মৃত জ্যোৎস্নার রাত্রি – ৩৩
তেত্রিশ
দু-বার চাবিটা ঘোরাতেই বড়ো তালাটা ঘটাং করে খুলে গেল। কনস্টেবলের হাতের ধাক্কায় কাঠরঙের দরজাটা ধড়াম করে হাট হয়ে গেল। ঢুকে পড়ল সায়ন, সোমদত্তা আর তিনজন কনস্টেবল। একটা গুমোট গন্ধ সবার নাক দিয়ে ঢুকে শরীরের তন্ত্রীতে ছড়িয়ে পড়ল। সপ্তাখানেকের বেশি সময় ধরে ঘরটা বন্ধ। আলো-পাখা চলেনি। এক ফোঁটা হাওয়াও ঢোকেনি অন্ধকার ঘরটায়। ‘আলোটা জ্বালো’ হুকুম ছুড়ে দিল সায়ন। আদেশ মতো পটাপট যতগুলো আলো ছিল ঘরে, সবকটা পরপর জ্বলে উঠল। পাখাটা ঘুরতে শুরু করল। এক ঝলকে ঘরটা সকলের চোখের সামনে দিনের আলোর মতো ফুটে উঠল।
— ইসস কী অবস্থা ঘরের!
সোমদত্তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল কথাটা।
— হুম। ধানুয়াটা বড্ড নোংরা। আত্রেয়ী সেন যে কী করে একে কাজে বহাল রেখেছিল কে জানে?
এর আগে আত্রেয়ীর পুরো বাড়ি সার্চ করলেও, বাগানের পেছনে ধানুয়ার থাকার এক চিলতে ঘরটাকে পাত্তাই দেয়নি সায়ন। ঘরের চারপাশে চোখটাকে চরকির মতো ঘোরাতে ঘোরাতে সায়ন বলল কথাগুলো। সোমদত্তা পালটা উত্তরে বলল, ‘কথায় আছে না স্যার, রতনে রতন চেনে।’ হাতে ধরা রুল দিয়ে বিছানায় ছড়িয়ে থাকা জামাকাপড় সরাতে সরাতে খানিক থেমে গেল সায়ন। সোমদত্তার কথার অর্থ বুঝল না। সোমদত্তা সেটা বুঝে ফিক করে হেসে বলল, ‘কেউ বাইরে ময়লা আর কেউ ভেতরে ময়লা, ব্যাপারটা স্যার একই।’ ঠোঁট বেঁকিয়ে হেসে সায়ন বলল, ‘ওয়েল সেইড ওয়েল সেইড। সূর্যের কিন্তু এই সুন্দর কথা বলার গুণটা নেই।’ খাটের তলায় উঁকি মারবে বলে সবে একটু ঝুঁকেছিল সোমদত্তা। সায়নের মুখে সূর্যের কথা শুনে মাঝপথ থেকেই একেবারে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল সে। কিছু না বুঝেই জিজ্ঞেস করল, ‘হঠাৎ সূর্যের কথা বললেন কেন?’
— কেন? ও তো আমাদের ডিপার্টমেন্টেরই একজন। বলতে পারি না?
— হ্যাঁ, হ্যাঁ স্যার নিশ্চয়ই।
ঝট করে সিরিয়াস হয়ে সায়ন প্রশ্ন করল, ‘বাই দ্য ওয়ে, কাজের কথা বলো। সূর্যের কাজের কী আপডেট? ওর সঙ্গে আমার কথাই হচ্ছে না।’
— সে কী স্যার, ও যে বলল কালই আপনার সঙ্গে কথা হয়েছে!
সায়নের প্রশ্নটা পড়ামাত্রই সোমদত্তার উত্তর। সোমদত্তাও উত্তরটা দিয়ে একটু ব্যোমকে গেল। সূর্যের সঙ্গে যে হরবখতই সোমদত্তার সব বিষয় নিয়ে কথা হয় সেটা ধরে ফেলাটা সায়নের পক্ষে অসম্ভব নয়। সায়ন চোখদুটোকে বড়ো করে ভ্রূ উঁচিয়ে সোমদত্তার উত্তর দেবার ভঙ্গিমা খেয়াল করছিল। সায়নের চাউনির ভাষা বুঝতে পেরেই চুপ করে গেল সোমদত্তা। অমনি ছদ্মগম্ভীর স্বরে সায়ন বলল, ‘বাহ্! খুশি হলাম জেনে যে একজন কলিগ আর-এক কলিগের কাজের খবরাখবর রাখে।’ সোমদত্তার মনে হল ধানুয়ার তক্তপোশটার তলায় ঢুকে যেতে পারলে ভালো হয়। কী, তোমরা কিছু পেলে?’ এতক্ষণ ধরে কনস্টেবলরা ঠকাঠক, ঠুংঠাং শব্দ করে ঘরের আনাচ-কানাচ খুঁজছিল। যদিও অত খোঁজার আছেটাই-বা কী? এই তো একখানা ঘর। এখানে-সেখানে দেয়াল থেকে রং খসে গেছে। ঘরের মধ্যেই দড়ি টাঙিয়ে জামা-কাপড় ঝোলানো। ঘরের এক কোণে স্টোভ রাখা। কিন্তু বাসন-কোশন কিছু নেই। সোমদত্তা জিজ্ঞেস করল, ‘ধানুয়া নিজে রেঁধে খেত?’ সায়ন বলল, ‘তাহলে বাসন থাকবে। কিছুই তো নেই। এই ওই ট্রাংকটা খোলো তো।’ সায়নের নির্দেশ পেয়েই একজন গিয়ে লোহার ট্রাংকটা খুলে দেয়। ঘেঁটেঘুটে তিনটে জামা, দুটো লুঙ্গি আর কয়েক প্যাকেট বিড়ি ছাড়া কিচ্ছু পায় না। ঘর-লাগোয়া ছোট্ট বাথরুম। উঁকি মারে সায়ন। চোখে পড়ার মতো কিছু নেই। ওদিকে সোমদত্তা মাটিতে রুল দিয়ে ঠুকে ঠুকে দেখছে কোথাও কোনো ফাঁপা শব্দ পায় কিনা। কিন্তু সন্দেহ করার মতো কিছুই শ্রুতিগোচর হয় না। সায়ন মাথা নীচু করে খাটের তলাটা ভালো করে দেখতে থাকে। ‘পুরো ফাঁকা স্যার। কিছু নেই।’ সায়ন মাথা তোলে। সোমদত্তাকে বলে, ‘যেখানে দেখিবে ফাঁকা, সরাইয়া দ্যাখো ঢাকা। পাইলেও পাইতে পারো কোনো গুপ্ত পথ।’
— মানে?
সায়ন আবার হুকুম ছোড়ে, ‘এই তক্তপোশটা সরাও তো। ওই দেয়ালের দিক থেকে এপাশে সরিয়ে আনো।’ সোমদত্তা রীতিমত ভেবলে দাঁড়িয়ে থাকে। তক্তপোশ সরানো হয়। সায়ন বলে, ‘ছেনি-হাতুড়ি যা পারো এনে এই টাইলসটা ভাঙো, তাড়াতাড়ি।’ লোকগুলো ছুটে বেরিয়ে যায়। সেই ফাঁকে সায়ন দেয়ালের নীচের দিকে রুল দিয়ে একটি বিশেষ জায়গায় মারে। সোমদত্তাও এবার খেয়াল করে, দেয়ালের নীচে এ-মাথা থেকে ও-মাথা পর্যন্ত অন্য রঙের টাইলসের বেড় দেওয়া। পুরোটাই সমান। কেবল একটি টাইলসের দু-পাশে লম্বা করে সিমেন্টের দাগ। জায়গাটা অন্ধকার থাকায় সোমদত্তা খেয়াল করেনি।
.
আধঘণ্টার কসরতে জায়গাটা ভেঙে একটা গর্ত তৈরি হল। ভাঙতে ভাঙতে বেরিয়ে এল ভাঁজ করা একটা শাড়ির দোকানের প্যাকেট। সোমদত্তা হাতে গ্লাভস পরে সেই প্যাকেট বের করে আনল প্রাচীর গহ্বর থেকে। সায়ন ভ্রূ কুঁচকে উদ্বিগ্ন হয়ে তাকিয়ে রইল সোমদত্তার হাতের দিকে। প্যাকেটটা খুলতেই ভক করে একটা বিশ্রী গন্ধ সোমদত্তার নাকে এসে ঝাপটা মারল। সায়নও নাকটা প্যাকেটের কাছে নিয়ে যেতেই বিশ্রী গন্ধটা পেল। দু-বার শ্বাস নিয়ে বলল, শাড়ির প্যাকেটে মদের গন্ধ! সঙ্গে আরও কোনো গন্ধ মিশে আছে।’ প্যাকেটের মধ্যে থেকে একটা চামড়ার ওয়ালেট বের করে আনল সোমদত্তা। সায়নের চোখের ওপর চকলেট রঙের ওয়ালেটটা এপাশ-ওপাশ করে ঘোরাল সে। সায়নও সেটা হাতে নিয়ে আলোর সামনে ধরে দেখল ওয়ালেটের গায়ে লম্বা লম্বা গাঢ় দাগ। কিন্তু পুরোনো হয়ে যাওয়া চামড়ার ওপর কীসের দাগ সেটা বোঝা যাচ্ছে না। কিছু জায়গায় এলোমেলো ঘষে সেটা জমে আছে। দাগগুলোর ওপর তর্জনী বুলিয়ে কিছু বোঝার চেষ্টা করে সায়ন। ওয়ালেটের চামড়া একটা দিক আর-একটা দিকের সঙ্গে চটচটে হয়ে এঁটে গেছে। এই চামড়াটা একটার সঙ্গে আর-একটা যেন একটু বেশিই কামড়ে ধরে আছে। খুলতে চচ্চড় করে শব্দ হল। ওয়ালেটটা পুরো খুলে ফেলতেই একপাশে একটা ছবি চোখে পড়ল। পাসপোর্ট সাইজের রঙিন ছবি। সায়নের ভ্রূ কুঁচকে গেল। কোনোরকমে ছবিটা বের করে সোমদত্তার হাতে দিয়ে নিজের মোবাইলটা সামনে ধরে। লক খুলে গ্যালারির মধ্যে ঢুকতেই বেরিয়ে আসে একটি নির্দিষ্ট ছবি। ওয়ালেটের ছবিটা এতদিন মুখ গুঁজে বদ্ধ জায়গায় থাকার জন্য অনেকটাই নষ্ট হয়ে গেছে। তবু দুটো ছবি যে একই লোকের সেটা বুঝতে অসুবিধে হল না সায়ন আর সোমদত্তার।
— মানে এই ওয়ালেটটা শান্তনু নিয়োগীর?
সোমদত্তা বলল। সায়ন ঘাড় নেড়ে বলল, ‘শুধু এইটুকু বুঝলে? শান্তনুকে যে খুন করা হয়েছে সেটা বুঝলে না? ওয়ালেটের ওপরে, ভেতরে এগুলো কীসের দাগ বলে মনে হয়?’ দৃঢ় কণ্ঠে উত্তর দেয় সোমদত্তা, ‘রক্তের দাগ।’
— রাইট। প্যাকেটে মদের সঙ্গে রক্তের গন্ধও মিশে আছে। তবে এটা আমার অ্যাসাম্পশন। ল্যাবে টেস্ট করলেই ধরা পড়বে। ভেতরে ছবি ছাড়া কিছু নেই।
— মানে শান্তনুকে খুন করে তার পকেট থেকে এটা বের করে নিয়েছে। কিন্তু কেন?
— কারণ খুনি চেয়েছিল লাশটাকে বেওয়ারিশ করে দিতে। যাতে লোকটার কোনো পরিচয়ই না পাওয়া যায়।
— তার মানে স্যার খুনি লোকটার মুখটাকেও অক্ষত রাখবে না। কিছু না কিছুভাবে ক্ষতবিক্ষত করে দেবে।
কথাটা কানে যাওয়া মাত্রই সায়নের চোখের সামনে বাজ পড়ে জ্বলে ওঠা প্ৰকাণ্ড গাছের মতো ঝলসে ওঠে দু-দিন আগে মিহিরের বাড়িতে দেখা সেই বীভৎস মূর্তির মুখ। যাকে একটা কালো প্রবল বলশালী ধোঁয়া টেনে নিয়ে গেল চোখের সামনে দিয়ে।
— স্যার
সোমদত্তার ডাকে হুঁশ ফিরল সায়নের। সাড়া দিল সায়ন। সোমদত্তা বলল, ‘স্যার, খুনটা তার মানে এই বাড়িরই কেউ করেছে। কিন্তু এখানে নয়। এখানে লাশ লুকোবার জায়গা…’ বলেই সোমদত্তার চোখদুটো বিস্ফারিত হয়ে উঠল। উত্তেজিত হয়ে বলে উঠল, ‘বাগানের কোথাও পোঁতা নেই তো?’ সায়ন এতক্ষণ ঘটনার মধ্যে প্রায় ঢুকে গিয়েছিল। দুম করে মুডটা চেঞ্জ করে বলে উঠল, ‘এটা তো এক্কেবারে অপটু বাচ্চা গোয়েন্দার মতো কথা বললে সোমদত্তা!’
— কেন স্যার?
সোমদত্তার মুখটা ছোটো হয়ে গেল। সায়ন বলল, ‘একে সেলিব্রেটির বাড়ি। দুনিয়ার মিডিয়া পারলে বেডরুমের অ্যাটাচ বাথে পর্যন্ত ঢুকে পড়ে। আর এখানে সবার চোখ এড়িয়ে একটা আস্ত লাশ পুঁতে ফেলবে?’
— তা-ও ঠিক। তাহলে স্যার লাশটা গেল কোথায়?
— সম্ভবত পাহাড়ে।
— ভারমোর!
— রাইট। কিন্তু সেখান থেকেই-বা লাশ কোথায় গেল? সূর্য তো বলল এরকম লাশের কোনো রেকর্ডই পাওয়া যায়নি।
সায়ন আবার সেই বড়ো গোল গোল চোখ করে সোমদত্তার দিকে তাকাল। বলল, ‘নাহ্! এবার দেখছি সূর্যকে আর ফোন করে ডিস্টার্ব করা ঠিক হবে না। তোমাকে করলেই চলবে।’ লজ্জায় ঢক করে মাথাটা মাটির দিকে নেমে যায় সোমদত্তার। একটাও কথা বলে না। সায়ন হাসে। বলে, ‘ক্যারি অন।’ সোমদত্তা এতক্ষণে মাথা তুলল। বলল, ‘তবে স্যার একটা কথা কিছুতেই মাথায় ঢুকছে না।’
— কী?
— খুন করল ভারমোরে। আর প্রমাণ পকেটে করে এই এতটা পথ বয়ে এনে দেয়াল খুঁড়ে এখানে লুকোল। কেন? মাঝপথে ট্রেন থেকে ফেলে দিলেই তো ল্যাটা চুকে যেত।
— কী জানি? যতদূর মনে পড়ছে বন্দনা বলেছিল শান্তনু একটা ব্যাগ নিয়ে বেরিয়েছিল ভারমোর যাবে বলে। তাহলে সেই ব্যাগটাই বা কোথায় গেল? আত্রেয়ীর সারাবাড়িতে নেই। খুনি যদি লাশটাকে না-চেনার মতো অবস্থায় কোথাও ফেলে ও তাহলে সেই লাশটা পাওয়া উচিত। কিন্তু সেটাও পাওয়া যায়নি। লাশের ব্যাগ নেই। কেবল এতটা রাস্তা পার করে এই ওয়ালেট লুকোনো বাড়ির দেয়ালে।
— আর স্যার ক্যামেরা? সেটাও তো সঙ্গে ছিল।
সোমদত্তা কথাটা বলামাত্রই মাথার মধ্যে চিড়িক দিয়ে ওঠে সায়নের। মনে পড়ে তন্ময়ের বাড়িতে খাটের তলা থেকে পাওয়া কাপড় মোড়া সেই ক্যামেরাটা। কিছুক্ষণ চুপ থেকে সায়ন বলে, ‘তন্ময় হালদারের বাড়ি থেকে যে ক্যামেরা আর কার্ড পাওয়া গিয়েছিল সেগুলো ল্যাবে পাঠাবার ব্যবস্থা করো। সম্ভবত সেগুলোই শান্তনুর।
— ওকে স্যার। বাট কার্ডগুলো থেকে কোনো ছবি পাওয়া যায়নি। সব কার্ড ফাঁকা ছিল।
গালের পাশটা চুলকে নিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে সায়ন বলল, ‘শালা তন্ময়টা হসপিটালে থেকেই যত কাল হয়েছে। নইলে ঘা কতক দিলেই ভড়ভড় করে বেরিয়ে আসত।’
— স্যার আরও একটা জিনিস আছে।
বলেই প্যাকেটের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে মোটা কাগজের খামে মোড়া চৌকো মতন কিছু একটা বের করে সোমদত্তা। ‘কী এটা? খোলো দেখি’ বলেই ওয়ালেটটা সোমদত্তার দিকে বাড়িয়ে দেয় সায়ন, ‘এটাকে প্যাকেটের মধ্যে রাখো। সোমদত্তা হাত থেকে প্যাকেটটা নিয়ে নেয় চিরঞ্জীব। খামের মধ্যে থেকে বেরিয়ে আসে কতগুলো পোস্টকার্ড সাইজের চেয়ে একটু ছোটো মাপের ছবি। ‘দেখি কীসের ছবি’ বলে হাত বাড়িয়ে দেয় সায়ন। সোমদত্তা ভালো করে দেখে বলে, মনে তো হচ্ছে আত্রেয়ী সেনের কম বয়সের ছবি। দেখুন।’ সায়ন ছবিগুলো হাতে নেয়। প্রথম ছবিটা দেখেই বলে ওঠে, ‘আত্রেয়ী সেনের কোলে বাচ্চাটা কে?’ ছবির নীচ থেকে আর-একটা ছবি বের করে ভালো করে দেখে। যতই দেখে ততই কমে আসে দুটো ভ্রূর মাঝখানের দূরত্ব। চোখদুটো অজানা কোনো সূত্র পাওয়ার চমকে চঞ্চল হয়ে ওঠে। ছবিগুলো পরপর দেখতেই থাকে সায়ন। সোমদত্তা খেয়াল করে সায়ন বেশ অস্থির হয়ে উঠেছে।
— কী হয়েছে স্যার? এগুলো কার ছবি? কোনো ক্লু পেলেন?
পরপর তিনটে প্রশ্ন করে সায়নের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে সোমদত্তা। সায়ন কপালের ঘাম মুছে বলে, ‘সব যে তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে সোমদত্তা। অনেক, অনেক রহস্য একসঙ্গে জমে আছে। কতগুলোর জট ছাড়াব একসঙ্গে?’
— স্যার কী হয়েছে আমাকে একটু বলুন না। আমি যদি কিছু হেল্প করতে পারি!
— সালমা খাতুনের খবর নিয়েছ?
— সালমা খাতুন!
আত্রেয়ী সেন থেকে হঠাৎ করে সালমা খাতুনে ট্রান্সফার হওয়াতে প্রথমটায় খেয়াল করতে পারেনি সোমদত্তা। ঠিক তারপরেই মনে পড়াতে বলল, ‘ও হ্যাঁ হ্যাঁ। কবরডাঙায় থাকে। ওটা ওর বাপের বাড়ি। মেয়েটির শ্বশুরবাড়ি বেহালার দিকে। ওর বরের নাম রফিক আহমেদ। কিন্তু সে বছরের বেশিরভাগ সময়েই বাইরে থাকে কাজের সূত্রে। তাই বাপের বাড়িতে আছে এখন।’
— সালমা যে সোনোগ্রাফি করাতে আসে, ডাক্তার দেখায়, সেটা কার সঙ্গে? নিশ্চয়ই একা আসে না। মা বা বাবার সঙ্গে?
— না স্যার বাবা নেই। মা আছেন। তবে বেরোন-টেরোন না। সালমার ভাই আছে ওয়াসিম। ওই দিদির দেখাশোনা করে।
— কবরডাঙা, তার মানে চারু মার্কেট পুলিশ স্টেশন!
— হ্যাঁ স্যার।
— হারি আপ। এক্ষুনি চলো।
ছবিগুলো হাতে নিয়েই হুড়মুড় করে বেরিয়ে গেল সায়ন। স্যারের মাথায় ঠিক কী চলছে কিচ্ছু বুঝল না সোমদত্তা। কেবল অন্ধের মতো অনুসরণ করতে করতে ছুটল সায়নের পেছন পেছন।
.
আত্রেয়ী ঘুমিয়ে পড়ার পর সোহিনী কেবিনের কাচের সামনের পর্দা টেনে দিল। ঘরের মাঝের পর্দাটাও টেনে দিয়ে আত্রেয়ীর মাথার ওপরের আলোটা নিভিয়ে দিল। পর্দার ওপারে হালকা আলোটা জ্বলছে। আজ আত্রেয়ীর যে টেস্টগুলো হয়েছে সেগুলোর রিপোর্ট এসেছে খানিকক্ষণ আগে। এতদিনেও তো পেশেন্টের বাড়ির লোক বলতে কেউ এল না। এক ওই তন্ময় হালদার দু-বার এসেছিল। কিন্তু এখন সে-ও তো হসপিটালে। যে প্রোডাকশন হাউসের কাজ করছিল সেই হাউজের লোকজনই যা খবরাখবর নেয়। এই নিয়েও তো মিডিয়ার প্রশ্নের শেষ নেই। এত বড়ো একজন অভিনেত্রী, অথচ তার বাড়ির লোক বলতে কেউ নেই? আত্রেয়ী সেনের নার্স বলে সোহিনী নিজেই যে কত লোকের কতরকমের প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। পর্দার শেষ প্রান্তে চেয়ারে বসে আছে সোহিনী। কেবিনের মাঝের পর্দার ওপাশ থেকে ঠিকরে আসা আলোয় রিপোর্টগুলো দেখতে অসুবিধে হচ্ছে না তার। বাইরের করিডর নিস্তব্ধ। একেই রাত। তার ওপর চারপাশের নৈঃশব্দ্য চোখের পাতাকে ভারী করে তোলে। বাইরের করিডর থেকে সাদা টিউবের আলো কাচের দরজা ঠেলে কেবিনের মাটিতে আড়াআড়ি ভাবে পড়েছে। বেশ কিছুক্ষণ পর সোহিনীর মনে হয় কাচের দরজার কাছে কে যেন এসে দাঁড়িয়েছে। মাটিতে আলোর সঙ্গে তেরচা ছায়া পড়েছে তার। চোখ তুলে তাকায় সোহিনী। কিন্তু দরজার বাইরে সে কাউকেই দেখতে পায় না। দুটো ভ্রূর মাঝে অল্প ভাঁজ ফেলে ভাবে ভুল দেখল সে! হয়তো না, সত্যিই হসপিটালের কেউ এসে দাঁড়িয়েছিল কোনো কাজে। তারই ছায়া দেখেছে। এ নিয়ে আর বিশেষ পাত্তা দিল না মনকে। কাজে মন দিল সোহিনী।
.
আত্রেয়ী সেন ঘুমের মধ্যেই নড়ে ওঠে। পাশ ফেরার চেষ্টা করছিল। বুঝতে পেরে সোহিনী দৌড়ে গিয়ে আত্রেয়ীর হাতটা ধরে একটা বালিশের ওপর রাখল। পিঠের তলায় আর-একটা বালিশ দিয়ে দিল। মুখটা একটু ঝুঁকিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘ম্যাম, জল খাবেন?’ আত্রেয়ী চোখ বুজেই না-সূচক ঘাড় নাড়ল। সোহিনী ফিরে এল নিজের জায়গায়। ঠিক সেইসময় বাইরের করিডরের লিফটটা খুলে গেল। স্ট্রেচারে করে অক্সিজেনের নলসমেত একজন রোগীকে নিয়ে আসা হল। আত্রেয়ীর ঘর ছাড়িয়ে পাশের কেবিনে চলে গেল। কেবিনের দরজায় আবার বেশ কিছু মানুষের ছায়ার চলাচল দেখল সোহিনী। একটা সময় সেইসব সব ছায়াও সরে গেল। কেবল একটি ছায়া কাচের গায়ে গা ঠেকিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। সোহিনী রিপোর্টগুলো একটা ফাইলে রাখবার জন্য চেয়ার ছেড়ে উঠে আত্রেয়ীর পাশের টেবিলের দিকে গেল। টেবিল লাগোয়া ড্রয়ার টেনে নীল ফাইলটা বের করে কাগজগুলো গুছিয়ে রাখল। ঘর জুড়ে এসির ঠান্ডা হাওয়াটা আরও বেশি ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। সোহিনীর গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছে। বাইরে গিয়ে শুভমকে বলতে হবে এ ঘরের এসিটা একটু কমিয়ে দিতে, এই ভেবে পেছনে ঘুরতেই থমকে গেল। আশ্চর্য! দরজার বাইরে কে? একভাবে ওইখানেই দাঁড়িয়ে আছে। সোহিনী এগিয়ে গিয়ে টান মেরে দরজাটা খুলে দিল। বুকের কাছে কে যেন সজোরে এক ধাক্কা দিয়ে গেল সোহিনীর। দরজার বাইরে কেউ নেই। নিশ্বাসটা ভারী হয়ে এল তার। এবার একটু ভয় পেল সে। ঝট করে বাইরে এদিক-ওদিক ভালো করে দেখল। করিডরটা সাদা আলোর চাদর মুড়ি দিয়ে শূন্য বুকে বসে আছে। হঠাৎ চচ্চড় করে কাচ ফাটার শব্দ কানে আসে। খুব মনোযোগ সহকারে শুনতে চেষ্টা করে শব্দের উৎস। কোথাকার কাচ ফাটছে? মুহূর্তে দরজার দিকে তাকায়। কিন্তু কিচ্ছু দেখতে পায় না। আওয়াজটা একবার করে হচ্ছে আর থেমে যাচ্ছে। রিপোর্টগুলো পড়তে পড়তে সত্যিই চোখটা জুড়ে আসছিল সোহিনীর। এইসব ভুলভাল দেখছে, শুনছে কী তার জন্য?
— তপতীদিইইই, ও তপতীদিইই।
দু-বার ডেকেও সাড়া পেল না কারও। এদিকে এক কাপ কফি না হলে খুব মুশকিল। দরজার বাইরে দাঁড়িয়েই ঘরের ভেতর মাথা ঝুঁকিয়ে আত্রেয়ীর অবস্থান দেখে নিল। মহিলা নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে। কাউকে যখন পাওয়াই যাচ্ছে না তখন কয়েক পা এগিয়ে নিজেই নিয়ে আসুক কফিটা। কতক্ষণ আর! দু-মিনিটের ব্যাপার। সেই মতো ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল সোহিনী। তেরো-চোদ্দো পা হাঁটতেই কফি মেকার। ড্রয়ার খুলে কাপ নিল। মেশিনের সুইচ টিপে দুধ নিল। ঘষঘষ শব্দ করে কফির ফ্যানা উপচে এল কাপের কিনারায়। এরপর একটা চুমুক। আঃ! গরম কফিটা গলা দিয়ে বুকের কাছে যেতে বেশ আরাম হল। কাপে চুমুক দিতে দিতে কেবিনের দিকে এগিয়ে যায় সে। বাঁ-হাতে কাপটা ধরে ডান হাত দিয়ে দরজার হাতলে চাপ দেয়। তারপর শরীর দিয়ে দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই দেখে আত্রেয়ীর বিছানা খালি। একটু আগেই যে কফিটা গলা দিয়ে উষ্ণ পরশ বুলিয়ে নামছিল সেটা এখন কণ্ঠনালিটা যেন জ্বালিয়ে দিল। আত্রেয়ী সেন গেল কোথায়? হঠাৎ কেবিনের কাচ ঢাকা জানলার দিকে চোখ পড়তেই সোহিনী দেখে আত্রেয়ী জানলার দিকে ফিরে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। পর্দাটা সরানো। জানালার কাচে ফেটে যাওয়ার অজস্র নিশান। আত্রেয়ীর হাত থেকে ঝুলছে ছিঁড়ে যাওয়া স্যালাইনের নল। ঘরের মাঝের পর্দাটাও খানিকটা সরে গেছে। কোনো কিছু ভাবার আগেই সোহিনী চিৎকার করে ওঠে, ম্যাম, আপনি উঠলেন কী করে?’ বলেই এগিয়ে যেতে থাকে আত্রেয়ীর দিকে। চোখের পলকে হাওয়ার বেগে এক বীভৎস দর্শন লোক সোহিনীর সামনে এসে দাঁড়ায় তার রক্তমাংস মাখামাখি হয়ে যাওয়া থ্যাতলানো মুখের দাঁতগুলো বের করে। সে মুখের চোখ, ঠোঁট, দাঁত কিছুই ঠিক জায়গায় নেই। আচমকা ঝাঁপিয়ে পড়া আতঙ্কে সোহিনীর গলা দিয়ে তীক্ষ্ণ আর্তনাদ বেরিয়ে আসে। ঠিক তারপরেই ফেটে যাওয়া কাচগুলো ফুঁড়ে আত্রেয়ী সেন ছিটকে পড়ে জানলার বাইরে। আলোর ছদ্মবেশে থাকা শহুরে নিশুতি করালী রাক্ষসীর মতো তাকে গ্রাস করে নেয় উদরে। আত্রেয়ীর শরীরটা ছয়তলার জানলা দিয়ে ছুড়ে ফেলা পুতুলের মতো হুহু করে মাটির দিকে নেমে যায়। মাটিতে পড়ে মুখ থুবড়ে। মরণ-তামসী খলখল করে হাসতে হাসতে উদ্বাহু হয়ে নৃত্য করতে থাকে সেই মাথা থেঁতলে, হাড় গুঁড়িয়ে যাওয়া শরীরটার ওপর। জানলার কিছু কাচ বিঁধে থাকে নটীর নরম শরীরে। ছড়িয়ে-পড়া চুলগুলো রক্তে-ঘিলুতে মাখামাখি। চোয়াল ভেঙে ঘুরে গেছে। হাঁ হয়ে গেছে মুখটা। চোখদুটো বন্ধ করারও সময় পায়নি আত্রেয়ী। ডানহাতটা কে যেন মুচড়ে ভেঙে দিয়েছে। বাঁ-হাত বাঁধানো চাতালে ছড়িয়ে আছে। যারা ছুটে এল অকুস্থলে আত্রেয়ীকে দেখে তারাই সবার আগে আঁতকে উঠে মুখ ফিরিয়ে নিল। তারপর চোখ-মুখ কুঁচকে অনেক কষ্টে দেখবার চেষ্টা করে আত্রেয়ীর লাশটাকে।
