মৃত জ্যোৎস্নার রাত্রি – ৩৬
ছত্রিশ
এক-এর পর এক ঝড় বয়ে যাচ্ছে সায়নের ওপর দিয়ে। সুজয় সেনের নিথর দেহটা লোকাল থানার হাতে তুলে দিয়ে রাত একটার সময় বাড়ি ফিরেছে। এখন সকাল সাড়ে সাতটা বেজে গেছে। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন সায়ন। মুনাই চা নিয়ে ঘরে ঢুকে খাটের পাশের টেবিলটায় রাখে। দেখে সায়নের মাথার বালিশের পাশে রাখা মোবাইলটা ভোঁ ভোঁ শব্দ করে ভাইব্রেট করছে। হাতে নিতেই স্ক্রিনে ওঠা নামটা দেখে ভ্রটা একটু বেঁকে যায়। সোমদত্তা কলিং। ফোনটা বাজতে বাজতে কেটে গেল। যথাস্থানে রাখতে গিয়েই ফোনটা আবার বেজে ওঠে। ভ্রূটা নতুন করে কুঁচকে ওঠে মুনাইয়ের। ‘এই শুনছ, এই, ফোন এসেছে। এই সায়ন…’ বেশ কয়েকবার ঠেলা দেবার পর ঘুম ভাঙল সায়নের। ঘুমের মধ্যেও বিপদের আশঙ্কা যেন তাড়া করে বেড়ায় তাকে। এমন করেই সে ঘুম থেকে উঠল। ‘কী কী হয়েছে?’
— ফোন এসেছে।
মুনাইয়ের হাত থেকে ফোনটা নিয়ে কানে দিল, ‘হ্যাঁ বলো সোমদত্তা … না না কোনো ব্যাপার না… বলো বলো। না এখনও দেখিনি। কেন কী বেরিয়েছে? … কী? কী বলছ?’ এবার বেশ উত্তেজিত হয়ে বিছানা ছেড়ে নামল সায়ন। ফোনটা কানে দিয়ে ঘরে পায়চারি করতে থাকল। ‘সে কী? কে জানাল ওদের? সিসিটিভি! তুমি রাখো আমি দেখছি।’ ফোনটা কান থেকে নামিয়েই মুনাইকে জিজ্ঞেস করল খবরের কাগজ এসেছে কিনা। মুনাই জানাল, একটু আগেই দিয়ে গেছে। ডাইনিঙে আছে। সায়ন প্রায় দৌড়ে গিয়ে ডাইনিং টেবিল থেকে খবরের কাগজটা তুলে নিল। একদম প্রথম পাতাতেই বড়ো বড়ো মোটা হরফে লেখা ‘মেডিলাইফে অশরীরী আতঙ্ক! অভিনেত্রী আত্রেয়ীর অস্বাভাবিক মৃত্যু।’
— কী হয়েছে গো? কীসের খবর বেরিয়েছে, আত্রেয়ীর?
মধ্যমস্বরে খবরটা পড়তে লাগল সায়ন। ‘দু-হাজার বাইশে ভূত! ব্যাপারটা অস্বাভাবিক এবং অবাস্তব শুনতে লাগলেও এটাই সত্যি। অন্তত গোপন সূত্রে পাওয়া খবর সেরকমই বলছে। পঁচিশে মার্চ ভোররাতের দিকে মেডিলাইফের ছয়তলায় আইসিসিইউ-এর কাচ ভেঙে পড়ে গিয়ে মৃত্যু হয়েছে অভিনেত্রী আত্রেয়ী সেনের। এমন এক জায়গা থেকে পড়েছেন যেখান থেকে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে কোনো রোগী পড়ে যেতে পারেন না। যদি না ভারী কিছু দ্বারা সেই কাচ ভাঙা হয়। কিন্তু ভারী কিছুর সাহায্যে কাচ ভাঙার কোনো খবর বা নিদর্শন পায়নি পুলিশ। খোদ কমিশনার এসেও সরেজমিনে তদন্ত করে গেছেন। তাহলে মৃত্যু হল কীসে? অভিনেত্রী শারীরিকভাবে অত্যন্ত দুর্বল ছিলেন। ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্টেও এই ঘটনাটিকে খুন বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। বলা হচ্ছে হয়তো তাকে ঠেলে ফেলে মারা হয়েছে। কিন্তু ঠেলে ফেলল কে? সেই রাতে একজন নার্স ছিলেন আত্রেয়ী সেনের ঘরে। তাকেও ঘটনার পর ঘর থেকে অজ্ঞান অবস্থায় পাওয়া যায়। আত্রেয়ী সেনের শরীরেও ধ্বস্তাধ্বস্তির কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তাহলে রহস্যটা কী? রহস্য জানা গেল গতকাল মধ্যরাতে যখন আত্রেয়ী সেনের মৃত্যুর সিসিটিভি ফুটেজটি ভাইরাল হল।’ সায়ন চমকে উঠল। মুনাই বলল, ‘ভাইরাল হয়েছে? তোমরা পাওনি?’ সায়ন চট করে নিজের ঘরে চলে গেল। সোমদত্তার ফোন কেটে মোবাইলটা বিছানায় রেখেছিল। এখন সেখান থেকেই মোবাইলটা তুলে নিয়ে হোয়াটস্যাপ চেক করতে থাকে। ষোলোটা হোয়াটস্যাপ এসেছে। তার মধ্যে চারজন সেই ভয়ানক ফুটেজটাই পাঠিয়েছে। হুবহু সেই ফুটেজটাই দেখছে সায়ন। মাঝে মাঝে কালো হয়ে যাচ্ছে স্ক্রিন। আবার চালু হচ্ছে। ‘ও ফাক ফাক ফাক’ ফোনটাকে বিছানায় ছুড়ে ফেলে দিল রাগের চোটে। মুনাই সায়নের সামনেই দাঁড়িয়েছিল। সে গলা চেপে বলল, ‘কী হচ্ছে কী? মা আছে, বউদি আছে। শুনতে পেলে কী হবে বলো তো?’ সত্যি মাথা খারাপ হয়ে গেছে সায়নের। চুলের মধ্যে দুটো হাত চালিয়ে দিয়ে মাথা নীচু করে বসল সায়ন। বলল, ‘সরি সরি, আমার মাথা জাস্ট কাজ করছে না।’ মুনাইও ফুটেজটা দেখল। ও চোখের সামনে যা দেখেছে তার থেকে এটা ভয়ানক নয়। তাই ভয়ে সে কেঁপে উঠল না। খানিকক্ষণ ভেবে সায়নের সামনে এসে দাঁড়াল। মাথা হাত বুলিয়ে দিল। মুখ তুলল সায়ন। বড়ো করুণ লাগল তার মুখখানা। মুনাই বলল, ‘যা হয় ভালোর জন্য হয়।’ এই অবস্থায় মুনাইয়ের কথায় তড়িতাহত হল সায়ন। বলল, ‘তোমারও কী মাথাটা গেল মুনাই? এই কেসটা কীভাবে জটিল হয়ে যাচ্ছে একবার ভেবেছ? আত্রেয়ীর বাবার খোঁজ পেয়েও কাউকে বলতে পারলাম না। এখন আত্রেয়ীর অতীত কীভাবে কোথা থেকে জানব? তার ওপর একটা ভূতের অ্যাঙ্গেল ঢুকে গেল কেসে।’
— আমার মন কিন্তু অন্য কথা বলছে।
— কী কথা?
— এতদিন তোমরা ভেতর ভেতর জানতে এটা একজন অশরীরীর কাজ। কিন্তু কাউকে বলতে পারতে না। আইন মানত না। তোমাদের হাতে যা প্রমাণ আছে সেগুলো তোমরা দেখলেও বাইরে প্রকাশ করতে পারছিলে না। আইন চাইত পুলিশ কোনো রক্তমাংসের অপরাধীকে ধরুক। আর তোমরা জানো যে, এই অপরাধীকে তোমরা ধরতে পারবে না। বাস্তব আর অবাস্তবের এক চূড়ান্ত লড়াই চলছিল। এবার তো সাধারণ মানুষ থেকে মিডিয়া সবাই জানল এটা কোনো মানুষের কাজ না। আজ বিশ্বাস না করলেও কাল করতেই হবে। দাদাভাইয়ের কেসটা কোর্টে উঠবেই। তখন তোমরা এই সিসিটিভি পেশ করতে পারবে। একটা অশরীরী যদি সবটা ঘটায় তাহলে তোমাদের কী করার আছে? প্রমাণ করুক কেউ, এটা কোনো অশরীরীর কাজ নয়, দাদাভাই করেছে।
সায়নের চোখ-মুখ সব পালটাতে থাকে। আশঙ্কার কালো মেঘ কাটছে কি তবে? এখনও বুঝতে পারছে না সায়ন। পাশে বসল মুনাই। বলল, ‘তুমি তো খবরটা পুরো পড়লেই না। শেষে একটা কথা লেখা আছে, আত্রেয়ী সেনকে শুটিঙে যে ঠেলে ফেলে দেওয়া হয়েছিল সেটাও কি এই অশরীরীর কাজ ছিল? বৃষভানু, তেঁতুল তাদের মৃত্যুও কি এইভাবে হয়েছে? কারণ ওই মৃত্যুগুলোও অস্বাভাবিক মৃত্যু। এই কথাগুলোই কাল কোনো একটা চ্যানেলে যেন বলছিল। যা সত্যি, সেটা প্রকাশ হবেই দেখো।’
.
মুনাই থামতেই মোবাইলটা আবার ভোঁ ভোঁ করে কেঁপে ওঠে। মোবাইল স্ক্রিনে লেখা ‘কমিশনার স্যার।’ সায়নের বুকটা ছ্যাৎ করে ওঠে। এবার বোধহয় ওপরমহল থেকে ফাইনাল নোটিস এসে গেছে। দুরুদুরু বুকে শুকনো গলায় সায়ন ফোনটা ধরে, ‘হ্যাঁ স্যার বলুন।’
.
পরিষ্কার বুঝতে পারছে না। একটা ছায়া ছায়া অবয়ব দরজার দিক থেকে এগিয়ে আসছে। স্পষ্টভাবে দেখার জন্য অনেক চেষ্টা করছে। মাথা ঝাঁকাচ্ছে। কিন্তু দৃষ্টি কিছুতেই স্পষ্ট হচ্ছে না। লোকটার এগিয়ে আসার ভঙ্গিমাটা অদ্ভুত লাগছে। শরীরটা তার ভাঙা। ঘাড় থেকে মাথাটা সরে আছে খানিকটা। অস্পষ্ট চোখ-মুখদুটোও ঠিক জায়গায় আছে বলে মনে হচ্ছে না। একটু কাছে আসতেই বুঝতে পারে তার দিকে বাড়িয়ে রাখা সুচালো নখরযুক্ত দুটো হাতও ভেঙেচুরে হাড়গুলো এপাশ-ওপাশ হয়ে গেছে। মাথাটা ঘষে দূরে সরে যাবার চেষ্টা করছে। পারছে না। পাশে গড়িয়ে পড়ে যেতে চাইলেও শরীরটা যেন পাথরের মতো ভারী হয়ে গেছে। শুধু পা-দুটো বিছানার চাদরে ঘষে চলেছে। কখনও শূন্যে ছুড়ছে। পালাতে হবে। পালাতেই হবে তাকে। এবার যে তার পালা। একদম চোখের কাছে এসে গেছে সেই রক্ত-মাংসে দলা পাকানো ভয়ংকর বিচ্ছিরি মুখটা। এবার দুটো সাদা চোখ একদম স্পষ্ট। ওই পুতিগন্ধময় কুৎসিত শরীরটা ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইছে। এইবার সে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। ঝাঁপিয়ে পড়ল…
.
জলের অতল থেকে খাবি খেয়ে জেগে উঠল তন্ময়। শুধু নাক নয়। মুখটা হাঁ করে নিশ্বাস নিতে হচ্ছে তাকে। চোখদুটো ঠেলে বেরিয়ে এসেছে। ঘর ফাঁকা। কেউ নেই। বড়ো কেবিনটায় তন্ময় একলা শুয়ে আছে হাতে-পায়ে ব্যান্ডেজ বেঁধে। স্যালাইনের নল ঢোকানো হাতের শিরায়। জায়গাটা টনটন করছে। ভয় পেয়ে শরীর ঝাঁকিয়ে জেগে উঠতে গিয়ে হয়তো টান পড়েছে তাতে। থরথর করে দেহের কাঁপুনিটা বেড়েই চলেছে। হঠাৎ পরিত্রাহি চিৎকার করে নার্সকে ডেকে ওঠে তন্ময়। বারবার ডাকে। ফাঁকা ঘরে তন্ময়ের গলাটা ঝমঝম করে বাজতে থাকে। বেডের সঙ্গে ঝোলানো ছিল সুইচ। ঘরে কাউকে না পেয়ে পরের পর সুইচ বাজাতে থাকে। ঝটিতি দরজা খুলে ঢুকে আসে নার্স।
কোথায় ছিলেন? পেশেন্টকে ঘরে একা রেখে কেন গেছিলেন? আপনাদের মিনিমাম দায়িত্ববোধ নেই? আপনাদের নামে কমপ্লেন করব আমি।
— রিল্যাক্স স্যার রিল্যাক্স। এরকম প্লিজ করবেন না। আপনার শরীর খারাপ করবে।
— তার জন্য দায়ী থাকবেন আপনি। আপনারা ছিলেন না বলেই তো ও এসেছিল!
— স্যার আমি জাস্ট দু-মিনিটের জন্য ওয়াশরুমে গিয়েছিলাম। আপনি হাঁফাচ্ছেন স্যার। প্লিজ শুয়ে পড়ুন।
— ও আসবে। আসবে আমি জানি।
চোখ বড়ো বড়ো করে কাঁপছে তন্ময়। কে আসবে স্যার? কেউ তো আসেনি আপনার ঘরে।’ নার্সের কথার ওপর দিয়ে তন্ময় ধমকে উঠল, মিথ্যে কথা। আমি স্পষ্ট দেখেছি।’
— কে এসেছিল?
— অ্যাঁ? কে? কে এসেছিল!
— হ্যাঁ স্যার বলুন কে এসেছিল। এখানে তো সিসিটিভি আছে। কেউ এলে আমরা ঠিক ধরে ফেলব।
ঘামে ভেজা মুখে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে তন্ময় বলল, ‘হ্যাঃ, সিসিটিভি! আত্রেয়ী সেনের ঘরেও তো সিসিটিভি ছিল। বাঁচাতে পারল?’
নার্স এবার বুঝতে পারল ঠিক কীসের ভয়ে কাঁপছে তন্ময়। কথাটা নার্সের বুকেও শক্ত পাথরের মতো চেপে বসে আছে। তা-ও নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, ‘চিন্তা করবেন না স্যার। আপনার কোনো ভয় নেই। পুলিশ থেকে আপনার প্রোটেকশন দ্বিগুণ করে দিয়েছে। স্পেশ্যাল পারমিশন নিয়ে এই ঘরের বাইরে পুলিশ পোস্টিং হয়েছে। তাই যে-কেউ যখন খুশি এই ঘরে ঢুকতে পারবে না। বিশ্বাস না হলে আমি সবাইকে ডাকতে পারি। আপনি নিজের চোখেই দেখে নিন।’ কথাগুলো শুনে তন্ময় নিশ্চিন্ত হবে কি হবে না ঠিক বুঝতে পারছিল না। চোখের মণিদুটো এপাশ-ওপাশ ছোটাছুটি করছে। নার্স যত্ন করে শুইয়ে দিল তন্ময়কে। তন্ময় বলে দিল, আপনি এরপর ঘর ছেড়ে গেলে কাউকে না কাউকে রেখে যাবেন।
— আচ্ছা বেশ! তাই হবে। এখন আপনি রেস্ট করুন।
তন্ময় শুয়ে রইল। ওষুধের হাই ডোজ চলাতে বিছানায় পিঠ ঠেকানো মাত্রই চোখের পাতা ভারী হয়ে এল। কিন্তু কিছুতেই ঘুমোতে পারল না। ঘুমোলেই কেউ যেন তার চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। শুধু একটু সুযোগের অপেক্ষায়।
.
পিক পিক করে মনিটরের সাউন্ড হয়েই চলেছে। হাতের ওপর কে যেন হাত রাখল। আলতো ঘুম এখন সবসময় জড়িয়ে রাখে মিহিরকে। তাই অচেনা হাতের স্পর্শ পেতেই চোখ খুলে তাকাল সে। চোখ খুললেই যে সবকিছু স্পষ্ট দেখতে পায় তেমনটা নয়। চোখের সামনে থেকে ঘোলাটে পর্দাটা সরতে একটু সময় লাগে। এর মধ্যেই গলাটা শুনতে পেল। একটা ভারী পুরুষকণ্ঠ তার নাম ধরে ডাকল। ডাকটার মধ্যে একটা শান্তি আছে। স্বস্তি আছে। আবার একটা অন্য গলার ডাক, ‘দাদাভাই, কেমন আছ?’ ঘোলাটে দৃষ্টিটা এবার পরিষ্কার হয়েছে। নীলাম্বর ব্যানার্জি আর সায়ন দাঁড়িয়ে মিহির হাসল। খুব ধীরে, শান্ত স্বরে বলল, ‘বোসো।’ সায়ন দুটো চেয়ার টেনে নিল। মিহির বুঝল নীলাম্বরের হাত তার কবজিটা ধরে আছে। মিহির জিজ্ঞেস করল, ‘কেমন আছেন নীলাম্বরবাবু?’
— প্রশ্নটা তুমি আমায় করছ?
বলেই ফিক করে হাসলেন। বললেন, ‘ভালো নেই। যতদিন না তোমাকে এখান থেকে বের করে বাড়িতে নিয়ে যাব ততদিন ভালো থাকব না।’
দীর্ঘশ্বাস ফেলল মিহির। নীলাম্বরের দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে ঘরের সিলিঙের দিকে তাকাল। সায়ন বলল, ‘দাদাভাই, খেলা ঘুরছে। এখন শুধু সাধারণ মানুষ নয়, পুলিশ ডিপার্টমেন্ট এটা বিশ্বাস করছে যে খুনগুলো তোমার কাজ নয়। কমিশনার আমায় নিজে ডেকে বললেন।’ সায়ন ঠিক কী বলছে কিচ্ছু বুঝতে পারছে না মিহির অবাক চোখে শুনছে সায়নের কথা।
— আইন অনেক কিছু পারবে না। কারণ আইন অলৌকিকত্বে বিশ্বাস করে না। কিন্তু আত্রেয়ী সেন বা আমার এক ড্রাইভার আবদুলের কেসে সিসিটিভিতে যা ফুটেজ ধরা পড়েছে তাতে তারাও বিশ্বাস করতে বাধ্য হচ্ছে এটা কোনো আন-ন্যাচারাল প্যারানরমাল ইনসিডেন্ট। তাই ইনভেস্টিগেশনের সঙ্গে এইসব অলৌকিক ঘটনা বন্ধ করতে যা যা করার আমি করতে পারি। এটা পুলিশ ডিপার্টমেন্ট আমায় আশ্বাস দিয়েছে। শুধু তোমার একটু হেল্প চাই।
— কী হেল্প?
— শুরু থেকে শেষপর্যন্ত, মানে আত্রেয়ী সেনের সঙ্গে তোমার আলাপের প্রথম দিন থেকে শুরু করে বোলপুরের শুটিং পর্যন্ত বা তার পরে যা যা হয়েছে খুলে বলো। তবে হ্যাঁ, যখনই তোমার মনে হবে কষ্ট হচ্ছে। তুমি জাস্ট চুপ করে যাবে। এখনও তুমি কথা বলার মতো অবস্থায় আসোনি। বাট, আমাদের শিয়রে সংক্রান্তি। এখন সব না জানলে আর সময় পাব না।
.
মিহিরের ভারী হয়ে আসা চোখের পাতাটা দু-বার নড়ে ওঠে। স্মৃতিতে ভেসে ওঠে সেই প্রথমদিন। যেদিন প্রোমোর স্ক্রিপ্ট শোনাতে প্রথমবার পা রেখেছিল আত্রেয়ীর বাড়িতে। একটা কাচের টেবিলের একদিকে সিঙ্গল সোফায় মিহির এবং তার উলটোদিকের সিঙ্গল সোফাটাতে বসে তন্ময় হালদার। দুজনের মাঝে বড়ো সোফায় পাদুটোকে বাঁ-দিকে মুড়ে হেলান দিয়ে বসে আছে আত্রেয়ী। হেলানো মাথাটা রাখা ডানহাতের তালুতে। প্রোমো শুরু হবে একটা গান দিয়ে। মিহিরের মোবাইলে সেই গানটাই বাজছিল, ‘আমি তোমার প্রেমে হব সবার কলঙ্কভাগী, আমি সকল দাগে হব দাগী, কলঙ্কভাগী।’ এইটুকু অংশের মধ্যেই মিহির খেয়াল করল মোবাইল ঘাঁটতে ঘাঁটতে তন্ময় টুক করে একবার চোখ মারল আত্রেয়ীকে। আত্রেয়ী ঢলঢলে গালে একটু আধো-আধো ভাব এনে মুচকি হাসল। মিহিরের বিরক্ত লাগল। ও একটা সিরিয়াস কাজের জন্য এসেছে, আর এদিকে এরা দুজন প্রেমের আদানপ্রদান করছে। তবু বিশেষ পাত্তা দিল না। গানটা মুখরা ছেড়ে সবে অন্তরায় ঢুকছে ঠিক সেই সময় প্রচণ্ড জোরে ধমকে উঠল মিহির, ‘থামো তোমরা।’ গান থেমে গেল। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে মিহিরের দিকে তাকাল আত্রেয়ী ও তন্ময়। দেখল স্ক্রিপ্টের দিকে তাকিয়ে মিহির চড়া গলায় দাঁতে দাঁত চিপে বলছে, বিধবা হয়ে রাসলীলা হচ্ছে? স্বামীকে খেয়েও আশ মেটেনি? ছ্যা ছ্যা ছ্যা ছ্যা।’ সুরটা নামিয়ে মিহির বলল, ‘এই সংলাপের মধ্যে দিয়ে মনোহর চৌধুরির এন্ট্রি। আলোকপর্ণা আর সুবিমল একটু ভয় পেয়ে ওদের দিকে তাকিয়েছে। আত্রেয়ী আর তন্ময় এতক্ষণে বুঝল যে এটা প্রোমোটার স্ক্রিপ্ট পাঠ করছে মিহির। আত্রেয়ী কপালে হাত দিয়ে মাথাটাকে নীচু করল। তন্ময়ও মুখ বেঁকিয়ে হাসল। এবার অস্বস্তিতে পড়ল মিহির। ও ঠিক বুঝল না এরা এমন কেন করছে। অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে যতটা পারা যায় সুর নরম করে মিহির বলল, ‘কী হল ম্যাম, কিছু প্রবলেম?’ হাসতে হাসতে আত্রেয়ী বলল, ‘নো নো। ক্যারি অন। মুখের সামনে ঝুঁকে পড়া সিল্কি চুলটা এক ঝটকায় পেছনে পাঠিয়ে গালে হাত দিয়ে বসল আত্রেয়ী। তন্ময় জিজ্ঞেস করল, ‘এখানে কীরকম লাইট ভাবছ?’ এক্কেবারে সরাসরি তুমি দিয়েই কথা শুরু করল তন্ময়। মিহিরের সেটা খুব একটা পছন্দ হল না। যার সঙ্গে এই কুড়ি মিনিট হল দেখা হয়েছে তাকে এমন করে প্রশ্ন করছে যেন মিহির পরীক্ষার্থী আর তন্ময় শিক্ষক। মিহির শান্ত স্বরেই বলল, ‘সকালের আলো যেমন হয়।’ কাঁধ নাচিয়ে একটু সামনের দিকে ঝুঁকে তন্ময় বলল, ‘এ আবার কী? সাতসকালে একটা বাড়ির বিধবা বউ মাঝ উঠোনে নেমে নাগরকে রোবিন্দোসংগীত শোনাচ্ছে? এটা অ্যাবসার্ড! এই আত্রেয়ী, এইরকম শো হলে তো তোমায় নিয়ে ট্রোল হবে।’ ব্যাস, এক শিয়াল ডাকলে সব শিয়াল ডেকে ওঠে। আত্রেয়ীও নাক-সিঁটকে বলে উঠল, ‘হুম। মিহির এটা পালটাও। এটা ভালো না।’ মিহির এবার গম্ভীর। ‘ম্যাডাম সুবিমল এখানে আলোকপর্ণার সঙ্গে দোল খেলতে এসেছে। আর দোলখেলাটা মূলত সকালেই হয়। আলো সেখানে এই গান গাইছে কারণ তার বৈধব্যের যে গণ্ডি সে সেটা ভেঙে ডেস্পারেট হয়ে নতুন করে জীবন গড়বে। গানের কথাগুলোও সেটাই বলছে। আমি তোমার প্রেমে হব সবার কলঙ্কভাগী।’ মিহিরের মুখের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে কথাগুলো শুনল আত্রেয়ী। তারপর ‘ও, তাহলে ঠিকাছে।’ বলে তন্ময়ের দিকে হাত দেখিয়ে বলল, তন্ময় এটা থাক। ভালোই বলেছে মিহির। মিহির তুমি বলো।’ তন্ময়ের চোয়ালদুটো শক্ত হয়ে উঠল। সেটা মিহিরের দৃষ্টি এড়াল না। মিহির বলতে শুরু করল। ‘এই মনোহর চৌধুরি যখন এল, তখন কিন্তু একা আসেনি। সঙ্গে গ্রামের লোকজন নিয়ে এসেছে। এই সময় সুবিমল আলোকপর্ণাকে গার্ড করে সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে বলল, কাকে কী বলছেন? আপনারা আলোকপর্ণার চরিত্রে এভাবে কালি ছেটাতে পারেন না। তখন ওই মনোহর চৌধুরি তেড়েফুঁড়ে উঠে বলে, এই গ্রামে এমন নষ্টামি চলবে না। বেরিয়ে যাও এই গ্রাম থেকে।’
— সেই থোড় বড়ি খাড়া গল্প। এবার নিশ্চয়ই আত্রেয়ী হাউমাউ করে কিছু বলবে?
আবার ফুট কাটল তন্ময়। আরও বলল ‘আত্রেয়ী সেনের মতো পুরস্কারপ্রাপ্ত অভিনেত্রী এই প্রথমবার কোনো ডেলি সোপ করছে। তার জন্য একটু আলাদা কিছু ভাবা গেল না?’ এবার আত্রেয়ীকে বলল, ‘এই আত্রেয়ী, শুধু তোমার জন্য আমি এই টিভি সিরিয়াল করতে রাজি হয়েছি। এ যা প্রোমো শোনাচ্ছে তাতে আমি তো ভালো ফ্রেমই দেখতে পাচ্ছি না। কী করছ এসব?’ আত্রেয়ী এবার সোফায় সোজা হয়ে বসল, ‘খুব কী খারাপ লাগবে? আফটার অল পুরোটাই কিন্তু আমার পার্ট। এরকম একটা প্রতিবাদী চরিত্র। লোকে কিন্তু খাবে।’
— আরে আত্রেয়ী তোমার ইমেজ…
তন্ময়কে চেপে দিয়েই আত্রেয়ী বলে উঠল, ‘ঠিকাছে পুরোটা শুনি না। বলো মিহির।’ বলেই মিহিরের ডানহাতটা ধরে আত্রেয়ী বলে উঠল, ‘অ্যাই তোমাকে তুমি করে বলছি বলে কিছু মনে করছ না তো?’
— এ মা! না না। আমার ভালোই লাগছে।
কথাটা বলেই মিহির তন্ময়ের দিকে তাকায়। মনের মধ্যে যে কী পরিমাণ আগ্নেয়গিরির স্ফুরণ হচ্ছে তার সেটা ভালোই বুঝতে পারে সে। এই সময় মিহিরের মনে একটু দুষ্টুমি চিড়িক দিয়ে ওঠে। সেই আসা থেকে বড্ড জ্বালাচ্ছে লোকটা। মিহির তাই আর-একটু জ্বালিয়ে দেবার জন্য তন্ময়কে বলে ওঠে, ‘আর তন্ময়দা, স্ক্রিপ্টটা ডিটেলসে বলা হয়ে গেলে আপনাকে আমি এর শট ডিভিশনগুলো মেইল করে দেব। আমার সব ফ্রেম ভাবা আছে।’ তন্ময়ের চোখদুটো ওপর থেকে নীচে মিহিরকে মেপে নিয়ে বলে, ‘ও, থ্যাংক ইউ।’
— ওয়েলকাম।
ঠিক এইসময় একটা শিরশিরে হাওয়া মিহিরের গায়ের পাশ দিয়ে সরে যায়। ভেতর থেকে একটু কাঁপুনি লাগে তার। এপাশ-ওপাশ তাকায়। দরজা জানলা সব বন্ধ।
— পড়।
আত্রেয়ী বলল। মিহির একটু হেসে আবার পড়তে শুরু করল।
