শাসনতন্ত্র প্রশ্নে বিরোধী দলগুলির ভূমিকা
আওয়ামী লীগ প্রস্তাবিত শাসনতন্ত্র যে সমাজতান্ত্রিক, গণতান্ত্রিক, জাতীয় স্বার্থ উদ্ধারকারী ও ধর্মনিরপেক্ষতার রক্ষক নয় এ কথা সম্পর্কে সাধারণভাবে বিরোধী দলসমূহের মধ্যে মোটামুটিভাবে মতৈক্য দেখা যাচ্ছে। কিন্তু লক্ষ্য করার বিষয় হচ্ছে এই যে শাসনতন্ত্রের বিরুদ্ধে উপযুক্তভাবে জনমত গঠনের এবং আন্দোলন করার ইচ্ছে কারো নেই। এদিক দিয়ে বিরোধী দলগুলির কর্মসূচীর প্রধানতঃ দুটি ধারা। প্রথমতঃ, একটি করে সাংবাদিক সম্মেলন আহ্বান করা এবং সেই সম্মেলনে বলা যে সংবিধান তৈরির পদ্ধতি সঠিক নয়। এ ক্ষেত্রে সঠিক পদ্ধতি নির্ণয় করতে গিয়ে তাঁরা বলছেন যে সংবিধান তৈরীর জন্যে একটি জাতীয় সম্মেলন আহ্বান করা দরকার অর্থাৎ তাঁদেরকেও নেওয়া দরকার। এরপর সেই সম্মেলনে গৃহীত সংবিধান, গণভোটের মাধ্যমে পাস করানো। অন্য কেউ কেউ সাংবাদিক সম্মেলন আহ্বান করে তার বিভিন্ন সমালোচনা সাংবাদিকদের সামনে উপস্থিত করে সংবিধানটি ‘প্রত্যাখ্যান’ করছেন। কাজেই দেখা যাচ্ছে যে, আওয়ামী লীগ সংবিধান সম্পর্কে ‘সম্মেলন আহ্বান’ এবং ‘সংবিধান প্রত্যাখ্যান-এর কর্মসূচী ব্যতীত বিরোধী দলগুলির উন্নততর এবং ব্যাপকতর কোন কর্মসূচী নেই।
যাঁরা জাতীয় সম্মেলন আহ্বানের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তাঁদের মূল কথা হলো তাঁদেরকে আওয়ামী লীগ সংবিধান প্রণয়নের জন্যে আহ্বান জানাচ্ছে না কেন? কিন্তু সে আহ্বান আওয়ামী লীগ জানাবে কেন? তাদের যা ইচ্ছে করার মতো শক্তি যখন আছে তখন তারা অন্যদেরকে আহ্বান করার কোন প্রয়োজনীয়তাই বোধ করছে না এবং তা না করারই কথা। এটা কি বিরোধী দলের নেতৃত্বের জানা নেই? নিশ্চয়ই আছে এবং তা যদি থাকে, তা হলে তাঁরা জনমতকে সংগঠিত করার জন্যে কি করছেন? সরকারী ঘোষণা অনুযায়ী ঈদের পূর্বেই হয়তো সংবিধান পাস হয়ে যাবে। সেই অবস্থায় জনগণের এক বিশাল অংশ, যাঁরা এই সংবিধানের বিরোধী, তাঁদেরকে এর বিরুদ্ধে সংগঠিতভাবে মত প্রকাশের সুযোগই এঁরা দিলেন না। অর্থাৎ সংবিধান বিরোধিতার ক্ষেত্রে তাঁরা জনগণকে সাথে নিলেন না।
যাঁরা সাংবাদিক সম্মেলনে এই সংবিধানকে ‘প্রত্যাখ্যান’ করছেন তাঁরা এই প্রত্যাখ্যানের মাধ্যমেই এ ক্ষেত্রে নিজেদের দায় সারছেন। এ ব্যাপারে জনগণের সংগঠিত প্ৰতিবাদ ব্যতিরেকেই তাঁরা সংবিধানটিকে পাস হওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছেন। আওয়ামী লীগের যখন নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে তখন তাঁরা লোক দেখানোভাবে সংবিধানটির সামান্য দুচারটি অগুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী গ্রহণ করে যে সেটি পাস করিয়ে নেবেন তাতেও কোন সন্দেহ নেই। তাই এই ক্ষেত্রে যা করণীয় ছিল তা হচ্ছে ‘জনগণের সংগঠিত প্রতিবাদের মুখে’ একে পাস হতে দেওয়া। কিন্তু ঠিক সেটাই এঁদের দ্বারা সম্ভব হলো না।
এই দলের মধ্যে কেউ কেউ আছেন যাঁরা নিজেদেরকে কমিউনিস্ট অথবা কমিউনিস্ট সমর্থক বলেন। এঁরা যখন সাংবাদিক সম্মেলন ডেকে সংবিধানটিকে প্রত্যাখ্যান করেন তখন কমিউনিস্ট হিসেবেও তাঁরা ভুল পথ নেন। তার কারণ সামন্ত-বুর্জোয়া সমাজ ব্যবস্থার শাসক শ্রেণী যে সংবিধান দেয় তাকে গ্রহণ অথবা বর্জন করার কোন দায়িত্ব কমিউনিস্টদের নয়। তাঁদের মূল দায়িত্ব এ ক্ষেত্রে হলো এ ধরনের সংবিধানের চরিত্রকে উপযুক্তভাবে উদ্ঘাটন করা। লেনিন যখন ডুমার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছেন এবং যখন তা বর্জন করেছেন তখন উভয় ক্ষেত্রেই তাঁর মূল উদ্দেশ্য ছিলো জারতন্ত্রের চরিত্রকে জনগণের সামনে তুলে ধরা, তার মুখোশ বলতে যা কিছু তা খুলে দেওয়া।
সামন্ত-বুর্জোয়া সমাজ ব্যবস্থায় যে সংবিধান ক্ষমতাসীন শ্রেণী জনগণের সামনে উপস্থিত করে তা কখনো গণতান্ত্রিক, সমাজতান্ত্রিক ইত্যাদি হতে পারে না। এটা হতে পারে না সেটা স্বতঃসিদ্ধ। এ জন্যেই তাকে সাংবাদিক সম্মলনে ‘প্রত্যাখ্যান’ করতে যাওয়াটা কমিউনিস্ট সুলভ সঠিক পন্থা নয়। কিন্তু দেখা যাচ্ছে যে মোটামুটিভাবে তাঁরা সেই পথই এক্ষেত্রে গ্রহণ করেছেন।
যাই হোক, কমিউনিস্ট অথবা অকমিউনিস্ট, যে হিসেবেই নিজেদের পরিচয়দান করুন কোন গ্রুপ অথবা দলই শাসনতন্ত্রের বিভিন্ন গণবিরোধী ধারার অথবা সামগ্রিকভাবে তার বিরুদ্ধে কোন আন্দোলন গড়ে তোলার কর্মসূচী এখনো পর্যন্ত নিলেন না এবং তার সুযোগও আর ভবিষ্যতে থাকবে বলে মনে হয় না।
এদিক দিয়ে সরকার বিরোধী সমস্ত দলই যে মোটামুটিভাবে নিজেদের গণতান্ত্রিক দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হয়েছেন সেটা বলাই বাহুল্য। এদিক দিয়ে তাঁরা যদি ভবিষ্যতে অধিকতর সজাগ না হন তাহলে গণতান্ত্রিক শক্তিসমূহ জনগণের প্রতিনিধিত্ব করার পরিবর্তে বাস্তব অর্থে জনগণ থেকে অনেকাংশে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে এবং ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত শাসক শ্রেণী অথবা শক্তিসমূহের সেই দুর্বলতার সুযোগ নিতে কোন রকম দ্বিধা অথবা গাফিলতি করবে না।
সাপ্তাহিক স্বাধিকার
৫ই নভেম্বর, ১৯৭২
