রক্তঝরা নভেম্বর ১৯৭৫ – ৮
৮
আনন্দের মধ্যে বিষাদের মতোই একটি প্রশ্ন মনে এলো আমার, আজ তো ছুটির দিন। রবিবার। আজ কোর্ট কোথায়? ডিআইজি সাহেব বললেন, সবকিছু ঠিক আছে। কোর্টের ছুটি থাকে না। আপনি এখুনি কোর্টে চলে যান। সেখানে একজন হাকিম অপেক্ষায় থাকবেন আপনার জন্য। আমাদের তো নিয়ম মেনে চলতে হবে। হাকিম ছাড়া আমরা আপনাকে ছাড়তে পারবো না। তিনি একজন পুলিশ অফিসারের জিপে আমাকে উঠতে বললেন, যিনি আমাকে কোর্টে নিয়ে যাবেন। কী জানি বাবা। আবার ভুল করলাম না তো? এখন তো কাগজে পত্রে আমি রমনা থানা থেকে মুক্ত। এখন আমি কোথায়? এখন আমাকে যদি?- তাহলে? আমি জিপে ওঠার সময় ডিআইজি সাহেব কাঁধে হাত রেখে আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, দুঃখ করবেন না কবি সাহেব, আপনি হলেন লেখক মানুষ। লেখার জন্য নানা রকমের অভিজ্ঞতা দরকার পড়ে। আপনি একসময় এই অভিজ্ঞতার কথা লিখতে পারবেন। দেশের জন্য মাঝে মাঝে এরকম কষ্ট করা ভালো।
আমি বললাম, নিশ্চয়ই, তাতে দেশ ও মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গাঢ় হয়। দেশের জন্য মানুষ অকাতরে প্রাণ দিচ্ছে। আমি তো সামান্য ক’দিন। এটা কোনো ব্যাপারই না। লেখার কথা বললেন? হ্যাঁ, লিখতে নিশ্চয়ই পারবো। কিন্তু আমি এই অভিজ্ঞতা নিয়ে কিছু লিখবো না। না লেখারই চেষ্টা করবো আমি। আমার লেখার বিষয় আরও অনেক আছে।
২১ বছর পর আজ ঐ কথাগুলো আমার খুব মনে পড়ছে। ডিআইজি ছিলেন একজন সত্যিকারের ভালো মানুষ। আমার প্রতি তিনি ছিলেন খুব সহানুভূতিশীল এবং শ্রদ্ধাশীলও। তাঁকে ঐ কথাটা আমি সেদিন কেন বলেছিলাম? মনে হয় মৃত্যু সম্ভাবনার সঙ্গে যুদ্ধ করে করে কষ্ট পাওয়ার অভিমান থেকেই আমি সেদিন রেগে গিয়ে কথাটা ঐরকম করে বলেছিলাম। যে কথা ভেবে আমি আজও অনুতপ্ত বোধ করি।
দুপুরে আমাকে ভাত দিতে গিয়ে রমনা থানার হাজতে আমাকে না পেয়ে শৈবালেন্দু চোখে অন্ধকার দেখে। সে দ্রুত মহাদেবের বাসায় ফিরে যায় এবং বাসাই ফিরেই হাউ-মাউ করে কাঁদতে শুরু করে। মহাদেবও খুবই দুশ্চিন্তার মধ্যে পড়ে যায়। আমাকে ছুটির দিনে কোর্টে নিয়ে যাওয়া হয়েছে— রমনা থানা পুলিশের ঐ কথায় তারা কেউই আস্থা স্থাপন করতে পারে না। ওরা ভাবে, কোর্টের নাম করে আমাকে নিশ্চয়ই ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এবং অদ্যই আমার শেষ-রজনী।
মহাদেব, মোস্তফা মীর আর শৈবালেন্দু তিনজন মিলে তখন বিষয়টি তদন্ত করে দেখার জন্য বিকেলের দিকে কোর্টে আসে। যার বন্ধু বা ভাই রক্তচক্ষু-সামরিক বাহিনীর সন্দেহবিদ্ধ— তার নিজের বিপদও কিছু কম ছিল না। ঝুঁকি নিয়েই তারা কোর্টে আসে এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা আমাকে আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়। আমার মতো অন্যান্য থানা থেকেও কিছু আসামি সেদিন কোর্টে এসেছিল। কিন্তু ছুটির দিন থাকায় হাকিম সাহেব সহজে কোর্টে আসছিলেন না। সূর্য ডোবার একটু আগে-আগে তিনি কোর্টে আসেন। তখন উকিলের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরি করে, আমাদের মহামান্য হাকিমের সামনে হাজির করা হলে, মাননীয় হাকিম আমার মুক্তিপত্রে সদয় স্বাক্ষর দান করেন।
কাঠগড়া থেকে সমতলে নামামাত্র মহাদেব, মোস্তফা মীর আর শৈবালেন্দু আমার দিকে দৌড়ে ছুটে আসে। আমিও মুক্তির আনন্দে আমার তিন রকমের, তিন বয়সের তিন শুভার্থীর দিকে ধাবিত হই।
কলেরা ইনজেকশন নেয়ার পর কলেরায় আক্রান্ত হওয়ার ভয় থেকে দেহ-মন যেমন মুক্ত হয়—, আমার সেরকমই নিজেকে নির্ভয় বলে মনে হতে থাকে। মনে এইরূপ প্রত্যয় আসে যে, অতঃপর আমাকে আর কেউ দেশদ্রোহী সন্দেহে গ্রেফতার করতে পারবে না। আমি দেশপ্রেমের ইনজেকশন নিয়ে এসেছি। একটা প্রচণ্ড রকমের ভূমিকম্পকে সহ্য করে, বাংলার মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকার সংগ্রামে আমি জয়ী হয়েছি।
পাঁচ দিনের বন্দিজীবনের ধকল সইতে না পেরে আমার স্বাস্থ্য ভেঙ্গে পড়েছিল। আমি এতো ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম যে, আমি প্রায় কথাই বলতে পারছিলাম না। আমার মাথার চুল কয়েক দিনের মধ্যেই অনেকটা পেকে গিয়েছিল। এমনিতেই আমার স্বাস্থ্য খুব ভালো ছিল না। শীতের সময় আমার সর্দিকাশি হতো। থানা হাজতের ঠান্ডা মেঝে ও স্যাতস্যাতে দেয়ালের একটি ছোট্ট ঘরের মধ্যে অপরিচিতসব হাজতিদের সঙ্গে বন্দি- বিনিদ্র রজনী যাপনের কারণে আমার বুকে কফ জমে যায়। আমি বাসায় ফিরেই শয্যা নিই। পাড়ার যারা আমাকে আর দেখা যাবে না বলে আশংকার মধ্যে ছিলেন, তারা অনেকেই আমাকে দেখতে আসেন। আমার হয়ে মহাদেবই তাদের সঙ্গে কথা বলে। অনেকদিন পর আমি আমার বিশ্বস্ত-বন্ধুর গৃহে নিশ্চিন্তে ঘুমাই।
ঐ দিন আমি আর পিজিতে যাই না। মহাদেব পিজিতে গিয়ে আবুল হাসানকে আমার ফিরে আসার সুসংবাদটি জানায়। আবুল হাসান আমার ভবিষ্যৎ-চিন্তায় খুবই দুর্ভাবনার মধ্যে ছিল। মহাদেবের মুখে আমার মুক্তির খবর পেয়ে হাসান খুব খুশি হয়। মহাদেব রাতে বাসায় ফিরে এলে আমি তার কাছে আবুল হাসানের স্বাস্থ্যের খোঁজ নিই। মহাদেব জানায়, হাসানের অবস্থার খুব একটা উন্নতি হচ্ছে না। ডাক্তাররা ওর ব্যাপারে খুব একটা কার্যকর কিছু করতে পারছেন না।
পরদিন আমি নিজেকে দেখাতে এবং আবুল হাসানকে দেখতে পিজিতে যাই। হাসান পিঠের তলে বালিশ দিয়ে হাসপাতালের শুভ্র- শয্যায় শুয়ে ঘন-ঘন শ্বাস টানছিল। বুক ওঠা নামা করছে। বুঝতে পারছিলাম তার শ্বাস নিতে খুব কষ্ট হচ্ছে। আমাকে দেখেই হাসান বিছানায় উঠে বসতে চায়। আমি ছুটে গিয়ে বিছানায় উবু হয়ে ওর বুকের সঙ্গে বুক মিলাই। আমার মুক্তিতে হাসানকে দায়মুক্ত বলে মনে হয়। সে আমার ঐ ক’দিনের অভিজ্ঞতা জানতে আগ্রহ প্রকাশ করলে, আমি বলি, আমি বেশ ভালোই ছিলাম। পুলিশের হাতে আমি টর্চার হয়েছি কি-না, তা-ও সে জানতে চায়। আমি বলি, না। আমাকে টর্চার না করার জন্য কর্নেল নোয়াজেশ পুলিশের প্রতি যে নির্দেশ দিয়ে গিয়েছিলেন ঐ নির্দেশটি যে যথাযথভাবে পুলিশ পালন করেছিল, তা শুনে হাসান খুশি হয়।
ফিরে আসার সময় হাসানকে আশায় উদ্বুদ্ধ করার উদ্দেশ্যেই বলি, আমি যখন মুক্তি পেয়ে যমের ঘর থেকে এসেছি, তুমিও ভালো হয়ে যাবে। দেহের বাইরের শত্রুতাকে জয় করে আমি যেমন জীবনযুদ্ধে জয়ী হয়েছি, তুমিও তোমার দেহের ভিতরের শত্রুতাকে জয় করে সুস্থ হয়ে উঠবে। আমি জানতাম, আবুল হাসান ছিল ওর মা এবং ওর বোনদের প্রতি খুবই দুর্বল। বিশেষ করে বুড়ির প্রতি ওর খুবই দুর্বলতা ছিল। পারিবারিক কথা উঠলে হাসান ওর মা এবং বোনদের কথাই বেশি বলতো। বাবা বা ভাইদের কথা সে খুব একটা বলতো না। ওর শয্যাপাশে গ্রাম থেকে আসা বোন বুড়ি এবং মা সর্বদাই উপস্থিত থাকতো। হাসানের কাছ থেকে ওরা আমার সম্পর্কে এবং আমার পরিবারের অনেকের কথাই শুনেছিল। বুড়ি ও হাসানের আম্মা জানতো যে, হাসান অনেকবার আমাদের গ্রামের বাড়িতে গেছে। কিন্তু আমি ওদের বাড়িতে কখনও যাইনি। হাসানও নিজের বাড়িতে খুব একটা যেতো না। সুস্থ থাকার সময়ও হাসান আমার চাইতে কমই গ্রামের বাড়িতে যেতো। বার্লিন থেকে ফিরে আসার পর হাসান একবারও গ্রামের বাড়িতে যায়নি। আমি ওকে গ্রামের বাড়িতে যাবার কথা বললে হাসান বলতো, যাবো … আরও একটু ভালো হয়ে নিই, পরে যাবো। আমার এখন বড়-ডাক্তারদের কাছাকাছি থাকা দরকার। দীর্ঘদিন হাসান গ্রামের বাড়িতে না যাওয়ার কারণে বুড়ি এবং খালাম্মা আমার কাছে অভিযোগ করলেন। বললেন, এবার হাসান ভালো হয়ে গেলে তুমিও হাসানের সঙ্গে আমাদের বাড়িতে আসবে। আমি বললাম, নিশ্চয়ই যাবো।
বুড়ির মাথায় ও হাসানের পায়ে আদর করে হাত বুলিয়ে দিয়ে আমি হাসপাতাল থেকে চলে আসি। হাসানের পায়ে হাত বুলাতে গিয়ে লক্ষ্য করি, তার পা বেশ ফুলে উঠেছে। তার মানে জল এসেছে হাসানের পায়ে। এটা খুবই খারাপ লক্ষণ। আমি খুব চিন্তিত বোধ করি।
মহাদেব ও আবুল হাসান আমাকে যৌথভাবে যে চিঠি দুটো লিখেছিল— আমি ঐ চিঠি দুটো সঙ্গে করে ঢাকায় নিয়ে এসেছিলাম। আমার প্রিয় চিঠিগুলোকে আমি আমার সঙ্গে সঙ্গে রাখতাম। আগেই জানিয়েছি, ভারত এবং আমেরিকান কানেকশন ছিল বলে আমার বড় ভাই ও বন্ধু পূরবীর চিঠি দুটো আমি ভয় পেয়ে পুলিশ কন্ট্রোলরুমের বাথরুমে ঢুকে ছিঁড়ে ফেলে টয়লেটে ফ্লাশ করে দিয়েছিলাম। কিন্তু আবুল হাসান ও মহাদেবের চিঠির খামটি আমার পকেটেই ছিল। রমনা হাজতে যখন ছিলাম, যখন আমার ঘুম আসতো না, তখন সময় কাটাবার জন্যই ঐ চিঠি দুটো আমি পড়তাম। বারবার পড়তাম। ভালো লাগতো। হাজতিদের কেউ-কেউ ভাবতো আমি বুঝি আমার কোনো প্রেমিকার চিঠি পড়ছি। আসলে ঐ চিঠি দুটোকে আমি প্রেমপত্ররূপেই জ্ঞান করতাম বন্ধুর উদ্বেগ ও ভালোবাসামাখা ঐ চিঠি দুটো আমাকে জীবনের বিষাদদীর্ণ মুহূর্তে আনন্দ দিতো, বাঁচবার সাহস যোগাতো। উন্নতির পরিবর্তে হাসানের অবস্থা যখন ক্রমশ অবনতির দিতে যাচ্ছিল, তখন আমার কাছে হাসানের চিঠিটির গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। আমি গভীর রাত্রে আবার হাসানের চিঠিটি খুলে পড়তে বসি। কী বলতে চেয়েছে হাসান চিঠিতে? আমার মতো একজন সামান্য বন্ধুর চিঠি না পাওয়ার জন্য এতো অভিমান হয়েছিল কেন হাসানের? নিজেকে অপরাধী মনে হতে থাকলো আমার
অন্য অনেককে লিখলেও, হাসান বার্লিন থেকে আমাকে চিঠি লেখেনি। ১৫ আগস্টের পর, ঐরূপ একটি নৃশংসতম রাজনৈতিক হত্যাকান্ডের ঘটনায় আমি যখন মানসিকভাবে একেবারে বিপর্যস্ত, তখন একদিন দুপুরের দিকে আমি আর মোস্তফা মীর হাইকোর্ট মাজার থেকে সিদ্ধি সেবন করে নিউ পল্টনের মেসের দিকে ফিরছিলাম। সুরাইয়ার সঙ্গে একই রিকশায় করে তখন হাসান যাচ্ছিল হাইকোর্টের সামনে দিয়ে। আমি হাসানকে দেখে রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে হাত উঠাই। হাসান, স্পষ্টই বুঝতে পারি, সুরাইয়ার নির্দেশে তখন চকিতে অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। রিকশাটি আমাদের পাশ দিয়েই প্রেসক্লাবের দিকে চলে যায়। থামে না। আমি কষ্ট পাই হাসানের ঐরূপ আচরণে। তার দু’একদিন পরেই আমি গ্রামের বাড়িতে ফিরে যাই অনির্দিষ্ট কালের জন্য। মহাদেব ওর বাবার শ্রাদ্ধক্রিয়াদি সম্পন্ন করার জন্য তখন গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিল। মহাদেব নেই, হাসানও আমাকে দেখে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। নিজেকে খুবই নির্বান্ধব বলে মনে হলো। আমার বুকের মধ্যে লুকিয়ে রাখা ঐ অভিমানের কারণেই আমি গ্রাম থেকে ইচ্ছে করেই হাসানকে কোনো চিঠি লিখিনি। আমি চেয়েছিলাম, ওর চিঠি না পাওয়ার কষ্ট আমি যেমন ভোগ করেছি, ওর উপেক্ষা যেমন আমাকে কষ্ট দিয়েছে; আমার উপেক্ষা, আমার চিঠি না পাওয়া কষ্টও তেমনি হাসান অনুভব করুক।
চিঠি না লিখে আমি যতটা আঘাত করতে চেয়েছিলাম হাসানকে, হাসানের চিঠি পড়ে মনে হলো সে তার চেয়ে অনেক বেশি আঘাত পেয়েছে। প্রিয়জনের দেয়া আঘাতকে বড় করে গ্রহণ করার ক্ষমতা, আমার তুলনায় হাসানের যে বেশি ছিল, ওর চিঠি থেকে তাই প্রমাণিত হয়। একটি নরোম-কোমল বন্ধুবৎসল কবিচিত্তকে আহত করার জন্য আমি মনে-মনে কষ্ট পেতে থাকি। মহাদেবের চিঠিটিও ছিল খুবই আন্তরিকতাপূর্ণ। কিন্তু পার্থক্য এই যে, মহাদেবের চিঠিটি নিয়ে আমার মনের মধ্যে কোনো অপরাধবোধ তৈরি হয়নি। হাসানের চিঠিটি আমার মধ্যে একধরনের ‘গিল্টি ফিলিং’ তৈরি করেছিল।
আমি আবার ভালো করে হাসানের চিঠিটি পড়তে শুরু করি।
আবুল হাসান
মহাদেবের বাসা থেকে
প্ৰিয় গুণ,
আজ রাত্রে মহাদেবের সঙ্গে আল মাহমুদের এক তুমুল বাক-বিতন্ডার পর, মহাদেবের বাসায় এসে দেখি তোমার একটি অভিমানী চিঠি মহাদেবের কাছে, যা তুমি লিখেছো। চিঠিটা বারবার পড়লুম। অনেকদিন পর তোমার সান্নিধ্য চিঠির মাধ্যমে পেয়ে একদিকে যেমন ভালো লাগলো, অন্যদিকে তেমন আহত হলুম, এই ভেবে যে তুমি আমার ঠিকানা জানা সত্ত্বেও একটা চিঠিও আমাকে লেখোনি। জানি না কী কারণ; তবে চিঠি না পেলেও তোমার সম্পর্কে অনবরত এর ওর কাছ থেকে খবর নিতে চেষ্টা করেছি— মাঝে মাঝে তোমার অনুপস্থিতির নৈঃসঙ্গের তাড়নায়ই হয়তোবা। এছাড়া এর পেছনে আর কোনো মানবিক কারণ নেই। এক সময় ছিল, যখন তুমি আমাকে হলুদ পোষ্টকার্ডে চিঠি লিখতে— তখন তুমি বাইরে থাকলেও মনে হতো তোমার উপস্থিতি উজ্জ্বলভাবে বর্তমান
আমি মানুষ হিসেবে কতটুকু সৎ এবং শুভবুদ্ধির সেটা বিচার সাপেক্ষ, তবে বন্ধু হিসেবে একসময় তো আমরা পরস্পরের কাছাকাছি এসেছিলাম। আমাদের জীবন যাপন সূত্রগুলি একে একে পরে ছিন্ন- বিচ্ছিন্ন হয়ে চতুর্দিকে বিক্ষিপ্ত হলেও সেই প্রবল প্রোচ্ছন্ন দিনগুলির কি কোনো কিছুই আর আমাদের মধ্যে অবশিষ্ট নেই, যা তোমার স্মৃতিকে একবারও নাড়া দিতে পারে? বা পারতো? এবং সেই স্মৃতির সুবাদে একটা চিঠি কি আমিও পেতে পারতুম না? মানি, আমার নিজের কিছু কিছু এককেন্দ্রিক দোষ-ত্রুটি এবং মানবিক দুর্বলতা শেষকালে আমাদের দু’জনকে দু’দিকে সরিয়ে দিয়েছিলো— প্রথমদিকে আমি যা ভালোবাসতাম না সেইগুলি তোমার ভালোবাসার জিনিষ ছিলো— পরে যখোন তুমি সেই মদ মাগী গাঁজা চরস পরিত্যাগ করলে এবং সেই সময় যখোন আমাদের সবচেয়ে নিকটবর্তী হওয়ার সময়, কেন জানি না এক অনির্দিষ্ট অদৃষ্টের তাড়নায় আমরা দু’জন পরস্পরের কাছ থেকে পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লাম। বিচ্ছিন্নতার কারণ হয়তোবা আমার দুরারোগ্য ব্যাধির তাড়না।
বার্লিন থেকে আসার পর আমি অন্য মানুষ। ফলে, পুরনো যোগসূত্র সংস্থাপনের চেষ্টা করেছি যতবার, —ততবার দেখেছি আমার শরীর আমার বৈরী। তুমি যা ভালোবাসো, সেইসব আমার শরীর ভালোবাসে না, তবে অসুস্থতার কারণেই। কিন্তু সত্তায় আমাদের যে গভীর সম্পর্কের সূত্র, কবির সঙ্গে কবির সেই সম্পর্ককে তো আমি কোনোদিন ম্লান করিনি।
১৬ আগস্টের পর; তোমার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে– কিন্তু পরে একদিন হঠাৎ জানলাম তুমি আর ঢাকায় নেই। তোমার ঢাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার ব্যাপারটায় দুঃখ পেয়েছিলাম; নৈঃসঙ্গও কম বাজেনি। কিন্তু পরে আবার ভেবেছি, যেভাবে তুমি মাঝে মাঝে বাড়ী যাও, সেভাবেই হয়তো গিয়েছো—, পরে আবার কিছুদিনের মধ্যে ফিরে আসবে। কিন্তু পরে জানতে পারলুম, তুমি গিয়েছো অনেকদিনের জন্য। বাড়ী গিয়ে তুমি বিভিন্নজনের কাছে চিঠি লিখেছো, সেইসব চিঠিতেই এইসব জানতে পেরেছি। আমিও অপেক্ষায় ছিলুম, একটা চিঠি পাবো, কিন্তু সবসময় অপেক্ষা যে ফলপ্রসূ হবে, এটার তো কোনো কথা নেই।
মহাদেবের কাছে তোমার চিঠি বারবার পড়েছি। বারবার পড়বার মতোই। কবির চিঠির মধ্যে যে দুঃখবোধ এবং নৈঃসঙ্গবোধ থাকে, তার সবরকম চীৎকার হঠাৎ আমাকেও একা— সম্পূর্ণ একা করে দিয়ে গেলো কিছুক্ষণের জন্য। এই একাকীত্বের দরকার ছিলো আমারও। আমি অনেকদিন এরকম সুন্দরভাবে একা হতে পারিনি। বার্লিন থেকে ফেরার পর আমি এই একাকীত্বই সান্নিধ্যে খুঁজতে চেষ্টা করেছি। যার জন্য আমি এক রমণীর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলাম, এখন সেই শ্রীমতিও আমাকে আর একাকীত্ব দিতে পারেন না।
হতে পারে এই একাকীত্ব কেবল তুমিই আমাকে একবার অনেকদিন ধরে দিয়েছিলে। তুমি কি ভুলেই গেলে সেইসব দিনের কথা— যখন শীতের কুয়াশায় মধ্যরাত্রির বাতাসকে আমরা সাক্ষী রেখে ঢাকা শহরের অলিগলি চষে বেড়িয়েছি। আমরা তখোন কী সুখী ছিলাম না? সেই সুখের কারণেই কি তুমি আবার ফিরে আসতে পারো না? যতোই ভালোবাসার পিছনে ধাবমান আমাদের ছায়া এর ওর সঙ্গে ঘুরুক, তুমিও জানো আর আমিও জানি–একসময় আমরাই আমাদের প্রেমিক ছিলাম। আর একমাত্র পুরুষ এবং আর একজন পুরুষই ভালোবাসার স্মৃতি সংরক্ষণ করতে পারে—, কারণ রমণীরা অতি নশ্বর। কিন্তু সেই নশ্বরতার বেদনাবোধ কেবল কবি-পুরুষরাই একমাত্র গ্রহণ করতে পারে। সেই নশ্বরতার অঙ্গীকারে আমরা আমাদের বেঁধেছিলুম একদিন। এখনও সেই বোধ, সেই ভালোবাসা আমার জীবনের একমাত্র স্মৃতি, জানি না তোমার ক্ষেত্রে তার স্পর্শ আর কতদূর মূল্যবান।
ভালোবাসা নিও। ভালো থেকো। এবং ফিরে এসো।
ইতি। চিরশুভাকাঙ্ক্ষী হাসান।
[ সচিত্র সন্ধানী : ১ম বর্ষ, ৩১ সংখ্যা, রবিবার ২৬ নভেম্বর ১৯৭৮ ]
