মৃত জ্যোৎস্নার রাত্রি – ৩৪
চৌত্রিশ
বাংলার বুকে আজ এক মর্মান্তিক দিন। ভয়ানক কালো দিন। ভয়ংকর এক দুর্ঘটনায় চলে গেলেন অভিনেত্রী আত্রেয়ী সেন। কলকাতার সবচেয়ে বড়ো হাসপাতাল মেডিলাইফ সুপার স্পেশ্যালিটি হসপিটাল। সেটারই ছয় তলার আইসিসিইউ থেকে বন্ধ জানলার কাচ ভেঙে এক্কেবারে নীচে আছড়ে পড়লেন অভিনেত্রী। কিন্তু কীভাবে? তিনি তো নিজে হাঁটাচলাই করতে পারছিলেন না। মাত্র তিনদিন আগে ওঁর জ্ঞান ফিরেছিল। সারা গায়ে স্যালাইন, অক্সিজেনের হাজারও একটা টিউব। সেগুলো ছিঁড়ে এই অবস্থায় কীভাবে জানলার শক্ত কাচ ভেঙে নিজে থেকেই নীচে পড়ে গেলেন? আত্মহত্যা করতে গেলেও মনের সঙ্গে গায়ের শক্তি লাগে। কিন্তু এই মুহূর্তে আত্রেয়ী সেনের কোনোটাই ছিল না। তাহলে কি হত্যা? কিন্তু কে করল এই কাজ? কোথায় ছিলেন নার্স? কর্তৃপক্ষকে এর জবাব দিতেই হবে। সপ্তাহ দু-এক আগেই আত্রেয়ী সেনকে খুন করার চেষ্টা করা হয় বোলপুরের চৌধুরি ভিলার ছাদ থেকে ঠেলে ফেলে। খুনের অভিযোগ ওঠে শুটিং ডিরেক্টর মিহির সরখেলের ওপর। দুর্ভাগ্যের বিষয় তাকেও কলকাতার আর-এক নাম করা হসপিটালে ভরতি করা হয়েছে। কারণ উনিও আত্রেয়ী সেনের বাড়ির দোতলার বারান্দা থেকে ঝাঁপ দিয়ে গুরুতর আহত হন। তাহলে কী মিহির সরখেল নয়? এই সব খুনের আড়ালে আছে অন্য কেউ?
.
গলা তুলে হাত-মাথা নেড়ে যতটা পারা যায় হুমহাম করে ক্যামেরার সামনে একটানা বকে গেল এক টিভি চ্যানেলের রিপোর্টার। এখনও ভোর হয়নি। অশরীরী রাত্রি এখনও তার সর্বনাশী কুহেলি ছড়িয়ে রেখেছে। এমনই আরও কয়েকজন রিপোর্টার হুমড়ি খেয়ে পড়েছে হসপিটালের সামনে। সকলের আঙুল এখন হসপিটাল কর্তৃপক্ষ এবং পুলিশের দিকে। অজস্র প্রশ্ন আর আঙুল তুলে দোষারোপের মধ্যে দিয়েই কমিশনার গাড়ি থেকে নেমে দৌড়ে ঢুকে গেলেন হসপিটালে। গেটের বাইরে প্রশ্নের পাহাড় জমতে থাকে। ক্ষোভে, রাগে আর ভয়ে ফেটে পড়েন অনেক মানুষ।
.
সোহিনীর গায়ে চাদর জড়িয়ে আত্রেয়ীর কেবিনেই বসিয়ে রাখা হয়েছে। সে বসে বসেই হাঁটু আর হাতদুটোকে বুকের কাছে জড়ো করে থরথর করে কাঁপছে। চোখদুটো লাল। জলে ভরতি। থেকে থেকেই চোখের কোল ভরে উপচে পড়ছে অশ্রু। নীচের ঠোঁটটা তিরতির করে কাঁপছে। মাঝেমাঝে ভাঙা কাচের দিকে তাকাচ্ছে আর ফুলে ফুলে উঠছে। সোমদত্তা মোবাইলটাকে হাতে ধরে বসে আছে সোহিনীর কাছে। সোহিনী বলতে শুরু করলেই সে রেকর্ড করবে। কিন্তু সোহিনী যে কিচ্ছু বলছে না। শুধু কাঁপছে। সায়ন চুপ করে বসে আছে সোহিনীর দিকে তাকিয়ে। ‘কী ঘটেছিল সেটা আপনাকে বলতেই হবে সোহিনী ম্যাডাম। আপনিই কিন্তু এখানে ছিলেন কাল রাতে।’ সোমদত্তার পাশেই দাঁড়িয়েছিল এই হসপিটালের সুপারভাইজার শিবানী গাঙ্গুলি। ফিশফিশ করে সোমদত্তাকে জিজ্ঞেস করল, ‘আচ্ছা, উনি ওসব কী করছেন?’ সোমদত্তা শিবানীর দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে সামনের দিকে তাকাল। সায়নের সঙ্গে নীলাম্বরও এসেছেন। তিনি এই কেবিনে ঢোকামাত্রই হাতে রুদ্রাক্ষ জড়িয়ে কিছু একটা মন্ত্র পড়তে শুরু করেছেন। তারপর চোখ বুজে ভাঙা জানলার দিকে হাঁটতে থাকেন। আবার চোখ বুজেই ফিরে আসেন। তারপর একবার বেরিয়ে যান কেবিন থেকে। এরপর ঘরে ঢুকে আসেন। চোখ বন্ধ করেই দু-পা পিছিয়ে যান। কেবিনের বেডের দিক থেকে জানলার দিকে মুখ ফেরান। সোমদত্তা অবাক হয়ে দেখছিল নীলাম্বরের কাণ্ড। কেবিনের বাইরে কয়েকজন পুলিশ। শিবানীর মুখ শুকিয়ে ছোটো হয়ে গেছে। সে তার কথা সায়নকে বলে যাচ্ছে, ‘সোহিনী এখানে আছে পাঁচ বছর হল স্যার। ওর কাজের দক্ষতার জন্যেই ম্যাডামের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু স্যার, ম্যাডাম বিছানা থেকে কীভাবে উঠলেন? কীভাবেই বা জানলার কাছে গিয়ে অত শক্ত দুই লেয়ারের একটা মোটা কাচ ভেঙে পড়ে গেলেন! কিচ্ছু বুঝতে পারছি না।’ নীলাম্বর নিজের মনে তার কাজ করে চলেছেন। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা কনস্টেবলরা হঠাৎ পা ঠুকে স্যালুট করে ওঠে। পায়ের শব্দ পেয়ে সায়ন ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় এবং দ্যাখে কমিশনার ঢুকে এসেছেন কেবিনে। বজ্রগম্ভীর কন্ঠটা গমগম করে প্রশ্ন করে ওঠে, ‘কী ব্যাপার সায়ন? কিছু জানতে পারলে?’ সোমদত্তা আর সায়ন উঠে দাঁড়িয়ে স্যালুট জানায়। সায়ন বলে, ‘স্যার, ইনি কাল রাতে আত্রেয়ী সেনের কেবিনে ছিলেন। নাম সোহিনী সান্যাল। উনি হঠাৎ চিৎকার করে ওঠেন। তখন আশেপাশের সবাই ছুটে আসেন। এসে দেখেন সোহিনী মাটিতে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছেন। আর ওই কাচটা ভাঙা। ঠিক তখনই নীচ থেকে শোরগোল শুনে এঁরা এই কাচের মধ্যে দিয়ে নীচে তাকান। দেখেন আত্রেয়ী ম্যাডাম নীচে পড়ে আছেন। জ্ঞান ফেরার পর থেকে সোহিনী কথাই বলছেন না। শুধু কাঁদছেন আর বোধহয় ভয়ে কাঁপছেন।’ সায়নের কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনলেও কমিশনারের দৃষ্টি ছিল নীলাম্বরের কর্মকাণ্ডের দিকে। সায়নের কথা শেষ হতেই জিজ্ঞেস করেন, ‘উনি কে? এখানে কী করছেন?’ উত্তরটা সায়নই দেয়, ‘স্যার উনি নীলাম্বর ব্যানার্জি। প্যারানরমাল অ্যাক্টিভিটি নিয়ে কাজ করেন। আমার তেরো নম্বর ফ্লোরের প্রবলেমটা উনিই সলভ করেন।’
— তা তোমাদের কী ধারণা? এইসব কাজ ভূতের?
— স্যার আপনি…
সায়ন কিছু একটা উত্তর দিতে গিয়েছিল। কিন্তু তার আগেই নীলাম্বর চোখ বুজেই বলে ওঠেন, ‘ভূত মানে তো অতীত কমিশনার সাহেব। সেটাকে কি আপনি অস্বীকার করতে পারেন?’ এবার চোখ খুলে কমিশনারের দিকে তাকালেন নীলাম্বর। কমিশনার নীলাম্বরকে উত্তর না দিয়ে সরাসরি সায়নকে প্রশ্ন করলেন, ‘সায়ন, এবার থেকে পুলিশ কি তাহলে ওঝার সাহায্য নিয়ে কেস সলভ করবে?’ সায়ন একটু অপ্রস্তুত। তা-ও বলল, ‘স্যার, আবদুলের কেসটা কি পুলিশ সলভ করতে পেরেছে? আপনি তো নিজেই সিসিটিভি ফুটেজ দেখেছেন।’
— কারেক্ট। সিসিটিভি ফুটেজ। দেখেছ নিশ্চয়ই। কিছু পেয়েছ?
সায়ন বুঝল, সঠিক উত্তর না থাকায় কমিশনার কথাটা ঘুরিয়ে দিলেন। সায়ন বলল, ‘না স্যার। সোহিনীর জবানবন্দি নেবার পর দেখব ভেবেছিলাম।’
— বাহ্! আশ্চর্য! তোমরাই তো বলছ উনি মুখ খুলছেন না। ততক্ষণে সিসিটিভিটা তুমি দেখবে তো। তোমার জুনিয়র তো সোহিনীর জবানবন্দি নিতেই পারে নাকি? আর তাতেও যদি মুখ না খোলেন তাহলে থানায় নিয়ে গিয়ে হাজারও উপায় আছে কথা বের করার।
কমিশনারের হম্বিতম্বিতে সোমদত্তা একটু সিঁটিয়ে গেল। ‘উনি বোধহয় মুখ খুলতে পারবেন না’ কথাটা বলতে বলতে এগিয়ে এলেন নীলাম্বর।
— মানে? আপনি কী করে জানলেন উনি কথা বলতে পারবেন কি পারবেন না?
বেশ কড়া গলাতেই কথাটা শোনালেন কমিশনার। নীলাম্বর বলেন, ‘কারণ ও যা চোখে দেখেছে সেটা দেখার পর কথা বন্ধ হয়ে যাওয়ারই কথা।’
— উনি চোখে কী দেখেছেন সেটা আপনি কী করে জানলেন?
— যোগসাধনা।
কমিশনার ঠোঁট বেঁকিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলেন। সায়নকে একটু কড়া সুরেই বললেন, ‘আমরা এখানেই দাঁড়িয়ে থাকব নাকি সিসিটিভি ফুটেজটা দেখব?’
— চলুন স্যার।
ঘর থেকে বেরোবার আগে সায়ন বলল, ‘সোমদত্তা তুমি দ্যাখো কথা বলাতে পারো কিনা। আর নীলাম্বরবাবু আপনি এখানেই থাকুন।’
— যোগসাধনা চালিয়ে যান আর এখান থেকে এই মুহূর্তে বেরোবেন না।
ঘর থেকে বেরোবার আগে নীলাম্বরের দিকে তাকিয়ে আরও একটু তাচ্ছিল্য মেশা হুকুম ছুড়ে দিয়ে বেরিয়ে গেলেন কমিশনার। সায়নের মুখটা লজ্জায় কঠিন হয়ে গেলেও কিছু বলতে পারল না। নীলাম্বর হাসলেন।
.
গতকাল রাতে যা যা ঘটেছে সব একে একে দেখাতে থাকে সিসিটিভি। সোহিনীর চেয়ারে বসে আপন মনে রিপোর্টের পাতা ওলটানো। মাঝে দৌড়ে গিয়ে আত্রেয়ীকে সাহায্য করা। সে কিছু একটা কথা বলল আত্রেয়ীর কানের কাছে মুখ নিয়ে। তারপর আবার চেয়ারে এসে বসল। কমিশনারের চোখ সব ক-টা স্ক্রিনে ধূর্ত শৃগালের মতো ঘুরে চলেছে। পাশে দাঁড়িয়ে সায়ন। সে-ও ভালো করে দেখছে। এখনও কোনো অস্বাভাবিকত্ব চোখে পড়েনি কারও। পেছনে এক বুক টেনশন নিয়ে কয়েকজন ডাক্তারসমেত ম্যানেজমেন্টের লোক দাঁড়িয়ে। হঠাৎ আইসিসিইউ-র মধ্যের দুটো সিসিটিভির ছবি একটু ডিস্টার্ব করতে থাকে। কমিশনার এতক্ষণ ঝুঁকে দেখছিলেন। এবার একটু সোজা হয়ে বসেন। সায়নের মনেও পূর্ব-ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি শুরু হয়। সকলেই দেখে করিডরের বাইরে থেকে তেরচাভাবে এসে মাটিতে পড়া আলোতে কারও একটা ছায়া। লম্বা মানুষের মতোই। সোহিনী তাকাল। সঙ্গে সঙ্গে কমিশনার বলে উঠলেন, ‘স্টপ স্টপ।’ সবকটা সিসিটিভি একসঙ্গে পজ হয়ে গেল। কমিশনার বললেন, ‘রাত দুটো বেজে দু-মিনিটে একটা ছায়া কেবিনে পড়ল। অথচ সেইসময় করিডরে কেবিনের দরজার কাছে কেউ নেই? এটা কী করে সম্ভব? তাহলে ছায়াটা কার?’ উপস্থিত সকলেরই সারা গায়ের ওপর দিয়ে একটা শিরশিরে হাওয়া খেলে গেল। কেউ বুঝল না কোথা থেকে বন্ধ ঘরে হাওয়াটা এল। সত্যি হাওয়া এল নাকি সিসিটিভি যা দেখাল তারই প্রতিক্রিয়া হল সবার শরীরে? সায়ন চুপ। কোনো প্রতিক্রিয়া নেই তার মুখে কারণ ওর কাছে এর কার্যকারণ সব জানা। কমিশনারের নির্দেশে চলতে শুরু করল সিসিটিভির ফুটেজগুলো। খানিকক্ষণ বাদে লিফট থেকে একজন রোগীকে অক্সিজেনসমেত নিয়ে আসা হয় স্ট্রেচারে করে। তাকে নিয়ে চলে যাওয়া হয় পাশের একটা কেবিনে। সকলের চোখ সড়ুৎ করে সরে আসে সোহিনীর ফুটেজে। সেখানে দিব্যি মানুষগুলোর ছায়া পড়ল এবং সেটা সরেও গেল। কিন্তু আবারও অবাক কাণ্ড। একটি ছায়া বেশ খানিকক্ষণ ধরে আত্রেয়ীর কেবিনের মাটিতে শুয়ে রইল। অথচ করিডরের বাইরে তখনও কেউ নেই। সোহিনী উঠে দরজা খোলে এবং কাউকে দেখে না। তারপর কাকে যেন এপাশে-ওপাশে তাকিয়ে ডাকে মেয়েটি। না পেয়ে ঘরের দিকে একবার তাকিয়ে দরজা বন্ধ করে বেরিয়ে যায়। সোহিনী কফি নিচ্ছে। ঠিক সেই সময় আত্রেয়ী সেন নড়ে ওঠে। সিসিটিভিতে ঝিরঝির করতে থাকে। কমিশনারের কপালে ভাঁজ। ভ্রূদুটো কুঁচকে কাছে চলে আসে। চোখের মণি ঈষৎ বিস্ফারিত। চমকে ওঠে সবাই। ফুটেজে প্রবলেম থাকা সত্ত্বেও সবাই বুঝতে পারে আত্রেয়ীর হাত থেকে স্যালাইনের নলটা ছিঁড়ে গেল। আত্রেয়ী যেন কাকে দেখে ছটফট করছে। ‘পজ পজ। আত্রেয়ীকে জুম করো।’ ছবি জুম হয়। কমিশনার বলে ওঠেন, ‘আরও জুম। একদম ঠোঁটে যাও। কিছু একটা বলছে মনে হচ্ছে।’ ছবি আরও জুম হয়। ফুটেজটা ফেটে যায়। কিন্তু মুখ নড়াটা ঝাপসা হলেও মোটামুটি বোঝা যায়। ভালো করে স্লো করে দেখে সবাই। চোখে মাইক্রোস্কোপ লাগালে যেমন চোখ ছোটো হয়ে আসে তেমনি করে ঠোঁটের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম নড়াচড়া প্রত্যক্ষ করছে উপস্থিত সকলে। আত্রেয়ীর দু-বার ঠোঁট নড়া দেখে সায়নও হুবহু একইরকমভাবে ঠোঁট নেড়ে বুঝতে চেষ্টা করে সে কী বলতে চাইছে। তাতে তার মাথায় যে শব্দটা প্রথম আসে সেটা ভেবে চমকে ওঠে। মনে মনে খুশিও হয়। সায়ন বোঝে সে ঠিক পথেই এগোচ্ছে। কমিশনার জিজ্ঞেস করে, ‘কিছু বুঝতে পারছ সায়ন! কী বলছেন আত্রেয়ী?’
— স্যার আমি তো লিপ-রিডার নই তবু আন্দাজ করতে পারি।
— কী? কী বলছে?
এবার বেশ উত্তেজিত শোনায় কমিশনারের গলা। সায়ন বলে, ‘আত্রেয়ী ওঁর স্বামীর নাম বলছেন, শান্তনু।’
— অ্যাঁ! কী বলছ? ওঁর স্বামী তো নিরুদ্দেশ।
— সেই জন্যেই তো কেউ জানে না তিনি বেঁচে আছেন কিনা।
— দেখি ফুটেজটা আবার চালান তো।
ভয়ে হাঁ হয়ে থাকা মুখের মধ্যে জিভটা একবার ওপরের টাকরা ছুঁয়ে নীচে নামে, সঙ্গে মুখটাও বন্ধ করে খুলে আবার বন্ধ হয়। কমিশনার নিজেই আত্রেয়ীর ঠোঁটের সঙ্গে গলা মিলিয়ে বলে, ‘শাআআআন।’ স্লো মোশনে আত্রেয়ীর ঠোঁটদুটো ঈষৎ সামনের দিকে এগিয়ে নরমাল হয়ে যায়। কমিশনার উচ্চারণ করেন নামের বাকি অংশ ‘তনু।’ শব্দটার সঙ্গে হুবহু লিপ মিলে যায়।
ফুটেজ চলতে শুরু করে। কিন্তু ছবিটা মাঝেমাঝে একেবারে কালো হয়ে যাচ্ছে আবার চলে আসছে। সেইভাবেই দেখা গেল আত্রেয়ী নিজেই বিছানা ছেড়ে ওঠার জন্য পিঠটা তুলছে। তারপরেই অন্ধকার। আবার যেই ছবি ফুটে উঠল, দেখা গেল আত্রেয়ী কেবিনের মাঝের পর্দা সরিয়ে জানলার দিকে যাচ্ছে। তা-ও ভীষণ অল্পক্ষণের সেই ছবি। এরপর আবারও ফুটেজ ব্ল্যাক। এটা একমাত্র কেবিনের ফুটেজেই প্রবলেম হচ্ছে। করিডরের সিসিটিভি দেখাচ্ছে সোহিনী কফি নিয়ে কাপে চুমুক দিতে দিতে ঘরের কাছে এল। গা দিয়ে ঠেলে দরজা খুলল। করিডরের ফুটেজে বোঝা গেল সোহিনীর শরীরটা কিছু দেখে থমকে গেছে। তারপরেই কেবিনে ঢুকে গেল। কিন্তু ঢুকে কী হল সেটা দেখা গেল না। কারণ কেবিনের ভেতর সিসিটিভিতে তখন মরণ-তামসীর ছায়া। একটুখানির জন্য ছবিটা এসেই চলে গেল। সেটুকুতে বোঝা গেল সোহিনী জানলার দিকে ছুটে যাবার জন্য শরীরটাকে এগিয়ে দিচ্ছে। ব্যাস, পরক্ষণেই সব অন্ধকার।
.
বাইশ সেকেন্ড পরেই মেডিলাইফের বাইরের সিসিটিভি দেখাল একটা শরীর পুতুলের মতো অবলীলায় মাটির দিকে পড়ছে। আশেপাশে বসে কিংবা দাঁড়িয়ে থাকা লোকজন ‘ও গড’ বলে আপশোশ করে উঠল। কমিশনার একটানা চেয়ে থাকতে পারলেন না। করিডর দিয়ে লোকজন ছুটে আসছে। আত্রেয়ীর কেবিনে ঢুকছে। ঠিক সেই মুহূর্তে আবার চালু হল কেবিনের ভেতরের সিসিটিভি। সোহিনী অচৈতন্য হয়ে মাটিতে লুটোচ্ছে। পাশে খানিকটা তফাতে ছিটকে পড়ে ভেঙে গেছে কফির কাপ। জানলার কাচ ভাঙা।
.
কমিশনার নিজের উরুর ওপর একটা ঘুষি চালিয়ে চোয়াল শক্ত করে ওঠে। ‘এগুলো কী? সিসিটিভির ওই জায়গাগুলোই নেই কেন?’ হসপিটাল সুপার বলে উঠল, ‘এরকম জীবনে কখনও দেখিনি স্যার। এটা জাস্ট আনবিলিভেবল। এরকমভাবে সময় বুঝে সিসিটিভি কীভাবে বন্ধ হবে স্যার?’ একজন নার্স বলে উঠল, ‘স্যার এটা কিন্তু ভৌতিক কাণ্ড। এতদিন এখানে কাজ করছি এরকম ফেস করিনি। কী হবে স্যার?’ কমিশনার একবার কটমট করে সায়নের দিকে তাকালেন। সায়ন মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে রইল। কমিশনার বললেন, ‘এই ফুটেজ যেন বাইরে লিক না হয়। আর দয়া করে আপনারা এটা ভূতের কীর্তি বলে রটাবেন না।’ সঙ্গে সঙ্গে সুপার বলে উঠল, ‘তাহলে এটা কে করেছে? সোহিনীকে আমরা কিছুতেই অবিশ্বাস করতে পারছি না। এটা যদি মানুষের কাজ হত তাহলে আমাদের হসপিটালেরই কাউকে করতে হত। কিন্তু ফুটেজে তো সোহিনী ছাড়া একজনও নেই। আর সোহিনীর কী অবস্থা হয়েছে সেটা তো আমরা দেখতেই পাচ্ছি। বাইরে তো মিডিয়া ছিছি করছে।’
— তা বলে এটা ভূতের কীর্তি সেটা যদি রটে সেখানেও আপনাদের ক্ষতি। যে হাসপাতালে ভূতের উপদ্রব সেখানে আর কোনো পেশেন্ট ভরতি হবেন?
হসপিটাল কর্তৃপক্ষের মাথায় হাত। তাদের বেশিরভাগই অলৌকিক ভয়ে গুটিয়ে আছে। আর বাকিরা না পারছে এগোতে আর না পারছে পিছোতে।
.
কমিশনারকে বেশ আনমনা মনে হল সায়নের। সিসিটিভিতে দেখা ফুটেজগুলো তাঁকে বেশ ভাবিয়েছে। গায়ে পরে থাকা আইনের বর্মটাই তাঁর মনের মধ্যেকার আসল সন্দেহগুলোকে বাইরে আসতে দিচ্ছে না। সায়নের মনটা আরও একটা ব্যাপারে খচখচ করছে। অনেকক্ষণ চেপে রেখেছিল নিজেকে। লিফটে একা পেয়ে কমিশনারকে প্রশ্নটা করেই ফেলল, ‘স্যার, ডিপার্টমেন্ট আর আমায় ভরসা করছে না, তাই না?’ অকস্মাৎ এমন এক প্রশ্নে মনের চিন্তাগুলো থমকে গেল কমিশনারের। তিনি পালটা প্রশ্ন করলেন, ‘সেটা কি আমি এসেছি বলে তোমার মনে হচ্ছে?’
— আসলে চট করে তো কোনো কেসে আপনি ফিল্ডে আসেন না। হয়তো ওপরমহলই বলেছে আপনাকে। বাট আমি কিন্তু স্যার সবদিক থেকে ট্রাই করছি। কোথাও কোনো ফাঁক রাখছি না।
লিফটটা এসে সেভেন্থ ফ্লোরে দাঁড়ায়। ‘চলো দেখি সোমদত্তা কোনো কথা বের করতে পারল কিনা!’ সায়নের কথার কোনো উত্তরই দিলেন না কমিশনার। সে কি দেওয়ার প্রয়োজন নেই? নাকি দিয়ে কোনো লাভ নেই। ওপরমহল থেকে যা সিদ্ধান্ত নেবার নিয়ে নিয়েছে। কেন কমিশনার এখন কিচ্ছু জানাচ্ছেন না! এইসব ভাবতে ভাবতেই আত্রেয়ী সেনের কেবিনের সামনে এসে পড়ে দুজনে
— কী হল? কথা বের করা গেল?
কেবিনে ঢুকতে ঢুকতেই প্রশ্নটা করলেন কমিশনার। সোমদত্তা উঠে দাঁড়াল। ‘না স্যার, শুধু থরথর করে কাঁপছে আর কাঁদছে। কিচ্ছু বলছে না। গায়ে বেশ টেম্পারেচরও আছে।’ কমিশনার শুধু একটা ‘হুম’ বলেই নীলাম্বরের দিকে তাকালেন। নীলাম্বর সোহিনীর চেয়ারটায় বসেছিলেন। কমিশনার বললেন, ‘কী পয়গম্বরবাবু, কী বলছে আপনার যোগসাধনা?’
— পয়গম্বর হবার জন্য অনেক পুণ্য আর সাধনা লাগে। অতটাও উচ্চমাপের সাধক আমি নই। তা-ই নীলাম্বর নামটুকুই আমার জন্য যথেষ্ট।
কাঠির খোঁচার বদলে যে এমন মিছরির ছুরি ছুটে আসবে রুদ্রাক্ষ দুলিয়ে অংবংচং করা একটা লোকের থেকে সেটা আশা করেননি কমিশনার সাহেব। তাই সামলে নিয়ে বললেন, ‘ও সরি, নামটা মনে ছিল না। নীলাম্বরবাবু।’ বলেই আবার ভ্রূ তুলে বললেন, ‘তা বলুন, আপনি কী বুঝলেন!’ এবার চেয়ার ছেড়ে কমিশনারের দিকে দু-পা এগিয়ে এলেন নীলাম্বর। বললেন, ‘এইটুকুই বুঝলাম, যে সিসিটিভি ফুটেজ দেখে কোনো মানুষকে অপরাধী ঠাওরানো সম্ভব নয় আপনাদের পক্ষে। কারণ এই মেয়েটি ছাড়া অকুস্থলে আর কোনো মানুষ ছিলেন না।’ সায়নের মুখটা দেখে নিয়ে ভ্রূ বেঁকিয়ে নীলাম্বরের দিকে তাকালেন কমিশনার। নীলাম্বর বললেন, ‘আত্রেয়ী সেন আর সোহিনী ছাড়া যে ছিল তাকে সিসিটিভিতে দেখা অসম্ভব। যদি না সে নিজে থেকে দেখা দেয়। আর সে যখন-যখন এসেছে সোহিনীর সামনে ঠিক সেই সময়গুলো সিসিটিভি ব্ল্যাক হয়ে গেছে। কী তাই তো কমিশনার সাহেব?’ এবার একটু নীলাম্বরের দিকে ঘুরে দাঁড়ালেন তিনি। অবাক চোখে তাকিয়ে বললেন, ‘এসবও কী যোগসাধনায়…।’ নীলাম্বর হাসতে হাসতে বললেন, ‘সাধনা বড়ো বিচিত্র পথ স্যার। যে পথে মানুষের চলাচল নেই সেই পথের খবর একমাত্র দিতে পারে সাধনা। যাইহোক, এখন এসব কথা বলার সময় নয়। আপনারা যে দৃশ্যগুলো দেখতে পাননি, তার বর্ণনা আমি দিচ্ছি।’ কথাটা শেষ করেই সোহিনীর কাছে যান নীলাম্বর। আলতো করে মাথায় হাত রাখেন। বলেন, ‘মা গো, তোমার কোনো ভয় নেই। তুমি যাকে দেখেছ সে আর কখনও তোমার কাছে ফিরবে না। কারণ সে তোমার থেকে কিচ্ছু চায় না। তুমি তার শত্রু নও।’ কথাগুলো সোহিনীর কানে যাওয়া মাত্রই বুকে যেন টাটকা বাতাস লাগল তার। এতক্ষণ সে একদৃষ্টে মাটির দিকে তাকিয়েছিল। এবার সে মুখ তুলে তাকাল নীলাম্বরের দিকে। সোমদত্তা, শিবানী, এমনকি কমিশনার পর্যন্ত অবাক। কেবল সায়ন বিস্মিত হল না। কারণ সে নিজের চোখে দেখেছে নীলাম্বরবাবুর ক্ষমতা, তেরো নম্বর ফ্লোরের কেসে। নীলাম্বর সোহিনীকে বলেন, ‘শুধু আমায় একটু সাহায্য করো মা। ইচ্ছে না হলে কোনো কথা বলতে হবে না তোমায়। আমি যা দেখাচ্ছি বা বলছি সেটা ঠিক কী ভুল সেটুকু বোলো, কেমন?’
ভয়ে, আতঙ্কে সোহিনীর টকটকে লাল চোখদুটো একভাবে নীলাম্বরের চোখে চেয়ে আছে।
.
নীলাম্বর শুরু করেন। শুধু গত রাত নয়, তার আগের রাতেও ঘটা অলৌকিক ঘটনাগুলো এক এক করে বলতে থাকেন। সঙ্গে সোহিনীর শরীরের গতিবিধি ও দেখাতে থাকেন। অর্থাৎ সোহিনী ঠিক কীরকমভাবে এগিয়েছে, চমকেছে, কী কাজ সে করেছে সবটুকু। সোহিনী এবার হাতদুটোকে বুকের কাছ থেকে শরীরের পাশে নামিয়ে রাখল। নীলাম্বর দু-চোখ বুজে কেবিনের মধ্যে ভূতে পাওয়া মানুষের মতো ঘুরে বেড়াতে লাগলেন। আর বলতে থাকলেন ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ। এবার এলেন গতকাল রাতের ঘটনায়। নীলাম্বর যত অ্যাক্ট করে দেখাতে লাগলেন ততই বিস্মিত হলেন কমিশনার, শিবানী আর হসপিটালে কয়েকজন ডক্টর যাঁরা খানিক আগেই সিসিটিভি দেখে এসেছেন। বিস্ময়ের ঘোর আরও সকলের মাথা ঘুলিয়ে দিল যখন নীলাম্বর বললেন, বাইরে কেউ দাঁড়িয়েছিল না অথচ ভেতরে তার ছায়া পড়েছিল। কমিশনারের নিশ্বাস ঘন হতে লাগল। ঠিক কী বলবেন বুঝতে পারছেন না। লোকটা কী বড়ো ধরনের কোনো ম্যাজিশিয়ান? যদি তাই হয় তাহলে কী এমন ম্যাজিক জানেন যে ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থেকেও সব বলে দিচ্ছেন। কমিশনার নীলাম্বরকে দেখছেন আর ভাবছেন।
— এবার দেখুন আপনারা যেগুলো দেখতে পাননি।
কথাটা বলে নীলাম্বর বেডের কাছে চলে গেলেন। বললেন, ‘এইখানে শুয়ে ছিলেন আত্রেয়ী সেন। সোহিনী বেরিয়ে যাবার পরেই আপনারা দেখেন আত্রেয়ী চমকে তাকায়। চোখগুলো তার বিস্ফারিত। মুখটা খুলে কী যেন বলছে।’
— কী বলছিলেন?
কমিশনার জিজ্ঞাসা করলেন। নীলাম্বর চুপ করে কমিশনারকে দেখতে থাকেন। বলেন, ‘এখনও পরীক্ষা! বেশ!’ কমিশনার অপ্রস্তুত। এই লোকটা মনও পড়তে পারে! নীলাম্বর দৃপ্তকণ্ঠে বললেন, ‘শান্তনু।’ কথাটা যেন ঘরের দেয়ালে দেয়ালে পাক খেয়ে উপস্থিত সকলের মস্তিষ্কের মধ্যে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে।
— শান্তনু আত্রেয়ী সেনের স্বামী। তার বিকৃত, থ্যাঁতলানো মুখ নিয়ে প্রতিটা ভেঙে যাওয়া হাড় নিয়ে শান্তনুর আত্মা এসেছিল। সেই আগের শরীর ধারণ করে।
এবার সোমদত্তা বলল, ‘আত্মা?’
— হ্যাঁ। কারণ সে আর বেঁচে নেই।
অমনি কমিশনার প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি কী করে জানলেন যে শান্তনু আর বেঁচে নেই? আত্রেয়ী সেনই তো জানতেন না।’
নীলাম্বর মৃদু হেসে বলেন, ‘বা হয়তো উনি সবই জানতেন। কাউকে জানতে দেননি।’
কমিশনার আবার একটা কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু নীলাম্বর তাঁর মুখের কথা কেড়ে নিয়েই বলে উঠলেন, এবার প্লিজ আমায় জিজ্ঞেস করবেন না শান্তনু কীভাবে মারা গিয়েছিল। ওটা আমি জানি না কারণ ওই অকুস্থলে আমি যাইনি।’ চুপ করে গেলেন কমিশনার।
.
নীলাম্বরের দিকে তাকিয়ে সোহিনী বাবু হয়ে বসল। নিশ্বাসটা যেন একটু জোরে জোরেই নিচ্ছে সে। বলতে শুরু করলেন নীলাম্বর, ‘এরপর আত্রেয়ী সেন নিজে থেকেই উঠে পড়ে। সবাইকে অবাক করে দাঁড়িয়ে পড়ে। কারণ তাঁর শরীরে তখন প্রতিশোধস্পৃহায় জ্বলতে থাকা আত্মার শক্তি। আত্রেয়ী নিজেই হেঁটে জানলার ধারে এসে দাঁড়ান। পর্দাটা নিজে থেকেই সরে যায়। ঠিক তখনই ঢুকে আসে সোহিনী।’ নীলাম্বর দৌড়ে দরজার কাছে গিয়ে সোহিনীর ঢুকে আসা, বেড খালি দেখে চমকে ওঠা এবং আত্রেয়ীকে জানলার ধারে খুঁজে পাওয়া সবটুকু অভিনয়ের মাধ্যমে বর্ণনা করেন।
— এরপরেই যেটা ঘটে সেটা আর আপনারা কেউ দেখেননি। সোহিনী যেই আত্রেয়ীকে ধরবার জন্য এগিয়ে আসে অমনি শান্তনুর আত্মার বিকট মূর্তি সামনে এসে দাঁড়ায়। সাদা ধবধবে দুটো চোখে মৃত্যু ভ খায় সোহিনীকে। ভয় পেয়ে আর্তনাদ করে ওঠে সোহিনী এবং ওই একই সঙ্গে আত্রেয়ীও প্রবল আসুরিক শক্তির জোরে মোটা কাচ ভেঙে নীচে পড়ে যায়।’
— চুপ করুউউউউউন। চুপ করুউউউউউন।
দুটো কানে হাত চাপা দিয়ে চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বলে ওঠে সোহিনী। চুপ করুন, আমি আর নিতে পারছি না।’ হাউহাউ করে কেঁদে ফেলে সে। নীলাম্বর থম মেরে দাঁড়িয়ে যায়। কমিশনার চুপ। সোমদত্তা আর শিবানী সোহিনীকে সামলাতে থাকে। কান্নায় সোহিনীর কথা জড়িয়ে যায়। তা-ও বলে, ‘আমি আর ওই ভয়ংকর মুখ মনে করতে চাই না। প্লিজ, আর বলবেন না। আপনার সব কথা ঠিক। কিন্তু আমি আর শুনতে চাই না।’ পরক্ষণেই কমিশনারের দিকে, সায়নের দিকে হাত জোড় করে সোহিনী ফুঁপিয়ে কেঁদে বলে, ‘আপনাদের, আপনাদের যদি মনে হয় আমাকেই অ্যারেস্ট করবেন তাই করুন। কিন্তু আর ওই কথা আমার সামনে বলবেন না। শিবানী মাথায় হাত বুলিয়ে বলে, ‘আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে, চুপ কর। আর কেউ বলছে না। চুপ। এবার শরীর খারাপ করবে তোর।’
এরপর সত্যি আর কেউ প্রশ্ন করে না। নীলাম্বর আর সায়নের দিকে তাকিয়ে চুপ করে যান কমিশনার।
বাইরে ভোর কেটে সকাল হয়েছে। কিন্তু সূর্যের দেখা নেই। বেশ মেঘ করেছে আজকে। হঠাৎ হসপিটালের এক কর্মী ছুটে এসে জানায়, বাইরে মিডিয়ার লোকেরা সিসিটিভি ফুটেজ দেখান বলে চিৎকার করছে। প্রচণ্ড খেপে গেছে। খবরের চ্যানেলগুলোও লাইভ টেলিকাস্ট করছে আর মাঝে মাঝে আত্রেয়ীর সিনেমার নানান মুহূর্ত দেখাচ্ছে। কেবিনের বাইরে বেরিয়ে কমিশনার জিজ্ঞেস করলেন, ‘বডিটা পোস্টমর্টেমে পাঠাও। যত তাড়াতাড়ি সৎকার করা যায় তত ভালো। আচ্ছা, আত্রেয়ী সেনের বাড়ির লোককে খবর দেওয়া হয়েছে?’
— কেউ নেই স্যার। আত্রেয়ীর বাবা আছেন বলে শুনেছিলাম। মানে ওই তন্ময় হালদারকে জেরা করে জেনেছি। কিন্তু উনিও বাড়ির ঠিকানা জানেন না।’
— মুশকিল হল তো। দ্যাখো খবরের চ্যানেলগুলো যখন দেখাচ্ছে তখন নিশ্চয়ই আত্রেয়ীর বাবাও খবর পেয়ে যাবেন। কোন জায়গায় থাকতে পারে সেটা কিছু জানো?
না স্যার। মেয়েকে দেখতে একবার এই হসপিটালে এসেছিলেন। তন্ময়বাবু জিজ্ঞেস করেন ঠিকানা। উনি নাকি বলেছেন, যমের বাড়ির একটু আগের ডানদিকের গলি।
— হোয়াট?
— হ্যাঁ স্যার। হয় লোকটা পাগল আর নয় তো নিজের ঠিকানা জানাতে চায় না।
— উনি তো এই হসপিটালেই এসেছিলেন? তাহলে সিসিটিভি থেকে তো ওঁর ছবি পাওয়া যেতেই পারে।
— সেটাও চেক করেছি স্যার। মাঝে এখানকার কয়েকটা সিসিটিভিতে প্রবলেম হয়েছিল। তাই অনেক ফুটেজই মিসিং। তন্ময় যেদিন এসেছিলেন সেটা ওই প্রবলেমের মধ্যেই। কিছু চলছিল। কিছু চলছিল না।
— বাহ্! চমৎকার। তা কালকেও কোনো প্রবলেম হয়নি তো?
— স্যার, তাহলে নীলাম্বর ব্যানার্জি কী করে সব জানলেন?
দূরে বিবেকানন্দ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে ছিলেন নীলাম্বর। সেদিকে তাকিয়ে কমিশনার বললেন, ‘হুম! ওটাই একটা আশ্চর্যের বিষয়। ওঁকে ধরে রেখো। যেখানে যত খুন, রাহাজানি, আত্মহত্যা হবে ওঁকে নিয়ে গেলেই অপরাধীর পর্দা ফাঁস। ডিটেকটিভদের আর দরকারই পড়বে না।’
সায়ন হেসে বলে, ‘না স্যার, যতটুকু এতদিনে জেনেছি, যেখানে প্যারানরমাল কিছু হবে সেখানেই উনি ওঁর ক্ষমতা কাজে লাগাতে পারবেন। উনি বলেন, লোকে মারা গেলেই যে তার আত্মা এই লোকে ঘুরে বেড়াবে, কোনো অলৌকিক কাণ্ড ঘটাবে সেটা নয়। মানুষের কাজের ওপর, মৃত্যুর ধরনের ওপর তারা কোন লোকে থাকবে সেটা নির্ধারিত হয়। সেই অনুযায়ী আত্মা…! নিজের মতো বলে যাচ্ছিল সায়ন। হঠাৎ খেয়াল পড়ে কমিশনার চোখে কৌতুক মেশা চাউনি নিয়ে সায়নের দিকে তাকিয়ে আছে। বেশ লজ্জায় পড়ে সায়ন। ইসস! কমিশনারের সামনে কীসব হাবিজাবি বলে গেল কে জানে!
— তুমি পুলিশের চাকরি ছেড়ে হিমালয়ে যাবার প্ল্যান করছ না তো?
সায়নের মুখে লাজেরাঙা হাসি। কমিশনার প্রশ্ন করলেন, ‘এই কেসটা কতদূর?’
— গতকাল আত্রেয়ী সেনের বাড়ি থেকে বেশ কিছু প্রমাণ আমাদের হাতে এসেছে স্যার। সেই ভিত্তিতে কাল একজনকে জেরাও করেছি এবং তাতে আরও অনেক কথা জানতে পেরেছি। সেটার ওপর ভিত্তি করেই আজ দুজনের সঙ্গে কথা বলার ছিল। কিন্তু আজ তো যা হল সেটা না মিটলে আমি অন্যদিকে যেতে পারব না। আশা করছি, খুব তাড়াতাড়িই এই কেসটা সলভ করতে পারব স্যার। শুধু একটু ভরসা রাখুন স্যার।
শেষ কথাটা সায়ন কোন আশঙ্কা থেকে বলল সেটা ভালোই বুঝলেন কমিশনার। মুচকি হেসে বললেন, ‘কে কী বলছে, ডিপার্টমেন্ট কী ভাবছে এসব নিয়ে এখন তোমার ভাবার দরকার নেই। নিজের কাজটা মন দিয়ে করে যাও।’ সায়ন হাসিমুখে স্যালুট জানাল।
