মৃত জ্যোৎস্নার রাত্রি – ৮
আট
দুঃস্বপ্নের মতো সন্ধের অন্ধকার নেমেছে আজ। পুলিশের গাড়ির জানলায় মাথা হেলিয়ে আছে মৃন্ময়ী। তীব্র হাওয়ার ঝাপটা এসে লাগছে মুখে। মনে হচ্ছে পরিবেশ পরিস্থিতি যেন তাকে চাবুকের আঘাতে ছিন্নভিন্ন করে দিতে চাইছে। বোলপুরের এক অন্ধকার খুপরিতে ভালোবাসার মানুষটাকে একলা ফেলে তাকে ফিরতে হচ্ছে কলকাতা। মন চাইছে না। তবু যেতে হবে তাকে। তিন বছরের ছেলেটার জন্য মন তার আনচান করছে। আর কি কখনও দেখা হবে মিহিরের সঙ্গে? আর কি কখনও সুস্থ স্বাভাবিক হাসি-ঠাট্টা-মজায় জীবন কাটাতে পারবে তারা? মন কেন বারবার বলছে, দুজনের এই দেখাই শেষ দেখা! মৃন্ময়ীর অন্তঃস্থলে অন্তঃপুরের মেয়েটা আকুলি-বিকুলি করে কেঁদে মরছে। তবু বাইরে তার প্রকাশ নেই। মাত্র কয়েক ঘণ্টাতেই কি গায়ের চামড়াগুলো শক্ত হয়ে গেল?
.
একটা শব্দ হচ্ছে। বাজনা বাজছে কোথাও। পাশে বসে থাকা একটা মানুষের ছটফটানিতে মনে হল সায়নের পকেটে ফোনটা বাজছে। পা-টাকে একটু সামনের দিকে ছড়িয়ে দিয়ে পকেট থেকে মোবাইলটা বের করল সায়ন।
— হ্যাঁ সূর্য বল। ও তাই নাকি? বাবা! এটা তো বেশ রিস্ক হয়ে গেল। আচ্ছা।
ফোনে কথা চলাকালীন মৃন্ময়ী সায়নের মুখের দিকে অধীর আগ্রহে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল। কী জানি কী খবর এল। ফোনটা কান থেকে সরাতেই মৃন্ময়ী বলল, ‘ওদের চ্যানেল থেকে? কিছু বলল ওরা? উকিল পাঠাচ্ছে?’ একসঙ্গে এতগুলো প্রশ্ন করে থামল সে। সায়ন শান্ত গলায় বলল, ‘না বউদি। আমাদের থানা থেকে জানাল যে আত্রেয়ী সেনকে কলকাতার মেডিলাইফ সুপার স্পেশ্যালিটিতে ট্রান্সফার করা হচ্ছে ফর বেটার ট্রিটমেন্ট।’
— ও।
মৃন্ময়ীর মুখটা আবার শুকিয়ে গেল। পরক্ষণেই সায়নের মোবাইলটা আবার বেজে উঠল। মৃন্ময়ীর চোখদুটো আবারও অজানা আশায় সায়নের মুখের দিকে তাকাল। সায়ন ফোন ধরে। ‘হ্যালো হ্যাঁ বলছি। ও আচ্ছা আচ্ছা বলুন। হুম … আচ্ছা … আচ্ছা। মানে কালকের আগে কিছু … বেশ। ঠিকাছে।’ মৃন্ময়ীর চোখদুটো এবার চকচক করে উঠেছে নিজে থেকেই। ও আর প্রশ্ন করল না। সায়ন নিজে থেকেই বলল, ‘চ্যানেল থেকে ভালো উকিল ঠিক করেছে। কাল কোর্টে জামিনের জন্য ট্রাই করবে।’ ‘ও জামিন পেয়ে যাবে বলো সায়ন? অ্যাঁ পেয়ে যাবে না? ও তো কিছু করেনি।’ শিশুর মতো অসহায় লাগছে মৃন্ময়ীকে। নিজের মতো সাফাই সাজিয়ে বলে চলেছে। ‘ঠিক বলেছ। দাদাভাই কিছু করেনি। জামিন পেয়ে যাবে চিন্তা কোরো না।’
কিন্তু কার জামিন হবে কাল? মিহিরের? কীভাবেই-বা হবে? সায়ন যখন মৃন্ময়ীকে নিয়ে কলকাতার পথে ঠিক তখনই বোলপুর থানায় তুলকালাম। থানা-ভরতি লোক, পাহারাদার। জাঁদরেল কৃষ্ণপদ ঘোড়ুই ডিউটিতে থাকাকালীন এমন দুর্ঘটনা কল্পনাও করেনি কেউ। কৃষ্ণপদ অনেক দিন পর খুব শখ করে আলুসেদ্ধ, চানাচুর, শশা, ছোলা, পেঁয়াজ ও একটু তেঁতুলের জল দিয়ে গুছিয়ে মুড়ি মাখিয়ে এনেছিলেন। পায়ের ওপর পা তুলে জমিয়ে দুই কি তিন গাল খেয়েছে। অমনি ভেতর থেকে এক কনস্টেবল দৌড়োতে দৌড়োতে এল।
— স্যার স্যার। সর্বনাশ হয়ে গেছে।
সবেমাত্র মুখের মধ্যে চালান করা মুড়িগুলো ভুরভুর করে বেরিয়ে এল বাইরে। চেয়ারে এলিয়ে থাকা কৃষ্ণপদর পিঠটা চড়াৎ করে সোজা হয়ে গেল। রসনায় ব্যাঘাত কৃষ্ণপদর একদম সহ্য হয় না। আর এখন ঠিক সেটাই হল। ‘কী হয়েছেটা কী? উল্লুকের মতো লাফাচ্ছ কেন?’ দৌড়ে আসা কনস্টেবল প্রায় লাফিয়ে-হাঁফিয়ে যা বলল তাতে কৃষ্ণপদর হাত থেকে মুড়ির ঠোঙাটা তৎক্ষণাৎ থানার মেঝেতে পড়ে গড়াগড়ি। পড়ি কী মরি করে দলবলসমেত থানার করিডর ফুঁড়ে ঢুকে পড়েন কৃষ্ণপদবাবু। চোখ কপালে তুলে এসে দাঁড়ান লক-আপের সামনে। আসামাত্রই বুকের মধ্যে কে যেন খুব জোরে জোরে হাতুড়ি পিটতে শুরু করে তাঁর। এ কী করে সম্ভব? অমন মোটা শক্ত লোহার গরাদগুলো কে যেন আসুরিক শক্তিতে দু-পাশে বেঁকিয়ে ঠেলে দিয়েছে। মাঝে একটা বিরাট হাঁ-মুখ তৈরি হয়েছে যেখান দিয়ে যে-কোনো মানুষ অনায়াসেই গলে বেরোতে পারবে। লক-আপ শূন্য। মিহির সরখেল উধাও। ‘এটা কী করে সম্ভব হল?’ ফুসফুস ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠলেন কৃষ্ণপদ ঘোড়ুই। ‘থানা-ভরতি এতগুলো লোক কি ঘুমোচ্ছিলে?’ কনস্টেবলের দল সব মাথা নীচু করে চুপ। তারপরেই হঠাৎ গলাটা শীতল থেকে শীতলতর হয়ে যায় কৃষ্ণপদবাবুর। উনি বলেন, ‘মাত্র তো একজন আসামি ছিল। তাকেও খেয়াল করে রাখা গেল না? এতগুলো লোকের চোখের সামনে দিয়ে বেরিয়ে গেল?’ সাব-ইনস্পেক্টর বিপুল বলে, ‘স্যার, মিহিরবাবু যদি পালিয়েও যান তাহলে তো আপনার ঘরের মধ্যে দিয়েই যাবে। এছাড়া তো আর কোনো পথ তাঁর জানার কথা নয়।’
বুটে ঠকঠক শব্দ তুলে বিপুলের সামনে এসে দাঁড়িয়েও চুপ রইলেন তিনি। কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারলেন না। কারণ কথাটা ভীষণ সত্যি। শুধু দাঁতে দাঁত চেপে বললেন, ‘যান, এখুনি মিহির সরখেলকে ধরে আনুন। যেখান থেকে পারেন।’ কেউ ঠিক বুঝতে পারছে না। এখন জায়গা থেকে নড়া ঠিক হবে, না ভুল! সবাইকে কাঠের পুতুলের মতো দেখে মাথায় আগুন জ্বলে যায় কৃষ্ণপদর। মাথা ঝাঁকিয়ে পরিত্রাহী চিৎকার করে ওঠেন, ‘সবাই কি মরে গেলেন? যান খুঁজে আনুন মিহির সরখেলকেএএএ।’
.
শাওয়ারের তলায় দাঁড়িয়েও আনমনা হয়ে ছিল বৃষভানু। আবেগের বশে দুম করে বোলপুর থানার ওসিকে ফোন করে দেওয়াটা ঠিক হল না বোধহয়। কোথা থেকে কীসে জড়িয়ে পড়ে সে ও নিজেও জানে না। কিন্তু সে তো রাতে ফোন করবে বলল। এখন আর মন চাইছে না তার। শাওয়ারের ঠান্ডা জলের নীচে দাঁড়িয়েও শিরা দিয়ে যেন আতঙ্কের উষ্ণ স্রোত বইছে। এটা ও কী দেখল? ভুল দেখেনি তো? না না, এতটা ভুল সে দেখতে পারে না। এমনকি ভুল দেখলেও এরকম ভুল সে কিছুতেই দেখতে পারে না। এ যে অলৌকিক! অবাস্তব! ভয়ংকরও বটে। এরকম হতে পারে না কিছুতেই। বুক কাঁপিয়ে কলিং বেলটা বেজে উঠল। ভাবনার জগৎ থেকে বাস্তবের মাটিতে আছড়ে পড়ল বৃষভানু। শাওয়ার বন্ধ করে কোনোরকমে টাওয়েল জড়িয়ে বেরিয়ে এল। সারা গা দিয়ে টপটপ করে জল পড়ছে। লাল মাটিতে জলভেজা পায়ের ছাপ ফেলতে ফেলতে এগিয়ে গেল দরজার দিকে। ছিটকিনিটা খুলতে গিয়েও হাত থমকে গেল। একবার ভেবে নিল, পুলিশ এখানে কি আসবে? নাহ! সে সম্ভাবনা নেই। তবে কে এল? ঠিক তখনই বাইরে থেকে একটা ছেলের গলা, ‘ভানুদাআআআ, ও ভানুদাআআআ। খাবার এনেছি তো। ভানুদাআআআআ।’ হাঁফ ছেড়ে বাঁচল বৃষভানু। দরজা খুলল। স্টিলের থালা দিয়ে ঢাকা খাবার হাতে করে দাঁড়িয়ে আছে সামনের খাবার দোকানের তেঁতুল। ‘কী গো? চান করছিলে? আমি সেই কখন থেকে বেল দিচ্ছি।’’দে দে’ বলে হাত বাড়িয়ে খাবারটা নিল ভানু। ঢাকনা সরিয়ে খাবারটা দেখেই বলল, ‘পেঁয়াজ দিসনি? বলে এলাম যে।’ ঝট করে লম্বা জিভটা কেটে তেঁতুল বলল, ‘অ্যাল! একদম ভুলে গেছি। এখুনি দিয়ে যাচ্ছি।’ দরজাটা দিতে যাবে অমনি তেঁতুল জিজ্ঞেস করল, ‘হ্যাঁ গো ভানুদা, তোমাদের শুটিঙে নাকি হেবি বাওয়াল! ওই ডিরেক্টর আত্রেয়ীকে খুন করতে গেছিল?’ সারা শহর জেনে গেছে। লুকোবার জায়গা নেই। বেশি কথা বলল না, শুধু ‘হুম’ বলে দরজাটা বন্ধ করার তালে ছিল বৃষভানু, অমনি আবার তেঁতুল বলে উঠল, তা বলছি পুলিশ বাওয়াল দেয়নি? এত তাড়াতাড়ি তোমাকে আসতে দিল?’
— তোর না বড্ড কৌতূহল তেঁতুল। যা না। দোকানে খদ্দের নেই?
— আছে তো।
— তাহলে যা। পেঁয়াজটা নিয়ে আয়।
বলে আর-একটা কথাও না বাড়িয়ে তেঁতুলের মুখের ওপর দরজাটা দিয়ে দেয় বৃষভানু। ঘরে এসে খাবারটা রেখে বিছানায় বসে পড়ল সে। এই কেষ্টপুরে এক কামরার একটা ঘর ভাড়া নিয়ে থাকে। গত বছরই বিয়ে করেছে। বউ দেশের বাড়িতে থাকে। মোবাইলটা চোখে পড়তেই কৃষ্ণপদর মুখটা ভেসে ওঠে ভানুর চোখের সামনে। কোনো এক গোপন কথা জানাবে বলে ভানু কথা দিয়েছে তাকে। এবার যদি না জানায় তাহলে পুলিশ ভানুকেই সন্দেহ করতে পারে। ‘উফফফ’ বলে মোবাইলটা হাতে তুলে নেয়। কৃষ্ণপদর নম্বর ডায়াল করতে যায়। ঠিক সেই মুহূর্তে আবার বেজে উঠল কলিং বেল। মুখটা ব্যাজার হয়ে গেল। এবার পেঁয়াজ দেবার নাম করে নির্ঘাত আরও গন্ডাখানেক প্রশ্ন নিয়ে হাজির হয়েছে তেঁতুল। কোমর থেকে গামছাটা খুলে একটা হাফপ্যান্ট পরে নেয়। দরজা খুলতেই অবাক হয়ে যায়। কেউ নেই। দরজার বাইরে মুখ বাড়িয়ে গলিটার এপাশ-ওপাশ দেখে। শুনসান। দূরে একটা পাগল অনেকক্ষণ থেকেই বসে। উলটোদিকে রিকশাগুলো সারে সারে দাঁড় করানো। হলদে স্ট্রিটলাইটের আলো গলিটাকে আলোকিত করে রেখেছে। আজব ব্যাপার! বেল দিল কে? ভ্ৰূটা কুঁচকে দরজাটা দিয়ে দিল। ঘরে গিয়ে মোবাইলটা হাতে নিয়ে ডায়াল করল।
.
তন্নতন্ন করে খুঁজেও মিহিরকে কোথাও পাওয়া যায়নি। টেনশনে থানার মধ্যেই পায়চারি করছেন কৃষ্ণপদ। এত বছরের কর্মজীবনে এমন ফ্যাসাদে কক্ষনো পড়েননি। এমন অদ্ভুত কাণ্ডও ঘটেনি তার সঙ্গে। জলজ্যান্ত একটা মানুষ রাতারাতি উবে গেল চোখের সামনে দিয়ে? এমন সময় কৃষ্ণপদর ফোনটা আবার বেআক্কেলের মতো ঝনঝন করে ওঠে। কৃষ্ণপদ দৌড়ে এসে ফোনটা কানে ধরেই বলে ওঠে ‘হ্যালো।’ কানের পর্দায় আবারও যেই ঝনঝন করে আগের মতো ফোনটা বেজে ওঠে তখন উনি বোঝেন যে কল অ্যাক্সেপ্ট না করেই হ্যালো বলে ফেলেছেন। কোনোরকমে সবুজ রঙের গোল রিসিভার আঁকা চিহ্নটার ওপর ডানহাতের তর্জনিটা ঘষে দিয়েই আবার ‘হ্যালো’ বললেন। ফোনের ওপারে বৃষভানু। এখন একে মাথার ঘায়ে কুকুর পাগল দশা। তার ওপর ভানুর ফোন। চূড়ান্ত বিরক্তি নিয়ে বলেন, ‘হ্যাঁ কী বলবেন বলুন।’
— আমি স্যার ঠিক বুঝতে পারছি না কী বলব। মানে কী করে বোঝাব? আপনারা হয়তো বিশ্বাসই করবেন না।
— মানে?
প্যান্টের ওপর দিয়েই পেছনটা চুলকে নিয়ে ব্যাজারমুখে উত্তর দেন কৃষ্ণপদবাবু।
ভানু পায়চারি করতে করতে সবে মুখ খুলতে যাবে ঠিক তখনই ওর মনে হল ঘরের দরজায় কে যেন এসে দাঁড়িয়েছে। কথা বলবে বলে মুখ খুলেও থেমে গেল। হ্যাঁ ঠিক দেখেছে সে। ঘরের আলো আর বাইরের করিডরের আলোর মাঝে লম্বা মতন কেউ দাঁড়িয়ে আছে। গায়ে মেরুন রঙের টি-শার্ট, জিনস। প্রোমোশুটের শুরু থেকেই এই রঙের পোশাক দেখছে সে। তবু মুখটা আবছা লাগল চোখে। ফোনটা কানে ধরেই ভানু বলে ওঠে, ‘কে? কে ওখানে?’ ফোনের ওপারে কৃষ্ণপদ খ্যাকখ্যাক করে বলে ওঠে, ‘আরে কে আবার কী? আপনি তো আমায় ফোন করলেন।’ এসব কিছুই ফোনের এপারে ভানুর কানে ঢুকছে না। কারণ ঘরে আসা আগন্তুকের মুখ এখন আবছা থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ভানুর হাতটা কান থেকে আপনা-আপনিই নেমে আসে। গলা দিয়ে বেরিয়ে আসে, ‘স্যার আপনি?’ ওপার থেকে কৃষ্ণপদ আরও কিছু বলে চলে কিন্তু কানে পৌঁছোয় না ভানুর। ধীরে ধীরে চোখদুটো ভয়ে ঠেলে বেরিয়ে আসতে থাকে বৃষভানুর। সে পিছোতে পিছোতে হোঁচট খেয়ে বিছানায় পড়ে যায়। হঠাৎ সে চিৎকার করে ওঠে, ‘না, এ-এ হতে পারে না। কে আপনি?’ বলামাত্রই একটা হাত ভানুর গলা টিপে ধরে। ‘অক-অক’ করে শব্দ বেরোতে থাকে। কৃষ্ণপদ ওপার থেকে ভানুর নাম ধরে ডেকেই চলে। তারও কিছু একটা সন্দেহ হয়। এদিকে ধারালো নখের চাপে ভানুর গলার হাড়গুলো শরীরের ভেতরে মড়মড় করে ভেঙে যায়। বিছানা থেকে ঝুলতে থাকা পা-দুটো ছটফট করতে করতে থেমে যায়। গলার মধ্যে বসে যাওয়া আততায়ীর হাতটা উঠে আসে। রক্ত আর মাংসের মধ্যে গেঁথে গিয়েছিল বলে পচপচ শব্দ হয়। লম্বা লম্বা খুনে নখরগুলোতে কিছু মাংসের টুকরো লেগে ঝুলতে থাকে। বিছানায় ছড়িয়ে থাকা ভানুর নিথর হাতের কিছু দূরে পড়ে থাকা মোবাইলে উচ্চৈঃস্বরে বাজতে থাকে কৃষ্ণপদর গলা, ‘ভানুবাবু কথা বলুন, কী হয়েছে আপনার? বৃষভানু আপনি শুনতে পাচ্ছেন? কথা বলছেন না কেন? কে এসেছে? হ্যালো, হ্যালো। ভানুবাবু …।’
.
মুনাই তার বউদিকে আজ রাতে আর ছাড়েনি। সায়নের মা-ও মৃন্ময়ীকে বাড়ি যেতে দিল না। মৃন্ময়ী বাড়ি ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে ছোট্ট সোনাই যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছিল। দু-গালে চুমু খেয়ে গলা জড়িয়ে সে কী আদর তার মা-কে। বেচারা, এই প্রথম গোটা একটা দিন সে মা-ছাড়া ছিল। আদর করতে করতেই আধো আধো স্বরে সোনাই জিজ্ঞেস করেছিল, বাবা কোথায়?’ চোখ ভিজে গিয়েছিল মৃন্ময়ীর তারপরেই ছেলে বলে উঠেছিল, ‘যা যা! বাবা হালিয়ে গেল?’ বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠেছিল মৃন্ময়ীর। ছেলেকে বুকে জড়িয়ে বলেছিল, ‘না সোনাই বাবা তো কাজে গেছে। হারিয়ে যাবে কেন? বাবা কালকেই ফিরে আসবে।’ কোন জোর থেকে কথাগুলো ছেলেকে বলল, সে জানে না। তবু বলে ফেলল।
— কী অত ভাবছ বউদি, খেয়ে নাও। এত চিন্তা কোরো না।
খাবার টেবিলে বসে কখন যে আনমনা হয়ে গিয়েছিল মৃন্ময়ী নিজেরও খেয়াল নেই। খাবার টেবিলেই সায়নের ফোনটা বেজে ওঠে। মৃন্ময়ী, মুনাই, মুনাইয়ের শাশুড়ি সবার লক্ষ্য এখন সায়ন।
— হ্যালো। হ্যাঁ বলছি। ও কৃষ্ণপদবাবু।
নামটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে মৃন্ময়ী সোজা হয়ে বসে। আবার কী খবর এল রে বাবা! আশঙ্কার ভাবনাটা মনের মধ্যে তখনও গুছিয়ে বসতে পারেনি, তার আগেই ‘হোয়াট’ বলে সায়ন একদম খাবার টেবিল ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। হাত লেগে খাবার থালাটা আর-একটু হলেই উলটে যেত। ‘অ্যাবসার্ড। এটা একটা অসম্ভব আজগুবি গল্প বলছেন কৃষ্ণপদবাবু। একজন দাগি আসামি হলেও না হয় মেনে নিতাম। কিন্তু মিহির সরখেল জাস্ট একজন নিতান্ত সাধারণ মানুষ। ওঁর গায়ে অত জোরই-বা আসবে কোত্থেকে?’ মুনাই আর মৃন্ময়ী প্রায় কাঁদো-কাঁদো হয়ে জিজ্ঞেস করে, কী হয়েছে? ওর কী হয়েছে?’ ‘দাদাভাইয়ের কী হল কিছু বলো।’ দুজনকেই হাত দেখিয়ে চুপ করতে বলে সায়ন। তারপর ফোনে কৃষ্ণপদকে জিজ্ঞেস করে, ‘আর কী হয়েছে? মানে?’ এরপর বেশ খানিকক্ষণ চুপ। সায়ন চেয়ারে বসে পড়ে। কৃষ্ণপদ কী যে বলে চলেছেন সে কেবল সায়নই জানে। কথা শুনতে শুনতে কান থেকে একবার ফোন সরিয়ে ফোনের স্ক্রিনে কী যেন দেখল সায়ন। তারপর আবার ফোনটা কানে দিয়ে বলল, ‘যেভাবে হোক খুঁজে বের করুন কৃষ্ণপদবাবু। মিহির সরখেল যেন হারিয়ে না যায়।’ ফোনটা কাটতেই সায়নের ওপর প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ছিল মুনাই আর মৃন্ময়ী। কিন্তু তার আগেই মোবাইলটা আবার বেজে ওঠে।
— হ্যাঁ দত্ত বলো। … কী? … কোথায়? কেষ্টপুর! ভিক্টিমের নাম?
সায়নের গলায় আবারও চমকে যাওয়ার আভাস, ‘কী নাম? বৃষভানু মণ্ডল!’ নামটা উচ্চারণ করতে করতেই সায়নের কানে বেজে উঠল একটু আগেই কৃষ্ণপদর বলা কথাগুলো, ‘বৃষভানু আরও কিছু একটা দেখে ফেলেছিল। সেটা আমায় জানাতে ফোন করে। কিন্তু সে কিছু বলার আগেই অন্য কারওর সঙ্গে সে কথা বলতে শুরু করে। প্রথমে সে তাকে ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করে। কিন্তু তার পরেই চিৎকার করে বলে ওঠে, না না এ অসম্ভব। হতে পারে না এইরকম গোছের কথা। তারপরেই বলে— ‘কে? কে আপনি?’ আর ঠিক তারপরেই গোঙাতে থাকে। তারপর আর কারও কোনো সাড়া নেই। কিচ্ছু বুঝতে পারলাম না। বৃষভানুর ঠিকানা আছে। আমরা খোঁজ নিচ্ছি। মিহির আপনার আত্মীয় তাই আপনাকে জানালাম। ওদের চ্যানেলের বিজনেস হেডকেও জানিয়েছি।’
.
কান থেকে ফোন নামিয়ে মিহিরের পালিয়ে যাবার কথা সবাইকে জানায় সায়ন। কৃষ্ণপদ আরও বড়ো ফোর্স রেডি করে বোলপুরের গ্রামেগঞ্জে আজ সারারাত তল্লাশি চালাবে। তাতেও না পাওয়া গেলে প্রতিটা থানায়, রাস্তার পাশে, দেয়ালে দাদাভাইয়ের ছবি ঝুলিয়ে দেবে। সবাই যাতে সাবধান হয়ে যায়। মৃন্ময়ী কাঁদছে না আর। মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে। এই মুহূর্তে মাথার ভেতরটা মহাশূন্যের মতো খালি। সায়ন বৃষভানুর খুনের খবরটাও সবাইকে জানায়। বলে তাকে এখুনি বেরিয়ে যেতে হবে। ঘরে সোনাই ঘুমোচ্ছিল। হঠাৎ কেঁদে ওঠে। মৃন্ময়ী ঠায় বসে থাকে। মুনাই দৌড়ে যায় ঘরে। সায়ন যখন পুলিশের পোশাক পরে বেরিয়ে যাচ্ছিল, মৃন্ময়ী তখন জিজ্ঞেস করল, ‘লক-আপের সেই লোকটাও কি পালিয়েছে?’
— ওই লক-আপে দাদাভাই ছাড়া আর তো কেউ ছিল না বউদি
দু-চোখে রহস্য ঘনিয়ে মৃন্ময়ী বলে ওঠে, ‘তার মানে ও চলে যাওয়ার পর লক আপটা খালি হয়ে গিয়েছিল।’ আরও কীসব যেন ভাবতে ভাবতে নিজের মধ্যে ডুবে যেতে থাকে মৃন্ময়ী।
