মৃত জ্যোৎস্নার রাত্রি – ৩৮
আটত্রিশ
— সেদিন রাত্রে আমার জ্বর চলে আসে। ওই বিচ্ছিরি মুখটা আমি কিছুতেই ভুলতে পারছিলাম না। কিছু খেতে গেলেই গা গুলিয়ে উঠছিল। আমি আর এই শুটিংটা করতেই চাইনি। আমার দমবন্ধ হয়ে আসছিল। মৃন্ময়ীর সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে ফেলছিলাম। মাঝেমাঝেই আমার শরীরটা খুব ভারী লাগত। খালি মনে হত সব কিছু ভেঙে গুঁড়িয়ে দিই। আবার পরক্ষণেই শান্ত হয়ে যেতাম।
.
সাধনচক্ষে দেখা দৃশ্যগুলোকে মিহিরের কথার সঙ্গে চোখ বুজে মিলিয়ে নিচ্ছিলেন নীলাম্বর। তিনি হয়তো স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলেন। আর পূর্বের ঘটনাগুলো যত দেখছিলেন ততই কেঁপে কেঁপে উঠছিলেন। মিহির নিজে হাতে এ কী সর্বনাশ করতে যাচ্ছে!
.
— শুনছওওওও, গামছাটা একটু দেবে?
ছোট্ট সোনাই ঘরের মধ্যে একটা পুরোনো মোবাইল ফোন নিয়ে খেলছে। নিজের মনেই কাল্পনিক কোনো মানুষের সঙ্গে সুখ-দুঃখের কথা বলে চলেছে। ঠিক ওর বাবা, মা যেমন করে ফোনে ঘুরতে ঘুরতে কথা বলে, ও ঠিক সেরকম করেই মুখের ভাবভঙ্গি করে কথা বলে চলেছে। ওদিকে বাথরুমের দরজা অল্প ফাঁক করে ডেকে চলেছে মৃন্ময়ী, ‘কী গো শুনছওওও, গামছাটা দাও না। নিতে ভুলে গেছি।’ এত ডাকাডাকি সত্ত্বেও মিহিরের কোনো সাড়া শব্দ নেই। অথচ সে বাড়িতে তার নিজের ঘরেই আছে। দরজার দিকে পিঠ করে বিছানায় বসে আছে।
— সোনাই, বাবাকে একটু ডাক না সোনা।
মায়ের মুখে নিজের নাম শুনে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল তিন বছরের সোনাই। গোল্লা গোল্লা চোখ পাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করল মা কী বলছে। মৃন্ময়ী আবার বলল, ‘সোনাই বাবাকে গিয়ে বল তো, মা তোমায় ডাকছে। যা যা শিগগির যা।’ মুখ থেকে কথাটা খসা মাত্র সোনাই ফিক করে হেসে ঘরের দিকে দৌড়োল। এক লাফে বিছানায় উঠে সোজা বাপের ঘাড়ে বেতালের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল। মিহির মুখ না-ফিরিয়েই শরীরটা দানবের মতো কাঁপিয়ে দিল। ছেলেটা ছিটকে খাটের ধারে গিয়ে পড়ল। আর-একটু হলেই খাটের কোনায় মাথাটা লাগছিল। ভালো মানুষ শান্ত বাবার হঠাৎ এমন আচরণে প্রথম চোটে একটু থমকে গেল সোনাই। কিন্তু শরীরে তারও তিন বছরের ছুটন্ত দামাল রক্ত। এত সহজে সে বাপকে ছাড়বে না। ওদিকে মৃন্ময়ী ডেকেই সারা। সোনাই আবার ঝাঁপিয়ে পড়ল মিহিরের ঘাড়ে। হইহই করতে করতে দু-বার দুলেও নিল। তারপরেই আবার একটা মোক্ষম ঝটকা। এবার আর বিছানায় নয়, কচি কচি হাত-পাগুলো নিয়ে সোনাই একেবারে মেঝের ওপর আছড়ে পড়ল। হাতে আর হাঁটুতে ব্যথা পেয়ে কেঁদে উঠল। তীক্ষ্ণ গলার কান্না শুনে বাথরুম থেকেই মৃন্ময়ী চিৎকার করল, ‘এই কী হল? পড়লি নাকি?’ সোনাই বুকফাটা কান্নায় কান ঝালাপালা করে দিচ্ছে মিহিরের। রাগে গরগর করছে মিহির। অদ্ভুত একটা গোঙানির শব্দ গলা ফুঁড়ে উঠে আসছে তার। সে দু-পাশে মাথা ঝাঁকাচ্ছে। বাচ্চার কান্নার শব্দটা কিছুতেই সহ্য করতে পারছে না সে। কিন্তু সোনাই মাটিতে বসেই হাউহাউ করে কেঁদে চলেছে। মুখ নীচু করে বসে এতক্ষণ মাথা ঝাঁকাচ্ছিল মিহির। কারও আদর না পেয়ে তীব্র অভিমানে সোনাই গলা চিরে চিৎকার করে কাঁদতে থাকে। টকটকে লাল চোখ তুলে ঝড়ের বেগে সোনাইয়ের দিকে ঘুরে তাকায় মিহির। সোনাইয়ের জলে ভেজা চোখের পলক পড়ার আগেই তাকে টুটি টিপে ওপরের দিকে তুলে ধরে সে। মিহিরের দাঁতগুলো হিংস্র জন্তুর মতো ঠোঁটের বাইরে বেরিয়ে আসে। গলার কাছের শিরাগুলো প্রচণ্ড আক্রোশে ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে। বাবার শক্ত আঙুলগুলো কচি ছেলেটার গলার মধ্যে বসে যাবার উপক্রম। সোনাইয়ের চোখদুটো যন্ত্রণায় বেরিয়ে আসছে। পাদুটো শূন্যে ছটফট করছে। ঠিক তখনই গলা ফাটানো আর্তনাদ করে বাঘিনীর মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে মৃন্ময়ী। ‘কী করছ তুমি? ছেড়ে দাও সোনাইকে।’ এক ঝটকায় সোনাইকে ছাড়িয়ে নিতে যায় মৃন্ময়ী। কিন্তু পারে না। মিহির একভাবে ঘাতকের রক্তাভ চোখে সোনাইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। মৃন্ময়ীর গলায় যত জোর ছিল, গায়ের যত শক্তি ছিল সবটুকুকে এক করে বাঁ-হাতে জাপটে ধরে সোনাইকে আর ডান হাত দিয়ে প্রচণ্ড জোরে ঠেলা মারে মিহিরকে। হাত ফসকে সোনাই তার মায়ের কোলে চলে আসে। মৃন্ময়ীর ধাক্কায় মিহির বিছানার ওপর হেলে পড়ে। ব্যথায়, আতঙ্কে, ভয়ে ফুলে ফুলে কাঁদছে সোনাই। মৃন্ময়ী চিৎকার করে ধমকে ওঠে, ‘তুমি কী জানোয়ার হয়ে গেলে? নিজের ছেলেকে তুমি… মুখ থেকে আর পরের শব্দগুলো বেরোল না। মৃন্ময়ী দেখল, মিহিরের চোখের মণিদুটো অর্ধেকটা ওপরের দিকে উঠে আছে। সাদা অংশটা লাল। রাতের অন্ধকারে ওঁত পেতে বসে থাকা ধূর্ত শৃগালের মতো লাগছে মিহিরকে। ও হাঁফাচ্ছে। যেন এক্ষুনি নখ-দাঁত বের করে ঝাঁপিয়ে পড়বে। ছেলেকে কোলে নিয়েই টেবিল থেকে জলের জগটা তুলে ঘরের দিকে ঘুরতেই দেখে মিহির প্রচণ্ড মূর্তি নিয়ে তেড়ে আসছে। সময় নষ্ট না করেই এক জগ জল মিহিরের মুখে ছুঁড়ে মারে। আচমকা ধেয়ে আসা জলের তোড়ে কয়েক পা পেছন দিকে ছিটকে যায় মিহির। তারপরেই দেয়াল ধরে মাটিতে ধপ করে বসে পড়ে। মায়ের কাঁধে মুখ রেখে সোনাইয়ের কান্না তখনও অব্যাহত।
.
— এরপর কী তোমার মনে ছিল, তুমি ঠিক কী কী করেছিলে?
প্রশ্নটা সায়ন করল। মিহির দু-পাশে না-সূচক মাথা নাড়াল। বলল, ‘আমি কিছুক্ষণের জন্য অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম। তারপর যখন জ্ঞান ফিরল মৃন্ময়ী আমায় সবটা বলল। আমি… আমার তখন ইচ্ছে করছিল সোনাইকে দু-হাতে জাপটে ধরি। ভীষণ আদর করি। করতে গেলামও। কিন্তু ছেলে এতই ভয় পেয়েছে যে আমার কাছে এলই না। মৃন্ময়ী বলল একটু সময় দিতে। এই ট্রমাটা ভুলতে সোনাইয়ের একটু সময় লাগবে। এরপর থেকে খেয়াল করছিলাম মৃন্ময়ীও আমায় ঠিক ভরসা করতে পারছিল না। ছেলেকে আমার কাছে ছেড়ে কোত্থাও যাচ্ছিল না। পূর্ণিমাদি ছিল এই রক্ষে।’ এই কথাগুলো বলে একটু দম নিল মিহির। এই ফাঁকে সায়নের মোবাইলটা আবারও একটু ভাইব্রেট করল। হোয়াটস্যাপে টাইপ করল সায়ন, ‘Medical test must l’
.
বেল বাজতেই দরজা খুলল সুরভি। ঘাম মুছতে মুছতে বাইরে থেকে ঘরে ঢুকল বন্দনা। ‘কী রে? কতবার ফোন করলাম তোকে। কোথায় ছিলিস? জলখাবারটাও খেলি না।’ উত্তর না দিয়েই বন্দনা ঘরে ঢুকে গেল। কাঁধ থেকে চামড়ার ব্যাগটা বিছানায় নামিয়ে রেখে ধপ করে বসে পড়ল। সুরভি ঘরে এসে পাখাটা চালিয়ে দিল। ‘কী রে কোথায় গেছিলি বল।’
— ব্যাংকে।
—কেন?
চামড়ার ব্যাগটা কোলের কাছে টেনে চারটে লাল রঙের গয়নার বাক্স আর একটা কাপড়ের থলে বের করল। সেই থলেটা উপুড় করতেই কয়েকটা সোনার গয়না বিছানার ওপর ছড়িয়ে পড়ল। সুরভি চমকে উঠল। ‘এ কী করেছিস? এসব এনেছিস কেন, অ্যাঁ?’
— এর কত হয় দেখি। বাকি আমার জমানো কিছু আর ফিক্সড ডিপোজিটগুলো থেকে যা হবে তাতে তোমার বাইপাস সার্জারিটা আশা করছি হয়ে যাবে।
ছটফট করে উঠল সুরভি। গলা চেপে চোখ বড়ো করে সুরভি বলল, তুই কী পাগল হলি বাণী? স্থাবর-অস্থাবর যেটুকু আছে সব বেচেবুচে আমি বেঁচে থাকব?’
— আর উপায় নেই মা। আমি ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলেছি। এখন না হলে অনেক দেরি হয়ে যাবে।
— বাণী এগুলো আমি আর তোর বাবা অনেক কষ্ট করে করেছি। শুধু তোর একটা ভালো বিয়ে দেব বলে। ভোর বাবা কী বলত মনে নেই?
— বাবা তো নিজে চলে গেছে। এখন বাবার কথা ধরে বসে থাকতে হলে তোমাকেও হারাব। আমার আর কে আছে বলো তো? জন্ম থেকেই তো সব খুইয়ে বসে আছি। এসব আমার কিচ্ছু কাজে লাগবে না। আগে তুমি সুস্থ হও। তা ছাড়া আমিও তো রোজগার করব। বসে তো আর থাকব না।
আর-একটা কথাও না বাড়িয়ে সুরভি চটপট গয়নাগুলোকে ব্যাগের মধ্যে পুরতে থাকে। গম্ভীর হয়ে বলে, ‘আমারই ভুল। লকারে তোর নামটা ঢোকানো আমার উচিত হয়নি।’
— পাগলামি কোরো না মা।
— পাগলামি তুই করছিস। এইভাবে বেঁচে থাকার চেয়ে আমার মরে যাওয়াও ঢের ভালো।
কলিং বেলটা আবার বেজে উঠল। সুরভি একটু থমকাল। তারপর বলল, ‘এগুলো আমি তুলে রাখছি। একদম হাত দিবি না।’ আবার বেল বাজল। ‘যা গিয়ে দরজা খুলে দেখ কে এল!’ সুরভি বিছানা ছেড়ে উঠে আলমারির চাবিটা নিল। বন্দনা কড়া গলায় বলল, ‘ওগুলো আমি বেচব মা। তোমার বাইপাস সার্জারিটা আমি করাবই।’ বেলটা এবার ঝনঝন করে বেজে উঠল। সুরভি মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। একগুঁয়ে মন্তব্যটা করে বন্দনা ঘরের বাইরে চলে গেল। সুরভি জানে, মেয়ে যেটা জেদ ধরে সেটা করেই ছাড়ে। কপর্দকশূন্য হবার ভয়টা বুকের ওপর চেপে বসে সুরভির।
.
দরজায় লাগানো আইহোলে চোখ রাখল বন্দনা। ভ্রূ দুটো কুঁচকে গেল। আইহোল থেকে চোখ সরিয়ে নিল। মুহূর্তে শুকিয়ে গেল মুখটা। এবার বেলটা পরপর দু-বার বাজল। বাধ্য হয়ে দরজা খুলল বন্দনা। সোমদত্তা চারজন মহিলা কনস্টেবল নিয়ে দাঁড়িয়ে। সিঁড়িতে আরও তিনজন পুরুষ কনস্টেবল।
— কী ব্যাপার? আবার আপনারা কেন?
সোমদত্তা বলল, ‘সুরভি দত্তকে ডেকে দিন।’ বন্দনা যেন আকাশ থেকে পড়ল। ‘মা! মা-কে কেন?’ বন্দনার আমন্ত্রণের তোয়াক্কা না করেই কনস্টেবলদের নিয়ে ঘরে ঢুকে এল সোমদত্তা। ‘কী হল, কী ব্যাপার আমি তো কিছু বুঝতে পারছি না। ঘর থেকে মেয়ের গলা পেয়ে বেরিয়ে এল সুরভি, ‘কে এসেছে রে বাণী?’ কথাটা শেষ করতেই সোমদত্তা এবং তার টিমকে দেখতে পায় সুরভি। বুকের ভেতর ধক করে ওঠে। বলে, ‘আপনারা, আবার কেন? কী করেছে বাণী?’
— এবার শুধু বাণী নয় সুরভি দেবী। আপনাকেও আমাদের সঙ্গে থানায় যেতে হবে।
বন্দনা চিৎকার করে ওঠে, ইয়ার্কি পেয়েছেন নাকি আপনারা? একজন অসুস্থ মানুষকে আপনারা থানায় নিয়ে যাবেন? কেন? মা কী করেছে?’
— আমাদের সঙ্গে ডক্টর আছেন।
— থাকুক। তাহলেও মা যাবে না। এইভাবে যখন তখন যাকে-তাকে তুলে আনা যায় না।
সোমদত্তা মাথা গরম করে না। শুধু একটা নাম বলে সুরভির দিকে তাকিয়ে, শান্তিলতা নবজীবন আশ্রম।’ নামটা ঘরের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ামাত্রই সুরভির চোখ-মুখ পালটে যায়। শাড়ির আঁচলটা পেটের কাছে এনে খামচে ধরে থাকে। গলার নলিটা ওপর থেকে নীচে একবার নড়ে ওঠে। সোমদত্তা বুঝতে পারে অনেক গোপন রহস্যের উষ্ণস্রোত নেমে গেল সুরভির গলা দিয়ে। মাটির দিকে তাকিয়ে বন্দনা চুপ করে দাঁড়িয়ে। চোখের কোলটা তার ছলছল করছে। ছলছলে চোখদুটো তুলে একবার মায়ের দিকে চায় সে। জলে ঝাপসা হয়ে আসা চোখ তুলে সুরভিও তাকায় মেয়ের দিকে।
.
প্রায় একশো বছরের বাড়িটাকে ঘিরে অনুরণিত হচ্ছে রবিঠাকুরের গান, ‘আমি তোমার প্রেমে হব সবার কলঙ্কভাগী।’ সুবিমলের হাতে মুঠো করা লাল আবির গান গাইতে গাইতে আলোকপর্ণা মেখে নিচ্ছে নিজের দুই গালে। প্রেমিকা তাকে স্বীকার করেছে দোলের দিনে। তাই সুবিমলের আনন্দের সীমা নেই। কিন্তু তাকে তরুণ কিশোরের মতো উচ্ছ্বল হলে চলবে না। বজায় রাখতে হবে গাম্ভীর্য। কিন্তু সুবিমল ভীষণ খুশিতে হাসছে। ক্যামেরা হাফ রাউন্ড ট্রলিতে ঘুরছিল আত্রেয়ী আর সুবিমল চরিত্রের অভিনেতাকে ঘিরে। হঠাৎ মিহির চিৎকার করে উঠল মনিটরের সামনে থেকে, ‘কাট কাট কাট।’ মুখে এক রাশ বিরক্তি নিয়ে ক্যামেরা থামাল তন্ময়। গলা তুলে মিহিরের উদ্দেশ্যে বলল, ‘প্রবলেমটা কী ছিল? আত্রেয়ী তো দুর্দান্ত শট দিচ্ছিল।’
— দৃশ্যটা দুজনের। তাই দুজনকেই সমান ভালো হতে হবে।
তন্ময়কে উত্তরটা দিয়েই মাইকে সুবিমলের উদ্দেশ্যে মিহির বলল, ‘সুবিমল…’
— ইয়েস স্যার।
— তুমি অত দাঁত বের করে হাসবে না।
— ওকে।
মাথায় রাখবে তোমারও বয়স হয়েছে। তাই কিশোরের মতো উচ্ছ্বলতা তোমার মধ্যে থাকবে না। কিন্তু তুমি খুশি। সেটা তোমার মুখে হালকা হাসি আর গাম্ভীর্য দিয়ে প্রকাশ করবে।
— ওকে স্যার।
— আর-একবার যাব।
এবার আত্রেয়ী গলা তুলে বলল, ‘সময় লাগবে। আমার গাল থেকে আবির সরাতে হবে।’ উত্তর দিল মিহির, ‘ওকে ওকে। মেকআপ একটু তাড়াতাড়ি।’
তন্ময় বিড়বিড় করে বলল, ‘ইঁঃ! সত্যজিৎ রায়!’ ক্যামেরা অ্যাসিস্ট্যান্ট ফিক করে হাসল।
.
শ্যুট শুরু হল। হাফ রাউন্ড ট্রলি শট সমেত আরও কয়েকটা শট ভালোভাবেই উতরে গেল। কিন্তু আবারও গোল বাঁধল ক্লোজ শটে এসে। মিহির চায় আত্রেয়ীর ডান প্রোফাইল থেকে ক্যামেরা সামনে আসবে। কিন্তু তন্ময়ের এক গোঁ, শটটা ঠিক এর উলটো হওয়া উচিত কারণ আত্রেয়ীর ডানদিকের ফেসের চেয়ে বাঁ-দিকের ফেস অনেক বেশি ভালো। আত্রেয়ী প্রথমে চুপ ছিল। কিন্তু যখন দেখল মিহির কোনোভাবেই তন্ময়ের কথা মানছে না তখন সে নিজে হাল ধরল। বলল, ‘মিহির, তন্ময় যে শটটা বলছে সেটা যদি না হয় তাহলে এটা নিয়োই না। পরের শটে যাই চলো।’ মিহির মুখের ওপর জানিয়ে দেয় সেটা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কারণ এই শট না হলে এডিটে অসুবিধে হবে। আর তন্ময়ের বলা শট নিলে সেখানে কন্টিনিউটি জার্ক হবে।
— কিন্তু তাই বলে তো আত্রেয়ী সেনকে দেখতে খারাপ লাগতে পারে না। অন্য কোনোভাবে ম্যানেজ করো।
কথাটা আত্রেয়ী নয়, তন্ময় বলল। আত্রেয়ী বলল, ‘আমি আর এই গরমে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি না। তোমরা ডিসাইড করো কী করবে। তারপর আমায় ডেকো। এই মিতালিইইই, আমার জুসটা দে।’
— না আত্রেয়ী।
মিহির বাধা দিল। আত্রেয়ী দাঁড়াল। ‘আমাদের হাতে সময় নেই। উলটোদিকের শটেই যাওয়া হোক।’ মিহির মুখ গোমড়া করে মনিটরের পাশে এসে বসে পড়ল। দাঁতে দাঁত চিপে পরপর দুটো শট নিল মিহির। শরীরের ভেতর কেমন একটা অস্বস্তি শুরু হয়েছে তার। আসলে একটা শুটিঙে এসে ক্যামেরাম্যান যদি ডিরেক্টরের বিপরীতে হাঁটে তাহলে সেই কাজটা করা ভয়ানক বিরক্তিকর পর্যায় গিয়ে পড়ে। ‘মিহিরদা এবার লো অ্যাঙ্গেল শট তো?’ ক্যামেরা অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রশ্ন করল।
— হ্যাঁ। ফ্রেমে যেন পিছনের বাড়িটাকে পাই।
— ওকে দাদা।
পাঁচ মিনিটে শট রেডি। মিহির ফ্রেম দেখে নিয়েছে। আত্রেয়ী সুবিমলকে ক্রস করে এগিয়ে আসবে বদমাইশ লোকগুলোর দিকে। মিহির মাইকে বলল, ‘রোল ক্যামেরা।’ ক্যামেরার দিক থেকে উত্তর এল, ‘রোলিং।’ মিহির বলল, ‘স্টার্ট সাউন্ড।’
— রোলিং।
মিহির বলল, ‘অ্যান্ড অ্যাকশন।’ আত্রেয়ী ফুল এফোর্ট দিয়ে সুবিমলকে ক্রস করে এগিয়ে আসার জন্য তৈরি। সঙ্গে সঙ্গে মিহিরই চিৎকার করে উঠল, ‘কাট কাট কাট, এই ওপরে কে দাঁড়িয়ে? দেখতে পাচ্ছ না শট চলছে। যাত্রা দেখছ নাকি? সরে যাও।’ রীতিমতো খেপে গিয়ে সব ক্ষোভ হঠাৎ দেখা আগন্তুকের ওপর উগরে দিল। সবাই দেখল তন্ময় দোতলার কোণের ঘরের দিকে তাকিয়ে। এক শেয়াল ডাকলেই সব শেয়াল ডেকে ওঠার মতো কোনো কিছু না দেখেই হুজুগে সব হইহই করে উঠল ‘সরো সরো’ বলে। সবাই ওপরের দিকে তাকাল। কিন্তু কেউই কাউকে দেখতে পেল না। তন্ময় জিজ্ঞেস করল, ‘এই মিহির, কোথায় কে?’ ‘শটটা চালিয়ে দ্যাখো। ওই ওপরে একজন দাঁড়িয়ে ছিল।’ শট প্লে হল। সেখানেও কোথাও কেউ নেই। ভালো করে দেখার জন্য আবার চালানো হল। কিন্তু সেই একই দৃশ্য, ওপরের বারান্দার কোনে কেউ নেই। মিহির উত্তেজিত হয়ে বলে উঠল, ‘আমি স্পষ্ট দেখলাম ওখানে কেউ একজন দাঁড়িয়ে। এই মনিটরেই দেখলাম।’
— তাহলে তো শটেও থাকার কথা ভায়া। কোথায়?
মিহিরের ঘাড়-মাথা ব্যথা করছে। ঘামে ভেজা চুলের মধ্যে একবার হাত চালিয়ে দিল মিহির। সময় বুঝে তন্ময় একটু চিমটি কাটল, ‘হয় হয়। প্রথমবার ডিরেকশন দিলে চোখে অমন সর্ষে ফুল সবাই দেখে। নাও নাও চলো।’ বেশ কিছু লোক খ্যাকখ্যাক করে হাসল। একেই ভ্যাপসা গরম। তার ওপর সকাল থেকে কোনো কিছুই নিজের হাতে থাকছে না। প্রতিটা পদক্ষেপে তন্ময়ের এক্সপার্ট কমেন্ট আর আত্রেয়ীকে তেল দিয়ে চলা। তার পরেও অযথা অপমান আর নিতে পারছে না। মিহিরের মাথায় আগুন জ্বলে ওঠে। অনেক কষ্টে নিজেকে সংবরণ করে রাখল সে। মিহির এবার তীক্ষ্ণ নজরে মনিটরের দিকে চেয়ে বলে উঠল, ‘অ্যান্ড অ্যাকশান। শট শুরু হল। আত্রেয়ী তেড়েফুঁড়ে এগিয়ে এল। যা সংলাপ বলার সেটাও বেশ চড়া দাগে বলল। মিহির নিজেই দু-পাশে মাথা নেড়ে বিড়বিড় করল, ‘না না, এত চড়া নয়।’ হঠাৎ ক্যামেরার সামনে দিয়ে একটি লোক দৌড়ে চলে গেল। ‘কাট কাট কাট’ চিৎকার করে উঠল মিহির। তন্ময় এবার বিরক্ত হয়ে রেগে বলে উঠল, ‘আরে হচ্ছেটা কী বস? শটটা তো দারুণ ছিল।’ মিহিরও তড়পে উঠল, শট ভালো মানে? লেন্সের সামনে দিয়ে একটা লোক দৌড়ে চলে গেল শটের মাঝখান থেকে দেখতে পেলেন না?’ ক্যামেরা ছেড়ে তন্ময় এগিয়ে এল, ‘তোমার মাথা কি পুরো গেছে? এ ভাই কার পাল্লায় পড়েছি আজ। কে গেল? কেউ নেই। আমি তো ক্যামেরার সামনে বসে। আমার সামনে আত্রেয়ী আর শুভায়ু শট দিচ্ছে। এর মধ্যে থার্ড পার্সন আসছে কোথা থেকে?’
— আপনি শটটা প্লে করুন। নিজেরাই দেখতে পাবেন।
তন্ময় অ্যাসিস্ট্যান্টকে হুকুম ছুড়ে দিল শট চালাবার। প্রোডাকশন হাউসের অমিতাভ মল্লিক মিহিরের কানের কাছে এসে বলল, ‘ও ভাই, কে গেল? আমিও তো কাউকে দেখলাম না। তোমার সঙ্গে আমিও তো মনিটর দেখছিলাম।’
— আপনাদের চোখে কেউ পড়ল না?
— না তো।
শট চালানো হল। কিন্তু এবারেও ক্যামেরা কাউকে ধরতে পারেনি। আত্রেয়ী এবার বেশ খেপে গেছে। রাগে গরগর করতে করতে বলে উঠল, মিতালিইই, আমি আর পারছি না। আমার জুসটা দিয়ে যা।’ বলে বেশ খানিকটা দূরে ছাতার তলায় একটা চেয়ার পাতা ছিল, সেখানে গিয়ে বসল। মিতালি কারুকাজ করা একটা বোতলে করে জুস এনে দিল। আত্রেয়ী খেঁকিয়ে উঠল, ‘এ কী? আমার ক্রিস্টালের গ্লাস কোথায়? বোতলে এনেছিস কেন?’ মিতালি কাঁচুমাচু মুখ করে বলল, ‘এখুনি আনছি ম্যাডাম।’
— থাক। অনেক করেছিস।
মিতালির হাত থেকে বোতলটা কেড়ে নিয়ে ঢক করে খানিকটা জুস মুখে ঢেলে দিল। ওপাশ থেকে মিহির বলল, ‘আত্রেয়ী আর-একবার যাব।’
— মিতালি, ওকে বলে দে আমার দশ মিনিট টাইম লাগবে।
মালকিনের কড়া হুকুম। শব্দগুলো হুবহু রিপিট করল মিতালি। তন্ময় সবাইকে শুনিয়ে বেশ জোরেই বলল, শটটা কিন্তু এক্কেবারে শেষে এসে কাট হয়েছিল শুধু শেষের ডায়লগটা নিলেই এনাফ।’
— না। পুরোটাই যাব।
মিহির বলল। আত্রেয়ী জানতে চাইল, ‘কেন শটে কী প্রবলেম আছে?’
— তুমি অনেক বেশি হাইপার ছিলে। দেখে মনে হচ্ছিল দুর্গা যুদ্ধে যাচ্ছে।
মুখের ওপর আত্রেয়ী বলল, ‘হ্যাঁ সেটাই তো হবে মিহির। আমার বাড়ি থেকে আমায় তাড়াতে এসেছে তাদের আমি এভাবেই বলব, সেটাই স্বাভাবিক।’
— আমি আসছি দাঁড়াও।
মাইকে এত কথা বলাটা ঠিক নয়। তাই মিহির আত্রেয়ীর সামনে এসে বলল, ‘দেখো আলোকপর্ণা এমন একজন মেয়ে যে ভীষণ ইন্ট্রোভার্ট। কোনোদিন বাড়ির চাকরের সঙ্গেও চড়া গলায় কথা বলেনি। সে প্রথম চোটেই এত হাইপার কক্ষনো হবে না। আলোকপর্ণার তেজ ওর গাম্ভীর্য। সে যদি সামনে এসে দাঁতে দাঁত চিপে কথাগুলো বলে সেটা অনেক বেশি পাওয়ারফুল হবে।’
আত্রেয়ী চেয়ারে বসেই বলল, ‘এটা ভুল কথা মিহির। যে কোনোদিনও চিৎকার করে কথাই বলেনি সে যদি হঠাৎ করে বুক ফাটিয়ে প্রতিবাদ করে তাহলেই মানুষের ভালো লাগবে। তা ছাড়া এটা তো আর্ট ফিল্ম নয়। একটা সিরিয়ালের প্রোমো। সেখানে যদি একটু তেজ না থাকে তাহলে তো বিচ্ছিরি লাগবে।
— হ্যাটস অফ ম্যাডাম। একেই বলে অভিনেত্রী। কী করে যে এত গভীরে যেতে পারো বুঝি না বাবা।
অযাচিতভাবেই কথাগুলো বলতে বলতে এগিয়ে এল তন্ময়। মিহির চোখটা ঘুরিয়েই রাখল। তন্ময়ের মুখটাও দেখতে ইচ্ছে করছে না তার। মিহিরের কাঁধে একটা চাপ্পড় মেরে তন্ময় বলল, ‘ভাই, সুযোগ পেয়েছ শিখে নাও। একদম ঠিক কথা বলেছে আত্রেয়ী।’ তন্ময়কে কোনো উত্তরই দিল না। আত্রেয়ীকে বলল মিহির, আত্রেয়ী, একটু টোন ডাউন করো। অত চড়া সংলাপ ভালো লাগছে না।’
— মিহির, ইন্ডাস্ট্রিতে না আমার বাইশটা বছর হয়ে গেল। তোমার চেয়ে ঢের বেশি অভিজ্ঞতা আমার। শুধু বিনোদিনী নয়, অজস্র চরিত্রে প্রাণ-প্রতিষ্ঠা করেছি আমি। সেটা প্লিজ ভুলে যেয়ো না।
হতে পারে আত্রেয়ী। বাট আমি যখন ডিরেক্টর তখন একজন অভিনেত্রীর কর্তব্যের মধ্যে পড়ে তার কথাটা শোনা।
— হাউ ডেয়ার ইউ? আমার কী করা উচিত সেটা এখন তুমি আমায় শেখাবে?
— ভুল বুঝছ আমায়। আমি শুধু বলেছি ডায়লগটা আর-একটু টোন ডাউন করে বলো। কারণ সেটাই স্ক্রিপ্ট ডিমান্ড করছে।
মিতালির হাতে জুসের বোতলটা ধরিয়ে বিদ্যুতের মতো উঠে দাঁড়ায় আত্রেয়ী। কড়া সুরে বলে, ‘স্ক্রিপ্টটা আমিও পড়েছি মিহির। সেখানে এই প্রতিবাদটাই চাই। নইলে আলোকপর্ণার ক্যারেক্টারটাই ভেজা ন্যাতার মতো হয়ে যাবে। আর ওই ভ্যাদভ্যাদে চরিত্র আমি করব না।’
— বুঝলাম না, শুটিংয়ে এসে করব না মানে?
— করব না মানে করব না। আমি যেভাবে বলছি সেটাই হবে। তন্ময় প্লিজ বোঝাও। আমি ঘরে যাচ্ছি।
— এক সেকেন্ড ম্যাডাম।
গলাটা চড়ে গেল মিহিরের। দূরে যারা দাঁড়িয়েছিল এখন তাদের পর্যন্ত এই উত্তপ্ত বাদানুবাদের আঁচ পৌঁছে গেছে। অমিতাভ মল্লিক কী হল আবার’ বলে মিহিরের দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। মিহির আত্রেয়ীকে বলল, ‘ডিরেক্টর আমি। তন্ময় হালদার নয়। উনি আপনার বন্ধু বলে ওঁকে অনেক সহ্য করেছি। উনি এখানে আর-একটাও কথা বলবেন না।’
তন্ময় চোখ বিস্ফারিত করে বলে, ‘সাহস দ্যাখো আত্রেয়ী, আমায় অপমান করছে।’
— এ মিস্টার আপনি যান তো এখান থেকে। আমি তো আত্রেয়ীর সঙ্গে কথা বলছিলাম। আপনি মাঝখান থেকে কেন কথা বলতে শুরু করলেন?
আত্রেয়ী গলা তুলে ডাকে, ‘অমিতাভ, এদিকে এসো।’ অমিতাভ প্রায় এসেই পড়েছিল। আত্রেয়ীর ডাক শুনে আরও একটু পা চালিয়ে এল। আত্রেয়ী বলল, ‘তোমরা আত্রেয়ী সেনকে কেন নিয়েছ? যে-কোনো পাতি আর্টিস্টকে তো নিতে পারতে।’ আমতা-আমতা করে অমিতাভ বলে, ‘না মানে আসলে এটা তো চ্যানেলের ডিসিশন।’
— তাহলে চ্যানেলকে জানিয়ে দাও আত্রেয়ী সেন কোনো নবাগত পরিচালকের হাতের পুতুল নয় যে, সে ভুলভাল যা বলবে সেটা মেনেই সে কাজ করবে। এই প্রোমো আমি করব না। সরি। মিতালি চলো।
— এই এই, আত্রেয়ী প্লিজ।
আত্রেয়ী আর কারও কথাই শুনল না। পিএ-কে নিয়ে সোজা ঘরের দিকে হাঁটা দিল। ‘মিহির আত্রেয়ীকে আটকাও। প্রোমোটা না হলে পঁচিশ লক্ষ টাকা পুরো নষ্ট।’
— সরি অমিতাভদা, আমি আত্রেয়ী সেনের পোষা তাঁবেদার নই যে, যা বলবে আমি তাই করব।
খানিক তফাতে দাঁড়িয়ে থাকা তন্ময়ের গায়ে বেশ বড়ো বড়ো ফোসকা পড়ল। রাগে কোমরের পাশে ঝুলিয়ে রাখা হাতটা মুঠো করে নেয়। ‘হতেই পারেন আত্রেয়ী সেন অনেক বড়ো অভিনেত্রী। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, উনি ভুল বললেও সেটা মানতে হবে। এরপর প্রোমোটা যদি অ্যাপ্রুভ না হয় তখন তো দায়টা আমার ঘাড়েই আসবে। আপনি ওঁকে নিয়ে আসুন। আমি ওয়েট করছি।’
.
আত্রেয়ী রাজি হল না। শুটিং বন্ধ হল। চ্যানেলে খবর গেল। প্রোগ্রামিং হেড ফোন করে জানাল, আত্রেয়ী যা বলছে, যেমন করতে চাইছে তেমনটাই যেন হয়। পরাজয়ের গ্লানি মস্তকে ধারণ করে বিকেলের দিকে শুরু হল কাজ। পুরোটাই ডে লাইটে আউটডোর শুট। তাই সম্পূর্ণ করা গেল না। পরের দিন ভোর থেকে আবার শুট শুরু হবে তেমনটাই ঠিক হল।
— তারপর? রাতে কী হল?
সায়নের প্রশ্নে মিহিরের ঘোর কাটল। একটু ভেবে মিহির বলল, ‘সারা সন্ধে আমি আর ঘর থেকে বেরোইনি। দোতলায় বারান্দার কোণের ঘরটা ছিল আমার। আমি খেতে যাইনি দেখে রাতে বৃষভানু নিজে আমার ঘরে খাবার পৌঁছে দেয়। খেয়ে-দেয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। তারপর অনেক রাতের দিকে আমার ঘুম ভাঙে। তবে কখন যে আমি বিছানা ছেড়ে উঠি আমার মনে নেই। যত দূর মনে পড়ছে, তন্ময়, হ্যাঁ তন্ময়ই আমার ঘরে এসেছিল। আমিও তখন বেরোচ্ছিলাম বোধহয়। এখন ঠিক মনে নেই।’
— তুমি বেরোচ্ছিলে কেন? কিছু শুনেছিলে?
— হ্যাঁ। একটা হইচই। মনে হচ্ছিল বাইরে কিছু যেন হয়েছে। গিয়ে দেখলাম সেই ভয়ানক দৃশ্য। উফফফ।
কিছুক্ষণ চোখ বুজে সেদিনের সেই ভয়ংকরতাকে ভোলার চেষ্টা করে মিহির। তারপর বলে, ‘তখনও বুঝিনি, এর চেয়েও ভয়াবহ একটা জিনিস আমার জন্য অপেক্ষা করছিল।’
— কী জিনিস?
সায়ন কানটাকে আর-একটু মিহিরের মুখের দিকে বাড়িয়ে নিয়ে গেল। মিহির ধরা গলায় বলল, ‘মানুষের চোখ। অবিশ্বাস, সন্দেহে ভরা চোখগুলো সব আমার দিকে ছিল। পুলিশের কাছে একজনও বলল না আমি এ-কাজ করতে পারি না। নিজেরই অজান্তে আমি খুনি হয়ে গেলাম। কতবার বললাম, এ-কাজ আমি করিনি। তন্ময়, অমিতাভ সবাই নাকি আমায় দেখেছে সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসতে। এমনকি বৃষভানুও। কিন্তু কীভাবে? আমি তো যাইনি।’ এতক্ষণ বাদে নীলাম্বর মিহিরের কবজি ছেড়ে দেন। চোখ খোলেন। ইশারায় সায়নকে বলেন মোবাইলের রেকর্ডিংটা অফ করতে। সায়ন অফ করে। নীলাম্বর বলেন, ‘মিহির, তোমার আড়ালেই তোমাকে নিয়ে রহস্যের জাল বোনা হয়েছে। যা তুমি নিজেও জানো না। অন্য কেউ তোমাকে দিয়ে তার ইষ্ট সাধন করিয়েছে।’
— কে সে?
নীলাম্বর সায়নের দিকে তাকালেন। তারপর বললেন, ‘সেটা এখনও প্রমাণসাপেক্ষ তবে এখন আমি একটা কাজ করব যেটা করা আইসিসিইউতে উচিত নয়। কিন্তু আমায় করতেই হবে।’ সায়ন আর মিহির দুজনেই অবাক। নীলাম্বর পকেট থেকে একটা লাল সুতোয় বাঁধা মাদুলি বের করেন। মিহিরের ডানহাতের বাহুমূলে বেঁধে দেন। মাদুলির দিক থেকে চোখ তুলে মিহির নীলাম্বরকে জিজ্ঞেস করে, ‘সে কি কোনো অশরীরী নীলাম্বরবাবু?’ নীলাম্বর হাসেন। বলেন, ‘সে যেই হোক। কালভৈরবের মন্ত্রপূত চণ্ডাল করোটির ভস্ম তোমাকে রক্ষা করবে। কেউ তোমায় স্পর্শ করতে পারবে না। নিশ্চিন্ত থাকো। আমরা আসি এখন।’ মিহিরের দুটো চোখ বড্ড করুণ লাগল সায়নের। মিহিরের হাতটাকে শক্ত করে ধরে সায়ন বলল, ‘এত টেনশন কেন করছ? আমরা তোমায় বাড়ি নিয়ে যাব।’
.
করিডরে বেরিয়ে নীলাম্বর বললেন, ‘এবার বুঝতে পারছ তো সায়ন, মিহির কোনো সর্বনাশের সঙ্গে জড়িয়ে না থেকেও কেন ফেঁসে গেছে!’ সায়ন ঘাড় নাড়ল। বলল, শান্তনুর আত্মা আত্রেয়ীকে মারতে এসেছিল। কিন্তু সেটা পারেনি। বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল মিহির সরখেল। তাই ওকে হাতিয়ার করে সে তার কাজ করে চলল।’
একদম ঠিক। মিহিরের রাশ অত্যন্ত হালকা হওয়ায় সেই আত্মার বশ করতে আরও সুবিধে হয়েছে। আত্রেয়ীর বাড়িতে মিহিরের যে শিরশিরে অনুভূতি হয়েছিল সেটা হতেই পারে ওই আত্মার জন্য। সে শুরু থেকে ওদের খেয়াল করছিল।
সায়ন নীলাম্বরকে জিজ্ঞেস করল, ‘তন্ময়ের হাতেও একটা তাবিজ বাঁধবেন তো?’
— না।
সায়ন অবাক। ‘কেন? তন্ময়ও তো…’
— পাখিকে ফাঁদে ফেলতে হলে তার খাবারকে তো খোলা জায়গায় রাখতেই হবে। নইলে এর শেষ হবে না যে। ব্যবস্থা করেছ তো সব?
সায়ন ঘাড় নেড়ে বলে, ‘সব ব্যবস্থা পাকা।’
