মৃত জ্যোৎস্নার রাত্রি – ৩১
একত্রিশ
হিমাচলের ভারমোর থেকে গাড়িতে নিউ দিল্লি পৌঁছোতে গেলে প্রায় বারো-তেরো ঘণ্টার ধাক্কা। তাই সূর্য ঠিক করে ভারমোর থেকে পাঁচ-সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা গাড়িতে জার্নি করে পাঠানকোট এয়ারপোর্টে পৌঁছে সেখান থেকে ফ্লাইটে নিউ দিল্লি পৌনে দু-ঘণ্টা। সবমিলিয়ে সাত-আট ঘণ্টা। চার-পাঁচঘণ্টা তো বাঁচবে। কিন্তু কপালের কাছে মানুষ বড়ো অসহায়। ভারমোর থেকে ফেরার পথে যেখানে ইরাবতী আর রাভি মিলেমিশে একটাই নদী হচ্ছে সেখানকার নাম খাড়ামুখ। আর সেই মুখেই একটি বড়ো গাড়ি খারাপ হয়েছে। একে সরু পাকদণ্ডী। একটা গাড়ি গেলে আর-একটা গাড়ি পাশ দিয়ে যাওয়া মানে হাতে জীবন নিয়ে যাওয়া। তার ওপর গাড়ির লম্বা লাইন। এখান থেকে যে থানায় খবর দিয়ে রাস্তা পরিষ্কারের কথা বলবে তারও উপায় নেই। খাড়ামুখ থেকে বেশ খানিকটা আগেই সূর্যের গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়েছিল। সেখানে মোবাইলের টাওয়ার নেই। অগত্যা ঝাড়া তিনঘণ্টা সেখানে দাঁড়িয়ে থাকার পর গাড়ি ছাড়ল। সকাল এগারোটা পঞ্চাশের ফ্লাইট মিস করল। ডিপার্টমেন্টকে জানিয়ে পরের ফ্লাইটে টিকিট কাটার ব্যবস্থা করে এয়ারপোর্টেই অপেক্ষা করে সূর্য। ওয়েটিং লাউঞ্জে বসেই ফোন করে সায়নকে রাস্তার বৃত্তান্ত সব জানিয়ে দেয়। বাকি রাস্তায় যদি আর কোনো অসুবিধেয় নাও পড়ে গন্তব্যে পৌঁছোতে প্রায় সন্ধে হয়ে যাবে।
.
সোনাইয়ের খিলখিল হাসিতে গোটা বাড়িটা ঝলমল করছে। সে যত কোমর দুলিয়ে নাচে, তার পিসি তত কোমর দুলিয়ে হাত ঘুরিয়ে মজাদার অঙ্গভঙ্গি করে নাচতে থাকে। পাশের ঘর থেকে সায়ন চুপচাপ খেয়াল করছে আর নিজের মনে হাসছে। কয়েক মুহূর্তের জন্য যেন এই লোকগুলোর ওপর থেকে অশরীরীর অশুভ ছায়া সরে গেছে। সায়ন এক দৃষ্টে সোনাইয়ের সঙ্গে মুনাইকেও লক্ষ করছে। এমন করে নাচতে সে তার ভালোবাসাকে কক্ষনো দেখেনি। পিসি-ভাইপোর নাচানাচি দেখতে দেখতে আনমনেই ঘরের দরজার কাছে চলে যায়। মুনাইয়ের মুখের দু-পাশের চুলগুলো ঢেউ খেলিয়ে চোখের ওপর পড়ছে আবার নাচের তালে মুখের পাশে সরে কাঁধের ওপর ঝুঁকে পড়ছে। কতদিন পর এইভাবে সায়ন তার মুনাইকে দেখছে। সায়নের দিকে চোখ পড়তেই মুনাই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে। অকস্মাৎ পিসির এমন নাচ থামিয়ে দেওয়ায় সোনাইও ব্যোমকে যায়। মুনাই লজ্জা পেয়ে বলে, ‘তুমি আবার এ ঘরে এলে কেন? যাও না ও ঘরে।’ ঠোঁটের ওপর প্রেমিক-প্রেমিক হাসি ছড়িয়ে সায়ন বলে, ‘তুমি যে এত ভালো নাচো জানতাম না তো।’ মুনাই যেন আরও লজ্জায় কুঁকড়ে যায়। ঠোঁটের ওপর আঙুল দিয়ে বলে, ‘চুপ। রান্নাঘরে মা আছে। শুনতে পাবে।’ সায়ন এবার ঘরে ঢুকে যায়, ‘ওমা ভালো তো। তার বউমার ভেতর যে এত গুণ একবার দেখে যাক।’ মুনাই লজ্জায় লাল হলে সায়নের দেখতে বেশ মজা লাগে। তাই শেষের কথাগুলো রান্নাঘরে থাকা মায়ের কানে যাতে পৌঁছোয় সেই জন্য গলা তুলে বলে।
— অ্যাই, কী করছ বলো তো। অসভ্য একটা
ঠিক তখনই মৃন্ময়ী সোনাইকে ডাকে স্নান করাবার জন্য। সে তো তুড়ুক তুভুক লাফিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায়। গলায় কপালে ফুটে-ওঠা ঘাম মুছে পাশ ফিরতেই সায়ন তার নিজের বুকে টেনে নেয় মুনাইকে। ‘কী করছ কী, দরজা খোলা আছে তো।’ দিনদুপুরে বর-বউয়ের সোহাগ দেখে ফেললে মুখ দেখাতে পারবে না মুনাই। তাই নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে চায়। কিন্তু পুলিশের থাবা! বাবা! সে ছাড়িয়ে বেরোয় কার সাধ্যি। সায়ন রেলা নিয়ে বলে, ‘আমি আমার বিবাহিত বউকে জড়িয়ে ধরেছি। কার কী বলার আছে?’
— তাই নাকি? আসুক না মা, দেখব কত জড়িয়ে থাকতে পারো। ছাড়ো এখন যাই।
— শোনো না, শোনো না।
— কী হল আবার?
— বলছি, আমাদের কবে সোনাই হবে গো?
— উঁ?
ভ্রূ কুঁচকে মাথাটাকে পিছন দিকে ঝুলিয়ে সায়নের দিকে তাকায় মুনাই। সায়ন বলে, ‘উঁ আবার কী? আমাদের সোনাই কবে হবে?’
— হবে না।
— মানে?
— সোনামণি হবে।
সায়ন ফিক করে হেসে ফেলে। এবার আরও একটু বেশি বউকে জাপটে ধরে বলে, ‘সে যাইহোক। কিছু একটা আমার চাই। আমি বেশ তার সঙ্গে তোমার মতো নাচব।’
— হ্যাঁ সেই। বউকে টাইম দেবার সময় নেই, তুমি নাকি বাচ্চার সঙ্গে নাচবে!
আহ্লাদি মুখভঙ্গি করে সায়নের হাত ছাড়িয়ে খাটে গিয়ে বসে। সায়নের মুখে অসহায়তা। ‘সত্যি মুনাই, কতদিন হয়ে গেল আমাদের মধ্যে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক তো দূর, একটু ভালো করে কথাও হয় না। কবে যে সব স্বাভাবিক হবে!’ সায়নও মুনাইয়ের পাশে চুপ করে বসে পড়ে। মাথা থেকে শরীর জুড়ে দমবন্ধ করা ক্লান্তিগুলো মাকড়সার মতো জাল বুনে চলেছে। মুনাই বলে, ‘সব ঝামেলা মিটে যাক, দাদাভাই ভালোয় ভালোয় বাড়িতে ফিরে আসুক। তারপর আমি আর তুমি কোথাও একটা ঘুরতে যাব।’ সায়ন হেসে সম্মতি জানায়। হঠাৎ মোবাইলের রিংটোনের শব্দ। সায়ন দৌড়ে চলে গেল পাশের ঘরে। সেখানেই মোবাইলটা রেখে এসেছে। মুনাই শুধু ড্যাপড্যাপ করে চেয়ে থাকল।
.
— হ্যাঁ সোমদত্তা বলো।
— স্যার আমি কেয়ার অ্যান্ড কিয়োরের সামনে দাঁড়িয়ে আছি।’
— আচ্ছা! খোঁজ নিয়েছ?
— হ্যাঁ স্যার। গত এক বছরে বন্দনা দত্ত নামের কেউ এখান থেকে কোনোরকম সোনোগ্রাফি করায়নি। ইনফ্যাক্ট এই রিপোর্টটা ফেক।
সায়ন হাওয়ায় একটা ঘুষি মেরে বলে, ‘জানতাম। জানতাম আমি। যখন থেকে জেনেছি আত্রেয়ী সেনের বাড়ি থেকে পাওয়া ট্যাবলেটটা একটা কনট্রাসেপ্টিভ পিল তখনই বুঝেছি কিছু একটা গণ্ডগোল আছে।’
— এখানেই শেষ নয় স্যার।
— মানে?
— সোনোগ্রাফির পর যে ছবিটা দেওয়া হয় এক্স-রে প্লেটের মতো সেটা কিন্তু আসল স্যার। কারণ ওই রিপোর্টে একটা ব্যাচ নম্বর থাকে। যে ব্যাচ নম্বরটা এদের এখানকার। কিন্তু তার পেশেন্টের নাম সালমা খাতুন। এই বন্দনা দত্তের রিপোর্টে যে ডেট দেওয়া আছে সেই একই ডেটে সোনোগ্রাফি করিয়ে ছিল।
যত শুনছে ততই সায়নের চোখ ছোটো হয়ে যাচ্ছে। একটা নির্দিষ্ট বিন্দু যেন সায়নের চোখের সামনে ফুটে উঠছে।
— বন্দনাকে তুলে আনি স্যার?
সোমদত্তা বলল।
— একদম না। বরং ব্যাপারটা পুরো চেপে যাও। আমি নিশ্চিত যে বন্দনা এই সালমা খাতুন মেয়েটিকে চেনে। অ্যাড্রেস পেয়েছ তো?
— হ্যাঁ স্যার। অ্যাড্রেস, ফোন নম্বর সব।
— এক কাজ করো। ফোন করবে না খবরদার। তুমি ভেতর থেকে লোক লাগিয়ে এই সালমা খাতুনের খোঁজ নাও। প্রয়োজন হলে নিজে যাও। ডিরেক্ট ওর বাড়ি যাবে না। পাড়াপ্রতিবেশী, লোকাল দোকান এইসব জায়গা থেকে সালমা খাতুনের কেসটা যাচাই করো। আর বন্দনার ওপর চব্বিশ ঘণ্টা নজর রাখো।
— ওকে স্যার।
— আপডেট জানাবে আমায়।
— স্যার।
.
রাজধানীর রাস্তায় সন্ধে নেমেছে। স্ট্রিট লাইটের আলো ভরিয়ে রেখেছে সন্ধেটাকে। মেন রোড ছেড়ে গলির মধ্যে দু-মিনিট হাঁটা। কয়েকটা বড়ো বড়ো বাড়ি পেরিয়ে সবুজ রঙের দরজা। তার পাশে শুধু বাড়ির নম্বরটা দেওয়া। মোবাইলে সেভ করা নম্বরের সঙ্গে মিলিয়ে নিল সূর্য, ফোর বাই ওয়ান ওয়ান জিরো, ডি কে গার্ডেন। সবুজ দরজার পাশেই ছোট্ট একটা সুইচ। সেটাকে দু-বার বাজাতেই দরজা খুলে যায়। এক মাড়োয়ারি ভদ্রমহিলা প্রায় মাথার সামনে পর্যন্ত ঘোমটা টেনে বেরিয়ে আসেন। কিন্তু শাড়িটা শিফন বা সিল্ক জাতীয় হওয়াতে ঘোমটাটা পেছনের দিকে সরে যায়। বেরিয়ে পড়ে মেটে রঙের সিঁদুরে ভরা সিঁথি। সিঁথির পাশ থেকে বেশ কিছু পাকা চুল মাথার মাঝখানটা সাদা করে রেখেছে। ধরা গলায় মহিলাটি বললেন, ‘জি বোলিয়ে।’ সূর্য একটা চেক শার্ট আর নীল জিনস পরে গেছে তাই বোঝার উপায় নেই যে সে পুলিশ। সূর্য জিজ্ঞেস করল, ‘ইয়ে পঙ্কজ শর্মা কা ঘর হ্যায়?’
— হাঁ। পর উও তো ঘর পর নেহি হ্যায়।
— কাঁহা গয়ে?
— আপ কৌন হ্যায়?
মহিলার পালটা প্রশ্নে সূর্য একটু থমকাল। বলল, উনকা পুরানা দোস্ত।’ বলেই আবার প্রশ্ন করল, ‘পঙ্কজ কাঁহা হ্যায়?’ মহিলা এবারেও উত্তর দিল না। উলটে জিজ্ঞেস করল, ‘আপকা নাম?’ সূর্য বুঝল, এই মহিলাকে দেখতে ভোলাভালা হলেও আদতে বেশ চৌখস। এবার সূর্য পালটা প্রশ্ন করল, ‘আপ পঙ্কজ কা…।’ প্রশ্নটা পুরো হবার আগেই মহিলা বললেন, ‘ওয়াইফ। আপ কা নাম?’
— আমার নাম, মেরা নাম সূর্য। সূর্য দাশগুপ্ত।
নামটা শোনামাত্রই মহিলাটির মুখ আলতো হাসিতে ভরে যায়। বলেন, ‘ও! আপ জরুর উনকা মামাজি কা রিশতেদার হ্যায় না?’ সূর্যের একটু অবাকই লাগল। এই নামে নিশ্চয়ই কেউ ওদের পরিচিত আছেন। সূর্য কিছু বলল না। একটু হাসি হাসি ভাব এনে বলল, ‘পঙ্কজকো একবার বুলাইয়ে। কুছ জরুরি বাত করনা হ্যায়।’
— উও তো ইঁহা নেহি হ্যায়। পিছলে দো সাল হরিয়ানা মে কাম কর রহে হ্যায়।
— হরিয়ানা!
মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল সূর্যের। হিমাচল থেকে দিল্লি এসে আবার হরিয়ানা! মহিলা বললেন, ‘হাঁ, দো সাল হো গয়ে।
— হরিয়ানা মে কাঁহা?
— মোরনি। উও যো বড়া হোটেল হ্যায় না, রয়্যাল রিট্রিট। উনকা ম্যানেজার হ্যায়। আপ ভিতর আইয়ে না। থোড়া চায়ে
— নো। থ্যাংক ইউ।
বলেই সূর্য হনহন করে হাঁটতে থাকে। মহিলাটি অবাক হয়ে সূর্যের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে। গলিটার মুখে বড়ো রাস্তার ওপর দিল্লির পুলিশ দাঁড়িয়েছিল। তাদের সূর্য সবটা জানিয়ে বলল, ইমিডিয়েট মোরনি পুলিশ স্টেশনে জানিয়ে দিতে। লোকটা যেন কোনোভাবে সেখান থেকে পালাতে না পারে। কারণ সূর্যের সিক্সথ সেন্স বলছে এই মহিলা যদি কোনোভাবে পঙ্কজকে ফোন করে সূর্যের কথা জানায় তাহলে সে কিছু-একটা আন্দাজ করতেই পারে। এই মুহূর্তে মোরনিতে পৌঁছোবার ব্যবস্থা যেন করা হয়। কিন্তু দিল্লি পুলিশের একজন জানালেন, আজ রাতে না গিয়ে কাল সকালে গেলে ভালো হয়। কারণ দিল্লি থেকে মোরনি প্রায় তিনশো কিলোমিটার। যেতে সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা লেগে যাবে। মাঝে রাস্তাও খুব ভালো নয়। সন্ধে সাড়ে সাতটা বেজে গেছে। এখন রওনা দিলে রাস্তার যা অবস্থা তাতে পৌঁছোতে রাত দুটো তো বাজবেই। তার চেয়ে ওদের ওখানকার পুলিশ লোকটির ওপর নজর রাখুক। কাল সকালে ওখানে পৌঁছে জেরা করা যাবে। সূর্য ভেবে দেখল কথাটা ঠিক। তাই সেই রাতটা দিল্লির একটা হোটেলে থেকে গেল।
.
ভোর রাতে খবরটা পেয়েই সকাল হতে না হতে অবনীশকে জানায় সায়ন। সকাল ন-টার মধ্যে ড্যাফোডিলে চলে আসতে বলে অবনীশ। জানায় সে-ও থাকবে। সোমদত্তাকে সঙ্গে নিয়ে সায়ন সময়মতো হাজির। ডক্টর বিশাখ চ্যাটার্জির ট্রিটমেন্টে ছিল তন্ময় হালদার। কাল থেকে সে কথা বলছে। লোকজনকে চিনতেও পারছে। পুলিশের কাছে এ যেন হাতে চাঁদ পাওয়া। তবু ডক্টরের কড়া নির্দেশ, ‘এমন কোনো প্রশ্ন করবেন না যাতে পেশেন্ট উত্তেজিত হয়ে পড়েন। ম্যাক্সিমাম তিনটে কি চারটে প্রশ্ন।’ সায়ন বলে, ‘জাস্ট দুটো প্রশ্ন করব, আপাতত।’
— ওকে। যান।
— থ্যাংক ইউ ডক্টর।
.
অক্সিজেন মাস্ক খুলে দিয়েছে। শরীরে দুটো নল ঢোকানো। হাতে, বুকে আর পায়ে ব্যান্ডেজ। চোখ বন্ধ করে শুয়েছিল তন্ময়। পুলিশ ঢুকেছে দেখে নার্স উঠে দাঁড়ায়। ফিশফিশ করে সায়ন জিজ্ঞেস করে, ঘুমোচ্ছেন?’ নার্স মাথা নেড়ে না বলেন। সোমদত্তাকে চোখের ইশারা করে সায়ন। সোমদত্তা একবার চোখের পাতা ফেলে মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। তন্ময়ের পাশে গিয়ে দাঁড়ায় সায়ন, অবনীশ আর সোমদত্তা। ঘরের মধ্যে মেশিনের পিক পিক শব্দ ছাড়া দ্বিতীয় কোনো শব্দ নেই। নার্স তন্ময়কে ডাকে, ‘তন্ময়বাবু, দেখুন আপনার সঙ্গে দেখা করতে ওঁরা এসেছেন।’ নার্সের এক ডাকেই চোখ মেলে চাইল তন্ময়। চোখ জুড়ে ঘুমের ঘোর। এত ওষুধ পড়ছে এ তারই জের। পুলিশকে দেখে তন্ময়ের আধবোজা চোখটা বেশ বড়ো করে খুলে গেল। যদি না বুঝতে পারে তাই সায়ন ওপর-নীচে মাথা দুলিয়ে ঠোঁটদুটোকে একটু বেশি নাড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কেমন আছেন?’ তন্ময় ঘাড় নাড়ল। তন্ময়ের চোখের মণিদুটো অবনীশ আর সোমদত্তাকে দেখে নিল। সায়ন নার্সকে বলল তিনি যদি একটু বাইরে যান তাহলে সুবিধে হয়। নার্স বেরিয়ে গেল। অবনীশ খেয়াল করল নার্স চলে যাওয়াতে তন্ময় একটু অস্থির হয়ে পড়েছে। চোখটা একবার নার্সের চলে যাওয়ার দিকে, আর-একবার পুলিশের দিকে ঘুরে চলেছে। অবনীশ বলল, ‘ঘাবড়াবেন না। সায়নবাবু আপনাকে জাস্ট দুটো প্রশ্ন করবে। আপনি চটপট তার সঠিক উত্তরটা দিয়ে দিলেই আমরা বিদেয় হব।’ চঞ্চল চোখের পাতা একটু স্থির হল তন্ময়ের। সোমদত্তা মোবাইলটা বের করে রেকর্ডিং অন করল। সায়ন প্রশ্ন করল, ‘আপনি তো আত্রেয়ী ম্যাডামের বন্ধু, মানে বিশেষ বন্ধু। আপনাদের সম্পর্ক এতটাই ঘনিষ্ঠ, মানে আপনারা এতটাই আপন যে ম্যাডামের বাড়ির ডুপ্লিকেট চাবি আপনার কাছে থাকে। এমনকি বাড়ির আলমারির সিন্দুকের চাবিও। তাই তো?’
শোয়া অবস্থাতেই একটু নড়েচড়ে উঠল তন্ময়ের শরীরটা। চোখদুটো আবার এপাশ-ওপাশ ছোটাছুটি করছে। মুখে কোনো কথা নেই। সায়নও খানিক চুপ থেকে তন্ময়কে অবজার্ব করল। উত্তর না পেয়ে সায়নই কথা বলতে শুরু করল, ‘যাক মৌন থাকা সম্মতির লক্ষণ বলেই ধরে নিলাম। একটা কথা বলুন, আত্রেয়ী সেনের বাড়ির কাউকে আপনি চেনেন? মানে বাবা, মা, ভাই, বোন!’ তন্ময় দেরি না করে দু-পাশে ঘাড় নাড়ল। সায়ন মুখটাকে বাংলার পাঁচের মতো করে খানিক সন্দেহ উগরে দিল, ‘চেনেন না! আপনি আত্রেয়ীর এত ভালো বন্ধু। এ-এটা কী হতে পারে বলুন তো তন্ময়বাবু?’
— আত্রেয়ী আমায় কিছু বলেনি।
তন্ময় মুখ খুলল। গলায় যে কোনো জোর নেই সেটা ভালোই বোঝা যাচ্ছে। সায়ন হালকা করে জোর দিল, ‘দেখুন আপনি ভীষণ অসুস্থ। আপনাকে চাপ দেবার ইচ্ছে আমাদের নেই আর সেটা দেবও না। তাই সঠিক তথ্যটা আমাদের দিন তন্ময়বাবু। হয়তো এতে আপনারই ভালো।’ শেষ কথাগুলো বলার সময় সায়ন একটা ভ্রূ তুলে বেশ বাঁকা চোখে তাকায়। তন্ময় ঠিক বুঝতে পারে না তার কোন ভালোর কথা বলছে সায়ন। আবারও খানিক নীরবতা টেনে তন্ময় বলে, ‘ওর বাবাকে আমি একদিন দেখেছিলাম। আত্রেয়ীকে দেখতে এসেছিল।’
— এই যে বললেন চিনি না!
অবনীশ বলল কথাটা।
— সত্যিই আমি চিনি না। উনি নিজের পরিচয় দিলেন।
সায়ন জিজ্ঞেস করল ‘কী নাম?’
— নাম বলেননি। শুধু বললেন আত্রেয়ী ওঁর মেয়ে।
— আর কী বললেন? উনি কোথায় থাকেন?
— যমের বাড়ির একটু আগে ডানদিকের গলি।
‘কী?’ শব্দটা ঘরের মধ্যে প্রতিধ্বনিত হল। কারণ এমন উদ্ভট উত্তরে অবনীশ, সায়ন এবং সোমদত্তা তাদের কানগুলোকে তন্ময়ের কাছে নিয়ে এসে একই প্রশ্ন করে উঠল, ‘কী?’ তন্ময় বলল, ‘উনি এটাই বলেছিলেন। তারপর কখন যে চলে গেলেন সেটাও দেখতে পাইনি।’
— কেন? দেখতে পাননি কেন?
সায়ন প্রচণ্ড কৌতূহলে প্রশ্নটা করল। শুকিয়ে আসা ঠোঁটদুটোকে একবার চেটে নিয়ে তন্ময় বলল, ‘আমি ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে কথা বলছিলাম।’
— বেশ। দ্বিতীয় প্রশ্ন, আপনার এই অবস্থা কে করল? মিহির সরখেল নাকি অন্য…
সায়নের প্রশ্ন শেষ হওয়ার আগেই উত্তেজিত হয়ে চোখ বড়ো বড়ো করে তন্ময় বলে ওঠে, ‘ওটা মিহির নয়। মিহির…’ বলেই চুপ করে যায়। সায়ন ঝট করে কথার রেশ ধরে নেয়, ‘তাহলে কে? কে মেরেছে আপনাকে?’ অবনীশ একটা কান তন্ময়ের দিকে এগিয়ে রেখে নিশ্বাস বন্ধ করে আছে। ‘বলুন তন্ময়বাবু কে আপনার এই হাল করেছে?’
— চিনি না। আমি চিনি না।
— চেনেন না?
— মিহির… মিহিরও হতে পারে।
— কী বলছেন ঠিক করে বলুন তন্ময়বাবু। মিহির নাকি অন্য কেউ?
তন্ময়ের চোখদুটো ভয়ে বিস্ফারিত হয়ে এপাশ-ওপাশ ছোটাছুটি করে চলেছে। মনিটরে ছুটতে থাকা লাইনগুলো এবার বড্ড বেশি উঁচু-নীচু হয়ে গেছে। বড়ো বড়ো নিশ্বাস নিচ্ছে তন্ময়। সায়ন বলে, ‘প্লিজ তন্ময়বাবু, কিচ্ছু লুকোবেন না। বলুন কে ছিল লোকটা?’
— মিহিরের মতোই। কিন্তু চোখমুখ আলাদা। পালটে গেল। উফফফ! আমি জানি না আর…। জানি না।
তন্ময়ের নিশ্বাসের কষ্ট হচ্ছে। সায়ন বলে, ‘সোমদত্তা নার্সকে ডাকো।’ সোমদত্তা ছুটে বাইরে যায়। সায়ন আর অবনীশ তন্ময়কে ঘন ঘন রিল্যাক্স হতে বলে। আর কিছু বলতে হবে না। আপনি রিল্যাক্স করুন, প্লিজ। শান্ত হোন।’ ইতিমধ্যেই নার্স আর ডক্টর ঢুকে আসেন। চটপট ব্যবস্থা নেন। সায়নদের বাইরে যাবার অনুরোধ করেন। ওরাও বেরিয়ে আসে। বাইরে বেরিয়ে অবনীশ বলে, ‘একটু বোধহয় বাড়াবাড়িই হয়ে গেল সায়নবাবু।’ সায়ন অবনীশের দিকে চেয়ে বলে, ‘হুম! কিন্তু প্রশ্নটা এতটা উত্তেজিত হওয়ার মতো ছিল কি? ধরুন আমি আপনাকে খুব মারলাম। পুলিশ আপনাকে জিজ্ঞেস করল কে মেরেছে? তখন তো আপনি নামটা বলতে পারলেই বাঁচবেন। কারণ আপনি জানেন এরাই আপনাকে বাঁচাবে। কিন্তু আপনি তা না করে প্রশ্নটা শোনামত্রই উত্তর দিতে গিয়ে প্রচণ্ড ভয়ে জানি না, চিনি না বলতে লাগলেন। কেন?’
অবনীশ চুপ করে সায়নের চোখের দিকে তাকিয়ে ছিল। সায়নের প্রশ্নটা উড়ে আসতেই অবনীশ পালটা প্রশ্ন করল, ‘কেন?’
— কারণ, হয় যে আপনাকে মেরেছে তার মধ্যে কোনো অস্বাভাবিকত্ব আছে যা আপনাকে প্রচণ্ড ভয় পাইয়ে দিয়েছে। আর নয় তো আপনি আততায়ীকে খুব ভালো করে চেনেন। কিন্তু আপনি বলতে চান না কারণ তার সঙ্গে আপনার কোনো অপরাধবোধ জড়িয়ে আছে। তাতে কেঁচো খুঁড়তে কেউটে বেরোবে আর আপনি জড়িয়ে যাবেন।
ঠিক এই সময় ঘর থেকে ডক্টর বিশাখ বেরিয়ে আসেন। ‘কী বুঝলেন ডক্টর?’ সায়ন জিজ্ঞেস করল। ডক্টর বিশাখ মাথা নেড়ে ক্যাজুয়ালি বললেন, ‘না সেরকম কিছু হয়নি। উনি একটু উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলেন তাই সাময়িক প্রবলেম হয়েছিল। এখন ঘুমোচ্ছেন।’ ‘ঘুমের ইঞ্জেকশন দিতে হয়েছে?’ আবারও সায়নের প্রশ্ন।
— না না। নিজে থেকেই ঘুমিয়ে পড়লেন।
সায়ন হাসল। বলল, কী অবাক কাণ্ড! এই একেবারে শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে বুকটা হাপরের মতো লাফালাফি করছিল। যেই আমরা বেরিয়ে এলাম অমনি কষ্ট চলে গিয়ে ঘুমিয়েও পড়লেন!’ কান এঁটো করা হাসি হেসে অবনীশের দিকে তাকিয়ে সায়ন বলল, ‘ব্যাপারটা বেশ মজার না?’ অবনীশ কিছু বুঝতে পারল না এখানে ঠিক কী বলা উচিত। মাঝখান থেকে ডাক্তার বিশাখ চ্যাটার্জি একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে অবনীশ আর সায়নের মুখের দিকে এপাশ-ওপাশ করে তাকালেন। তারপর বললেন, ‘দেখুন আপনাদের কাজে তো আমি বাধা দিতে পারি না। কিন্তু একটা রিকোয়েস্ট, একটু সুস্থ হতে দিন।’
— হুম শিয়োর।
ছোট্ট করে জবাব দিয়ে সায়ন জিজ্ঞেস করল মিহিরের কথা। বিশাখ বললেন, ‘উনিও আগের চেয়ে বেটার। তবে তাঁকে এক্ষুনি কথা বলানো বোধহয় উচিত হবে না। যদিও এ ব্যাপারে ডক্টর চিরন্তন বকশি বেটার বলতে পারবেন। আপনারা ওঁর সঙ্গে একবার কথা বলে নেবেন।
