মৃত জ্যোৎস্নার রাত্রি – ৩৭
সাঁইত্রিশ
আত্রেয়ী সেনের বাড়িতে বসে তুমি যে শিরশিরে হাওয়া ফিল করেছিলে সেটা কী আর কখনও পেয়েছিলে?
নীলাম্বর প্রশ্ন করলেন। মিহির বলল, ‘না। ঠিক হাওয়া নয়। আমি যতক্ষণ ওই বাড়িটাতে ছিলাম আমার একটা অস্বস্তি হচ্ছিল। খালি মনে হচ্ছিল আমার ঠিক পেছনে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। দু-একবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম। কিন্তু একবারও কাউকে দেখতে পেলাম না। শুধু একবার একটি মেয়ে এসে স্ন্যাক্স আর কফি দিয়ে গেল।’
নীলাম্বর ‘হুম’ বলে মিহিরের হাতের কবজিটা ধরে চোখ বন্ধ করলেন। মিহির আবার বলতে শুরু করল, আত্রেয়ী সেনের বাড়ি থেকে ফিরে আসার পরের দিন মিতালি নামের একটি মেয়ে আমায় ফোন করল। আত্রেয়ী সেনের পিএ।
মিহিরের কথায় অবাক হল নীলাম্বর। চোখ খুলে আবার প্রশ্ন করলেন, ‘আত্রেয়ী সেনের পিএ-র বন্দনা না কী যেন নাম না?’ উত্তরটা সায়ন দিল, ‘বন্দনা আগে ছিল। বোলপুরের শুটিঙের এক-দেড় মাস আগে ছেড়ে দেয়। তার কয়েকদিন বাদে মিতালি জয়েন করে।
— বেশ।
আবার চোখ বুজলেন নীলাম্বর। মিহির জানাল, মিতালি ফোন করে বলে পরের দিন বিকেল সাড়ে চারটে পাঁচটা নাগাদ অল্টেয়ার হোটেলের রুফটপে যেতে। সকাল থেকে ম্যাডামের ওখানেই শুট। আপনার সঙ্গে একটু বসবেন প্রোমোর স্ক্রিপ্টটা নিয়ে। মিহির সেদিন সোয়া চারটের মধ্যে যথাস্থানে পৌঁছে যায়। তখনও শুটিঙের লাস্ট শটের টেক চলছে। ক্যামেরায় তন্ময় হালদার। মিহির গিয়ে মনিটরের পাশে দাঁড়াল। শটের ফাঁকে তন্ময় আর মিহিরের চোখাচুখি হয়। মিহির ভদ্রতার খাতিরে সৌজন্যের হাসি হাসে। কিন্তু তন্ময় সেই সৌজন্যটুকু দেখাবারও প্রয়োজন মনে করে না। অপমানিত হলেও খুব একটা গায়ে মাখে না মিহির। আত্রেয়ী সেন তাকে ডেকে পাঠিয়েছে। মিহিরের কাছে এই অনেক। বন্ধুমহলে এখনই বেশ হাওয়ায় ভাসছে মিহির। কেউ কেউ পিঠ চাপড়ে বলেছে, ‘ভাই, টলিউডের স্বপ্নসুন্দরী তোমায় ডাকছে। ইস্পেশাল মিটিঙে। এরপর চিনতে পারবে তো?’ সেখানে এই তন্ময় হালদার কে? মিহির খেয়াল করে কালো ড্রেস পরে একজন লম্বা চওড়া লোক দাঁড়িয়ে অ্যাটেনশন মোডে। বুঝতে অসুবিধে হল না যে এই লোক আত্রেয়ীর বডিগার্ড। একটি ফরসা মাঝারি উচ্চতার মেয়েও দাঁড়িয়ে আছে। শটের ফাঁকে আত্রেয়ীর হয়ে সেই চিৎকার করে মেকআপ ডাকছে। জল আনাচ্ছে। এই মেয়েটিই কী মিতালি? কী জানি, হবে হয়তো।
.
সূর্যটা আজকের মতো ঘুমোতে যাবার তোড়জোড় করছে। প্রায় ফুরিয়ে-আসা বসন্তের শহুরে বিকেলের আকাশটা বড়ো মায়াময়। ভাবটা এমন যেন ছেড়ে যেতে মন চায় না। তবু ছেড়ে যেতে হয়। আকাশের দিকে চেয়ে খানিক আনমনাই হয়ে গেছিল মিহির। ঠিক সেই সময় ডিরেক্টর প্যাক আপ বলে ওঠে। মিহির ঠিকই ভেবেছিল, ওই মেয়েটিই মিতালি। ঠোঁটের নীচে ছোট্ট একটা তিল মিতালির মুখটাকে যেন সাজিয়ে তুলেছে। কাছে এসে বলল, ‘দাদা আপনাকে ডাকছেন।’ মিহির স্বভাবতই একটু অবাক হল। কোনো দাদার ডাক আসার তো কথা ছিল না। ‘কোন দাদা?’
— তন্ময়দা।
— ও।
দূরে তন্ময় দাঁড়িয়ে দুজনের সঙ্গে হাসছে আর কীসব কথা বলছে। তা-ও মিহির গিয়ে দাঁড়াল। ‘হ্যাঁ তন্ময়দা বলুন।’
— আজকাল ক-টা লোক কাজ বুঝে কাজ করেন বলো তো? সব শালা ভুঁইফোঁড়। কেউ বড়ো ক্যামেরাম্যান তো কেউ বড়ো ডিরেক্টর। সব্বাই নিজেকে ঋতুপর্ণ গৌতম ভাবছে। আরে তাঁদের স্কিল দ্যাখো আর নিজেরটা দ্যাখো।
সামনে দাঁড়িয়ে থাকা চাপদাড়ির মাঝবয়সি লোকটা তন্ময়ের কথায় তাল ঠুকে ঘাড় নাড়ল। তন্ময় পাত্তাই দিল না মিহিরকে। সামনের লোকটির সঙ্গেই কথা বলে চলল। দূরে আত্রেয়ীকে কিছু একটা খেতে দিল মিতালি। আত্রেয়ী তাকাচ্ছেই না মিহিরের দিকে। আশ্চর্য ব্যাপার! ডাকল তো আত্রেয়ী। কিন্তু এই মালটা আবার কী কথা বলবে? এ যেন আমায় দেখতেই পাচ্ছে না। মনে মনে আচ্ছা করে গাল পাড়ল মিহির। আবার বলল, ‘তন্ময়দা ডাকছিলেন নাকি?’ মিহিরের গলাটা এবার একটু জোরেই বাজল। তন্ময় তাকাতে বাধ্য হল। ‘ও হো, হ্যাঁ। জরুরি কিছু কথা ছিল।’
— বলুন।
চাপদাড়ি লোকটা বলল, ‘আপনারা কথা বলুন। আমি ওদিকটা দেখছি।’ তন্ময় এক্কেবারে বিনয়ের অবতার হয়ে জিজ্ঞেস করল এই রুফটপে কিছুক্ষণ থাকতে পারা যাবে কিনা। চাপদাড়ি তন্ময়ের দু-হাত ধরে এক গাল হেসে জানাল, ‘আরে এ কী বলছেন? কিছুক্ষণ কেন সারা রাত থাকবেন বলুন, ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।’
— আরে না না। থ্যাংক ইউ।
.
মিহির আর তন্ময় ঠিক আত্রেয়ীর সামনেই এসে বসল। শুধু একটু হাসি বিনিময় করেই নিজের মোবাইলে মন দিল আত্রেয়ী। ব্যাপারটা ঠিক কী ঘটছে কিছু বুঝতে পারছে না মিহির। ফস করে তন্ময় বলে উঠল, শট ডিভিশনের প্রিন্ট আউটটা একবার বের করো তো।’ বস যেন সাবর্ডিনেটকে হুকুম করল। মিহির বলল, ‘প্রিন্ট তো আনিনি।’
— যাশা! যেটা নিয়ে কথা বলব সেটাই আনোনি? এ কী ধরনের রেসপন্সিবিলিটি ভাই?
— এটা নিয়ে যে কথা বলতে ডেকেছেন সেটাই তো বলেননি। তা ছাড়া ডেকেছিলেন তো…
কথাটা শেষ করতে না দিয়েই তন্ময় বলল, ‘এটা বলার কী আছে? তোমার সঙ্গে নিশ্চয়ই মাসকাবারি বাজারের আলোচনা করতে ডাকিনি।’
মাথায় আগুন জ্বলে গেলেও নিজেকে ঠান্ডা রাখল মিহির। বলল, ‘মোবাইলে আছে। কী বলবেন বলুন।’
পকেট থেকে সিগারেট বের করে তন্ময় ধরাল। মিহিরকে অফার করল। কিন্তু হাত তুলে না বলল সে। তাতেও তন্ময় যা এক্সপ্রেশন দিল মনে হল মিহির যেন অন্য গ্রহের কোনো প্রাণী। অথবা পুরুষ মাত্রই যেন সিগারেট খাওয়াটা জরুরি।
.
সূর্যটা পশ্চিমে ঢলে পড়েছে। আর-একটু পরেই সন্ধে নেমে আসবে। আশেপাশে সবাই শুটিঙের জিনিসপত্র প্যাক করতে ব্যস্ত। ভুসভুস করে ধোঁয়া ছেড়ে তন্ময় বলল, ‘প্রথম পয়েন্ট হল, ওই চার নম্বর শটটা যেখানে আত্রেয়ীকে আমরা লো অ্যাঙ্গেল শটে দেখছি সেটা বাদ দিতে হবে।’
কেন?
— আত্রেয়ীকে লো অ্যাঙ্গেলে ভালো লাগে না। চিনটা এসে যায় তো তাই। বয়স্ক লাগবে।
— তাতে প্রবলেমটা কোথায়? আমাদের ক্যারেক্টারটাই তো একটু এজেড। বরং দিদিকে কমবয়সি লাগলেই গল্পের সঙ্গে যাবে না।
— মিহির, ভাই একটা জিনিস মাথায় রাখো। এটা আত্রেয়ী সেন। লোকের চোখে আত্রেয়ী এখনও টলিউডের স্বপ্নসুন্দরী।
— আমি আত্রেয়ী সেনকে পোট্রে করছি না তন্ময়দা। আলোকপর্ণাকে দেখাচ্ছি। যার বয়স চল্লিশ পেরোতে চলেছে এবং সেই বয়সে গিয়ে একজনের প্রেমে পড়েছে যে কি না তার চেয়ে খানিক ছোটো।
— তা হোক মিহির। তুমি ওটা বাদ দাও প্লিজ।
হঠাৎ মিহিরকে চমকে দিয়ে আত্রেয়ী মিহিরের হাতের ওপর হাত রেখে আহ্লাদি সুরে কথাটা বলল। সত্যি কথা বলতে একটু অস্বস্তিতেই পড়ল মিহির। সেদিনকার হাত রাখাটা যতটা সুখের মনে হয়েছিল মিহিরের, আজকে যেন একটু অস্বস্তিই লাগল। তা-ও বলল, ‘কিন্তু দিদি, আপনার তো…।’
— ওহ মিহির। কল মি আত্রেয়ী। এরকম সবার সামনে ‘দিদি দিদি’ কোরো না তো।
ঢোঁক গিলে মিহির বলল, ‘আচ্ছা তাই হবে। কিন্তু ম্যাডাম এই প্রোমোটাতে তো আপনার ভাইটাল শটগুলোই লো অ্যাঙ্গেলে। আপনি প্রতিবাদ করতে করতে যখন লোকগুলোর দিকে তেড়ে আসছেন তখন শট তো সব…।’
— ওগুলো বেশ কিছু লং থেকে ট্রলি করব। আর কিছু প্রোফাইল থেকে হাফ রাউন্ড ট্রলি। চকাচক হয়ে যাবে।
মিহিরের কথার ওপর দিয়েই ওভারল্যাপ করল তন্ময়ের কথা। তন্ময়ের দিকে তাকিয়ে আদুরে চোখদুটো টিপল আত্রেয়ী। মিহির চোখটা নামিয়ে নিল। আবারও আত্রেয়ীর নরম হাত এসে মিহিরের পিঠ স্পর্শ করে বলল, ‘তোমরা কথা বলো, আমি একটু আসছি।’ যেন অনন্ত সুখলোকের কোনো তরঙ্গ মিহিরের শরীরে আবার আলোর আঁকিবুকি কেটে দিয়ে গেল। সঙ্গে কোনো এক হিমশীতল হাওয়া মিহিরকে ছুঁয়ে আত্রেয়ীর সঙ্গে দূরে সরে গেল। মিহিরের মনে হল ওর ঘাড়ে কেউ নিশ্বাস ফেলছে। কিন্তু পেছনে অনেক লোক ঘোরাঘুরি করছে। গলা তুলে একে অন্যকে ডাকছে। বিশেষ কেউ মিহিরের ঘাড়ের কাছে দাঁড়িয়ে নেই। কানে মোবাইল দিয়ে আত্রেয়ী রুফটপের একদম ধারে গিয়ে দাঁড়াল। আকাশ থেকে আলো হারিয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। ভিড়ও খালি হয়েছে ছাদের। আরও কিছু কথা বলতে বলতে তন্ময়ের একটা ফোন আসে। সে-ও উঠে খানিকটা দূরে চলে যায়। মিহির শুধু একা বসে অপেক্ষা করতে থাকে।
.
মিহির এক দৃষ্টে চেয়ে আছে আত্রেয়ী সেনের দিকে। রুফটপের এক্কেবারে ধারে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। মাঝে মাঝে হাসতে হাসতে পিঠের ওপর ছড়িয়ে থাকা চুলগুলো হাত দিয়ে মুখের সামনে এনেই আবার পেছনে ছুড়ে দিচ্ছে। খোলা আকাশের হাওয়ায় সেগুলো ফুরফুর করে ডানা মেলে উড়ে আবার নিজের জায়গায় ফিরে আসছে। এখনও বিশ্বাসই হচ্ছে না তার ডিরেকশনে অভিনয় করবে আত্রেয়ী সেন। মিহিরের মনে হচ্ছে আত্রেয়ী যেন লালিমা ছড়ানো আকাশের বুকে মুখ পেতে বেঁচে থাকার ঘ্রাণ নিচ্ছে। তার মাথার ওপরে রূপ বদলাচ্ছে অস্তরাগের আকাশ।
কিন্তু ওটা কে? আত্রেয়ী সেনের পেছনে! মিহির তো এতক্ষণ একভাবে আত্রেয়ীর দিকেই তাকিয়ে ছিল। কেউ তো ছিল না। ধূসর রঙের জামা আর কালো রঙের প্যান্ট, তার ওপর কালচেটে লাল ছোপ। যেন চারপাশে রক্ত শুকিয়ে আছে। অদ্ভুত দেখতে জামাকাপড় পরা লোকটা কে? আত্রেয়ীর দিকেই-বা এগোচ্ছে কেন? মিহির এদিক-সেদিক তাকিয়ে দেখল কাউকে জিজ্ঞেস করা যায় কিনা। কিন্তু কেউ নেই। সবাই দূরে-দূরে। সেই বডিগার্ডই-বা গেল কই? আবার আত্রেয়ীর দিকে চোখ ফেরাতেই চমকে ওঠে মিহির। ঝড়ের বেগে উঠে দাঁড়ায় সে। লোকটার বিচ্ছিরি বাঁকা দুটো হাত আত্রেয়ীর দিকে উঠেছে। এক্ষুনি পেছন থেকে আত্রেয়ীকে ঠেলে ফেলে দেবে। আর কিচ্ছু না ভেবে মিহির পাগলের মতো দৌড়োতে থাকে আত্রেয়ীর দিকে। লোকটার হাত আত্রেয়ীর পিঠের একদম সামনে চলে এসেছে। ‘আত্রেয়ীইইইইইইই’ চিৎকার করে ওঠে মিহির। দূরে-দূরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা লোকগুলো যে যার কাজ ছেড়ে তাকায়। দেখে একটি ছেলে দৌড়ে আত্রেয়ীর দিকে গেল, আত্রেয়ী ফিরে তাকাল এবং কিছু বোঝার আগেই ছেলেটি আত্রেয়ী সেনকে টেনে নিয়ে ছাদের ওপর চিত হয়ে শুয়ে পড়ল। হ্যাঁচকা টানে আত্রেয়ী সেন সোজা মিহিরের বুকের ওপর মুখ গুঁজে হুমড়ি খেয়ে পড়ল। ঠিক সেই মুহূর্তে একমাত্র মিহির দেখতে পেয়েছিল রক্ত-মাংস থ্যাঁতলানো মুখে ভয়ানক দুটো সাদা চোখ প্ৰচণ্ড হিংস্রতায় চেয়ে আছে। দাঁতগুলো তার ভেঙেচুরে বেরিয়ে আছে। কিন্তু সেই লোকটা মুহূর্তের জন্য দেখা দিয়েই চোখের পলকে উধাও। ততক্ষণে সকলে হইহই করতে করতে ছুটে এসেছে। আত্রেয়ী সেন দাঁতে দাঁত চিপে বলে উঠল, ‘হোয়াট দ্য ফাক!’ তন্ময় দৌড়ে এসেই মিহিরকে মুখঝামটা দিতে শুরু করে দেয়। ‘এসব কী হচ্ছে? চ্যাংড়ামো পেয়েছ? আত্রেয়ী তুমি ঠিক আছো তো?’ বডিগার্ড এসে ম্যাডাম-ম্যাডাম করে কত কী বলছে। মিহির তখনও হাঁফাচ্ছে। ভীষণ জোরে জোরে নিশ্বাস নিচ্ছে। মিতালিকে ধরে আত্রেয়ী উঠে দাঁড়াল। মিহির তখনও ছাদের ওপর বসে সেই ভয়ানক লোকটাকে এপাশ-ওপাশ খোঁজার চেষ্টা করছে।
— হেইইই, ওঠো ওঠো। অনেক নাটক করেছ।
তন্ময় গায়ের জোরে টেনে তুলল মিহিরকে। সকলের সামনে মিহিরের জামার কলার ধরে গলা চড়িয়ে তন্ময় বলল, ‘টলিউডের এক নম্বর সুন্দরী নায়িকাকে খুব বুকে জড়াতে ইচ্ছে করেছিল না? চ্যানেলে জানাব নাকি?’
— তন্ময় লিভ ইট। মিহির এখন যাও তুমি।
আত্রেয়ীর কথার ওপর দিয়ে তন্ময় তেড়েফুঁড়ে উঠল, ‘আমি তোমায় সেদিনই বলেছিলাম ছেলেটার চোখদুটো ভালো না।’
— থামুন আপনি।
ধমকে উঠল মিহির। ‘তখন থেকে অনেক ফালতু কথা বলেছেন। আমি যদি দৌড়ে না আসতাম ওই লোকটা আত্রেয়ীকে ঠেলে ফেলে দিত। মেরে ফেলত।’ আকাশে কোনো মেঘ নেই। দিনমণি তার সব রংটুকু বিলোতে বিলোতে হারিয়ে যাচ্ছে। তবু রুফটপে প্রাণঘাতী এক বাজ পড়ল। সব্বাই চমকে উঠল। এ কী কথা বলছে মিহির?
— মেরে ফেলত? মানে?
অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল আত্রেয়ী।
— সব ঢপ। এখন শাক দিয়ে মাছ ঢাকছে।
তন্ময় ঝংকার দিয়ে বলল।
— না আত্রেয়ী, বিশ্বাস করুন। লোকটা আপনাকে ঠেলে ফেলে দেবে বলে আপনার পিঠের দিকে হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসছিল। আমি স্পষ্ট দেখেছি।
— কে লোক? কোন লোকের কথা বলছ বলো তো? আমার পেছনে তো কেউ ছিল না তুমি ছাড়া।
আত্রেয়ী পালটা প্রশ্ন করল।
— লোকটাকে ভয়ানক দেখতে। সাদা ফ্যাটফ্যাটে চোখ। থ্যাতলানো মুখ। গায়ে বোধহয় অফ হোয়াইট বা গ্রে শেডের টি শার্ট ছিল। কিন্তু সেটাতে অদ্ভুত ডিজাইন। মনে হল চাপ চাপ রক্ত শুকিয়ে জমাট বেঁধে আছে।
এবার আত্রেয়ীর বডিগার্ড বলে উঠল, ‘এসব কী গল্প বানাচ্ছেন? এরকম কেউ ছিল না ছাদে।’ মিহির জোর দিয়ে বলল, ‘একশোবার ছিল। আমি স্পষ্ট দেখেছি।’ মিতালি বলল, ‘কিন্তু আপনি যেরকম বর্ণনা দিচ্ছেন সেরকম কোনো মানুষ হয় না। ভূত-প্রেত হয়। এখানে তারা আছে বলে তো কলকাতা শহরে কেউ শোনেনি।’ আশেপাশে আরও নানান গুঞ্জন উঠল। বেশিরভাগটাই মিহিরকে অবিশ্বাস করে লোকে কমেন্ট পাস করতে থাকে। কিন্তু এবার একদম চুপ করে যায় আত্রেয়ী সেন আর তন্ময় হালদার। আত্রেয়ী বলে ওঠে, ‘তন্ময়, এখান থেকে চলো।’ অদ্ভুত দৃষ্টিতে মিহিরের দিকে তাকায় আত্রেয়ী। সেই দৃষ্টিতে সন্দেহ নাকি ভয়, ঠিক কোনটা ছিল মিহিরের বোধগম্য হল না। তন্ময় আর একটা কথাও বলল না। চুপচাপ আত্রেয়ীকে নিয়ে চলে গেল। সূর্য অস্ত গেল। অন্ধকার নেমে এল।
.
পকেটের মধ্যে ফোনটা কেঁপে উঠতেই সায়ন দেখল সূর্য ফোন করছে। বুকের কাছে কে একটা পিন ফুটিয়ে দিল তার। এবার কী সূর্যও কোনো খারাপ খবর দেবে! ‘আমি জাস্ট দু-মিনিটে আসছি এই ফোনটা রিসিভ করে।’ মিহির আলতো করে মাথা নাড়ল। কিন্তু নীলাম্বর মিহিরের হাতের কবজি ধরে চুপ করে বসে রইলেন। সায়ন বেরিয়ে গেল। করিডরে গিয়ে ফোনটা রিসিভ করল। ‘হ্যাঁ বলো সূর্য…। তাই, কী খবর? কী বলছ?’ সায়ন ফোনটা কানে নিয়ে অবাক হয়ে খুব ধীর গতিতে পায়চারি করতে থাকে। ‘তারপর? মানে কী কী বলল একটু শর্টে বলো।’ এরপর বর্ষার আকাশের মতো সায়নের মুখের পেশিগুলোর অভিব্যাক্তি বদলাতে থাকে। কোনো এক লক্ষ্যভেদের অভিপ্রায়ে তীক্ষ্ণ চোখদুটো করিডরের ফাঁকা দেয়ালের গায় স্থির হয়ে যায়। কিন্তু দৃষ্টি তার দেয়াল ফুঁড়ে দেখছে অন্য এক জায়গার ছবি, ভিন্ন এক ক্ষণের ছবি যেখানে সব কিছু ওলট-পালট হয়ে যাচ্ছে। খানিক বাদে কান থেকে ফোনটা নামিয়ে কী যেন ভাবে। তারপর সঙ্গে সঙ্গে সোমদত্তাকে ফোন করে বলে, ‘সোমদত্তা, এখুনি দুজনকে তুলতে হবে। থানায় এনে খাতির-যত্ন করো। আমি এদিকটা সেরে আসছি।’
