মৃত জ্যোৎস্নার রাত্রি – ৪২
বিয়াল্লিশ
স্তনবৃত্ত শুষে নিয়ে তন্ময়ের ঠোঁটটা বন্দনার গলার কাছে পৌঁছোয়। শরীরী নেশায় ডুবে আছে তন্ময়। আজকাল সুযোগ খোঁজে বন্দনাকে কাছে পাওয়ার। নিজের বাড়িতেও ডেকে পাঠাচ্ছে। বন্দনাও ফাঁক-ফোকর দেখে চলে আসে তন্ময়ের ফ্ল্যাটে। এমনই একদিন তন্ময়ের হাতের তালুদুটো যখন বন্দনার স্তনমর্দনে ব্যস্ত, উত্তপ্ত পৌরুষ যখন যোনির আশেপাশে ইতস্তত ঘুরছে গুপ্তকক্ষে প্রবেশের আশায়, ঠিক তখনই প্রশ্নটা করে বসে বন্দনা, ‘আত্রেয়ীকে বিয়ে করবে তুমি?’ আগে-পিছে দুলন্ত শরীরটা হঠাৎ থেমে গেল। ভ্ৰূদুটো কুঁচকে গলার কাছ থেকে মুখ তোলে তন্ময়। ঘর্মাক্ত মুখে লাল চোখ দুটো হঠাৎ হেসে ওঠে, তুমিও যেমন। শালা বুড়ি মাগি বিছানা অবধি ঠিক আছে। বিয়ে-ফিয়ে ধুস।’ বলেই মুখটা বন্দনার কানের পাশে ঘষতে যায় তন্ময়। সঙ্গে সঙ্গে বন্দনা বলে ওঠে, ‘আমায় বিয়ে করবে তুমি?’ আবারও হোঁচট খায় তন্ময়। মুখ তুলে বলে, আজ কী হয়েছে তোমার? এত বিয়ে-বিয়ে করছ কেন?’
— নাহ্। কিছু না। তুমি তো আমার সঙ্গেও শুচ্ছ আবার আত্রেয়ীর সঙ্গেও।
— তো? কী বলতে চাইছ বলো তো? ধুস, মজাটাই চটকে দিলে। বন্দনার বুকের ওপর থেকে নেমে বিছানায় চিৎ হয়ে শুল তন্ময়। সেই, আমি তো পুতুল। মজা নাও খালি।’ বন্দনার স্বরে অভিমানী সুর দেখে তন্ময় বলল, ‘বাবা! এত অভিমান? দেখো, আত্রেয়ী আর আমার সম্পর্কটা ওই দুজন ক্লায়েন্টের মতো। ও বিশ্বাস করে আমার ক্যামেরাতেই ওকে সবচেয়ে ভালো লাগে। আমি ক্যামেরা করলে ওর ছবি হিট করে। আর সেটা সত্যিও। আমি ছাড়া আর একজনও আত্রেয়ীকে এক্সপ্লোর করতে পারেনি। তার জন্য ও কাজও পেয়েছে অনেক। আবার এটাও ঠিক, আত্রেয়ীকে সুখে রাখলে আমার কাজের অভাব হবে না। যদিও সেক্ষেত্রে সুখটা এক তরফা। যতই ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াক, কিসসু নেই। আমাকেই খেটে মরতে হয়। কিন্তু তোমার ক্ষেত্রে তো তা নয়।’ বলতে বলতে আবার বন্দনার গায়ের ওপর এসে পড়ে। বন্দনা সরিয়ে দেয়। রিকোয়েস্ট করে, ‘নেজাল ড্রপটা দেবে প্লিজ? নাকটা বন্ধ হয়ে গেছে।’
— কোথায় আছে?
তন্ময়ের দিকের বিছানার পাশে একটা কালো ব্যাগ রাখা ছিল। সেটা দেখিয়ে বলল, ‘ওটার মধ্যে। ব্যাগের চেন খুলে হাতড়াতে থাকে তন্ময়। ‘কোন খাপে রেখেছ?’
— দেখো না, ওটার মধ্যেই।
তন্ময় ব্যাগের আর-একটা খাপে হাত ঢোকাতেই জিনিসটা পেয়ে যায়। কিন্তু সঙ্গে পায় আরও কিছু। তিনটে ছবি। বের করে নেয়। ছবি দেখেই চমকে ওঠে তন্ময়। আত্রেয়ীর কম বয়সের ছবি। তার কোলে একটা বাচ্চা। পরের ছবিতে বন্দনার মা ও আরও দুজন পুরুষ। বন্দনার মায়ের কোলেও একটি বাচ্চা। বাচ্চার কাপড়ের রং দেখে বোঝা যাচ্ছে দুটো একই বাচ্চা। ‘এগুলো কী বন্দনা?’ বন্দনা চমকে ওঠে। ‘এ কী! এগুলো নিয়েছ কেন?’ বলেই ঝাঁপিয়ে পড়ে তন্ময়ের হাত থেকে ছবিগুলো নেবার জন্য। তন্ময় ঝট করে হাতটা সরিয়ে নেয়। আগে বলো আত্রেয়ীর অল্প বয়সের ছবি তোমার কাছে কী করে এল?’
— বলছি। তুমি আগে দাও।
— না আগে বলো।
তন্ময়ের হাত থেকে জোর করে ছিনিয়ে নিল ছবিগুলো। ব্যাগের ভেতর ঢুকিয়ে দিয়ে বন্দনা বলল, ‘আমারই ভুল। তোমাকে নেজাল ড্রপ না দিতে বললেই হত।’ বন্দনাকে দু-হাতে ধরে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নেয় তন্ময়, কথা ঘুরিয়ো না বন্দনা। আত্রেয়ীর কোলে যে বাচ্চা সেই বাচ্চাই তোমার মায়ের কোলে গেল কী করে? তোমার মা কি আত্রেয়ীকে চিনত?’
— কে বলল বাচ্চাদুটো একই? বাচ্চার সাইড ফেস দেখে সব বুঝে গেলে?
— হ্যাঁ গেলাম। দুজনেরই সাইড ফেস এক। গায়ের কাপড়টাও একই কালারের। এমনকি আত্রেয়ী আর তোমার মা দুজনেই কমবয়সি। প্লিজ এখন বোলো না ওটা তোমার মা নয়। সেদিন তোমায় বাড়ি থেকে তুলতে গিয়ে মাসিমার সঙ্গে বেশ খানিকক্ষণ কথা হয়েছে। কয়েকটা চুল পাকা আর মোটা হয়ে যাওয়া ছাড়া কোনো পরিবর্তন নেই।
— সত্যি, তোমার চোখ আছে তন্ময়দা।
— আমি জানতে চাইছি আত্রেয়ীর কম বয়সের ছবি তুমি কোথা থেকে পেলে? বাচ্চাটা একই কী করে হল? তোমরা কি আগে থেকেই পরিচিত?
বন্দনা একটু চুপ করে রইল। তন্ময় উত্তরের আশায় ঘাড় বেঁকিয়ে প্রশ্নাতুর চোখে বন্দনার দিকে তাকিয়ে নীরব। বন্দনা হঠাৎ তন্ময়ের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আত্রেয়ী সেন আমার বায়োলজিক্যাল মাদার।’ এখনও নীরব তন্ময়। বন্দনার চোখ ভাষাহীন। ওর চোখে কোনো মজার ইশারা নেই। নেই কোনো উত্তেজনা। ভীষণ নির্লিপ্ত সে। এইটুকু সময়ে বন্দনাকে ভয়ানক মনে হল তার। তবু প্রশ্ন করল, ঠাট্টা করছ?’ বন্দনার দৃঢ় জবাব, ‘না। ডিএনএ টেস্ট করাবে?’ তন্ময় ছিটকে গেল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে পুরো ব্যাপারটাকে হজম করে বলল, ‘এটা কী করে সম্ভব হল?’ বন্দনা সব জানাল তন্ময় চোখে হাত চাপা দিয়ে বসে রইল। ‘তুমি যে সব জানো সেটা জানাওনি কেন?’
— প্রতিশোধ নেব বলে।
তন্ময় বজ্রাহতের মতো বন্দনার মুখের দিকে তাকায়। ‘মানে?’
— আত্রেয়ী সেনের যা কিছু আছে সব আমার। সব। ওর জীবনে কোনো সুখ থাকতে পারে না। ওর জীবনে কোনো ঐশ্বর্য থাকতে পারে না।
— একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
— বলো।
— মায়ের রেড পার্টনারের সঙ্গে নিজের বেড শেয়ার করতে খারাপ লাগল না?
বন্দনা খপ করে ডানহাত দিয়ে তন্ময়ের গলাটা টিপে ধরে। আমার মায়ের নাম সুরভি দত্ত। কোনো বেশ্যা আমার মা হতে পারে না।’ এক ঝটকায় হাতটা তন্ময়ের গলা থেকে নামিয়ে নেয় বন্দনা। দাঁতে দাঁত পিষে বলে, ‘আমার মায়ের স্টেন্ট বসাতে হবে। এখন না বসালে পরে বাইপাস সার্জারি পর্যন্ত কেসটা গড়াবে। তারপর চিকিৎসা তো রয়েইছে। আমার অনেক টাকার দরকার তন্ময়দা। আমার মা-কে বাঁচাতেই হবে। আত্রেয়ী সেনের অট্টালিকা আমায় ভাঙতেই হবে। ওর সব সম্পত্তি হবে আমার। তুমি যদি হেল্প কর, সেখানে তোমারও ভাগ থাকবে। কথা দিচ্ছি
খ্যাঁকখ্যাঁক করে হেসে উঠল তন্ময়। বিবস্ত্র শরীরটা দুলে দুলে উঠল। ‘এতে হাসির কী হল?’ বিরক্তমুখে জিজ্ঞেস করল বন্দনা। মাথার বালিশটা দেয়ালে ঠেকিয়ে হেলান দিল তন্ময়। রিল্যাক্স হয়ে বলল, ‘বেকার বেকার বিয়ের প্যাঁচাল পাড়ছিলে। দ্যাখো, এখন কেমন সম্পর্কটা ক্লায়েন্টের মতো হয়ে গেল।’
— সাহায্য করবে কিনা বলো।
— ফিফটি ফিফটি।
বন্দনা এটাই আশা করেছিল মনে মনে। বিয়ে-ফিয়ে সব ফালতু অজুহাত। তন্ময়ের প্রতি নিজের পীরিত বোঝাতে আর আত্রেয়ীকে সে ঠিক কী চোখে দেখে সেটা বুঝতে ওইসব নাটকীয় কথার অবতারণা। আসলে তন্ময়কে একটু বাজাতে চেয়েছিল সে। বন্দনা ভাবল, এই বিপুল সম্পত্তির অর্ধেক ভাগ হলেও কম কিছু নয়। তাই হালকা হেসে বলল, ‘বেশ। তাই হবে।’
— কিন্তু অসুবিধে আছে।
তন্ময় বলল।
— কীসের?
— আত্রেয়ীর জীবনের সব কিছুতে বড়ো বাধা শান্তনু। ও থাকলে কিচ্ছু হওয়া সম্ভব নয়।
বিছানার ওপরে পড়ে থাকা ব্রা-টা তুলে গায়ে পরতে যায় বন্দনা। তন্ময় এক ঝটকায় সেটা কেড়ে নেয়। ‘আঃ! কী হচ্ছে কী?’
— উঁহু!
— মানে?
এক হাতে ব্রা আর অন্য হাতে প্যান্টিটা তুলে দেখিয়ে তন্ময় বলে, ‘এটা আর এটা, এখন থেকে আমার কাছে থাকবে। এখানে।’
— পাগল নাকি? কী অসভ্যতা করছ? দাও।
বন্দনা শূন্যে হাত চালায় দুটো ছিনিয়ে নেবার জন্য। কিন্তু মিস হয়ে যায়। আরে আমি কী পরে বাড়ি যাব?’
— তুমি যখন থাকবে না। তখন এগুলোর ঘ্রাণ নেব আমি।
কথাটা বলেই তন্ময় বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ে। ভেতর থেকে বন্দনার গা-টা গুলিয়ে ওঠে। পরক্ষণেই ভাবে, ভালোই তো। তন্ময় যত নোংরা হবে ততই বন্দনার লাভ। আলমারির দিকে এগিয়ে যায় তন্ময়। বন্দনা বলে ওঠে, ‘এরকম কোরো না তন্ময়দা প্লিজ।’ তন্ময় কোনো কথায় কান না দিয়ে আলমারি খোলে। হাতের দুটো রেখে নতুন দু-খানা প্যাকেট বের করে। আলমারি বন্ধ করে বন্দনার কোলে ছুড়ে দিয়ে বলে, ‘এগুলো পরে বাড়ি যাবে।’ বন্দনা প্যাকেট খুলে দ্যাখে নতুন ব্রা আর প্যান্টি। মুচকি হেসে বন্দনা জিজ্ঞেস করে, ‘মাপ জানলে কী করে?’ হাত দুটো ক্যামেরার ফ্রেমের মতো করে চোখ পাকিয়ে এগিয়ে যায় বন্দনার বুকের দিকে, বলে, ‘ক্যামেরার ফ্রেমে সবকিছু সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম নজর করতে হয়।’ বন্দনা চোখ তুলে হাসে। তন্ময় বসে পড়ে। প্যাকেট খুলে নতুন ব্রা বের করতে করতে বলে, ‘সরিয়ে দিতে হবে।’ প্রথম চোটে তন্ময় ঠিক ধরতে পারে না, ‘কী?’
— বাধা। আমাদের রাস্তায় যে বাধা হয়ে দাঁড়াবে তাঁকে সরিয়ে ফেলতে হবে। ব্রায়ের স্ট্যাপে দুটো হাত গলিয়ে দেয় বন্দনা। তন্ময় বলে, ‘কিন্তু কীভাবে?’
— একটু লাগিয়ে দাও না প্লিজ।
এলো পিঠটা তন্ময়ের সামনে মেলে ধরে বন্দনা। তন্ময় ব্রায়ের স্ট্র্যাপদুটোকে টেনে কাছাকাছি আনে। তখন বন্দনা বলে, ‘প্ল্যান করতে হবে।’ সপ্রশ্ন দৃষ্টি নিয়ে বন্দনার দিকে তাকায় তন্ময়। বন্দনাও ঘাড় ঘুরিয়ে তন্ময়ের দিকে তাকায়।
.
সায়ন বলল, ‘তার মানে ভারমোরে যাওয়াটা আপনার প্ল্যান?’ বন্দনা আলতো করে চোখ তুলে সায়নকে বলে, ‘হুম। আমিই তন্ময়দাকে বলেছিলাম, আত্রেয়ীকে নিয়ে কোথাও একটা বেড়াতে যেতে। এতে শান্তনুর সঙ্গে দূরত্ব আরও বেড়ে যেত। শান্তনু এমনিতেই রাগে ফুঁসতে থাকে সর্বক্ষণ। দু-চক্ষে সহ্য করতে পারত না আত্রেয়ীকে। এর মধ্যে একদিন তন্ময়ের কাছ থেকে শুনি, আত্রেয়ীও নাকি কথায় কথায় বলেছে শান্তনুকে আর সহ্য করতে পারছে না। ইচ্ছে করছে ওকে চিরকালের মতো শেষ করে দিই। আর ঠিক সেই সুযোগে তন্ময় আরও খেপিয়ে দেয় আত্রেয়ীকে। কিন্তু ব্যাপারটা কী হবে কেউ বুঝতে পারছিল না। এমনকি তন্ময়কে যখন বেড়াতে যাবার কথা বলি তখন ও আমায় বলে, আমি একা কিছু করতে পারব কিনা। আমার মাথায় তখন অন্য প্ল্যান। আমি সেটা তন্ময়কেও বুঝতে দিই না। ওরা চলে যায়। ফ্লাইটে গিয়েছিল। এক রাত চাম্বায় থেকে পরের দিন ভারমোর পৌঁছে যায় ম্যাডামরা। ওরা পৌঁছোনোর পরের দিন আমি আমার জন্ম পরিচয়ের কথা জানাই শান্তনুকে।’
— কীভাবে? সরাসরি গিয়ে বলে দিলেন?
প্রশ্ন করল সোমদত্তা। দু-পাশে ঘাড় নাড়ল বন্দনা।
.
শান্তনু ক্যামেরার ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে দোতলায় নিজের ঘর থেকে বেরোচ্ছিল। সিঁড়ির কাছটায় এসে পা দুটো হঠাৎ থমকে গেল তার। একটা কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছে আত্রেয়ীর ঘর থেকে। আত্রেয়ী বাড়িতে নেই। ওই ঘরে একমাত্র বন্দনাই ঢোকে। কাজের লোক কাজ করতে ঢুকলেও বন্দনা পাহারা দেয়। ওই ঘরে শান্তনুরও যখন তখন ঢোকার অনুমতি নেই। কান্নার আওয়াজটা পেয়ে তারও কৌতূহল হল। এগিয়ে গেল দরজার সামনে। দেখল আলমারি খোলা। তার সামনে দাঁড়িয়ে আড়ালে মুখ গুঁজে সে কাঁদছে। কাঁদছে যখন কাঁদুক। আত্রেয়ীকে বাঁচাতে এই মেয়েটাই তার গায়ে হাত তুলবে বলেছিল না? ক্যারাটে জানার ভয় দেখিয়েছিল। ও কাঁদল তো বয়েই গেল। কথাগুলো মনে পড়তেই মুখ ঘুরিয়ে চলে যাচ্ছিল শান্তনু। কিন্তু বিড়বিড় করে বলা বন্দনার কথাগুলো তাকে আবার আটকে দিল। ‘এরকম কেন করলে মা? আমার কী দোষ ছিল? তুমি এরকম না করলে তো আমার জীবনটা এমন করে ছারখার হয়ে যেত না মা!’
মা?
বন্দনার মায়ের কী হয়েছে? ওর হাতে যেন কিছু একটা আছে মনে হচ্ছে। তা ছাড়া আত্রেয়ীর আলমারি খুলে ওর মার জন্য কাঁদছে কেন? কৌতূহল দমন করতে না পেরে বিনা শব্দে বন্দনার পিছনে গিয়ে দাঁড়ায় শান্তনু। ইতস্তত করেও ডেকে ওঠে, ‘বন্দনা।’ আপন মনে কাঁদতে থাকা বন্দনা শান্তনুর গলা পেয়ে চমকে ওঠে। চট করে শান্তনুর দিকে ফিরতেই হাত ফসকে একটা ছবি শান্তনুর পায়ের কাছে গিয়ে পড়ে। অপেক্ষা না করে সেই ছবি হাতে তুলে নেয় শান্তনু। চমকে ওঠে সে। ছবিতে অল্প বয়সের আত্রেয়ীর কোলে একটি ছোট্ট শিশু। বন্দনা এটা দেখে কাঁদছিল কেন? বন্দনার দিকে তাকাতেই ভয়ে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে রাখে সে।
— আত্রেয়ীর অল্প বয়সের ছবি তোমার হাতে কেন? কী হল? চুপ কেন বলো। কাকে তুমি মা মা বলছিলে? বন্দনা টেল মি।
দূর থেকে একটা প্লেনের আওয়াজ ভেসে আসছিল। ধীরে ধীরে সেটা বাড়তে থাকল। শান্তনু চিৎকার করে উঠল, ‘বন্দনা চুপ করে থেকো না বলো। বাচ্চাটা কে? এখানে কোথায় তোমার মা?’
বিদ্যুৎস্পৃষ্ট নায়িকার মতো মাথাটা ঝাঁকিয়ে শান্তনুর দিকে তাকিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে বন্দনা। দু-হাত জড়ো করে হাপুস নয়নে কাঁদতে কাঁদতে শান্তনুর পায়ের কাছে বসে পড়ে। রাগে থরথর করে কাঁপতে থাকে শান্তনু। বন্দনা লুটিয়ে পড়ে অঝোর কান্নায়। যেন বাড়ির ছাদের ওপর দিয়ে প্রবল শব্দে উড়ে যাচ্ছে প্লেনটা। ঘর কাঁপছে। দেয়ালের ফাটল প্রকট হচ্ছে। এক সমুদ্র কান্না ফেনিল ক্রোধ সমেত আছড়ে পড়ছে শান্তনুর পায়ে।
.
— শান্তনু দিল্লির ফ্লাইটের টিকিট পায় না। তাই পরদিন ভোরের ট্রেনে দিল্লি রওনা দেয়। তারপরের দিন সকালে দিল্লি পৌঁছবে। সেখান থেকে পাঠানকোট ফ্লাইটে গিয়ে গাড়ি করে ভারমোর। কিন্তু আমায় শান্তনুর আগেই ভারমোর পৌঁছোতে হবে। আমাদের শুটিংয়ের জন্য যিনি টিকিট অ্যারেঞ্জ করেন আমি তাঁকে ধরে দিল্লির ফ্লাইটের টিকিট জোগাড় করি।
.
বন্দনাকে থামিয়ে সায়ন বলল, ‘আপনি টিকিট পেলেন আর শান্তনু পেল না? উনিও তো ইন্ডাস্ট্রিরই।’ গম্ভীর হয়ে বন্দনা বলল, ‘আপনি যতদিন কাজে আছেন ইন্ডাস্ট্রি ততদিনই আপনাকে পুছবে। কাজ ফুরিয়ে গেলে কেউ কারও নয়। শান্তনু যখন কাজ করত তখনই তার শত্রুর অভাব ছিল না। মেয়েবাজি, বেশি টাকা নিয়ে কাজ পাইয়ে দেওয়া এইসবের জন্যেই তার পতন হয়। বাজারে অন্যান্য আরও ভালো ফোটোগ্রাফার এসে যায়। তাই আর শান্তনুর প্রয়োজন পড়ে না। আর শান্তনুও নিজের রেট কিছুতেই কমায় না। তাই হারিয়েও যায়। কিন্তু আমি আত্রেয়ী সেনের পিএ। আর কারও টিকিট হোক না হোক আমারটা ঠিক জোগাড় হয়ে যাবে এটা আমি জানতাম।’
— দিল্লি গেলেন?
— হুম। আমিও সেদিন দিল্লি বেরিয়ে গেলাম। তারপর সেখান থেকে পাঠানকোট হয়ে গাড়ি করে ভারমোর। পৌঁছোতে রাত হয়ে গেল।
— এক সেকেন্ড।
সোমদত্তা থামালো বন্দনাকে। ‘প্রথম কথা, দুটো ফ্লাইট, একটা গাড়ি। হোম-স্টের খরচা বাদ দিলাম। এত টাকা পেলেন কোথায়? দ্বিতীয় প্রশ্ন, শান্তনুও ভোরে বেরোল, আপনিও ভোরে বেরোলেন। কেউ কাউকে দেখলেন না?’
— না। কারণ শান্তনু আগের দিন রাতেই বেরিয়ে গিয়েছিলেন। আমি ওভার হিয়ার করেছিলাম। যে বন্ধু ওকে টিকিট করে দিয়েছে ও সম্ভবত তার বাড়িতে রাত কাটিয়ে ভোরে হাওড়া গিয়েছিল। কারণ ওর বন্ধু স্টেশনের কাছেপিঠেই থাকে। আর আমার কাছে আত্রেয়ী সেনের আলমারির চাবি থাকে। দরকার হলে সেখান থেকেই টাকা নিই। আত্রেয়ী খোঁজও নিত না।
— চুরি করতেন?
সায়ন বলল। দৃঢ়তার সঙ্গে বন্দনা জানাল, ‘আত্রেয়ীর সব কিছু তো আমারই। নিজের জিনিস নেওয়াটাকে চুরি করা বলে না।
— তাহলে তো আপনার হাতের কাছে সুযোগ ছিলই। মানুষ মারতে গেলেন কেন?
— টুকটাক টাকা নেওয়া আর গোটা সম্পত্তি নেওয়ার মধ্যে বিস্তর ফারাক স্যার। আত্রেয়ীর বিশ্বাস অর্জন করাটা প্রাথমিক কাজ ছিল। সেটা পেয়েছিলাম। কিন্তু তবু অনেক কিছুই আমার থেকে গোপন করে রাখত ম্যাডাম। একটা সন্দেহ ছিলই তার মনে। আমি সেটাও দূর করতে চেয়েছিলাম। নইলে ব্যাংকের কাজগুলো আমি করতে পারব না। কোথায় কত আছে সেটাও জানতে পারব না।
সায়ন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘বাবা! আপনার তো আমাদের হোমিসাইড ডিপার্টমেন্টে থাকা উচিত ছিল। তারপর, ভারমোর গিয়ে কী করলেন?’
