মৃত জ্যোৎস্নার রাত্রি – ৬
ছয়
অফিস থেকে ফিরে খাটের ওপর হাত-পা ছড়িয়ে বসে আছে মিহির। চোখ দুটো তার খোলা জানলার বাইরে। তখন ভরা জ্যোৎস্না। খাটের পাশে স্নিগ্ধ হলুদ আলোয় জ্বলছে টেবিল ল্যাম্প। সেই আলোর খানিকটা আর বাইরে থেকে আসা জ্যোৎস্নার কিছুটা রশ্মি মিহিরের শ্যামলা মুখে পড়েছে। ফ্যানের হাওয়ায় বাইরে বসন্ত বাতাস মিশে অসম্ভব সুন্দর একটা রোমান্টিক পরিবেশ। গায়ের ফিনফিনে সাদা ফতুয়াটা তিরতির করে মিহিরের শরীর ছুঁয়ে নড়ছে। কপালের ওপর নেমে আসা ঈষৎ ঢেউ খেলানো চুলগুলো ফুরফুর করে উড়ছে। মিহিরের চোখের পাতাগুলোও কোনো এক নরম আবেশে ভিজে বন্ধ হচ্ছে আবার খুলছে। হঠাৎ পটাং করে জ্বলে উঠল ঘরের টিউব লাইটটা। আলোর ঝটকায় ভ্রূ কুঁচকে চোখ বুজল মিহির।
— দাও কালকের বাজারের টাকাটা দাও। তুমি তো আর থাকবে না। আমাকেই যেতে হবে।
মিহির রীতিমতো ভ্রূ কুঁচকে ব্যাজার মুখে মৃন্ময়ীকে বলল, ‘তুমি ঠিক কেমন করে এলে বলো তো?’
— কেমন করে?
— কমলবনে মত্ত হস্তীর মতো।
আঁচল দিয়ে গলার ঘাম মুছতে মুছতে মুখ বাঁকালো মৃন্ময়ী। ‘মরণ! হস্তী মত্ত না হলে সংসারটা যে ছত্রখান হয়ে যাবে। তুমি তো আর কোনো ঝামেলা ঘাড়াবে না। যত জ্বালা আমার।’ মিহির পুচ করে মুখ দিয়ে শব্দ করে মৃন্ময়ীকে উত্তর দিল, ‘তুমি না সেই টিপিক্যাল গৃহিণীদের মতো হয়ে যাচ্ছ মৃন্ময়ী। কোথায় আমি আজ বাদে কাল টলিসুন্দরী মেরে স্বপ্নো কি রানি আত্রেয়ী সেনকে নিয়ে শুট করতে যাচ্ছি। তুমি পাশে বসে উৎসাহ দেবে, তা নয়।’
এবার মৃন্ময়ী যারপরনাই আনন্দিত হয়ে বলল, ‘কী বলছ কী? ফাইনাল?’ চোখ নাচিয়ে ঘাড় হেলিয়ে মিহির বলল, ‘হে হে বাওয়া তবে আর বলছি কী? আজকেই ওঁর বাড়ি গেছিলাম। ডিওপি আর আত্রেয়ী সেনের সঙ্গে স্ক্রিপ্ট নিয়ে মিটিংটা ওঁর বাড়িতেই হল। আমিও সব বুঝিয়ে-টুঝিয়ে দিলাম।’
— তোমার কথা শুনল?
— ও মা! আমি ডিরেক্টর। আমার কথা শুনবে না মানে? তবে ডিওপিটা একটু পোঁয়া পাকা।
— কেন?
— কোন ডায়লগটা আত্রেয়ী সেনের মুখে ভালো লাগবে, কোন অ্যাঙ্গেলে আত্রেয়ীর কীভাবে তাকানো উচিত সব শালা ও জানে। স্ক্রিপ্ট লিখেছি আমি, ডিরেকশন আমার। আরে বাবা আমারও তো একটা ভাবনা-চিন্তা আছে নাকি?
এবার রীতিমতো গোয়েন্দাসুলভ সন্দিগ্ধ চোখে মৃন্ময়ী জানতে চায় ডিওপির নাম। মিহির বলল, ‘তন্ময় হালদার।’ নামটা শুনেই খানিক চুপ করে যায় মৃন্ময়ী। তারপর বলে, ‘দেখো বাবা! কোনো ঝামেলায় জড়িয়ো না যেন। দেখবে হয়তো কাটি করে তোমাকেই বাদ দিয়ে দিল।’ মৃন্ময়ীর মাথায় পটাং করে একটা চাঁটি মেরে মিহির বলল, ‘কালিমুখী কালনাগিনী! ভালো কিছু মুখে আসে না, না?’ মৃন্ময়ীও মিহিরের মাথায় খোঁচা দিয়ে বলে, ‘আমি ভালোর জন্যেই বলেছি গো। এই তো ক-দিন আগেই কোন একটা পেপারে পড়ছিলাম, আত্রেয়ী সেনের সঙ্গে ওই তন্ময়ের এখন প্রেম চলছে। মহারানি নাকি ওঁকে ছাড়া এখন শুটই করেন না। কোন একটা সিনেমা থেকে ক্যামেরাম্যানকে সরিয়ে তন্ময়কে নেওয়া হয়েছে।
— নিকুচি করেছে। আমি ডিরেক্টর আমি যেমন বলব ডিওপি তেমন শট নেবে আর আমার আত্রেয়ীও সেই শটটাই দেবে।’ মৃন্ময়ী এবার ছদ্মরাগে ফুঁসে ওঠে, ইসসস! একদিনেই কেমন বশ করেছে দেখেছ? আমার আত্রেয়ী! যতসব ঢলানি মহিলা। কাজ ছাড়া একদম ধারে-কাছেও ঘেঁষবে না।’ ফিক করে গা-জ্বালানি হাসি হেসে মিহির বলে, দুটো দিন যাক না। দেখো না কী হয়।’ কথাটা বলার সময় মিহিরের শরীরটাও বিছানায় বসে তুড়ুক তুডুক দু-বার নেচে উঠল। তারপর হাত দুটোকে সামনে বাড়িয়ে দু-পাশে ছড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘খবরের কাগজে বড়ো বড়ো করে বেরোবে, আত্রেয়ী সেন এখন মিহির সরখেলের ছবি ছাড়া শুটিং করেন না।’ মৃন্ময়ী খিলখিল করে এক চোট হেসে নিল। তারপর মিহিরের চুলে আঙুল চালিয়ে একটু ঘেঁটে দিয়ে আদুরে স্বরে বলল, ‘অনেক ভাট বকেছ। এবার বাজারের টাকাটা ছাড়ো।’ মিহিরের বুকের ছাতি একবার উঠেই নেমে গেল। সঙ্গে একটা বড়ো দীর্ঘশ্বাস। এই নিশ্বাসের অন্তরালেই হয়তো লুকিয়ে রইল তার সুদূরের অসম্ভব কোনো স্বপ্নের বীজ! তারপর টেবিলে রাখা পার্স থেকে তিনটে একশো টাকা বের করতেই মৃন্ময়ী হাত বাড়াল।
— উঁহু।
পট করে হাত সরিয়ে দু-পাশে ঘাড় নাড়ল মিহির। টাকাটা গিন্নির হাতে না দিয়ে পাশের টেবিলেই রাখল। তারপর মৃন্ময়ীর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ওখান থেকে নিয়ে নাও।’
— মানে? তোমার হাত থেকে নিলে ক্ষতি কী ছিল?
মিহির পার্সটা টেবিলে রেখে ডানহাতটাকে মুখের কাছে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখল। ভীষণ নরম আর আহ্লাদি সুরে বলল, ‘এই হাত আর তোমায় ছোঁবে না কখনও। তুমিও ছুঁয়ো না যেন!’ ন্যাকা-ন্যাকা নাটকীয় সুরটাকে মিহিরের গলা থেকে চুরি করে মৃন্ময়ীও জিজ্ঞেস করল, ‘কেন গো?’ সুনীল সাগরের দু-ফোঁটা জল ধার করে মিহির বলল, ‘এই হাত ছুঁয়েছে আত্রেয়ীর হাত, একে স্পর্শ কোরো না তুমি! এখন থেকে সারারাত এই হাতে খাব শুধু হামি।’ বলেই চুকুত করে নিজের হাতেই একখানা চুমু খেল মিহির। তারপরে ঘরের মধ্যে শুধুই চপেটাঘাতের শব্দ, মিহিরের খ্যাকখ্যাক হাসি আর মৃন্ময়ীর মুখে টিপিক্যাল গৃহিণীদের মতো বরের উদ্দেশ্যে উদ্গীরিত হওয়া সোহাগিশব্দ, ইতর, দুশ্চরিত্র, ছোটোলোক, দু-কান কাটা’ ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি।
.
থানার করিডরের টাংস্টেন আলোয় হারিয়ে যেতে লাগল সব কিছু। স্মৃতিগুলো সব ইতিউতি ছিঁড়ে যাওয়া মাকড়সার জালের মতো ঝুলে রইল থানার করিডরটায়। সায়ন আর মৃন্ময়ী এখন লোহার গরাদের সামনে। দু-হাতের আঙুলে লোহার গরাদটাকে পেঁচিয়ে ধরে মৃন্ময়ী এক দৃষ্টে দেখতে থাকে ভেতর দিকে। লক-আপের ভেতরে হাঁটু-মাথা এক করে বসে আছে, কে ও? মানুষ! নাকি কলে-পড়া কোনো জন্তু? লক-আপের মাথার দিকে ঘুলঘুলি মতো জানলা দিয়ে ঠিকরে আসা আলোটা তেরচাভাবে পড়ে মাটিতে ও দেয়ালের খানিকটা অংশ আলোকিত করেছে। সায়ন আর মৃন্ময়ী বাকরুদ্ধ। এতক্ষণে একবারও গলা তুলে ডাকতে পারেনি ভেতরের চেনা মানুষটাকে। ওই মানুষটাও কি বুঝছে না কেউ এসেছে? মরমে মরে কাঠ হয়ে গেছে হয়তো। ভাবতেই পেটের ভেতর থেকে কান্নাটা দলা পাকিয়ে উঠল মৃন্ময়ীর। তবু ডাকতে হবে। সময় নেই বেশি। লোহার গরাদ টপকে কান্না-জড়ানো কাঁপা গলায় একটা আটপৌরে ডাক ভেসে গেল, ‘শুনছ! কী গো?’ আস্তে আস্তে মাথা তুলল লোকটা। মাত্র দুটো দিনে চেনা মানুষটাকে অন্য লোক মনে হচ্ছে। ক্লিন সেভ মুখে এত দাড়ি কী করে গজিয়ে গেল মানুষটার?
— দাদাভাই, চিন্তা কোরো না। আমি জামিনের ব্যবস্থা করছি। কিচ্ছু হবে না তোমার।
সায়নের কথাগুলো লোকটাকে এক ঝটকায় দূরে বসার জায়গা থেকে এক্কেবারে গরাদের সামনে নিয়ে এল। কথা বলল না কিছু। গরাদে প্যাঁচানো মৃন্ময়ীর হাতটাকে খুব জোরে চেপে ধরল মিহির। অনেক কিছু বলার জন্য গলার নলিটা কাঁপছে, ঠোঁট দুটো থরথর করছে। লাল চোখদুটো দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। অনেক কষ্টে মিহির বলল, ‘আমি কিচ্ছু জানি না। আমি কিচ্ছু করিনি।’
গরাদের মধ্যে থেকেই হাত বাড়িয়ে বড়ো শ্যালকের কাঁধে হাত রাখল সায়ন। বলল, ‘সেটা তুমি না বললেও আমরা জানি। তুমি কিচ্ছু ভেবো না।’
.
এই কথাগুলো যখন সায়ন বলছে তখন মৃন্ময়ীর চোখ সেলের অন্ধকার কোণে আটকে গেছে। সেখানে হাঁটু-মাথা এক করে আরও এক আসামি বসে আছে। মুখটা দেখা যাচ্ছে না। মনে তো হচ্ছে গায়ে কালো রঙেরই পোশাক। নিশ্চয়ই কোনো দাগি আসামি। ভাবতেই ভেতর থেকে লজ্জায় কুঁকড়ে এল মৃন্ময়ী। শেষে কিনা আর পাঁচজন চোর-ডাকাত-খুনির সঙ্গে একই ঘরে থাকতে হচ্ছে তার স্বামীকে? মৃন্ময়ীর ভয় হল মিহিরের শরীর খারাপ করবে না তো? যদি মানসিক কোনো সমস্যা দেখা দেয়! তিন বছরের ছেলেটাকে নিয়ে একা কী করবে সে? ঠিক সেই সময়েই মিহিরও প্রশ্ন করল, ‘সোনাই, সোনাই কার কাছে? ওকে আয়ার হাতে ছেড়ে এসেছ নাকি? ‘ চোখের জল মুছে মৃন্ময়ী জানাল, ‘সোনাইকে মুনাই নিয়ে গেছে।’ ছেলেটা নিজের ছোটো বোনের কাছে আছে জেনে খানিক শান্ত হল মিহির। দূরে বসে থাকা আসামির দিকে আড়চোখে চেয়ে মৃন্ময়ী ফিশফিশ করে মিহিরকে বলল, ‘এখানে কেউ তোমায় ডিস্টার্ব করছে না তো গো? মানে ওদের সঙ্গে কিন্তু বেশি কথা বোলো না কেমন।’
— কাদের সঙ্গে আর কথা বলব মৃন্ময়ী? আমার সঙ্গে কথা বলার মতো কেই-বা আছে এখানে?
বড্ড অসহায় লাগল মিহিরকে। সায়ন মনে মনে স্থির করেই নিয়েছে। কিছু একটা করতেই হবে। চ্যানেল থেকে এখনও কোনো ফোন এল না। ওরা ঠিক কী ব্যবস্থা নিচ্ছে সেটা জানা গেলে বড্ড উপকার হত। এখানে থাকলে এই কৃষ্ণপদ দাদাভাইকে ছিঁড়ে খাবে। এই ভাবনাগুলো যখন সায়নের মনের ভেতর তোলপাড় করছে তখনই কনস্টেবল এসে জানাল সময় শেষ। আসার আগে মিহিরকে যতটা সম্ভব সান্ত্বনা দিতে চেষ্টা করল সায়ন। মিহিরও অসহায়ের মতো বারবার বলতে থাকে একটাই কথা, ‘আমি কিচ্ছু করিনি সায়ন। আমি নিজের ঘরেই ঘুমোচ্ছিলাম। আমি কোনো খুন করিনি। ওরা সবাই ভুল করছে।’
— একদম চিন্তা কোরো না দাদাভাই। আমি সবার সঙ্গে কথা বলব। আমায় জানতে হবে আসল কারণ কী। ওই বৃষভানু নাকি সব দেখেছে। ঠিক কী দেখেছে আমি নিজে ওর মুখ থেকে শুনব। আর এটাও জানব তন্ময় আর বৃষভানুকে থানা থেকে জিজ্ঞাসাবাদ করে কেন এত তাড়াতাড়ি ছেড়ে দিল।
সায়ন মিহিরের সঙ্গে কথা বলছে আর মৃন্ময়ী ঠায় চেয়ে আছে দূরে বসে থাকা লোকটার দিকে। এতক্ষণ লোকটাকে পাথরের মূর্তির মতো লাগছিল। কিন্তু সায়নের জিজ্ঞাসাবাদ করার কথা শুনে লোকটা যেন একটু নড়ে উঠল। সত্যিই কি নড়ল নাকি মৃন্ময়ীর ভ্রম! আরও ভালো করে পর্যবেক্ষণ করবে বলে একটু সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ল মৃন্ময়ী। কিন্তু সায়ন বুঝল, মিহিরের অসহায়তা চোখের সামনে মৃন্ময়ী যত দেখছে তত ভেঙে পড়ছে। তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মৃন্ময়ীকে নিয়ে থানা থেকে বেরোতে হবে।
.
সায়ন আর মৃন্ময়ী বেরিয়ে আসতেই কৃষ্ণপদ টিপ্পনি কাটলেন, ‘কী স্যার? আপনার আত্মীয়কে খুব একটা খারাপ রাখিনি তো? যত্নেই আছেন কিন্তু!
— হ্যাঁ কেমন যত্নে রেখেছেন সেটা তো নিজের চোখেই দেখলাম।
রাগ আর অভিমান একসঙ্গে বেরিয়ে এল মৃন্ময়ীর গলা দিয়ে। কৃষ্ণপদ বাঁ-দিকের ভ্রূ তুলে বললেন, ‘কেন? খারাপটা কী দেখলেন?’
— এখানে কথা বাড়িয়ে লাভ নেই বউদি। চলো আমরা বরং…
— আরে দাঁড়ান দাঁড়ান …
সায়নকে হাত তুলে থামিয়ে দিলেন কৃষ্ণপদ। মৃন্ময়ীকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘খাবার সময় খেতে দিয়েছি, অপরাধী সন্দেহে মারধোরও করিনি। খারাপটা কী রেখেছি?’
এত বাগবিতণ্ডা সায়নের ভালো লাগছিল না। তবু মৃন্ময়ী কৃষ্ণপদর চোখে চোখ রেখে কড়া গলায় বলল, ‘একজন নিপাট ভদ্রলোককে নিতান্ত সন্দেহের বশে গ্রেপ্তার করে আর পাঁচটা আসামির সঙ্গে একই লক-আপে রেখেছেন। এরপরেও বলছেন খারাপ কী রেখেছি?’ এবার শুধু কৃষ্ণপদ নয়, মৃন্ময়ীর অভিযোগ শুনে সায়নেরও ভ্রূ কুঞ্চিত হল।
— এই দেখুন সায়নবাবু, আপনার বউদি কী বলছেন এসব? আপনার আত্মীয়কে তো সম্পূর্ণ একটা আলাদা কেবিনে জামাই আদরে রেখেছি। আর পাঁচজন আসামি কোথায় সেখানে?
কৃষ্ণপদর চিবিয়ে চিবিয়ে ঠাট্টা করে বলা কথাগুলো মৃন্ময়ীকে আরও খেপিয়ে দিল। বেশ ঝাঁঝালো কণ্ঠেই মৃন্ময়ী বলল, ‘পুলিশের পোশাক পরে মিথ্যে কথা বলবেন মা প্লিজ!’ কথাটা সোজাসুজি এবার কৃষ্ণপদর ব্রেনে গিয়ে ঘা দিল। মাথার পাশের রগদুটো শক্ত হয়ে উঠল। ঠিক এই সময় সায়ন বলল, ‘না না বউদি, কৃষ্ণপদবাবু কিন্তু মিথ্যে বলছেন না।’ মৃন্ময়ী যেন আকাশ থেকে পড়ল। দু-চোখ ভরা বিস্ময় নিয়ে সায়নের দিকে তাকাল। সায়ন বলল, ‘দাদাভাই তো ওই ঘরটায় একাই আছে। আর তো কোনো আসামি নেই!’
— সায়ন, তোমার চোখটাও কী গেল? অন্ধকার কোণের দিকে বসে থাকা অত বড়ো মানুষটাকে তুমি দেখতেই পেলে না?
— কোন মানুষ? কার কথা বলছ? আমি তো দাদাভাই ছাড়া কাউকেই দেখিনি।
বউদি আর নন্দাইয়ের মাঝে পড়ে কৃষ্ণপদ ভড়কে ভ। স্বামীকে আসামির ঘরে দেখে এর নির্ঘাত মাথা গেছে। এদিকে মৃন্ময়ী কিছুতেই সায়নের কথা মানবে না। সায়ন বলল, ‘আচ্ছা বেশ, কৃষ্ণপদবাবু, আমি নিজে আর-একবার লক-আপটা চেক করে আসতে চাই। প্লিজ!’ সায়নের মাথা থেকে পা পর্যন্ত একবার দ্রুত চোখ চালিয়ে অনিচ্ছাসত্ত্বেও অনুমতি দিলেন। সায়ন ঢুকে গেল। খানিক বাদে বেরিয়েও এল। এসে একই কথা বলল, ‘না বউদি, ওই ঘরে দাদা একাই আছে।’ এতটা ভুল দেখল মৃন্ময়ী? না না, সে কী করে হয়? ও যে স্পষ্ট দেখল একটি লোক তিন মাথা এক করে হাঁটু মুড়ে বসে আছে। মুখ ঢাকা। মনে হয় কালো অথবা ছাই রঙের পোশাক ছিল গায়ে। অন্ধকারে সঠিক রংটা ঠাওর করতে পারেনি।
