রক্তঝরা নভেম্বর ১৯৭৫ – ৯
৯
আমি খুবই শক্ত মনের মানুষ। ছোটবেলায় মাকে হারিয়েছিলাম কাঁদিনি। বড় ভাই যখন ভারতে চলে যায়, তখনও আমার কান্না আসেনি। আমি সহজে কাঁদি না। একেবারে কাঁদিই না বলা যায়। কিন্তু হাসানের চিঠি পড়ে আমার প্রায় কান্না চলে আসে। আমি মনে-মনে কাঁদি।
হাসানের চিঠিটি আমার হস্তগত হয়েছিল ১৫ অক্টোবর, ১৯৭৫ তারিখে। এর রচনা তারিখ ১২ অক্টোবর রাত। আমাকে অভিমানমুক্ত করার জন্য, চিঠির অন্তিম পঙক্তি এবং ফিরে এসো কথাটাকে কী প্রবল ভালোবাসার আর্তি দিয়েই না কাচের ওয়েটপেপারের ভিতরের রঙিন ফুলের মতো করে সাজিয়েছে হাসান। ওর চিঠি পড়ে মানতেই হলো, আমি হাসানকে যতটা ভালোবেসেছি, হাসান আমাকে তার চেয়ে বেশি ভালোবেসেছে। না হলে এমন চিঠি কখনও বানিয়ে লেখা যায় না।
দিনের পর দিন যেতে থাকে। হাসানের অবস্থার কোনো উন্নতি হয় না। তার অবস্থা ক্রমশ অবনতির দিকেই ধাবিত হতে থাকে। আমরা কিংকর্তব্যবিমূঢ়ের মতো ক্রমশ নিভে-আসা হাসানের জীবনপ্রদীপের তেলহীন সলতেটিকে উসকে দিয়ে তার মধ্যে আলো ফুটিয়ে তোলার বৃথা চেষ্টায় দিন গুনতে থাকি।
নভেম্বরের ৪ তারিখ হাসান ভর্তি হয়েছিল পিজিতে। ক্রমাগত বাইশ দিন বক্ষব্যাধির সঙ্গে সংগ্রাম করার পর আসে ২৬ নভেম্বর-এর ভোর। শীতের কুয়াশামাখা ভোর হাসানের প্রিয় ছিল। মৃত্যুর জন্য কোন্ সময়টা ভালো— এই নিয়ে একদিন আমার সঙ্গে হাসানের কথা হয়েছিল। আমি বলেছিলাম, মৃত্যুর জন্য কোনো সময়ই ভালো নয়। হাসান বলেছিল, এটা হচ্ছে তোমার গায়ের জোরের কথা। একটা সময় তো বেছে নিতেই হবে। হাসান বলেছিল, আমার ভালো লাগে ভোরের দিকটা। শীতের সময়। ছোটবেলায় গ্রামের বাড়িতে যখন থাকতাম, খুব সকালে উঠতাম ঘুম থেকে, শীতের শেফালি কুড়াবার জন্য। মসজিদে তখন আজান দিতো মোয়াজ্জিন। খুব ভালো লাগতো।
ওর ঐ কথাটাই শেষ পর্যন্ত সত্য হলো। প্রিয় সময়টাতেই শেষ- নিঃশ্বাস ত্যাগ করলো হাসান। ২৬ নভেম্বরের কুয়াশাঢাকা ভোরে, ঝরা শেফালির মতোই অভিমানী হাসান নশ্বর দেহকে পরিত্যাগ করে ওর অনশ্বর-অদৃশ্য আত্মায় তুলে নিলো অনন্তের পথ।
হাসান যখন জন্মভূমির এই মায়াময় মাটির পৃথক পালংকে শয়ন করবে——, তখন তার উদ্বাস্তু-উম্মুল যৌবনসঙ্গীটি যেন ঘটে-যাওয়া রাজনৈতিক নিষ্ঠুরতার ঘটনায় অভিমান করে দূরে, গ্রামের বাড়িতে লুকিয়ে না থেকে ঢাকায় ফিরে এসে তার প্রিয়বন্ধুর অন্তিম পালংক- নির্মাণে অংশ নিতে পারে, তা নিশ্চিত করার জন্যই কি আবুল হাসান এই আবেগমথিত পত্রটি আমাকে লিখেছিলো? ওর অজ্ঞাতসারে? আমার তা মনে হয় না। আমার মনে হয়, হাসান জানতো, এটিই হবে ওর শেষ- চিঠি।
একবার হাসানের মরদেহ তাঁর গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাবার কথাও ভাবা হয়েছিল, কিন্তু পরে পরিবারের সদস্যরা, তাঁর অনুরাগী ভক্ত ও বন্ধুরা বনানী কবরস্থানেই তাঁকে কবর দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। বাংলা একাডেমী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদে নামাজে জানাজা পড়ার পর, আমরা বিকেলের দিকে হাসানের মরদেহটিকে একটি পুষ্পশোভিত ট্রাকে তুলে বনানী কবরস্থানে নিয়ে যাই। তাঁর অন্তিম কাব্যগ্রন্থ ‘পৃথক পালংক’-এর প্রকাশক গাজী শাহাবুদ্দিন আবুল হাসানের কবরের মাটি ক্রয় করার জন্য নগদ তিন হাজার টাকা প্রদান করেন।
আমরা জানতাম, ১৫ আগস্ট, ৩ নভেম্বর এবং ৭ নভেম্বরের শহীদরা বনানীর কবরে শায়িত আছেন। ইচ্ছা থাকলেও এতোদিন ঐ শহীদানদের কবর জিয়ারত করার সুযোগ আমাদের হয়ে ওঠেনি। সুযোগ থাকলেও সাহস হয়নি। আবুল হাসান আমাদের সেই সাহস বাড়িয়ে দিয়ে গেলো। আবুল হাসানের কবরের জন্য একটি ভালো জায়গা খুঁজতে গিয়ে আমি বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি, রব সেরনিয়াবাত ও শেখ মণির পরিবারের সদস্যদের কবরের সামনে থমকে দাঁড়াই। ১৫ আগস্টের নিহতদের কবরের পরই একই সারিতে ৩ নভেম্বরে জেলে নিহত ৩ জাতীয় নেতা : সৈয়দ নজরুল ইসলাম, এম, মনসুর আলী এবং তাজউদ্দিনের কবর। তিন নেতার কবর পেরুতেই চোখে পড়লো নভেম্বরে ‘সিপাহী বিপ্লবে’ নিহত খালেদ মোশাররফের ব্যর্থ অভ্যুত্থানের বিশ্বস্ত সহযোগী (রংপুর বিগ্রেডের কমান্ডার) কর্নেল নাজমুল হুদার কবর। কর্নেল খন্দকার নাজমুল হুদার কবরের পরে আর কারও কবর হয়নি। পাশের জায়গাটা ছিল খালি। কেন খালি ছিল, কে জানে? হয়তো ভয়ে। আওয়ামী-বাকশালীদের সমর্থক ও ভারতের চর হিসেবে কলংকিত করে যারা খালেদ মোশাররফ ও তাঁর দুই সহযোগীকে হত্যা করেছিলো, পরে তারাই রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করায়, মনে হয় ৩ নভেম্বরের ব্যর্থ-অভ্যুত্থানের অন্যতম নায়কের পাশে কেউ তার প্রিয়জনকে কবর দিতে সাহস পাচ্ছিল না, পাছে মৃতের জীবিতরা রাষ্ট্রক্ষমতা দখলকারীদের কুনজরে পড়ে যায়। ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের নায়করা সত্যি-সত্যিই ভারতের চর ছিলো— ঐরূপ বিশ্বাস থেকেও এমনটি হতে পারে। কিন্তু আমার ঐরূপ ভয় ছিল না। আমি কখনও বিশ্বাস করিনি, খালেদ মোশাররফ-হুদা-হায়দাররা ভারতের চর। বরং ভারত জুজুর ভয় তখন যারা বেশি দেখিয়েছিল, তাদের নিয়েই আমার সন্দেহ। খালেদ-হুদা-হায়দাররা ছিলেন সত্যিকারের বীর ও দেশপ্রেমিক। খালেদ মোশাররফের কবরটি ছিল বনানী কবরস্থান সংলগ্ন আর্মি গ্রেভিয়ার্ডের ভিতরে। ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থাকারী বীর কর্নেল হুদার পাশের জায়গাটা খালি পেয়ে আমার খুব ভালো লাগলো। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামী হিসেবে কর্নেল হুদা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একজন বিশ্বস্ত ভক্ত ছিলেন। সিদ্ধান্ত নিলাম, কর্নেল হুদার কবরের পাশেই আবুল হাসানেরও কবর হবে।
সবাই আমার প্রস্তাব মেনে নিলো। তখন বনানীর মাটি খুঁড়ে আমরা হাসানের জন্য একটি গভীর কবর খনন করলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই ১৫ আগস্ট, ৩ নভেম্বর ও ৭ নভেম্বরে বীরদের পাশে নির্মিত হলো ২৬ নভেম্বরের প্রয়াত অভিমানী এক কবির কবর। জীবদ্দশায়, চঞ্চল-জীবন যাদের দূরে-দূরে সরিয়ে রেখেছিলো, নিশ্চল-মৃত্যু ঐ মহৎ প্রাণগুলোকে একই মালার ফুলের মতো করে পাশাপাশি গেঁথে দিয়ে গেলো।
হাসানের মরদেহকে কবরে শুইয়ে দিয়ে, আমরা যখন নগরীর দিকে ফিরছি, তখন আমার বক্ষচাপা-ক্রন্দন, উদ্গত দীর্ঘশ্বাসের মতো মুক্ত হলো একটি ছোট্ট-পঙক্তিতে : ভালোবেসে যাকে ছুঁই সেই যায় দীর্ঘ পরবাসে…।
হাসানের জন্য এলিজি লেখার সময় এটি ঐ এলিজির অন্তিমচরণে পরিণত হয়। ২৬ নভেম্বরের ভোরে আবুল হাসানের মৃত্যুর পাশাপাশি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। হাসানের মৃত্যুসংবাদ শুনে আমি যখন পিজি হাসপাতালের গেইটে পৌঁছাই— তখন হঠাৎ একদল পুলিশ ছুটে এসে পিজি হাসপাতালটিকে ঘিরে ফেলে। পুলিশ কর্ডন করা অবস্থায় একটি বড় কালো মার্সিডিজ গাড়ি একইসঙ্গে খুব দ্রুত পিজি হাসপাতালের ভিতরে প্রবেশ করে। আমি হাসপাতালের ভিতরে প্রবেশ করতে গিয়ে দেখতে পাই, পুলিশরা একজন রাষ্ট্রদূতকে ধরাধরি করে হাসপাতালের রিসেপশনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। একজন পুলিশকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারি, উনি হচ্ছেন ভারতীয় হাই কমিশনার শ্রীসমর সেন। তখন তাঁর দেহ ছিল রক্তাক্ত। তাঁর গায়ে শার্ট ছিল না। শুধু গেঞ্জি ছিল। তিনি বাম হাতে ডান কাঁধের দিকে একটি ক্ষতস্থানকে চেপে ধরে খুবই ক্রুদ্ধ-ভঙ্গিতে চারপাশে তাকাচ্ছিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে স্ট্রেচার নিয়ে নার্স ও ডাক্তাররা সমর সেনকে বাঁচানোর জন্য ছুটে আসে। আমি দ্রুত ঐ ঘটনাটিকে পাশ কাটিয়ে উপরে উঠে যাই। সমর সেনের কী হয়েছে–তা আর তখন জানা হয়নি।
পরে জানতে পারি, ৬ জন আত্মঘাতী তরুণের একটি দল সকালের দিকে ভারতীয় হাইকমিশনার শ্রীসমর সেনকে অপহরণ করার জন্য ধানমন্ডির ২ নম্বর সড়কে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাসে হামলা চালিয়েছিল। অল্পের জন্য ঐ হামলাটি ব্যর্থ হয়। শ্রীসেনের দেহরক্ষী এবং দুতাবাস-প্রহরারত পুলিশের গুলিতে ঘটনাস্থলেই অপহরণপ্রয়াসীদের মধ্যে চারজন নিহত হয়। দু’জন আহত অবস্থায় পুলিশের হাতে ধরে পড়ে। এরা সবাই জাসদের কর্মী বলে জানা যায়।
এই ঘটনার দু’দিন আগে, ২৩ নভেম্বর রাষ্ট্রদ্রোহী তৎপরতায় লিপ্ত থাকার অভিযোগে জাসদ নেতা রব-জলিলসহ ১৯ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। সরকারী পত্রিকা দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত সংবাদের শিরোনামে শুধুই আসম রব ও মেজর জলিলের কথা থাকলেও, ভিতরে ১৭ নম্বর আসামী হিসেবে যে নামটি ছিল, ওটিই ছিল ঐ কথিত রাষ্ট্রদ্রোহী মামলার আসল টার্গেট। তাঁর নাম কর্নেল তাহের।
ঐ মৃত্যুদণ্ডযোগ্য রাষ্ট্রদ্রোহী মামলাটি যে কর্নেল তাহেরকে ফাঁসিতে লটকিয়ে দেবার জন্যই করা হয়েছে— তা বুঝতে পেরেই জাসদ-এর ছয় জন জঙ্গী সদস্য একটি আত্মঘাতী স্কোয়াড গঠন করে ভারতীয় হাইকমিশনার শ্রীসমর সেনকে অপহরণের মাধ্যমে জিম্মি করার চেষ্টা করেছিলো। এভাবেই তারা ঐ মামলাটি প্রত্যাহারে জিয়ার সরকারকে ভারতের চাপের মুখে ফেলতে চেয়েছিলো। কিন্তু জাসদের জন্য বিধি ছিল বাম। তাই, পরিকল্পনাটি অল্পের জন্য ব্যর্থ হয়ে যায়। তাহেরকে বাঁচাতে গিয়ে তাহেরের আপন এক ছোট ভাইসহ চার-চারটি তাজা- তরুণ প্রাণ অকালে ঝরে পড়ে।
খালেদ মোশাররফের ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক আছে—এই অভিযোগটি প্রচার করার ব্যাপারে কর্নেল তাহের ও তাঁর দলের খুবই তৎপর ভূমিকা ছিলো। যার পরিণতিতে খালেদ মোশাররফসহ তিন-তিনজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে জীবন দিতে হয়। নিয়তির নির্মম পরিহাসই বলতে হবে, ১৯ দিনের ব্যবধানে, সেই ভারতকে সম্পর্কিত করেই জিয়ার হাত থেকে বাঁচার পথ সন্ধান করতে হলো তাহের ও তাঁর দলকে। ঐ অপহরণ-প্রচেষ্টাটি সফল হলে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নিতো, তা আমাদের কল্পনার বিষয় হিসেবেই থেকে গেলো।
শ্রীসমর সেনকে জিম্মি করার প্রচেষ্টাটি ব্যর্থ হওয়ার ফলে শেষ পর্যন্ত জেনারেল জিয়াই লাভবান হন। জঙ্গী জাসদের মোকাবিলায় তিনি ভারতের পরোক্ষ সমর্থন লাভ করেন। তাই, অল্পদিনের ব্যবধানে, সংক্ষিপ্ত সামরিক আদালতে দ্রুত বিচারের মাধ্যমে নিষ্ঠুর জিয়া ৭ নভেম্বরের ‘সিপাহী বিপ্লবের’ অন্যতম প্রধান রূপকার, মুক্তিযুদ্ধে এক-পা হারানো অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল আবু তাহেরকে প্রত্যাশিত অনুকম্পা প্রদর্শনের পরিবর্তে, অবলীলায় ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেন।
এভাবেই ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দের রক্তঝরা নভেম্বর মাসটির অবসান হয়।
***
