মৃত জ্যোৎস্নার রাত্রি – ৪০
চল্লিশ
কনকনে হিমশীতলতার কম্বল মুড়ি দিয়ে সন্ধে নেমেছে হিমাচলে। খাদের ধার ঘেঁষে পাকদণ্ডিতে লোক নেই খুব একটা। স্থানীয় কিছু মানুষ ঘুরে বেড়াচ্ছে। কেউ কেউ খাদের ধারে কাঠের আগুন জ্বেলে তাত পোয়াচ্ছে। দূরে দূরে টিমটিমে জোনাকির মতো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা আলো। হাতে গোনা কয়েকটা পাহাড়ি বসত। জ্যোৎস্নার আলোয় ভেসে যাচ্ছে চরাচর। একটা গাড়ি এসে থামল দেবীকুণ্ড হোটেলের সামনে। ভাড়া মিটিয়ে লোকটা কাঁধের একটা ব্যাগ আর ক্যামেরার ব্যাগ নিয়ে ঢুকে গেল হোটেলের ভেতরে। ম্যানেজার পঙ্কজ শর্মা সোফায় বসে ঘাড় উঁচিয়ে দেয়ালে ঝোলানো টিভি দেখছিল। লোকটাকে ঢুকে আসতে দেখে পঙ্কজ উঠে দাঁড়ায়। লোকটি পঙ্কজকে বলল, ‘আচ্ছা দাদা, ইস হোটেল মে দো দিন পহেলে আত্রেয়ী সেন অ্যান্ড তন্ময় হালদার নামকা দো লোগ আয়ে হ্যায়?’ কথাটা বলামাত্রই পঙ্কজ হাত জোড় করে বলে, ‘আপ বাংলা বোল সকতে হ্যায়। আপ শান্তনু হ্যায় তো?’ শান্তনু রীতিমতো হকচকিয়ে যায়। আপনি কী আমায় চেনেন?’
— জরুর চিনি। আপ ফোটোগ্রাফার হ্যায় না?
— হাঁ।
কথাটা শুনেই শান্তনুর খুব আনন্দ হল। বুকের ভেতর একটা চোরা গর্ব খেলিয়ে উঠল। এতকাল বাদেও তাহলে সে হারিয়ে যায়নি। এই সুদূর পাহাড়ি প্রান্তের মানুষ তাকে চিনতে পেরেছে। যেই খেয়াল হল হাতে তার ক্যামেরার ব্যাগ অমনি চোরা গর্বটা কর্পূরের মতো উবে গেল। ক্যামেরার ব্যাগ দেখে ব্যাটা ফোটোগ্রাফার বলেছে। কিন্তু নাম জানল কী করে? এত বড়ো সেলিব্রেটিও সে নয়। এমনকি আত্রেয়ীরা জানেও না যে সে এখানে আসছে। শান্তনু প্রশ্ন করার আগেই পঙ্কজ নিজে থেকে বলে উঠল, ‘আপ সোচ রহে হ্যায় কি আমি আপনাকে চিনলাম ক্যায়সে? তাই তো?’
— হুম।
— তন্ময়বাবু আপকে বারে মে সবকুছ বাতা দিয়া।
নামটা শুনেই চড়াং করে উঠল শান্তনুর মাথাটা। মনে মনে খিস্তি মেরে বলল, ‘ঢ্যামনাটা জানল কী করে?’ পঙ্কজ আপন মনে বলে চলেছে, ‘উনি বুলেছেন কি আপনি এলেই সিধা রুমে পাঠিয়ে দিতে। ছুপ চুপ কর মেডাম কা এক্সক্লিউজিভ ফোটো খিচনা হ্যায় না’? পঙ্কজের কথার আগা-মাথা কিছুই শান্তনুর মাথায় ঢুকল না।
— আপ নিশ্চিন্ত হো কর আপনা কাম কর লিজিয়ে। কোই মিডিয়া-কিডিয়া কো হাম ঘুসনে নেহি দেঙ্গে। এ ভজুয়া, ভজুয়াআআআ।
হাঁক পাড়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে কমবয়সি একটি ছেলে এসে হাজির। পঙ্কজ বলল, ‘ইয়ে বাবুসাব কো তেরা নম্বর রুম মে লে যা।’ পেন ধরার মতো করে তর্জনী আর বুড়ো আঙুল জুড়ে হাত নাড়াল শান্তনু। জিজ্ঞেস করল, ‘সাইন করতে হবে না?’ অমনি জিভ কেটে পঙ্কজ বলল, ‘আরে নেহি নেহি। বাইচান্স মিডিয়া আ যায়ে তো আপকো পহেচান লেঙ্গে না। আপ যাইয়ে।’ ভজুয়া শান্তনুকে সঙ্গে করে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেল।
.
এর ঠিক পঁয়তাল্লিশ মিনিট বাদে পঙ্কজ ভজুয়াকে পাঠায় তেরো নম্বর রুমে ডিনারের অর্ডার নিতে। ভজুয়া মিনিট তিনেক বাদে ফিরে আসে। ‘ক্যায়া লেঙ্গে উও লোগ?’ মুখটা কাঁচুমাচু করে ভজুয়া বলে, ‘মালুম নেহি।
— ক্যায়া?
ভজুয়া বলল সে ঘরে নক করেনি। দরজার কাছে যেতেই ভেতর থেকে প্রচুর লাফড়ার শব্দ আসছিল। ‘বেঙ্গলি মে উও লোগ ক্যায়া বোল রহে হ্যায় মালুম নেহি। পর ঘর মে বহত লাফড়া হো রহে হ্যায়।’ পঙ্কজ নিজেই চলে যায় তেরো নম্বর রুমের সামনে। দরজায় কান পাততেই চমকে ওঠে। ঘরের মধ্যে রীতিমতো তুমুল কাণ্ড। কার গলা কোনটা কিছু বুঝতে পারে না পঙ্কজ। শুধু উড়ে আসে কিছু ছেঁড়া ছেঁড়া কথা। একটি লোক বলল, মায়ের পেট থেকে পড়েই ফস্টিনস্টি শুরু করে দিয়েছিস শালি?’ মহিলাটি তেড়ে ওঠে, ‘মুখ সামলে কথা বলবে। ছোটোলোক একটা।’ লোকটি বলে, ‘এবার বুঝবি আমি কতটা ছোটোলোক। স্বনামধন্য অভিনেত্রীর কেচ্ছা এবার সারা কলকাতাবাসী জানবে।’
— এটা হোটেল। প্লিজ তোমরা থামো।
এটা অন্য আর-একজনের গলা। আর-একটি লোক তাকে ধমকে ওঠে, ‘এই চুপ কর হারামি ব্লাডি বাস্টার্ড।’ সঙ্গে সঙ্গে একটা ফোন বেজে ওঠে। কার মোবাইল পঙ্কজ বুঝতে পারে না। কিন্তু এটা বুঝতে পারে যে সেটা কেটে দেওয়া হয়। আবার প্রথম লোকটা গলা চেপে বলে ওঠে, ‘পায়ের ফাঁকে তোর এত চুলকুনি খানকি?’ চটাস করে একটা শব্দ। মহিলা বলে, ‘মাইন্ড ইওর ল্যাঙ্গোয়েজ। আমার পেছনে লাগতে এলে শেষ করে দেব তোমায়।’ এরপরেই লোকটি দাঁতে দাঁত চেপে খেপে ওঠে, ‘সে তো দিবিই। সঙ্গে যে নাগর আছে তাই পুড়কি অনেক বেশি।’ আবার মোবাইল বেজে ওঠে এবং সেই আওয়াজটা দরজার দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। পঙ্কজ বোঝে কেউ একজন বাজতে থাকা মোবাইলটা নিয়ে এগিয়ে আসছে এদিকেই। চট করে সরে গিয়ে লুকিয়ে পড়ে। আড়াল থেকে দেখে তন্ময় বেরিয়ে এসেছে। বেশ রেগে ফোন ধরল।
— কী হয়েছে কী? বারবার কেন কল করছ?… চূড়ান্ত অসভ্যতা চলছে হোটেলে। আর এই সব হয়েছে তোমার জন্য।… মানেটা বুঝছ না? কী দরকার ছিল শান্তনুকে ছবিটা দেখাবার?… একটু সাবধান হতে পারলে না? নাকে কাঁদুনিটা ওর সামনেই কাঁদতে হল? কাঁদতে হল? কী হয়েছে বলো। সেটা আমিও জানি এটা হোটেল।… আরে ও তো এখানে। আমি কী করব? বের করব কী করে? শালাকে এক্ষুনি শেষ করে দিতে ইচ্ছে করছে। নেহাত লাশ লুকোবার জায়গা নেই তাই… এই জ্ঞান মেরো না তো। এত রাতে যাবটা কোথায়? সেটা আবার কোথায়?… ও হো, আজ বিকেলে একজন বলছিল বটে। কিন্তু তুমি এতো ডিটেইলস জানলে কী করে? বাবা! ট্রাভেল সাইট!… কী বলছ? শুনতে পাচ্ছি না… হন্টেড? কেন?’
.
মোবাইলটাকে কানে চেপে চুপ করে এপাশ-ওপাশ দেখতে থাকে তন্ময়। তারপর বলে, ‘হুম। সেটাই করতে হবে… এতে তোমারও সুবিধে তাই তো? আচ্ছা আচ্ছা ঠিকাছে। রাখছি এখন। দেখছি, শালার একটা ব্যবস্থা করতে হবে।’ ঘরে চলে যায় তন্ময়। পঙ্কজের মনে অশনি সংকেত। সর্বনাশের গন্ধ পায় সে। সোজা রিসেপশনে চলে আসে।
.
পনেরো মিনিটের মধ্যে তিনজনেই নীচে নেমে আসে। ঘড়িতে প্রায় রাত পৌনে ন-টা। শান্তনু কাঁধে শুধুমাত্র ক্যামেরার ব্যাগ নিয়ে হনহন করে বাইরে বেরিয়ে যায়। তন্ময় জানায় ওরা একটু বেরোচ্ছে। ফিরতে রাত হবে। কিছু স্পেশ্যাল ছবি তোলার আছে। তন্ময় পঙ্কজের কানে কানে বলে যায় দেখবেন কেউ যেন না জানে। তারপর কোথা থেকে মিডিয়া চলে আসবে! সব গণ্ডগোল হয়ে যাবে। উও তো ঠিক হ্যায়, পর এত রাতে ফোটো কাঁহা লেঙ্গে?’ তন্ময় জানায়, তারা আজ বিকেলে একটা জায়গা দেখে এসেছে। সুইসাইড পয়েন্ট।’ নামটা শোনামাত্রই আঁতকে ওঠে পঙ্কজ। ‘ক্যায়া বোল রহে আপ? ইতনি রাত মে উও জগাহ! উও তো হন্টেড হ্যায়।’ তন্ময় হা হা করে হেসে ওঠে। বলে ওসব গুজব। আমরা সব জেনেই যাচ্ছি। চাঁদের আলোয় ওখানেই সবচেয়ে ভালো ছবি হবে।
— আপ লোগ খানা ক্যায়া লেঙ্গে?
— করকে চার রোটি অউর রাজমা উইথ স্যালাড।
— তিন আদমি চার রোটি?
তন্ময় একটু থমকে গেল। নাক দিয়ে ফস করে শব্দ বের করে হাসল। বলল, শান্তনু ছবি তুলেই চলে যাবে। ও কোনো একটা হোম স্টেতে উঠেছে।
— ও। জ্যাদা রাত মত করনা। ভজুয়া সো যায়েগা। মুঝে ভি ঘর যানা হ্যায়।
তন্ময় ঠোঁট চিপে হেসে চোখ টিপে সম্মতি জানাল। পঙ্কজ আর কথা বাড়াল না। কিন্তু মনের মধ্যে একটা সন্দেহের কাঁটা খচখচ করতেই থাকল। শান্তনু যদি আজ এখানে না থাকে তাহলে তার লাগেজ নিল না কেন? শুধু ক্যামেরাটা নিল! তাহলে কী এখানে ফিরে লাগেজ নিয়ে তারপর যাবে?
.
ঘণ্টার কাঁটা ঘুরেই চলল। রাত সাড়ে দশটা বেজে গেল। নির্জন ভারমোরে এটা অনেক রাত। পথঘাট জনশূন্য। যে ক-টা আলো ইতিউতি জ্বলছিল সেগুলোও এখন নিভে গেছে। একটা টর্চ নিয়ে পঙ্কজ বেরোল বটে। কিন্তু সেটা জ্বালতে হল না। আকাশ থেকে উপচে পড়া যুবতি জ্যোৎস্নার রুপোলি আলো হিমাচলের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়েছে। দূরে একটা আগুনের আলো দপ করে নিভে গেল। আজকের মতো হয়তো কোনো বাড়ির আলো নিভল। এখান থেকে মণিকৈলাস পাহাড়কে পৃথিবীর মাথায় রুপোর মুকুট বলে মনে হচ্ছে। আজ জ্যোৎস্না নিজেকে বিলোতে এতটুকুও কার্পণ্য করেনি। কয়েক যোজন দূরে এঁকেবেঁকে মিশে থাকা পাহাড়ি খাঁজ, জমে থাকা জঙ্গলের ফাঁক-ফোকর, বয়ে চলা চকচকে রুপোলি নদী সব কিছু মায়াবী ক্যানভাসের মতো স্পষ্ট। কিন্তু এই অসীম সৌন্দর্যের মধ্যেও যেটুকু কালো অন্ধকার জাপটে আছে সেখানেই ওঁৎ পেতে আছে অবশ্যম্ভাবী সর্বনাশ। গ্রাম ছাড়িয়ে সুইসাইড পয়েন্টের কাছাকাছি আসতেই একটা সুর শুনতে পায় পঙ্কজ। বড়ো মায়াবী সেই সুর। একটু কাছে যেতেই গানের কথাগুলো কানে এসে বাজে পঙ্কজের। পাহাড়ি হাওয়ায় ভেসে কথাগুলো পাথরে ধাক্কা খেয়ে মিশে যাচ্ছে শূন্যে। ‘আমার এ ঘর বহু যতন করে, ধুতে হবে মুছতে হবে মোরে।’ আরও একটু কাছে আসতেই দৃশ্যটা স্পষ্ট। মহিলাটি এক জায়গায় দাঁড়িয়ে পাথরের গায়ে হেলান দিয়ে নিজের মনে গান গাইছে। তার থেকে বেশ খানিকটা তফাতে, ও কী! কী হতে চলেছে ওইখানে? একটি লোকের কালো মূর্তি পাহাড়ি খাদের ধারে টলছে। দাঁড়াতেই পারছে না ঠিক করে। মুখ পরিষ্কার দেখতে না পেলেও পঙ্কজের বুঝতে অসুবিধে হল না যে লোকটা তন্ময় হালদার। ম্যাডামের সঙ্গে যে এসেছে। পেছন থেকে এগিয়ে যাচ্ছে আরও একটি লোক। তার কাঁধে সেই ক্যামেরা। ব্যাগটা বোধহয় কোথাও রাখা। তার মানে এ শান্তনু। এটা কী করছে ওরা? তন্ময় এত টলছে সে তো যে-কোনো মুহূর্তে খাদে পড়ে যাবে। শান্তনু আটকাচ্ছে না কেন? পেছন থেকে মজা দেখছে নাকি? বুকের ভেতরটা ধুকপুক করতে থাকে পঙ্কজের। তার কি এখুনি হাওয়া হওয়া উচিত! নইলে যে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে। কনকনে ঠান্ডার মধ্যেও ঘনঘন ঘাম মুছছে পঙ্কজ। এমনিতেই প্রেশারের প্রবলেম। তার মধ্যে এমন ভয়ানক কিছু চোখের সামনে ঘটতে চলেছে যে তার ভাষা হারিয়ে গেছে। গলা শুকিয়ে আসছে। পঙ্কজ দেখল পেছনের লোকটা মানে শান্তনু দুটো হাত সামনের দিকে তুলে এগিয়ে যাচ্ছে। সোজা লোকটার পিঠে গিয়ে ধাক্কা মারতে চাইছে কী? হ্যাঁ, সেরকমই করতে চলেছে। তন্ময় এবার একদম খাদের কিনারে। একবার পা হড়কালে শরীরের আর কোনো অংশই খুঁজে পাওয়া যাবে না। নীচে ঘন জঙ্গল। তার নীচে প্রচুর পাথর। তারও অনেক নীচে উত্তাল নদী। পঙ্কজের চোখের সামনে তন্ময়কে প্রায় ঠেলে ফেলে দেবে। এমন সময় কোথা থেকে আরও একটি কালো মূর্তি প্রবল বেগে উলটোদিক থেকে দৌড়ে আসে এবং তন্ময়কে পাহাড়ের ধার থেকে টান মেরে মাটিতে ফেলে দেয়। পঙ্কজ থরথর করে কাঁপছিল। ওটা কে এসে বাঁচাল লোকটাকে? স্থানীয় কেউ? মুখ দেখা যাচ্ছে না। তার ওপর মাথা থেকে গলা পর্যন্ত মাঙ্কি ক্যাপ পরা। ম্যাডাম ওদিকে আপন মনে গান গেয়েই চলেছে। ‘আমারে যে জাগতে হবে কী জানি সে আসবে কবে, এই নিরালায়।’ ম্যাডামের পাশেই যে এমন গভীর মরণখেলা চলছে সেটা ম্যাডাম বুঝতে পারছে না? নাকি বুঝেও বুঝতে চাইছে না! এত দূর থেকে যদি পঙ্কজ সবটা খেয়াল করতে পারে, দেখতে পায় তাহলে আত্রেয়ী ম্যাডাম কেন গান গেয়ে চলেছেন? যে দৌড়ে এসে বাঁচাল সে এবার ক্যামেরা কাঁধে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটার মুখ চেপে ধরে কী যেন বলছে। তারপর মুখ থেকে হাত সরিয়ে নিল। লোকটা ক্যামেরা কাঁধে নিয়েই তৎক্ষণাৎ দৌড়ে পাশে পড়ে থাকা একটা পাথরের কাছে গেল। অনেক কষ্টে তুলে নিল পাথরটা। টলতে টলতে মাটিতে পড়ে থাকা লোকটার কাছে এল। চোখ রগড়ে নিল পঙ্কজ। ও কি ঠিক দেখছে? কিছু ভাববার আগেই ক্যামেরাধারী লোকটার হাত ফসকে ভারী বড়ো পাথরটা ঝপাৎ করে মাটিতে লুটিয়ে থাকা লোকটার মুখের ওপর পড়ল। পচাৎ আর দুম, দুটো শব্দ একসঙ্গে নিস্তরঙ্গ পাহাড়ে ধ্বনি সৃষ্টি করল। সঙ্গে সঙ্গে গান থেমে গেল। কিন্তু ম্যাডাম নড়ল না। মাটিতে পড়ে থাকা লোকটার পাদুটো পাথরের মাটিতে ঘষটাতে ঘষটাতে থেমে গেল। কয়েক মুহূর্ত দম বন্ধ হয়ে গিয়েছিল পঙ্কজের। ও আর দাঁড়াতে পারল না। বড়ো একটা পাথরের আড়ালে বসে পড়ল। মাথা থেকে পা পর্যন্ত থরথর করে কাঁপছে। চোখ ফেটে জল পড়ছে তার। আতঙ্কে, ভয়ে নিশ্বাস নিতে ভুলে যাচ্ছে সে। কিন্তু এরপর কী হতে চলেছে? সেটা মনে হতেই পাথরের আড়াল থেকে আবার মুখ তুলে দেখে, যে লোকটি দৌড়ে এল এবং ক্যামেরা কাঁধে নিয়ে থাকা আর-একজন একসঙ্গে পাথরসমেত নিথর লোকটাকে ঠেলে গড়িয়ে দিল পাহাড়ের খাদে। শূন্যতার মধ্যে গুমগুম করে এক ভারী শব্দ উত্থিত হল। পঙ্কজের মনে হল যেন এক মহাপ্রলয় আসতে চলেছে। কিছু পরে হারিয়ে গেল শব্দ। হারিয়ে গেল মানুষটা। তিনজন এসেছিল হোটেল থেকে। এখনও তিনজনই রইল। হারাল যে তার চিহ্নটুকুও কী রইল না? ম্যাডাম এবার হাঁটতে হাঁটতে অকুস্থলে গেল। কী যে কথা হল তাদের মধ্যে তার কিচ্ছু শুনতে পেল না পঙ্কজ। শুধু দু-তিন বোতল জল ঢালার শব্দ পেল সে। রক্তের দাগ যেন না থাকে। পঙ্কজের কষ্ট হল খুব। খানিকক্ষণ তার নড়াচড়ার শক্তিও হারিয়ে গিয়েছিল। তারপর সকলে খুব দ্রুত হাঁটতে হাঁটতে হোটেলের পথে ফিরতে লাগল। পঙ্কজকেও ওই পথে ফিরতে হবে। তাই তিনটে লোক কিছুটা দুরে গেলে নিজেকে আড়াল রেখে খুব সাবধানি পায়ে এগোতে থাকে পঙ্কজ। একসময় খেয়াল করে মাংকিক্যাপ পরে যে শেষে এসেছিল সে রাস্তার পাশের একটা হোম স্টেতে ঢুকে যায়। ম্যাডাম আর ক্যামেরাম্যান দেবীকুণ্ডের দিকে এগোতে থাকে।
সেদিন রাতে বাড়ি ফিরে পঙ্কজের খুব জ্বর আসে। পরেরদিন সকালে বিছানা ছেড়ে উঠতে পারে না। তাই হোটেলেও আসে না। সারারাত দু-চোখের পাতা এক করতে পারেনি পঙ্কজ। চোখের সামনে এমন নিষ্ঠুর হত্যালীলা দেখে সে প্রায় বাকরুদ্ধ। ভজুয়া সক্কাল সক্কাল ফোন করে। বলে যে ম্যাডাম আর তন্ময় স্যার হোটেল চেক আউট করে এখনই চলে যাবেন বলছেন। কলকাতায় কাজ পড়ে গেছে। পঙ্কজ ভীষণ অবাক হয়। বারবার ভজুয়াকে জিজ্ঞেস করতে থাকে তন্ময় স্যার নাকি ক্যামেরা নিয়ে যে এসেছিল সেই শান্তনু স্যার? ভজুয়া বারবারই একই উত্তর দেয়। আত্রেয়ী ম্যাডাম আর তন্ময় স্যারই চেক আউট করবেন। ক্যামেরা নিয়ে যে এসেছিল সে তো কাল রাতে হোটেলে ফেরেইনি। তাতেও যখন বিশ্বাস হয় না তখন ভজুয়াই তন্ময়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলিয়ে দেয় পঙ্কজের। পঙ্কজ বুঝতে পারে, কাল রাতে শান্তনুর ক্যামেরাটা তন্ময়ের কাঁধে থাকায় সে ভুল বুঝেছিল। আসলে মৃত্যুর অতলে তলিয়ে গেছে শান্তনু। তন্ময় বহাল তবিয়তে বেঁচে আছে।
.
ইন্টারোগেশন রুমের টিভিটা চলছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে হসপিটালের বেডে বসে অসুস্থ পঙ্কজ বয়ান দিচ্ছে। উস রাত ম্যায় কৈলাস হোম স্টে মে গয়া থা। উসকা মালিক কিশোর মুঝে বহত প্যায়ার করতা থা। উনহোনেই মুঝে বাতায়া উও মাংকিক্যাপ পহেননেওয়ালি কা নাম।’ ভিডিয়োর উলটোদিক থেকে সূর্যের গলা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল, ‘পহেননেওয়ালি?’
— হাঁ। উও একটা মেয়ে ছিল।
— কী নাম?
— ভন্দনা দত্তা।
— আর ইউ শিওর? বন্দনা দত্ত ছিল?
— হাঁ। উও নাম ম্যায় কভি নেহি ভুলুঙ্গা।
— কেন?
— মেরা মা কা নাম ভি ভন্দনা থি। ভন্দনা চকরবরতী। বেঙ্গলি ব্রাহ্মিণ।
ফুটেজ পজ হয়ে গেল। সায়ন চুপ করে তাকিয়ে রইল বন্দনার দিকে। বন্দনা মুখে হাত চাপা দিয়ে বসে আছে। দুজনের মাঝে ঝুলতে থাকা আলোটাও থমথম করছে। শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল সায়ন, ‘কেন করলেন এই কাজ? একটা নিরাপরাধ মানুষকে খুন করলেন?’ বন্দনা চুপ। সোমদত্তা জিজ্ঞেস করে, ‘চুপ থেকে লাভ নেই। সময় নষ্ট না করে ঝটপট বলে ফেলুন।’
— যা করেছি বেশ করেছি।
সায়ন আর সোমদত্তা দুজনেই একসঙ্গে ‘অ্যাঁ’ বলে চমকে ওঠে। মুখের সামনে থেকে হাত সরিয়ে সায়নের চোখে চোখ রেখে বন্দনা বলে, ‘যা করেছি বেশ করেছি। আত্রেয়ী সেনকে ছারখার করে দিয়েছি। ওর সব কিছু আমার।’ এতক্ষণ বাঁ-দিকে হেলে টেবিলের ওপর হাতের ভর রেখে বসেছিল সায়ন। বন্দনার কথা শুনে শিরদাঁড়া টানটান করে বসল। ‘কেন? আত্রেয়ী আপনার কোন ক্ষতিটা করেছে যে তার স্বামীকে মেরে প্রতিশোধ…’! সায়নকে কথা শেষ করতে না দিয়েই দাঁতে দাঁত চিপে বলে ওঠে বন্দনা, ‘আমায় জন্ম দিয়ে ভুল করেছে। জন্মের পর আমায় ছুড়ে ফেলে দিয়ে ভুল করেছে।’
.
ইন্টারোগেশন রুমের আলোটা একটা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ফেটে পড়তে পারত। গোটা থানার দেয়ালে ফাটল ধরতে পারত। কারণ এই মুহূর্তে অদৃশ্য এক বাজ পড়ে আত্রেয়ী সেন হত্যা-রহস্যের যে ভয়ানক দিকটি সামনে এল তা কেউ দুঃস্বপ্নেও কল্পনা করেনি। সোমদত্তা বলে ওঠে, ‘কী বলছেন আপনি? আত্রেয়ী সেন আপনার মা?’
— ওই শব্দটা একদম আত্রেয়ী সেন নামের সঙ্গে উচ্চারণ করবেন না প্লিজ। ওই নোংরা, লোভী মহিলা আমার মা হতে পারে না। কিন্তু, কিন্তু আমার দুর্ভাগ্য যে আত্রেয়ী আমার বায়োলজিক্যাল মাদার।
সায়ন টেবিল চাপড়ে ধমকে ওঠে, ‘আবার আপনি গল্প বানাচ্ছেন বন্দনা।’
— না না। এটাই সত্যি।
— বেশ। যদি তাই হবে তাহলে আত্রেয়ী আপনাকে কেন চাকরি দেয়নি? কেন সুরভি দেবীকে যেতে হয়েছিল আত্রেয়ী সেনের পায়ে পড়তে? সুরভি দেবী যে গিয়েছিলেন সেটা হান্ড্রেড পার্সেন্ট সত্যি। ওদের বাড়ির দারোয়ান ধানুয়াও বলেছে এ কথা।
— মা আত্রেয়ী সেনের পায়ে পড়েননি।
— তবে?
— আত্রেয়ী সেনের সঙ্গে মা আলাদা কথা বলবে বলে একট অন্য ঘরে চলে যায়। আমায় বাইরে দাঁড়াতে বলে। মা গিয়ে শুধু কয়েকটা ছবি দেখায় আত্রেয়ী সেনকে। যে ছবি আমায় অনাথআশ্রম থেকে দত্তক নেবার সময়ে তোলা হয়েছিল।
— শান্তিলতা নবজীবন আশ্ৰম?
সোমদত্তা উত্তেজিত হয়ে বলে ওঠে। বন্দনা হ্যাঁ-সূচক ঘাড় নাড়ে। তারপর বলে, ‘আত্রেয়ী নিজেও জানত না। এমনকি আমিও তখন কিচ্ছু জানতাম না। মা ঘরে ঢুকে আত্রেয়ীকে ছবিগুলো দেখায়। বলে সে যেন তার মেয়েকে এই চাকরিটা দেয়। কারণ মায়ের মানে সুরভি দত্তের শরীর ভালো নেই। যে-কোনোদিন যা খুশি হতে পারে।’
— এক সেকেন্ড, এক সেকেন্ড।
সায়ন থামিয়ে দিল। ‘এই যে আপনি বললেন মায়ের অসুখটা সাত বছর আগে ধরা পড়ে! তখন তো আপনার আত্রেয়ী সেনের কাজ করার এক বছর হয়ে গেছে।’
— তখন মা এমনিই বলেছিল। শরীরে অসুবিধে ছিল হয়তো। কিন্তু বুঝতে দেয়নি। মা নিজেও ভাবতে পারেনি যে এই শরীর খারাপটাই একদিন সত্যি হয়ে যাবে। মা যখন আত্রেয়ী সেনের সঙ্গে কথা বলে বেরিয়ে এল তখন ম্যাডামের মুখের ভাব সম্পূর্ণ আলাদা। আমায় কেমন যেন ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে দেখছিল। আমার জন্য আলাদা থাকার ঘরের ব্যবস্থা করে দিল। আমি তখন কিচ্ছু বুঝিনি। মা-কে জিজ্ঞেসও করতাম। মা বলত, ওঁকে নাকি খুব ভালো করে আমাদের অসুবিধের কথা বুঝিয়েছে। তাই ওঁর মন গলেছে। কিন্তু এর ঠিক এক বছরের মাথায় মায়ের বাড়াবাড়ি হয়। ডাক্তার দেখাই। তখনই সব ধরা পড়ে। মা খুব ভয় পেয়ে যায়। তাই একদিন আমায় ডেকে ছবিগুলো দেখায়। আর আমার আসল জন্ম পরিচয় বলে।
