মৃত জ্যোৎস্নার রাত্রি – ৪৬
ছেচল্লিশ
কাছেপিঠে জ্বলতে থাকা আগুনের আঁচ এসে পড়ছে ব্রহ্মস্বরূপানন্দের রক্তবস্ত্রে। রাতের আঁধারেও বস্ত্রের টকটকে লাল রংটা দপদপ করে জ্বলে উঠছে। মাথা থেকে আজানুলম্বিত একরাশ জটা নেমে এসেছে। চোখদুটো নেশায় রক্তিম বর্ণ। ওপরের ঠোঁট খয়েরি-সাদা গোঁফে ঢেকে আছে। শীর্ণকায়। এত বয়সেও হাত কাঁপে না তাঁর। কামরূপ কামাখ্যার শ্মশানেই গত মাসদুয়েক ধরে আছেন। এরপর আবার অন্য কোথাও যাবেন। ব্রহ্মস্বরূপানন্দ অনেকক্ষণ ধরে একভাবে তাকিয়ে আছেন নীলাম্বরের চোখের দিকে। তারপর গমগমে গলায় বলে উঠলেন, ইস উমর মে হঠাৎ তোর এমন সর্বনাশের শখ হল কেন?’ নীলাম্বর জবাব দিলেন, ‘আমার পূর্বপুরুষ ছিলেন অঘোরী সাধক। আমি তাঁর এক কণাও নই গুরুদেব।’
— সির্ফ ইয়েহি ওয়াজা?
— না গুরুদেব। কৌতূহল বলতে পারেন। শবদেহ জাগাব আমি। শব সাধনা করব। কত মানুষ কত কঠিন সমস্যা নিয়ে আসে। আমি তাদের ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হই। শুধু অনেক কিছু জানি না বলে। আপনি আমায় সাহায্য করুন গুরুদেব।
— সবার জন্য সব কিছু নয় নীলাম্বর। এক জীবনে তুই সব কিছু চাইছিস।
— আমি তো জীবনে কারও ক্ষতি করিনি। সৎভাবে বেঁচেছি। নিজের সাধ্যমতো সবার উপকার করেছি। আমি আরও উপকার করতে চাই গুরুদেব।
— উও তো ঠিক হ্যায়। পর তুই আরও শক্তিশালী ভি হতে চাস বেটা। বেশ। আমি তোর সামনে শব জাগাব। ফির ওই আত্মার ইচ্ছা তোকে পূরণ করতে হবে। তবেই আমি তোকে এই সাধনার দীক্ষা দেব।
.
হিন্দির টানে বাংলায় কথাগুলো বলে গেল ব্রহ্মস্বরূপানন্দ। তিনি হাঁক দিলেন, ‘নিগমানন্দ, নিগমানন্দ।’ কাছেপিঠে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বেশ কিছু সাধু গাঁজায় টান দিচ্ছিল। তার মধ্যে থেকেই কালো জটাধারী এক মাঝবয়সি সাধু উঠে এল। গুরুদেব হুকুম দিলেন, ‘করোটি কা ঝোলা লে কর আও।’
— জি।
বলে ঘরে গিয়ে একটা বিশাল লাল রঙের ভারী ঝোলা নিয়ে এল। দড়ি দিয়ে বাঁধা ঝোলার মুখটা খুলে গুরুদেব বললেন, ‘এই ঝোলায় বহুত করোটি আছে। আদ্যাশক্তির নাম নিয়ে তুই চোখ বুজে এর মধ্যে হাত ঢোকাবি। তারপর তোর হাতে প্রথম যে করোটি পাবি সেটাই তুলে আমায় দিবি। মনে রাখবি, তোর হাত প্রথম যে করোটি স্পর্শ করবে ওটাই আমায় দিবি। আমি ওই করোটিতেই প্রাণ প্রতিষ্ঠা করে উও ইনসানকা শরীর ওয়াপস করব। উও য্যায়সা ভি হো, মাননা পড়েগা তুঝে।’
— তাই হবে গুরুদেব।
নীলাম্বরের চোখদুটো চকচক করে ওঠে। আদ্যাশক্তির উদ্দেশে প্রণাম করে চোখ বুজে ঝোলার মধ্যে থেকে তুলে আনে একটা নরকরোটি। গুরুদেব বলেন, ‘আঁখে খোল বেটা।’ নীলাম্বর চোখ খুলে দেখেন যে-করোটি সে তুলে এনেছে সেটা বিকৃত, বিকট। দু-পাশে চ্যাপটা। অন্যান্য নরকরোটির মতো আকৃতি নয়। অবাক হয়ে প্রশ্ন করেন নীলাম্বর, ‘গুরুদেব, এ কী মানুষের করোটি?’
— হাঁ বেটা। এটা মানুষেরই। আজ সে ছ্যায় সাড়ে ছ্যায় সাল পহেলে আমরা হিমাচলের রাভি নদীর পাড়ে সাধনা করছিলাম। রাত মে হঠাৎ বিশাল বড়ো একটা পাখর গিরনে কা শব্দ হুয়া। উসকে বাদ, অউর ভি এক শব্দ। উও শব্দ বহুত কম থা। সাধনা ছেড়ে উঠতে নেই। তাই তখন কিছু দেখিনি। সারা রাত সাধনা করে ভোরবেলা নাহানে কে লিয়ে হাম নদী মে যা রহে থে। হামারা ঝোপড়ি নদীকে পাস হি থা। তখনও আলো ফোটেনি। হঠাৎ দেখি, একটা মানুষের বডি ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে আছে। সারা গায়ের জামা ছেঁড়া। রক্তের দাগ। কাছে গিয়ে দেখি, লোকটার মাথাটা কেউ ভারী পাথর দিয়ে থেঁতলে দিয়েছে। নদীর ওপর জঙ্গল, তার ওপর পাহাড়। উসকে উপর এক জগাহ হ্যায়। নাম মালুম নেই। শায়েদ মার্ডার করকে উঁওহি সে ফেক দিয়া। একদিকে আমাদের ভালোই হল। শবসাধনায় অপঘাতে মৃত্যুর মড়া আমাদের কাজে লাগে। তখনই ওই বডি নিয়ে আমরা পাহাড়ের ভেতর চলে যাই। সেই বডির করোটিই এটা। আমি পঁয়তাল্লিশ দিন এই করোটিকে নিয়ে সাধনা করে এই আত্মার পূর্বরূপ ফিরিয়ে আনব। তুই থাকবি আমার সঙ্গে।
— তাই হবে গুরুদেব।
.
সেই করোটিকে সামনে রেখে শুরু হল সাধনা। ঠিক পঁয়তাল্লিশ দিনের দিন হঠাৎ ব্রহ্মস্বরূপানন্দের সামনে থেকে উধাও হয়ে গেল করোটি। নীলাম্বর চমকে যায়। তার বেশ খানিকক্ষণ পর রাতের অন্ধকারে চোখ বন্ধ করে নীলাম্বরও যখন একমনে ধ্যান করছেন তখন বুঝতে পারেন তাঁদের ঘিরে কেউ যেন ঘুরছে। চোখ বুজেই একটা ছায়ার চলাচল আন্দাজ করেন নীলাম্বর। হঠাৎ ঘড়ঘড়ে গলায় কে যেন বলে ওঠে, ‘বড্ড কষ্ট!’ পিলে-চমকানো সেই কণ্ঠ শুনে নীলাম্বর চোখ খুলতে বাধ্য হন। দেখে তার থেকে মাত্র চার-পাঁচ হাত দূরত্বে একজন পুরুষ দাঁড়িয়ে আছে। সম্পূর্ণ নগ্ন। মানুষেরই মুখ। কোনোভাবেই থ্যাঁতলানো নয়। কিন্তু চোখ ও মুখের ভঙ্গি যে-কোনো মানুষকে ভয় পাইয়ে দেবে। লোকটা প্রচণ্ড রেগে আছে। সারা শরীরে কষ্টের সঙ্গে বিপুল রাগ ফুটে উঠেছে। গুরুদেব চোখ খোলেন। আত্মার দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘কষ্ট তো হবেই। নরক-যন্ত্রণা ভোগ করছিস যে।’ রাগে গরগর করে উঠল আত্মাটা। আবার বললেন, ‘নরকে গিয়েও তোর শান্তি নেই। তোর অনেক ইচ্ছে। যা, পূরণ করে নে। দুই পক্ষকাল সময় পাবি।’ কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গে আত্মার চোখ-মুখ সব পালটাতে থাকে। ধীরে ধীরে মুখটা খ্যাতলানো রক্তাক্ত হয়ে যায়। নীলাম্বর তাকাতে পারছিল না। আত্মা হাওয়ায় বিলীন হলে তার শান্তি হয়।
— ও কোথায় গেল গুরুদেব? আমি কীভাবে ওকে সাহায্য করব?
গুরুদেবের শুভ্র শুশ্রুর ফাঁকে ছলনার হাসি ফুটে ওঠে। তিনি বলেন, ‘এ এক জটিল ইচ্ছেপূরণ নীলাম্বর। তোকে খুব বুদ্ধি করে চলতে হবে। নইলে সব ছারখার করে দেবার ক্ষমতা রাখে এই আত্মা। জীবিত অবস্থায় এ নিজেও ছিল লম্পট, দুশ্চরিত্র। ধূর্তও বটে। এখনও সেই সকল দোষ ওর মধ্যে বিদ্যমান। কিন্তু কোনো মানুষের প্রাণ সে নেয়নি। উলটে ওর প্রাণ চলে গেছে। যারা যারা ওকে শেষ করেছে এখন শুধু ও তাদের শেষ করবে না। যারা ওর পথে বাধা হয়ে আসবে ও তাদেরও শেষ করে দেবে।’
— কিন্তু গুরুদেব, যেকোনও পরিস্থিতিতেই তো মানুষকে মারা পাপ। আমি সেই পাপ কাজে ওকে সাহায্য করব?
— পাপ দিয়েই পাপকে খতম করতে হয় নীলাম্বর। অপরাধীকে ফাঁসি দেওয়া, এনকাউন্টার করা, সেগুলোও তো মেরে ফেলাই। কিন্তু পৃথিবী থেকে পাপ সরাতে পাপীদের হত্যায় সাহায্য করা কোনো অপরাধের নয়। তা ছাড়া তুই আপনে হাথো সে নেহি মারেগা।
— তাহলে?
আবার হাসেন গুরুদেব। ‘সব ম্যায় বোল দুঙ্গা তো তেরা পরীক্ষা ক্যাসে হোগা?’ নীলাম্বর বেশ চিন্তায় পড়ে যান। কূলকিনারা খুঁজে পান না গুরুদেবের কথার। আবার চোখ বন্ধ করে ধ্যানে বসেন গুরুদেব। বলেন, ‘তুই নিজে ঠিক করবি, কাকে মারবি আর কাকে রাখবি। একটা বাত মাথায় রাখিস, তুই যাকে পাপ ভাবছিস, সেটা তোর পরিচিত কারও নিয়তি। সেই নিয়তির ভোগযন্ত্রণা থেকে তাকে তুই-ই মুক্তি দিবি। ইয়েহি তেরা নিয়তি হ্যায়।’
— আমি কী ফিরে যাব গুরুদেব?
— আজ সে সাতদিন বাদ পূর্ণিমাকে রাত। মাঝরাতে ব্রহ্মপুত্রের ধারে আমি একটা যজ্ঞ করব। তারপর যেটা দেব ওটা নিয়ে রওয়ানা হবি।
.
— আপনি গেলেন সাতদিন বাদে?
প্রশ্নটা মৃন্ময়ী করল। সায়নের বাড়িতে বসে দমবন্ধ করে সবাই নীলাম্বরের গল্পটা শুনছে। সূর্য আর সোমদত্তাও উপস্থিত। নীলাম্বর বললেন, ‘হ্যাঁ গেলাম। সেই যজ্ঞের পরই উনি আমায় চণ্ডাল-করোটি দিয়ে বলেছিলেন কালভৈরবের মন্ত্র দ্বারা ভৈরবী যন্ত্রে চণ্ডালকে জাগাতে হবে। তার জন্য লাগবে পনেরো দিনের মধ্যে মৃত্যু হওয়া একটা চণ্ডালের হার্ট। সেটাই হবে আমাদের রক্ষাকবচ।’ মৃন্ময়ীর দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘তোমাদের বাড়ি থেকে যেভাবে আমি শান্তনুর আত্মাকে তাড়ালাম।’ মুনাই জিজ্ঞেস করে, ‘তার মানে আপনি জানতেন ওই আত্মা আমাদের এই সর্বনাশ করবে?’
— না মা। গুরুদেব যখন নিয়তির কথা বলেন তখন আমি কিছু বুঝিনি। আমি শুধু ভেবে গিয়েছি কার হতে পারে? আমি ট্রেনে বা ফ্লাইটে কিছুতেই আসিনি। কারণ ওই চণ্ডাল-করোটি নিয়ে প্লেনে আসা সম্ভব ছিল না। ট্রেনটাও রিস্কি হয়ে যেত। তাই বাই রোড এসেছি। আসতে আসতেই ইন্টারনেটে মিহিরের খবরটা পড়ি। ঠিক তখনই আমার মনে পড়ে মিহিরের কুষ্ঠির কথা। মিহিরের জীবনের এই ঘটনার জন্য তোমরা আমায় দায়ী করতেই পারো। কারণ আমার থেকেই এই সর্বনাশের শুরু।
সায়ন লজ্জা পেয়ে বলে ওঠে, ‘না না নীলাম্বরবাবু। এ আপনি কী বলছেন? আপনিই তো সব করলেন। আর শেষে সোমদত্তা।’ সবার সামনে প্রশংসা সোমদত্তাকে বেশ লজ্জায় ফেলে।
— না সায়ন। তোমরা জানো না। এর শুরু কোথায়!
নীলাম্বরের কথায় উপস্থিত সবার কপালে নতুন করে ভাঁজ পড়ে। মৃন্ময়ী বলে, আরও কিছু আছে নীলাম্বরবাবু?’
— হ্যাঁ মা। এই সর্বনাশের উৎস এখনও তোমাদের বাড়িতে বর্তমান।
মৃন্ময়ী ভয় পেয়ে যায়। ‘মানে? কী সেটা?’
— তেরো নম্বর ফ্লোরের ঘটনাটার শেষ দিন, মানে যেদিন ঊষাকালে মিহির তিলোত্তমার অস্থি গঙ্গায় বিসর্জন দিল। সেইদিন থেকেই আজকের ঘটনার সূত্রপাত। মিহির ফেরবার পথে আমার প্যারানরমাল সোসাইটির ছেলেদের জিজ্ঞেস করে যে, ওই ফ্লোরে এখন যাওয়া যাবে কিনা। কারণ ওখানে ওর ফোনটা পড়ে আছে। ছেলেরা বলে দেয়, কোনো প্রবলেম নেই। আসলে ওরাও তো শিখছে। ওদের শেখা অনেক বাকি। অনেক কিছু জানে না ওরা। তা সেদিন মিহির ওদের কথা শুনে তেরো নম্বর ফ্লোরে যায়। ফোনটাও খুঁজে পায়। ঠিক তখনই একটা শব্দ হয়। ভারী দরজাটা বন্ধ হওয়ার শব্দ। মিহির অবাক হয়ে যায়। ফোনটা হাতে নিয়ে দরজার কাছে আসে। কাউকে দেখতে পায় না। দেখার কথাও নয়। কারণ কোনো মানুষ সেখানে ছিল না। তিলোত্তমা যাবার সঙ্গে সঙ্গে কাচের গা থেকে কালো মায়া সরে গিয়েছিল। কিন্তু এক যুগ ধরে অশুভ শক্তির বাসস্থান ছিল ওই তেরো নম্বর ফ্লোর। তাই আত্মা বিদায় নিলেও সম্পূর্ণভাবে অশুভ শক্তি চলে যায় না। মৃতদেহের সঙ্গে আত্মা যেমন তিনদিন বাস করে, তেমনি অশুভ আত্মা চলে যাবার পরেও তার বসবাসকারী স্থানে অনেক অশুভ অতৃপ্ত ছায়ারা থাকে তিনদিন বা আরও বেশিদিন পর্যন্ত। যারা কর্মফলের দরুন নানান লোকে বিচরণ করে। কেউ দেখা দেয় আবার কেউ অদৃশ্য হয়ে থাকে। তাদের চেনা যায় না। শুধু অনুভব করা যায় যে কিছু একটা আছে। মিহির শুধু সেই ফ্লোরেই যায়নি, ওই ফোনটাকেও বাড়িতে নিয়ে আসে। তাই ওর ওপর থেকে অশুভ ছায়া কাটেনি।
মৃন্ময়ী চোখ বড়ো বড়ো করে উত্তেজিত হয়ে বলে ওঠে, ‘ফোনটা ওখান থেকে আনার পর আর চালু হয়নি। কিন্তু আমার ছেলেটা তো এখন ওই ফোনটা নিয়েই খেলে।’
— হয়তো সেই কারণেই আত্মা তোমার ছেলেকে বশ করতে পেরেছিল। কোনো নেগেটিভ এনার্জি আছে যে জায়গায়, সেখানকার কোনো জিনিস বাড়িতে রাখবে না। তাহলে অশুভ আত্মারা আকৃষ্ট হয়। আর তোমাদের বাড়িতে কোনো মঙ্গলযজ্ঞ না করেও ঢুকবে না। তার আগে ওই ফোনটাকে গঙ্গায় বিসর্জন দেবে।
— আপনি এই কারণেই আমায় ডেকে পাঠিয়ে মিহিরের কুষ্ঠি নিয়ে বলেছিলেন?
মৃন্ময়ীর প্রশ্নে মাথা নেড়ে নীলাম্বর বলেন, ‘হ্যাঁ। কারণ ছেলেগুলোর মুখ থেকে ওটা শোনার পর মনটা খুব খচখচ করছিল। তারপর কুষ্ঠিতেও যখন দেখলাম তখন আর…’ একটা বড়ো নিশ্বাস ছেড়ে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ালেন নীলাম্বর। এবার আমি আসি। একটু উকিলের বাড়ি ঘুরে বাড়ি চলে যাব।’ সকলে উঠে দাঁড়ায়। নীলাম্বর সোমদত্তার মাথায় হাত রেখে বলেন, ‘একটা কথা মাথায় রাখিস মা, মানুষের সবচেয়ে দুর্বলতম জায়গা হল ভয়। সেটাকে কক্ষনো মনে স্থান দিবি না। শুভ চিন্তা নিয়ে এগিয়ে যাবি। তোর জয় নিশ্চিত।’ সোমদত্তা হেসে ঢক করে প্রণাম করতে যায় নীলাম্বরকে। নীলাম্বর সোমদত্তাকে বাধা দিয়ে বলে ওঠে, ‘একদম না। আসি, বিয়েতে নেমন্তন্ন করিস কিন্তু। কবজি ডুবিয়ে খাব।’ বলেই সূর্যের দিকে তাকায়। সূর্যও হাসে। তারপর সূর্য আর সোমদত্তাকে একসঙ্গে আশীর্বাদ করে বেরোবার জন্য উদ্যোগ নেন। এগোতে এগোতে মৃন্ময়ী বলে, ‘হসপিটাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর ওর যে কী হবে জানি না। ভালোয় ভালোয় ফিরে এলে পুজো দেব বাড়িতে। ওই পুজোটাও কিন্তু আপনিই করবেন নীলাম্বরবাবু।’ চলতে গিয়ে থমকে যান। মৃন্ময়ীর দিকে মুখ ফিরিয়ে শুধু হাসেন।
.
সমগ্র পুলিশ ডিপার্টমেন্ট মিহিরের পাশে দাঁড়ায়। জাঁদরেল উকিলের তত্ত্বাবধানে কোর্টে কেস ওঠে। আত্রেয়ীকে বোলপুরের চৌধুরি ভিলা থেকে ঠেলে যে ফেলেছিল সে মিহির নয়। কারণ যে সেই ঘটনা দেখেছে অর্থাৎ বৃষভানু সে তার বন্ধু বল্টুকে সাদা ধবধবে রাক্ষুসে চোখের কথা বলে। যেটা মিহিরের নয়। সেরকম কোনো লেন্সের হদিশও মেলেনি। এরপর বোলপুর থানার গরাদ ভেঙে পালায় মিহির। কিন্তু কীভাবে? কৃষ্ণপদ কোর্টে ওঠে। গারদ ভেঙে পালাতে গেলে সবার চোখের সামনে দিয়েই পালাতে হবে। তাহলে কৃষ্ণপদ ঘোড়ুই যে বোলপুর থানার ওসি সে কী করছিল? দায়িত্বজ্ঞানহীনতার আঙুল ওঠে তার দিকে। শুধু সে নয়, গোটা থানা-ভরতি লোকের চোখে ধুলো দিয়ে পালিয়ে গেল সে। একজন সাধারণ মানুষ হয়ে তার গায়ে এত জোরই-বা এল কোত্থেকে? মিহিরের রেকর্ড বলছে সে দাগি আসামি নয়, বডি বিল্ডার নয়। ডাক্তারি পরীক্ষায় পরবর্তীকালে তার আসুরিক শক্তির কোনো রিপোর্ট পাওয়া যায়নি। কিন্তু লোকে বলছে তাকে নাকি পিশাচ ভর করেছিল। যা আইন মানে না। যদি মিহির নিজের ইচ্ছেতেই পালায় তাহলেও সে কীভাবে বোলপুর থেকে কলকাতা ওইটুকু সময়ে আসে? যখন দ্রুতগামী কোনো যানই কলকাতা পৌঁছোতে পারে না? বৃষভানু খুন হওয়ার পর তার শরীর থেকে মিহিরের হাতের ছাপ পাওয়া যায়নি। মৃত্যুটাও অস্বাভাবিক। শুধুমাত্র হাতের চাপে কোনো মানুষের পক্ষে ওইভাবে মারা সম্ভব নয়। অন্য কোনো অস্ত্রের প্রমাণ মেলেনি। এমন কোনো তথ্য মেলেনি যা মিহিরের সঙ্গে সম্পর্কিত। এমনকি, তেঁতুল ওরফে পিন্টু ঘোষ বৃষভানুর মতোই বীভৎস চোখের একটি লোককে দেখে। সিসিটিভিতে যার মুখের ছবি ধরা পড়েনি। শুধু জামা আর প্যান্টের রংটা বোঝা গিয়েছিল। যা মিহির সরখেলের সঙ্গে মিলছিল। তা-ও স্ট্রিট লাইটের আলোয় জামার রং সঠিক করে বলা যায়নি। এরপরে তেঁতুলের মৃত্যু যা আদতে আইনের চোখে খুব রেয়ার দুর্ঘটনা। কোর্টে এসে আত্রেয়ীর নার্স সোহিনী সান্যাল বয়ান দেয় সে ঠিক কী কী দেখেছে এবং ফেস করেছে। কীভাবেই-বা আত্রেয়ী মারা যায়! তন্ময় হালদার যে কিনা কোর্টে প্রমাণিত হয় শান্তনু খুনের দোষী বলে সে-ও স্বীকার করে, তাকে যে মারতে চেয়েছিল সে মিহির নয়। শান্তনু। অথচ শান্তনু মৃত। তাহলে সে এল কোথা থেকে? সেটা অমীমাংসিত। ভূতের কনসেপ্ট আদালত না মানলেও ড্রাইভার আবদুলের মৃত্যু, আত্রেয়ীর মৃত্যু এবং ড্যাফোডিলে ঘটা ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ দেখে স্বয়ং বিচারক হতবাক। এর কোনো যুক্তি পায়নি আদালত। সাক্ষী হিসেবে সুরভি দেবীকে আনা সম্ভব হয়নি কারণ মেয়ের হাজতবাসের কথা শুনে তাঁর হার্টফেল করে। তন্ময় আদালতে সব স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে। পুলিশ সবই জানত। শুধু এই ওয়ালেট আর ছবির কেসটাই ধোঁয়াশায় ছিল। তন্ময় জানায়, শান্তনুকে খুন করার পর ওর ওয়ালেট ফেলে দিতেই পারত। কিন্তু সেক্ষেত্রে কেউ না কেউ খুঁজে পেত। তাই চলন্ত ট্রেন থেকে ফেলে দেবে বলে প্যান্টের পকেটে রাখে। ফেরার পথে ওরা ফ্লাইটের টিকিট পায়নি। এছাড়া ফেরার পথে ওরা দুজনে এত ভয়ে ছিল যে, ওয়ালেটের কথাটা মাথা থেকে বেরিয়ে যায়। কলকাতা ফিরে এসে যখন খেয়াল হয় তখন আত্রেয়ী বলে তার কাছে থাকা অনাথআশ্রমের ছবিগুলোও এমন একটা জায়গায় লুকোতে হবে যাতে কেউ না খুঁজে পায়। কিন্তু সেগুলো পুড়িয়ে একেবারে নষ্ট করতে চায়নি সে। ওই ছবিগুলো ওর প্রথম মা-হওয়ার স্মৃতি। তাই বারবার বলা সত্ত্বেও ছবিগুলো জ্বালাতে চায়নি। প্রকাশ না করলেও বন্দনার প্রতি অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়ে আত্রেয়ী। শান্তনুকে জীবন থেকে সরিয়ে দেবার পর বন্দনার ওপর অনেকটাই ভরসা করতে শুরু করে আত্রেয়ী সেন। ওর কথাতেই ওই ছবিগুলোর সঙ্গে শান্তনুর ওয়ালেটটাও ধানুয়ার ঘরের দেয়াল ভেঙে লুকিয়ে ফেলে তন্ময়। যে লোক এই কাজ করে তাকেও তন্ময় কলকাতার বাইরে থেকে নিয়ে আসে। তন্ময় ও বন্দনার যাবজ্জীবন কারাবাস ঘোষণা করে আদালত। প্রমাণের অভাবে বেকসুর খালাস পায় মিহির সরখেল। প্রতিটা মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে সেই খবর। হইচই পড়ে যায় চতুর্দিকে।
.
মিহির এখন স্ক্রাচ নিয়ে হাঁটে। ডাক্তার বলেছে, এটা টেম্পোরারি। আবার আগের মতো ছুটে হেঁটে ঘুরে বেড়াতে পারবে মিহির সরখেল। বাড়িতে বড়ো করে যজ্ঞের আয়োজন হয়। চারজন পুরোহিত সেই যজ্ঞ করেন। নীলাম্বর ব্যানার্জিই এঁদের কন্ট্যাক্ট দিয়েছিলেন সায়নকে। কিন্তু তিনি আসেননি। আসতে পারেননি।
.
সাদার্ন অ্যাভিনিউয়ে নীলাম্বরের বাড়ি। আজ বৃষ্টিটাও হচ্ছে অনেকক্ষণ ধরে। বৃষ্টি থামলে বেরোব, এই ভেবে অপেক্ষা করেই সময়টা নষ্ট হল। প্যারানরমাল সোসাইটি থেকে বাড়ি ফিরতে অনেকটা রাত হয়ে গেল নীলাম্বরের। রাস্তাঘাটে লোকজন নেই বললেই চলে। বৃষ্টি মাথায় ঘাড় নীচু করে এক পায়ে দাঁড়িয়ে রাস্তা পাহারা দিচ্ছে স্ট্রিটলাইটগুলো। কালু, ভুলুরাও আজ বেপাত্তা। নইলে এতক্ষণে বিস্কুটের আশায় ল্যাজ নাড়তে নাড়তে ঠিক চলে আসত। ছাতা মাথায় হাঁটতে হাঁটতেই মোবাইলে কথা বলছেন নীলাম্বর। ‘হ্যাঁ হ্যাঁ সব ঠিক আছে। আমি আর কী বলব বলুন তো? সেদিন তো আপনার বাড়িতে গিয়ে সব দেখে এলাম। আমার যাবতীয় আইনি দস্তাবেজ তো আপনি আজকে প্রথম করছেন না। না না সমাজপতিবাবু পূর্ণ বিশ্বাস করি আপনি সব ঠিক করবেন… হ্যাঁ আমি ভাইয়ের ছেলেকে আসতে বলেছি। ও তো এখন ব্যাঙ্গালোরে। এলেই আপনার কাছে নিয়ে যাব। আর একান্ত যদি আসতে না পারে তাহলে আর-
.
আর কিছু বলার অবকাশ পেলেন না নীলাম্বর। কখন যে দানবের মতো লরিটা হর্ন ছাড়াই ছুটে এসে পিষে দিয়ে গেল তাঁকে, নীলাম্বর নিজেও টের পেলেন না। ফোনটা কোথায় পড়ল জানেন না। তবে নীলাম্বরের শরীরটা উড়ে গিয়ে পাঁচিলে ধাক্কা খেয়ে রাস্তার পাশেই পড়ল। সারা শরীরের রক্ত ধুয়ে দিতে দিতে বৃষ্টিও ক্লান্ত হয়ে গেল। চোখের ওপর স্ট্রিটলাইটের আলোগুলো নিভে যাবার আগে আগুনের মতো দপ করে জ্বলে উঠল। সেই আগুনের পাশে বসেই গুরুদেব বলেছিলেন, ‘তুই এই আত্মাকে জাগাচ্ছিস। তাই মনে রাখিস নীলাম্বর, আত্মার ইচ্ছে যদি পূর্ণ না হয় তাহলে ও যে লোকেই থাকুক না কেন, তোকে মেরে তবেই শান্ত হবে।’
.
চার পুরোহিত উচ্চকণ্ঠে সংস্কৃত মন্ত্রোচ্চারণ করে চলেছেন। আগুনের লেলিহান শিখাগুলো পরমানন্দে নৃত্যরত। যজ্ঞ ঘিরে বসে আছে সায়ন, মিহির, মুনাই, মৃন্ময়ী, সূর্য, সোমদত্তা ও সোনাই। সকলের চোখই জ্বালা করছে এখন। নোনতা জল গড়িয়ে পড়ছে টুপটুপ করে। সে কী ধোঁয়ার জন্য, নাকি ডাইনিঙের দেয়ালে মালা দিয়ে সাজনো পরমবন্ধুর ছবিটার জন্য!
.
গল্প শেষ হয়। কিন্তু জীবন নয়।
***
