মৃত জ্যোৎস্নার রাত্রি – ৩২
বত্রিশ
গাল ভরতি চাপদাড়ি। তার আড়াল থেকে যেটুকু গালের চামড়া দেখা যাচ্ছে সেটুকু লাল হয়ে উঠেছে। ফরসা গায়ের রং বলে লাল আভাটা যেন ঠিকরে বেরোচ্ছে। কাল মধ্যরাত থেকে মোরনি থানায় পঙ্কজ। তাই রাগে গজগজ করছে। চোখের তলায় কালি পড়েছে। কপালটা ছোটো। একসময় মাথায় বেশ ঠাসা চুল ছিল সেটা দেখলেই বোঝা যায়। এখনও মাথার চুল বেশ ঘন। কাঁচা-পাকা চুলের মধ্যে সোনালি আভা। নতুন করে হেয়ার কালার করার সময় হয়ে এসেছে। পঙ্কজের উলটোদিকের চেয়ারটা টেনে বসল সূর্য। সময় নষ্ট না করেই আধলা ইঁটের মতো একখানা প্রশ্ন ছুড়ে দিল পঙ্কজের দিকে, ‘ভারমোর সে আপ ভাগে কিউ?’ পঙ্কজ খ্যাসখেসে গলায় পালটা প্রশ্ন ছুড়ে দিল, ম্যায় ভাগ আয়া কৌন বোলা আপকো?’
— তাহলে?
কথায় কথায় বাংলা বেরিয়ে আসছে সূর্যের। নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, ‘ফির? উহা তো আচ্ছা নকরি কর রহে থে।’ পঙ্কজ একবার সূর্যর দিকে তাকিয়ে চোখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিল। বলল, ‘আপ বাংলা বোল সকতে হ্যায়। হামি বাংলা বুঝি বোল ভি সকতা, থোড়া থোড়া।’
— ক্যায়সে? মানে কীভাবে?
সূর্য বেশ অবাক। পঙ্কজ জানাল ওঁর মা বাঙালি। ‘চকরবরতী।’ পঙ্কজের বউয়ের বলা কথাটা সূর্যর কানে বাজল। মহিলা তাহলে এই কারণে জিজ্ঞেস করছিল যে পঙ্কজের মামারবাড়ির আত্মীয় কিনা! ‘বলুন তাহলে, ভারমোরে তো খুব ভালো একটা জব করছিলেন। হঠাৎ কোনো কারণ ছাড়া চাকরি ছেড়ে দিলেন কেন?
— কারণ ছিল না সেটা কৌন বোলা আপকো?
— প্রশ্ন করবেন না। উত্তর দিন।
কথার এই ঝাপটা খাওয়ায় পঙ্কজ একটু থমকে গেল। আর কোনো প্রশ্ন না করে বলল, ‘তবিয়ত ঠিক নেহি থে। ডক্টর নে বোলা ফুল বেড রেস্ট করনে কে লিয়ে।’
— কী হয়েছিল?
— লিভার কা প্রবলেম।
— এখন ঠিক হয়ে গেছে?
— থোড়াসা।
— কোন ডাক্তার দেখেছিল? নাম কী?
— ডক্টর রামশংকর ত্রিবেদী।
— ভারমোরে?
— হাঁ।
— প্রেসক্রিপশন দেখাতে পারবেন?
— নেহি। বহুত দিন পহেলে দিখায়া থা। প্রেসক্রিপশন খো গয়া।
— বোঝো, এত গুরুতর অসুখ হল যে চাকরি ছাড়তে হল। যার প্রেসক্রিপশনটাই নেই। আর তবিয়ত খারাপ হল তো হল যখন আত্রেয়ী সেন, তন্ময় হালদার দুজনে মিলে শান্তনু নিয়োগীকে ভ্যানিশ করে দিলেন!
.
কথাগুলো এক্কেবারে পঙ্কজের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল সূর্য। নামগুলো শোনামাত্রই পঙ্কজ বেশ চমকে গেল। চোখের পাতাটা এক ঝটকায় মাটি থেকে সূর্যের দিকে। সূর্যও এই সুযোগ ছাড়ে না। পঙ্কজ চমকে চোখ তুলে তাকাবার সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন করে, ‘চেনেন নাকি?’ তোতলায় পঙ্কজ, ‘ক কৌন হ্যায় ইয়ে লোগ?’
এতক্ষণ তো দিব্যি ঝড়ের মতো কথা বলছিলেন। এখন তোতলাচ্ছেন কেন? আপনি চেনেন তো এঁদের?
— নেহি।
— ন্যাচারালি। কত লোক হোটেলে যায় আসে। সবাইকে কি মনে রাখা সম্ভব? যদিও সাড়ে ছ্যায় সাল পহেলে বহত সারে টুরিস্ট উহা নেহি যাতে থে। তবু, কিছু কিছু টুরিস্ট তো একটু স্পেশ্যাল হয় তাই না?
— ইনস্পেক্টর, মেরা টাইম বরবাদ মত করো। হোটেল মে বহত সারে কাস্টমার হ্যায়।
— ভাবিজি কব ফোন কিয়ে থে আপকো?
— কৌন?
— ভাবিজি… ভাবিজি। আপকা ওয়াইফ।
— আপ কো কিঁউ বাতাউঁ?
— আমি বলছি। আপনি শুনুন। কাল শাম পৌনে আট বাজে ভাবিজি আপকো কল করকে আমার আসার খবর দিয়েছে। আপনি নাম শুনেই বুঝেছেন আমি বাঙালি। অথচ আপনার বাঙালি দোস্ত, স্পেশ্যালি এই নামের কাউকেই আপনি চেনেন না। তার ওপরে ভাবিজি আমার বয়সের যা বর্ণনা দিয়েছেন তাতে আপনি ভালোই বুঝতে পারেন যে আপনার আর আমার বয়সের বেশ কিছুটা তফাত আছে। তাই আমি কখনোই আপনার বন্ধু হতে পারি না। তাই আপনার সন্দেহ হয়। তাহলে কী করা যায়? কীভাবে আমি কে সেটা জানা যায়? ভাবতে ভাবতে আপনি একটা দারুণ ফন্দি আঁটলেন। আমার নাম দিয়ে নেটে সার্চ দিলেন। আমি কে? কোথা থেকে আসছি? এমনকি, আপনার সন্দেহ হয়েছিল আমি পুলিশ কিনা তাই আমার নামের পাশে পুলিশ অফিসার বলে লিখেছেন গুগলে। পৌনে আটটা থেকে সাড়ে এগারোটা পর্যন্ত নেটওয়ার্ক প্রবলেম থাকায় আপনি কিচ্ছু দেখতে পাননি। শুধু এক-এর পর এক ট্রাই করে গেছেন। রাত সাড়ে এগারোটার পর নেটওয়ার্ক পেয়ে আপনি আমার ফেসবুক প্রোফাইল দেখেছেন, গুগলে আমার সম্পর্কে পড়ে নিশ্চিত হয়েছেন যে আমি পুলিশ। কিন্তু আপনি যার ছবি দেখছেন সেই কি আপনার বাড়িতে গিয়েছিল? সেটা তো নিশ্চিত হতে হবে। তাই একই নামের বেশ কয়েকটা ছবি ডাউনলোড করে আপনি আপনার ওয়াইফকে হোয়াটস্যাপ করলেন এবং ভাবিজি আমার ছবিটাকে ট্যাপ করে লিখলেন, ‘ইয়ে আদমি আয়া থা।’ আর এইগুলো আপনি হোটেল থেকে বেরিয়ে বাইরের লনে দাঁড়িয়ে করেন। কারণ নেটওয়ার্ক প্রবলেম তখনও ছিল। তাই থেকে থেকে ফোনটাকে আকাশের দিকে, এপাশে-ওপাশে করছিলেন। তারপর পুলিশ আপনার খোঁজ করছে সন্দেহ করে হোটেল থেকে মাঝরাতে পালাবার মতলব করেন। আপনি জানতেন না যে, এখানকার পুলিশ আপনার হোটেলের ওপর র্যাদার আপনার ওপর নজর রেখেছে। তাই পালাবার চেষ্টাটা আপনার মাঠে মারা যায়। পঙ্কজবাবু, আপনার ফোন এখন আমাদের হেফাজতে। একটু ঘাঁটলেই সব বোঝা যায়।
চাপা দাড়ির নীচে পঙ্কজের চোয়ালদুটো শক্ত হয়ে উঠেছে। সূর্য বলে, ‘আচ্ছা পঙ্কজবাবু, পুলিশকে আপনি এত ভয় পেলেন কেন? কেনই-বা আপনার মনে হল যে পুলিশ আপনাকে ধরতে পারে?’
— ঝুট। আমি এসব কুছ ভাবিনি।
— ঝুট। না ভাবলে পালাচ্ছিলেন কেন? কেনই-বা আমি পুলিশ অফিসার কিনা সেটা জানার জন্য সার্চ দিয়েছিলেন?
— সূর্য নামে হামার কোনো ফ্রেন্ড নেই। তাই…
— থামুন।
ধমক দিল সূর্য। ‘বড্ড বাজে সময় নষ্ট করছেন। ঠিক করে বলুন, শান্তনুর বডিটা আপনি কোথায় সরিয়েছিলেন যে পুলিশও ট্রেস পেল না?’
— ঝুট ঝুট ঝুট।
উত্তেজিত পঙ্কজ। চিৎকার করে বলল, ‘কিসি শান্তনু কো হামি চিনে না। বডি সরানো তো দূর কি বাত।’
— তাহলে কে সরিয়েছে?
সূর্যের গলাটা হঠাৎ করেই খাদে নেমে এসেছে।
— আরে স্যার, হামি কীভাবে জানব? হামি কাউকে চেনে না। বিসওয়াস করুন।
— করতাম। বিশ্বাস আমি আপনাকে করতাম যদি আপনি পুলিশকে ভয় না পেতেন। যদি মাঝরাতে না পালাতেন। আপনি তো শুধু হোটেল থেকে পালাননি। ভারমোর থেকে পালিয়ে চাম্বা গেলেন। সেখান থেকে পালিয়ে দিল্লি এলেন। তারপর আবার সেখান থেকে হরিয়ানা। আর এখন আপনার গা, হাত, পা থরথর করে কাঁপছে, ভয়ে।
পঙ্কজ এতক্ষণ খেয়ালই করেনি যে সত্যি তার গা-হাত-পা কাঁপছে। সূর্য বলার পর নিজেকে সংবরণ করার চেষ্টা করল সে। কিন্তু পারছে না কিছুতেই। দরদর করে ঘামছে। নিশ্বাস পড়ছে ঘনঘন। সূর্য কড়া গলায় বলেই চলেছে, ‘আপনি যদি ভালো কথায় না বলেন তাহলে আশা করি আপনার থার্ড ডিগ্রির কথা জানা আছে?’ পঙ্কজ কাঁপতে কাঁপতে বলে, ‘হামি ভাগিনি। তবিয়ত ঠিক করতে চাম্বা আসি। ফির মেরে বেটে কো দিল্লি কনভেন্ট মে অ্যাডমিশন করানা থা। ইসলিয়ে ফ্যামিলি লে কর দিল্লি চলে গয়ে। ফির মোরনি মে নকরি মিলা, তো এখানে চলে আসি। হামি অউর কুছ জানি না স্যার। প্লিজ মুঝে ছোড়…’ কথাটা সম্পূর্ণ না করেই পঙ্কজের মাথাটা টেবিলের ওপর ঠক করে পড়ে গেল।
— পঙ্কজবাবু, পঙ্কজবাবু… কোই হ্যায়? পানি লে কর আও জলদি।
সূর্য বারবার ডাকল। মুখ ধরে নাড়াল। কিন্তু পঙ্কজ সাড়া দিল না।
.
আইসিসিইউর কাচের গায়ে হাত রেখে চুপ করে দাঁড়াল মৃন্ময়ী। কাচের ওপারে নানান রকমের নল, সাদা ব্যান্ডেজ আর মনিটরে চলতে থাকে। হৃদস্পন্দনের ওঠানামা নিয়ে শুয়ে আছে মিহির। আজ আর মুখে মাস্ক নেই। শরীরটা থেকে ফ্যাকাশে ভাব খানিকটা কেটে গেছে। অক্সিজেনের মাস্কটা খোলা। তবু কথা বলার পারমিশন দেয়নি ডাক্তার। ঘরের ভেতরে থাকা নার্স মৃন্ময়ীর দিকে আঙুল দেখিয়ে তার আসার খবর দিল মিহিরকে। ধীরে মাথাটা বাইরের কাচের দিকে হেলে গেল। চোখের মণিটা দু-চোখের কোণে ঝুঁকে পড়ল। মৃন্ময়ী হাতটা নাড়াল। বুকের মধ্যে কষ্ট চেপে হালকা হাসল। নীরবে বলল, ‘আমি আছি’ যদিও সেটা মনে মনে। তবু সেই মনের কথা পড়তে বিন্দুমাত্র অসুবিধে হল না মিহিরের। কাচের মধ্যে দিয়েই মৃন্ময়ী খেয়াল করল মিহিরের দুটো চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে কানের দিকে। এতক্ষণ অনেক কষ্টে নিজের আবেগ সংবরণ করলেও এখন আর চোখের জল ধরে রাখতে পারল না মৃন্ময়ী। কান্নার আবেগে চিবুকটা তার কেঁপে উঠল। গাল বেয়ে দু-ফোঁটা জল তারও গড়িয়ে পড়ল। কাচের ওপর কপাল রেখে চেপে রাখা কান্নায় ফুলে উঠল মৃন্ময়ী। ঠিক সেই সময়েই পাশে এসে মৃন্ময়ীর কাঁধে হাত রাখল সায়ন। নাক টেনে কান্নাটাকে বুকের মধ্যে চাপা দিল। হাত উলটো করে চোখের জল মুছে নিল। সায়ন মিহিরের দিকে দু-চোখ টিপে ডানহাতের বুড়ো আঙুল তুলে অল ইজ ওয়েল মার্কা একটা হাসি ছুড়ে দিল। সে হাসি অনায়াসেই ছুঁয়ে ফেলল মিহিরের ঠোঁট।
সায়ন হঠাৎ টের পেল প্যান্টের পকেটে রাখা মোবাইলটা ভাইব্রেট করছে। হাতে নিয়ে দেখল সূর্য ফোন করছে। ফোনটাকে নিয়ে আইসিসিইউর সামনে থেকে সরে এল।
— হ্যাঁ সূর্য বলো।
এরপরেই যে কথাটা ভেসে এল তাতে বেশ চমকে গেল সায়ন। ‘সে কী! কেন? হার্টের অসুখ ছিল নাকি? ও হো! কেসটা ঝুলে গেল তার মানে। কোন নার্সিংহোম? গায়ে-টায়ে হাত তোলোনি তো? বেশ, তাহলে চাপ নেই। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে ভগবান না করুন যদি টপকে যায় তাহলে তো আমাদের কেসটা বিশ বাঁও জলে। তোমায় তো সবই বললাম এখানে কী হচ্ছে। আসামি চোখের সামনে আছে। অথচ অদৃশ্য। ধরতে পারছি না। ইনভেস্টিগেশন বলছে আরও একজন আছে কিন্তু সে যে কে সেটাই বোঝা যাচ্ছে না।… হ্যাঁ কিন্তু শুধু সন্দেহ করলে তো হবে না। প্রমাণ চাই।… ঠিকই বলেছ, ওই আসামিকে ধরা যায় না। কিন্তু ব্যাপারটাকে অলৌকিক রাখলে তো আর হবে না। আমাদের লৌকিক প্রমাণ জোগাড় করতে হবে। যেটা এই পঙ্কজ আমাদের দেবে। আদৌ যদি সত্যি ও কিছু জেনে থাকে তো।… না না চিন্তা কোরো না। ওখানে কেমন ট্রিটমেন্ট হচ্ছে আমায় জানাও। দরকার হলে ওঁকে দিল্লির সবচেয়ে বড়ো হসপিটালে নিয়ে আসতে হবে। যেভাবে হোক বাঁচাতেই হবে। আর তুমি ওখানেই থাকো যতদিন না পঙ্কজবাবু সুস্থ হচ্ছেন।…না না, একা কই? তোমার সোমদত্তা আছে তো।’
বলেই নিজে শূন্যের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপল। মুখে ফাজলামির হাসি। আরে না না, তোমার মানে আমার, আমাদের। এন্টায়ার পুলিশ ডিপার্টমেন্টের। কেন, তুমি কি অন্য কিছু বুঝলে নাকি?’ ঠোঁট চিপে সায়ন আবার নিজের মনে হাসল। ‘ওকে ওকে, চলো। ওদিকটা সামলে নাও। ও হো, সূর্য… আর-একটা ইনফরমেশন জোগাড় করো তো। ভারমোরে পঙ্কজ যেখানে থাকত সেখানে হোটেলের আর কেউ থাকত কিনা। মানে ওই একই পথে যাতায়াত করত কিনা!… ঠিক আছে। ছাড়লাম।’ কান থেকে ফোনটা নামিয়ে কেটে দিতেই সায়নের গা-টা কেমন যেন শিরশির করে উঠল। ঠান্ডা হাওয়ার ঝলকটা পেছন দিক থেকে এল। চট করে পিছনে ঘুরে গেল। লম্বা করিডর। কয়েকজন নার্স এ-ঘর থেকে ও-ঘরে যাচ্ছে। একজন ফাঁকা স্ট্রেচার ঠেলতে ঠেলতে সায়নের পাশ দিয়ে চলে গেল। দূরে দুজন হসপিটালের মহিলা স্টাফ বসে কথা বলছে। ফ্লোরের এসিটা বাড়াল কি? হতেই পারে। কিন্তু মনটা কেন যে খচখচ করছে সেটাই বুঝতে পারছে না সায়ন। আসলে শেষ দু-সপ্তাহ ধরে এতগুলো খারাপ ঘটনা পরের পর ঘটে চলেছে যে মনের মধ্যে খারাপ কিছু ছাড়া ভালো ভাবনা উঁকি দিতে পারছে না।
.
রাত বাড়লে শহর ঝিমিয়ে পড়ে। পথের পাশে বড়ো বড়ো প্লাস্টিক খাটিয়ে ঘর বানানো মানুষগুলো সারাদিন তেতে-পুড়ে নিশীথের শীতলতায় ঘুমোয়। খোদ শহরের বুকের রাতবাতিগুলো ড্যাবড্যাব করে চেয়ে থাকলেও একটু গলিঘুঁজির মধ্যে যেগুলো দাঁড়িয়ে থাকে সেগুলোর মধ্যে কেউ কেউ ঘাপটি মেরে চোখ বুজে থাকে। রাত করে ফেরা মানুষগুলো ওটুকু পথে মোবাইলের আলো জ্বেলে পার হয়ে যায়। কোথাও আবার কান্না জেগে ওঠে বাতাসে। মেডিলাইফের পেছনের দরজা দিয়ে একটা বডিকে গাড়িতে তোলা হচ্ছে। ঠান্ডা কনকনে জলে ভেজা বডি। আপাদমস্তক মোড়া সাদা কাপড় সরিয়ে শেষবারের মতো মুখটা দেখে নিল বাড়ির লোক। বইতে থাকা বাতাসে মহিলা কন্ঠের তীক্ষ্ণ কান্নার রোল ছড়িয়ে পড়ল চতুর্দিকে। একটা কুকুরের কান্না মিশে গেল প্রিয়জন হারানোর কান্নার সঙ্গে। গলিটার আশেপাশেই রয়েছে বোধহয় কুকুরটা। সিসিটিভিগুলো সজাগ। মেডিলাইফ সুপার স্পেশ্যালিটির প্রত্যেকটা মুহূর্তকে শকুনের চোখে দেখে চলেছে। জমা করে রাখছে প্রত্যেকের গতিবিধি। নাইট ডিউটি যারা দিচ্ছে তারাই একমাত্র জেগে ঘোরাঘুরি করছে। তা-ও সেটা অনিয়মিত। একজন যাওয়া আর অন্যজনের ফিরে আসার মাঝে করিডরগুলো নির্জন। বিশেষত আইসিইউর কাছেপিঠের জায়গাগুলো। আত্রেয়ী সেনের কেবিনে এই মুহূর্তে একজন নার্স। বেডের পাশে ঝুলতে থাকা স্যালাইনের বোতলটা পালটে দিল উপস্থিত নার্স। বুকে নাম লেখা ব্যাজ আটকানো, ‘সোহিনী সান্যাল।’ খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে মনিটর চেক করল সোহিনী। অক্সিজেন লেভেল ঠিক আছে। রাতের খাবার খেয়ে ঘুমোচ্ছে আত্রেয়ী। অকাতরে ঘুম যাকে বলে। পাশে যে খুটখাট শব্দ হল স্যালাইনের বোতল পালটাতে গিয়ে তাতে কোনো হুঁশ নেই তার। মাথার ওপর সাদা আলোটা নিভিয়ে আত্রেয়ীর পায়ের কাছে রাখা চেয়ারটাতে বসল সোহিনী। কেবিনটা বেশ বড়ো। মাঝে পর্দা টানা। উলটোপাশে একটা হালকা আলো জ্বলছে। যেটাতে অনায়াসেই বই পড়া বা লেখা যায়। পাশের ছোট্ট টেবিলে রাখা সাদা পাতাগুলো নিয়ে সোহিনী কী যেন নোট করতে থাকে। বেশ খানিকটা তফাতে কেবিনের জানলা। না ঠিক জানলা বলা যায় না। জানলার আকারে দেয়াল কেটে এয়ার প্রুফ কাচ লাগানো। ওপরের মোটা পর্দাটা সরিয়ে রেখেছে সোহিনী। অবশ্যই সেটা আত্রেয়ীর নির্দেশে। এখন জ্ঞান আছে তার। তাই ঘর আর বাইরের তফাতটা বুঝতে পারছে। সবসময় চার দেয়াল দেখতে বিরক্ত লাগছে আত্রেয়ীর। তাই সন্ধে হলেই পর্দা সরে যায়। অস্তরাগের আলোয় ভরে যায় ঘরখানা। অপলকে দেখে আকাশের গায়ে রঙের খেলা। তারপর সন্ধে নামে। তারা ফোটে না। কিন্তু বাইরে থেকে ছিটকে আসা কিছু আলোর আভায় সাদা কাচটাকে রঙিন ক্যানভাসের মতো দেখায়। ক্লান্তিতে চোখ বুজে আসে আত্রেয়ীর। সেই থেকে পর্দা সরানো। ঘরের মধ্যে যন্ত্রের পিক পিক শব্দ ছাড়া আর কোনো বিশেষ শব্দ নেই। লিখতে লিখতে সোহিনীর হঠাৎ মনে হয় আত্রেয়ী সেন যেন একটু একটু নড়ছে। চোখ তুলে তাকাতেই দেখে নিশ্বাসটা ঘন ঘন পড়ছে পেশেন্টের। তারপরেই দৃষ্টিটা একটু ওপর দিকে সরতেই চমকে ওঠে সোহিনী। এ কী সর্বনাশ! স্যালাইনের বোতলটা কোথায়? ঝট করে চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ে সে। আত্রেয়ীর হাতে গোঁজা নলটা মাটিতে লুটোচ্ছে। সেটা ধরে টান মারতেই খাটের তলা থেকে খং খং শব্দ করে গড়িয়ে এল স্যালাইনের বোতল। তাতে এক ফোঁটাও স্যালাইন নেই। আজব কাণ্ড! এক্ষুনি তো বোতল পালটে দিয়ে গেল সোহিনী। চট করে আর-একটা বোতল এনে লোহার স্ট্যান্ডে ঝুলিয়ে দিল। অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে ঘুমন্ত আত্রেয়ীর দিকে তাকিয়ে রইল সে। একটু পরেই আবার সব স্বাভাবিক হয়ে গেল। এসির ঠান্ডার মধ্যেও টেনশনে ঘেমে গেছে সোহিনী। আবার গিয়ে সে চেয়ারে বসল। এরপর একভাবে চেয়ে রইল আত্রেয়ীর দিকে। ঘড়ির কাঁটা গভীর রাত থেকে ভোর রাতের দিকে এগিয়ে চলেছে। বসে বসে ভীষণ ঘুম পাচ্ছে তার। নাহ্! ঘুম পেলে চলবে না। গা ঝাড়া দিয়ে উঠে পড়ল। আইসিইউর দরজা খুলল। সামনে পেছনে তাকিয়ে গলাটা চেপেই ডাকল, ‘তপতীদি, আমায় একটা কফি দিয়ে যাও না।’ বলে ঘরে এসে আবার সেই চেয়ারেই বসল। আরও একবার হাই তুলতে গিয়ে চমকে উঠল সোহিনী। বুক দিয়ে ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। অন্ধকারের মধ্যে সাদা চাদর মুড়ি দিয়ে উঠে বসেছে আত্রেয়ী সেন। একভাবে সোহিনীর দিকে চেয়ে আছে। ‘একী ম্যাডাম, আপনি উঠে বসলেন কেন?’ সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ল আত্রেয়ী সেনের জ্ঞান ফিরলেও নিজে থেকে উঠে বসার মতো ক্ষমতা হতে এখনও সপ্তাহখানেক। সোহিনী এগিয়ে গেল আত্রেয়ীর মাথার দিকে। ওদিকেই খাটের সঙ্গে ঝুলছে বেড সুইচ। কোনোদিকে না তাকিয়ে পটাস করে আলোটা জ্বালিয়ে দিল। আলো জ্বলে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে সোহিনীর বুকের ভেতরটা ঝপাস করে কোনো অতলে পড়ে শূন্য হয়ে গেল। আত্রেয়ী বিছানায় শুয়ে অকাতরে ঘুমোচ্ছে। কেউ কোত্থাও বসে নেই। সোহিনীর নাক দিয়ে বেরিয়ে আসছে ঘন উষ্ণ নিশ্বাস। কিন্তু ও যে স্পষ্ট দেখেছে আত্রেয়ী বসে ওর দিকেই তাকিয়ে ছিল। কেবিনের এই দিকটা এত বেশিও অন্ধকার নয় যে একটা মানুষ উঠে বসে থাকলে বোঝা যাবে না। তাহলে কি ঘুম পেয়েছে বলে ভুল দেখছে? হতে পারে। ব্যাপারটাকে হালকা করতে নিজেই হেসে ফেলল সোহিনী। আবার পটাস শব্দ করে আলোটা বন্ধ হয়ে যায়।
ছুসসসসস!
কেবিনের মাঝে ঝুলে থাকা পর্দায় কেউ যেন উলটোদিক থেকে হাত বুলিয়ে চলে গেল। আঁতকে উঠে আবার আলোটা জ্বালিয়ে দেয়। বুঝতে পারছে না এসব কী হচ্ছে! পাঁচ বছরের চাকরি জীবনে এমন অভিজ্ঞতা হয়নি তার। চোখের সামনে কত লোকে মারা গেছে। কত ট্রেনে কাটা পড়া, লরিতে পিষে যাওয়া বডি দেখেছে সে। আজকের মতো ভয় আর কিছুতে পায়নি। এদিকে এতবার আলো জ্বলছে আর নিভছে বলে সোহিনী ভয়েই মরছে। একবার যদি আত্রেয়ী সেন কমপ্লেন করে ঘুমে ব্যাঘাত হওয়ার জন্য তাহলে আর রক্ষে নেই। কিন্তু কিচ্ছু করার নেই সোহিনীর। পর্দার ওপারে নিশ্চয়ই কেউ আছে নইলে এমন শব্দ কে করবে? আর এটাকে ও মনের ভুল বলে মানতেও পারবে না। কারণ পর্দার গায়ে হাত বুলিয়ে চলে গেলে উলটোদিকে পর্দায় যে কম্পন ও তরঙ্গের সৃষ্টি হয় তা এইমাত্র এই কেবিনের পর্দায় হয়েছে। পর্দাটা এখনও দুলছে। অথচ এত ভারী পর্দা হাওয়া না দিলে দোলার কথা নয়। সোহিনীর গলা শুকিয়ে আসছে। সে মনে মনে সাহস সঞ্চয় করে মাথাটাকে ঈষৎ বেঁকিয়ে এগিয়ে চলেছে পর্দার শেষপ্রান্তের দিকে। কারণ কম্পনের তরঙ্গটা আত্রেয়ীর মাথার পাশ থেকে শুরু হয়ে পর্দার শেষ প্রান্ত অর্থাৎ আত্রেয়ীর পায়ের দিকের দেয়াল পর্যন্ত গেছে। সোহিনী শেষ মাথা পর্যন্ত পৌঁছে এক ঝটকায় পর্দাটা সরিয়ে দেয়। দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে হাঁফাতে থাকে। কাকে দেখতে চলেছে সে নিজেও জানে না।
.
কোথায়? কেউ নেই পর্দার ওপারে। মাথার ওপর জ্বলতে থাকা নরম আলোটা জায়গাটাকে বেশ মায়াময় করে রেখেছে। এই আলোটাই পর্দার ওপারে এসে পড়ছে। তাতেই এতক্ষণ বসে লিখছিল সোহিনী। খানিক নিশ্চিন্ত হয়ে এপারে এসে পর্দা টেনে দিতেই একটা হাত এসে পড়ে সোহিনীর কাঁধে। আঁতকে উঠে পেছন ফিরে তাকায়।
— ও মা! কী হল তোর? আমায় ভয় পেলি নাকি?
তপতীদি এক কাপ কফি নিয়ে এসেছে। ‘তুমি কখন ঢুকলে? দরজায় নক করোনি তো?’
— তুই যদি কানের মাথা খেয়ে বসে থাকিস আমি কী করব বল তো? দু-বার নক করেছি। কোনো সাড়া নেই দেখে ঢুকে পড়লাম। ভাবলাম, কী জানি হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছিস।
— দাও।
কফির কাপটা দিয়ে তপতী চলে গেল। নিজের বরাদ্দ চেয়ারে গিয়ে বসে কফিতে চুমুক দিল সোহিনী। একটু শান্তি হল যেন।
কিন্তু সোহিনী জানলই না, যে তার মাথার ওপরেই পর্দার ওপার থেকে এপারে ঝুঁকে তাকিয়ে আছে একজোড়া সাদা চোখ। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা!
.
ডক্টর বিশাখ চ্যাটার্জি এবার খানিকটা বিরক্তই বলা চলে। কালকে জেরার পর সায়ন আজকে আবার তন্ময়ের সঙ্গে দেখা করতে হাজির হয়েছে ড্যাফোডিলে। সঙ্গে আবার নীলাম্বর ব্যানার্জি। সায়ন বলে, ‘আজ কোনো প্রশ্ন করব না। ট্রাস্ট মি।’ ডাক্তার বলে, ‘তাহলে কেন যেতে চাইছেন বলুন?’ নীলাম্বরকে দেখিয়ে সায়ন বলে যে ইনি বাইরে থেকে এসেছেন, বিশেষ পরিচিত। তন্ময়ের কাজের খুব বড়ো ভক্ত। আসলে উনি একজন ফটোগ্রাফার। যদিও পেশাটা আলাদা। তাই একবার মিট করতে চান। কালকেই আবার ফিরে যাবেন নয়ডা। ডাক্তার বলে, ‘বেশ, তবে পাঁচ মিনিটের বেশি নয়।’ এক গাল হেসে সায়ন বলে, ‘থ্যাংক ইউ ডক্টর।’ বিন্দুমাত্র দেরি না করে সায়ন নীলাম্বরকে নিয়ে তন্ময়ের ঘরে ঢুকে যায়। তন্ময় চোখ বুজে শুয়েছিল। সায়নের নির্দেশে নার্স বাইরে চলে গেল। ঘরের মধ্যে চাপা গলায় কিছু কথা হচ্ছে বুঝতে পেরে চোখ খুলে তাকায় তন্ময়। সায়নকে দেখে একবার চোখ বন্ধ করে আবার খোলে। সায়নের চোখ এড়ায় না তন্ময়ের ভাব। সায়ন নীলাম্বরকে সঙ্গে নিয়ে তন্ময়ের উদ্দেশ্যে বলতে বলতে এগিয়ে আসে, ‘আজ কেমন আছেন তন্ময়বাবু?’ তন্ময় চুপ। পাশে এসে দাঁড়িয়ে সায়ন বলল, ‘কাল আমরা চলে যাবার পর আর শ্বাসকষ্ট হয়নি তো?’ সায়নের কথাগুলোর মধ্যে বেশ একটা অস্বস্তি ধরানোর ব্যাপার আছে। তন্ময় একটু অপ্রস্তুত হয়েই দু-পাশে ঘাড় নাড়ল।
— গুড। ভেরি গুড। আজ আপনাকে জ্বালাব না। বরং আপনার জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে। ইনি হলেন নীলাম্বর ব্যানার্জি। বাইরে থাকেন। পেশা অন্য হলেও নেশা ফটোগ্রাফি। এবং উনি…
নীলাম্বর সায়নের হাত চেপে ধরল। ‘আমিই বলি?’
— ওহ্ শিয়োর।
সায়ন সরে দাঁড়াল। নীলাম্বর এগিয়ে এলেন। করজোড়ে প্রণাম করে বললেন, ‘আমি আপনার ফ্যান বলতে পারেন।’ তন্ময়ের ভ্রূ কুঁচকে গেল।
— জানি অবাক হচ্ছেন। কারণ ডিওপির ফ্যান কথাটা খুব আজব। মানে চট করে এরকম হয়তো কেউ বলেনি। কিন্তু কী জানেন, আমি যেহেতু একটু ছবি তুলতে ভালোবাসি তাই কার ক্যামেরা মানুষকে টেনে ধরার ক্ষমতা রাখে সেটা ভেতর থেকে বুঝতে পারি। যেমন চোখের বালির ওই দৃশ্যটা, মহেন্দ্রর মা রাগ করে গ্রামের বাড়ি যাচ্ছেন। সেখানে শুধু একটা চাবির গোছার ছিটকে পড়ার সঙ্গে কতগুলো আলতা পরা পায়ের শটটা ট্রলি করে সোজা উঠে এল উঠোনে। যেখান থেকে জুড়ি-গাড়ি বেরিয়ে গেল। তিনটে জিনিসকে মাত্র একটা শটে পুরো মাখনের মতো উপস্থাপন করেছেন।
নীলাম্বরের মুখে প্রকৃত ভক্তের মতো হাসি লেগে আছে। যেন তিনি ভগবানকে সামনে থেকে দেখছেন। তন্ময় প্রথমে বিশ্বাস করতে না চাইলেও এমন করে তার শুট করা দৃশ্যের সূক্ষ বর্ণনা ভক্ত না হলে দেওয়া অসম্ভব। তাই এবার একটু গলা ফুলিয়ে হাসে। নীলাম্বর বলতে থাকেন, ‘আপনার করা আরও একটা ছবির কাজ আমার খুব প্রিয়। ত্র্যম্বকেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের ‘ফুল ফুটুক, না ফুটুক।’ আমাদের আত্রেয়ী ম্যাডাম স্লো মোশনে করিডর দিয়ে হেঁটে আসছেন। ধীরে ধীরে পালটে যাচ্ছে তার বেশ। সধবার বেনারসি থেকে তার গায়ে উঠে আসছে বিধবার সাদা থান। কতটা পাকাপোক্ত হাত হলে তবে ওই দুটো দৃশ্যকে এক্কেবারে নিখুঁত প্যারামিটারে শুট করা যায় সেটা জাস্ট ভাবা যায় না।’
— বাবা! আপনি তো বেশ হোমওয়ার্ক করে এসেছেন দেখছি।
নীলাম্বর কোনো কথা না বলে টক করে তন্ময়ের শরীরের পাশে পড়ে থাকা হাতের কবজিটা ধরে গদগদ হয়ে বলেন, ‘কী বলছেন তন্ময়বাবু, এ আমার সৌভাগ্য যে আপনার মতো গুণী মানুষের কাজ দেখে আপনার সামনে দাঁড়িয়েই বলতে পারছি। আপনাকে ছুঁতে পারা কী কম কথা? কী বলো সায়ন?’
নীলাম্বর কথা ছাড়তেই সায়ন ধরে নেয়। ‘একদম তাই। আত্রেয়ী ম্যাডামের উত্থানের পেছনে তন্ময়বাবুর কম অবদান? মাফ করবেন, আমি আপনাদের ইন্ডাস্ট্রির নই। কিন্তু সিনেমার অনেক খবর আমাদেরও রাখতে হয়। তন্ময়ের চোখে-মুখে আর ভয়ের ছাপ নেই। এখন বেশ উৎফুল্ল ভাব। ‘না না, আত্রেয়ী ভালো অভিনেত্রী। আর আমি ভালো কাজ করার চেষ্টা করি মাত্র।’ বেশ লাজুক বিনয়ের সঙ্গে কথাগুলো বলল তন্ময়। সায়ন যেন এবার আরও বেশি গদগদ হয়ে বলল, ‘দেখেছেন তো, প্রকৃত ভালো শিল্পীরা ঠিক এরকম বিনয়ীই হন। এই আপনার জায়গায় অন্য কেউ হলে এতক্ষণে হয়তো রেলা নিয়ে কয়েকটা জ্ঞানই ঝেড়ে দিতেন বা চাল মারতেন। একটা কথা অস্বীকারের কোনো জায়গা নেই তন্ময়বাবু যে আত্রেয়ী ম্যাডামের জীবনে আপনি আসার পরেই ম্যাডামের এত সম্মান, প্রতিপত্তি। কোনো একটা ইন্টারভিউতে তো ম্যাডাম নিজেই স্বীকার করেছেন সে কথা। ওই তো কী যেন বলেছিলেন, কোনো টিভি চ্যানেলেই তো। উনি বললেন, সবাই আমার জীবনে কিছু না কিছু পাবার জন্য এসেছে। কিন্তু তন্ময় এসেছে প্রকৃত বন্ধু হয়ে। আমার খ্যাতি, সম্মান, অর্থ, সম্পত্তি কিচ্ছু চায়নি সে। আমার স্বামীও হয়তো এতটা বন্ধু হননি কোনোদিন। এটা আত্রেয়ী ম্যাডাম নিজেই বলেছেন।’ একদমে, না থেমে গড়গড় করে সায়ন বলে গেল কথাগুলো। বলতে বলতেই সায়ন আড়চোখে নীলাম্বরকে দেখে নিয়েছে। তিনি তন্ময়ের কবজি ধরে দরজার দিকে মুখ ঘুরিয়ে চুপ করে বসে আছেন। হয়তো চোখ তার বন্ধ। ঠিক দেখা যাচ্ছে না। প্রশংসাবাক্য শুনতে শুনতে তন্ময়ের মুখে যে হাসিটা ঝিলিক দিচ্ছিল, আত্রেয়ীর স্বামীর কথা ওঠায় সেটা দপ করে নিভে এল। সেটা খেয়াল করেই সায়ন জিজ্ঞেস করল, ‘আচ্ছা তন্ময়বাবু, শুনেছি মানে আপনাদের ইন্ডাস্ট্রির খবর যে অতনুবাবু নাকি খুব একটা ভালো লোক ছিলেন না?’
— কে অতনু?
তন্ময় অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল। সায়ন বলল, ‘আত্রেয়ী ম্যাডামের স্বামী। অতনুবাবুই তো?’ দু-বার চোখের পাতা ফেলে আগের চেয়ে একটু গম্ভীর হয়ে তন্ময় বলল, ‘অতনু নয়, শান্তনু।’
— ও হ্যাঁ হ্যাঁ। ওই হল। আসলে যার পাত্তাই নেই কত বছর ধরে তার নাম আর কী করে মনে রাখব? তা ছাড়া উনি তো আর আপনার মতো সেলিব্রেটি নন।
ভীষণরকম একটা তাচ্ছিল্যের ভাব নিয়ে কথাটা বলল সায়ন। তারপরেই গলা চেপে জিজ্ঞেস করল, ‘মানুষটা তো খুব একটা সুবিধের ছিল না শুনেছি। খুব জ্বালিয়েছে আত্রেয়ী সেনকে। তাই না?
— আমি ঠিক জানি না। ওঁর সঙ্গে আমার অতটা পরিচয় ছিল না।
একটু আহ্লাদি স্বরেই সায়ন বলল, ‘এ কী বলছেন, আমি তো শুনেছি আপনারা একসঙ্গে পাহাড়ে কোথায় একটা বেড়াতে গেছিলেন নাকি!’ নীলাম্বরের শরীরটা ঝট করে কেঁপে উঠল। সায়ন বুঝল। কিন্তু ঠিক কী হল বোঝার আগেই তন্ময় বলল, ‘কে বলল আমরা তিনজন গেছিলাম?’
— ওই তো হোটেলের ম্যানেজার, পঙ্কজ না কী নাম যেন! ওদের রেজিস্টারেই তো দেখলাম আপনাদের নাম।
তন্ময়ের বুকটা উঠছে আর নামছে। সায়ন খেয়াল করে। ‘কক্ষনো না। রেজিস্টারে শুধু আমি সই করেছি। আত্রেয়ী বা শান্তনুর নাম থাকতে পারে না।’
— ও তার মানে শান্তনুবাবুও গিয়েছিলেন। নইলে এতটা শিয়োর হয়ে…
সায়নের কথার ওপর দিয়েই কড়া গলায় তন্ময় বলে ওঠে, ‘না। উনি যাননি। আমি আর আত্রেয়ী গিয়েছিলাম।’
— না না, আমরা তো নিজে চোখে দেখলাম শান্তনু নিয়োগীর নাম।
— হতেই পারে ওটা অন্য শান্তনু।
— হতেই পারে। মানে হতেই পারত। যদি না শান্তনুর ছবি দেখে কেউ চিনতে পারত।
— ছবি! ছবি কোথায় পেলেন?
তন্ময় যেন আকাশ থেকে পড়ল। বলল, ‘এটা কী বললেন, যে ছবি তোলে তার ছবি কারও কাছে থাকবে না? সেই ছবি দেখে এবং আপনাদের দুজনের ছবি দেখে তো পঙ্কজ বললেন যে হ্যাঁ, এঁরা তিনজনে এসেছিলেন। প্রথমে ম্যাডাম আর আপনি। পরে শান্তনু জয়েন করেছিলেন। তাই ওঁকে আলাদা রুম দেওয়া হয়েছিল।’
— ইম্পসেবল। হতে পারে না। শান্তনু কোনো রুম নেয়নি।
সায়ন এবার চুপ করে তন্ময়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। সায়নের চোখের মণি দুটো শুধুমাত্র দৃষ্টি নিক্ষেপ করেই তন্ময়ের মগজটা খুবলে নিতে চাইছে। তন্ময়ও থমকে যায়। সায়নের দিক থেকে চোখ ঘুরিয়ে সিলিঙে, দেয়ালে চরকিপাক খেতে থাকে। এদিকে নীলাম্বর পাথরের মতো চুপ
— আপনাদের কথা হয়ে থাকলে আমি এবার ঘুমোব। আমি আর কথা বলতে তন্ময়ের কথা শেষ হবার আগেই চেয়ার ছেড়ে ঝট করে উঠে দাঁড়ান নীলাম্বর। দৃষ্টি তার উলটোদিকের দেয়ালে। সায়ন আর তন্ময় দুজনেই থমকে যায়। নীলাম্বর গম্ভীর হয়ে বলেন, ‘থ্যাংক ইউ তন্ময়বাবু। সায়ন আমরা বেরোই এবার।’ বলেই নীলাম্বর কারও দিকে না তাকিয়ে সোজা দরজা দিয়ে বেরিয়ে যান। সায়ন কিচ্ছু বুঝতে পারে না। তন্ময়ের দিকে তাকিয়ে কান-এঁটো করা হাসি হেসে ‘শান্তিতে ঘুমোন’ বলে গটগট করে বেরিয়ে যায়।
.
করিডরে পাতা বেঞ্চে ধপ করে বসে পড়লেন নীলাম্বর। ‘কী হয়েছে নীলাম্বরবাবু?’ প্রশ্নটা করেই সায়ন দেখল নীলাম্বরের চোখদুটো ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে। এসির মধ্যেও কপালে, গলায় ঘাম জমেছে। নীলাম্বর গলা নামিয়ে বললেন, ‘আর সময় নেই সায়ন। শান্তনু নিয়োগীর ব্যবহার করা কোনো জিনিস আমায় দাও। শিগগির।’ সায়ন চিন্তায় পড়ে যায়। নিজেই বিড়বিড় করে, ‘ব্যবহার করা জিনিস?’
— হ্যাঁ। ব্যবহার করা জিনিস। যেটার সঙ্গে বেশ কয়েকবার শান্তনুর বডি কন্ট্যাক্ট হয়েছে এরকম কোনো জিনিস।
— সে কোথায় পাব? আত্রেয়ীর বাড়িতে শান্তনুর একটা পাসপোর্ট ছবি পর্যন্ত নেই। সেখানে ব্যবহার করা জিনিস…!
— আছে। থাকতেই হবে। সব প্রমাণ লোপাট হয়নি। তন্ময়ের বাড়ি সার্চ করো। ইমিডিয়েট।
— সেটাও তো হয়েছে। কিন্তু সেখান থেকে এমন কোনো জিনিস পাওয়া যায়নি যেটা অন্য কারও মনে হতে পারে। এবার শান্তনুর পরা জামা যদি কখনও তন্ময় কোনোভাবে নিয়ে গিয়ে থাকে তাহলে সেটা বুঝব কী করে?
— তোমরা আত্রেয়ীর বাড়ি পুরো খুঁজেছ? মানে সব জায়গা? ঘর, ছাদ, বাগান, বাথরুম, বাইরের কোনো ঘর যা যা আছে।
সায়নের চোখে আলো চলকে ওঠে। হঠাৎ কিছু মাথায় খেলে তার। কোনো কথা না বলে অবনীশকে ফোন করে। ‘অবনীশবাবু, আর-একবার আত্রেয়ী সেনের বাড়িতে যেতে হবে। এক্ষুনি প্লিজ।’ কিন্তু অবনীশ জানায় সে অন্য একটা কেসে ফেঁসে আছে। তার কিছু জরুরি মিটিংও আছে। তাই সায়ন যেন একাই চলে যায়। বালিগঞ্জ থানায় কাউকে পাঠিয়ে যেন আত্রেয়ীর বাড়ির চাবি নিয়ে যায়।
