মৃত জ্যোৎস্নার রাত্রি – ৪৩
তেতাল্লিশ
— যেদিন শান্তনুর সন্ধেবেলা পৌঁছোবার কথা সেদিন বেলার দিকে আমি তন্ময়কে ফোন করি। বলি যে শান্তনু আমার হাতে আত্রেয়ীর ছবি দেখে ফেলেছে। জানতে চায় ছবিটা কী করে আমার কাছে এল। আমি চাপে পড়ে সব বলে ফেলেছি। প্রচণ্ড রেগে যায়। তোমাদের সঙ্গে বোঝাপড়া করতে সে আজ পৌঁছোচ্ছে। এটা শুনে তন্ময় খুব ভয় পেয়ে যায়। ও জিজ্ঞেস করে, কোন হোটেলে ওরা আছে সেটা কী জানে? আমি বলি, হ্যাঁ জানে। তন্ময় বলে, কী করে জানল? তুমি বলেছ? আমি বললাম, না বলব কী করে? আমি আত্রেয়ী সেনের পিত্র। আমি জানব না সেকি হয় নাকি? তন্ময় দাঁত খিঁচিয়ে ওঠে। টেনশন করতে থাকে। ঠিক করে এখুনি আত্রেয়ীকে নিয়ে চেক আউট করবে। কিন্তু তাহলে তো আমার উদ্দেশ্য সফল হবে না। তাই ওকে বুদ্ধি দিলাম।
.
খোলা জানলার ওপারে মণিকৈলাসের শৃঙ্গ। জানলার পাশে বসেই বন্দনা মোবাইলে কথা বলছে। ‘পাগলামো কোরো না তন্ময়দা। ভারমোরে আর কোনো ভালো হোটেল নেই। আর এখন এমনিতেই বেলা হয়ে গেছে। আর ঘণ্টাদুয়েকের মধ্যেই আলো পড়তে শুরু করবে। কোথায় যাবে ম্যাডামকে নিয়ে?… আমি যা বলছি তাই করো। শোনো, রিসেপশনে কথা বলো। ওদের বলো যে শান্তনু নামের একজন ফোটোগ্রাফার আসবে ম্যাডামের এক্সক্লিউজিভ ছবি তুলতে। ওঁর নাম যেন রেজিস্টারে না রাখে। কোনো আলাদা ঘরও যেন না দেয়। ডিরেক্ট তোমাদের ঘরে যেন পাঠিয়ে দেয়। এটা শুনে তন্ময় জিজ্ঞেস করে, আমি বললেই বা ম্যানেজার শুনবে কেন? হোটেলের রুলস আছে তো। আমি বললাম, সে থাকুক। সেলিব্রেটি গেছে। তাঁদের জন্য অনেক ছাড় থাকে। কোনো মিডিয়া যেন জানতে না পারে শান্তনু এসেছে। তাহলে আর এক্সক্লিউজিব ছবি হবে না। ওদের হোটেলে খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজ হতে চলেছে যা দু-দিন বাদে খবরের কাগজ, টিভি সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়বে। সঙ্গে হোটেলের নামও থাকবে। এইভাবে বোঝাও। এতেও যদি না হয় তাহলে ম্যাডামকে দিয়ে বলাবে। উনি ঠিক পারবেন ম্যানেজ করতে। কিন্তু আত্রেয়ী সেনকে মাঠে নামতে হয়নি। তন্ময়ের কথাতেই পঙ্কজ শর্মা পটে যায়। তাই শান্তনু আসতেই চিনতে পারে সে।
.
সোমদত্তা বড়ো বড়ো চোখ করে বলে, ‘সেটাও আপনার বুদ্ধি?’ বন্দনা চুপ করে থাকে। সায়ন গালে হাত রেখে বন্দনার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে। এই দুজনের মনের ভাব বন্দনা বেশ ভালোই বুঝতে পারে। বলে, ‘আমাকে আমার লক্ষ্যে পৌঁছোতেই হত। যেভাবে হোক।’ সায়ন বলল, ‘আপনি জানতেন যে শান্তনুকে আপনি আর রাখবেন না। তাই রেজিস্টারে নাম রাখেননি। তন্ময়কে দিয়েও বলিয়েছেন যে শান্তনু সেই রাতেই চলে যাবে। কারণ অন্য হোম-স্টেতে উঠেছে। তার মানে হোটেলের ঘরে অশান্তি চলাকালীন তন্ময়ের ফোনে বারবার আপনিই ফোন করেছিলেন এবং কোথায় নিয়ে যেতে হবে বুদ্ধি দিয়েছিলেন। ঠিক বললাম তো?’
— হুম। আমি সকাল থেকে নির্জন জায়গা দেখতেই বেরিয়েছিলাম। স্থানীয় লোকেদের মুখেই সুইসাইড পয়েন্টের নামটা শুনি আর সেটাই তন্ময়কে জানাই।
— তন্ময় বা আত্রেয়ী কারুর চোখে যদি পড়ে যেতেন তখন কী করতেন? ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি। ‘পড়িনি কে বলল?’
— তারপর?
— পাশ দিয়ে চলে এসেছি। আমায় চিনতেও পারেনি। গায়ে তো এমনিতেই জ্যাকেট ছিল। মাংকি ক্যাপে মাথা থেকে মুখ সবটুকু ঢাকা। চোখদুটো শুধু দেখা যাচ্ছিল। সেটাও সানগ্লাসে ঢাকা।
— আচ্ছা ফোনে তন্ময়কে ঠিক কী বলেছিলেন আপনি? পঙ্কজ তো আড়াল থেকে এক তরফা শুনেছে তন্ময়ের কথা। আপনারটা তো শুনতে পায়নি।
.
জনহীন পাহাড়ি প্রান্তর। খাদের ধারে দাঁড়িয়ে চারপাশে নজর রাখতে রাখতে ফোনে কথা বলছে বন্দনা। ওপার থেকে বেশ রেগেমেগে প্রশ্ন উড়ে এল তন্ময়ের, ‘কী হয়েছে কী? বারবার কেন কল করছ?’
— এত চিৎকার কীসের?
— চূড়ান্ত অসভ্যতা চলছে হোটেলে। আর এই সব হয়েছে তোমার জন্য।
— মানে?
— মানেটা বুঝছ না? কী দরকার ছিল শান্তনুকে ছবিটা দেখাবার?
— স্যারের তো বাড়ি থাকারই কথা ছিল না। কখন ঘরে ঢুকে এসেছে জানব কী করে?
— একটু সাবধান হতে পারলে না? নাকে কাঁদুনিটা ওর সামনেই কাঁদতে হল?
— সরি তন্ময়দা। আমি ঠিক বুঝতে পারিনি গো।
— কী হয়েছে বলো।
— এখুনি তোমরা বেরিয়ে পড়ো। চিৎকার-চেঁচামেচি করলে লোক জানাজানি হবে। ওটা তো হোটেল।
— সেটা আমিও জানি এটা হোটেল।
— তুমি বলো, যা কথা বলার হোটেলের বাইরে গিয়ে বলতে। যেভাবে হোক বোঝাও। কোথাও একটা বসে কথা বলা দরকার। তুমি বলো যে আত্রেয়ীর এই নোংরামি তুমিও জানতে না। এর একটা ফয়সালা তোমাকেও করতে হবে। তাহলে স্যার ঠান্ডা হলেও হতে পারে। কিন্তু সেটা কোনোভাবেই হোটেলে নয়।
— আরে ও তো এখানে। আমি কী করব? বের করব কী করে? শালাকে এক্ষুনি শেষ করে দিতে ইচ্ছে করছে। নেহাত লাশ লুকোবার জায়গা নেই তাই…
— এটা মাথা গরম করার সময় নয় তন্ময়দা। আগে বেরোও ওখান থেকে।
— এই জ্ঞান মেরো না তো। এতো রাতে যাবটা কোথায়?
— সুইসাইড পয়েন্ট।
— সেটা আবার কোথায়?
— তোমাদের হোটেল থেকে বেরিয়ে দারোল গ্রামের দিকে এগোবে। দেখবে দুটো রাস্তা ভাগ হচ্ছে। ডানহাতের রাস্তা ধরে উঠে যাবে। একদম টপ। ওটাই সুইসাইড পয়েন্ট। পনেরো মিনিট মতো হাঁটা কিন্তু। এর আগে কোত্থাও থামবে না।
— ও হো, আজ বিকেলে একজন বলছিল বটে। কিন্তু তুমি এত ডিটেইলস জানলে কী করে?
— ট্রাভেল সাইট থেকে
— বাবা! ট্রাভেল সাইট!
— লোকে বলে ওটা নাকি হন্টেড।
— কী বলছ? শুনতে পাচ্ছি না।
— জায়গাটা হন্টেড বলে বিশেষ কেউ যায় না। রাতে তো নয়ই
— হন্টেড? কেন?
— কয়েক বছর আগে দুজন টুরিস্ট পরপর মারা যায় ওখানে গিয়ে। তারপর আরও একজন। সেই থেকে ওখানে কেউ যায় না। আর এই সুযোগে তুমিও তোমার কাজ সেরে নাও। পথের কাঁটাকে সরিয়ে দাও। বাবা-বাছা করে পেট ভরে মদ গেলাও। এমনিতেই যন্ত্রণায় আছে। রাগের চোটে এখন গ্যালন গ্যালন মদ খেয়ে নেবে শান্তনু নিয়োগী। মাতাল করে দাঁড় করিয়ে দাও খাদের ধারে। তোমায় কিছু করতে হবে না। নিজে থেকেই গড়িয়ে যাবে অতলে। আর সেটা না হলে টুক করে একটু ঠেলে দিয়ো। ব্যস, মাল সাবাড়
— হুম। সেটাই করতে হবে।
— যা করার সাবধানে তাড়াতাড়ি করো।
— এতে তোমারও সুবিধে তাই তো?
ও তোমার অসুবিধে হচ্ছে নাকি? তাহলে আত্রেয়ী সেনের আলমারির ডুপ্লিকেট চাবিটা ফেরত দিয়ে দিয়ো আমায়। আমি একাই যা করার করব। শুধু ভাগটা নিতে এসো না।
আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে। রাখছি এখন। দেখছি, শালার একটা ব্যবস্থা করতে হবে। –
.
রাত প্রায় সোয়া ন-টা। আত্রেয়ী আর তন্ময় শান্তনুকে নিয়ে এল সুইসাইড পয়েন্ট। আত্রেয়ী, তুমি যা করেছ তাতে তোমার সঙ্গে আর কথা বলার অভিরুচি নেই আমার।’
— তন্ময় তুমিও একথা বলছ?
আত্রেয়ী সরু গলায় বলে ওঠে।
— হ্যাঁ বলছি। আমাকে, শান্তনুকে দুজনকেই ঠকিয়েছ তুমি।
— তন্ময়…
— আর-একটাও কথা বলবে না আত্রেয়ী। আর আমরা এখানে নিজেদের মধ্যে একটু কথা বলব। তুমি আমাদের মধ্যে থাকবে না।
শান্তনু রাগে ফুঁসছিল। এতটা পথ রাগের চোটে খুব দ্রুত হেঁটে এসেছে সে। তাই হাঁফাচ্ছিল। তন্ময়ের মুখের ওপর বলে ওঠে, ‘আমার তোমার সঙ্গে কোনো কথা নেই তন্ময়।’ তন্ময়ের গলা নরম। প্লিজ শান্তনু। আমার কথা আছে আপনার সঙ্গে। আত্রেয়ী, তুমি ওইখানে গিয়ে বোসো।’ সুইসাইড পয়েন্টটা অনেক বড়ো। খানিকটা তফাতে একটা জায়গা নির্দেশ করে দিল তন্ময়। শান্তনু তখন অন্যদিকে তাকিয়ে। সেই ফাঁকে চোখ মেরে যা বোঝানোর বুঝিয়ে দিয়েছে আত্রেয়ীকে। আত্রেয়ীও নিজেকে সামলে নিয়ে ছদ্মরাগ দেখিয়ে বলে উঠল, ‘আমাকে তোমরা এখানে নিয়ে এলে কেন তা তো বুঝলাম না। যতসব। বেশ। আমি তোমাদের মধ্যে থাকতেও চাই না। এত সুন্দর ওয়েদার। এমন ভরা জ্যোৎস্না। আমার গান গাইতে ইচ্ছে করছে। তোমরা মরো এখানে
— একটা নির্লজ্জ বেহায়া মাগি।
শান্তনুর কথায় আবার ঝাঁঝ দেখাতে যাচ্ছিল আত্রেয়ী। তন্ময়ের ইশারা তাকে শান্ত করে। সে-ও শান্তনুকে শুনিয়ে বলে, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ যাও। জন্মের শেষ গানটা গেয়ে নাও। এখানে যাই হয়ে যাক। ভুলেও আসবে না।’ আত্রেয়ী চলে গেল। তন্ময় শান্তনুর পাশে বসল। কাঁধে করে বয়ে আনা ব্যাগের মধ্যে থেকে একটা হুইস্কির বোতল বের করল। সঙ্গে বেরিয়ে এল চকচকে স্ফটিকখচিত দুটো গ্লাস। জ্যোৎস্নার আলোয় স্বর্গের সুরাপাত্রের মতো লাগছে। শান্তনু অবাক চোখে তাকিয়ে দেখছে তন্ময়ের কীর্তিকলাপ। ‘আমরা এখানে কোনো পিকনিক করতে আসিনি তন্ময়। কী বলার আছে বলো। ওই হারামিটাকে শেষ না করে আমার শান্তি নেই।’ এই সংক্রান্ত কোনো কথাই বলল না তন্ময়। বরং নিজের মনে স্ফটিকখচিত দুটি পাত্রে হুইস্কি ঢালল। এই সময় আত্রেয়ীর গলা ভেসে এল। ও গান ধরেছে। ‘আজ জ্যোৎস্নারাতে সবাই গেছে বনে।’
— দেখুন, ওই মহিলার কোনো ভ্রূক্ষেপ আছে?
আত্রেয়ী দূরে বসে গাইছে। সেদিকে তাকিয়ে কথাটা বলল তন্ময়। শান্তনুকে বলল, ‘তাকান তাকান, কেমন নিশ্চিন্তে বসে গান গাইছে।’ শান্তনু আত্রেয়ীর দিকে তাকায়। অন্ধকারে রাগের আগুনে জ্বলজ্বল করছে দুটো চোখ। সেই ফাঁকে একটা হুইস্কির মধ্যে মিশে গেল কিছু একটা। ‘নিন ধরুন। শান্তনুর মুখের সামনে একটা সুরাপাত্র ধরে তন্ময়। ‘তুমি খাও।’ রাগ দেখায় শান্তনু।
— সোয়ারভস্কির ক্রিস্টালাইন টোস্টিং ফ্রুটস। এই পাত্রে একটা চুমুক দিলে পাতি রামও দামি ওয়াইনের মতো লাগে। পরখ করেই দেখুন।
— তোমার মতলবটা কী বলো তো?
— ঠগিনীকে সরিয়ে দেওয়া।
কেউ যেন ধাক্কা মারল শান্তনুকে। ‘মানে?’
— আত্রেয়ী আপনাকে ঠকিয়েছে। আমাকেও ঠকিয়েছে। ওর মিথ্যে অভিনয়টা শুধু ফ্লোরে নয়, বাড়িতে এনেও তুলেছে। আপনি কেন কাজ পান না জানেন?
— কেন?
— আত্রেয়ী সেন চায় না তাই।
শান্তনুর মুখ কঠিন হয়ে যায়। চাঁদের আলোয় চোয়াল দুটো শক্ত হয়ে ওঠে। তন্ময় বলে, ‘আত্রেয়ীকে নিয়ে যেসব পরিচালকেরা কাজ করেন তাদের ছবিতে স্টিল ফোটোগ্রাফারের নাম উঠলে প্রোডাকশন থেকে এখনও আপনার নামটাই আসে। কিন্তু ম্যাডাম পত্রপাঠ নাকচ করে দেন। আপনি নাকি ঘেঁটে গেছেন। মদ খেয়ে রেড লাইট এরিয়াতে পড়ে থাকেন।
— হোয়াট?
— শুধু তাই না। আপনার বদলে বেছে বেছে চিকনা দেখতে কচি ছেলেগুলোকে সেই কাজ দেওয়া হয়। এতদিন আপনাকে বলতে পারিনি। ভাবতাম আত্রেয়ী বোধহয় সত্যিই আমাকে ভালোবাসে। কিন্তু আজ বুঝলাম, ও আমাকে ইউজ করছে। এত মিথ্যে একটা মানুষের জীবনে? এর তো চরিত্রই…
কথাটা শেষ করার আগেই শান্তনু তন্ময়ের হাত থেকে গ্লাসটা কেড়ে নিয়ে ঢকঢক করে গলায় ঢেলে নিল। আরে আরে আস্তে আস্তে। এইভাবে কেউ খায় নাকি?’ শেষ করেই শান্তনু কাশতে থাকে। চাঁদের আলোয় ভীষণ শান্ত শীতল একটা হাসি খেলে যায় তন্ময়ের ঠোঁটে। শান্তনু ফাঁকা গ্লাসটা বাড়িয়ে দিয়ে বলে, ‘প্লিজ।’
— ওহ্ শিয়োর।
পাত্রটা আবার পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে সর্বনাশী সুরায়। তন্ময় বলে, ‘আত্রেয়ী গান ধরে ভালোই করেছে। আমাদের কথাগুলো ওর কানে পৌঁছোবে না। চলুন একটু ওখানে যাওয়া যাক। আপনি রিল্যাক্স করে খান। ক্যামেরাটা আমায় দিন।’
— না না ঠিকাছে।
— আরে দিন তো মশাই। আপনি প্রাণভরে খান।
তন্ময় ক্যামেরাটা নিজের কাঁধে ঝুলিয়ে নেয়। শান্তনুকে পাথরের ওপর থেকে তুলে গল্প করতে করতে খাদের দিকে এগোতে থাকে তন্ময়। ‘এটা সুইসাইড পয়েন্ট। লোকে বলে এখানে ভূত আছে। তাই এখান থেকে যদি কেউ হাপিস হয়ে যায় তাহলে লোকে ভাববে ভূতে মেরেছে।’ শান্তনুর চোখদুটো এখনই ঘোলাটে হয়ে গেছে। পা দুটোও ঠিকঠাক পড়ছে না। একে হুইস্কি, তার ওপর ওষুধের গুণ। সব কিছু ধোঁয়াশা শান্তনুর চোখে।
.
আদিগন্ত হিমাচলী প্রকৃতির সুন্দরী রূপ উছলে পড়ছে। এই সুন্দরের মধ্যেই মহাকাল বসে সর্বনাশের জাল বুনছে। বেশি অপেক্ষা করতে হয়নি কাউকেই। সেই মাহেন্দ্রক্ষণ খুব তাড়াতাড়িই এসে উপস্থিত হয় খাদের ধারে। শান্তনু আর দাঁড়াতে পারছে না। টলে টলে এগিয়ে যাচ্ছে। তন্ময় ধাক্কা মারার জন্য প্রস্তুত। হঠাৎ বড়ো পাথরের আড়াল থেকে আপাদমস্তক নিজেকে ঢেকে প্রবল বেগে দৌড়ে আসে বন্দনা। শান্তনুর একটা পা মাটি থেকে শূন্যের দিকে এগিয়ে গিয়েছিল প্রায়। ঠিক সেই মুহূর্তেই এক ঝটকায় পেছন থেকে টেনে মাটিতে ফেলে দেয় শান্তনুকে। শান্তনু প্রায় অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায়। তন্ময় ‘এই কে?’ বলে চমকে ওঠে। সঙ্গে সঙ্গে আগন্তুকের হাত এসে তন্ময়ের মুখ চেপে ধরে। আত্রেয়ী তখনও ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে একই গান গেয়ে চলেছে। তন্ময়ের চোখে বিস্ময়। নাকের ওপর অবধি উঠে থাকা মাংকিক্যাপটা অন্য হাত দিয়ে নামায় আগন্তুক। তন্ময়ের চোখদুটো আরও বিস্ময়ে বিস্ফারিত হয়ে যায়। চিনতে পারে বন্দনাকে। মুখে হাত চাপা দেওয়া অবস্থাতেই জড়ানো শব্দ বেরিয়ে আসে তন্ময়ের মুখ দিয়ে, ‘তুমি?’
অত্যন্ত ফিশফিশ করে বন্দনা বলে, চুপ। যা বলছি করো। ওই পাশ থেকে একটা পাথর নিয়ে এসে মুখটা থেঁতলে দাও। যাতে লাশ কেউ চিনতে না পারে। যাও দেরি কোরো না।’ তন্ময় বিভ্রান্ত। ওকে সত্যিই এই কাজটা করতে হবে? ‘লাশ চিনলে আমাদের কেউ বাঁচাতে পারবে না তন্ময়দা। গো।’
তন্ময় দৌড়ে গিয়ে একটা ভারী পাথর অনেক কষ্টে তুলে আনে। মাটিতে পড়ে থাকা শান্তনুর মুখের ওপর ঝুলিয়ে রেখে বন্দনার দিকে তাকায় তন্ময়। বন্দনা হাতের ইশারায় পাথরটা মুখের ওপর ফেলতে বলে। একটা বড়ো নিশ্বাস নিয়ে পাথর ধরে থাকা হাত দুটো আলগা করে দেয় তন্ময়
পাথর পতনের ‘দুমমম’ শব্দের সঙ্গে হাড়-মাংস মিশে থেঁতলে যাবার ‘পচাত’ করে একটা শব্দ হয়। তন্ময় টলে যায়। আত্রেয়ীর গান থেমে যায়। শান্তনুর পা দুটো ছটফট করাও বন্ধ করে দেয় একসময়। একটু চুপ করে দাঁড়িয়ে তন্ময় হাতিয়ার পাথরটাকে খানিকটা সরিয়ে দেখতে যায়। একটুখানি সরাতেই বেসামাল হয়ে পাথরটা গড়িয়ে খাদের দিকে পড়তে থাকে। চাঁদের আলোয় বেরিয়ে আসে ক্ষতবিক্ষত রক্তাক্ত বীভৎস মুখ। গা গুলিয়ে ওঠে তন্ময়ের। মুহূর্তের আকস্মিকতায় পাথরটা ধরতে চায় তন্ময়। পড়লেই বিরাট শব্দ হবে। যদি লোক জানাজানি হয়ে যায়! কিন্তু শেষ রক্ষা হয় না। পাথরটা নির্জন পাহাড়গাত্রে গুমগুম শব্দ তুলে পড়তে থাকে। মাঝখান থেকে তন্ময়ের হাতদুটো পাথরের গায়ে লেগে থাকা রক্তে মাখামাখি হয়ে যায়। আত্রেয়ী দৌড়ে এসে মুখে হাত চাপা দিয়ে আঁতকে ওঠে। ওদিক থেকে বন্দনা বলে, ‘পকেট থেকে মোবাইল, পার্স যা আছে বের করে নাও।’ তন্ময় দরদর করে ঘামছে টেনশনে। আর বিলম্ব না করে জিনসের পকেট থেকে পার্স আর বুক পকেট থেকে মোবাইল বের করে নেয়। তারপর তন্ময় আর বন্দনা মিলে শান্তনুর নিথর শরীরটাকে ঠেলে খাদে ফেলে দেয়। আত্রেয়ী একটু হলেও টলে যায়। চোখটা চকচক করে ওঠে তার। বিড়বিড় করে আত্রেয়ী বলে, ‘সরি শান্তনু।’ মদ, জল যা ছিল সব ঢেলে দিল পাথরের মাটিতে লেগে থাকা রক্তের ওপর। ধুয়ে গেল। কিছু যদি লেগেও থাকে তাতেও খুব একটা অসুবিধে হবে না। কারণ এখানে কেউ আসেই না। তন্ময় আর-একটা পাথর দিয়ে শান্তনুর মোবাইলটা ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়। তারপর সেগুলোকেও মুঠো করে ধরে খাদের দিকে শূন্যে ছুঁড়ে দেয়।
— এখানে আর এক মিনিটও নয়। তাড়াতাড়ি চলো।
বন্দনা বলল। উলটোদিক থেকে আত্রেয়ীর ভীত গলা ভেসে এল, ‘বন্দনা তুমি! তুমি এখানে কী করে?’ বন্দনা এগিয়ে গেল। আত্রেয়ীকে বলল, ‘স্যার তোমায় বড্ড জ্বালাতন করত। খুব কষ্ট দিত। আমার ভালো লাগত না, মা।
— বন্দনা!
‘মা’ ডাকটা শুনে আঁতকে ওঠে আত্রেয়ী।
— আমি সব জানি মা। তুমি কোন লজ্জা ঢাকতে আমায় অন্যের হাতে তুলে দিয়েছিলে। আমার জীবন থাকতে তোমার ক্ষতি কেউ করতে পারবে না। ভয় নেই। আমি কাউকে বলব না তুমি আমার মা। শুধু একটু তোমার কাছে থাকতে দিয়ো।
একটু আগে চোখের কোলে জমে থাকা চকচকে জিনিসটা মুক্তোদানার মতো ঝরে পড়ল আত্রেয়ীর। ভীষণ ইচ্ছে করছিল বন্দনাকে বুকে জড়িয়ে ধরতে। কাঁপতে কাঁপতে আদরের হাতটাও উঠেছিল বন্দনার মুখ লক্ষ্য করে। কিন্তু মাঝপথেই হাতটা মুঠো করে ফিরিয়ে নেয় আত্রেয়ী। নরম হলে চলবে না। দুর্বলতা তার সাকসেসের ক্ষেত্রে বাধা হতে পারে। তাই গম্ভীর হয়ে বলে ওঠে, ‘আর কক্ষনো আমায় মা বলে ডেকো না। ম্যাডামই বোলো। চলো এখন।’ বলেই উলটোমুখে হাঁটা দেয় আত্রেয়ী সেন। বন্দনা হাসে। ধারালো মিছরির ছুরি চাঁদের আলোয় ঝলসে ওঠে তার ঠোঁটে। তন্ময় বন্দনার চোখে চোখ রেখে ইশারা করে এগিয়ে যাবার জন্য।
.
— জীবনের চরমতম মুহূর্তে যখন পেটের সন্তান তার কাছে নিজের পরিচয় দিচ্ছে, তখনও আত্রেয়ী সেন শুধুমাত্র একজন নামকরা অহংকারী অভিনেত্রী হয়েই রইল। মাতৃত্বের কোনো অনুভূতিই আমি দেখলাম না। ও আসলে নাম, খ্যাতি, যশ, অর্থ এই সবই চেয়ে এসেছে। পৃথিবীর কোনো সম্পর্কই ওর কাছে কোনোদিন গুরুত্ব পায়নি। যতদিন কাউকে কাজে লাগবে ততদিনই তার গুরুত্ব। তারপর তাকে ছুড়ে ফেলে দেবে।
আত্মমগ্ন হয়ে একটানা কথাগুলো বলে গেল বন্দনা। সোমদত্তা বলল, ‘এরপরের প্ল্যান কী ছিল? আত্রেয়ীকে শেষ করে দেওয়া?’ ফিক করে হাসল বন্দনা। বলল, অত কাঁচা কাজ আমি করি না। অত তাড়াহুড়োও আমার নেই। তাই তো ওই সর্বনাশের পরেও সাড়ে ছয় বছর কেটে গেল।’
— সেটাই তো আশ্চর্যের। এত বছরে আর কিচ্ছু করলেন না?
— কে বলেছে? টুকটুক করে আত্রেয়ী সেনের ব্যাংকের কাজ সামলাতে শুরু করি। আত্রেয়ীর আরও কাছে চলে আসি। ঠিক তখনই তন্ময় বদমাইশি করতে শুরু করে। আমার অসতর্ক মুহূর্তে তোলা বেশ কিছু ছবি দেখিয়ে আমায় ব্ল্যাকমেল করতে থাকে। যাতে ওর ফিফটি পার্সেন্টটা বেড়ে সেভেন্টি হয়। দীর্ঘ দু-বছর আমি মুখ বুজে সহ্য করি। আমার শরীরটাকেও ইচ্ছেমতো ব্যবহার করতে শুরু করেছিল শয়তানটা। আমি বুঝতে পারি, আমি ফেঁসে যাচ্ছি। কিন্তু একজন সামান্য কামুক, ধূর্ত শয়তানের কাছে আমি হারব না। এর থেকে আমায় বেরোতে হবে। তাই প্রেগনেন্ট হবার অ্যাক্টিং শুরু করি। প্রমাণও জোগাড় করি।
— তন্ময় যদি ধরে ফেলত?
বন্দনা হাসে। সব অপরাধ জানাজানি হবার পরেও সে হাসছে। অবাক হয়ে যায় সায়ন আর সোমদত্তা। বন্দনা বলে, শান্তনুকে খুনের পর কলকাতায় ফিরে তন্ময়ের ফোনটা আমি সরিয়ে দিই। ওটাতে আমার সব কথা রেকর্ড করা ছিল। শুধু তাই-ই নয়, প্রথম দিনের আমার বেশ কিছু সাহসী ছবিও ওখানে ছিল। ও বেসিক্যালি ভীতু। যা যা হবে ও নাকি সব কিছুর প্রমাণ রাখবে। যাতে ওকে কেউ ফাঁসাতে না পারে। বা ও ফাঁসলে একা না ফাঁসে। সবাইকে নিয়ে ফাঁসবে। সব প্রমাণ রাখা যায় বলুন তো? তন্ময় আজও জানে না ওর ফোনটা কে নিয়েছিল। ও ভাবে স্টুডিয়ো থেকে চুরি হয়ে গেছে।
— তাহলে পরের ফোনটা সরালেন না কেন?
— চেষ্টা যে একেবারে করিনি তা নয়। তন্ময় বুঝে গিয়েছিল। আমার সামনেই আমার ফুটেজ, ছবি যা ছিল সব ডিলিট করে দেয়। কিন্তু পরেরদিনই আবার সেই একই ছবি আর ফুটেজগুলো আমায় দেখিয়ে বলে, ফোন যদি চুরিও হয়ে যায় এগুলো সারা জীবনের জন্য ওর কাছেই থেকে যাবে। তন্ময় ওইগুলো আরও অন্যান্য জায়গায় রেখেছিল।
সায়ন অবাক হয়ে বলল, ‘কিন্তু আমরা ওর যে ল্যাপটপের হদিশ পেয়েছি সেখানেও তো নেই।’ সোমদত্তা বলে, ‘স্যার, কোনো সিক্রেট ক্লাউডে রাখতে পারে। যার হদিশ একমাত্র তন্ময়ই জানে!’ একটু ভেবে সায়ন বলল, ‘হুম। হতে পারে।’ বন্দনাকে প্রশ্ন করল সোমদত্তা, কিন্তু এই মিথ্যেটা তো একটা সময় তন্ময় জেনেই যেত যে আপনি প্রেগনেন্ট নন। এটা তো আর লুকোবার বিষয় নয়।
সোমদত্তার এই কথার রেশ টেনেই সায়ন উত্তর দিল, ‘বন্দনা তার আগেই তো বড়ো বাজি জিতে নেবে ভেবেছিল। তাই আর ধরা পড়ার ভয় ছিল না।’ সোমদত্তা সপ্রশ্ন চোখে সায়নের দিকে তাকায়। সায়নের অভিজ্ঞ চোখ সোমদত্তার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝে নেয় যে সে কিছুই বুঝছে না। তাই সে নিজেই বলে, ‘বুঝলে না তো। খুব সহজ। ওই একটা ফেক রিপোর্ট দেখিয়ে বাড়ি বসেই তন্ময়ের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা আদায় করছিলেন বন্দনা। আমরা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট চেক করেছি। একটা নয়। তিনটে অ্যাকাউন্ট বন্দনা দত্তের নামে। আলাদা আলাদা ব্যাংকে। মাঝখান থেকে আত্রেয়ী সেনের এই দুর্ঘটনা ব্যাপারটাকে একটু টালমাটাল করে দেয়। তখন বন্দনাই তন্ময়কে হার-চুরির বুদ্ধি দেয়। আত্রেয়ী যখন বাঁচবেই না তখন আর সে হার রেখে কী হবে? তার চেয়ে বন্দনার ভোগেই লাগুক। বাইশটা হিরে বসানো প্ল্যাটিনামের হারের কত দাম হতে পারে আজকের বাজারে জানো? ওটা পেলেই তো কেল্লাফতে। মা কেন? সারা পাড়াতে যত বয়স্ক মানুষ আছেন তাদেরও একবার করে বাইপাস সার্জারি হয়ে যাবে। কী ম্যাডাম, ঠিক বলেছি তো?’
বন্দনা নীরব। সোমদত্তার মাথা ভোঁ ভোঁ করতে থাকে। পুলিশে চাকরি করেও অনেকের মাথায় এত প্ল্যানমাফিক বুদ্ধি থাকে না। সায়ন চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ে বন্দনার দিকে তাকিয়ে বলে, ‘তাহলে ম্যাডাম! এবার তো প্রতিদিনই আমাদের আপ্যায়ন আপনাকে সহ্য করতে হবে।’ আর কিছু বলার নেই বন্দনার। জীবনটাকে গোছাতে চেয়েছিল। একমাত্র অবলম্বন যে মা, তাকে আরও কিছু বছর বাঁচিয়ে রাখতে চেয়েছিল। কিন্তু ভেসে গেল। আসলে হড়পা বানের খবর আমরা কেউ জানি না। সে কখন আসবে, তা বোধহয় কেবল নিয়তিই জানে।
.
মুখের ওপর বন্ধ হয়ে গেল কারাগারের দরজাটা। নিষ্প্রাণ চোখে তাকিয়ে রইল বন্দনা। সায়ন বলল, ‘কাল রবিবার। কোর্ট বন্ধ। তাই পরশু আপনাকে কোর্টে তোলা হবে।’ বন্দনা শুধু একটাই কথা বলল, ‘আমার মাকে একটু দেখবেন স্যার। আমি ছাড়া মায়ের কেউ নেই।’
ওপর নীচে ঘাড় নেড়ে নীরব সম্মতি জানাল সায়ন।
