মৃত জ্যোৎস্নার রাত্রি – ৫
পাঁচ
ইনটারোগেশন রুম থেকে বাইরে এসে কৃষ্ণপদবাবু দেখলেন ওঁর চেয়ারের উলটোদিকের চেয়ারে সায়ন মল্লিক আর-একজন মহিলা বসে আছে। সায়নকে দেখেই আপাদমস্তক মেপে নিলেন কৃষ্ণপদ। পদের তুলনায় এক্কেবারেই কচি। ফরসা গায়ের রং। টিকালো নাকের নীচে সুন্দর একটা গোঁফ। ঠোঁটের দু-পাশে গোঁফের শেষপ্রান্ত দুটো নেমে সরু হয়ে গেছে। চেহারাটাও শক্তপোক্ত। প্রাথমিক আলাপ পর্ব ও পেশাগত সৌজন্য সেরে সায়ন সরাসরি প্রশ্ন করল কৃষ্ণপদকে, ‘আমাকে একটা কথা বলুন কৃষ্ণপদবাবু, আপনি ঠিক কীসের ভিত্তিতে মিহির সরখেলকে গ্রেপ্তার করলেন? ওখানে তো এত লোক ছিল। আপনার কেন মনে হল এইরকম একটা জঘন্য কাজের পেছনে মিহির সরখেলেরই হাত আছে?’ একদমে কথাগুলো বলে থামল সায়ন। গলাটাকে একটু ঝেড়ে নিয়ে কৃষ্ণপদ ঘোড়ুই উত্তর দিলেন, ‘সাক্ষ্য এবং সারকামস্ট্যানশিয়াল এভিডেন্স।’
— একটু বিস্তারিত বললে ভালো হয়।
— তার আগে বলুন সায়নবাবু, আপনাকে এত কথা কেন বলব? এটা তো আমার এরিয়ার কেস। যা বলার কোর্টে বলব।
— চ্যানেলটা আমার থানার আন্ডারে পড়ছে। আর তাছাড়া মিহির সরখেল আমার স্ত্রীর দাদা এবং ইনি ওঁর স্ত্রী।
— ও বাবা! বাঘের ঘরেই ঘোগের বাসা?
বলেই ফিক করে হাসলেন কৃষ্ণপদ। কথার খোঁচাটা বুঝতে দেরি হল না বিধাননগর থানার তুখোড় ওসি সায়ন মল্লিকের। মৃন্ময়ী প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে বলে উঠল, ‘ও এমন কাজ করতে পারে না স্যার। নিশ্চই আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে।’
— দেখুন ম্যাডাম এমন কথা সব অপরাধীর বাড়ির লোকেরাই বলে।
এবার সায়নের গলাটা একটু চড়ে গেল, ‘কৃষ্ণপদবাবু, আপনি আমার সমান পদাধিকারী হলেও দেখে যতটুকু বুঝতে পারছি আপনি আমার চেয়ে যথেষ্ট সিনিয়র। আশা করি আপনি নিজের এবং আপনার পদের সম্মানটা বজায় রাখবেন। বিচারে যতক্ষণ না প্রমাণিত হচ্ছে যে, মিহির সরখেলই অপরাধী ততক্ষণ আপনি তাকে অপরাধী বলতে পারেন না।’ কৃষ্ণপদ নিজের ভুল বুঝতে পেরে আর কথা বাড়ালেন না। উলটে সায়নই আবার জিজ্ঞেস করল কীসের ভিত্তিতে মিহিরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে? পঞ্চাশ ছুঁই-ছুই কৃষ্ণপদ বলতে শুরু করলেন, ‘শুটিঙের ক্যামেরাম্যান তন্ময় হালদার আমাদের কাছে স্পষ্ট বলেছেন, ওঁর জবানি রেকর্ডও করেছি।’
— কী বলেছেন? উনি মিহিরকে এই ঘটনাটা ঘটাতে দেখেছেন?
— উঁহু। বরং চিৎকারটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে উনি দোতলার বারান্দায় বেরিয়ে দেখেন নীচের উঠোনে উপুড় হয়ে পড়ে আছেন আত্রেয়ী সেন। আর ঠিক তখনই উনি দেখেন লম্বা মতন কেউ একজন সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল। তন্ময়বাবু তৎক্ষণাৎ লোকটাকে ফলো করেন এবং উনি জানান যে, মিহির যে ঘরে ছিলেন লোকটিও সেই ঘরে ঢুকে গেলেন। উনি দেরি করেননি। মিহিরের ঘরের দরজা ঠেলে ঢুকে দেখেন মিহিরও দরজার দিকেই এগিয়ে আসছিলেন। তবে মিহিরবাবুর বক্তব্য অনুযায়ী উনি নাকি ঘুমোচ্ছিলেন। চিৎকার শুনে বেরিয়ে আসছিলেন। তন্ময়বাবু খেয়াল করেন, যে-পোশাক পরে ছাদ থেকে নেমে আসা লোকটিকে মিহিরের ঘরে ঢুকতে দেখেছিলেন ঠিক সেই পোশাক পরেই মিহির দাঁড়িয়ে আছে। সে সময় ওই ঘরে আর কেউ ছিল না।
— তন্ময়বাবু মিহিরকে কিছু বলেননি?
— না। কারণ তখন ওঁর মাথা কাজ করছিল না। উনি মিহিরবাবুর ঘর থেকে বেরিয়ে সোজা প্রোডাকশন ম্যানেজার অমিতাভ মল্লিকের ঘরে তাকে ডাকতে যান। ততক্ষণে আরও বেশ কিছু লোকের ঘুম ভেঙে গেছে এবং তারা সবাই নীচে চলে এসেছেন। খবর পেয়ে আমরা যখন ঘটনাস্থলে পৌঁছোই তখন দেখি অদ্ভুতভাবেই আত্রেয়ী দেবীর নাড়ি চলছে। দেরি না করে ওঁকে বোলপুরের সবচেয়ে বড়ো হাসপাতালে নিয়ে যাই। এবং তিনি এখন ওখানেই চিকিৎসাধীন। বলা ভালো মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন।
.
সায়ন বলল, ‘মাত্র একজনের সাক্ষ্যতেই গ্রেপ্তার করলেন? তা-ও তিনি ঘটনাটা ঘটাতে দেখেননি?’
— কম বয়সে উচ্চ পদাধিকারী হলে এই অবস্থাই হয়।
কৃষ্ণপদর টিপ্পন্নিটা যে কাকে খোঁচা দেবার জন্য সেটা বুঝতে বাকি রইল না সায়ন এবং মৃন্ময়ীর। সায়ন কিছু বলার আগেই বোলপুর থানার ওসিই বললেন, ‘কলকাতার পুলিশরাই একমাত্র কাজ করেন আর মফস্সলের পুলিশেরা গায়ে হাওয়া লাগিয়ে বেড়ায় এমন ধারণা যে ভুল মিস্টার সায়ন মল্লিক।’
— সরি টু সে মিস্টার কৃষ্ণপদ ঘোড়ুই, আপনি না বড্ড বাজে বকেন। আসল কথাতে আসুন না। মাত্র একজনের সাক্ষ্যতেই …’
— সেই ভোররাত থেকেই আমি আমার ডিউটিটা করছি। ঘটনাস্থলে শুধু তন্ময়বাবুই নন, আরও দুজন মিহিরবাবুকে ছাদে উঠতে ও নামতে দেখেছেন। এক প্রোডাকশান ম্যানেজার অমিতাভ মল্লিক আর দুই, বৃষভানু। সকলে ভানু বলে ডাকে। শুটিঙে খাবার-টাবার দেয়।
— ভানু কী বলেছে?
— খুব ইন্টারেস্টিং। ও নিজের চোখে দেখেছে কেউ একজন আত্রেয়ী সেনকে ছাদ থেকে ঠেলে ফেলে দিল।
— হোয়াট?
— হ্যাঁ সায়নবাবু। ভানু প্রথমে কিছু বলতে চায়নি। একটু ধমক-ধামক দিতে ও সব বলে।
— কীভাবে দেখল? ও কি ছাদে ছিল?
— না। আত্রেয়ী সেন যে-দিকের ছাদে ছিলেন ঠিক তার উলটোদিকের দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়েছিল ভানু। তাই স্পষ্ট দেখতে পায় এবং ও এটাও দেখে আত্রেয়ীকে ঠেলে দিয়ে আততায়ী ওপর থেকে ঝুঁকে নীচের দিকে দেখে। দেখেই অন্ধকারে মিলিয়ে যায়। মানে ওই ছাদের আলসে থেকে সরে যায়। আত্রেয়ী ম্যাডামের চিৎকার শুনে সেইসময় দোতলার বারান্দায় বেরিয়ে আসে ক্যামেরাম্যান তন্ময়। ঠিক সে সময় কেউ একজন সিঁড়ি দিয়ে নেমে একটু দ্রুত পায়ে হেঁটে মিহির সরখেলের ঘরে ঢোকে। ভানু তন্ময়বাবুকেও ফলো করতে দেখে। তারপরেই আরও লোকজন বেরিয়ে আসে। চ্যাঁচামেচি শুরু হয়ে যায়। ঘটনাস্থলে তন্ময়বাবু যখন আমাদের সব বলছিলেন, তখন মিহিরবাবু সম্পূর্ণ ঘটনা অস্বীকার করতে থাকেন। সেটা দেখে ভানু নিজে থেকেই বলে ওঠে, তন্ময়দা মিথ্যে কথা বলছে না। বলেই চুপ করে যায়। টেনশনেই হয়তো মুখ ফসকে বলে ফেলে ভানু। তারপরেই হয়তো ভাবে এই রে, পুলিশের ঝামেলায় বেকার জড়ালাম। তারপর সে তো কিছুতেই বলবে না। আমি খানিক কড়কাবার পর পুরোটা বলে।
মৃন্ময়ী বিড়বিড় করে বলতে থাকে, ‘এ হতে পারে না। কিছুতেই হতে পারে না। আমি বিশ্বাস করি না।’
কিছুক্ষণ চুপ থেকে সায়ন বলে, ‘ভানু কিন্তু একবারও বলেনি যে, সে মিহিরকেই দেখেছে।’
— না তা বলেনি। তবে অমিতাভবাবু ও তন্ময়বাবু যা যা বলেছেন ঠিক সেই ঘটনাগুলোই কিন্তু বৃষভানু বলেছে। শুধু দূর থেকে দেখেছে বলে ব্যক্তির মুখ দেখতে পায়নি। কিন্তু তন্ময় আর অমিতাভ দুজনেই মিহির সরখেলকেই দেখেছে। এবার বলুন, আমি কি আমার মনগড়া গপ্পো বানিয়ে ওঁকে লক-আপে পুরেছি?
— লক-আপে রেখেছেন?
‘লক-আপ’ শব্দটা মৃন্ময়ীকে ভীষণভাবে আঘাত করে। শেষে এই ছিল মিহিরের
কপালে? চোখ ফেটে জল ঝরে পড়ে মৃন্ময়ীর। আত্রেয়ী সেনের কোনো পার্সোনাল সেক্রেটারি?’ সায়ন জিজ্ঞেস করল। কৃষ্ণপদ বললেন, ‘পার্সোনাল সেক্রেটারি বলতে মিতালি নামের একটি মেয়ে আছে। সে আত্রেয়ীর হেয়ার, মেকআপ, ড্রেস, অ্যাপয়েন্টমেন্ট এইসব দেখে।’
— সে কিছু বলেছে?
— বিশেষ কিছু না। এই ঘটনা ঘটার সময় সে ঘরে ঘুমোচ্ছিল।
— আত্রেয়ী ঘুমোল না। অথচ তার পিএ ঘুমিয়ে পড়ল?
— মিথ্যে বলেনি। বাকিদের প্রশ্ন করেছি।
— সে কোথায়?
তাকে সকালেই জিজ্ঞাসাবাদ করে ছেড়ে দিয়েছি।
‘সে কী!’ সায়ন এক্কেবারে তড়াক করে লাফিয়ে উঠে বলল, ‘ভিক্টিমের পিএকে ছেড়ে দিলেন? একমাত্র ওই মেয়েটিই সবথেকে বেশি আত্রেয়ী সেনের খবরাখবর জানবে। আপনি আর কিছু …।’
— সায়নবাবু, মাথার টাকটা আমার এমনি-এমনি পড়েনি, বুঝলেন।
ভেতর ভেতর জ্বলে উঠল সায়ন। সব থেকে বড়ো সাক্ষীকে ছেড়ে দিয়ে এখন বাকতাল্লা ঝাড়ছে। কৃষ্ণপদ বললেন, ‘এই মেয়েটি দিন দশেক হল জয়েন করেছে। এর আগে যে ছিল সে আর নেই। খুব গুরুতর কোনো শরীর খারাপ হয়েছে তাই ছেড়ে দিয়েছে। এই মেয়েটি এখনও তেমন কিছুই জানে না। আত্রেয়ীর সঙ্গে এটা তার প্রথম শুটিঙে আসা।’ এবার অবাক হল সায়ন। জিজ্ঞেস করল, ‘কী হয়েছিল মেয়েটার? জানেন?’ গলাটা ঝেড়ে একটু আমতা-আমতা করে কৃষ্ণপদ বললেন, ‘ওই মেয়েলি কোনো কিছু হবে হয়তো। মেয়েটা সেটাই বলল।’ সায়ন আড়চোখে মৃন্ময়ীর দিকে তাকিয়ে কৃষ্ণপদকে জানাল, ও নিজে চৌধুরি ভিলা দেখতে চায়। মনে মনে গররাজি থাকলেও বাইরে সেটা বুঝতে দেন না কৃষ্ণপদ। রাজি হয়ে যান। তবে তার আগে মিহিরের সঙ্গে একবার দেখা করাটা জরুরি।
.
লক-আপটা থানার ভেতরের দিকে। এদিকটায় আলো কম। কেমন একটা স্যাতস্যাতে গন্ধ। সরু করিডরটায় দু-তিনটে টিউবলাইট জ্বলছে। এক পা-দু-পা করে এগোচ্ছে সায়ন আর মৃন্ময়ী। স্মৃতির ভারে পা-দুটো ভারী হয়ে যাচ্ছে মিসেস মিহির সরখেলের। কাকে দেখতে যাচ্ছে ওরা? একজন আসামি! নাকি একজন আপাদমস্তক নিরীহ ভদ্রলোককে যে কিনা অনেক বড়ো পরিচালক হবার স্বপ্ন দ্যাখে দিনরাত। তাই তো এই রুপোলি দুনিয়ায় পা রাখা। এই তো মাত্র সপ্তাদুয়েক আগের কথা। অনেক টানাটানির পর ঠিক হয় মিহিরের করা প্রোমোতে আত্রেয়ী সেন নায়িকা হবে। আত্রেয়ী সেনকে নিয়ে কাজ করবে মিহির! আনন্দে রাতে ঘুম চলে গিয়েছিল তার। সবাই কত রকমের নায়িকার নাম অফার করেছে। কিন্তু মিহিরের এক গোঁ। এই সিরিয়ালে আত্রেয়ী সেনই বেস্ট অপশন। ওকে ছাড়া আলোকপর্ণার চরিত্র কেউ ফুটিয়েই তুলতে পারবে না। আত্রেয়ীকে নিয়েই মৃন্ময়ীর পেছনেও লেগেছিল এক চোট।
