বাঙলাদেশের সংবিধান ও পরবর্তী নির্বাচন
আওয়ামী লীগের মুখপাত্রেরা অনেকে নিজেদের বক্তৃতা বিবৃতির মাধ্যমে বলে বেড়াচ্ছেন যে, আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুল সংখ্যাধিক্যে জয়লাভ করবে এবং সেই বিজয়ের মাধ্যমে প্রমাণিত হবে যে, বাঙলাদেশের জনগণ তাদের দেওয়া সংবিধানের সমর্থক। অর্থাৎ আওয়ামী লীগের এই মুখপাত্রদের মতে আগামী সাধারণ নির্বাচন এক ধরনের গণভোট।
এ ব্যাপারে প্রথম কথা হলো এই যে, সংবিধানের প্রশ্নে জনমত যাচাই করাকে যদি তাঁরা প্রয়োজনীয় এবং নিরাপদ মনে করতেন তাহলে তাঁদের উচিত ছিলো সংবিধানটি চূড়ান্ত করার পূর্বেই গণভোটের ব্যবস্থা করা। সে ব্যবস্থা তাঁরা করেননি, তার কোন প্রয়োজনও বোধ করেননি। কাজেই সংবিধান প্রণীত হওয়ার পর গণভোটের প্রশ্ন তোলা, সাধারণ নির্বাচনকে সংবিধানের ওপর গণভোট বলে ধরে নিতে সকলকে উপদেশ দেওয়া সস্তা বাগাড়ম্বর ব্যতীত আর কি?
দ্বিতীয়তঃ, আওয়ামী লীগ যদি বিপুল ভোটাধিক্যে আগামী নির্বাচনে জয়লাভও করে তাহলেও তার দ্বারা সংবিধানের প্রতি কোন সমর্থন বোঝাবে না। এর সহজ কারণ এই যে, আমাদের দেশের ভোটদাতাদের মধ্যে শতকরা সত্তর-আশী জনের প্রকৃতপক্ষে কোন অক্ষর পরিচয়ই নেই। কাজেই সংবিধানের মতো একটি দলিলের ভালো-মন্দ যাচাই করা এবং তার ভিত্তিতে তাদের ভোট দেওয়ার প্রশ্ন উঠে না। এদিক দিয়ে বিচার করলে দেখা যাবে যে, আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ‘বিপুল বিজয়’ অথবা ‘দারুণ পরাজয়’ হলেও তার কোনটির দ্বারা সংবিধানের প্রতি জনগণের সমর্থন অথবা সমর্থনের অভাব বোঝাবে না। এদিক দিয়ে আগামী নির্বাচনে সংবিধানের প্রশ্ন নিতান্তই অবান্তর।
বস্তুতঃপক্ষে সংবিধান প্রণয়কারী ক্ষমতাসীন দলের অর্থনৈতিক কর্মসূচী, রাজনৈতিক কার্যকলাপ, জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা ইত্যাদি প্রশ্নই নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করবে, এগুলির দ্বারাই নির্বাচন নিয়ন্ত্রিত হবে। বর্তমান ক্ষমতাসীন দল সংবিধানে নিজেদের হাতে রাখা ক্ষমতার ব্যবহার ভবিষ্যতে কিভাবে করবে তার ওপরই নির্ভর করবে সংবিধানের প্রতি জনগণের মনোভাব। এই মনোভাব পরবর্তীকালে নির্বাচন অথবা গণবিক্ষোভের মাধ্যমেই ব্যক্ত হবে। ১৯৬২ সালে স্বৈরাচারী আইয়ুব খান পূর্ব বাঙলাসহ সমগ্র পাকিস্তানের ঘাড়ে যে সংবিধান চাপিয়ে দিয়েছিলো তাকে আমাদের জনগণ তৎক্ষণাৎ বিক্ষোভের মাধ্যমে বর্জন করেননি। এমন কি ১৯৬৪ সালের মৌলিক গণতন্ত্রী নির্বাচনের সময়েও তাঁরা সেই শাসনতন্ত্রকে উচ্ছেদ করার জন্যে বদ্ধপরিকর ছিলেন না, যেমনটি তাঁরা ছিলেন ১৯৬৮- ৬৯ সালের ডিসেম্বর-মার্চ আন্দোলনের সময়। ১৯৬২ থেকে ১৯৬৮ পর্যন্ত এই ছয় বছর নিজের প্রণীত স্বৈরাচারী শাসনতন্ত্রে আইয়ুব খান নিজের হাতে অপরিমিত ক্ষমতা রেখে জনগণের স্বার্থের বিরুদ্ধে সেই ক্ষমতাকে যেভাবে ব্যবহার করছিলো তার ফলেই জনগণ আইয়ুব খান, তার শাসন এবং পরিশেষে তার শাসনতন্ত্রের প্রতি বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। এ জন্যেই পরিশেষে তাঁরা আইয়ুবের ১৯৬২ সালের স্বৈরাচারী শাসনতন্ত্রকে ব্যাপক গণবিক্ষোভের মাধ্যমে উচ্ছেদ করেন।
এই শাসনতন্ত্র উচ্ছেদ তাই কেবলমাত্র একটি শাসনতন্ত্র উচ্ছেদ ছিলো না। তা ছিলো শাসনতন্ত্র প্রণেতা ব্যক্তি ও দলের উচ্ছেদ। বস্তুতঃপক্ষে শাসনতন্ত্র প্রণেতাই ছিলো এ ক্ষেত্রে শাসনতন্ত্রের মূর্তপ্রতীক। এই প্রতীক এবং তার নির্যাতনের বিরুদ্ধেই ছিলো অক্ষর পরিচয়হীন জনগণের প্রত্যক্ষ বিক্ষোভ, তাকে উচ্ছেদ করাই ছিলো তাঁদের মূল কর্মসূচী। শাসনতন্ত্রের উচ্ছেদ ছিলো এই কর্মসূচীরই এক পরোক্ষ পরিণতি।
কাজেই ১৯৬২ সালে প্রদত্ত আইয়ুব খানের শাসনতন্ত্রে কি ছিলো তার ওপর ভিত্তি করে ১৯৬৪ সালে জনগণ ভোট দান করেননি। গ্রামাঞ্চলে অবস্থিত বিপুল অধিকাংশ ভোটার মৌলিক গণতন্ত্রীদের বাস্তব আচরণ এবং আইয়ুব শাসনের নানান কর্মসূচীর বাস্তব প্রয়োগের বিভিন্ন দিক বিবেচনা করেই নিজেদের ভোট প্রদান করেছিলেন। জনগণ তখন আইয়ুব শাসনতন্ত্র উচ্ছেদের প্রশ্ন তোলেননি। ভোটার হিসেবে তাঁরা ভোট কেন্দ্রে গিয়ে বিপুল সংখ্যক আইয়ুব-বিরোধী প্রার্থীদেরকে নিজেদের ভোট প্রদান করেছিলেন। সেই ভোট সত্ত্বেও শাসনতান্ত্রিক কারসাজীর ফলে ১৯৬৫ সালে আইয়ুব যখন নিজে অধিকাংশ মৌলিক গণতন্ত্রীদের সমর্থনে পুনরায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলো তখনই জনগণের দৃষ্টি পড়লো শাসনতন্ত্রের ওপর। এর ফলে ১৯৬৮-৬৯ সালে জনগণ স্বৈরাচারী শাসনতন্ত্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার হলেন, আন্দোলন গড়ে তুললেন এবং পরিশেষে আইয়ুব ও তার শাসনতন্ত্রকে উচ্ছেদ করলেন।
আগামী নির্বাচনে হার-জিতকে শাসনতন্ত্রের প্রতি সমর্থন অথবা বিরোধিতাব্যঞ্জক বলে যাঁরা অভিহিত করতে চাইছেন তাঁরা জনগণকে বিভ্রান্ত করতে চাইছেন। ১৯৭৩-এর মার্চ মাসে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা তাতে শাসনতন্ত্র নয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক নৈরাজ্য এবং সেই নৈরাজ্য সৃষ্টির ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ভূমিকা, অন্নবস্ত্রের প্রশ্ন, বাসস্থানের প্রশ্ন, দ্রব্যমূল্যের ক্রমাগত ঊর্ধ্বগতি বাঙলাদেশের রাজনীতিতে বৈদেশিক প্রভাব, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ইত্যাদি ক্ষেত্রে স্থিতাবস্থা রক্ষা অথবা উন্নতি বিধানের ব্যাপারে আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতি জনগণের অবস্থা ইত্যাদিই নির্ণয় করবে ব্যাপক ভোটদাতাদের সমর্থন। এ জন্যে স্থানীয় এবং জাতীয় ক্ষেত্রে নানান বাস্তব সমস্যাই আগামী নির্বাচন নিয়ন্ত্রণ করবে। শাসনতন্ত্র ভালো কি মন্দ অথবা দেশকে শাসনতন্ত্র দিয়ে আওয়ামী লীগ জনগণের হৃদয় কতখানি জয় করছে তার পরিমাপ, সেই নির্বাচনের মাধ্যমে নির্ণীত হবে না।
সাপ্তাহিক স্বাধিকার
২৬শে নভেম্বর, ১৯৭২
