মৃত জ্যোৎস্নার রাত্রি – ৪
চার
শালা কী কুক্ষণে যে এই শুটের দায়িত্ব নিতে গেলাম। মাঝপথে ক্যানসেল হয়ে যাচ্ছিল সেটাই ভালো ছিল। নেহাত আত্রেয়ী সেনের মতো আর্টিস্ট আছে। আর মিহির এত করে ধরল তাই। নইলে …
— কী ব্যাপার অমিতাভবাবু! কিছু বলুন।
অন্যান্য পুলিশের তুলনায় চেহারায় তালপাতার সেপাই। প্রায় ছয় ফুটের কাছাকাছি লম্বা। খানিকটা সামনের দিকে ঝুঁকে থাকেন। মুখটাও চ্যাপটা কালো মতন। চোখের মণিদুটো ব্রেইনভিটার কালো চকচকে গুলির মতো। অত্যন্ত চঞ্চল। ঠোঁটদুটো মোটা। মাথায় কাঁচা-পাকা চুলটা বেশ পাতলা হয়ে এসেছে। তবে চেহারার সঙ্গে গলাখানার আওয়াজ মেলাতে গেলে মনে হবে সরু কঞ্চি দিয়ে কেউ রাজবাড়ির ঘণ্টা পেটাচ্ছে। ঠিক সেই কারণেই বোলপুর থানার ওসি কৃষ্ণপদ ঘোড়ুইয়ের ধমকানিতে ভাবনায় ছেদ পড়ল দ্য ক্রিয়েশন প্রোডাকশন হাউসের ম্যানেজার অমিতাভ মল্লিকের। ওসির হেঁড়ে গলার কড়কানিতে একটু কেঁপে উঠল অমিতাভ। ‘কী বলব স্যার? আলাদা করে তো আর … ‘
— আলাদা বলবেন কেন? গতকাল রাতে কী দেখেছিলেন? মানে ঘটনাটা যখন ঘটে আপনি কোথায় ছিলেন? কীভাবে টের পেলেন? বিস্তারিত বলুন। একদম সত্যি কথা বলবেন। আমাদের কাছে কিন্তু খবর আছে আত্রেয়ী সেনকে আপনারা এখনও পুরো পেমেন্ট করেননি।
— কাজ শেষ না হলে আমরা কাউকেই পেমেন্ট করি না স্যার। তা-ও তো আত্রেয়ী বলে ফোর্টি পারসেন্ট পেমেন্ট করে দিয়েছি। কাজ শেষ হলে বাকিটা।
— ঘটনা ঘটার সময় আপনি কোথায় ছিলেন?
— ঘরে। আমি যেহেতু ম্যানেজার তাই সকলের খোঁজ-খবর নেওয়াটা আমার কাজ। আর ওই চৌধুরি ভিলাতে যেহেতু সবার থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল
অমিতাভর কথা শেষ হবার আগেই কৃষ্ণপদ প্রশ্ন ছুড়ল, ‘একটা কথা বলুন অমিতাভবাবু, বোলপুরে এত হোটেল থাকতে ওই চৌধুরি ভিলাতেই থাকার ব্যবস্থা কেন করলেন? বাড়িটা শুটিং করার জন্য ভালো হলেও রাত্রিবাসের জন্য মোটেও ভালো না।’
— আসলে স্যার, আমাদের পরেরদিন খুব ভোরে দু-একটা শট নেবার ছিল। সেটা হোটেলে থেকে পরদিন ভোরে আবার স্পটে গিয়ে নেওয়া সম্ভব ছিল না। তাই মিহিরই আমাদের এখানে থাকার ব্যবস্থা করতে বলেছিল।
— মিহির সরখেল?
ভ্রূ দুটো কাছাকাছি এনে নামটার ওপর একটু জোর দিয়েই উচ্চারণ করলেন কৃষ্ণপদ ঘোড়ুই। অমিতাভ একবার ঢোঁক গিলে বলল, ‘হ্যাঁ স্যার। আমি প্রথমে রাজি হইনি। কিন্তু মিহির এমন চাপাচাপি করল যে…’
— হু! বেশ! তারপর।
— তা সে রাত্রে মানে গতকাল রাতে ঘরে ঘরে গিয়ে খবর নিচ্ছিলাম কারও কোনো অসুবিধে হচ্ছে কি না। আমাদের যে ডিওপি তন্ময়
— ডিওপি! সেটা কী?
— ডিরেক্টর অফ ফটোগ্রাফি। মানে ক্যামেরাম্যান।
— ও। হ্যাঁ তারপর।
— তা ওই তন্ময়ের ঘর থেকে আমি তখন সবে বেরিয়ে দোতলার বারান্দা দিয়ে নিজের ঘরের দিকে যাচ্ছি …
.
অমিতাভর পা-টা একটু টলছে। কোনোদিন এমন হয় না। আজ বোধহয় একটু বেশিই পড়েছে। তন্ময়টাকে কতবার বারণ করল। শুনল না। জোর করে গলায় ঢেলে দিল শালা। এত লোকের দায়িত্ব। তার ওপর কাল রাত থাকতে উঠতে হবে। এখনই সাড়ে বারোটা বেজে গেছে। এককালের জমিদার বাড়ি ছিল এই চৌধুরি ভিলা, তাই থাকার ঘরের অভাব নেই। কিন্তু সব ঘরের অবস্থা বসবাসের উপযুক্ত নয়। তন্ময়ের ঘরের কয়েকটা ঘর পরেই ছাদে ওঠার সিঁড়ি। সেটা টপকে গেলে অমিতাভর ঘর। নেশা আর ঘুমে চোখ টেনে আসছে। সবেমাত্র সিঁড়িটা টপকাতে যাবে ঠিক তখনই চমকে উঠলেন অমিতাভ। ‘কে? কে ওখানে?’ বলতে বলতেই হাতের মোবাইলে টর্চটা জ্বালিয়ে ফেললেন। টর্চের আলো মুখে পড়তেই আগন্তুক মুখে হাত চাপা দিল। তারপর সেই হাত লোকটির মুখের সামনে থেকে সরতেই অমিতাভ নিজেই বলে উঠল, ‘ও বাবা! এখনও জেগে আছ? ঘুমোওনি?’
— না এই ঘুমোব।
জিভ জড়িয়ে আসছে। তবু একটু ফিক করে হেসে অমিতাভ বলল, ‘বুঝেছি, এখনও দুপুরের ঘটনাটা নিয়ে ভাবছ তাই না? ভেবো না ভেবো না। ওরকম কত হয়। সব ভুলে আবার মাথা ঠান্ডা করে কাজ করতে হয়। আরে বাল, করছ তো প্রোমো। নামধাম কিসসু থাকবে না। অত ভাবছ কেন? যখন নিজের ফিল্ম বানাবে তখন এক্কেবারে ডাঁটের সঙ্গে ডিরেক্ট কোরো। তখন দেখবে এসব আত্রেয়ী-ফাত্রেয়ী তোমার পায়ে লুটোচ্ছে।’ কথা শেষ করেই এক চোট ফ্যাচ ফ্যাচ করে হেসে নিল অমিতাভ মল্লিক।
— না, ওসব কিছু ভাবছি না। আমি এমনি একটু পায়চারি করছিলাম।
— বললেই হল? মিহির সরখেলের অমন মিহি সুরেলা গলাখানি কী আর এমনি এমনি ঘড়ঘড় করছে? যাও যাও। আর রাত কোরো না, ঘুমিয়ে পড়ো। কাল ভোরে সব রেডি হলে আমি ডেকে দেব। তখন শট নিয়োখন। যাও।
বলতে বলতে অমিতাভ সিঁড়ির অংশটা টপকে ঢুকে গেল নিজের ঘরে। প্রাচীন দরজাখানা বন্ধ করতে বেশ বেগ পেতে হল অমিতাভকে। কতদিন ব্যবহার হয় না। কবজায় জং পড়ে শক্ত হয়ে গেছে। কোনোরকমে দরজা ভেজিয়ে আলো নিভিয়ে খাটে শরীর এলিয়ে দিল। চোখদুটো অসম্ভব ভারী হয়ে এল। বাইরে থেকে আসা মিয়োনো জ্যোৎস্নার আলোটা ঘর অবধি পৌঁছোতে পারেনি। লম্বা গরাদগুলোকে অবলম্বন করে জড়িয়ে রইল তারা।
কাচের গ্লাসে রাখা জলটা এক নিশ্বাসে খেয়ে ফেলল অমিতাভ মল্লিক। দু-পাশের দেয়াল থেকে অল্প আলো এসে পড়েছে ঘরের মাঝে বসে থাকা দুটো মানুষের ওপর। তীক্ষ্ণ নজরে অমিতাভর মুখের দিকে চেয়ে আছেন কৃষ্ণপদ ঘোড়ুই। কষ বেয়ে গড়িয়ে পড়া জলটা ডানহাত দিয়ে মুছে অমিতাভ বলল, ‘তারপর ঠিক কতক্ষণ পর মনে নেই, ঘুমের মধ্যেই অনেএএএক দূর থেকে একটা মেয়ের চিৎকার শুনেছিলাম। কিন্তু তখন আমি উঠিনি। কারণ ওটা যে সত্যি সেটাই বুঝতে পারিনি। খানিকবাদে বুঝলাম আমায় কেউ যেন ডাকছে। বারবার ডাকছে। শরীরটাকে ধরে ঝাঁকাচ্ছে। আসলে এত ক্লান্ত ছিলাম যে … ‘
অমিতাভর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে ওসি বললেন, ‘তার ওপরে আকণ্ঠ পান, উঠবেন কী করে বলুন?’ বেশ ইতস্তত করতে করতেই অমিতাভ হাত কচলে বলল, মানে ওই আর কী স্যার।’
— পরেরটা বলুন। কে ডাকল আপনাকে?
— তন্ময়। মানে আমাদের ডিওপি। সে একেবারে হাঁফাতে হাঁফাতে এসে বলল আত্রেয়ী নাকি ছাদ থেকে পড়ে গেছে। শিগগিরি চলো।
— এত লোক থাকতে খবরটা তন্ময়বাবুই আপনাকে দিল?
— হ্যাঁ স্যার।
— উনি মদ খাননি?
হ্যাঁ। তবে আমাদের মতো নেশা হয়েছে বলে তো মনে হল না। আমাদের মতো? মানে মদের আসরে আরও লোক ছিল?
হ্যাঁ। ডিওপির অ্যাসিস্ট্যান্ট চিরাগ আর মৃণাল, ফ্লোর ইপি মধুরিমা, আর্টের কৌশিক-বিরাজ। এছাড়া আরও দুজন শুটিং অ্যাসিস্ট্যান্ট ভোদাই আর ঘেঁটু।
— ও ব্বাবা! আসর তো তাহলে জমজমাট।
অমিতাভ যেন মদ গিলে বিরাট অপরাধ করে ফেলেছে এমন করে দু-চোখ তুলে ওসির দিকে তাকাল। ঠিক এই সময় এক কনস্টেবল ঢুকে এসে জানাল কলকাতা থেকে বিধাননগর থানার ওসি সায়ন মল্লিক এসেছেন। সঙ্গে এক মহিলা। কৃষ্ণপদর ভ্রূ কুঁচকে গেল। হাত উলটে ঘড়িটা একবার দেখে নিল। জেরা করতে করতে বারোটা বেজে গেল। ‘ওঁকে বসাও। ইনটারোগেশন শেষ করে আসছি।’ বসের আদেশ কানে নিয়ে বেরিয়ে গেল লোকটি। অমিতাভর মুখের দিকে বেশ খানিকক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইল কৃষ্ণপদ ঘোড়ুই। অমিতাভ মল্লিক তাকাবে নাকি চোখ নামিয়ে রাখবে সেটা মনে মনে ঠিক করতে করতেই চার-পাঁচবার ওসির সঙ্গে শুভদৃষ্টি সেরে নিল। ঠোঁটের কোনায় হাসব কী হাসব না ভাব! ‘এবার তাহলে আসি’ বলতে গিয়েও থেমে গেল অমিতাভ। কৃষ্ণপদই প্রশ্ন করলেন, ‘আপনাদের মদের আসরে মিহির ছিল না?’
না স্যার। ও ওসব খায় না। সিগারেট খেতেও তেমন একটা দেখিনি। ওই চাপাচাপি করলে হয়তো। ওর চা খাবারও তেমন নেশা নেই স্যার। অদ্ভুত একটা ছেলে।
— হুমম! বেশ। আজকের মতো আপনার ছুটি অমিতাভবাবু। প্রয়োজনে আবার ডাকব।
