মৃত জ্যোৎস্নার রাত্রি – ৯
নয়
সায়ন পৌঁছোবার আগেই বিধাননগর থানা থেকে লোক পৌঁছে গেছে ঘটনাস্থলে। বেশ কয়েকজন রিপোর্টারও এসে গেছে। সায়ন এসেছে দেখেই দৌড়ে আসে সূর্য। ‘কী অবস্থা সূর্য?’
— গলার কাছটা দলা পাকিয়ে গেছে স্যার। এইভাবে কেউ গলা টিপে মানুষ মারে এই প্রথম দেখলাম।
— শরীরে আর কোনো আঘাতের চিহ্ন?
— ওপর থেকে তো আর কিছু বোঝা যাচ্ছে না।
— হুম! প্রথম কে দেখে?
— একটা ছেলে স্যার। সতেরো-আঠেরো বছর হবে হার্ডলি। ওই তো ওকে বসিয়ে রেখেছি।
বাড়িটার সামনে পুলিশ থিকথিক করছে। আশেপাশের লোকজনও বেরিয়ে এসেছে। রাত প্রায় সাড়ে এগারোটা। ছেলেটার সামনে গিয়ে দাঁড়ায় সায়ন। তুই প্রথম দেখেছিস?’ বেশ ভয়ে ভয়ে উত্তর দেয় তেঁতুল, ‘হ্যাঁ স্যার। কিন্তু আমি কিছু জানি না বিশ্বাস করুন। আমি শুধু পিঁয়াজ দিতে এসেছিলাম।’ বলেই কেঁদে ফেলে।
— এই কান্না থামা। কান্না থামা বলছি।
চোখের জলটা দু-হাতে মুছে সায়নের দিকে তাকায়। ‘কী নাম তোর?’
— ভালো নাম পিন্টু ঘোষ। এখানে সবাই আমায় তেঁতুল বলে ডাকে।
— তেঁতুল? এ আবার কী নাম?
সূর্য একটু হাসে। তেঁতুল এবার মুখ খোলে। আর বলবেন না স্যার, ওই খাবারের দোকানের মালিক আমায় এমন নাম দিয়েছে।’
— কেন?
— আমার চেহারাটা নাকি তেঁতুলের মতো আর মুখটা তেঁতুলের বিচির মতো। পেটের ভেতর থেকে হাসিটা গুলিয়ে মুখের কাছে এলেও সায়ন সেটা গিলে নেয়। কিন্তু সূর্য একেবারে দাঁত ছড়িয়ে হাসে। সায়ন বলে, ‘তা তুই কখন কীভাবে দেখলি বল।’
— ভানুদা রোজ আমাদের দোকানে খেতে যায়। কিন্তু আজ ফেরার পথে বলল খাবারটা বাড়িতে দিয়ে আসতে। শরীর ভালো নেই। আমি দিতেও এসেছিলাম। কিন্তু পেঁয়াজটা দিতে ভুলে গেসলাম। আবার সেটাই দিতে এসেছিলাম। বাইরে থেকে কত ডাকলাম। সাড়াই পেলাম না। দরজা ভেজানো ছিল। আমি ঘরেই ঢুকে গেলাম। গিয়েই দেখি ভানুদা বিছানায় পড়ে আছে। রক্তে ভেসে যাচ্ছে চাদর। আমি ভয়ে পেয়ে বাইরে এসে ‘খুন খুন’ বলে চিৎকার করি। আর কী করব ভেবে পাই না। স্যার আমি কিছু করিনি স্যার। ভানুদা খুব ভালো। আমি তার কোনো ক্ষতি করিনি স্যার।
— থাম থাম। যা বলছি তার উত্তর দে। তুই সন্দেহজনক কাউকে দেখেছিলি?
তেঁতুলের মুখটা নিমেষে পাংশুবর্ণ হয়ে যায়। গোল গোল চোখ পাকিয়ে বলে, ‘একজন এসেছিল স্যার।’ সায়নের ভ্রূ দুটো কুঁচকে যায়। ‘একজন মানে? চিনিস তাকে?’
— না না। বাপ রে! অমন ভয়ানক লোককে আমি চিনি না।
— ভয়ানক কেন?
তেঁতুল রীতিমতো হাত-পা নেড়ে বলতে শুরু করে। ‘দোকানে তখন অনেক খদ্দের। ভানুদার পেঁয়াজ নিয়ে প্রায় দৌড়ে দৌড়ে আসছিলাম।’ সায়নের চোখের সামনে ঘটনাটা ঘটতে শুরু করে।
তেঁতুল হন্তদন্ত হয়ে ফুটপাথ ধরে এগিয়ে আসছে। আচমকাই একটা লোকের সঙ্গে জোর ধাক্কা। বোধহয় সে-ও দৌড়োচ্ছিল। ‘ধুর সালা দেখে যাবেন তো’ বলেই লোকটার চোখে চোখ তেঁতুলের। ধাক্কার গতিবেগে মুহূর্তের জন্য সে-ও ঘুরেছে আর তেঁতুলও সেই আগন্তুকের দিকে চেয়েছে। ঘুরতেই তেঁতুলের বুকটা ধড়াস করে উঠল। লোকটার চোখদুটো ভয়ানক। সাদা ধবধবে ডিমের গায়ে যদি কেউ রক্ত দিয়ে ফাটলের ছবি এঁকে দেয় তাহলে যেমন হবে লোকটার দুটো চোখই সেরকম। মণি বলে কিছু নেই। এক মুহূর্তের জন্য তেঁতুলের দিকে তাকিয়েই লোকটা মুখ ঘুরিয়ে হাওয়ার গতিবেগে এগিয়ে যেতে থাকে। তেঁতুল প্রচণ্ড ভয়ে পেয়ে ঝট করে ফুটপাথে পড়ে যাওয়া পেঁয়াজের টুকরোটা তুলে নেয়। তারপর যেই সামনের দিকে তাকায় দ্যাখে লোকটা উধাও। আজব ব্যাপার! তেঁতুল যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেখান থেকে অন্তত ষাট-সত্তর পা দূরে বাঁ-দিকে রাস্তাটা বেঁকেছে। সেকেন্ডের ভগ্নাংশে সেই বাঁক পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়া একটা মানুষের পক্ষে অসম্ভব।
.
সায়ন থমকেই গিয়েছিল। তেঁতুলের কথা থামতে সূর্য প্রশ্ন করে, ‘লোকটা কী পরেছিল দেখেছিস? দেখতে কেমন?’
— ওই চোখ দেখে অত ভালো করে কিছু দেখিনি। তবে যতটা দেখেছি তাতে লোকটার মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি ছিল। এই আলোতে ফরসা না কালো বুঝতে পারিনি।
সায়ন জিজ্ঞেস করল, ‘দাড়ি কাঁচা না পাকা?’
— কালোই তো মনে হল।
— আর জামাকাপড়?
— লাল ধরনের কোনো জামা পরেছিল। প্যান্টটা দেখিনি।
এক ঝলকে সকালে বোলপুর থানায় লক-আপের ছবিটা ভেসে ওঠে সায়নের চোখে। মিহিরের গায়ে মেরুন রঙের টি-শার্টই তো ছিল। সঙ্গে জিনসের প্যান্ট। সারা গায়ে একটা শিরশিরে হাওয়া খেলে গেল সায়নের। হঠাৎ কী মনে হওয়াতে মোবাইল থেকে ফেসবুক খুলে মিহিরের ছবিটা বের করে তেঁতুলকে দেখাল। তেঁতুল ভালো করে দেখে একটু চমকেই উঠল। বলল, ‘স্যার পুরোপুরি বলতে পারছি না তবে এরকমই হবে।’ সূর্য খ্যাক করে উঠল, ‘এই এরকমই হবে আবার কী? ঠিক করে বল।
— স্যার এখানে তো দাড়ি নেই। চোখদুটোও মানুষের মতো।
.
সায়ন বলল, ‘সূর্য, থানায় পরিমল আছে?’
— না। ও তো সন্ধেবেলায় চলে গেছে।
— এখনি ওকে ফোন কর আর বলো যে একটা ছবি পাঠাচ্ছি। ইমিডিয়েট যেন মুখের মধ্যে খোঁচা খোঁচা দাড়ি এঁকে চোখদুটোকে তেঁতুলের বলা কথার মতো করে পাঠায়। ফাস্ট।
— ওকে স্যার।
— আর এই অঞ্চলের সবকটা সিসিটিভি ফুটেজ জোগাড় করে রাখো। আমি থানায় গিয়ে দেখব। ততক্ষণ ওকে থানায় নিয়ে যাও।
থানায় যাবার কথা শুনেই ‘স্যার আমি কিছু করিনি স্যার। প্লিজ স্যার’ বলে কান্নাকাটি জুড়ে দেয় তেঁতুল। অন্যান্য কনস্টেবল তেঁতুলকে ধরে গাড়িতে তোলে। সায়ন বাড়িটার মধ্যে ঢুকে যায়। ভানুর মৃতদেহ দেখতে দেখতে একটাই কথা সায়নের মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে। খুনি যেন কিছুতেই মিহির সরখেল না হয়। কিছুতেই নয়। পরক্ষণেই মনে হয়, যদি হয় তাহলে কীভাবে? কীভাবে সম্ভব? খুনটাও তো কোনো সাধারণ মানুষের বলে মনে হচ্ছে না। এমন শক্তিশালী কে হতে পারে? যে কি-না একটা মানুষের গলা মুচড়ে হাড় ভেঙে চেপটে সরু করে দিতে পারে! আর-একটু হলেই ধড় থেকে মুণ্ডুটা ছিঁড়ে যেত ভানুর। এদিকে সারা শরীরে বাইরে থেকে দ্বিতীয় কোনো আঘাতের চিহ্ন দেখা যাচ্ছে না। ঘরের জিনিসপত্রও ঠিকঠাক সাজানো। কোনো ধস্তাধস্তির প্রমাণ ঘরে নেই। তার মানে বৃষভানু কোনো বাধাই দেয়নি? প্রথমে ‘স্যার’ বলে কাউকে একটা সম্বোধন করেছিল। তার মানে ভানুর পরিচিত। পরক্ষণেই ‘কে আপনি’ বলে প্রশ্ন করেছে। তার মানে আগন্তুক অপরিচিত। অথচ একজন মানুষই এসেছে যে প্রথমে পরিচিত আর তারপরেই অপরিচিত। অদ্ভুত! তাহলে সেই অপরিচিত লোকের মধ্যে কী এমন ছিল যা দেখে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টাটুকুও ভানু করতে পারেনি! ঠিক তখন আবারও কানের কাছে বেজে ওঠে কৃষ্ণপদর গলা, ‘আপনার শালা জেল ভেঙে পালিয়েছে। লোহার গরাদগুলোকে বেঁকে দুমড়ে লক-আপ থেকে বেরিয়েছে।’
.
অজস্র ক্যামেরার ফ্ল্যাশে মাথার ভেতরটা বোঁ বোঁ করছে সায়নের। অপরাধী অপরাধীই হয়। সে আপনজন হোক বা পর। কিন্তু মিহির সরখেল নামটার সঙ্গে এই ভয়ানক ঘটনাগুলো কোনোভাবেই খাপ খাচ্ছে না। সায়ন দেখল, পাশের টেবিলে খাবার যেমন ঢাকা দেওয়া ছিল তেমনই পড়ে আছে। সারা বাড়ি ছানবিন করে সন্দেহজনক কিছুই পাওয়া যায়নি। থানায় ফিরতে ফিরতে সায়নের বারবার মনে হচ্ছিল, বৃষভানু কী এমন জিনিস দেখে ফেলেছিল যার জন্য ওকে খুন হতে হয়? ও যা দেখেছে সবই তো বলেছে। তাহলে আর কী হতে পারে? উফফফ! এক গুচ্ছ প্রশ্ন মাথার পোকাগুলোকে উত্যক্ত করে মারছে।
.
থানায় পৌঁছোতেই হাতে ছবি চলে আসে। প্রথম দেখেই সায়নের বুকটা কেঁপে ওঠে। তিলোত্তমার আত্মা গ্রাস করে নেওয়া শম্পার সেই বীভৎস মুখটা ভেসে ওঠে চোখের সামনে। চোখটা বন্ধ করে মাথাটা একবার ঝাঁকিয়ে নেয় সায়ন। তেঁতুলের সামনে ছবিটা ফেলতেই সে-ও ভয়ে আঁতকে ওঠে। উত্তেজিত হয়ে বলে ওঠে, হ্যাঁ হ্যাঁ। এই সে। একেই দেখেছিলাম।’
সায়নের মাথায় বাজ পড়ে। গলা শুকিয়ে আসে। ঠিক করে দেখে বল। পুলিশের হাত থেকে পালাতে যা খুশি বলছিস না তো?’ সায়নের ধমকে মুখটা কাঁচুমাচু করে তেঁতুল বলে, ‘না না স্যার, আমি একটুও ভুল বলছি না। আমি একেই দেখেছি।’ সায়ন চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। গম্ভীর গলায় বলে, ‘চল আমার সঙ্গে সিসিটিভি ফুটেজ দেখবি।’ তেঁতুল যা যা বলেছে, যেমন যেমন বলেছে সিসিটিভি ঠিক সেই জিনিসগুলোই সবার চোখের সামনে মেলে ধরল। সায়ন জুম করে স্পষ্ট দেখল, মুখটা দেখা গেল না তবে লোকটির পরনে মেরুন টি-শার্ট যেটা স্ট্রিটলাইটের আলোয় খানিক কালচেটে লাগছে। কিন্তু আসল রংটা যে মেরুন সেটা নিয়ে কারও কোনো সন্দেহ নেই। এমনকি নীল রঙের জিন্সটাও স্পষ্ট। সকালে এই পোশাকেই লক-আপে মিহিরকে দেখেছিল সায়ন। তেঁতুলকে গাড়ি করে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসতে বলল আর জানিয়ে দিল সে যেন এখন কোত্থাও না যায় কেষ্টপুর ছেড়ে। সে-ও বাধ্য ছেলের মতো ঘাড় নেড়ে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে বেরিয়ে যায়। অবিশ্বাস্য ভয়ানক খবরটা মৃন্ময়ীকে কীভাবে বলবে সায়ন? তার আগে কৃষ্ণপদকে ফোন করে সবটা জানানো প্রয়োজন। সায়ন মনে মনে নিশ্চিত হয়েও মানতে পারছে না যে, এই খুনি মিহিরই। বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে তেঁতুলের দেখা ওই অস্বাভাবিক দুটো চোখ। আচ্ছা, চোখদুটো তো লেন্সও হতে পারে। কিন্তু কেন সে এমন কাজ করবে? কেন? সূর্যকে ডাকল সায়ন। মিহিরের আসল ছবি ও তেঁতুলের কথা অনুযায়ী তৈরি করা ছবি দুটো তার হাতে দিয়ে বলল, ‘এই ছবি দুটোর কপি প্রতিটা থানায় পাঠাবার ব্যবস্থা করো। তোমরা চারপাশে বেরিয়ে পড়ো খুঁজতে। আর আমার সঙ্গে চারজন এসো।’
— ওকে স্যার। আমি কি আপনার সঙ্গে যাব?
— না। তুমি অন্য একটা টিম লিড করো।
সম্পূর্ণ অন্য একটা দিকে তাকিয়ে শূন্য চোখে কথাগুলো বলে গেল সায়ন। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা যে-কোনো মানুষ বুঝতে পারবে যে সায়ন বলছে এক, আর ভাবছে আর এক।
