধ্যে। কিন্তু মোমের আলো যখন ঘরের দেয়ালে মানুষের ছায়া ফেলে প্রকট হয়ে ওঠে তখন সেটা চোখে দেখা গেলেও বুকটা ধুকপুক করতে থাকে। অন্ধকারের চেয়ে আলো-আঁধারি বেশি ভয়ানক। বেশি ছমছমে। নীচের ডাইনিঙের মেঝেতে টপাটপ জ্বলন্ত মোমবাতিগুলো বসিয়ে দেন নীলাম্বর। পেছনে চোখ পড়তেই দেখেন বাইরে যাবার দরজাটা খোলা। উঠে গিয়ে বন্ধ করে খিল তুলে দেন। কিন্তু কী মনে হওয়াতে খিলটা খুলে শুধুমাত্র ভেজিয়ে রাখেন দরজাটা।
আবার ঘড়ঘড় ধড়াম দুমদাম শব্দ। এবার শব্দটা ওপর থেকে নীচের দিকে সিঁড়ি টপকে গড়িয়ে নামল। ঘরের ভেতরের বাতাসটা ক্রমশই ভারী হয়ে উঠছে। তেমনি তাপমাত্রাও কমে আসছে। নীলাম্বর ভালোই বুঝল ব্যাপারটা। সে নীচে নামছে। কিন্তু তাকে নামতে দিলে কিছুতেই চলবে না। এই মুহূর্তে নীলাম্বরের থেকে তাকে দূরে রাখতেই হবে। ক্ষিপ্রতার সঙ্গে ব্যাগ থেকে একটা প্যাকেট বের করে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেলেন। সেখান থেকে একমুঠো ভস্ম নিয়ে ডাইনিং আর সিঁড়ির মাঝে লক্ষ্ম ণরেখা টেনে দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে সিঁড়ির ওপর থেকে প্রচণ্ড বীভৎস মূর্তি ধরে প্রকট হল সেই প্রেত। মুখটা তার ভারী কিছু দিয়ে খ্যাতলানো। রক্ত-মাংস মিলেমিশে একটা ভয়ংকর মণ্ড পাকিয়ে আছে। চোখদুটো অস্বাভাবিক রকমের সাদা। তাতে সরু সরু লাল রেখা চোখের সাদা মণিটাকে যেন ফাটিয়ে দিয়েছে। করাতের মতো দাঁতগুলো নীলাম্বরের রক্তমাংস ছিঁড়ে নেবার অভিপ্রায়ে বেরিয়ে এসেছে। চামড়া ছিঁড়ে যাওয়া বিকট কালো হাঁ করে হাওয়ার বেগে ঝাঁপিয়ে তেড়ে আসে নীলাম্বরের দিকে।
.
নাকের জল আর চোখের জল একাকার করে লোকটা বারবার একই কথা বলে চলেছে, ‘না স্যার বিশ্বাস করুন। আমি কিচ্ছু জানি না। আমায় কিচ্ছু বলেনি।’ রোগা মতন মহিলাটি ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলছে, ‘আমি ঘুমোচ্ছিলাম। সারাদিনের কাজের পর তখন আর কী করে জেগে থাকব স্যার?’ মোটা গোঁফ আর জোড়া ভ্রূর লোক দুটোও কিচ্ছু জানে না। আমরা তো চিৎকার শুনে বাইরে এসেছিলাম। তার আগে বৃষভানু কী দেখেছে কী করেছে আমরা জানি না স্যার।’ আত্রেয়ী সেনের শুটিঙে যারা যারা ছিল তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজনকে জেরা করেছে সায়ন। প্রোডাকশন হাউসের অমিতাভ মল্লিক লিস্ট ধরে সায়নের হাতে তুলে দিয়েছিল। এত রাতে বাড়ি ফিরতে ফিরতে সারাদিনের মুখগুলো শুধু মনে পড়ছে সায়নের। কেউ-ই কিছু জানে না। জেরা যত এগিয়েছে সায়নের হতাশা তত বেড়েছে। বৃষভানু ঠিক কী দেখেছে সেটা জানতে না পারলে এই কেসের একটা দিক সম্পূর্ণ অধরা থেকে যাবে। হাল যখন প্রায় ছেড়েই দিয়েছে ঠিক তখনই মাঝারি মাপের কালো লোকটা বলল, ‘হ্যাঁ স্যার। বলেছিল।’
— কী বলেছিল?
রহস্যের অথই পাথারে সায়ন যেন খড়কুটো পেয়েছে। লোকটি বলল, ‘ভানু খেয়ে-দেয়ে শুতে যাবার আগে পরেরদিন কী রান্না হবে তার হিসেব করছিল আমার সঙ্গে বসেই। তারপর বলল, বল্টু তুই শুয়ে পড়। আমি একটু বারান্দা থেকে হেঁটে আসি। আমি বললাম, এত রাতে হাঁটবি? শুয়ে পড় না। কাল ভোরে তো আবার উঠতে হবে। ও বলল, একটু গ্যাস মতন হয়েছে। হাঁটলে ঠিক হয়ে যাবে। কথাটা বলে ও বেরিয়ে গেল। আমি শুয়ে পড়লাম। ঘুমিয়েও পড়েছিলাম। হঠাৎ দেখি ভানু আমায় দু-হাতে ধরে ঝাঁকাচ্ছে। আমি তো ধড়মড় করে উঠে বসি। জিজ্ঞেস করলাম, কী রে কী হয়েছে? এত হাঁফাচ্ছিস কেন? সঙ্গে সঙ্গে ও আমার মুখ চেপে ধরল। আর ঠিক তখনই বাইরে থেকে লোকজনের হইচই শুনতে পাই। আমি জোর করে আমার মুখের ওপর থেকে ওর হাতটা সরিয়ে দিই। আমি বলি, এই বাইরে চ্যাঁচামেচি কীসের? দেখি তো। বলে যেই উঠতে যাব অমনি থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে আমার হাতদুটো চেপে ধরে ভানু বলল, চোখ। দুটো ভয়ানক সাদা চোখ। আমি কিচ্ছু বুঝি না। ও বলল, ওই চোখদুটো নাকি ভানুকে দেখেছে। এবার ওকে মেরে ফেলবে।’ এতক্ষণ দমবন্ধ করে লোকটির কথাগুলো শুনছিল সায়ন। চোখের কথা শুনে লোকটির দিকে আরও একটু বেশিই ঝুঁকে পড়ে। জিজ্ঞেস করে, ‘কার চোখ? সেই কী আত্রেয়ীকে ঠেলে দিয়েছে ছাদ থেকে?’
— হ্যাঁ স্যার। ভানু সেটাই দেখেছে। ম্যাডামকে ঠেলে ফেলার পরেই ভানুকে দেখতে পায়। ভানু একটা থামের আড়ালে লুকিয়ে দেখে একটা লোক সিঁড়ি বেয়ে নেমে এসে দোতলার কোণের ঘরটার দিকে এগোয়। তার পিছনে তন্ময়দাও যায়। ভানু ভয় পেয়ে আর কিছু না দেখেই ঘরে পালিয়ে আসে।
— পুলিশকে বলেননি কেন এসব কথা?
— ভানু, ভানু বারণ করেছিল। আমিও ভয় পেয়েছিলাম স্যার। কিন্তু ভানুর জন্য আমার খুব ভয় করতে লাগল। ও তো কলকাতায় একা থাকে। সত্যি যদি ওর কোনো বিপদ হয় তাহলে কে বাঁচাবে ওকে? তাই বোলপুর থেকে ফেরার পথে আমি ওকে বোঝাই যে, ও যেন সব খুলে পুলিশকে জানায়। আমরা যখন শক্তিগড়ে নেমেছিলাম তখন ও বোলপুর থানার ওসিকে ফোনও করেছিল। কিন্তু নেটওয়ার্ক প্রবলেমের জন্য কথা শুনতে পারেনি। কাছেপিঠে লোক ছিল বলে ভালোভাবে বলতেও পারেনি বেচারা। তাই ও বলেছিল কলকাতা ফিরে রাতে ফোন করবে। কিন্তু সেই সুযোগটুকু পেল না ভানু।
.
— আপনি বাড়ি যাবেন তো স্যার?
ড্রাইভারের কথায় সংবিত ফিরল সায়নের। ভাবনার জগৎ থেকে রাতের ছুটন্ত বাইপাসে এসে পড়ল তার চোখদুটো। এতক্ষণ সায়নের চোখে কেবল ভানুর ডেডবডির ছবি, জেরার মুখে স্বীকার করা লোকটার মুখ এসবই ভাবছিল। কিছু বললে স্বপন?’
— হ্যাঁ স্যার, জিজ্ঞেস করছিলাম…
সায়নের মোবাইলটা বেজে উঠল। মুনাই ফোন করেছে। ফোনটা ধরে এ কথা সে কথা বলতে বলতে জানতে পারে আজ তার শ্বশুরবাড়িতে কীসব পুজো করবেন নীলাম্বর। একাই গেছেন। কাউকে যেতে বারণ করেছেন। কিন্তু সায়নের মনে কু-ডাক ডেকে ওঠে। একা গেছে শুনে চমকে যায়। ‘শোনো মুনাই, তোমরা খেয়ে নিয়ো। আমি একবার ওই বাড়িতে যাব এখন। নীলাম্বরবাবুর সঙ্গে আমার দরকার আছে।’ ফোনের ওপার থেকে মুনাই একটু চিন্তান্বিত গলাতেই বলল, ‘আজকে এখনই যেতে হবে তোমায়? কাল তো উনি এখানেই আসবেন।’
— আমি সব পরে বলব মুনাই। রাখছি এখন
কথাটা শেষ করেই ফোনটা কেটে দিয়ে সায়ন বলল, ‘স্বপন, গড়িয়া চলো।’
.
সেদিন পূর্ণিমা। মুখ লুকোবার সামান্য জায়গাটুকুও পায়নি চন্দ্রমা। পাহাড়ের শিখর ছুঁয়ে নক্ষত্রখচিত রাত্রি সকল সাজিয়ে সর্বনাশের অপেক্ষায়। মধ্যরাতের চন্দ্রালোকে বয়ে যাওয়া নদীটাও যেন ভীত। নিঃশব্দে বয়ে চলেছে মুখে আঙুল দিয়ে। দূর পাহাড়ের উপচে পড়া সৌন্দর্যের মাঝেও কী যেন হাহাকার বেজে চলেছে অবিরত। ছায়াগুলো মৃত্যুশীতল হয়ে নিষ্প্রাণ চোখে তাকিয়ে দেখছিল ছায়ান্ধকারে নদীর পাড়ে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দুটো মানুষ। সেদিন রুদ্রাক্ষ জড়ানো ভস্ম-মাখা লম্বা নখরযুক্ত হাত সিঁদুর লেপা করোটি বাড়িয়ে বলেছিলেন, ‘এটাকে সঙ্গে রাখ।’ গম্ভীর কণ্ঠে কেঁপেছিল পাহাড়ি বনভূমি। রক্তাভ চক্ষুদুটো ছিল স্থির। সামনের দিকে হাত প্রসারিত করে তিনি বলেছিলেন, ‘তোর হাতে তার ক্ষয় নেই। যে কাজে সে গেছে, যেভাবে হোক সেই কাজ করে সে ফিরবে। যদি দেখিস ভীষণ বিপদ, তাহলে কোনো চণ্ডালের বন্ধ হয়ে যাওয়া হৃদয় দিয়ে এই চণ্ডাল করোটিকে জাগাবি। সির্ফ একবার এই চণ্ডালকে কাজে লাগাতে পারবি। কিন্তু ইয়াদ রহে, সে মাত্র একটিবার জাগবে আর যে চণ্ডালের হৃদয় নিবি সেটা যেন পনেরো দিনের বেশি পুরানা না হয়। হাতে পেয়েই ভৈরবী যন্ত্রে তাকে শোধন করে নিবি। তাহলে আরও এক পক্ষকাল সেই হৃদয় কাজ করবে। নইলে সব বিফলে যাবে।’
কথাগুলো স্মরণ করেই বন্ধ চোখটা ঝড়ের বেগে খুলে ফেললেন নীলাম্বর। গায়ে রক্তবস্ত্র। বুক থেকে পেট পর্যন্ত নেমেছে রুদ্রাক্ষমালার স্তর। বুকের দু-পাশ দিয়ে লাল উত্তরীয় দুটো উরুর ওপর এসে পড়েছে। সারা ঘরে জ্বলতে থাকা মোমবাতির আলো আগুনের পাখির মতো ডানা ঝাপটাচ্ছে নীলাম্বরের শরীরে। সামনের মেঝেতে ভস্ম আর সিঁদুর দিয়ে আঁকা কালভৈরব যন্ত্র। ছোটো থেকে বড়ো কালো বৃত্ত, প্রতিটি বৃত্তের পাশে ফুলের পাপড়ি আঁকা। বৃত্তের কেন্দ্রবিন্দুতে রক্ত দিয়ে লেখা মন্ত্ৰ ‘ওম হ্রীং শ্রীং ক্লীং ক্ষৌং।’ সম্পূর্ণ বৃত্তটির চারপাশে চৌকো আকারের বন্ধনী রচনা করা। বেশ কয়েকটি মাটির মালসায় সাজানো পূজার উপাচার। তার মধ্যে বড়ো একটি মাটির মালসায় চণ্ডাল করোটি স্থাপন করলেন নীলাম্বর। একটি ধারালো ব্লেড নিয়ে নিজের ডানহাতের তালুর ওপর লম্বালম্বিভাবে কাটলেন। ফুটে উঠল রক্তের রেখা। ব্লেডটাকে পাশে রেখে রক্তাক্ত ডানহাতের তালু রাখলেন চণ্ডাল করোটির মাথায়। বাঁ-হাতের আঙুলের অগ্রভাগ দিয়ে স্পর্শ করে রইলেন ডানহাতের বাহু। চোখ বুজে মন্ত্র পড়তে লাগলেন বিড়বিড় করে। নীলাম্বরের হাত থেকে করোটির মাথা চুঁইয়ে ঝরতে থাকে রক্তের ধারা। তাজা রক্তে স্নান করে করোটি। রক্ত গড়িয়ে মালসায় করোটির চারপাশে জমা হতে থাকে। চণ্ডাল খুলিটার শূন্য অন্ধকার অক্ষিকোটর দুটো নীলাম্বরের রক্তে স্নান করে। বেরিয়ে থাকা ভয়ানক দাঁতগুলো রক্তস্নাত হয়ে রক্তিম বর্ণ ধারণ করে। দেখে মনে হচ্ছে, সদ্য কোনো জীবকে ভক্ষণ করেছে ওই চণ্ডাল মুণ্ডটি। মন্ত্রপাঠের শেষে ব্লেডে কাটা হাতের তালুটা ভালো করে ওই মুণ্ডের মাথায় তিনবার বুলিয়ে দেন। তারপর সেই রুধিরসিক্ত হাত নিজের কপালে বাঁ-দিক থেকে ডানদিকে ঘষে নেন নীলাম্বর। গম্ভীর ভারী নীচু স্বরে বলে ওঠেন, ‘জয় কালভৈরবের জয়।’ রক্তমাখা হাতেই নীলাম্বর পরান দাসের নিথর হৃদয়টাকে তুলে নেন। চণ্ডাল মুণ্ডের সামনে রাখেন সেটি। নীলাম্বর খেয়াল করেন এই কার্যটি সাধন করার সঙ্গে সঙ্গে কোথা থেকে একটা গভীর গর্জন ভেসে আসে। মুহূর্তে সবক-টি মোমবাতি তিরতির করে কাঁপতে থাকে। নীলাম্বরের কানের পাশ দিয়ে নেমে আসে ঘাম। ঈষৎ বিস্ফারিত চোখদুটো ডানে-বামে দু-বার চক্কর কেটে নেয়। সিঁড়ির দিক থেকে একটা শীতল হাওয়া এসে নীলাম্বরের গায়ে ঝাপটা দেয়। ঘামে ভেজা শরীরটা শিরশির করে ওঠে তার। পরক্ষণেই করোটির দিকে চোখ পড়তে ছ্যাঁৎ করে ওঠে নীলাম্বরের বুক। চোখের পলকে ঘটে গেছে এক অলৌকিক ঘটনা। বেরিয়ে থাকা করোটির দু-পাটি দাঁত একটার সঙ্গে আরেকটা লেগে ছিল। মুখের ভেতরটা দেখা যাচ্ছিল না। কিন্তু এখন সেই চণ্ডালমুণ্ডের মুখ হাঁ করা। মুখের সামনে রাখা পরান দাসের হার্টটিও নেই। নীলাম্বরের বুঝতে অসুবিধে হয় না যে চণ্ডালমুণ্ডই সেটি ভক্ষণ করেছে। পরিস্থিতি ভয়ংকর হলেও মনে মনে তিনি খানিক খুশিই হন। তাঁর ষষ্ঠেন্দ্রিয় তাঁকে জানায় তিনি ঠিক পথেই এগোচ্ছেন।
নীলাম্বর এবার করোটিটা মালসা থেকে তুলে কালভৈরব যন্ত্রের ঠিক মাঝখানটিতে রাখেন। ঢাকা পড়ে যায় রক্তে লেখা মন্ত্র। করোটির সামনে একটি বেলপাতা, নিমপাতা এবং বটপাতা পরপর সাজিয়ে রাখেন। ঝোলা ব্যাগ থেকে একটি নর-অস্থি বের করে কপালে ঠেকান। সেটাকে নিয়ে চণ্ডালমুণ্ডের চারপাশে বারকয়েক ঘুরিয়ে কালভৈরব যন্ত্রের পাশে রাখেন। তারপর বজ্রগম্ভীর কণ্ঠে শুরু করেন কালভৈরবাষ্টকম স্তোত্র, ‘দেবরাজসেব্যমান পবনাংগ্রিপঙ্কজম ব্যালযজ্ঞসূত্রমিন্দু শেখরাংকৃপাকরম।’ উচ্চস্বরে স্তোত্র পাঠ করতে করতে কখনও একমুঠো তিল, কখনও-বা ভস্ম করোটিকে ঘিরে যন্ত্রের চারপাশে ছড়িয়ে দিতে থাকেন। একটা শব্দ ভুল হলেই সর্বনাশ। স্তোত্র যত এগোতে থাকে ততই বাড়তে থাকে প্রেতের হুংকার। প্রথমে দোতলা থেকে ভাঙচুরের শব্দ শোনা যায়। নীলাম্বর দমেন না। কানও দেন না সেদিকে। কারণ এখন নানানভাবে তাঁর মন্ত্রোচ্চারণে ব্যাঘাত সৃষ্টি করা হবে। গর্জন ক্রমে বাড়তে থাকে। ঘড়ঘড়ে এক আর্তনাদ ক্রমশ বাড়িটাকে গ্রাস করতে থাকে। সিঁড়ির দিক থেকে ধেয়ে আসছে অলৌকিক ঝোড়ো বাতাস। সিঁড়ি আর ডাইনিঙের মাঝে ভস্ম দিয়ে কাটা গণ্ডি ধীরে ধীরে ছড়িয়ে যেতে থাকে। মোমবাতির শিখাগুলো ঘাড় বেঁকিয়ে কোনোরকমে সলতের সঙ্গে নিজেদের ধরে রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করছে। সারা ঘরে যেন আগুনের স্ফুলিঙ্গরা শত শত পিশাচের মতো উদ্বাহু হয়ে নেচে চলেছে। নীলাম্বর দরদর করে ঘামতে থাকেন। স্তোত্রও প্রায় শেষের মুখে। কিন্তু কালভৈরব যন্ত্রের মধ্যে কোনো পরিবর্তন নেই। চণ্ডালের করোটি থেকেও কোনো অলৌকিক কিছু প্রকাশ পাচ্ছে না। কিন্তু নদীতীরে দাঁড়িয়ে গুরুদেব যে বলেছিলেন, এই করোটিই নাকি রক্ষা করবে। কালভৈরবের শক্তি নিয়ে চণ্ডাল জাগবে! কোথায় সে? এক আত্মা এক প্রাণ হয়ে শুধু মন্ত্রোচ্চারণ করে চলেছেন নীলাম্বর। এদিকে দোতলায় তাণ্ডবলীলার পর কেউ একজন এদিকেই নেমে আসছে। সঙ্গে নিয়ে আসছে আসুরিক শক্তির প্রবল ঝড়। পুজো করতে করতেই আড়চোখে নীলাম্বর একবার সিঁড়ির দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করেন। দেখেন গণ্ডির ভস্ম চৌকাঠ থেকে উধাও। সেই প্রেতের এখন আর সিঁড়ি দিয়ে নেমে নীলাম্বরের কাছে আসতে কোনো বাধা নেই। বিশ্রী ঘড়ঘড়ে গলায় অশরীরী আর্তনাদে কানের পর্দা ছিঁড়ে যাবার জোগাড়। নীলাম্বরও শেষ চেষ্টা না করে ছাড়বেন না। স্তোত্র শেষ। হঠাৎ যেন হাওয়াও থেমে গেছে। কয়েকটা মোমবাতি ঝড়ের দাপটে পড়ে গিয়ে নিভে গেছে। নীলাম্বর বাকরুদ্ধ হয়ে কালভৈরব যন্ত্রের দিকে চেয়ে রইলেন। মনে মনে বলতে লাগলেন, ‘জেগে ওঠো চণ্ডাল। জেগে ওঠো। হে অশুভ অশরীরী প্রেতসংহারক কালভৈরব জাগো। শক্তি দাও।’ কথাটা মনে মনে বলেই সিঁড়ির দিকের চৌকাঠে চোখ আটকে যায়। দুটো নগ্ন পা ডাইনিং রুমের মেঝেতে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। ভেতর থেকে থরথর করে কেঁপে ওঠেন নীলাম্বর। কালভৈরবের ঘুম ভাঙেনি তাই নীলাম্বরের ঘুমের সময় হয়েছে। পা থেকে কোমর হয়ে বুক ছুঁয়ে নীলাম্বরের দৃষ্টি প্রেতের মুখে পৌঁছোতেই গা-টা গুলিয়ে উঠল। রক্ত-মাংসে মিশে যাওয়া থ্যাঁতলানো একটা মুখ। হিংস্র রক্তধোয়া দাঁতগুলো বের করে লোলুপ দৃষ্টিতে চেয়ে আছে নীলাম্বরের দিকে। রাগে গরগর করে ফুঁসছে। মাত্র কয়েক পলকের নিস্তব্ধতা। তারপর চোখ ধাঁধিয়ে দিয়ে কোনো কিছু বোঝার আগেই বিকট আর্তনাদের সঙ্গে নীলাম্বরের দিকে ধেয়ে এল বীভৎস প্রেতশরীর। নীলাম্বর আসন ছেড়ে উঠতে পারবেন না। তাই ওই আসনে বসেই মৃত্যুভয়ে চিৎকার করে উঠলেন। মুহূর্তে সব অন্ধকার। এক ধাক্কায় ঝপ করে নিভে গেল ঘরের সবক-টি মোমবাতি। নীলাম্বর বুঝলেন প্রেত তাঁর গলাটা টিপে ধরেছে সজোরে। আসন থেকে ধীরে ধীরে শরীরটা তাঁর ওপরের দিকে উঠে যাচ্ছে। ‘অক অক’ করে দমবন্ধ হয়ে যাওয়া শব্দ বেরিয়ে আসছে তাঁর গলা থেকে। হঠাৎ কালভৈরব যন্ত্রটা থেকে নিঃসারিত হতে থাকল তীব্র নীল আলো। প্রেতের থ্যাঁতলানো মুখে সেই আলোর তেজ পড়তেই নীলাম্বরের শরীরটা পূর্বের আসনের ওপরেই খসে পড়ল। হাঁফাচ্ছেন নীলাম্বর। উবু হয়ে মুখ থুবড়ে নিজের আসনে পড়া অবস্থাতেই দেখলেন নীল আলোর রেখাগুলো থেকে দাউদাউ করে আগুন জ্বলে উঠল মেঝেতে। জ্বলতে লাগল চণ্ডালের মাথা। করোটির অক্ষিকোটর দিয়ে প্রবল কালো ধোঁয়া কুণ্ডলীকৃত হয়ে ওপরের দিকে ধেয়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যে সেই ধোঁয়া বিকটা এক মানব শরীরের অবয়ব ধারণ করল। প্রেত দেয়ালের গায়ে আটকে দাঁড়িয়ে আছে। বিকট ধবধবে সাদা চোখে দেখতে থাকে ধোঁয়ায় ভরা শরীরটাকে। নীলাম্বর উঠে দেয়ালের এক কোণে বসে থাকে হাত জড়ো করে। ছাদ ছোঁয়া সেই ধুম্রমানবের অবয়ব যেন নীলাম্বরের দিকে চেয়ে আছে। পর মূহূর্তেই ওই প্রেতের দিকে এগোতে থাকে সে। জেগে ওঠা চণ্ডালের গর্জনে বাড়ির দেয়ালে ফাটল ধরে। চোখের পলকে নগ্ন প্রেতশরীর উধাও হয়ে যায়। থমকে যায় চণ্ডাল। নীলাম্বর আবারও কালভৈরব মন্ত্র জপ করতে থাকেন। চণ্ডাল নিমেষের মধ্যে সিঁড়ি দিয়ে ওপরের দিকে উঠতে থাকে। কিন্তু নীলাম্বর আসন ত্যাগ করেন না। স্মরণ করেন গুরুদেবের কথা। তিনি বলেছিলেন, ‘এক মনে কালভৈরবের মন্ত্র জপ করতে করতে জ্বলতে থাকা আগুনে ঘৃত নিক্ষেপ করবি। সে আগুন যেন না নেভে কক্ষনো তাহলে চণ্ডাল শক্তি হারাবে। আগুন নিজে থেকে নিভে গেলে বুঝবি চণ্ডাল তার কার্যসিদ্ধি করেছে।’ তখন নীলাম্বর বোঝেননি কোথা থেকে আগুন আসবে! কারণ উনি তো কোনো যজ্ঞ করবেন না। কিন্তু এখন সব পরিষ্কার হয়ে গেছে নীলাম্বরের কাছে। সরখেল বাড়ির দোতলায় যে শুভ-অশুভের প্রবল এক খণ্ডযুদ্ধ চলছে তা বেশ ভালোই বুঝছেন নীলাম্বর।
অশুভ অশরীরী তার যত অলৌকিক মায়ার শক্তি ছিল সবটুকু উজাড় করে প্রবল ঝড় সৃষ্টি করে। দোতলার টেবিল চেয়ারগুলো শূন্যে উঠে ঝড়ের বেগে ধেয়ে আসতে থাকে ধোঁয়ার কুণ্ডলীর দিকে। জানলা থেকে পেলমেট সমেত পর্দা ছিঁড়ে তীব্র আঘাত হানে চণ্ডালের ওপর। চণ্ডালের রাগ আরও বেড়ে যায়। কাচের কিংবা ধাতব যা জিনিস ছিল সব আপনা থেকেই উড়ে এসে ঝাঁপিয়ে পড়তে থাকে। কিন্তু চণ্ডালকে রুখবে কার সাধ্যি? চোখের পলকে সে মানবের আকার থেকে পুনরায় ধুম্রকুণ্ডলীতে পরিণত হয়ে অশুভ প্রেতকে অলৌকিক নাগপাশে জড়িয়ে ধরে। নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য ধারালো রক্তমাখা ভয়ানক দাঁত বের করে চিৎকার করতে থাকে সেই প্রেত। ধীরে ধীরে ধুম্ৰপাশে বন্দি অবস্থায় প্রেত নীচের দিকে নামতে থাকে। সে কিছুতেই নিজেকে ছাড়াতে পারে না। নীচে নীলাম্বরের মন্ত্র প্রায় শেষ পর্যায়ে। চোখ তুলে দেখে প্রবল আক্রোশে প্রেত ছটফট করছে আর নিজেকে ছাড়াবার চেষ্টা করছে। ঠিক এই সময়েই বারান্দার দরজা খুলে ভেতরে এগিয়ে আসে সায়ন। ঢোকবার মুখেই থমকে যায় সে। আঁতকে ওঠে নীলাম্বর। সে পইপই করে বারণ করে এসেছিল কেউ যেন না আসে। সর্বনাশ হবে। মন্ত্র পড়তে পড়তেই চোখের ইশারায় সায়নকে চলে যেতে বলে নীলাম্বর। কিন্তু সায়ন পাথরের মতো দাঁড়িয়ে চোখের সামনে ঘটে চলা ভয়ংকর অলৌকিক মারণখেলা প্রত্যক্ষ করতে থাকে। প্রেতের নজর পড়ে সায়নের দিকে। সায়নও আতঙ্কের আকস্মিকতায় ধবধবে সাদা চোখের বীভৎস লোকটার দিকে তাকিয়ে থাকে। এই তো সেই চোখ। যে চোখের কথা তেঁতুল বলেছিল, যে চোখ বৃষভানু দেখেছিল। এ কে? লোকটা যে সায়নের দিকেই এগিয়ে আসছে। ওর শরীরের ওই ধোঁয়ার বাঁধন কীসের? ভয়ানক শরীরটার উপস্থিতি ছাড়া সায়নের সামনে বাকি সব ঝাপসা। দূর থেকে কেউ যেন বলছে, ‘পালিয়ে যাও, পালিয়ে যাও সায়ন।’ কিন্তু সায়নের মস্তিষ্ক তাতে সায় দিচ্ছে না। শরীরও চলছে না। সায়নের এক্কেবারে মুখের সামনে মৃত্যুমুখর ধারালো দাঁতগুলো বের করে এগিয়ে আসে প্রেতশরীর। ঠিক সেই মুহূর্তেই সায়ন তার শরীরে সামনের দিক থেকে একটা সজোরে হ্যাঁচকা টান অনুভব করে। তারপর হুমড়ি খেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে সায়ন। এরপর আর সে কিচ্ছু জানে না। নিমেষের ভগ্নাংশে কুণ্ডলীকৃত ধোঁয়ার শিকল অজানা প্রেতকে নিয়ে টর্নেডোর গতিতে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যায়। এই গভীর রাতে বাইরে থেকে এক চড়া আলো যেন ওদের টেনে নিয়ে গেল। দরজার কপাট একটার গায়ে আর-একটা পড়ে দড়াম দড়াম করে দু-তিনবার শব্দ করে উঠল। বাইরের গেট ঝনঝন করে বেজে উঠল।
.
ভোর রাত। নীলাম্বরকে নিয়ে সায়ন বাড়ি ফিরে এসেছে। সোনাইয়ের কাছে মুনাইয়ের শাশুড়ি শুয়ে আছে। পাশের ঘরে বিছানায় পিঠে বালিশে হেলান দিয়ে সায়ন বসে। কপালের এক কোণে ব্যান্ডেড লাগানো। নীলাম্বর সোফাতে বসে আছেন। ডানহাতে তাঁর সাদা গজ দিয়ে ব্যান্ডেজ করা। মুনাই আর মৃন্ময়ী এক্কেবারে চুপ। রাতে ধয়ে যাওয়া কালবৈশাখীর দাপট সকলকে বাদ্ধ করে দিয়েছে। একটু পরে মুনাই সায়নের দিকে চেয়ে বলল, ‘কতবার তোমায় বারণ করলাম যেয়ো না। সায়ন চোখ তুলে মুনাইয়ের দিকে তাকিয়ে আবার চোখটা নামিয়ে নেয়। নীলাম্বর শান্ত কণ্ঠে বললেন, ‘আমি যেরকম বলব তোমরা ঠিক সেরকম করবে সায়ন। তুমি পুলিশ হতে পারো। কোমরে রিভলবার থাকতে পারে। কিন্তু এতদিনে এটুকু নিশ্চয়ই বুঝেছ যে সব বিপদে পার্থিব অস্ত্র কাজে লাগে না! আজ তো তুমি এতক্ষণে শেষ হয়ে যেতে। তুমি আমায় বাঁচাতে ও বাড়ি গিয়ে আমায় যে কত বড়ো বিপদে ফেলেছিলে সে তুমি নিজেও জানো না। নেহাত তুমি যখন গেছ মন্ত্রটা তখন প্রায় শেষ তাই আসন ছেড়ে তোমাকে টানতে পেরেছি। তা-ও আমার সম্পূর্ণ শরীরটাকে আসন থেকে বিচ্যুত করিনি। তাই তোমায় বাঁচাতে পেরেছি আর নিজেও বেঁচেছি।’ সায়ন সত্যিই লজ্জিত। ‘সরি নীলাম্বরবাবু। আচ্ছা, আমি তো অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম। তারপর কী হল? ওই দাউ দাউ করে যে আগুন জ্বলছিল সেটা নেভালেন কী করে?’
— আমায় নেভাতে হয়নি। তুমি যখন অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলে তখনই সে আগুন আপনা থেকেই নিভে গেছে।
— কী করে?
— চণ্ডালের কাজ শেষ হলেই সে আপনা থেকে বিদায় নেবে আর আগুনও নিভে যাবে। তাই যখন আগুন আস্তে আস্তে নিভে এল তখন বুঝলাম চণ্ডাল তার কাজ সমাধা করেছে। সেই বিকট প্রেতকে তাড়িয়ে ছেড়েছে।
মৃন্ময়ীর চোখ দুটো চকচক করে উঠল। শোকের ভারে চিন্তায় যে ম্রিয়মানতা তার চেহারায় ছাপ ফেলেছিল সেটা যেন নিমেষের মধ্যে সরে গেল। খুব আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘তার মানে সেই প্রেত আর আমাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না! ও ভালো হয়ে যাবে?’
— না।
নীলাম্বরের বজ্রকন্ঠ বেজে উঠল। বুকের ভেতর ধক করে উঠল মৃন্ময়ীর। নীলাম্বর বললেন, ‘ওই আত্মা তোমাদের বাড়ির চৌহদ্দিতে আর ঢুকতে পারবে না। কারণ চণ্ডালের কাছে আমার সংকল্প ছিল ওই আত্মাকে তোমাদের বাড়ি থেকে বিতাড়িত করার। ও সেই কাজটাই করেছে।’
— আত্মাকে একেবারে শেষ করে দিলেন না কেন নীলাম্বরবাবু?
প্রশ্ন শুনে চুপ করে মুনাইয়ের দিকে তাকালেন নীলাম্বর। বললেন, ‘আত্মা অবিনশ্বর। সেটা করা সম্ভব ছিল না। ওই শরীর যে প্রতিশোধ নিতে এসেছে সেটা না করে ওর শেষ নেই। যে বীজমন্ত্রে ওকে জাগানো হয়েছে সেই বীজমন্ত্রেই ওর শেষ।’ সায়ন প্রশ্ন করল, ‘সেটা কী মন্ত্র? আপনি জানেন না?’ নীলাম্বর বলল, ‘মন্ত্ৰ জানলেই হয় না। তার সঙ্গে অনেক উপচার থাকে। অনেক ক্ষমতাবান অঘোরী সাধকের প্রয়োজন। যেটা আমি নই।’
— তাহলে এর বিনাশ কোথায়? আমি তো আর নিতে পারছি না।
মৃন্ময়ীর কথা শুনে হাত তুলে তাকে শান্ত হতে বললেন নীলাম্বর। আরও বললেন, চণ্ডালের যে করোটি পুড়ে ভস্ম হয়ে গেছে তার সেই ভস্ম সায়ন, মৃন্ময়ী, মুনাই আর সোনাইকে মাদুলির মধ্যে ভরে দেবেন। তারা যেন সেটা গা থেকে না খোলে। সায়ন জিজ্ঞেস করে, ‘তাহলে আমাদের এখন করণীয় কী?’
— ওই আত্মা এখন সবার আগে তার ক্ষতিসাধন করতে চেষ্টা করবে যাকে ও সবথেকে বড়ো শত্রু মনে করে। তাই মিহিরের সঙ্গে ওই অভিনেত্রী আর ক্যামেরাম্যান, কী যেন নাম
— তন্ময় হালদার।
— হ্যাঁ, ওই তন্ময়কে নজরে নজরে রাখতে হবে। আমার গণনা বলছে এই তিনজনের মধ্যেই ওই প্রেতাত্মার সবচেয়ে বড়ো শত্রু আছে। আর ও খুব শিগগিরি তাকেই আঘাত করবে।
মৃন্ময়ী সম্পূর্ণ আনমনা হয়ে বিড়বিড় করে ওঠে, ‘এখন আমরাও ওর সবচেয়ে বড়ো শত্রু নীলাম্বরবাবু। আমাদের বাড়ি থেকে ওকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।’ নীলাম্বর ঘাড় নেড়ে বললেন, ‘হুম। সেটাই আতঙ্কের সবথেকে বড়ো কারণ! এখন ও যাকে আক্রমণ করবে তোমরা ধরেই নিতে পারো সেই ব্যক্তিই এই আত্মার কোনো না কোনো ক্ষতি করেছিল।’
.
হঠাৎ সায়নের ফোনটা বেজে উঠল। প্রথমে একটু চমকেই গেল সবাই। সায়ন ফোন ধরেই বলল, ‘হ্যাঁ সূর্য বলো। এনিথিং সিরিয়াস?’ এরপর ফোনের ওপার থেকে যে কথাগুলো উড়ে এল তাতে সায়ন বেশ খুশিই হয়েছে মনে হল। ‘গ্রেট জব সূর্য। বেস্ট অফ লাক।’ বলেই ফোনটা নামিয়ে বিছানায় রাখল সায়ন।
— হ্যাঁ গো কী হয়েছে গো?
মুনাই প্রশ্ন করল।
— আত্রেয়ী সেন ভারমোরের যে হোটেলে উঠেছিল তার তৎকালীন ম্যানেজারের ঠিকানা পাওয়া গেছে।
— কোন জায়গার নাম বললে সায়ন?
ভ্রূ কুঁচকে প্রশ্ন করলেন নীলাম্বর। সায়ন বলল, ভারমোর। ওই হিমাচলের একটা প্রত্যন্ত জায়গা। টুরিস্ট যায় সেখানে, তবে কম।’ নীলাম্বরের চোখে-মুখে অদ্ভুত এক আলোছায়ার খেলা লক্ষ করল সায়ন। অবাক হয়ে প্রশ্ন করল, ‘আপনি ওখানে গেছেন নীলাম্বরবাবু?’ উত্তর দিলেন না নীলাম্বর। বরং পালটা প্রশ্ন করলেন, ‘ভারমোরের সঙ্গে এই অভিনেত্রীর কেসের কী সম্পর্ক?’ সায়ন বলল, ‘আত্রেয়ীর বর্তমান প্রেমিক এই তন্ময় হালদার। আজ থেকে সাড়ে ছয় বছর আগে ওরা দুজন ভারমোরে বেড়াতে যান। আত্রেয়ীর স্বামী ছিলেন শান্তনু নিয়োগী নামের এক ফোটোগ্রাফার। সেই সময় আত্রেয়ীর স্বামীর সঙ্গে সম্পর্ক ভালো যাচ্ছিল না। যখন ওঁর স্ত্রী আর তার প্রেমিক ভারমোরে ছিলেন, ঠিক সেই সময় হঠাৎ করে শান্তনুও একদিন ভারমোরে চলে যান তার স্ত্রীকে না জানিয়ে। তারপর থেকে শান্তনুর আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। আত্রেয়ী বলেছিল শান্তনু সব ছেড়ে দিয়ে চলে গেছেন। উনি আর ফিরে আসবেন না বলেছেন। তখন পুলিশ কেসও কিছু হয়নি, কারণ শান্তনুর খোঁজ নেবার কেউ ছিল না। এখন খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে ওই হোটেলের রেজিস্টারে শান্তনুর কোনো নাম নেই এমনকি আত্রেয়ীরও কোনো নাম নেই। কেবল তন্ময়ের নাম আছে। ওই সময়ে যিনি ম্যানেজার ছিলেন তিনিও সাড়ে ছয় বছর আগে হোটেলের চাকরি ছেড়ে চলে যান। কিন্তু শান্তনু কোথায় গেল? একটা জলজ্যান্ত লোক তো আর হাওয়ায় উবে যেতে পারে না। তখনকার পুলিশ রেকর্ড ঘেঁটেও দেখা গেছে সেই সময় যারা মারা গেছেন, সে খুন হয়েই হোক, আত্মহত্যাই হোক বা দুর্ঘটনা, শান্তনুর কোনো ট্রেস পাওয়া যায়নি। না কোনো বেওয়ারিশ লাশ।’ নীলাম্বর বললেন, শান্তনুর কোনো ছবি?’
— অদ্ভুত ব্যাপার জানেন। আত্রেয়ীর বাড়িতে শান্তনুর কোনো জিনিসের চিহ্ন নেই। অনেক কষ্টে স্টুডিয়ো পাড়ার একজনের কাছ থেকে একটা পুরোনো ছবি জোগাড় করতে পেরেছি।
বলতে বলতে সায়ন আলতো চালে হাসে, বলে, ‘আসলে ফোটোগ্রাফাররা সবার ছবি তুললেও ফোটোগ্রাফারদের খুব একটা ছবি পাওয়া যায় না।’
— দেখাতে পারো ছবিটা?
নীলাম্বরের দিকে নিজের মোবাইলটা বাড়িয়ে দিল সায়ন। বাইরে পাখি ডাকছে। কিন্তু জানলার কাচে তখনও অন্ধকার জাপটে আছে। চশমাটা চোখের সামনে পেছনে করে মোবাইলের ছবিটা ভালো করে দেখলেন নীলাম্বর। ছবিটার ওপর হাত রেখে খানিক চোখ বুজে থাকলেন। সায়ন, মৃন্ময়ী আর মুনাই অবাক হয়ে দেখছিল নীলাম্বরকে। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মোবাইলটা সায়নের দিকে বাড়িয়ে দিলেন। মুনাই ছবিটা দেখল। পাশে বসে মৃন্ময়ী হাই তুলছিল। তখন ছবিটা দেখে মুনাই মোবাইলটা সায়নের দিকে বাড়িয়ে দিচ্ছিল। ঠিক তখনই এক ঝলকে ছবিটা যেন টেনে ধরল মৃন্ময়ীর চোখ। ‘এই দেখি দেখি’ বলে মোবাইলটা মুনাইয়ের হাত থেকে নিয়ে ছবিটাকে ছোটো-বড়ো করে ভালো করে দেখতে লাগল মৃন্ময়ী। হঠাৎ বলে উঠল, ‘এ-এই তো, এই তো সেই লোক।’ সায়ন সোজা হয়ে বসল। মুনাই আর নীলাম্বর অবাক। মুনাই বলল, ‘তুমি চেনো নাকি বউদি?’ সায়ন জিজ্ঞেস করল, ‘কোন লোক? কোথায় দেখেছ একে?’ মৃন্ময়ী বলল, ‘বোলপুরের চৌধুরি ভিলাতে।’
— হোয়াট? কী বলছ তুমি?
সায়ন আকাশ থেকে পড়ল। ‘হ্যাঁ সায়ন, এই সেই লোক। আমরা যখন চৌধুরি ভিলাতে গিয়েছিলাম তখন এই লোকটাই দোতলা থেকে আমাদের দেখছিল। আমি তো একেই ওই বাড়ির কেয়ার টেকার ভেবেছিলাম। একটা ধূসর রঙের জামা ছিল গায়ে।’ সায়ন একটু হালকা ছলেই কথাটা নিল এবার। ‘তোমার কোথাও ভুল হচ্ছে না তো বউদি? আসলে ওই অত দূর থেকে একটা লোককে দেখেছ তো!’ মৃন্ময়ী এবার গম্ভীর হয়ে বলল, ‘ভুল আমার হতেই পারত যদি লোকটাকে ওই অত দূর থেকে আমি একবারই দেখতাম। কিন্তু আমি যে এই লোকটাকে ভীষণ কাছ থেকে দেখেছি সায়ন। এই যেমন তোমাদের দেখছি। সেই একই রঙের শার্ট। শার্ট ঠিক নয়, ওই গেঞ্জি কাপড়ের টি-শার্ট ছিল।’
— আবার কখন দেখেছ?
সায়ন প্রশ্ন করল। মৃন্ময়ী বলল, ‘ছাদে উঠে তোমরা যখন কথা বলছিলে। তখন আমি তোমাদের থেকে একটু পেছনে দাঁড়িয়েছিলাম। অত বড়ো ছাদটাকে ভালো করে দেখছিলাম।’ কথাগুলো বলতে বলতে সেদিনের দৃশ্যগুলো নতুন করে যেন মৃন্ময়ীর সামনে ফুটে ওঠে। চৌধুরি ভিলাকে ঘিরে থাকা ঝাঁকড়া গাছগুলো, ছাদের আনাচ-কানাচ দেখতে দেখতে মুখটা যেই সিঁড়ির দরজার দিকে ঘুরিয়েছে অমনি মৃন্ময়ী কেমন যেন স্তব্ধ হয়ে যায়। ধূসর রঙের টি-শার্ট আর কালো প্যান্ট পরা লোকটা সোজা মৃন্ময়ীর চোখের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মৃন্ময়ী সায়নের দিকে তাকিয়ে বলতে চাইল, ‘সায়ন, ওই তো উনি এসেছেন।’ কিন্তু বলতে চাওয়াই সার। মৃন্ময়ীর শরীরের ভেতরটা নড়েচড়ে উঠলেও বাইরের খোলসটা প্রস্তরমূর্তির মতো স্থির, শক্ত। অবাক হয়ে ভ্ৰূদুটো কুঁচকে কাছাকাছি আসতে চাইলেও কপালের চামড়ায় একটুও ভাঁজ পড়ল না। মৃন্ময়ীর ষষ্ঠেন্দ্রিয় বুঝতে পারে, লোকটার দৃষ্টি ঠান্ডা হয়ে যাওয়া মৃত শরীরের মতো। কোনো ভাব নেই, অভিব্যক্তি নেই। অথচ কী ভয়ানক টান আছে! মৃন্ময়ীকে টানছে। ওর শরীর পাথর হয়ে গেলেও ভেতর থেকে মৃন্ময়ী বুঝতে পারে লোকটা মূর্তির মতো গোটা শরীরটাকে সমান রেখে পেছন দিকে ঘুরে গেল। তারপর সিঁড়ি দিয়ে নেমে চলেছে। এতক্ষণ সায়ন আর অন্যান্য পুলিশের কথা কানে এলেও এখন যেন গোটা ব্রহ্মাণ্ডের কোনো শব্দই মৃন্ময়ীর কান পর্যন্ত পৌঁছোতে পারছে না। মৃন্ময়ীও যন্ত্রচালিত রোবটের মতো লোকটিকে অনুসরণ করে। সিঁড়ি দিয়ে নেমে বাঁ-দিকের করিডর ধরে সোজা গিয়ে ডানদিকে বেঁকে যায়। কয়েক পা হাঁটতেই মৃন্ময়ীর অন্তরাত্মা বোঝে লোকটি কিছুক্ষণ আগে বারান্দার এই কোণের ঘরের সামনেই দাঁড়িয়ে নীচের দিকে তাকিয়ে ছিল। না, এখন আর লোকটি সেখানে দাঁড়াল না। সোজা কোণের ঘরটায় ঢুকে গেল। অবশ যন্ত্রমানবের মতো মৃন্ময়ীও ঘরে ঢুকল। লোকটি উলটোদিকের জানলার বাইরে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ বুকের ভেতরটা অজানা ভয়ে ছ্যাঁক করে উঠল। মৃন্ময়ী এবার বুঝতে পারল যে সে নিজের ইচ্ছেমতো তার শরীরটাকে নড়াতে পারছে না। দুটো ভ্রূর মাঝে ভাঁজ পড়ল তার। গলা দিয়ে স্বর বেরোল। কে আপনি? এখানেই-বা নিয়ে এলেন কেন? মৃন্ময়ীর প্রশ্ন করা শেষ হলে লোকটির শরীর থেকে কট কট করে কী যেন শব্দ হতে থাকে। দৃষ্টিটা মাথা ছেড়ে কোমরের পাশে ঝুলে থাকা হাতের দিকে পড়তেই মৃন্ময়ী দেখে হাতের আঙুলগুলো নিজে থেকেই ভেঙেচুরে বেঁকে যাচ্ছে। কোনো মানুষের হাত এইভাবে বেঁকে ভেঙে ঘুরতে পারে না। ভয়ে বিস্ফারিত হয়ে যায় মৃন্ময়ীর চোখ। লোকটা এবার মৃন্ময়ীর দিকে ঘুরছে। কট কট করে হাড়ে হাড়ে ঠোকা লাগার শব্দটা কানের পর্দায় এসে বিঁধছে। তবু কানে হাত চাপা দিতে পারছে না মৃন্ময়ী। শুধু কাঁপছে। থরথর করে কাঁপছে। লোকটা ঘুরে তাকাতে তাকাতে চোখের পলকে ঝড়ের বেগে হঠাৎ মৃন্ময়ীর মুখের সামনে চলে আসে। হাঁ করে আঁতকে উঠে দু-পা পিছিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে মৃন্ময়ী। মুহূর্তের মধ্যে তার চোখদুটোকে ঝলসে দেয় ধবধবে সাদা দুটো চোখ আর ভয়ংকর একটা মুখ। না না, ঠিক মুখ নয়। রক্ত-মাংস একে অপরের সঙ্গে মিশে গিয়ে একটা গা-গুলোনো প্রাণ কেড়ে নেওয়া প্রতিমূর্তি। মৃন্ময়ী চিৎকার করতে চেয়েছিল। কিন্তু পারেনি।
.
মোবাইলটাকে বিছানায় ফেলে দিয়ে দু-হাতে মুখ ঢেকে নিয়েছে মৃন্ময়ী। আর সে কক্ষনো দেখতে চায় না সেই ভয়ানক বীভৎস মুখটা। মুনাই বউদিকে জড়িয়ে ধরে বলে, ‘তার মানে আমিও সেই একই মুখ দেখেছি বউদি। রক্ত-মাংসে দলা পাকানো হাড় হিম করে দেওয়া সাদা চোখ। সায়নও বলল, ‘বৃষভানু, তেঁতুল এরা সবাই ওই একই চোখ দেখেছে। শুধু শরীরটা ছিল মিহির সরখেলের।’ চোখ ভরতি জল আর আতঙ্কের কালো ছায়া নিয়ে সায়নের দিকে তাকাল মৃন্ময়ী, ‘প্রত্যেকটা খুন ওই লোকটাই করেছে। আর সবাই ভেবেছে তোমার দাদাভাই…।’ সবটা বলতে পারল না। গলা বুজে এল। ঢোঁক গিলে মৃন্ময়ী বলল, ‘এবার বুঝতে পারছ তো সায়ন, আমি সেদিন লক আপে ভুল দেখিনি! অন্ধকারে মুখ লুকিয়ে বসে থাকা লকআপের সেই লোকটা এই লোকটাই, শান্তনু নিয়োগী। সে তো মানুষ নয়। সে প্রেতাত্মা। আইনকে কীভাবে মানাবে জানি না। কিন্তু আমি হান্ড্রেড পার্সেন্ট শিয়োর, শান্তনুকে কেউ না কেউ খুন করেছিল। আজ সে তারই প্রতিশোধ নিচ্ছে। শুধু একটা কথাই বুঝতে পারছি না, এর মধ্যে তোমার দাদা, আমরা কীভাবে, কেন জড়িয়ে পড়লাম? নীলাম্বরবাবু প্লিজ আপনি কিছু করুন। প্লিজ।’ মৃন্ময়ী কেঁদে ফেলে। জানলার কাছে ভোরের আলোর ছায়া। পাখির ডাকও বেড়েছে আগের থেকে। এতক্ষণ চুপ করে বসেছিলেন নীলাম্বর। কোনো কথা বলেননি। মৃন্ময়ীর কথার পর মাথাটা তার নীচু হয়ে গেল। সায়ন বলল, ‘শান্তনুর আত্মা ফিরে এল প্রতিশোধ নিতে। কিন্তু সাড়ে ছয় বছর পর কেন?’ চশমার কাচের আড়ালে দুটো চোখ বুজে নিলেন নীলাম্বর। ঘরের মধ্যে রহস্যের ঘনঘটায় থমথমে নিস্তব্ধতা। এ এক এমন রহস্য যার অপরাধীকে সবাই চেনে। কিন্তু ধরতে পারছে না। অপরাধ কী সেটাও প্রায় সকলেই আন্দাজ করতে পারছে। কিন্তু প্রমাণ মিলছে না। এখন শুধু সমাধানের পথ খোঁজা আর অপেক্ষা, সঠিক সময়ের।
— সায়ন, আমায় একবার মিহির, তন্ময় আর আত্রেয়ীর কাছে নিয়ে যেতে পারো?
নীলাম্বর অনেকক্ষণ চুপ থেকে কথাটা বললেন। সায়ন বলল, ‘নার্সিংহোমে কথা বলে দেখছি। আত্রেয়ীর তো জ্ঞান এসেছে। দাদাভাই আর তন্ময়ের রক্তও লাগছে না। আশা করছি হলেও হতে পারে।’
— আজ তোমরা কেউ বেরিয়ো না। আমার মাদুলিটা বানাতে আজকের দিনটা লাগবে।
নীলাম্বরের কথা শুনে সায়ন বলল, ‘দেরি হয়ে যাবে না? এর মধ্যে ও যদি কারও ক্ষতি করে বসে!’
— দ্যাখো সায়ন, এ তো কোনো সাধারণ মানুষ নয়। এ এক অপশক্তি। অলৌকিক শক্তি তার। তাড়াহুড়ো করে কোনো লাভ তো হবেই না বরং নিজের প্রাণসংশয় হবে। আর নিজেদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিলে বাকিদের বাঁচাবে কী করে? তবে নিশ্চিন্তে থাকো, ওই আত্মা একটা অনেক বড়ো ধাক্কা খেয়েছে। কালভৈরবের আঘাত বড়ো আঘাত। সেটা সামলে আবার ঘুরে দাঁড়ানো ওই আত্মার পক্ষে আজকেই সম্ভব হবে না। ও বুঝে গেছে ওর শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়াবার ক্ষমতা আমাদেরও আছে। তাই আজই মিহিরের কোনো ক্ষতি তো করবেই না, আত্রেয়ী বা তন্ময়ের ক্ষতিও করতে দু-বার ভাববে। ও এই মুহূর্তে এমন কোনো স্থান ওর নিজের জন্য বাছবে যেখানে ও ওর নিজের শক্তি ফিরে পায়
মুনাই জিজ্ঞেস করল, ‘সেটা কোন জায়গা হতে পারে?’ উত্তর দিলেন না নীলাম্বর। চুপ করে থাকলেন।
