মৃত জ্যোৎস্নার রাত্রি – ৪১
একচল্লিশ
একেই বর্ষাকাল। তার ওপর আবার নিম্নচাপ। চার-পাঁচ দিনের আগে এই বেয়াড়া বৃষ্টি ধরবে না। বাজ পড়ছে ঘন ঘন। সেই বাদলের ছোঁয়া লেগেছে দত্তবাড়ির ঘরের ভেতর। অসুস্থ মা-কে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কাঁদছে বন্দনা। ‘এসব তুমি কী বলছ মা? এ হতে পারে না। কিছুতেই হতে পারে না।’ বুকের ওপর পড়ে কাঁদতে থাকা মেয়ের মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে সুরভি বলে, ‘যা সত্যি তা চেপে রাখা যায় না রে। আমি তোকে তো এসব বলতে চাইনি। তুই আমার মেয়ে। শুধু আমার। শুধু তোকে জড়িয়েই বাঁচব ভেবেছিলাম। তাই আত্রেয়ীকেও আমি বারণ করেছিলাম তোকে যেন না বলে এসব কথা। ও আমায় কথা দিয়েছিল। শুধু শর্ত দিয়েছিল আমি যেন ওই ছবিগুলো সব ওকে দিয়ে দিই। আর কোথাও কোনোদিন কেউ যেন সেই ছবি দেখতে না পায়। আমি যে তাকে কথা দিয়েছিলাম কেউ জানবে না। শুধু একটা জিনিস আমি পারিনি।’ বন্দনা মাথা তোলে মায়ের বুকের ওপর থেকে। চোখ মুছে বলে, ‘কী পারোনি?’
— তুই যাকে আমার দূর সম্পর্কের জেঠু বলে চিনিস, ও আসলে তোর দাদামশাই। আত্রেয়ীর বাবা সুজয় সেন।
— কী? এসব কী বলছ তুমি?
— ঠিক বলছি রে মা। তোর বাবার সঙ্গে আমার বিয়েটা খুব অল্প বয়সেই হয়। এক বছরের মধ্যে আমার সন্তান আসে। কিন্তু জন্মাবার আগেই সে
চাপা কান্নায় ফুলে ওঠে সুরভির বুক। কেঁপে ওঠে ঠোঁট। বলতে থাকে তবু, ‘মিস ক্যারেজের পর আমি আস্তে আস্তে ডিপ্রেশনে চলে যাই। চিকিৎসা চলতে থাকে। ওষুধ খেয়ে ভালো থাকলেও সেটা সাময়িক। সন্তান হারানোর কষ্ট আমি মানতে পারি না। আমার খালি বুকটা খাঁ খাঁ করতে থাকে। আমরা আবার চেষ্টা করি। কিন্তু ভগবান মুখ তুলে তাকান না। কোল আমার শূন্য থাকে। তোর বাবা যখন দেখল আমি আস্তে আস্তে অসুস্থ হয়ে পড়ছি। তখন ঠিক করল দত্তক নেবে। আমার প্রথমে মত ছিল না। পরে তোর বাবাই আমায় জোর করে ঝাড়গ্রামে নিয়ে যায়। ওখানে একটা অনাথ আশ্রম ছিল তোর বাবার পরিচিত একজনের। কী যেন নাম ছিল ভদ্রলোকের! নির্মলেন্দু নাকি অমলেন্দু, যাইহোক। সেখানে গেলাম। উনি আমাদের বললেন, চারদিন আগে একটি বাচ্চা হয়েছে তাঁদের আশ্রমেই। আমরা অবাক হয়ে যাই। জিজ্ঞেস করি, আশ্রমে কী করে বাচ্চা হয়? তখন উনি বললেন, ওঁর এক বন্ধুর মেয়ের মেয়ে হয়েছে। মেয়েটি বিবাহিত নয়। সবে ক্লাস টুয়েলভ পাস করেছে। কলেজেরই কোনো এক ছেলের সঙ্গে নিজের কপাল পোড়ায়। মেয়েটির বাবা মানে ওই নির্মলেন্দুর বন্ধু তার মেয়েকে কলকাতা থেকে লাস্ট ছয়মাস এই আশ্রমে এনে রেখেছিল। তাই এখানেই সেই বাচ্চা জন্মেছে। ওরা সেই সন্তানকে কোনো নিঃসন্তান দম্পতিকে দিয়ে দেবে। সেই আমাদের সঙ্গে প্রথম আলাপ সুজয় সেনের। আত্রেয়ী নিজে এসেছিল তোকে কোলে নিয়ে। লজ্জায় মুখ তুলতে পারেনি সে। রোগা-পাতলা একটা মেয়ে। ওর ডাক নাম ছিল ঝুমা। ওদের আশ্রমের একটা নিয়ম ছিল। সন্তান দত্তক নেওয়ার সময় ছবি তুলে রাখা। তবে পার্টি না চাইলে সেগুলো গোপনই থাকবে। ওরাই প্রত্যেকের কাছে একটা করে কপি দিত। আমরাও পেয়েছিলাম। আমি সেই কপি থেকে কলকাতায় ফিরে আরও দু-তিনটে কপি বানাই। পাছে ওই মুহূর্তটার ছবি হারিয়ে ফেলি। আমি তো ওইদিন ওই সময়েই মা হয়েছিলাম বল? সুজয়বাবু আমাদের হাত ধরে রিকোয়েস্ট করেছিলেন আমরা যেন এর আসল পরিচয় কাউকে না বলি। আমরাই বা বলব কেন? সুজয়বাবু আমার কোলে যাকে তুলে দিলেন সে তো আমার সন্তান। তোকে কোলে নিয়ে আমি সব ভুলে যাই জানিস। আমাকে আর-একটাও ওষুধ খেতে হয়নি। শুধু শরীরের ভেতরে চুপিচুপি কিছু রোগ বাসা বেঁধে ফেলে। যাক, আমি তাই নিয়েই খুশি। আমি শুধু আত্রেয়ীর সেই কথাটা রাখতে পারিনি যে আমার কাছে কোনো ছবি থাকবে না। শুধুই তার কাছে থাকবে।’
— এই জন্য দাদু আমার প্রত্যেক জন্মদিনে খাবার বানিয়ে আনত?
— তুই যে ওর একমাত্র নাতনি রে। ওঁর সঙ্গে তোর রক্তের সম্পর্ক। যেদিন তোকে আমার কোলে তুলে দেন, সেদিনই আমরা তোকে নিয়ে চলে আসছিলাম। উনি হঠাৎ আমাদের আলাদা করে ডাকেন। বলেন, উনি আমাদের সঙ্গে আজীবন সম্পর্ক রাখতে চান। কিচ্ছু না, শুধু নাতনিটাকে একবার চোখের দেখা দেখবেন। তোর বাবা এক কথায় রাজি হয়ে যায়। সেই থেকে উনি আমার জেঠু। আর তোর দাদু। মেয়েটা তো থেকেও নেই। কোনো খবরই নেয় না তার বাবার।
.
ইন্টারোগেশন রুমে বসে বন্দনা বলে, ‘সেইদিন বুঝেছিলাম, লোকে কেন বাচ্চাদের পুতুল বলে। তাদের নিয়ে যেমন ইচ্ছে খেলা যায়। আদর করে বুকে ধরে রাখাও যায় আবার ছুড়ে ফেলে দেওয়াও যায়।’ কথাটা শেষ হতেই ধানুয়ার ঘর থেকে পাওয়া ছবিগুলো বন্দনার সামনে সাজিয়ে দেয় সোমদত্তা। ‘ভালো করে দেখুন তো, এই সেই ছবিগুলো?’ হাত দিয়ে ছবিগুলো নেড়েচেড়ে দেখে বন্দনা। একটা ছবিতে আত্রেয়ীর কোলে বাচ্চা, একটিতে সুজয় সেন সুরভির কোলে বাচ্চা তুলে দিচ্ছে। পাশে বন্দনার পালিত বাবা। পেছনের দেয়ালে আশ্রমের নাম লেখা। এরকমই আরও দুটো ছবি। বন্দনা জিজ্ঞেস করে, ‘কোথায় পেলেন এগুলো?’
— পেয়েছি কোথাও থেকে। নইলে আর হাতে এল কী করে?
সায়ন বলল। সোমদত্তা ছবিগুলো সরিয়ে নিয়ে বলল, ‘স্যার লাঞ্চটা কী করে নেবেন?’
— হুম। খিদে তো ভালোই পেয়েছে। কী বন্দনা ম্যাডাম? খিদে পেয়েছে তো? বলেই সোমদত্তাকে বলল, ‘ডাক্তারকে বলো সুরভি দেবীকে আর-একবার দেখতে।’
— ওকে স্যার।
সোমদত্তা বাইরে চলে গেল। সায়ন বন্দনাকে বলল, ‘এই ছবিগুলো হাতে পেয়েই আপনার মা-কে আমি চিনতে পেরেছিলাম। চেহারাটা ভারী হয়েছে আর কয়েকটা চুল পেকেছে। বয়সের ভারে চামড়া কুঁচকে গেছে। এর চেয়ে খুব বেশি তফাত হয়নি সুরভি দেবীর। বুঝতে পেরেছিলাম আত্রেয়ী সেনের সঙ্গে কোনো-না-কোনোভাবে যোগ আছে ওঁর। তাই ওঁকে তুলে আনা। ওঁর বিরুদ্ধে এখনও পর্যন্ত কোনো অভিযোগ নেই আমাদের। তবে একটা খারাপ খবর আছে, জানি না আপনি জানেন কিনা।’
— খারাপ খবর! কী—কী খবর?
—আপনার দাদু, মানে সুজয় সেন আর নেই।
— কী? মানে?
— আপনার মা যেদিন…
বলতে গিয়ে হোঁচট খায় সায়ন। আবার শুরু করে, ‘মানে আত্রেয়ী সেন যেদিন মারা যান সেদিন উনি কেওড়াতলা শ্মশানের পাশেই একটা রোড অ্যাকসিডেন্টে মারা যান।’
খুব অসহায়ের মতো চোখ বোজে বন্দনা। এক এক করে ওর সব কাছের মানুষগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। কাঁদতে কাঁদতে মাথা নীচু হয়ে যায় তার।
.
লাঞ্চের সময়েই আরও ভালো চিকিৎসার জন্য সুরভিকে কাছের একটি হসপিটালে শিফট করা হয়। দুপুরের খাওয়া সেরে আবারও বন্দনার মুখোমুখি হয় সায়ন আর সোমদত্তা। খুব ঠান্ডা গলায় সায়ন বলে, ‘দেখুন বন্দনা ম্যাডাম, আপনি খুন করেছেন এবং সেটা সম্পূর্ণভাবে প্রমাণিত। তাই আপনাকে হাজতে পুরতে আমার দু-মিনিটও লাগবে না। কিন্তু কী জানেন, আমি বিশ্বাস করি যে একটা মানুষ জন্মেই অপরাধী হয় না। সেটা আপনার কথা থেকেও প্রমাণিত। আপনি আত্রেয়ী সেনের ওপর রাগ থেকে এই কাজটা করেন। কিন্তু একটা কথা কিছুতেই বুঝতে পারছি না, আত্রেয়ী সেনের ওপর শোধ নিতে গিয়ে শান্তনুকে মারার প্ল্যান কেন করলেন? আপনিই-বা ওই অত দূরে পৌঁছোলেন কীভাবে? টাকা কোথা থেকে পেলেন? এই সবটুকু আমরা জানতে চাই। আমি চাই না আপনার মুখ থেকে কথা বের করবার জন্য আমাদের অযথা কঠিন হতে হোক। নিন শুরু করুন।’
.
বন্দনা চুপ। ‘বন্দনা ম্যাডাম, প্লিজ, সোমদত্তা বলল কথাটা। বন্দনা একটা বড়ো করে নিশ্বাস নিল। তারপর আনমনে মাটির দিকে দৃষ্টিনিবদ্ধ রেখে বলতে শুরু করল। ‘মায়ের মুখ থেকে সবটা শোনার পর আমার ভীষণ রাগ হতে থাকে। ঘেন্না হতে থাকে। যখনই আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছি তখনই মনে হয়েছে আয়নার ওপারের বন্দনা আমায় বলছে, তুই বেজন্মা। তোর কোনো পরিচয় নেই। তোর মা নেই, বাপ নেই। তুই একটা বাচাল দুশ্চরিত্র মেয়ের ফূর্তির ফল। যন্ত্রণায় আমার মাথাটা ছিঁড়ে যেত। মায়ের অসুস্থতার জন্য আমি যে-কদিন ছুটি নিয়েছিলাম এক মিনিটের জন্য দু-চোখের পাতা এক করতে পারিনি। একটা সময় মনে হতে লাগল, আচ্ছা, আমি তো ছোটোবেলা থেকে খেলতে ভালোবাসতাম। দৌড়োতে ভালোবাসতাম। ক্যারাটেতে আমি আরও অনেক, অনেক ওপরে উঠতে পারতাম। আমি আরও বড়ো কোথাও বিউটিশিয়ান কোর্স করতে পারতাম। এগুলো কেন হল না? ঠিক তখনই মনে হত আত্রেয়ী সেনের মেকআপে কোনো একটা বিষাক্ত কেমিক্যাল মিশিয়ে সারাজীবনের জন্য ওর ওই সুন্দর মুখটা পুড়িয়ে দিই। ঘুচে যাক ওর ঠাট-বাট সব। পরক্ষণেই ভাবলাম, আমি এত বোকা কেন! আত্রেয়ী সেনের যা আছে তা তো সব আমার। সব আমার। ও যখন আমায় জন্ম দিয়ে এই পৃথিবীতে এনেছে তখন ওরই তো দায়িত্ব আমায় ভালো রাখা। কিন্তু তা না হয়ে আজ আমি আমার জন্মদাত্রীর কাছে চাকরির জন্য হাত পেতেছি। তার খিদমত খাটছি। জানেন স্যার, আমার না ছোটো থেকে খুব রাগ। সবার ওপর না। যখন আমি বুঝতে পারি একটুখানি হলেও কেউ আমায় ঠকিয়েছে তখন আর আমি নিজেকে সামলাতে পারি না।’
— একদম ডিরেক্ট মেরে দেন। সে হাতে যদি কম্পাস থাকে তাতেও আপনার কিছু যায় আসে না তাই তো।
সায়নের কথাগুলো শুনে রীতিমত আকাশ থেকে পড়ল বন্দনা। সোমদত্তাও এবার থ। সায়ন বলল, ‘সারদাসুন্দরী বিদ্যালয়ের ক্লাস সিক্সের ছাত্রী অণিমা তপাদার। আপনার ব্যাচমেট। আপনি জানতেন সে ভীষণ ভালো বন্ধু। কিন্তু সেই অণিমাই টিচার্স রুমে গিয়ে দিদিমণিদের কাছে আপনার নামে মিথ্যে কথা বলে আসত যে, আপনি নাকি ওকে রোজ ক্যারাটে করার নাম করে মারেন, সেটা আপনি জানতেন না। অন্য একটি মেয়ে একদিন ওভার-হিয়ার করে এসে আপনাকে জানায়। দিদিমণি সেদিন আপনাকে শাস্তি দেয়। গার্জেন কল করে এবং একটা পরীক্ষায় বসতে দেন না। ব্যাস, আপনি খেপে যান। এরপর একদিন সত্যি সত্যি ক্যারাটের নাম করে জিয়োমেট্রির কম্পাসটা বসিয়ে দেন মেয়েটির পিঠের ডানদিক বা বাঁ-দিকে। এবার আর গার্জেন কল নয়। সোজা টিসি। একটা বছর লস হল আপনার। পরের বছর লোকাল এমএলএ-র বদান্যতায় ভরতি হলেন কমলা গার্লস বিদ্যানিকেতনে।
গল্পটা শেষ করে শ্যেনদৃষ্টিতে সায়ন চেয়ে থাকে বন্দনার দিকে। সোমদত্তা একেবারে হাঁ হয়ে যায়। সায়ন আর কথা না বাড়িয়ে মুচকি হাসে সোমদত্তার দিকে তাকিয়ে। তারপর বন্দনাকে বলে, ‘নিন। শুরু করুন।’ ‘কী করে জানলেন’ এই প্রশ্নটা আর করল না বন্দনা। সে আবার বলতে শুরু করল তার জীবনবৃত্তান্ত। অনেক ভালো হয়ে থাকার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু পারলাম না। ভেবে দেখলাম, যা আমার পাওনা তা আমাকেই জোগাড় করতে হবে। সে যেভাবে হোক। সেদিন প্রচণ্ড বৃষ্টি। নিম্নচাপ তখনও চলছে। শহর ভেসে যাচ্ছে। সেদিন আমার যাওয়ার কথা ছিল না। কিন্তু আমি কিছুতেই বাড়িতে বসে থাকতে পারলাম না। খালি মনে হতে লাগল, দেরি হয়ে যাচ্ছে। আমার বয়সটা বেড়ে যাচ্ছে। মা-কেও সুস্থ করতে হবে। কারণ মা ছাড়া আমার কেউ নেই। আর যেই ঠকাক আমায়, যে মা তার নিজের সন্তান না জেনেও এমন করে একটা মেয়েকে বড়ো করে তোলে, এত ভালোবাসা দেয় সেই মা আমায় কক্ষনো ঠকাবে না। তাই মায়ের জন্য আমায় আমার প্রাপ্য বুঝে নিতেই হবে। আত্রেয়ী সেনের বাড়ি গিয়ে শুনলাম তিনি সকালে বেরিয়ে গেছেন। শান্তনু স্যারও নেই। তবে তন্ময়দা বাড়িতে আছে। নামটা শুনতেই পেটের ভেতর থেকে গুলিয়ে ওঠে। চোখের সামনে ঝলসে ওঠে আত্রেয়ী সেনের সঙ্গে তন্ময়ের ঘনিষ্ঠ মুহূর্তগুলো। তখনই শুনতে পেলাম আমার মা বলছে, ওই আত্রেয়ী সেনই যে তোর জন্মদাত্রী মা রে বাণী।’ রাগে ঘেন্নায় আমার সারা শরীর রিরি করতে থাকে। মনে মনে ঠিক করে নিই সবার আগে এই তন্ময়কেই আমায় কাছে টানতে হবে। ওর কাছেই আছে আত্রেয়ীকে বশ করার মন্ত্র। ও যা বলে আত্রেয়ী সেন তাই করে। একেবারে অগাধ বিশ্বাস।’ এরপর বন্দনা একটু থামে। সায়ন আর সোমদত্তার দিকে কাঁপা কাঁপা চোখ তুলে তাকায়। তারপর বলে, ‘তন্ময় আমার বেডরুমে এসে কিছু রেকর্ড করেনি। তন্ময়কে আমিই প্রোভোগ করি। এর আগে তন্ময় সুযোগ পেলেই আমার সঙ্গে কোনো-না-কোনো ছুতোয় কথা বলতে আসত। মিশতে আসত। তাই আমি নিশ্চিত ছিলাম, তন্ময়ের মতো কামুক ছেলে আমার ফাঁদে পা দিতে বাধ্য।’
সোমদত্তা জিজ্ঞাসা করল, ‘কী করলেন আপনি?’ ছলনাময়ী নটীর মতো চোখ তুলে তাকাল বন্দনা।
বাইরে আকাশ ভেঙে পড়েছে। সেদিনও ছলনাময়ী নটীর ভাব নিয়ে তন্ময়ের গা ঘেঁষে বসল বন্দনা। তন্ময় নীচের ডাইনিঙে সোফাটায় বসেছিল। বন্দনার এ হেন আচরণে সে তো বেশ অবাক। হালকা হাসি নিয়ে প্রশ্ন করল, ‘কিছু বলবে বন্দনা?’ ঠোঁটের কোণে আহ্লাদি রং ফুটিয়ে ওপর-নীচে ঢকঢক করে ঘাড় নাড়ল।
— বলে ফেলো। দেরি কেন?
তন্ময় জানতে চাইল।
— আসলে ম্যাডাম সবসময় থাকেন বলে আপনার সঙ্গে ঠিকমতো কথা বলা হয় না। যদি রেগে যান!
হাসিতে তন্ময়ের বুকটা নেচে ওঠে। সে বলে, ‘এখন তো নেই। কী কথা বলবে বলো।’
— আমার বহুদিনের একটা ইচ্ছে আছে।
— হুম? তা কী ইচ্ছে শুনি।
— না থাক। আপনি আমায় খারাপ ভাববেন।
বন্দনার গালের কাছে মুখ এনে তন্ময় ফিশফিশ করে জিজ্ঞেস করে, ইচ্ছেটা কী?’ তন্ময়ের দিকে মুখ ঘোরায় বন্দনা। এখন তন্ময় আর বন্দনার মুখের মাঝে এক আঙুলের দূরত্ব। বন্দনা বলল, ‘আমায় কয়েকটা ছবি তুলে দেবেন?’ মুখের সামনে থেকে সরে গেল তন্ময়, ‘এইটুকু ইচ্ছে? তার জন্য এত…! বন্দনা, পারো তুমি। কবে ছবি তুলবে বলো।’
— আজই।
তন্ময় একটু থমকে গেল। ‘আজই! কিন্তু ক্যামেরা নেই যে। তুলব কীসে?’
— আপনার আই ফোনে। যথেষ্ট হাই রেজোলিউশন।
— বেশ। কোথায় যাবে বলো? বাইরে তো তুমুল বৃষ্টি।
— ঘরেই তুলব।
— যথা ইচ্ছা।
হঠাৎ সাপিনীর মতো তন্ময়ের দিকে তাকাল বন্দনা। হিসহিসে গলায় বলল, ‘একটু সাহসী হলে লজ্জা পাবেন না তো?’ বন্দনা বুঝল, তন্ময়ের চোখ-মুখ কেমন যেন -ধূর্ত সাপুড়ের মতো হয়ে গেল। সে-ও পালটা উত্তর দিল, ‘বেশ তো, দেখি কতটা সাহসী হতে পারো।’
— ডাকলে আসবেন।
বলেই বন্দনা ঘরের অভিমুখে চলে গেল। তন্ময় দেখল হেলেদুলে এক সাপিনীর চলে যাওয়া। একটু পরে যখন দরজা খুলে বন্দনা ডাকল, ‘তন্ময়দা, আসুন’, তন্ময় গেল। দেখল দরজা ধরে দাঁড়িয়ে আছে এক জলজ্যান্ত বিদ্যুৎ। বৃষ্টিভেজা গা সে মোছেনি। চুলও ভিজে অবিন্যস্ত। বড়ো সাদা তোয়ালেটা শুধু বুকের ওপর দিয়ে জড়িয়ে রাখা। চুল থেকে বুকের খাঁজে ঝরে পড়ছে বিন্দু বিন্দু জল। শুধু একটু উষ্ণতার জন্য। উদ্ভিন্নযৌবনে জাপটে থাকা তোয়ালেটা নেমে এসেছে হাঁটুর ওপর পর্যন্ত। তন্ময়ের চোখে এক আকাশ আকস্মিক বজ্রের ঝলকানি। নিশ্বাস ঘন হয়ে এসেছে তারও। বন্দনা চোখের ইশারায় ঘরে ডেকে নেয় তন্ময়কে। বাঁ-পা হাঁটু থেকে ঈষৎ ভাঁজ করে কোমরে হাত রেখে দাঁড়ায় বন্দনা। তন্ময় কোনো কথা না বলেই ডান পা-টাকে পেছনে ভাঁজ করে তুলে দরজাটা ঠেলে দেয়। শব্দ করে বন্ধ হয়ে যায় দরজাটা। ‘নিন, ছবি তুলুন!’ বলেই বারান্দা আর ঘরের মাঝে যে কাচের দরজা তার পর্দাটাকে অল্প সরিয়ে দেয়। কাচের দরজায় অজস্র জলের কণা বাষ্প বুকে নিয়ে জমে আছে। কাচের এপার থেকে তাদের গায়ে হাত রেখে তন্ময়ের দিকে পেছন ফিরে ইংরেজি ‘এস’ অক্ষরের মতো দাঁড়ায় বন্দনা। ছবি তুলতে থাকে তন্ময়। ক্যামেরার স্ক্রিনে ফুটে উঠতে থাকে বন্দনার এক-এর পর এক দেহসৌষ্ঠব। ছবি তুলতে তুলতে এখন অনেকটা কাছাকাছি তন্ময়। তার মুখ দিয়ে আপনা থেকেই বেরিয়ে আসে, ‘আত্রেয়ী যে ঘরের মধ্যে এমন আগুন পুষে রেখেছিল বুঝতে পারিনি তো!’ মোবাইল ক্যামেরার লেন্সে হাত রাখে বন্দনা। ক্যামেরা কেড়ে নিয়ে অফ করে দেয়। মোবাইলটা বন্দনার হাত থেকে বিছানায় গিয়ে পড়ে। তন্ময়ের গায়ের সঙ্গে গা ঠেকিয়ে বন্দনা বলে, ‘সেটা আঁচ করতেই তো বারবার কথা বলতে আসতে, তাই না?’ আর কথা নয়, তন্ময়ের হাতদুটো বন্দনার পিঠে শিকলের মতো একে অপরের সঙ্গে আটকে যায়। তার পরমুহূর্তেই সাপিনীর ঠোঁটে সাপুড়ের ঠোঁট ডুবে যায়। খেলতে শুরু করে শরীরের ওপর শরীর। উত্তাল সমুদ্রে ফুলে ওঠা ঢেউয়ে টাইটানিকও পথ হারায়। এরা তো ছোট্ট দুটো নৌকা মাত্র। হাল ছেড়ে স্রোতের বুকে গা ভাসিয়েছে। নরম বিছানায় ঢেউ উঠেছে। নৌকো দুটো উলটে-পালটে একের ওপর অন্যে উঠে পড়ছে, ফুলছে, গভীর শ্বাস নিয়ে নেমে আসছে। ঘন ঘন শীৎকারে মাতাল হচ্ছে।
.
‘তবু আগুন, বেণীমাধব আগুন জ্বলে কই? কেমন হবে আমিও যদি নষ্ট মেয়ে হই?’ কবিতার অন্তিম দুটো চরণ বলতে গিয়ে গলাটা কেঁপে উঠল বন্দনার। ইন্টারোগেশন রুমে ঝুলতে থাকা হলুদ আলোটার আগুন হয়ে জ্বলার কথা ছিল। কিন্তু জ্বলছে না। সেই আলোর দিকে তাকিয়ে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে চোখ। তবু জোর করে তাকিয়ে আছে সে। দু-চোখ বেয়ে টপ টপ করে জল পড়ছে তার। ‘ছোটো থেকে শুনে এসেছি, কাঁটা দিয়ে কাঁটা তুলতে হয়। আত্রেয়ী সেনের মেয়ে আমি। শরীর হল তার কাছে সিঁড়ি। আর সেই সিঁড়ির নীচের ময়লা হলাম আমি। এবার সেই শরীর হাতিয়ার করেই আত্রেয়ীকে ধ্বংস করব। ওর সবকিছু কেড়ে নেব আমি।’
— অন্যভাবেও তো হতে পারত।
সোমদত্তার কথা শুনে ঠোঁট বেঁকিয়ে হাসল বন্দনা। বলল, ‘কীভাবে? বলুন।’
— আত্রেয়ী সেন জানতেন আপনি ওঁর মেয়ে। তাই লোক জানাজানির একটা ভয় তো নিশ্চয়ই ছিল। আপনি যদি আপনার মায়ের চিকিৎসার জন্য টাকা চাইতেন আমার মনে হয় উনি হেসেখেলে দিয়ে দিতেন।’
— ভিক্ষে?
অন্তরের বিবমিষা উগরে দেয় বন্দনা। অণিমার পিঠে কম্পাসটা বসিয়ে দিয়েছিলাম বলে বড়ো দিদিমণি আমায় ক্ষমা চাইতে বলেছিলেন। কান ধরে সহপাঠীর কাছে সরি বলতে বলেছিলেন। কিন্তু একবারও অণিমাকে কেউ বলেনি আমায় সরি বলতে। কেউ জানতে চায়নি যে, সে আমার নামে কেন বারবার মিথ্যে বলেছিল। তাই আমিও সরি চাইনি। উলটে বলেছিলাম, যা করেছি বেশ করেছি। আপনারাই তো বলেন, অন্যায় করলে শাস্তি পেতে হয়! আমি শাস্তি দিয়েছি। অন্যায়টা কোথায় করেছি? আমার অপরাধ তো অস্বীকার করছি না আমি। কিন্তু অণিমা যে অপরাধ করেছে সেটা ও একবারও স্বীকার করেনি। আত্রেয়ী সেনও স্বীকার করত না। তাই তো ওই ছবিগুলো লোপাট করতে চেয়েছিল। আমাকেও তো বলতে পারত, আমি তোর সঙ্গে যা করেছি অন্যায় করেছি। আমায় ক্ষমা করে দে। বলুন, বলতে পারত না? কিন্তু সে তো বলেনি। একবারের জন্যেও বলেনি। আর সেই আমি কিনা ভিক্ষে চাইব ওই মহিলার কাছে? তার চেয়ে আমার ফাঁসি হোক। কোনো দুঃখ নেই।’
সায়ন আর সোমদত্তা বিস্ময়ে হতবাক। একটা নিতান্ত সাধারণ মেয়ের মধ্যে এত জোর কীভাবে আসে? পুরাণে দুর্গা, কালীর উদাহরণ থাকলেও নারী মানেই কোমলপ্রাণা। এমনই ধারণা আজও পোষণ করে সব্বাই। কিন্তু এই কোমলপ্রাণা কমললতার মাঝে বন্দনা হল ইষ্টকদৃঢ় মূর্তি। যে পাপ-পুণ্য, স্নেহ-প্রেম, ঝড়-তুফানেও ভাঙে না কখনও। কেবল সোজাসাপ্টা বিচার চায়। উত্তর চায়। কেন এমন হল? কেন সে করল না? কেন তাকে সইতে হবে? ‘কেন’ এই শব্দটাই তার হৃদয়ের চারপাশে তিনশো পয়ষট্টি দিন চব্বিশ ঘণ্টা প্রাণবায়ুর মতো ঘুরপাক খেতে থাকে। বন্দনারা বেঁচে থাকে অজস্র প্রশ্নের শবদেহের ওপর।
