মৃত জ্যোৎস্নার রাত্রি – ৪৪
চুয়াল্লিশ
শনিবার রাত। ড্যাফোডিল সুপার স্পেশ্যালিটি হসপিটালের সিসিটিভি রুমে সায়ন, নীলাম্বর, সোমদত্তাসহ বেশ কিছু পুলিশবাহিনী জড়ো হয়েছে। সকলের তীক্ষ্ণ নজর সিসিটিভিগুলোর দিকে। ‘প্রতিটা সিসিটিভি চেক করেছেন তো?’
— হ্যাঁ স্যার। এখানে দেখুন সবক-টাই চলছে।
নীলাম্বর কিছুটা তফাতে একটা সোফায় চোখ বুজে একটু আরাম করে বসেছিলেন। সেখান থেকেই বললেন, ‘কোনো ক্যামেরা এক সেকেন্ডের জন্যেও যদি অফ হয় বলবেন।’ সায়ন বলল, ‘আপনি নিশ্চিত্তে বিশ্রাম করুন নীলাম্বরবাবু। আমি আছি।’
— বিশ্রাম আমার নেই ভায়া। চর্মচক্ষু আর তৃতীয় চক্ষু একসঙ্গে খুলে রাখা যায় না। তাই ওটা খুলে এটা বন্ধ করে আছি। নইলে আমি তার আসা-যাওয়া টের পাব না যে। বরং তুমি আর সোমদত্তা একটু বিশ্রাম নাও। সারাদিন অনেক ধকল গেছে। আমি তো বাড়িতেই ছিলাম। তেমন কিছু বুঝলে আমি তোমাদের ডেকে দেব।’
সোমদত্তা হেসে বলল, ‘না না আমি ঠিক আছি।’
— ভালো কথা বলছি মা। সে যদি আসে হুলুস্থুল করে ছাড়বে কিন্তু। তখন সামলাতে হবে। ঘুমিয়ে নাও।
সোমদত্তা সায়নের দিকে তাকায়। সায়ন বলে, ‘চলো একটু বিশ্রাম করলে ভালোই হয়। সত্যি আর শরীর দিচ্ছে না।’
— ওকে স্যার। আপনি রেস্ট নিন। আমি একটু বাইরে থেকে আসছি।
সায়ন সময় নষ্ট না করেই বলল, ‘কী দরকার বাপু এত রাতে ছেলেটাকে ঘুম থেকে তোলার? কালকেই তো ফিরছে।’
— না না মানে বাড়িতে ফোন করতাম একটু।
সোমদত্তার কাঁচুমাচু মুখ দেখে মনে মনে হাসে সায়ন। বলে, ‘অ। তাহলে যাও!’ বলামাত্রই গটমট করে ঘরের বাইরে চলে যায় সোমদত্তা। এবার সায়নের হাসিটা মন ছাপিয়ে মুখে চলে আসে। ওদিক থেকে চোখ বুজে আবার উড়ে এল নীলাম্বরের বাণী, ‘তুমি বড়োই বেরসিক সায়ন।’ সায়ন তো রীতিমতো অবাক, ‘আজ্ঞে!’ নীলাম্বর বললেন, ‘কারও জীবনে নতুন সূর্যোদয় হচ্ছে। আর তুমি সেটাকে মেঘে ঢেকে দিতে চাইছ? আহাম্মক!’ আর কিছু বুঝতে বাকি থাকে না সায়নের। খিকখিক করে হেসে ফেলে। নীলাম্বর কিন্তু গম্ভীর হয়ে আধা শোয়া, আধা বসা অবস্থায় থাকে।
.
রাত কেটে যায়। সূর্য ওঠে। সিসিটিভিগুলো গত রাতে একবারের জন্যেও চোখ বন্ধ করেনি। সকালের আলো ফুটতে নীলাম্বর, সায়ন আর সোমদত্তা ড্যাফোডিল থেকে বেরোয়। পুলিশ পোস্টিং চেঞ্জ হয়। রাতে যারা ছিল তারা পরের জনকে ডিউটি বুঝিয়ে ঘরে ফিরতে থাকে।
— স্যার একটা রিকোয়েস্ট ছিল।
গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে সোমদত্তা বলল কথাগুলো। ঠিক কী রিকোয়েস্ট ছিল সেটা শোনার আগেই সোমদত্তাকে সায়ন বলে, সূর্যকে আজ ছুটি নিতে বোলো। বলে দিয়ো আমি বলেছি। আর তুমিও ছুটি নাও। তবে আজ রাতে তোমরা দুজনেই এখানে আমার সঙ্গে থাকবে কিন্তু। এবার বলো কী রিকোয়েস্ট?’
সোমদত্তা ভড়কে ভ। আর কী রিকোয়েস্ট করবে সে? আজ তার ছুটি চাই এই অনুরোধটাই তো করতে চেয়েছিল। কোনো উত্তর না পেয়ে সায়ন আবার বলল, ‘কী হল কী রিকোয়েস্ট বলো।’
— উম… ম… মানে স্যার! কী যেন! ভুলে গেছি। মনে পড়লে বলব স্যার। সায়ন ছদ্মবিস্ময়ে বলল, ‘ভুলেই গেলে? যাঃ! এইরকম মেমরি নিয়ে পুলিশে কাজ করছ?’
— না স্যার, সরি। আসলে আপনার কথা শুনতে গিয়ে সব ভুলে গেলাম। ঠিকাছে স্যার, মনে পড়লে বলব। গুড নাইট… এই… গুড ডে স্যার। আসছি।
সায়ন অম্লান বদনে বলল, ‘এসো।’ সোমদত্তা পড়পড়িয়ে পালিয়ে বাঁচল। এতক্ষণ হাঁ করে নীলাম্বর পেছন থেকে সব দেখছিলেন। এবার দুজনেই হা হা করে হেসে উঠল।
.
গাড়িতে যেতে যেতে সায়ন প্রশ্ন করে নীলাম্বরকে, ‘আচ্ছা নীলাম্বরবাবু, আপনি শুধু রাতেই কেন এইরকম লক্ষ্য রাখার ব্যবস্থা করতে বললেন? সকালে কি কিছু ঘটতে পারে না?’
— দেখো পৃথিবীতে অসম্ভব বলে তো কিছু নেই। যখন যা খুশি ঘটতেই পারে। কিন্তু রাতের সম্ভাবনা সর্বাধিক। কারণ সূর্যের আলোর মতো পবিত্র কিছু নেই। তার তেজ সবাই সহ্য করতে পারে না। দুষ্ট আত্মাদের কাজে অনেক বাধা আসে দিনেরবেলা। যার জন্য সন্ধে থেকে রাতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভৌতিক ঘটনা ঘটে। সকালবেলা ভয়-টয় দেখাতে পারে। কিন্তু কারও লক্ষ্য যদি হয় কারওর প্রাণহরণ তাহলে সেটা রাতেই সম্ভব। বিশেষত রাত তিনটের সময়।
— কেন?
— রাত তিনটে হল দুই প্রহরের সন্ধিক্ষণ। ওই সময় একটা যোগ সৃষ্টি হয় যখন আত্মারা শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
কথাটা শুনেই সায়ন বলল, আত্রেয়ী সেনের মৃত্যুর সময়ও রাত তিনটে বেজে পাঁচ কি ছয়।’
— একদমই তাই। আবার বোলপুরে ওই বাড়িতে মৃন্ময়ী যাকে দেখে সে কিন্তু ইচ্ছে করলেই ওর ক্ষতি করতে পারত। কিন্তু শুধু ভয় দেখিয়ে ছেড়ে দিয়েছে। কারণ ওই আত্মার আসল রাগ মিহিরের ওপর। আত্রেয়ীকে মারতে পারেনি সে। সেখানে মিহির বাধা দিয়েছিল। মুখের খাবার কেড়ে নিয়েছিল মিহির। এখানেও খেয়াল কর, সময়টা ছিল প্রায় যখন সন্ধে হয়ে এসেছে। কিন্তু দিনের আলোটাও আছে। তাই যেভাবেই হোক সে কাজে সফল হতে পারেনি।
— কিন্তু পিন্টুকে মানে তেঁতুলকে তো দিনেরবেলায় ভরা রাস্তায় মারল।
গাড়িটা বাম্পারে লাফিয়ে উঠল। নীলাম্বর বললেন, ‘মনে করে দ্যাখো, পিন্টুর গায়ে অশরীরীর কোনো চিহ্ন পাওনি তোমরা। এমনকি কোনো মানুষের চিহ্নও পাওনি। যেটা বৃষভানুর ক্ষেত্রে পেয়েছিলে। স্পষ্ট বোঝা গিয়েছিল যে কেউ একজন গলা টিপে মেরেছে। বাট হাতের ছাপ উদ্ধার করা যায়নি। কিন্তু পিন্টুর ক্ষেত্রে সেরকম হয়নি। শুধুমাত্র হাইটেনশনের তার ছিঁড়ে তার গায়ে পড়ে পেঁচিয়ে যায়। সেক্ষেত্রে যে-কোনো মানুষই মরে যাবে। মৃন্ময়ী আর সোনাইয়েরও সেদিন রাতে সর্বনাশ হয়ে যেত যদি না আমি গিয়ে পৌঁছোতাম।
— তাহলে কি আত্রেয়ীকে পুরোপুরি মারতে চায়নি? কারণ একে রাতেরবেলা। তার ওপর গলা টিপে ধরলেই তো ল্যাটা চুকে যেত।
— এখানেও খেয়াল করার একটা বিষয় আছে সায়ন। শান্তনুকে পাহাড় থেকে ঠেলে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। তার আগে যথেষ্ট কষ্ট দিয়ে মারা হয়েছে। শান্তনুকে যারা মেরেছে তাদের প্রত্যেককে সে-ও কষ্ট দিয়ে কোনো উঁচু জায়গা থেকে ফেলে মারতে চেয়েছে। যদিও আত্রেয়ীকে ঠেলে ফেলার আগে কোনো কষ্ট দেয়নি।
— স্ত্রী বলে বিশেষ ছাড় হয়তো!
হাসল সায়ন। নীলাম্বর চোখ কুঁচকে গম্ভীর হয়েই বলল, ‘কীই জানি? সব কিছুর মোটিভ তো ওরকম যুক্তি দিয়ে বোঝা যায় না। তবে তন্ময়কে যেভাবে মেরেছে সেখানেও কিন্তু সিঁড়ির ওপর থেকে ফেলতে চেয়েছিল। এবং সফলও হয়েছিল। এমনকি দেয়ালে ছুঁড়ে মেরেছিল তন্ময়কে। মাঝখান থেকে মিহির বেচারা…!
— শান্তনু যদি প্রতিশোধই নিতে চায় তাহলে তো বন্দনাকেও ওর ছাড়ার কথা নয়।
— শান্তনু তো জানেই না যে এই পুরো ষড়যন্ত্রের পেছনে বন্দনার বুদ্ধি। এমনকি ওর মৃত্যুর সময়ে যে বন্দনা উপস্থিত ছিল সেটাই তো বোঝেনি। বন্দনা নামটা কারও মুখ থেকে যদি ও অচেতন অবস্থাতেও শুনত তাহলে ওর আত্মা জানতে পারত বন্দনাও এর মধ্যে ইনভলভড। বরং, বন্দনার কান্নায় গলে গিয়েই শান্তনু ভারমোরে যায়। তাই ওর প্রতি শান্তনুর সফট কর্নার জাগলেও জাগতে পারে। অনেকেই মনে করেন, মানুষ মরলে তো সব সত্যি জানতে পেরে যায়। কারণ আত্মা হল সবজান্তা। সর্বজ্ঞ। কিন্তু একদমই তা নয়। আত্মা শরীর ছেড়ে বেরোবার আগের মুহূর্ত পর্যন্ত যেটা জানে, তার মন যেটা জানে সে শুধু সেটুকুই জানবে।
— বুঝলাম। কিন্তু মানুষের আত্মা শরীর থেকে বেরোলেই তো মানুষটার মৃত্যু হয়। তাহলে শান্তনুর মৃত্যুর পর তো ওই অকুস্থলে তিনজনেই ছিল। তাহলে বন্দনাকে চিনল না কেন?
— মানুষের মৃত্যুর পর তিনদিন পর্যন্ত ওই আত্মা শরীরকে আগলে থাকে। সে সম্পূর্ণ মায়া কাটাতে পারে না। তাই শরীরের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে নতুন কিছু দেখা বা বোঝার অবস্থায় সে থাকে না। তুমি দেখবে অপঘাতে যাঁদের মৃত্যু হয় তাঁদের তিনদিনে কাজ হয়। কেন হয়? অনেক কারণের মধ্যে এটাও একটা কারণ। তা ছাড়া শান্তনুকে মারার সঙ্গে সঙ্গে বডিটা খাদে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। ধরে নেওয়া যেতেই পারে শরীরের সঙ্গে সেই আত্মাও সেই অকুস্থল থেকে বিদেয় হয়। তাই বন্দনা যে দোষী সেটা বোঝাটা সম্ভব নয়।
সায়ন বেশ চিন্তিত হয়ে বলে, ‘শুধু একটাই খটকা থেকে গেল। শান্তনুর বডিটা কোথায় গেল? কেউ খুঁজে পেল না?’
.
সায়নের কথা শেষ না হতেই হঠাৎ কোথা থেকে একটা কালো বেড়াল লাফ দিল পুলিশের গাড়ির বনেটের ওপর। উইন্ড স্ক্রিনে সজোরে ধাক্কা খেল। বুক-কাঁপানো গ্যাওওয়্যাও শব্দে আর্তনাদ করে রাস্তার পাশে ছিটকে পড়ল। ড্রাইভার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে এদিক-ওদিক করতে থাকে। তার আগেই বেড়ালটা সরে যায়। বিকট শব্দ করে এক প্রবল ঝাঁকুনি দিয়ে গাড়িটা দাঁড়িয়ে পড়ে। সায়ন আর নীলাম্বরের শরীরটা সামনের সিটে গিয়ে ধাক্কা খায়। গাড়ি থেকে নেমে কোনো বেড়ালকে দেখতে পায় না সায়ন। নীলাম্বরের বুকে আশঙ্কার দুন্দুভি বেজে ওঠে। সায়ন গাড়িতে বসে হাঁফাতে থাকে। ড্রাইভারকে বলে, ‘সাবধানে চালাও।’
.
রাত দশটা বেজে গেছে। ড্যাফোডিলের সিসিটিভি রুমে একসঙ্গে ঢুকে এল সূর্য ও সোমদত্তা। সায়ন ঘাড় ঘুরিয়ে একবার দেখে নিয়ে বলল, ‘এই তো, জোড়া পায়রা এসে গেছে।’ মুচকি হেসে সূর্য আর সোমদত্তা আড়চোখে একে অপরের দিকে চাইল। তারপরে নির্দিষ্ট চেয়ারে গিয়ে বসল। ওদিকে সোফায় আগের দিনের মতোই বসে আছেন নীলাম্বর। চোখ বুজেই বললেন, এখন তো আর গুডমর্নিং বলা যাবে না। তাই সবাইকে গুড নাইটই বললাম।’ সোমদত্তাও হেসে ‘গুডনাইট’ জানাল। আরও বলল, ‘আমার মা-কে আপনার কথা বলেছি। মা ভীষণ এক্সাইটেড। একদিন আপনার সঙ্গে দেখা করবেন বলেছেন।’
— সে কী! তোমাদের বাড়িতেও ভূত আছে নাকি?
সবাই হা হা করে হেসে উঠল। সোমদত্তা বলল, ‘না না স্যার। আসলে মা একটু আপনাকে দেখবেন। আপনি কত কিছু পারেন।’
— দেখেছ সায়ন, পুলিশের চেয়ে ওঝার টিআরপি বেশি।
— সেই তো দেখছি।
আবারও সকলে সমস্বরে হেসে ওঠে।
.
রাত বেড়েছে। ঝিমিয়ে পড়েছে ড্যাফোডিল। মাঝেমধ্যে কয়েকটা অ্যাম্বুলেন্সের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে তা-ও খুব ক্ষীণ। বড়ো দুটো এলসিডি স্ক্রিনে ন-টা করে আঠেরোটা ক্যামেরা চলছে। সেদিকে তীক্ষ্ণ নজর দিয়ে বসে আছে সূর্য, সোমদত্তা, সায়ন ও হসপিটালকর্মী। সায়ন কাউকে কর্ডলেসে জিজ্ঞেস করে সব ঠিকঠাক আছে কিনা। ওপার থেকে উত্তর আসে সব ঠিক। বলে দেয় নিজেদের মোবাইলগুলো হাতের কাছে রাখবে আর ডায়ালে আমাদের তিনজনের নম্বর রেখে দেবে। ঘড়ির কাঁটা ঘুরে বারোটার ঘরে। সিসিটিভি রুম নিশ্চুপ। সকলেই স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বসে। কিন্তু সায়ন খেয়াল করল মাঝেমাঝেই সূর্য মোবাইলে খুটখুট করছে। আর ঠিক তারপরেই সোমদত্তার আঙুল নড়েচড়ে উঠছে তার মোবাইলের ওপর। তারপর যেই সোমদত্তার মোবাইল হাতের মুঠোয় চুপ অমনি সায়নের মোবাইলের আলো জ্বলে উঠছে। এক সময় ফিক করে হেসেই ফেলল সায়ন। সামনে সিসিটিভি ফুটেজের দিকে চোখ রেখেই সায়ন অত্যন্ত শান্ত কণ্ঠে ডাক দেয়, ‘সূর্য।’ চমকে উঠেই অ্যাটেনশন মোডে সূর্য, ‘স্যার!’
— বলছিলাম তুমি আর সোমদত্তা অনেকক্ষণ এই বদ্ধ ঘরে বসে আছ। যাও একটু বাইরে থেকে ঘুরে এসো।
এবার সোমদত্তাও অ্যাটেনশন মোডে। সূর্য বলে, ‘না স্যার। ঠিক আছি আমরা অবশ্য সোমদত্তা গেলে যেতে পারে
— না না স্যার, আমারও যাওয়ার প্রয়োজন নেই।
সোমদত্তা তড়িঘড়ি উত্তর দেয়।
— ভেবে বলছ?
সূর্য বলে, ‘একদম স্যার।’ সায়ন এবার নিশ্বাস ছাড়তে ছাড়তে বলে, ‘বেশ যেয়ো না। আসলে তোমাদের ওই কচিকচি আঙুলগুলোর কথা ভেবে কষ্ট হচ্ছিল। টকটকাটক করে এত নড়ছে খসে না পড়ে যায়!’ এরপর অস্বাভাবিকভাবে দুজনেই চুপ। স্ক্রিনের দিকে মুখ করেই সায়নের চোখের মণিদুটো সুড়ুৎ সুড়ুৎ দু-পাশে ঘুরে দেখে নেয়। দুজনেই এখন পারলে সিসিটিভি ফুটেজগুলোকে চোখ দিয়ে গিলে নেয়। হঠাৎ ধড়মড় করে সোফা ছেড়ে উঠে আসেন নীলাম্বর ব্যানার্জি। সবাই অবাক। সায়ন প্রশ্ন করে, ‘কী হল?’ সায়নের ঘাড়ের কাছে দাঁড়িয়ে স্ক্রিনের দিকে মুখ ঝুঁকিয়ে দেন। বলেন, ‘কিছু হয়নি। তবে হবে। এক্ষুনি।’
— মানে?
সায়ন জিজ্ঞেস করে। নীলাম্বর পালটা প্রশ্ন করেন, ‘কোনো সিসিটিভিতে প্রবলেম হয়েছে?’
— না তো।
— ভালো করে খেয়াল করো সায়ন। সূর্য রেডি হও।
ঘরের মধ্যে উপস্থিত সকলে এখন অ্যাটেনশন মোডে। সায়ন আবার কর্ডলেসে
বলে দেয়, ‘চারপাশে নজর রাখো ভালো করে। কিছু মনে হলেই আপডেট দেবে।’
— ইয়েস স্যার।
— তন্ময় হালদারের ঘরে নার্স আছে?
— না স্যার। এক্ষুনি বেরিয়ে কোথাও একটা গেল। বোধহয় ওয়াশ রুম।
— খেয়াল রাখো। খেয়াল রাখো।
.
এর মধ্যেই একটা সিসিটিভি চিচ্চির করে উঠল। কানেকশন কেটে যাবার আগে যেমন হয়। নীলাম্বর প্রশ্ন করল, ‘এটা কোন দিকের করিডর?’ হসপিটালের লোকটি বলল, ‘থার্ড ফ্লোরের।’ সায়ন বলল, ‘থার্ড ফ্লোরেই তো আইসিসিইউ।’ নীলাম্বরের চোখ বিস্ফারিত। সূর্য বলল, ‘স্যার আমরা ওখানে যাই?’ সায়ন হাত তুলে বারণ করল, ‘ওয়েট।’ এবার সিসিটিভিটা একদম অফ হয়ে গেল। সায়ন সোজা হয়ে বসল, ‘এটা অফ হয়ে গেল কেন?’ সিসিটিভির সামনে বসে থাকা হসপিটালের লোকটা সঙ্গে সঙ্গে ইন্টারকমে যোগাযোগ করে, ‘সাত নম্বর ক্যামেরা অফ হয়ে গেল। থার্ড ফ্লোরের করিডর। ওয়াশ রুম যেদিকে। এখুনি দ্যাখো।’ বলেই বলল, ‘দাঁড়াও দাঁড়াও। আবার চলেছে।’ সঙ্গে সঙ্গে সোমদত্তার নজর পড়ল দশ নম্বর সিসিটিভির ওপর। সেটা ব্ল্যাক হয়ে গেল। লোকটা ইন্টারকমে আবার জানাল, ‘এবার দশ নম্বর অফ হয়েছে। শিগগিরি চেক করো। কী হচ্ছে এগুলো?’
— এটা কোথাকার?
সায়নের প্রশ্নে উত্তর দিল লোকটি, ‘স্যার এটা ওয়াশ রুম থেকে আইসিসিইউর দিকে আসার পথে। পরপর সিসিটিভি আছে নয়, দশ।’ নীলাম্বর হাতের রুদ্রাক্ষের মালা চেপে ধরল। সায়ন কর্ডলেসে কনট্যাক্ট করল, ‘শোভন একটু খেয়াল করো তো তন্ময়ের কেবিনের দিকে ওয়াশরুমের দিক থেকে কেউ আসছে কিনা।’
— হ্যাঁ স্যার। ওই নার্সটাই ফিরছে।
সবাই অবাক হয়ে যায়। একে অপরের দিকে চাইবার মুহূর্তেই দশ নম্বর সিসিটিভি চলতে শুরু করে। এবার এগারো নম্বরের পালা। ঠিক তাই। ভাবতে না ভাবতেই সেটাও অফ হয়ে যায়।
— শোভন নার্স কি একদম কাছে এসে গেছে?
— হ্যাঁ স্যার। তন্ময় হালদারের ঘর
— হ্যালো, হ্যালো শোভন।
কর্ডলেসটা ঘড়ঘড় শব্দ করে কেটে গেল। কোনো সাউন্ডই হচ্ছে না। সময় নষ্ট না করে সূর্য মোবাইল থেকে কল করে শোভনকে। কিন্তু সেখানেও কোনো শব্দ নেই। কোনো নেটওয়ার্কই পাচ্ছে না। নীলাম্বর বলে ওঠে, আর দেরি করলে সর্বনাশ হয়ে যাবে সায়ন। এখুনি চলো।’ সূর্য আর সোমদত্তাও যেতে চাইছিল। কিন্তু সায়ন তাদের এই সিসিটিভি রুমেই থাকতে বলল। হসপিটালের লোকটিকে বলল, ‘আপনি ডক্টর নার্সদের বলে দিন সতর্ক থাকতে। আমরা তন্ময় হালদারের কেবিনে যাচ্ছি।’
— ওকে স্যার।
.
থার্ড ফ্লোরের লিফট থেকে বেরোতে গিয়েই দেখে শোভন দাঁড়িয়ে। ‘এ কী শোভন তুমি এখানে কেন?’
— স্যার লাইন লাগছিল না বলে আমি আপনাদের খবর দিতে যাচ্ছিলাম।
দ্রুত পায়ে হাঁটতে হাঁটতে কথাগুলো বলল শোভন। ইতোমধ্যেই খবর ছড়িয়ে পড়েছে। কয়েকজন নার্স বেরিয়ে এসেছে। কাঁচুমাচু মুখ নিয়ে জিজ্ঞেস করছে, ‘কী হবে স্যার?’ কেউ জিজ্ঞেস করছে, ‘কোনো বিপদ হবে না তো?’ ঝড়ের গতিতে উত্তর ছুড়ে দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে সায়ন, কারও কিচ্ছু হবে না। কেউ প্যানিক করবেন না।’ নীলাম্বর কোনো কথা বলছেন না। রুদ্রাক্ষের মালাটা হাতের মুঠোয় চেপে সামনের দিকে তাকিয়ে এগিয়ে চলেছে। তন্ময়ের কেবিনে সামনে এসে থমকে দাঁড়ায়। সায়ন দরজা খুলতে যায়। কিন্তু পারে না। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। আঁতকে উঠে নীলাম্বরের দিকে তাকায়। সায়ন দরজা ঠেলে। ধাক্কা দিয়ে বলে, ‘নার্স দরজা খুলুন। দরজা খুলুন বলছি। তন্ময়বাবু, তন্ময়বাবু শুনতে পাচ্ছেন?’ নীলাম্বর বিড়বড় করে মন্ত্র পড়ে চলেছেন। ঠিক তখনই তন্ময়ের আর্ত চিৎকার ভেসে আসে কেবিন থেকে। নীলাম্বর চিৎকার করে ওঠে, ‘দরজা ভেঙে ফেলো সায়ন।’ সঙ্গে সঙ্গে শোভন, সায়ন আর নীলাম্বর গায়ের জোরে ধাক্কা দিতে থাকেন। এদিকে তন্ময়ের গলার শব্দ পালটে যাচ্ছে ক্রমশ। আর্তনাদ শুনে বাইরে থেকেই ঠাওর করা যায় তন্ময় ছটফট করছে। তিনটে শক্তপোক্ত পুরুষের শরীরগুলো দরজার ওপরে গিয়ে বারংবার পড়তেই সেটা ভেঙে যায়। এক ঝটকায় সায়ন, শোভন আর নীলাম্বর হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ে তন্ময়ের কেবিনে।
.
ঘর নিস্তব্ধ। বেড খালি। তন্ময় নেই। মাঝে একটা পর্দা টানা। নীলাম্বর এগোতে থাকেন। মুখে অনবরত মন্ত্রোচ্চারণ। সশব্দে দরজাটা আবার বন্ধ হয়ে যায়। চমকে ওঠে শোভন। এমন পরিস্থিতিতে সে এই প্রথম। খুব সন্তর্পণে সাদা পর্দাটা সরাতে থাকেন নীলাম্বর। পর্দাটা সরেও যায়। সায়ন বলে ওঠে, ‘বন্ধ ঘরের মধ্যে থেকে কোথায় যাবে দুজন?’ নীলাম্বরের হঠাৎ নজর পড়ে হাতের রুদ্রাক্ষের দিকে। সেটা একটা বিশেষ দিকে বেঁকে যাচ্ছে। সেইদিকে খেয়াল করতেই দেখে বেডের তলায় নির্দেশ করছে। নীলাম্বর ধীরে ধীরে মাথাটাকে বেডের নীচের দিকে ঝুলিয়ে দিতেই বিকট শব্দ করে ছিটকে আসে তন্ময়ের শরীর। নীলাম্বর ধাক্কা খেয়ে মাটিতে পড়ে যায়। তন্ময়ের মাথা দেয়ালে গিয়ে ধাক্কা খায়। সায়ন দৌড়ে যায় তন্ময়কে বাঁচাতে। চিৎকার করে বলে, ‘আপনি নার্সকে খুঁজুন। আমি তন্ময়কে দেখছি।’ নীলাম্বর কোনোরকমে বলে ওঠেন, ‘ওর গায়ে হাত দিয়ো না সায়ন।’ বলতেই তন্ময় চোখ খুলে তাকায়। চোখের কোল বেয়ে রক্তের ধারা গড়িয়ে পড়ছে। সায়ন কিছু বোঝার আগেই ধারালো নখযুক্ত তন্ময়ের হাত সায়নের গলা চেপে ধরে। নীলাম্বর সবে কাঁধের ঝোলা থেকে কিছু একটা বের করতে যাবেন অমনি আরও একটা বিকট শব্দ পান। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখেন নার্সের হাত শোভনের গলা চিপে ধরে ওপরের দিকে তুলে ধরছে। একপাশে তন্ময়, আর-এক পাশে নার্স। দুজনেরই বিকট মূর্তি। নার্সের চোখ, ঠোঁটের কোণ রক্তে ভেসে যাচ্ছে। হাতগুলো অস্বাভাবিকভাবে বাঁকা। দুজনের মুখ দিয়েই ঘড়ঘড়ে শব্দ বেরোচ্ছে। নীলাম্বর বুঝতে পারে না ঠিক কোন শরীরে শান্তনুর আত্মা আর কোন শরীরে সেই আত্মার দশগুণ বেড়ে যাওয়া শক্তির অংশ! নীলাম্বর খেয়াল করে নার্সের মুখে চোখ, নাক, ঠোঁট কোনোটাই সঠিক জায়গায় নেই। পাথর দিয়ে থেঁতলে দেওয়া শান্তনুর মুখ যেমন দেখেছিলেন অনেকটা সেরকম। শোভনের দমটা প্রায় বেরিয়ে আসছে। সঙ্গে সঙ্গে নীলাম্বর হাতের রুদ্রাক্ষটা চেপে ধরে নার্সের মাথায়। পড়তে থাকে মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র। কান-ফাটানো চিৎকার করে শোভনকে ছেড়ে দেয় নার্সের হাত। শোভন মাটিতে পড়েই জ্ঞান হারায়। উলটোদিকে সায়নের গলাতেও তন্ময়ের হাত আলগা হয়ে যায়। নার্স লুটিয়ে পড়ে। তন্ময় হঠাৎ পাথরের মতো হয়ে মুখ থুবড়ে সামনের দিকে পড়ে। বন্ধ হয়ে যাওয়া দরজাটা দড়াম শব্দে খুলে যায়। একটা হাওয়ার তোড় যেন ধ্বংসাত্মক রূপ নিয়ে ছুটে বেরিয়ে যায়। সায়ন গলা ধরে কাশতে থাকে। বাইরে থেকে কিছু পুলিশ ভেতরে ঢুকে আসে। তারাই চিৎকার করে ডাক্তার ডাকে। তন্ময়কে এই কেবিনের বেডেই শুইয়ে দেওয়া হয়। নার্স আর শোভনকে অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হয়। সায়ন ঠিক আছ তো?’ নীলাম্বর প্রশ্ন করেন। গলায় হাত বুলিয়ে মুখে ব্যথার ভাব এনে বলে ‘হ্যাঁ, আমি ঠিকাছি। কিন্তু সে কোথায় গেল?’
— আপাতত পালিয়েছে। কিন্তু বুঝতে পারছি না কোথায়।
— দুজনেই পজেসড হয়ে গেল কী করে?
— শান্তনুর আত্মার শক্তি অনেক বেড়ে গেছে। এই আত্মারা যত বেশি প্রতিশোধ নিতে সফল হয় ততই ওদের শক্তি বাড়ে। আত্রেয়ীকে মারতে সফল হয়েছে। তার আগে বৃষভানু, তেঁতুল। এদের জীবনী শক্তি শুষে নিজে শক্তিশালী হয়েছে। মিহিরের শরীরের বাস করাকালীন তারও রক্ত শুষেছে। তাই মিহির অমন রক্তশূন্য ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল। ও এখন অজস্র শরীরকে বশে আনার ক্ষমতা রাখে। একসঙ্গে এখন আমাদের অনেকের সঙ্গে লড়তে হবে সায়ন। চলে এসো।’ এগোতে গিয়েও হঠাৎ কী মনে হওয়াতে থেমে যান নীলাম্বর। সায়নের দিকে ঘুরে ডানহাতের জামার হাতাটা তুলে দেখেন বাহু শূন্য। ‘কালভৈরবের তাবিজটা কোথায় গেল সায়ন?’ এক রাশ আতঙ্ক নিয়ে নীলাম্বর বললেন। সায়ন অবাক। ‘আশ্চর্য! কালকেও তো আমার হাতে ছিল। খুলে গেল কখন?’ নীলাম্বরের মনে পড়ল আজ সকালে একটা দুর্ঘটনা ঘটতে গিয়েও ঘটেনি। ‘কালো বেড়াল!’ কথাটা নীলাম্বরের মুখ থেকে শুনেই প্রবল ঝাঁকুনি দিয়ে গাড়িটা থেমে যাওয়ার কথা মনে পড়ল। সায়ন বলল, ‘সর্বনাশ! মোহনলাল তো আমাদের এখানে নামিয়ে দিয়েই গ্যারেজে গাড়ি ধুতে নিয়ে গেছে।’ হাত উলটে ঘড়ি দেখল সায়ন। রাত একটা বেজে গেছে। মোহনলাল সায়নদের হসপিটালে ছেড়েছে রাত সাড়ে ন-টায়। নীলাম্বর বললেন, ‘আমাদের এখুনি সিসিটিভি রুমে যাওয়া উচিত।’
— চলুন চলুন। এই তোমরা এঁদের দেখো।
কেবিনেই শুইয়ে ডাক্তার তার মতো চিকিৎসা শুরু করেছে। সায়ন তাকেও বলে গেল, ‘যেভাবে হোক তন্ময়কে বাঁচাতে হবে ডক্টর।’
— আমরা সবরকমের চেষ্টা করছি স্যার।
— থ্যাংক ইউ।
সায়ন করিডর দিয়ে লিফটের দিকে যাচ্ছে। সঙ্গে নীলাম্বর। ফোন করল মোহনলালকে। লিফটে ঢুকে গেল দুজনে। নীলাম্বর বললেন, ‘কী হল? ফোন তুলল না মোহনলাল?’
— সুইচড অফ।
সায়নের মুখটা একটু হলেও শুকিয়ে গেল।
