রক্তঝরা নভেম্বর ১৯৭৫ – ৩
৩
বঙ্গবন্ধু ও চার জাতীয় নেতার খুনিদের পক্ষে আমেরিকা-চীন- লিবিয়া-সৌদি আরব যতটা আছে- খুনিদের বিরুদ্ধে ভারত বা সোভিয়েত ইউনিয়ন ততটা পজেটিভলি নেই। তাই পরিবর্তিত বিশ্ব- পরিস্থিতিটা এই মুহূর্তে আমাদের অনুকূলে নেই। তাছাড়া, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) গঠন করা এবং চারটি পত্রিকা রেখে বাকি সমস্ত কাগজ বন্ধ করে দেবার কারণে, দেশের মানুষও কিছুটা বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে গিয়েছিল। মানুষ ভালো করে বুঝে উঠতে পারছিল না, বাকশাল গঠন করে বঙ্গবন্ধু আসলে কী করতে চেয়েছিলেন। আওয়ামী লীগ ভেঙ্গে গিয়েছিল ঠিকই কিন্তু দেশের সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বয়ে গঠিত বাকশাল তখনও ক্ষতস্থানকে প্রোটেক্ট করার মতো শক্ত চামড়া নিয়ে গড়ে উঠতে পারেনি। বঙ্গবন্ধুর অনুসারীদের ঐ-রূপ অসংগঠিত অবস্থার মধ্যে খুনিরা ১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বরের ঘটনার নজিরবিহীন নিমর্মতার সুফলও ভোগ করছিল উপরি- পাওয়া হিসেবে। আমার মতো অনেকেই তখন ভয়ে হোক, ঘৃণায় হোক বা অক্ষম অভিমানেই হোক নিজের ভিতরে সেঁধিয়ে গিয়েছিল। আপনা থেকে বাহির হয়ে ঘৃণার কৃপাণ হাতে খুনির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার শক্তি তখনও অনেকেই সঞ্চয় করে উঠতে পারেনি। যেহেতু আমি অভ্যুত্থানের সঙ্গে মনে-মনে নিজেকে যুক্ত করে ফেলেছিলাম, সেহেতু অভ্যুত্থানটিকে খুব ধীর গতিতে অগ্রসর হতে দেখে আমি খুব ভীত হয়ে পড়ি। চারদিকে আতঙ্ক। কী হবে না হবে তা কেউ-ই বলতে পারছে না। সংশয় সর্বত্র পাখা মেলে আছে। বিদেশি সংবাদ মাধ্যমই তখন আমাদের প্রধান সংবাদ ভরসা। সারাক্ষণ রেডিও খুলে আমি আর মহাদেব বাসায় বসে থাকি। জিয়া যে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করার প্রশ্নে খালেদ ও শাফায়েত জামিলের সঙ্গে একমত নন, তা ক্রমশ আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে আসে। জিয়ার দিকে আমার খুব রাগ হয়। আমার মনে হয় জিয়া ভুল করছেন। জিয়ার প্রতি আমার যে বিশ্বাস ছিল তা দ্রুতই ভেঙে যেতে থাকে।
ব্রিগেডিয়ার খালেদকে নিয়েও আমার মনে সংশয় দেখা দেয় দুটো কারণে।
১. ১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বরের জেল হত্যার সঙ্গে যুক্ত সামরিক অফিসারদের তিনি দেশ থেকে নির্বিবাদে পালিয়ে যেতে দিলেন কেন?
(পরে জেনেছিললাম, খালেদ মোশাররফ জেল-হত্যার বিষয়টি সময়মতো জানতেন না। মিসেস মোশাররফ খালেদের প্রদত্ত তথ্যানুযায়ী, খালেদ মোশাররফ পরদিন ৪ নভেম্বর জেলখানায় নিহত চার জাতীয় নেতাকে দেখতে যান। তথাকথিত ‘সূর্যসন্তানদের সঙ্গে যখন খালেদ মোশাররফের প্যাকেজ ডিল হয়, তখন জেল-হত্যার বিষয়টি সম্পর্কে অবগত থাকার পরও জেনারেল ওসমানী, মেজর জেনারেল খলিলুর রহমান এবং তৎকালীন ডিআইজি অব পুলিশ ই.এ. চৌধুরী খালেদের কাছ থেকে ঐ তথ্যটি গোপন করেছিলেন।)
২. তিনি যদি আওয়ামী লীগের সমর্থকই হবেন, তবে জেলে নিহত জাতীয় চার নেতাকে সম্মানের সঙ্গে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের নিকটবর্তি তিন-নেতার কবরের পাশে কবর দেবার ব্যবস্থা করলেন না কেন? আমার স্পষ্ট মনে আছে, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পাশে তিন নেতার কবরের দক্ষিণের ফাঁকা জায়গাটিতে চার নেতাকে মর্যাদার সঙ্গে সমাহিত করার জন্য চারটি কবর খোঁড়া হয়েছিল। আমি ঐ খোঁড়া কবরগুলোকে চোখে চোখে রাখছিলাম। অপেক্ষা করছিলাম, কখন ঐ চার নেতার লাশ এখানে আনা হবে। আমার খুব ইচ্ছে ছিল চার নেতার দাফনে শরিক হবার। তাঁদের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করার। কিন্তু আমার সে ইচ্ছে সেদিন পূরণ হয়নি। সন্ধ্যার পরও নেতাদের লাশ সেখানে আনা হয়নি। পরে খোঁড়া কবরগুলো মাটি দিয়ে পুনরায় ভরাট করে ফেলা হয়।
পরে, ৫ নভেম্বর সন্ধ্যায়, চার নেতার মধ্যে তিন নেতাকে বনানী কবরস্থানে বঙ্গবন্ধু এবং সেরনিয়াবাতের পরিবারের নিহত-সদস্যদের পাশেই দাফন করা হয়। শহীদ কামরুজ্জামানের লাশ রাজশাহীতে তাঁর পারিবারিক গোরস্থানে দাফন করা হয়।
ঘটনাদৃষ্টে মনে হয়, ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের বলি হয়েছেন এই চার জাতীয় নেতা। সেনাবাহিনীর মধ্যে ‘চেইন অব কমান্ড’ প্রতিষ্ঠিত হলে ভেঙ্গে পড়া সাংবিধানিক চেইন অব কমান্ডও যে স্বাভাবিকভাবেই পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে—, সে-কথা বুঝতে পেরেই জেলের ভিতরে বন্দি চার নেতাকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল মোশতাক এবং তার সহযোগীরা সেনাবাহিনীতে চেইন অব কমান্ড প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ না নিলে, ঐ চার নেতা হয়তো বেঁচে যেতে পারতেন তাই বলতে হয়, ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানকারীরা জেলের ভিতরে বন্দি চার জাতীয় নেতার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যাপারটিকে অগ্রাধিকার না দিয়ে সেদিন অদূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছিলেন। পরে, ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের পরোক্ষ বলি, জাতীয় চার নেতাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তিন নেতার কবরের পাশে কবর না দেয়ার বিষয়টিও আমাকে খালেদ মোশাররফ ও তাঁর সহযোগীদের রাজনৈতিক বিশ্বাস সম্পর্কে কিছুটা সন্দিহান করে তুলেছিল। মর্যাদাপূর্ণ ঔ জায়গাটিতে চার নেতাকে সমাহিত করার পথে কোথায় বাধা ছিল—তা আমরা বুঝে উঠতে পারিনি। আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে, তবে কি সামরিক বাহিনীতে চেইন অব কমান্ড পুনঃপ্রতিষ্ঠার ‘সীমিত লক্ষ্য’-কে সামনে নিয়েই খালেদ মোশাররফ এই অভ্যুত্থান ঘটিয়েছিলেন? দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে অপটু একজন দুর্বলচিত্তের জেনারেল হিসেবে খালেদ যখন চিহ্নিত হতে চলেছেন, তখন আমাদের কানে আসে কর্নেল শাফায়েত জামিলের নাম। আমরা শুনতে পাই, শাফায়েত জামিল বঙ্গভবনে গিয়ে খুনি মোশতাককে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছিলেন। তখন জেনারেল ওসমানী সাহেব বুক পেতে মোশতাকের সামনে দাঁড়িয়ে শাফায়েত জামিলের রুদ্ররোষ থেকে মোশতাককে প্রাণে রক্ষা করেন এমন ঘটনার কথা তখন প্রেসক্লাবে শোনা যাচ্ছিল। সেদিন ‘নো মোর ব্লাড’ তত্ত্ব হাজির করে ওসমানী সাহেব মোশতাকসহ বঙ্গবন্ধুর খুনিদের রক্ষাকর্তা হিসেবে আবির্ভুত হওয়ার সংবাদ শুনে আমাদের খুবই খারাপ লেগেছিল।
একসময় জাসদের পত্রিকা গণকণ্ঠে কাজ করেছি। জাসদের অনেক নেতার সঙ্গে চেনাজানা আছে। ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে প্রেসক্লাবে তাদের অনেককেই খুব তৎপর বলে মনে হলো। তখন একটা জিনিস লক্ষ্য করেছিলাম, ঐ অভ্যুত্থানের পক্ষে বা বিপক্ষে কেউই খুব সরব ছিলেন না। একটা অনিশ্চিয়তা আমার ও মহাদেবের মতো অন্য অনেকের মনকেই ঘিরে রেখেছিল। জাসদের অনেক বন্ধুকে তখন খালেদের বিরুদ্ধে তৎপর হতে দেখছিলাম—তার অর্থ যে ঐ ঘটনার ভিতরে কর্নেল তাহেরের সম্পৃক্ততার সূচক, তা আমরা জানতাম না। তবে ঐ অভ্যুত্থানকে ভারতীয় স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত করে প্রচার চালানোর বিষয়টি যে খুবই কৌশলের সঙ্গে করা হচ্ছিল— তা আমি এবং মহাদেব বুঝতে পারছিলাম এ কারণে যে, আমাদের কাছে ঘেঁষতে দেখে প্রেসক্লাবের অনেক টেবিল-আলাপ বন্ধ হয়ে যেতো। এবং আমাদের দিন অর্থাৎ হিন্দুদের দিন এসে গেছে বলে কেউ কেউ আমাদের বিদ্রুপ করতেন। ঐ অভ্যূত্থানের সঙ্গে আমাদের বিন্দুমাত্র সম্পর্ক না থাকার পরও—এমন মন্তব্যকারীদের সঙ্গেও আমাদের এমন সৌজন্যমূলক আচরণ করতে হতো যে, সত্যিই তাই। এবং আমরা দু’জন এ-কারণে সংশ্লিষ্ট সকলের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী।
৭২ ঘণ্টা চলে যাবার পরও ব্রিগেডিয়ার থেকে জেনারেল ও সেনাবাহিনীর প্রধান (জিয়াকে সেনাপ্রধানের পদ থেকে সরিয়ে দেয়া হয়) পদে উন্নীত খালেদ মোশাররফ যখন বেতার বা টিভি ভাষণের মাধ্যমে তাঁর এ্যাকশনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে দেশবাসীকে কোনো কিছুই বোঝাতে পারলেন না, তখন তাঁর বিরুদ্ধপক্ষের প্রচারণাকেই মানুষ সত্য বলে ধরে নিতে শুরু করলো। ভিতর থেকে বন্দি জেনারেল জিয়ার নিষ্ক্রিয় অসহযোগিতা এবং বাইরে থেকে কর্নেল তাহেরের সক্রিয় প্রতিরোধের কারণে, তিনি যে সেনাবাহিনীকে নিজের অনুকূলে আনতে ব্যর্থ হয়েছেন— সেকথা আমরা যারা তাঁর সমর্থক, তারা ভয়ে ভয়ে ভাবতে থাকলাম বটে—কিন্তু সাধারণ মানুষ ষড়যন্ত্রকারীর নীরবতার সঙ্গেই খালেদের নীরবতার মিল খুঁজে পেলো।
বঙ্গবন্ধুহীন বাংলাদেশের প্রতি ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি কী হবে— তা আমাদের জানা ছিল না। ফলে, আমরাও খুব আশঙ্কার মধ্যে ছিলাম।
বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর থেকেই মানুষ ভারতের দিকে এক চোখ সতর্ক রেখেছিল। ১৫ আগস্টের ‘সূর্যসন্তানদের’ শায়েস্তা করার লক্ষে গৃহীত খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানের পর ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী চুক্তিটি নিয়ে দেশের মানুষের মধ্যে আশঙ্কাভাব আরও বৃদ্ধি পায়। মনে হতে থাকে, এই বুঝি ভারতীয় সেনারা ঢাকা ঢুকে পড়লো। এই বুঝি আকাশ পথে ছুটে এলো ভারতীয় বিমান। এরকম সম্ভাবনার কথাই তখন চারদিকে প্রচারিত হতে থাকে। ঐ সংগঠিত প্রচারণার মোকাবিলা করার শক্তি তখন, আগেই বলেছি, বঙ্গবন্ধুর অসংগঠিত অনুসারীরা অর্জন করতে পারেননি। আমি আর মহাদেব তখন রাত জেগে এরূপ ভাবতে বাধ্য হই—ভারত যদি রাজনৈতিক কোনো উচ্চাভিলাষ থেকে বাংলাদেশের এই সংকটের মধ্যে জড়িত হয়ে ফায়দা লুটতে চায়, বা ভগবান না করুন, অন্য কোনো কারণেও জড়িত হয়ে পড়ে, তাহলে বাংলাদেশের হিন্দুরাই তার প্রথম বলি হবে। আমরা প্রার্থনা করি, খুনিচক্র ও তাদের স্বাধীনতা বিরোধী সমর্থকদের হাতে বাংলাদেশের নিরীহ হিন্দুদের জিম্মি করে ভারত যেন এমন কাজ কখনও না করে।
আমাদের প্রার্থনাই সত্য হয়। ভারত আমাদের কথা রাখে। বঙ্গবন্ধুকে বাঁচাতে যেমন ভারত কোনো ভূমিকা রাখেনি: খালেদ মোশাররফকে বাঁচানোর জন্যও ভারত কোনো ভূমিকা রাখে না। অথচ ভারত-জুজুর ভয় দেখিয়েই খালেদের বারোটা বাজিয়ে দিতে সক্ষম হয় খালেদের বিরুদ্ধবাদীরা। খালেদের হাত থেকে দেশকে উদ্ধার করা আর ভারতের হাত থেকে দেশকে মুক্ত করা সমার্থক—এমন প্রচারিত বাস্তবতার মধ্যে খালেদের পক্ষে জয়ী হওয়া তখনই সম্ভব যদি সত্যি- সত্যিই ভারত তাঁর পাশে এসে দাঁড়াতো। কিন্তু তা আর সম্ভব ছিল না। কেননা আমরাই তো একইসঙ্গে খালেদের জয় এবং নিজেদের নিরাপত্তা কামনা করছিলাম। আমাদের নিজেদের অস্তিত্বের স্বার্থেই আমরা তখন ভারতীয় অনুপ্রবেশের ভয়ে ভীত। ঐরকমের হাত-পা বাঁধা অবস্থায় খালেদ মোশাররফ ও তার সহযোগীদের জন্য তখন আমাদের বুকের ভিতরে এক ধরনের মায়া তৈরি হয়। ভাবি, কী প্রবল দুশ্চিন্তার মধ্যেই না অভ্যুত্থানের ঐ নেতারা প্রহর গুনছেন। তাঁদের একটি মহৎ প্রয়াস কী করুণ পরিণতির পথেই না এগিয়ে চলেছে। বিবিসি-র রাতের খবরে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে খালেদের পাল্লা ভারী বলে বলা হলেও আমাদের মনের সংশয় তাতে দূর হয় না। আমরা উদ্বেগ নিয়েই ৬ তারিখ রাতে ঘুমাতে যাই।
আমাদের সমগ্র সত্তাকে ভয়ে কাঁপিয়ে দিয়ে, বিগত বিনিদ্রপ্রায় রজনীর সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে, ৭ই নভেম্বরের ভোর আসে। পিলখানার ভিতর থেকে রাইফেলের গুলি ছুঁড়তে-ছুঁড়তে, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনাপূর্ণ শ্লোগান ছড়িয়ে বেরিয়ে আসে জোয়ানরা। তাদের কণ্ঠে ‘নারায়ে তকবির আল্লাহু আকবর’ ধ্বনি। সারা আজিমপুর জেগে উঠে উল্লাসে। সেই উল্লাস সারা শহরে ছড়িয়ে পড়ে। ছড়িয়ে পড়ে পরাজিত জেনারেল খালেদের হাত থেকে জেনারেল জিয়ার ক্ষমতা উদ্ধারের সংবাদ। জিয়া গৃহবন্দি হওয়ার পর মোশতাক ক্ষমতা হারিয়েছিলেন। খালেদ-শাফায়েত খুনি মোশতাককে হটিয়ে প্ৰধান বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে রাষ্ট্রপতি করেছিলেন। মোশতাকসহ বঙ্গবন্ধুর খুনিদের সঙ্গে জেনারেল জিয়ার যে দূরত্বটুকু এতদিন বজায় ছিল; ৭ নভেম্বরে সকালের আলো ফুটবার সঙ্গে সঙ্গেই তা ঘুচে যায়। তখন জিয়া ও মোশতাকের অনুগত সৈনিক ও বঙ্গবন্ধু বিরোধী নগরবাসীর মুখে-মুখে জিয়ার পাশাপাশি মোশতাকের নামেও জয়ধ্বনি ওঠে। জিয়া-মোশতাক ভাই ভাই। চারদিকে ভারতের হাত থেকে দেশটিকে এইমাত্র মুক্ত করা হয়েছে—এমন মনোভাব প্রকাশিত হতে থাকে। আমরা বাইরে গিয়ে বিডিআর থেকে বেরিয়ে যাওয়া সৈনিকদের বিজয় উল্লাস দেখবার সিদ্ধান্ত নিই। তখনই ‘ভারত-রাশিয়ার দালালেরা হুশিয়ার সাবধান’ বলে আমাদের থামিয়ে দেয়া হয়। আমরা ৪ নভেম্বরের মৌন-মিছিলে অংশ নিয়েছিলাম। মনে-মনে মোশতাক ও জিয়ার বিনাশ কামনা করেছি। সুতরাং আমরা ঘরের মধ্যে বসে থাকলাম। আমাদের রক্তশূন্য ভীত মুখ দেখে মহাদেবের স্ত্রী নীলা আমাদের ঘরের বাইরে না যাবার পরামর্শ দিলো। কিন্তু আমি স্থির করলাম, আমি যাবো। না গেলে আমার বিপদ হতে পারে। ঐ দিনই দুপুরে রেডিওতে আমার কবিতা পড়ার কথা। আগের দিন আমি অনুষ্ঠানের প্রযোজকের কাছে আমার কবিতা জমা দিয়ে এসেছি। আমার জমা দেয়া কবিতাগুলোতে ১৫ আগস্টের ঘটনার শোকাচ্ছন্নতা রয়েছে। প্রিয়জন-হত্যার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার প্রস্তুতি গ্রহণের কথাও বলা হয়েছে। আমার কবিতাগুলো ছিল— ১. যীশু ক্রশ। ২. প্রস্তুতি। (পরে ঐ কবিতা দুটো ‘ও বন্ধু আমার’ [প্রকাশকাল : ডিসেম্বর ১৯৭৫] নামক কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত হয়।) অন্য কবিতাটির কথা মনে নেই। তিনটি কবিতা আমি জমা দিয়েছিলাম ভাবলাম, এখন আমি যদি ঐ কবিতাগুলো পড়তে না যাই, তবে ভাবা হতে পারে যে, আমি খালেদ মোশাররফের ক্যু’র প্রশ্রয়েই এই কবিতাগুলো লিখেছিলাম। এখন খালেদ পরাজিত হওয়াতে আমি ভয় পেয়ে গেছি। তাই কবিতা পড়তে যাইনি। অথচ আমার এ-কবিতাগুলো আমি লিখেছিলাম আমার গ্রামের বাড়িতে বসে। আমার কবিতাগুলোর উৎসশক্তি সম্পর্কে ভুল ধারণা পোষণ করা হোক—আমি তা হতে দিতে পারি না। তাই মহাদেব এবং নীলার নিষেধ সত্ত্বেও আমি দুপুর বারোটার দিকে শাহবাগের দিকে যাই। স্থির করলাম পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রেডিওতে আমার কবিতা যদি পড়তে পারি তো পড়বো—তারপর আমার কবিবন্ধু আবুল হাসানকে পিজিতে দেখতে যাবো। ৪ নভেম্বর অসুখ বেড়ে যাওয়ার কারণে আবুল হাসান পিজি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।
রেডিওতে যাবার পথে উল্লাসরত সৈনিক ও জনতার ট্রাকমিছিল এবং রাজপথে কিছু ট্যাংক চলতে দেখা গেলো। সিপাহী-জনতা ভাই ভাই শ্লোগানটি তখনই এক দুবার শুনলাম। তারা কেউ কেউ আমাকেও মিছিলে যোগ দিতে ডাকলো; কিন্তু আমি গেলাম না। আমি গেলাম রেডিও অফিসে। সেখানে গিয়ে দেখি এলাহি কান্ড। ট্যাংক নিয়ে সৈনিকেরা ঘিরে রেখেছে রেডিও অফিসটি। আমি বুকে সাহস সঞ্চয় করে গেটের দিকে এগিয়ে গেলাম। দোতলায় দাঁড়িয়ে, আমাকে রেডিওতে ঢুকতে দেখে আমার প্রযোজক একজন পিয়নকে আমার কাছে পাঠালেন। আমি তাঁকে চিনতাম না, কিন্তু তিনি আমাকে চিনতেন। তিনি আমার কাছে এসে আমাকে টেনে গেটের বাইরে নিয়ে গেলেন।
বললেন, দাদা, আপনার কি মাথা খারাপ হয়েছে?
আমি বললাম কেন, আমি আমার কবিতা পড়তে এসেছি। আমার তো প্রোগ্রাম আছে দুপুরে।
তিনি বললেন, আপনার নিশ্চয়ই মাথা খারাপ হয়েছে। আপকি কি দুনিয়াদারির কোনো খবর রাখেন না নাকি?
আমি বললাম, কেন? কি খবর?
তিনি জানালেন, প্রেসিডেন্ট খন্দকার মোশতাক এখন রেডিওর ভিতরে আছেন। তিনি এসেছিলেন জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিতে। কিন্তু কর্নেল তাহের তাঁকে কিছুতেই ভাষণ দিতে দেবেন না। তিনি মোশতাককে টয়লেটের মধ্যে বন্দি করে রেখেছেন। সবাই এখন জিয়ার জন্য অপেক্ষা করছে। আপনি তাড়াতাড়ি বাসায় চলে যান। কখন কী হয় কিছু বলা যায় না। আপনি নিজেও মরবেন, আমাদেরও মারবেন।
ডুবন্ত মানুষ যেমন খড়কুটোকে আশ্রয় করে বাঁচবার শেষ- চেষ্টা করে, আমার অবস্থাও অনেকটা সেরকম। খালেদ মোশাররফের ওপর বাজি ধরে হেরে যাবার পর— আমি এবার বাজি ধরলাম কর্নেল তাহেরের নামে। তাহের মোশতাককে পায়খানার মধ্যে আটকে রেখেছেন, তাকে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিতে দেননি ঐ আনন্দ সংবাদটি শুনে আমার খুব ভালো লাগলো। ঐ কথা শুনে আমি কর্নেল তাহেরকে মনে মনে খুবই তারিফ করলাম। আমার বাড়ি নেত্রকোনায়। তাহেরও নেত্রকোনার মানুষ। ভাবলাম, এই যুদ্ধে তাহের জিতলেও মন্দ হয় না।
৩ নভেম্বর বঙ্গভবনে আয়োজিত এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে একই সঙ্গে জেনারেল এবং সেনাবাহিনীর প্রধানের পদে উন্নীত হওয়ার সময় খালেদ মোশাররফ ঘুনাক্ষরেও ভাবতে পারেননি যে, তাঁর জেনারেলের ব্যাজ সম্বলিত এই পোশাক এবং সেনাপ্রধানের নতুন পদটি— এতটাই ক্ষণস্থায়ী হবে। মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে, ক্ষমতার দ্বন্দ্বে পরাভব মেনে, ঐ পোশাক ছেড়ে সিভিল পোশাক পরিধান করে তাঁকে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটতে হবে জীবন বাঁচানোর জন্য। তিনি তাঁর দুই বিশ্বস্ত সহযোগী কর্নেল নাজমুল হুদা এবং লে. কর্নেল হায়দারকে নিয়ে ভোরের দিকে শেরে বাংলা নগরস্থিত ১০ম বেঙ্গল রেজিমেন্টে গিয়ে আশ্রয় নেন। জেনারেল খালেদ হয়তো ভেবেছিলেন, তিনি যেমন গত চারদিন ধরে জেনারেল ওসমানী সাহেবের ‘আর রক্ত নয়’ দর্শনটি অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলেছেন, তেমনি অভ্যুত্থানজয়ী জেনারেলরাও নিশ্চয়ই ঐ ওসমানী- দর্শন মেনে চলবেন। তাই তিনি শেরে বাংলা নগরের ১০ম বেঙ্গল রেজিমেন্টে আশ্রয় নিয়েছিলেন আত্মবিশ্বাস থেকে। ঐ রেজিমেন্টটি মুক্তিযুদ্ধকালীন ‘কে’ ফোর্সের সদস্যদের নিয়ে গঠিত ছিল। কিন্তু হায়রে বিশ্বাস। মোশতাককে বাঁচানোর জন্য বঙ্গভবনে যেমন ওসমানী সাহেব সর্বদা উপস্থিত ছিলেন, খালেদ ও তাঁর সহযোগীদের বাঁচানোর জন্য শেরে বাংলা নগরে সেরকম কোনো ওসমানী উপস্থিত ছিলেন না। ফলে, ৭ নভেম্বর সকাল ১১ টার দিকে ঊর্ধ্বতন সামরিক অফিসারের নির্দেশমতো অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় নিম্নস্তরের সামরিক অফিসাররা গুলি ও বেয়নেট চার্জ করে ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের নেতৃত্বদানকারী তিন বীর- মুক্তিযোদ্ধাকে নির্মমভাবে হত্যা করে।
[সূত্র : কর্নেল (অবঃ) শাফায়েত জামিল, ভোরের কাগজ, ৭ নভেম্বর ১৯৯৬]।
আমি অবশ্য শুনেছিলাম যে, ক্যান্টনমেন্টের কাছেই, এখানকার আর্মি স্টেডিয়ামের সামনে, পথের ওপর খেজুর গাছের নিচে খালেদ মোশাররফের লাশ পড়ে আছে। কারাগারে নিহত জাতীয় চার নেতার লাশ যথার্থ মর্যাদায় শেরে বাংলা ও সোহরাওয়ার্দীর কবরের পাশে দাফন না করার জন্য দু’দিন আগে যাকে অভিযুক্ত করেছিলেন, দু’দিন পর তাঁর লাশ রাস্তার ওপর পড়ে থাকার সংবাদ শুনে আমি সেই অভিযোগ প্রত্যাহার করে নিলাম। বুঝতে পারলাম, অভ্যুত্থান করলেও, তিনি সেনাবাহিনীর ভিতরের পরিস্থিতিকে পুরোপুরি নিজ-নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেননি। অভ্যুত্থান-উত্তর সেনাবাহিনীর মধ্যকার বেসামাল অবস্থার কাছে তিনি খুবই অসহায় হয়ে পড়েছিলেন। তাই চার নেতাকে বনানীতে পাঠিয়ে দিয়ে হয়তো প্রমাণ করতে চেষ্টা করেছিলেন যে, আওয়ামী লীগের নেতাদের প্রতি তাঁর বিশেষ কোনো দুর্বলতা নেই। বঙ্গবন্ধুর রুহের মাগফেরাত কামনা করার জন্য সংগ্রামী ছাত্র সমাজ কর্তৃক আয়োজিত ৪ নভেম্বরের মৌন মিছিলের সঙ্গে তাঁর মা ও ভাইয়ের সম্পর্ক থাকলেও, তাঁর নিজের কোনোরূপ সম্পর্ক ছিল না— এটি প্রমাণ করাটাও হয়তো তাঁর জন্য তখন জরুরি হয়ে পড়েছিল। দু’দিনের ব্যবধানে তাঁকেও যে ঐ বনানী কবরস্থানে, চার জাতীয় নেতার পাশেই অন্তিম-শয়নে শায়িত হতে হবে, তা অন্তরাল থেকে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেন যে ঈশ্বর, তিনি ছাড়া কে আর ভাবতে পেরেছিলো। আমার কী যে খারাপ লাগলো। আমার বুকের ভিতরটা গোপনে কেঁদে উঠলো। কেঁপে উঠলো। হায় কী দুর্ভাগ্য! আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের এ কী করুণ পরিণতি। হা ঈশ্বর, তাঁরা কি এভাবেই এক এক করে শেষ হয়ে যাবেন?
খালেদকে সহায়তা করার জন্য রংপুর ক্যান্টনমেন্ট থেকে ঢাকায় ছুটে এসেছিলেন কর্নেল নাজমুল হুদা। মেজর হায়দার (পরে লে. কর্নেল) বিমান বাহিনীর এ আর খন্দকারের সঙ্গে পাকিস্তান বাহিনীর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে মুক্তিবাহিনীর প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন রেসকোর্সে, ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরে। তিনি ছুটিতে থাকা অবস্থায় ঢাকায় খালেদের সঙ্গে দেখা করতে এসে ঘটনার ভিতরে জড়িয়ে পড়েছিলেন। নিশ্চিত পরাজয়ের মুখে বন্ধু খালেদের সঙ্গ আর ত্যাগ করতে পারেননি। একেই বলে বন্ধুত্বের টান।
রেডিও থেকে বেরিয়ে, আমি আমার বন্ধু আবুল হাসানের টানে তার সঙ্গে দেখা করার জন্য পিজি হাসপাতালে যাই। হাসান খুবই অসুস্থ। তাঁর শেষ-জীবনের বান্ধবী কবি সুরাইয়া খানম তখন পিজিতে হাসানের দেখাশোনা করছিল। সুরাইয়া কবিতা লিখতো এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে শিক্ষকতা করতো। শামসুন্নাহার হলের হাউস টিউটরও ছিলো। হাসানের কাছে তখন আর কে ছিল, ঠিক মনে পড়ছে না। হাসানের আম্মা এবং ওর বোন বুড়িও হয়তো ছিল।
আমার কাছে লেখা হাসানের শেষ চিঠিতে হাসান তাঁর বান্ধবী সুরাইয়া সম্পর্কে লিখেছিল…’ঐ শ্রীমতীও এখন আর আমাকে একাকীত্ব দিতে পারেন না।’
[ দ্র: আবুল হাসানের শেষ চিঠি : সচিত্র সন্ধানী : ২৬ নভেম্বর ১৯৭৮ ]
সুরাইয়া কি জানতো তাঁকে নিয়ে হাসানের ঐ উপলব্ধির কথা? হয়তো জানতো না ঠিক, তবে বুঝতে পারতো। আমার আর হাসানের অন্তর্গত সম্পর্কের গভীরতাটুকু সুরাইয়ার না জানার, বা না বোঝার কোনো কারণ ছিল না। ফলে, হাসানের কাছ থেকে সে আমাকে যতটা সম্ভব দূরে রাখার চেষ্টা করতো।
সুরাইয়া ছিল মুজিব-বিরোধী। বাইরে একটু বিদ্রোহী ভাব থাকলেও মনে-মনে আমি ছিলাম খুবই মুজিবভক্ত। ষাটের দশকের শুরুতে, অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাজনীতির কারণে শেখ মুজিবকে ঘিরে আমার মধ্যে ঐ ভক্তি ভাবটার সৃষ্টি হয়েছিল। পরে, আমার ক্ষণস্থায়ী বিশ্ববিদ্যালয়-জীবনের সহপাঠিনীরূপে আবির্ভূতা মুজিবনন্দিনী আমার ঐ ভক্তিকে প্রেমে পরিণত করার ক্ষেত্রে পরোক্ষ ভূমিকা রাখেন। আমার কারণে কমবেশি আবুল হাসানও ঐ প্রেমে জড়িয়ে পড়েছিল। তবে, রাজনৈতিক অর্থে আবুল হাসানকে আমার মতো মুজিবভক্ত অবশ্যই বলা যাবে না। আসলে রাজনীতি সম্পর্কেই হাসানের এক- ধরনের নিরাসক্তি ছিল। হাসানের পিতা, একজন অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন। বিখ্যাত মুসলিম লীগ নেতা ঢাকার হাবিব ফকিরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। পার্টিশনের আগে কলকাতায় তাঁরা একসঙ্গে থাকতেন। পিতার সঙ্গে বন্ধুত্বের কারণেই আবুল হাসান ঢাকায় এসে প্রথমদিকে হাবিব ফকিরের বাসায় থাকতো। আমিও হাসানের সঙ্গে হাবিব ফকিরের বাসায় একাধিকবার রাত কাটিয়েছি। তাঁর মুসলিম লীগ ভাবাপন্ন পিতার সঙ্গে অগ্রবর্তি সময়ের মতাদর্শগত বিরোধ এড়াবার জন্যই কি হাসান রাজনীতি থেকে নিজেকে গুটিয়ে রাখতো? কে জানে?
জানি, দুরারোগ্য ব্যধির চিকিৎসা-সুবিধার কথা বিবেচনা করেই বাকশাল হওয়ার পর আবুল হাসান বাকশালে যোগ দিয়েছিল। আবুল হাসান বাকশালের ওপর আস্থা স্থাপন করে বাকশালে যোগ দিয়েছিল, এমন নয়। আগের বছর, চিকিৎসার জন্য সরকারী আনুকূল্যে জিডিআর যাবার সময়ই আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে আবুল হাসানের একটা কৃতজ্ঞতার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী অধ্যাপক ইউসুফ আলী চিকিৎসার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে আবুল হাসানকে পাঁচ হাজার টাকা অনুদান দিয়েছিলেন, যা টিভি-সংবাদে প্রচারিত হয়েছিল।
কথাশিল্পী-সাংবাদিক জনাব রাহাত খান, বাংলা একাডেমীর তৎকালীন পরিচালক শামসুজ্জামান খান এবং সাহিত্যিক-রাজনীতিক মরহুম খন্দকার মুহম্মদ ইলিয়াস আমাকে বাকশালে যোগ দিতে অনুরোধ করেছিলেন—কিন্তু আমি বাকশালে যোগ দিইনি। আমার মনে হয়েছিল, বঙ্গবন্ধু বাকশাল গঠন করে একটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং অসময়োচিত পদক্ষেপ নিয়েছেন। বাকশাল গঠনের ভিতর দিয়ে তিনি তাঁর ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করতে চাচ্ছেন—আমার মনে হয়েছিল, ঐরূপ অভিযোগ তুলে বিরোধী মহল এখন মানুষকে বিভ্রান্ত করতে পারবে। বাকশাল গঠনের উদ্দেশ্য ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আমার নিজের মনেও কিছু সংশয় ছিল। তা ছাড়া, কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হওয়ার ব্যাপারে আমার মনের দিক থেকে সায় ছিল না। আমি ভাবতাম, এখনও ভাবি, বড় রকমের জাগতিক দায়িত্ব পালনের জন্যই কবির কর্তব্য হলো, ছোট ধরনের যাবতীয় দায়বদ্ধতা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা। কবির অবিনাশত্ব এবং সার্বভৌম-সয়ম্ভূতা সম্পর্কে আমি খুব তরুণ বয়স থেকেই ছিলাম অতিমাত্রায় সচেতন।
কবি শামসুর রাহমান এবং কবি মহাদেব সাহাও কাছাকাছি ধারণা পোষণ করতেন। তাঁরাও বাকশালে যোগদান করেননি। তবে ঐ দুজনের বাকশালে না-যোগদানের পটভূমি এক ছিল না। মহাদেব সাহা বঙ্গবন্ধুর ভক্ত ছিলেন। কিন্তু দৈনিক বাংলার পিকিংপন্থী রাজনৈতিক বৃত্তের ভিতরে বন্দি কবি শামসুর রাহমান, তখন পর্যন্ত ছিলেন মওলানা ভাসানীর ভক্ত।
অন্য প্রধান কবিদের মধ্যে কবি শহীদ কাদরী এবং আল মাহমুদ বাকশালে যোগ দিয়েছিলেন। শহীদ কাদরী তখন একটি মস্কোপন্থী ফিচার-সংস্থায় কাজ করতেন। তিনি বাকশালে বিশ্বাসও করতেন। আমার সঙ্গে ১৯৯৩ সালে আমেরিকায় দেখা হয়। ঐ বছর আমরা দু’জন একুশের একটি অনুষ্ঠানের অতিথি হয়ে নিউ ইয়র্কে গিয়েছিলাম অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করতে গিয়ে শহীদ কাদরী বাকশালের পক্ষে কথা বলেছিলেন।
কিন্তু আল মাহমুদের বাকশালে যোগ দেবার সংবাদ শুনে সবাই খুব অবাক হয়েছিল। জাসদের সঙ্গে সকল আদর্শিক সম্পর্ক চুকিয়ে দিয়ে, জেল থেকে মুচালেকা প্রদানের মাধ্যমে মুক্তিলাভ করার পরপরই বঙ্গবন্ধুকে গলায় ফুলের মালা পড়িয়ে আল মাহমুদ বাকশালে যোগ দেন। দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত আবুল হাসানের সরকারী আনুকূল্য লাভের বিষয়টিকে আমরা মানবিক সহানুভূতির দৃষ্টিতে দেখতাম। কিন্তু আল মাহমুদের বাকশালে যোগদানের সংবাদে আমরা খুবই কৌতুক বোধ করি। ন্যূনতম অ্যাকাডেমিক শিক্ষাগত যোগ্যতা ছাড়াই বঙ্গবন্ধু তাঁকে শিল্পকলা একাডেমীতে যে উপপরিচালকের চাকরিটি দিয়েছিলেন, বাকশালে যোগ না দেবার কারণে যদি ঐ চাকরিটি চলে যায়, ঐ রূপ কাল্পনিক ভয় থেকেই, মনে হয় আল মাহমুদ ঘটা করে বাকশালে যোগ দেন। তা ছাড়া তাঁর বাকশালে যোগদানের কোনো বিশ্বাসগত কারণ ছিল না। তিনি বঙ্গবন্ধু বা বাকশাল কোনোটাতেই বিশ্বাস করতেন না। তবে তাঁর ঐ বাকশালে যোগদান করার অন্য কোনো কারণ ছিল কি-না, তা আমাদের জানবার কথা নয়।
মনে পড়ে, ১৯৭৩ বা ৭৪ সালে চট্টগ্রামে আমরা কবিতা পড়তে গিয়েছিলাম। শামসুর রাহমান, শহীদ কাদরী, আল মাহমুদ, ফজল শাহাবুদ্দিন এবং আমি। রাতে চট্টগ্রাম পোর্টের ডাক্তার কামালের বাসায় আমাদের নৈশভোজের ব্যবস্থা ছিল। সঙ্গে ছিল সুরা। এক পর্যায়ে শামসুর রাহমানের সঙ্গে রাজনীতি নিয়ে আল মাহমুদের তুমুল তর্ক বেঁধে যায়। শামসুর রাহমান তর্কপটু মানুষ ছিলেন না। তাই শিল্পী দেবদাস চক্রবর্তী তখন শামসুর রাহমানের পক্ষ হয়ে আল মাহমুদের আক্রমণের জবাব দিতে উঠে দাঁড়ান। আল মাহমুদ যে রব-জলিলের খুঁটির জোরেই আজকাল এমন নর্তন-কুর্দন করছে— দেবুদা ঐ কথাটা জোরের সঙ্গে উত্থাপন করলো, কারও ভুলে যাবার কথা নয় ঐ নয়নমনোহর দৃশ্যটি, আল মাহমুদ তড়াক করে উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপতে একটি সোফার ওপর লম্ফ দিয়ে উঠে দাঁড়ান। তারপর, মুহূর্তমাত্র বিলম্ব না করে, শতকরা একশ’ ভাগ সাফল্যের সঙ্গে, পুরোপুরি সামরিক কায়দায় তাঁর তখনকার প্রিয় দুই নেতা রব-জলিলের উদ্দেশে স্যালুট নিবেদন করে বলেন,… ‘সেদিন খুব বেশি দূরে নয়, যেদিন সব ব্যাটাই রব-জলিলের নামে এইভাবে স্যালুট দেবে।’
