রক্তঝরা নভেম্বর ১৯৭৫ – ২
২
অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে, হঠাৎ একদিন ঢাকা থেকে একই খামে পাঠানো আমার দুই কবিবন্ধু আবুল হাসান ও মহাদেব সাহার দু’টি চমৎকার চিঠি পাই। তাদের সমবেদনাসিক্ত চিঠি দুটো পড়ে, বিশেষ করে আবুল হাসানের চিঠিটি পড়ে আমি ঢাকার প্রতি আমার অভিমান অনেকটাই ভুলে যেতে সক্ষম হই। আবার ঢাকা আমাকে ডাকে, আয় ফিরে আয়। তখনও আমি শারীরিকভাবে পুরোপুরি সুস্থ ছিলাম না। তাই আমার বাবা-মা আমাকে ঢাকায় যেতে বারণ করেন। আমার মা-বাবার ইচ্ছার বিরুদ্ধেই আমি নভেম্বরের শুরুতে ঢাকায় ফিরে আসি।
একাত্তরের নয় মাস বাদ দিলে, এর আগে এতো দীর্ঘদিন আমি আমার প্রিয় নগরী ছেড়ে বাইরে কখনও থাকিনি। প্রায় আড়াই মাস পর, বঙ্গবন্ধুহীন এই নগরীতে ফিরে এসে আমি আর আমার নিউপল্টনের বাঁশের বেড়ার মেসটিতে ফিরে যাইনি। আমি আমার বন্ধু মহাদেব সাহার ১১২ আজিমপুরের বাসায় উঠি। দীর্ঘদিন পর আমাদের দেখা হয়। আমরা দু’জন মিলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলি। আমরা হিসেব মিলাতে চাই। কেন এই হত্যাকান্ড? কেন এই নৃশংশতা? এখন কোথায় যাবে বাংলাদেশ? সংখ্যালঘুরা বঙ্গবন্ধুহীন এই নতুন বাংলাদেশে থাকতে পারবে কি? ধর্মনিরপেক্ষতার পথ কি অনুসৃত হবে আর? নাকি একটি মিনি পাকিস্তান (‘মুসলিম বাংলা’ কথাটা তখন চালু হয়েছিল) পরিণত হবে এই দেশ? ভারত কী করবে? সোভিয়েত ইউনিয়ন কি পারবে আমেরিকার
ষড়যন্ত্রকে রুখতে? দীর্ঘদিন পর আমরা প্রাণ খুলে কথা বলার সুযোগ পেয়েছি। আমাদের কথা ফুরাতে চায় না। রাজ্যের রাজনীতি এসে ভিড় করে আমাদের মাথায়। আলাপে-উদ্বেগে রাত ভোর হয়ে আসে। বাইরে খুব কমই বেরোই আমরা। মহাদেবের বাসায় অনেকটাই গৃহবন্দির মতো আমি থাকি। আমি যে ঢাকায় ফিরে এসেছি, তা খুব একটা মানুষকে জানাতে চাই না। পরদিন আবুল হাসানের সন্ধানে ওর শান্তিনগরের বাসায় যাবো, ঐরূপ স্থির করে অনেক রাত পর্যন্ত গল্প করে আমরা ঘুমিয়েছিলাম।
ভোরের দিকে কয়েকটি রাশান মিগ-২১ বিমান ঢাকার আকাশ কাঁপিয়ে উত্তর থেকে দক্ষিণের দিকে উড়ে যায়। সঙ্গে হেলিকপ্টার। শব্দে আমাদের ঘুম ভেঙে যায়। আমরা চমকে উঠি। অনেকদিন পর ঢাকার আকাশে, এ কিসের গর্জন? কার গর্জন? বঙ্গবন্ধুর নয়তো।
মারাত্মক একটা কিছু ঘটেছে—এমন আশঙ্কায় দ্রুত রেডিও নিয়ে আমরা সংবাদ শুনতে বসি। কিন্তু না, রেডিও চলছে না। একেবারে বন্ধ কোনো সাড়া শব্দই নেই। তবে? ভালো করে সকাল হবার আগেই পাড়ার মধ্যে একটা সাড়া পড়ে যায়। সবারই প্রশ্ন, রেডিও বাংলাদেশ বন্ধ কেন?
আকাশবাণী বা বিবিসিও আমাদের কোনো খবর দিতে পারে না। আমরা খবর জানতে দুপুরের দিকে প্রেসক্লাবে যাই। ওখানে গিয়ে খবর পাই, ভোরের দিকে সামরিক বাহিনীতে একটি অভ্যুত্থান হয়েছে। ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ এই অভ্যুত্থানটি করেছেন। সকালের দিকে ঢাকার আকাশে যে বিমান ও হেলিকপ্টারগুলো উড়েছিল সেগুলো উড়েছিল ঐ অভ্যুত্থানেরই পক্ষে। বিমান ও হেলিকপ্টারগুলোকে নাকি সোহরাওয়ার্দী উদ্যান এবং বঙ্গভবনের ওপর দিয়ে উড়ে যেতে দেখা গেছে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে তখন ১৫ আগস্টের মোশতাকবর্ণিত সূর্য- সন্তানদের ট্যাংক ও আর্টিলারি বাহিনীর ঘাঁটি ছিল। ফলে, অভ্যুত্থানটি যে ঐসব তথাকথিত সূর্যসন্তানদের বিরুদ্ধেই ঘটেছে—তা বেশ সহজেই বোঝা গেলো। অভ্যুত্থানের খবর শুনে আমি ও মহাদেব খুব খুশি হই।
দেশে এত বড় একটা ঘটনা ঘটে গেলো—অথচ কোথাও কোনো প্রতিবাদ নেই—, এই অসহনীয় অবস্থানটি অবসান ঘটাতে আমাদের আনন্দের শেষ নেই। আমরা সতর্কতার সঙ্গে আমাদের মনের খুশি- ভাবটাকে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করি। আমরা হচ্ছি ঘরপোড়া গরু। আকাশে সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পাই। বলা তো যায় না, যদি অভ্যুত্থানটি ব্যর্থ হয়ে যায়। আমি আর মহাদেব দ্রুত বাসায় ফিরে আসি এবং আকাশবাণী, বিবিসি ও ভয়েস অব আমেরিকার সংবাদ শোনার জন্য রেডিও নিয়ে বসি। ঢাকা বেতার তখনও বন্ধ, তবে টিভি চালু ছিল। টিভিতে এমনকিছু সংবাদ পাওয়া যাচ্ছিল না, যা থেকে সামরিক বাহিনীর মধ্যে যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছে, সে-সম্পর্কে কোনো সঠিক ধারণা লাভ করা যায়।
বিবিসি-র রাতের খবরে আমরা জানতে পারি যে, ৩ নভেম্বরের ভোরের দিকে, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি চার জাতীয় নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমদ, এম. মনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামরুজ্জামান নিহত হয়েছেন। সব প্রকারের কারাবিধান লংঘন করে সামরিক বাহিনীর কিছু লোক জেলের ভিতরে প্রবেশ করে চার বন্দি জাতীয় নেতাকে গুলি করে, বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করেছে। শুনে বেদনা ও ঘৃণায় আমরা স্তব্ধ হয়ে যাই। আমাদের চোখ থেকে ঘুম উধাও হয়ে যায়। আমরা খুব ভয় পেয়ে যাই। এও কি সম্ভব? এরকম একটি বর্বর হত্যাকাণ্ডের কথা তো আমরা ভাবতেও পারি না। পরে ১৫ আগস্টের নৃশংসতার দিকটির কথা স্মরণ করে আমরা এই সিদ্ধান্তে আসি, অতঃপর ঐরকমের কাজ এদেশের মাটিতে খুবই সম্ভব। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা আমাদের জীবনের চারপাশে আততায়ীদের পদশব্দ অনুভব করতে থাকি।
পরদিন আমরা দু’জন ভয়ে ভয়ে বাসা থেকে বেরোই। আমরা যাবো নিউমার্কেট হয়ে প্রেসক্লাবে। মহাদেবকে তাঁর ছেলের জন্য দুধ সংগ্রহ করতে হবে। তখন গুঁড়ো দুধের খুবই আকাল চলছিল। নীলক্ষেতের কাছে যেতেই দেখি একটি মিছিল আসছে। মিছিল? আমরা চমকে উঠি 1 ১৫ই আগস্টের পর এটিই ঢাকার প্রথম মিছিল। নীরব মিছিলটি যাচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে। মিছিলে লোকজন খুব বেশি একটা নেই। শ’দুয়েক হবে। ঐ মিছিলে আমাদের পরিচিত অনেকেই। আমাদের পরিচিত বন্ধুদের মিছিলে দেখে আমরাও ঐ মিছিলে ভিড়ে যাই। শুনতে পাই এই মিছিলের অগ্রভাগে আছেন ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের বৃদ্ধা মাতা এবং ভাই আওয়ামী লীগ নেতা রাশেদ মোশাররফ। শুনে খুব ভালো লাগে।
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি চার জাতীয় নেতার হত্যা না ১৫ আগস্টের মোশতাকবর্ণিত সূর্যসন্তানদের বিরুদ্ধে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থান কোনটি আগে ঘটছে, তা কেউই সঠিক করে বলতে পারলো না। জানলাম, এটি একটি মস্ত বড় ঘটনা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা এই মিছিলের আয়োজন করেছে। বাংলাদেশ ছাত্রলীগ এবং বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সমন্বয়ে গঠিত ছাত্রসমাজ বঙ্গবন্ধু স্মৃতি দিবস পালনের জন্য ঐ মিছিলের আয়োজন করেছিল। ঐ মিছিলে ছিলেন সংসদ সদস্য মহিউদ্দিন আহমদ, সংসদ সদস্য শামসুদ্দিন মোল্লা, সংসদ সদস্য রাশেদ মোশাররফ, মরহুম খন্দকার মুহম্মদ ইলিয়াস, জনাব মোস্তফা মহসীন মন্টু, বেগম মতিয়া চৌধুরী, জনাব সাইফুদ্দিন আহমদ মানিক, জনাব মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, জনাব ইসমত কাদির গামা, খালেদ মোশাররফের বৃদ্ধা মাতা প্রমুখ।
সংগ্রাম ছাত্র সমাজের উদ্যোগে ঐদিন বিকেল ৪ টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে একটি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশ শেষে নগরীতে একটি সংক্ষিপ্ত মিছিলও বের হয়।
৩ নভেম্বর খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সামরিক অভ্যুত্থানটি না ঘটলে, মিছিল সহকারে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে শ্রদ্ধা জানাতে যাওয়া কি সম্ভব হতো? মনে হয় না। দীর্ঘ বিরতির পর বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগ লাভ করার জন্য আমরা খুবই খুশি হই এবং খালেদ মোশাররফের প্রতি কৃতজ্ঞ বোধ করি। আরও একটি কারণে আমি খালেদ মোশাররফের প্রতি প্রতি দুর্বলতা বোধ করি, তা হলো, তাঁর সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত পরিচয়। ১৯৭৪ সালে কোনো একদিন সকালে নিউমার্কেটের নওরোজ কিতাবিস্তানে তাঁর সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন সচিত্র সন্ধানী পত্রিকার সম্পাদক জনাব গাজী সাহাবুদ্দিন সাহেব। ঐদিন খালেদ মোশাররফ বইয়ের দোকানে কিছু বই খুঁজছিলেন। খুব বেশি কথা হয়নি সামান্য পরিচয়ের ঘটনাটিই আমার মনে দাগ কেটেছিল। আমার ভালোই লেগেছিল তাঁকে। আমি জানতে চাইছিলাম তিনি কী ধরনের বই খুঁজছেন। কবিতা, গল্প, কি না? আমার কৌতূহলী প্রশ্নের উত্তরে মুচকি হেসে খালেদ বলেছিলেন, না ভাই, আমি মিলিটারি স্ট্র্যাটেজির ওপর বই খুঁজছি। তবে আমি কবিতাও পড়ি।
১৯৭১ সালে কলকাতায় ইন্ডিয়া টু ডে পত্রিকার সম্পাদক প্রীতিশ নন্দীর মুখে তাঁর প্রশংসা শুনেছিলাম। প্রীতিশ খালেদের একটি বড় ইন্টারভিউ করেছিলেন। আমি সেকথা স্মরণ করলাম। খালেদ খুশি হয়ে হাসলেন। বললেন, প্রীতিশ? হ্যাঁ, খুব মনে আছে।
মিছিলের পেছনে হাঁটতে হাঁটতে আমর ঐ দিনের কথা মনে হাঁটতে-হাঁটতে পড়লো। সেদিন তিনি আমাদের লোক কি-না, তা ভাববার প্রয়োজন বোধ করিনি। আজ ঐটি জানাই সবচেয়ে বড় জানার বিষয় হয়ে দেখা দিলো। মনে হলো, খালেদ আমাদেরই লোক হবেন। যার মা আমাদের, যার ভাই আমাদের, তিনি আমাদের না হয়ে যান না। আমি মনে-মনে খালেদ মোশাররফের সাফল্য কামনা করতে থাকি
সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল জিয়ার খবর কি–তা তখনও জানতে পারি না। তিনি কোথায় আছেন, তিনি কী ভাবছেন—তা কেউ- ই বলতে পারে না। খালেদ কি তাঁর বিরুদ্ধে এই অভ্যুত্থান করেছেন? নাকি বঙ্গবন্ধুর খুনীদের বিরুদ্ধে? জিয়া কি বঙ্গবন্ধুর খুনিদের পক্ষে আছেন না বুঝতে পারার প্রচন্ড উত্তেজনা বুকে নিয়ে আমি অপেক্ষা করতে থাকি রাতে বিবিসির সংবাদভাষ্য শোনার জন্য। তখনও আমি ভাবতে ভালোবাসি, যার কণ্ঠে ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চের দুপুরে আমি বঙ্গবন্ধুর নামে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা ইথারে তরঙ্গিত হতে শুনেছিলাম—, মুক্তিযুদ্ধের সেই বীর, সেই মুজিবভক্ত জেনারেল জিয়াউর রহমানও এই অভ্যুত্থানে নিশ্চয়ই খালেদের পক্ষেই আছেন। হয়তো খালেদকে সামনে দিয়ে তিনি পেছনে অবস্থান গ্রহণ করেছেন কোনো কৌশলগত কারণে। ২৫ মার্চের গভীর রাতে পাক-সেনাদের হাতে বঙ্গবন্ধুর গ্রেফতার হওয়ার পর চট্টগ্রামস্থ স্বাধীন বাংলা বেতার থেকে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক প্রচারিত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করে ১৯৭১-এর ২৭ মার্চে তিনি যে ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছিলেন, আজ তাঁর সামনে আবার সেরকম একটি মুহূর্ত এসে উপস্থিত হয়েছে। তিনি কি এই দায়িত্ব এড়াতে পারেন?
আমেরিকার নির্বাচন শেষ হয়েছে। আজ সকাল সকাল (৬ নভেম্বর) বাংলাবাজার পত্রিকা অফিসে আসার আগে পুনঃনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোর-এর বিজয় ভাষণ সিএনএন-এর চ্যানেলে শুনে এসেছি।
২ নভেম্বর তারিখে বাংলাবাজারের উপসম্পাদকীয় পাতায় ১৯৭৫ সালের রক্তঝরা নভেম্বরের স্মৃতিচারণমূলক যে লেখাটি শুরু করেছিলাম, আজ তার পরবর্তি কিস্তি লেখার কথা। প্রশ্ন উঠতে পারে, আজকের লেখার সঙ্গে আমেরিকার নির্বাচনের কোনো প্রাসঙ্গিক সম্পর্ক আছে কি? হ্যাঁ, আছে। খুবই সম্পর্ক আছে। ১৯৭৫ সালে আমেরিকার রাষ্ট্রক্ষমতা ছিল রিপাবলিকান দলের হাতে। আমেরিকার রিপাবলিকানরা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। আমাদের পক্ষে ছিল ভারত-রাশিয়াসহ পূর্ব-ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক শিবির। আমেরিকান সশস্ত্র বিরোধিতার পরও আমরা যখন আমাদের বহু প্রত্যাশিত স্বাধীনতা লাভ করি, তখন আমেরিকা তা ভালোভাবে নিতে পারেনি। তাদের মধ্যে এক ধরনের পরাভববোধ কাজ করছিল। তদুপরি বঙ্গবন্ধু যখন দেশ চালাতে গিয়ে রাশিয়া কিউবা (আমেরিকার নিষেধ সত্ত্বেও কিউবায় চটের থলে রফতানি করা) ঘেঁষা নীতি গ্রহণ করেন, তখন বঙ্গবন্ধু ও তাঁর সরকারকে উৎখাত করে বাংলাদেশকে একটি মিনি- পাকিস্তানে পরিণত করার ব্যাপারে আমেরিকার কম করেও নীরব সমর্থন তো ছিলই। এমন কথাই তখন আমরা শুনেছিলাম।
২১ বছর পর, বঙ্গবন্ধুর দল আওয়ামী লীগ যে আজ আবার বাংলাদেশের ক্ষমতায় ফিরে এসেছে, আসতে পেরেছে, তার পেছনে শুধু দেশের ভিতরের জনসমর্থনই নয়, বর্তমানে বিরাজিত আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটটিও বিবেচ্য। সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন- এর ভেঙে যাওয়া এবং আমেরিকার রাষ্ট্রক্ষমতায় রিপাবলিকানদের স্থলে ডেমোক্রাটদের আসীন হওয়ার ব্যাপারটিও আওয়ামী লীগের রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে আসতে পারার পথ প্রশস্ত করেছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন পরাশক্তিধর দেশ হিসেবে সত্তরের দশকে আমাদের দেশটিকে স্বাধীন হতে সাহায্য করেছিল। নব্বইয়ের দশকে এসে সেই সোভিয়েত ইউনিয়ন নিজেকে ভেঙে, দুর্বল করে আমাদের রাষ্ট্রক্ষমতা ফিরে পেতে ভিন্নভাবে সাহায্য করলো। সোভিয়েত ইউনিয়ন যদি টিকে থাকতো, তাহলে আমেরিকায় রিপাবলিকানরাও টিকে থাকতো, আর তখন আওয়ামী লীগের পক্ষেও ক্ষমতায় যাওয়া হয়তো সম্ভবই হতো না। আমেরিকার উস্কানিতে দেশে আরও একটি সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে যেতো।
‘৯৪-৯৫ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে গড়ে ওঠা জনপ্রিয় অসহযোগ আন্দোলনের সময় বেগম খালেদা জিয়ার অনুরোধ সত্ত্বেও জেনারেল নাসিম যে ক্ষমতা দখল করেননি—তার পেছনেও রয়েছে ঐ পরিবর্তিত বিশ্বরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। আজ ক্ষমতায় গিয়ে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা যে ১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বরের জেলহত্যার বিচার কার্য প্রক্রিয়াটি নির্ভয়ে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারছেন—তার পেছনেও আছে আমেরিকা। আছেন ক্লিনটন। মানে ঐ ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। বাংলাদেশ সরকার সতর্কতা অবলম্বন করার প্রয়োজনে কোনো স্পর্শকাতর বিদেশি রাষ্ট্রকে ১৫ আগস্ট বা ৩ নভেম্বরের ঘটনার সঙ্গে জড়িত না করার জন্য গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে পরামর্শ দিয়েছেন। সতর্কতা অবলম্বন করা নিশ্চয়ই ভালো। তবে, সত্য উদ্ঘাটনের স্বার্থে ১৯৭৫-এর ঘটনার পেছনে আমেরিকার উস্কানি ছিল, —এমন তথ্য যদি উদ্ঘাটিত হয়েও পড়ে, তাতেও খুব একটা অসুবিধা হবে বলে আমার মনে হয় না দ্বিতীয়বারের মতো নির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন তো আমেরিকার ভিয়েতনাম-নীতির সমালোচনা করেই নবীন আমেরিকার জনচিত্ত জয় করেছিলেন। বিল ক্লিনটন মার্কিন জনগণকে বুঝাতে পেরেছেন যে, রিপাবলিকানদের দায় বহন করাটা ডেমোক্র্যাটদের জন্য বাধ্যতামূলক কিছু নয়। তাতেই বরং আমেরিকার লাভ। তাতে এক দলের ভুল করার সুযোগ যেমন থাকে, অন্য দলের পক্ষে সেই ভুল সংশোধন করার উপায়ও থাকে। প্রয়োজনে খারাপও হওয়া যায়, আবার প্রয়োজনে ভালোও হওয়া যায়।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাগ্য ভালো বলেই মনে হচ্ছে। তিনি গত মাসে যখন আমেরিকায় ছিলেন, তখন আমাদের সাগরে গভীর নিম্নচাপের সৃষ্টি হয়েছিল। ১৯৯১ সালে বেগম খালেদা জিয়ার ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই গৃহশত্রুরূপী সমুদ্র আমাদের উপকূলে আঘাত হানে। তাতে হাজার হাজার প্রাণ ও প্রচুর ধনসম্পদ বিনষ্ট হয় এবং ত্রাণ কার্যের ছুঁতো ধরে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ-এর নির্দেশে অপারেশন ডেজার্ট স্টর্ম সাঙ্গ করে দেশে ফেরার পথে মার্কিন সেনারা খালেদা জিয়ার অনুমতি না নিয়েই বাংলাদেশের জলসীমায় প্রবেশ করে নতুন সরকারকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলেছিল। আমি ঐ সময় আমেরিকা ভ্রমণে ছিলাম এবং বাংলাদেশে মার্কিন সৈন্য প্রবেশের বিরোধিতা করে সেখানকার বাংলা কাগজে বিবৃতি দিয়েছিলাম।
এবারের নিম্নচাপের সংবাদ শুনেও আমার মনে আশঙ্কা হয়েছিল, কী জানি আবার। কিন্তু না এবার আর ঐ রূপ কিছু ঘটেনি। ঘটেনি যে, খুব অল্পের ওপর দিয়েই যে ঐ নিম্নচাপটি আমাদের দেশ অতিক্রম করেছে—তা শেখ হাসিনার জন্য খুবই সৌভাগ্যসূচক বলে গণ্য হয়েছে। আর চলতি নভেম্বরের শুরুতেই মার্কিন নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট দলীয় প্রার্থী বিল ক্লিনটনের পুনরায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার ব্যাপারটিও শেখ হাসিনার জন্য খুবই ভালো হলো। অতঃপর ১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বরের বর্বর হত্যাকান্ডের বিচার করার পথে শেখ হাসিনা অন্তত আমেরিকার দিক থেকে কোনোরূপ বাধার সম্মুখীন হবেন না বলেই মনে হয়।
আশা করি এতক্ষণ পর, আমার চলতি রচনার সঙ্গে এবারের মার্কিন নির্বাচনের প্রাসঙ্গিকতা প্রতিষ্ঠায় আমি মোটামুটিভাবে কৃতকার্য হয়েছি। এবার আমি ১৯৭৫-এর রক্তঝরা নভেম্বরের স্মৃতিচারণে ফিরে যেতে পারি। ১৫ আগস্টের ঘটনার পর আমি অনির্দিষ্ট কালের জন্য আমার গ্রামের বাড়িতে ফিরে গিয়েছিলাম। সহসা ঢাকা ফিরে আসার কোনো ভাবনাই আমার ছিল না। আমি আমার দেশ সম্পর্কে সকল আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলাম। নিকটবর্তি থানা শহরে গিয়ে খবরের কাগজ পড়তে পারতাম—, কিন্তু পড়তাম না। বাড়িতে রেডিও ছিল না, পাশের বাড়িতে ছিল——, ইচ্ছে করলে শুনতে পারতাম, কিন্তু শুনতাম না। ঢাকা কী হচ্ছে না হচ্ছে, আমি প্রায় কিছুই খবর রাখতাম না। আমি সারাদিন আমাদের গ্রামের শ্মশানে জগা সাধুর আশ্রমে পড়ে থাকতাম। আধ্যাত্মিক গান শুনতাম এবং দিনরাত সিদ্ধি সেবন করতাম। সংসার ত্যাগী জগা সাধুর সঙ্গে আমার একটা আত্মিক-আধ্যাত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। জগা সাধুর আশ্রমটা ছিল আমার মায়ের শ্মশানের খুবই কাছে। ঐ আশ্রমে বসে আমি আমার ছোটবেলায় হারানো মাকে অনুভব করতাম। আসলে, পরে বুঝেছি, ঐ সময়টায় এক ধরনের মানসিক রোগীতে পরিণত হয়েছিলাম আমি। আমার ঐ মানসিক রোগটার কী নাম জানি না- রোগটা ছিল সবাইকে সন্দেহ করা। সবসময় আমার মনে হতো, আমাকে মেরে ফেলার জন্য বিশ্বজুড়ে একটা গভীর ষড়যন্ত্র চলছে। ঐ ষড়যন্ত্রের হোতা হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ। আমার তখন মনে হতো, আমি তো শুধু আমি নই, বঙ্গবন্ধুর আত্মা বা রুহু পুনর্জন্মের আশায় আমার ভিতরে এসে আশ্রয় নিয়েছে। এই সংবাদটি সিআইএ-এর অজানা নয়। তাই, আমাকে শেষ করে দেবার জন্য সিআইএ-এর লোক এই প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্তও হানা দিতে পারে। আমার বিমাতা তো পারেনই, আমার আপন পিতাও প্রচুর ডলারের লোভে সিআইএ-এর ফাঁদে পা দিতে পারেন। কিছুই বলা যায় না। কাউকেই বিশ্বাস নেই। আমার খুবই সতর্ক থাকা দরকার। মানুষকে বিশ্বাস করা চলবে না। বঙ্গবন্ধু মানুষকে বিশ্বাস করে ঠকেছেন। আমাকে যে খাদ্য প্রদান করা হতো, আমি ঐ খাদ্য অন্যকে খাইয়ে টেস্ট করে তবেই খেতাম। তার আগে নয়। আমার আচরণে আমার মা-বাবা ভাইবোনরা খুব কষ্ট পেতো। কিন্তু তাদের চোখের জলও আমাকে আমার অটল সিদ্ধান্ত থেকে টলাতে পারতো না। চারদিকে রাষ্ট্র হয়ে গিয়েছিল যে, আমি পাগল হয়ে গেছি। আমার পাগল হয়ে যাবার খবর শুনে দূর থেকেও মানুষ আমাকে দেখতে আমাদের বাড়িতে এসে ভিড় করতো। আমি দেখা দিতাম কিন্তু পারতপক্ষে কারও সঙ্গে কথা বলতাম না। ঐরূপ মানসিক ভারসাম্য হারানো অবস্থার মধ্যেই আমার অনেকগুলো দিন কেটে যায়।
১৫ আগস্টের পর মোশতাক সরকারের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করার পর জেনারেল শফিউল্লাকে সরিয়ে দিয়ে তাঁর জায়গায় জেনারেল জিয়াউর রহমানকে সেনাপ্রধান নিযুক্ত করা হয়েছিল। তাতে বোঝা যায়, জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিশ্বাস অর্জনে সক্ষম হয়েছিলেন। তারপরও জিয়া সম্পর্কে আমার প্রত্যাশার অবসান না হওয়াটাকে কেউ কেউ যুক্তিহীন বলে আখ্যায়িত করেছেন। তাদের কথা হলো, ১৫ আগস্টের অব্যবহিত পর ইনফরমেশন গ্যাপের কারণে জিয়া সম্পর্কে আমার প্রত্যাশাকে কিছুটা সত্য বলে ধরে নিলেও, সেপ্টেম্বর-অক্টোবর পার হয়ে নভেম্বরে পৌঁছেও খুনিদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে তিনি বঙ্গবন্ধুর পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করবেন; জিয়া সম্পর্কে এমন কথা ভাববার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণই আর অবশিষ্ট ছিল না। জিয়া যে মোশতাক ও তাঁর সূর্যসন্তানদের খুব কাছের মানুষ——তা নাকি নানাভাবেই জানা যাচ্ছিল।
আমার মনে হয়, বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পরের ঘটনাপ্রবাহ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেবার কারণেই আমার ক্ষেত্রে আরও বড় রকমের একটি ইনফরমেশন গ্যাপ ঘটে থাকবে। এ কারণেই স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের পাঠক, মেজর জিয়া (পরে জেনারেল) সম্পর্কে আমার মোহভঙ্গ হয়েছিল অন্যদের চাইতে কিছু পরে। সে-কারণেই বঙ্গবন্ধুর অনুসারী হিসেবে আমার মনে জিয়ার পরমায়ু অন্যদের তুলনায় কিছুদিন বেশি স্থায়ী হয়েছিল।
খালেদ এবং জিয়ার মধ্যকার বন্ধুত্বের কথা আমি লোকমুখে শুনেছি। পাকিস্তানের কাবুল মিলিটারি একাডেমিতে তাঁরা একই সঙ্গে কর্মরত ছিলেন। যখন আমি জানতে পারলাম, জিয়া এই অভ্যুত্থানের সঙ্গে নেই—এবং বিগ্রেডিয়ার খালেদ জিয়াকে গৃহবন্দি করে রেখেছেন, তখন আমি খুবই দুঃশ্চিন্তায় পড়ে যাই। আমি ১৫ আগস্টের খুনি সৈনিকদের সম্পর্কে কিছুই জানতাম না। আমার মনে হয়েছিল, এরা সবাই পাকিস্তানপন্থী হবেন। কিছুসংখ্যক লোক দেখানো মুক্তিযোদ্ধা এদের সামনে থাকলেও, পাকিস্তান ফেরত প্রবীণ সৈনিক এবং মুসলিম লীগের কিছু রাজনীতিবিদ নিশ্চয়ই এদের পেছনে লুকিয়ে আছে। সময় ও সুযোগ বুঝে তারা ধীরে ধীরে আত্মপ্রকাশ করবে। জিয়া ও খালেদের মতো মুক্তিযোদ্ধারা যদি ১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বরের অভিন্ন-খুনিদের বিরুদ্ধে একজোট হতে না পারে, তবে বঙ্গবন্ধুর অনুসারীদের পক্ষে পুনরায় জয়ের ধারায় ফিরে আসতে পারাটা খুবই কঠিন হবে। মাঝখান থেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিটি দুই ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়বে।
