মরণ ঘুম – ১
১
অক্টোবরের মাঝামাঝি হলেও শীত নয়, বরং বাতাসে বৃষ্টির গন্ধ পাচ্ছিলাম। আমার পরনে ছিল হালকা নীল সুট। সঙ্গে গাঢ় নীল শার্ট, টাই, কালো জুতো আর কালো মোজা। দাড়ি কামানো সারা, ঘুম থেকে উঠে মদও ছুঁইনি। চল্লিশ লাখ ডলারের মালিকের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার সময় একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভ আর কতটা তৈরি হতে পারে বলুন?
স্টার্নউড প্লেসের দরজা পেরোলেই একটা দোতলা সমান হল পড়ে। সদর দরজাটা বিশাল– দরকার হলে শুধু মানুষ নয়, বোধ হয় হাতির পালও ঢুকে যাবে ওখান দিয়ে। তার ওপরেই রঙিন কাচে একটা ছবি আঁকা ছিল। সেখানে দড়ি দিয়ে গাছের সঙ্গে বাঁধা এক মহিলাকে উদ্ধার করার চেষ্টা করছিল এক নাইট। মহিলার পরনে কিছু ছিল না, তবে তাঁর চুল বেশ লম্বা বলে ওটাই ছড়িয়ে-জড়িয়ে কাজ চালানো হচ্ছিল। নাইটটি নিজের মুখের ওপর থেকে লোহার খাঁচা সরিয়ে আর হাত বাড়িয়ে মহিলার সঙ্গে আলাপ জমাতে চাইছিল। ভেবে দেখলাম, আমি ওই বাড়ির বাসিন্দা হলে অ্যাদ্দিনে মই বেয়ে ওপরে উঠে হাত লাগাতাম। মহিলাকে উদ্ধার করার ব্যাপারে নাইটটিকে তেমন উৎসাহী বলে মনে হচ্ছিল না।
সোজাসুজি তাকালে হলের ফ্রেঞ্চ ডোর দিয়ে পেছনে সবুজ ঘাস, আর তার পেছনে সাদা গ্যারেজ দেখা যাচ্ছিল। একজন তরুণ ড্রাইভার একটা মেরুন রঙের প্যাকার্ড কনভার্টিবল গাড়ি ঝাড়ামোছা করছিল। গ্যারেজের ওপাশে কয়েকটা গাছ, আর তাদের পেছনে গ্রিনহাউসের গম্বুজ আকারের ছাদটা দেখা যাচ্ছিল। তার ওপাশে আরও গাছ। শেষে জমিটা পাহাড়ের নীচে মিশে গেছে।
হলের পুবদিকে একটা টালি-বসানো সিঁড়ি ওপরে গ্যালারির দিকে উঠে গেছে। ওদিকেও দেখলাম রঙিন কাচে রোমান্টিক দৃশ্য আঁকা রয়েছে। তার সামনে বেশ কয়েকটা গদি-আঁটা বড়ো সাইজের চেয়ার এদিক-ওদিক ছড়ানো ছিল। পশ্চিম দেওয়ালে একটা ফাঁকা ফায়ারপ্লেস, তার ওপর মার্বেলের ম্যান্টলের দু-কোণে দুটো স্ট্যাচু বসানো। তাদের থেকে একটু উঁচুতে, বাকি দেওয়াল জুড়ে মিলিটারি পোশাক পরা এক ভদ্রলোকের পোর্ট্রেইট দেখলাম। ইউনিফর্ম দেখে মেক্সিকান যুদ্ধের কথা মনে হচ্ছিল। ইনি কি জেনারেল স্টার্নউডের কোনো পূর্বপুরুষ? বিপজ্জনক বিশ-এর ঘরে ঘোরাঘুরি করা দুটি কন্যা থাকলেও জেনারেলকে এতটা প্রাচীন বলে ভাবতে ইচ্ছে হচ্ছিল না।
ছবির মানুষটির গরম চোখের দিকে তাকিয়ে আকাশ-পাতাল ভাবছিলাম। তখনই পেছনে, ওই ঘোরানো সিঁড়ির নীচে একটা দরজা খুলে গেল। এক মহিলা বেরিয়ে এলেন।
মহিলা নয়, মেয়ে। বড়োজোর কুড়ি বছর বয়স হবে। চেহারার মধ্যে কমনীয়তা আর হালকা ভাবের সঙ্গে কোথাও যেন ইস্পাতও মিশে ছিল। ফিকে নীল রঙের স্ল্যাক্স পরেছিল মেয়েটা। তামাটে চুল এখনকার ফ্যাশনের অনুপাতে অনেকটাই ছোটো, তবে ঢেউ-খেলানো। মেয়েটা আমার কাছে এসে হাসল। ধূসর চোখে কোনো অভিব্যক্তি খুঁজে পেলাম না, তবে ফাঁক হওয়া মুখের ভেতর ছোটো ছোটো হিংস্র দাঁতগুলো ঝিকিয়ে উঠল।
‘আপনি কিন্তু বেশ লম্বা।’ মেয়েটা বলল।
‘কখন হলাম, টের পাইনি।’
মেয়েটার চোখ গোল হয়ে গেল। বুঝতে পারলাম, ও ভাবছে। ব্যাপারটা যে ওর কাছে বেশ কষ্টকর, তাও বুঝে গেলাম।
‘সুপুরুষও বটে।’ মেয়েটা বলল, ‘এটা নিশ্চয় টের পান?’
আমি নাক আর গলা দিয়ে একটা আওয়াজ করলাম।
‘আপনার নাম কী?’
‘রাইলি।’ আমি বললাম, ‘ডগহাউস রাইলি।’
‘ভারি অদ্ভুত নাম তো।’
মেয়েটা ঠোঁট কামড়াল। তারপর ঘাড় বেঁকিয়ে আড়চোখে আমাকে দেখল, তারপর চোখের পাতা ধীরে ধীরে নামিয়ে আবার তুলল, অনেকটা স্টেজের যবনিকার মতো করে। বুঝলাম, ও আশা করছে যে এইসব দেখে আমি আহ্লাদে গড়াগড়ি যাব, বা অন্য কিছু করব। আমি কিছুই করলাম না।
‘আপনি কি কুস্তিগির?’ এবার প্রশ্ন এল।
‘আজ্ঞে না। আমি একজন গোয়েন্দা।’
‘কী!’ মেয়েটা মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ‘আপনি আমার সঙ্গে ইয়ার্কি মারছেন, তাই না?’
‘উঁহু।’
‘কী উঁহু?’
‘আপনি কিন্তু বেশ স্পষ্ট করেই আমার কথা শুনেছেন।’ আমি বললাম, ‘এখন কোনো কাজ থাকলে বরং সেটা সেরে আসুন।’
‘আপনি কিছুই বলেননি। আমাকে শুধু ঝোলাচ্ছেন, তাই না?’
মেয়েটা নিজের বুড়ো আঙুল কামড়াল। আঙুলটা আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। সরু আর লম্বা আঙুলটাকে দেখে বুড়ো আঙুল নয়, অন্য যেকোনো আঙুলের মতো মনে হচ্ছিল। এমনকী প্রথম জয়েন্টের জায়গায় কোনো বাঁকা ভাবও দেখতে পাচ্ছি না। অন্যমনস্কভাবে আঙুল চিবোতে চিবোতে মেয়েটা আবার বলল, ‘আপনি খুউউব লম্বা।’
এতেও কিছু বলছি না দেখে মেয়েটা নিজের মনে খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। তারপর একপাক ঘুরে সোজা আমার ওপর এসে পড়ল। আমি যদি মেয়েটাকে না ধরতাম তাহলে ও সোজা মেঝেতে পড়ে মাথা ফাটাত, হয়তো হাড়ও ভাঙত গোটাকয়েক। মেয়েটাকে সামলে দাঁড় করানোর চেষ্টা করছি। আমার বুকের কাছে মুখ নিয়ে আবার খিলখিলিয়ে উঠল মেয়েটা। তারপর বলল, ‘আপনি সুন্দর। আমিও কিন্তু সুন্দর।’
আমি এরও কোনো উত্তর দিলাম না। বাটলার ভদ্রলোক তখনই ঘরে ঢুকলেন।
আমাদের ওই অবস্থায় দেখেও বাটলারের কোনো ভাবান্তর হল না। বছর ষাটেক বয়স হবে মানুষটির। কিন্তু রোগা, লম্বা, সাদা চুল, অদ্ভুতরকম নিরাসক্ত একজোড়া নীল চোখ, হেঁটে আসার সময় ভদ্রলোকের শরীরে পেশিদের নড়াচড়া– এসব দেখে বুঝতে পারছিলাম, মানুষটিকে স্রেফ একজন ‘পুরাতন ভৃত্য’ ভেবে উড়িয়ে দিলে মুশকিল। হয়তো সেজন্যই মেয়েটা এক ঝটকায় আমাকে ছেড়ে, সিঁড়ি দিয়ে হরিণের মতো ওপরে উঠে কোথাও গায়েব হয়ে গেল।
‘জেনারেল এবার আপনার সঙ্গে দেখা করবেন, মিস্টার মার্লো।’
আমি নিজেকে একটু গুছিয়ে নিলাম। তারপর বললাম, ‘উনি কে ছিলেন?’
‘মিস কারমেন স্টার্নউড, স্যার।’
‘বকলস-টকলস নেই বাড়িতে? বেঁধে রাখার ব্যবস্থা করতে পারেন না?’
‘জেনারেল অপেক্ষা করছেন, স্যার।’
আমি জেনারেলের সঙ্গে দেখা করতে এগোলাম।
