মৃত জ্যোৎস্নার রাত্রি – ৩৫
পঁয়ত্রিশ
— মা কসম, ইস বারেমে হামি কুছু জানি না।
ডানহাতে গলার নলি টিপে কথাটা বলল ধানুয়া। কড়া চোখে সায়ন জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার ঘরে কাজ হল আর তুমিই জানো না? এটা কী করে বিশ্বাস করি ধানুয়া?
— ইয়ে তো মুঝে ভি মালুম নেহি স্যার।
— তোমার ম্যাডাম তন্ময়বাবুর সঙ্গে ভারমোর গিয়েছিল। মনে আছে?
— কাঁহা গয়ে থে?
— ভারমোর। উও লোগ একবার ঘুমনে গয়ে থে না, যার পরে তোমার ম্যাডামের হাজব্যান্ড বেপাত্তা।
— ও হাঁ হাঁ হাঁ।
— ওরা যখন ফিরে আসে, তারপরেই ওরা কোনো দিন তোমার ঘরে ঢুকেছিল?
ধানুয়া একটু ভেবে বলল, ‘স্যার হামি তো তব ছুট্টিতে গেছিলাম।’
— কোথায়?
— দেশে। বিহার। মেডামজি নে নিজেই ডেকে বললেন, ধানুয়া তোমার দেশ থেকে ঘুরে এসো। অনেকদিন ছুটি নাওনি। আমরাও চলে এসেছি তো তুম কুছদিন কে লিয়ে ঘুমকে আও।
— বাবা! নিজে থেকেই ছুটি দিলেন?
— হাঁ স্যার। ম্যায়নে বোলা থা কি মেডাম হামি চালে যাব তো কে পেহেরাদারি করবে? মেডাম নে বোলা, কুছ দিন কে লিয়ে সেন্টার সে কিসি কো রেখে দেবে।
— কতদিনের জন্য গেছিলে?
— সাতদিন।
— হুম।
সায়নের চোখের সামনে পুরো ব্যাপারটাই দিনের আলোর মতো স্পষ্ট হয়ে যায়। আত্রেয়ী আর তন্ময় দুজনে মিলেই শান্তনুকে সরিয়েছে। তারপর বাড়ি ফিরে ধানুয়াকে ছুটি দিয়ে তার ঘরের দেয়ালে অপরাধের সব প্রমাণ লুকিয়ে রেখেছে। কী জানি, হয়তো কোনোভাবে ধানুয়াকে ফাঁসাবার প্ল্যান করে রেখেছিল দুজনে। কিন্তু তবু একটা প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, আত্রেয়ীর গোপন অতীত সম্পর্কে কি তন্ময় সব জানত? যদি না জানত তাহলে শান্তনুর রক্তমাখা মানিব্যাগের সঙ্গে ওই ছবিগুলো থাকত না।
— স্যার।
ধানুয়ার ডাকে ভাবনায় ব্যাঘাত হল সায়নের। ধানুয়ার দিকে তাকাতেই সে মুখটা কাঁচুমাচু করে জিজ্ঞেস করল, ‘স্যার, এখানে আমায় আর কতদিন থাকতে হবে?’ পুলিশের পক্ষ থেকেই ধানুয়াকে একটা বিশেষ জায়গায় রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বলা ভালো লুকিয়ে রাখা হয়েছে। যতদিন না এই কেস সমাধান হয় ততদিন এখানেই থাকবে সে। সায়ন বলে, ‘কেন অসুবিধে কী হচ্ছে? দিব্যি তো আছ। থাকছ, খাচ্ছ, ঘুমোচ্ছ।’
— দেশের জন্য মনটা কেমন করছে স্যার। হামাকে দেশে পাঠিয়ে দিন না।
— তাতে তোমার বিপদ হতে পারে। আর তোমার বিপদ মানে তোমার পরিবারের বিপদ। আর হ্যাঁ, খবরটা পেয়েছ তো?
ওপর নীচে ঘাড় নাড়ল ধানুয়া। ‘হাঁ স্যার, খবর মিলা হ্যায়।’
— তাহলে তো বুঝতেই পারছ, বিপদ আমাদের চারপাশে। কে খুন করে বেড়াচ্ছে কেউ জানে না। আর ক-টাদিন এখানেই থাকো।
জুতোয় শব্দ তুলে বেরিয়ে যায় সায়ন।
.
আজ মেঘ করেছিল সকাল থেকেই। বৃষ্টি আসার কথা। কিন্তু আসেনি। অভিমান, রাগ জমে ফুলে-ফেঁপে থাকা মেঘগুলোর বুকে বৃষ্টিগুলো জমে আছে। কিছু জল জমতে জমতে আজ উপচে পড়েছে। সেটাও গোপন স্নানঘরে। অঝোর শাওয়ারের তলায় দেয়ালে হেলান দিয়ে অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছে বন্দনা। ঠোঁট কাঁপছে। উদ্ভিন্নযৌবন তার ফুলে ফুলে উঠছে। শাওয়ারের জল ঢেকে দিচ্ছে তার চোখের নোনতা বন্যা। চোখদুটো লাল। বাইরের ঘর থেকে ভেসে আসছে আত্রেয়ী অভিনীত গান। কোনো নিউজ চ্যানেলে চলছে। বারবার একই গান বাজছে। এই গানটা আজ যত না রবীন্দ্রনাথের তার চেয়ে বেশি বিনোদিনীর চিরপ্রতীক্ষার, ‘আমারে যে জাগতে হবে/ কী জানি সে আসবে কবে এই নিরালায়, এই নিরালায় পড়ে তাহার মনে… ‘ গানটা ফেড আউট হয়ে ভেসে এল রিপোর্টারের গলা। গানের কথার সঙ্গে মিলিয়ে শোকটাকে পাহাড়প্রমাণ করে দিচ্ছে তারা। তারা বলছে, ‘প্রতীক্ষা করতে করতেই কি অভিমান নিয়ে চলে গেলেন অভিনেত্রী আত্রেয়ী? স্বামী তার থেকেও নেই। কোথায় আছেন কেউ জানে না। জীবনে বন্ধু পেয়েছেন। পেয়েছেন হয়তো সখাও। কিন্তু তবুও কি তার অন্তরের একাকিত্ব ঘুচেছে কোনোদিন। হয়তো না। তাই কি তীব্র অভিমান আর একাকিত্ব ঠেলে দিল তাঁকে মর্মান্তিক মৃত্যুর দিকে? নাকি এই মৃত্যুর আড়ালে লুকিয়ে আছে অন্য রহস্য? হসপিটালের পক্ষ থেকে কিছুই জানানো হচ্ছে না। দেওয়া হচ্ছে না সিসিটিভি ফুটেজ। পুলিশও এই ব্যাপারে মুখ খুলতে নারাজ। একের পর এক কী হচ্ছে এই শহরে?’ আরও অনেক কথা বলে যাচ্ছে টিভিটা। বিরক্ত লাগছে বন্দনার। সে হাউহাউ করে কাঁদছে আর সারা গায়ে জোরে জোরে সাবান ঘষেই চলেছে। যেন সারা জীবনের ময়লা এখুনি, এই মুহূর্তে গায়ের চামড়ার সঙ্গে তুলে ফেলবে সে। বাথরুমের দরজায় টোকা পড়ল। বাইরে থেকে সুরভির ক্লান্ত গলা বলল, ‘বাণীইইই, দেখাচ্ছে রে। পোস্টমর্টেম হয়ে গেছে।’
— টিভিটা বন্ধ করে দাও মা।
বন্দনার গলাটা শুনে সুরভির ভ্রূ দুটো কুঁচকে গেল। মেয়ের গলাটা একটু নাকি সুরে শোনাল। সুরভি ভালোই বুঝল এর কারণ। শুধু বন্দনাকে বুঝতে দিল না। গলা তুলে বলল, ‘অনেকক্ষণ থেকে জলের তলায় আছিস। আর ভিজিস না। ঠান্ডা লেগে যাবে।’
.
বাইরে একটা বাজ পড়ল। তারপরেই মুষলধারায় নামল বৃষ্টি। তুমুল বৃষ্টি। অনেক কিছু ধুয়ে দিতে চাইছে। কিন্তু পারছে না।
.
বৃষ্টিতে সাদা হয়ে গেছে কলকাতা শহর। জমা জলে ঝড় তুলে শহরের রাস্তা দিয়ে ছুটে চলেছে পুলিশের বোলেরো। সায়ন আর নীলাম্বর একই গাড়িতে। সায়ন সোমদত্তাকে ফোন করে বলে, ‘তুমি একটু আত্রেয়ীর দিকটা সামলে নাও সোমদত্তা। অবনীশবাবু আজ সকালেই খবর পেয়ে ফিরেছেন… উনি থাকবেন। আমি বলে দিয়েছি… আমি এখন নীলাম্বরবাবুকে নিয়ে ল্যাবে যাচ্ছি।… হ্যাঁ হ্যাঁ আমি আসব। বড়ি বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার কোনো প্রশ্নই নেই। ওখানে তো কেউ-ই নেই।… এখন স্টুডিয়ো পাড়ায় নিয়ে যাওয়া হবে। তারপর সাজিয়ে-গুছিয়ে ক্যাওড়াতলা। তোমার সঙ্গে আমার শ্মশানেই দেখা হবে। রাখলাম।’ ফোনটা রেখে দিতেই আবার টুংটাং শব্দ করে বেজে উঠল সে। মুনাই ফোন করেছে। হ্যাঁ বলো না না গাড়িতে। আর খাওয়া। আমাদের এখন শিয়রে শমন মুনাই। মিডিয়া আমাদের দেখলেই ছিঁড়ে খাচ্ছে। আচ্ছা আমি রাখলাম এখন। নামতে হবে।… আরে বাবা হ্যাঁ হ্যাঁ ঠিকাছে। রাখো এবার।’ কানের পাশ থেকে ফোনটা সরিয়েই ড্রাইভারকে বলল, ‘এই এই ডানদিকে তো।’
— ওহ্ সরি স্যার।
— রাস্তা ভুলে গেলে চলবে?
— ভুলিনি স্যার। বৃষ্টিতে কিছু বুঝতে পারছি না।
— চোখ দেখাও।
ড্রাইভার মুচকি হাসল।
.
ছাপ্পান্ন-সাতান্ন বর্ষীয় ডক্টর তরফদার গ্লাভসটা নীলাম্বরের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘নিন এটা পরে নিন।’ ল্যাবের বড়ো হলঘরটায় দাঁড়িয়ে সায়ন, নীলাম্বর, ডক্টর তরফদার আর দুজন মহিলা ফরেন্সিক অ্যাসিস্ট্যান্ট। নীলাম্বর সায়নের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এটা পড়লে কিন্তু আমার অসুবিধে হবে। আসলে ওই জিনিসটার সঙ্গে আমার স্কিন কন্ট্যাক্টটা খুব জরুরি।’ সায়ন ডক্টরের দিকে তাকাল। ডক্টর তরফদার বললেন, ওকে। নো প্রবলেম। আপনি এমনিই ধরুন। আমি স্যাম্পেল যা কালেক্ট করার করে নিয়েছি।’ সায়ন জিজ্ঞেস করল, ‘ও! কাজ হয়ে গেছে?’
— হয়েছে বলতে ক্যামেরার গা থেকে খুব বেশি কিছু স্যাম্পেল কালেক্ট করা যায়নি কারণ ওটা ভালো করে অনেকবার মোছা হয়েছে সম্ভবত। কেবলমাত্র এই ওয়ালেট থেকেই শুকিয়ে যাওয়া ব্লাড স্যাম্পেল পাওয়া গেছে। এরপর দেখতে হবে তন্ময় হালদারের সঙ্গে এগুলোর কতটা মিল। তারপর বলতে পারব।
— ওকে।
ডক্টর তরফদার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক মহিলা অ্যাসিস্ট্যান্টকে বললেন, ‘সোমা, ওয়ালেটটা ওঁকে দাও।’ গ্লাভস-পরা হাত থেকে রক্তমাখা ওয়ালেটটা ট্রান্সফার হল নীলাম্বরের হাতে। ডক্টর বললেন, ‘ভেতরে ওঁর ছবিও আছে।’ নীলাম্বর ব্যাগটা খুলে দেখলেন। তারপর রুদ্রাক্ষ-জড়ানো হাতের তালুটা ওয়ালেটের ভেতরে থাকা ছবিটার ওপর রাখলেন। চোখ বন্ধ করলেন। বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়লেন। ডক্টর তরফদার সায়নের কানের কাছে এসে বললেন, ‘এসব করে হবে কিছু?’ সায়নও ফিশফিশ করে বলল, ‘দেখতে থাকুন।’ বেশ খানিকক্ষণ চুপ করে অপেক্ষা করে রইল সবাই। মিনিট পাঁচেক অপেক্ষার পর সায়ন বাদে বাকি সকলেই একটু উশখুশ করতে থাকে। ডক্টর তরফদার খসখস করে টাক চুলকে নেন। মেয়েদুটো ঘড়ি দেখে একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে। সায়ন চোখ কপালে তুলে ইতিউতি চেয়ে সকলের মুখের ভাব লক্ষ করতে থাকে। প্রায় সাত মিনিট পেরিয়ে গেছে। নীলাম্বর পাথরের মতো এক জায়গায় দাঁড়িয়ে। হঠাৎ নীলাম্বরের শরীরটা টলে গেল। একটু হকচকিয়ে গেল সবাই। নীলাম্বর আবার টলে গেলেন। এবার সামনের দিকে এক পা করে হেঁটে এগোচ্ছেন আর টলে যাচ্ছেন। ডক্টর বিচলিত হয়েই সায়নকে বলতে যাচ্ছিল, ‘শরীর খারা…’ কথা শেষ করতে না দিয়েই সায়ন হাত তুলে থামিয়ে দিল। নীলাম্বরের মাথাটা কেঁপে ওঠে। টলতে টলতে আরও খানিক এগিয়েও দু-পা পিছিয়ে আসে। আবার দু-পা এগিয়ে যেই তিন নম্বর পা বাড়াতে যাবেন অমনি অদৃশ্য কেউ যেন নীলাম্বরকে পেছনের দিকে টেনে মাটিতে আছড়ে ফেলে দিল। ভারী শরীরটা ধপ করে পড়ায় শূন্য হলঘরে বেশ একটা শব্দ হল। ডক্টর তরফদার ও তার দুই অ্যাসিস্ট্যান্ট দৌড়ে ধরতে যাচ্ছিলেন কিন্তু এবারেও সায়ন বাধা দিল। নীলাম্বর মাটিতে পড়ে দু-পাশে মাথা নাড়িয়ে কাতরাচ্ছে। চোখ বন্ধ। হাতের মুঠোয় শান্তনুর ওয়ালেট। ঠিক কী ঘটছে কিছুই ঠাওর করতে না পেরে বিরক্ত হয়ে উঠছেন ডক্টর তরফদার। সায়নের সেদিকে নজর নেই। সে একভাবে নীলাম্বরকে নিরীক্ষণ করছে। হঠাৎ নীলাম্বরের শরীরটাকে একটা বড়োসড়ো ঝটকা দিয়ে কেউ যেন ঝাঁকিয়ে দিল। মুখ থেকে ‘গক’ করে একটা দমবন্ধ করা শব্দ বেরিয়ে এল। সঙ্গে সঙ্গে কোমর থেকে পা পর্যন্ত প্রচণ্ড জোরে কাঁপতে থাকে। দুটো পা মাটিতে ঘষে ঘষে ছুঁড়তে থাকেন। কয়েক সেকেন্ড পর সেটাও থেমে যায়। তারপর হল জুড়ে তিন সেকেন্ডের নীরবতা। দম আটকে সকলে নীলাম্বরের দিকে চেয়ে আছে। সব্বাইকে চমকে দিয়ে নীলাম্বর মুখে ভয়ার্ত শব্দ করে ধড়মড় করে উঠে বসেন। টকটকে লাল চোখদুটো তার এই মুহূর্তে বেরিয়ে আসবে। সারা শরীর ঘামে ভেজা। ওয়ালেট ধরা হাতটা থরথর করে কাঁপছে।
— একটু খাবার জল দেবেন প্লিজ।
কথাটা বলতে বলতে নীলাম্বরের পাশে এসে হাঁটু মুড়ে পা ভাঁজ করে বসে সায়ন। নীলাম্বরের পিঠে হাত বোলায়। কিছু বলে না। নীলাম্বরের চোখ-মুখ এখনও নরমাল হয়নি। ডক্টর তরফদারের টাকের দশ হাত ওপর দিয়ে সব বেরিয়ে যাচ্ছে। সোমার পাশে যে মহিলাটি দাঁড়িয়ে ছিল সেই জলভরতি একটা গ্লাস এনে দেয়। নীলাম্বর ঢকঢক করে এক গ্লাস জল খেয়ে একটু ধাতস্থ হন। সায়ন প্রশ্ন করে, কী দেখলেন নীলাম্বরবাবু?’ সায়ন এমন করে নীলাম্বরের মুখের দিকে চেয়ে আছে যেন এক মহাযুদ্ধের ফল ঘোষণা হবে। নীলাম্বরবাবু চুপ। তাই সায়ন আবারও প্রশ্নটা করল, নীলাম্বরবাবু, কী দেখলেন?’ এবার নীলাম্বর চোখদুটো বড়ো বড়ো করে সায়নের মুখের দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘সম্ভবত তিনজন।’ সায়ন অবাক হয়ে যায়। জিজ্ঞেস করে ‘এর মানে?’ নীলাম্বর বলেন, তিনজন মিলে শান্তনুকে মেরেছে।’ উপস্থিত সবাই একে-অপরের মুখের দিকে চায়। সায়ন প্রশ্ন করে ‘কে কে?’ নীলাম্বর শূন্য চোখে চেয়ে থাকে সায়নের দিকে। তারপর বলে, ‘একজন তন্ময় হালদার। সেটা আমি নিশ্চিত। কারণ আমি তন্ময়ের নাড়ি স্পর্শ করে খুব কাছ থেকে ওর অ্যাক্টিভিটি বুঝেছি। আর-একজন সম্ভবত আত্রেয়ী সেন নিজে।’
— আর তৃতীয়জন?
— বুঝতে পারলাম না।
— সে কী! কেন?
— তন্ময়কে স্পর্শ করেছি তাই আমি বুঝেছি। শান্তনুর এই ব্যাগ ছুঁয়ে ওর যন্ত্রণা ফিল করেছি। তাই তার ব্যাপারটাও আমার কাছে মোটামুটি স্পষ্ট। কিন্তু তৃতীয়জন কে সেটা আমার কাছে একদম আবছা। তার অস্তিত্ব শান্তনু নিজেও বোঝেনি। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত জানতে পারেনি। কিন্তু আমি যেহেতু থার্ড পার্সন তাই পুরোটাই দেখলাম। শুধু ওই তৃতীয় ব্যক্তিটি আড়ালে। কিন্তু সে আছে। ভীষণভাবে আছে।
সায়ন উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল। তার মনের মধ্যে তোলপাড় চলছে। কে সেই তৃতীয় জন? তাহলে কী সে? যে কেবল পালিয়ে বেড়াচ্ছে?
.
হাত ঝেড়ে মাটি থেকে উঠে দাঁড়ালেন নীলাম্বর। ওয়ালেটটা সোমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘থ্যাংক ইউ।’ সৌজন্যমূলক হাসিসমেত সোমা ওয়ালেটটা নিয়ে নিল। নীলাম্বর সায়নকে বললেন, ‘কিন্তু আমার কথায় তো কিছু হবে না স্যার। আইন তো প্রমাণ চাইবে। কী করবে?’ সায়নের চোখের মণিটা চট করে ঘুরে নীলাম্বরের চোখে পড়ল। বলল, ‘তিন নম্বর লোকটা কে, সেটা বোধহয় আমি জানি।
— কে?
— তার আগে বলুন তো, শান্তনুর শরীরটা মৃত্যুর পর কোথায় গেল? নীলাম্বর এবার একটু আমতা আমতা করল। হুঁ হাঁ করে বলল, ‘ওটা ঠিক জানি না। মানে দেখতে পাচ্ছি না। কারণ মৃত্যুর পর শান্তনুর পকেট থেকে এই ব্যাগটি বের করে নেওয়া হয়েছিল। যতক্ষণ ওর শরীরের সঙ্গে এই ব্যাগটা ছিল ততটুকুই আমি জানি। হয়তো কোনো পাহাড়ি খাদে ফেলে দিয়েছিল।’
— তার মানে পাহড়েই ঘটেছে ঘটনাটা।
— হ্যাঁ।
— কিন্তু খাদে ফেলুক আর যা-ই করুক। লাশটা তো আর এই পৃথিবী থেকে উবে যাবে না।
— যদি না কোনো বন্য পশু খেয়ে ফেলে তো।
.
বেশ হতাশ হল সায়ন। তীরে এসেও রহস্যের কুজ্ঝটিকা কাটল না।
.
দুপুর পর্যন্ত মুষলধারায় বৃষ্টি হয়ে বিকেল থেকে তার দাপট কিছুটা হলেও কমেছে। রাস্তাঘাট তুলনামূলক ফাঁকা। চায়ের দোকানগুলো একটু একটু করে আবার খুলেছে। বিশেষত শ্মশানের ধারে চায়ের দোকানের কদর আলাদা। লোকে আর কিছু না খাক, মড়া পোড়াতে এসে এক কাপ করে চা অন্তত খেয়ে যায়। আজ আবার আত্রেয়ী সেনের বডি এসেছে ক্যাওড়াতলায়। এমনিতেই ভিড় উপচে পড়বে। যদিও বৃষ্টিটা অনেকটাই ক্ষতি করে দিল। ভক্তকুলের যেরকম ভিড় হবার কথা ছিল সেরকম কিছু হয়নি। ওই টালিগঞ্জ পাড়ার কিছু আর্টিস্ট ও কর্মীরা, কিছু রিপোর্টার, কয়েকজন সরকারি হোমরা-চোমড়া আর পুলিশ। তাতেও বৃষ্টির দিনে ব্যাবসা মন্দ না। শেষ চুমুটা দিয়ে ভাঁড়টা ডাস্টবিনে ফেলে দোকানদারকে চায়ের দাম জিজ্ঞেস করল সোমদত্তা। টাকা মিটিয়ে হাঁটতে হাঁটতে শ্মশানে ঢুকে এল। মাথায় কালো ছাতা। শুরুতে যা ভিড় ছিল এখন তার থেকে অনেকটাই পাতলা হয়ে গেছে। এখন যারা আছে তারা বেশিরভাগই পুলিশের লোক আর মিডিয়া। শ্মশানের সামনের খালি জায়গাটায় সবাই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। কোনো কোনো চ্যানেল লাইভ টেলিকাস্ট করছে। এরই মাঝে একজনের দিকে হঠাৎ চোখ আটকে গেল সোমদত্তার। চোখ আটকানোর কারণটা হল, লোকটার বয়স। বেশ বৃদ্ধই বলা চলে। রোগা-পাতলা চেহারা ভিজে চুপচুপে হয়ে আছে। এই বৃষ্টিতে ছাতাটাও আনেনি সে। বেশ অবাক হল সোমদত্তা। এই লোকটিও কী আত্রেয়ী সেনের ফ্যান? নাকি অন্য কোনো মৃত ব্যক্তির আত্মীয়? আত্রেয়ী সেনের ফ্যান হলে এমন করে বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে ভিজবেই-বা কেন? যেদিকে আত্রেয়ী সেনের দেহটা ঘিরে লোকজন জড়ো হয়ে আছে সেদিকে লোকটি পাথরমূর্তির মতো একভাবে তাকিয়ে আছে। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। একটু কাছে যেতেই সোমদত্তা বুঝল বৃদ্ধের চোখে বেশ পাওয়ার আছে।
— আপনি ভিজছেন কেন?
সোমদত্তার গলা লোকটি শুনতেও পেল না। আবার বলল সোমদত্তা, ‘শুনছেন, এইভাবে ভিজলে তো শরীর খারাপ হবে।’ এইবার বৃদ্ধের চোখ সোমদত্তার ওপর পড়ে। একে তো প্রচুর পাওয়ার, তার ওপর বৃষ্টির জল পড়ে চশমার কাচ ঝাপসা। বৃদ্ধ তার মধ্যে দিয়েই সোমদত্তার দিকে তাকাল। কিছু বলল না। সোমদত্তা বলল, ‘এখানে দাড়িয়ে না থেকে কোনো শেডের নীচে যান।’
— এবার চলে যাব মা।
— এখানে কেন এসেছেন? আপনার কি কেউ…
এতটুকু বলেই চুপ করে যায় সোমদত্তা। বৃদ্ধও খানিক চুপ থেকে বলে, ‘মেয়েটাকে শেষ দেখা দেখতে এসেছিলাম। এবার চলে যাব।’ বৃদ্ধের কথাটা যেন সরাসরি সোমদত্তার বুকে গিয়ে বেঁধে। তারও গলাটা খুশখুশ করে ওঠে। পরক্ষণেই ‘মেয়েকে দেখতে এসেছে’ কথাটা সোমদত্তার মনে একটু জোরেই বাজে। খেয়াল হয়, আত্রেয়ী সেনের বাবাকেও খোঁজ করা হচ্ছে। ও ঝট করে প্রশ্ন করে, ‘কী নাম আপনার মেয়ের?’ হয়তো চোখ-ভরতি জল ছিল বৃদ্ধ মানুষটার। তাই গলাটা বুজে এল উত্তর দিতে। সঙ্গে বৃষ্টির শব্দ। তবু সোমদত্তা স্পষ্ট শুনল বৃদ্ধের বলা নামটা, ঝুমা।’ নাহ্! সোমদত্তা যেটা ভাবছিল ইনি তিনি নন। তা ছাড়া গায়ের যা পোশাক-আশাক তাতে ইনি কিছুতেই আত্রেয়ী সেনের বাবা হতে পারেন না। ‘আসি মা’ বলে বৃদ্ধ চুপচাপ চলে যাচ্ছিল। সোমদত্তা বলে উঠল, ‘কোথায় থাকেন? চলুন আপনাকে পৌঁছে দিয়ে আসছি।’ বৃদ্ধ তৎক্ষণাৎ বলল, ‘না না মা। আমি পাশেই থাকি। আমি নিজেই চলে যাব।’ বৃদ্ধ লোকটা তার নড়বড়ে শরীরটা নিয়ে একটু যেন তড়িঘড়ি স্থান ত্যাগ করল। সোমদত্তাও আর দাঁড়াল না। সোজা আত্রেয়ী সেনকে যেখানে শোয়ানো ছিল সেখানে চলে এল।
— কোথায় ছিলে?
ভিড়ের মধ্যে কানের কাছে কে যেন ফিশফিশ করে বলে উঠন। একটু চমকে মাথা ঘুরিয়ে তাকাল সোমদত্তা। ‘ও স্যার, আপনি এসে গেছেন?’ সায়ন বলল, ‘অনেকক্ষণ।’
— আমি একটু চা খেতে গিয়েছিলাম। দুপুরে ঠিক করে খাওয়া হয়নি তাই…
— ওকে ওকে। অত বিশ্লেষণ দিতে হবে না। তা কার সঙ্গে অত বকবক করছিলে?
সোমদত্তা বুঝল, সায়ন দূরত্বে দাঁড়িয়েও সব লক্ষ করেছে। ‘ও, ওই এক বুড়ো লোক দেখলাম বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে ভিজছে। তা বললাম শেডের তলায় দাঁড়ান। উনি বললেন, ওঁর মেয়েকে শেষ দেখাটা দেখতে এসেছিলেন।’
— হোয়াট! মেয়েকে শেষ দেখা! নাম জিজ্ঞেস করেছ?
সায়নের চোখ বিদ্যুতের মতো ঝিলিক দিয়ে উঠল। সোমদত্তা ঠান্ডা গলায় বলল, ‘না স্যার, ওঁর নাম জিজ্ঞেস করিনি। কারণ আপনি যা ভাবছেন উনি সে নন। আমারও প্রথম মনে হয়েছিল যে উনি হয়তো আত্রেয়ী সেনের বাবা। কিন্তু ওঁর মেয়ের নাম বললেন, ঝুমা।
— ঝুমা!
সায়ন নামটা উচ্চারণ করেই ভিড়ের মধ্যে দৌড়ে কোথায় যেন চলে গেল। ‘আরে স্যার…!’ কিছু জিজ্ঞেস করার ফুরসতই পেল না সোমদত্তা। তিরিশ কি চল্লিশ সেকেন্ড হয়েছে। হন্তদন্ত হয়ে ফিরে এল সায়ন। এসেই হুকুম করল, ‘ফলো মি।’
— কেন স্যার কী হল?
সায়নের পিছু পিছু দৌড়োতে লাগল সোমদত্তা। খানিকটা এগিয়ে সায়ন বলল, ‘লোকটাকে এখুনি খুঁজে বের করো।’ সোমদত্তা ছুটতে ছুটতেই উত্তর দিল, ‘ওকে স্যার। বাট কেন?’ ছুটন্ত গাড়ি যেমন হঠাৎ ব্রেক কষে সামনের দিকে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে পড়ে সায়নও সেইভাবে থেমে যায়। সোমদত্তার দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে বলে, ‘আত্রেয়ী সেন ছাড়া এই মুহূর্তে আর কোনো মেয়ের বডি আসেনি। এমনকি আজ যে ক-টা বডি এসেছে সব ক-টা ছেলের বডি। তাহলে ঝুমা কে বুঝতে পারছ?’ সোমদত্তা ভেতর থেকে টলে যায়। গোটা শ্মশানটা যেন প্রেতের মতো খলখল করে হাসতে হাসতে ঘুরতে থাকে তার চারপাশে। দুজনেই দৌড়ে শ্মশান থেকে বেরিয়ে রাস্তার ওপরে উঠল। একটা লোক সিগারেট খাচ্ছিল। তাকে বয়স্ক লোকটার কথা জিজ্ঞেস করাতে সে একটা নির্দিষ্ট দিকে আঙুল দেখিয়ে দিল। সায়ন আর সোমদত্তা ছুটল সেদিকে। দূরে একটা জটলা চোখে পড়ল। কিছু একটা ঘটেছে। ওরা সেদিকেই ছুটল। ভিড়ের কাছে গিয়ে সায়ন জিজ্ঞেস করল, ‘কী হয়েছে এখানে দেখি সরুন সরুন।’ সোমদত্তা আর সায়ন ভিড় ঠেলে ঢুকে আসতেই দেখে রক্তাক্ত কাণ্ড। রাস্তার ওপর মুখ থুবড়ে পড়ে আছে এক বৃদ্ধ। বৃষ্টির জলে শরীর থেকে ধুয়ে যাচ্ছে সেই রক্তের ধারা। পিচরাস্তায় সেই রক্তের আঁকিবুকি যেন এক অভিমানী মৃত্যুর ক্যানভাস। একটু তফাতে পড়ে আছে হাই পাওয়ারের চশমা। চিনতে পারল সোমদত্তা। স্যার ইনিই ছিলেন।’ সোমদত্তার দিকে কড়া নজরে তাকিয়ে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল সায়ন। ভিড়ের মধ্যে থেকে একজন বললেন, ‘একটা ট্যাক্সি মেরে দিয়ে গেল স্যার।’ আর-একজন বললেন, ‘না না উনিই ট্যাক্সির সামনে এসে পড়লেন, ট্যাক্সির দোষ নেই।’ মুখ থুবড়ে পড়েছিল বৃদ্ধ। সায়ন কাঁধ ধরে টেনে চিত করে শুইয়ে দিল। রোগা পাতলা অসহায় শরীরটা রক্তে ভিজে যাচ্ছে। সায়ন জিজ্ঞেস করল, ‘কেউ চেনেন এনাকে?’ কারও কোনো উত্তর নেই। আবার প্রশ্নটা করল সায়ন, ইনি কোথায় থাকেন কেউ জানেন?’ একটা কমবয়সি ছেলে ভিড় ঠেলে সামনে এসে বলল, ‘হ্যাঁ স্যার, আমি চিনি।’
— কী নাম এঁর?
— সুজয় সেন।
পদবি শুনেই সোমদত্তার মাথা নীচু হয়ে যায়। সায়ন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। জিজ্ঞেস করে, ‘কোথায় থাকেন?’ ছেলেটা একটা দিকে আঙুল তুলে বলে, ‘ওই তো ডানদিকের গলির শেষ বাড়িটা।’
‘ডানদিকের গলি’ কথাটা কানে এসে লাগতেই তন্ময়ের মুখ ভেসে উঠল। তার মুখ থেকেই শুনেছিল আত্রেয়ীর বাবা তার বাড়ির ঠিকানা বলেছিল, ‘যমের বাড়ির একটু আগে ডানদিকের গলি।’ যমের বাড়ি মানে শ্মশান। তার একটু আগের ডানদিকের গলিতেই সুজয় সেনের বাস।
— বাড়ির লোককে চেনো?
— কেউ নেই স্যার। একাই থাকত
— বউ-বাচ্চা কেউ নেই?
— না স্যার। বউ অনেকদিন আগেই ক্যানসারে মারা গেছে। দাদু তখন অন্য জায়গায় থাকত। তারপর একা এখানে চলে আসে। শুনেছি তো ছেলেপুলে কেউ নেই।
সত্যিই তার কেউ নেই। থাকলে কী আর শেষযাত্রায় শুয়ে থাকা নিজের মেয়েকে শেষবারের মতো দেখা আসা চোখদুটো আকাশের দিকে চেয়ে বেওয়ারিশ হয়ে পড়ে থাকত? একটু আগেই যার চোখের নোনতা জল বৃষ্টির জলে মিশে ঝরে পড়ছিল তার জন্য কাঁদবার কেউ নেই পৃথিবীতে।
