মরণ ঘুম – ১১
১১
মহিলার পোশাক-আশাক থেকে ডলারের দাপট আর আভিজাত্য এখনও ঠিকরে বেরোচ্ছিল। তবে গতদিনের তুলনায় ওঁর অনিন্দ্যসুন্দর পা-র খুব কম অংশই দেখা যাচ্ছিল। আর হ্যাঁ, মেক-আপ বা দামি টুপি দিয়েও ওঁর মুখের ফ্যাকাশে ভাবটা লুকোনো থাকছিল না।
‘আপনাকে তো পাওয়াই যায় না।’ নাকটা ঈষৎ কুঁচকে, রিসেপশনের হতদরিদ্র আসবাবগুলোর দিকে আলগোছে হাত নেড়ে বললেন মহিলা, ‘আমি ভাবছিলাম, আপনিও বোধ হয় মার্সেল প্রুস্তের মতো বিছানা থেকেই কাজকর্ম সারেন।’
আমি নির্বিকারভাবে একটা সিগারেট ধরিয়ে জানতে চাইলাম, ‘তিনি কে?’
‘এক ফরাসি লেখক। আপনার অবশ্য তাঁকে চেনার কথাও নয়।’
‘অ।’
‘কাল আমাদের আলাপটা ঠিক… জমেনি।’ উঠে দাঁড়ালেন মহিলা, ‘আমি বোধ হয় একটু রূঢ় আচরণ করে ফেলেছিলাম।’
‘আপনি একা করেননি।’ আমি চেম্বারের দরজা খুলে ওঁকে ভেতরে আসতে বললাম।
মলিন ঘরের এদিক-ওদিক দেখে আমার ডেস্কের একপাশের চেয়ারে বসে পড়লেন মহিলা। তারপর ঠোঁট বেঁকিয়ে বললেন, ‘আপনি যে দেখনদারিতে বিশ্বাস করেন না, সেটা বেশ বোঝা যাচ্ছে।’
দরজার একপাশে পড়ে থাকা ক-টা চিঠি তুলে, টুপিটা স্ট্যান্ডে ঝুলিয়ে আমি বসে পড়লাম। তারপর শান্ত গলায় বললাম, ‘পিংকারটনের মতো এজেন্সিও ওসব করে না। সৎ হলে এই লাইনে আপনি খুব বেশি রোজগার করতে পারবেন না। বেশি সাজসজ্জা মানেই আপনি বেশি রোজগার করছেন, আর তার মানেই…’
‘ও।’ মহিলা ব্যাগ খুলে লাইটার আর একটা এনামেল করা কেস বের করলেন। তার থেকে সিগারেট বেরোল। সেটা ধরানো হল। লাইটার আর কেস যথাস্থানে ফিরে গেল, কিন্তু ব্যাগের মুখটা খোলাই রইল।
‘তার মানে আপনি সৎ?’ ধোঁয়ার সঙ্গে মিশে প্রশ্নটা আমার দিকে উড়ে এল।
‘ভীষণভাবে।’
‘তাহলে এই ‘‘লাইন’’-এ এলেন কীভাবে?’
‘আপনি এক মদের চোরাচালানকারীকে বিয়ে করলেন কীভাবে?’
‘প্লিজ। আমি আবার ঝগড়া শুরু করতে চাই না। আমি গোটা সকাল আপনাকে ধরার চেষ্টা করেছি– প্রথমে ফোনে, তারপর এখানে। আমাদের মধ্যে সুস্থ, স্বাভাবিক কথা হওয়া দরকার।’
‘ওয়েনের ব্যাপারে?’
‘আপনি জানেন?’ মহিলার মুখটা শক্ত হয়ে গেলেও গলাটা নরম ছিল, ‘বেচারা।’
‘ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির অফিসের একজন আমাকে লিডো-তে নিয়ে গেছিলেন। তাঁর ধারণা ছিল, আমি এই ‘‘ব্যাপারে’’ হয়তো কিছু জানি। দেখলাম উনিই বরং আমার চেয়ে অনেক বেশি জানেন। ওয়েন যে আপনার বোনকে বিয়ে করতে চেয়েছিল– এটা উনি জানতেন।’
‘বিয়েটা হলে মন্দ হত না।’ ধোঁয়ার মধ্যে দিয়েও মহিলার কালো চোখজোড়া আমার মুখের ওপর একেবারে স্থির হয়ে ছিল, ‘ওয়েন ওকে ভালোবাসত। সেটা যে কী ভীষণ দুর্লভ একটা ঘটনা, তা আমি অ্যাদ্দিনে বুঝে গেছি।’
‘পুলিশের খাতায় ওর নাম ছিল।’
‘ও অসৎ-সঙ্গে পড়েছিল, ব্যস।’ মহিলা আলগাভাবে বললেন, ‘এদেশে পুলিশের খাতায় নাম তোলার জন্য ওটুকুই যথেষ্ট।’
‘এটা একটু বেশিরকমের সরলীকরণ হয়ে গেল, তাই না?’
‘আমি ওয়েনকে নিয়ে কথা বলার জন্য আপনার কাছে আসিনি।’ মহিলায় গলায় ধার বাড়ল, ‘বাবা আপনাকে কী জন্য ডেকেছিলেন, সেটা কি আমাকে বলতে পারবেন?’
‘ওঁর অনুমতি পেলে তবেই পারব।’
‘ব্যাপারটা কি কারমেনকে নিয়ে?’
‘সেটাও বলতে পারব না।’
আমি ধীরেসুস্থে পাইপে তামাক ভরলাম। তাতে কয়েকটা সুখটান দিলাম। মহিলা আমাকে কিছুক্ষণ দেখলেন, তারপর ব্যাগ থেকে একটা সাদা খাম বের করে ডেস্কের ওপর ছুড়ে বললেন, ‘দেখেই নিন।’
আমি খামটা তুললাম। টাইপ করে ঠিকানা লেখা ছিল– মিসেস ভিভিয়েন রেগান, ৩৭৬৫ অল্টা ব্রিয়া ক্রেসেন্ট, পশ্চিম হলিউড। মেসেঞ্জার সার্ভিসে ডেলিভারির জন্য পোস্ট অফিস থেকে খামটা বেরিয়েছে আজ সকাল আটটা পঁয়ত্রিশে। খাম খুলে ভেতর থেকে সোয়া চার ইঞ্চি বাই সোয়া তিন ইঞ্চি মাপের চকচকে একটা ফটো বের করলাম। ওটা ছাড়া খামে আর কিচ্ছু ছিল না।
ফটোটা কারমেন স্টার্নউডের– গাইগারের ঘরের চেয়ারে, স্রেফ একজোড়া কানের দুল পরে বসা অবস্থায়। ওর চোখের পাগলাটে ভাবটা দেখে আমার অস্বস্তি বাড়ছিল। ফটোটা খামে ভরে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কত চেয়েছে?’
‘পাঁচ হাজার– নেগেটিভ আর অন্য প্রিন্টগুলোর জন্য। আজ রাতেই ব্যাপারটা মেটাতে হবে, নইলে ওরা এগুলো কেচ্ছার কারবার করে এমন কোনো কাগজকে বেচে দেবে।’
‘টাকাটা কে চেয়েছে?’
‘এক মহিলা। এটা ডেলিভার্ড হওয়ার আধঘণ্টা পর ফোন এসেছিল।’
‘কেচ্ছা আর কাগজের ব্যাপারটা নিয়ে ভাবার কিছু নেই। আদালতে গেলে ওই কাগজ শেষ হয়ে যাবে। এ ছাড়া কী বলেছে?’
‘এ ছাড়া?’
‘হ্যাঁ।’
‘মহিলা বলছিলেন, এর মধ্যে একটা পুলিশি ঝামেলাও নাকি আছে।’ ভিভিয়েনকে বিভ্রান্ত দেখাচ্ছিল, ‘আমি টাকা না দিলে নাকি আমার বোনকে হাজতবাস করতে হবে।’
‘কী ধরনের পুলিশি ঝামেলা?’
‘জানি না।’
‘কারমেন এখন কোথায়?’
‘বাড়িতে। ও কাল রাত থেকে অসুস্থ।’
‘কাল রাতে ও বেরিয়েছিল?’
‘না। আমি বেরিয়েছিলাম, তবে বাকিরা বলেছে যে ও বেরোয়নি।’
‘কাল রাতে ওয়েন আপনার গাড়ি নিয়ে কী করছিল?’
‘কেউ জানে না।’ আলতো করে কাঁধ ঝাঁকালেন মহিলা, ‘ও কাউকে কিছু জানায়নি। যে দিনগুলোয় ওর ছুটি থাকে, সেদিন আমরা ওকে একটা গাড়ি নিয়ে যেতে দিই। কিন্তু কাল ওর ছুটি ছিল না। কেন? আপনি ভাবছেন…’
‘এই ফটোর ব্যাপারে ওয়েন কিছু জানত কি না? জানতেই পারে। ভালো কথা, আপনি কি পাঁচ হাজার ডলার জোগাড় করতে পারবেন?’
‘বাবা-র কাছে চাইলে হয়তো পাওয়া যাবে। নইলে ধার চাইতে হবে। এডি মার্সকে বলে দেখি।’
‘দেখুন। আপনার হাতে খুব বেশি সময়ও তো নেই।’
‘পুলিশকে বললে কেমন হয়?’ মহিলা চেয়ারে হেলান দিয়ে বললেন।
‘ভালো হয়। কিন্তু আপনি সেটা করবেন বলে মনে হয় না।’
‘করব না? কেন?’
‘কারণ আপনি আপনার বাবা আর বোনকে বাঁচাতে চান। পুলিশ কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে কোন সাপ বের করে ফেলবে– সেটা আপনি জানেন না। ব্ল্যাকমেইলের ব্যাপারে পুলিশ অনেক কিছু জেনেও মুখ বন্ধ রাখে, কিন্তু এক্ষেত্রে তার চেয়েও সিরিয়াস কিছু জানাজানি হয়ে যেতে পারে।’
‘আপনি কিছু করতে পারবেন?’
‘পারব। তবে এই নিয়ে আপনাকে কিছু বলতে পারব না।’
‘আপনি খুব ভালো লোক।’ মহিলা বললেন, ‘আপনার অফিসে গলা ভেজানোর কোনো ব্যবস্থা নেই?’
দেরাজ খুলে একটা বোতল আর দুটো গ্লাস বের করলাম। ড্রিঙ্ক বানিয়ে ওঁর আর নিজের সামনে রাখলাম। চুপচাপ গ্লাস খালি করে, ব্যাগটা বন্ধ করে উঠে দাঁড়ালেন মহিলা।
‘আমি টাকার জোগাড় করি।’ বললেন মহিলা, ‘এডি মার্সের পুরোনো খদ্দের আমি, টাকা দিতে ওর আপত্তি হওয়ার কথা নয়। তা ছাড়া আরও একটা ব্যাপার আছে, যেটা আপনি জানবেন না।’
মহিলা হাসলেন, তবে হাসিটা চোখ অবধি পৌঁছোল না। ওভাবেই উনি বললেন, ‘এডি-র বউয়ের সঙ্গেই রাস্টি পালিয়েছে।’
আমি কিছুই বললাম না। আমার দিকে স্থিরচোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে মহিলা বললেন, ‘এই তথ্যটা আপনার কোনো কাজে লাগবে না?’
‘ওঁকে খুঁজে বের করতে চাইলে কাজে লাগবে– যদি আপনি আদৌ ওঁকে খুঁজে বের করতে চান। কেন, উনিও এই ব্যাপারে জড়িয়ে আছেন বলে আপনার মনে হচ্ছে নাকি?’
‘আর একটা ড্রিঙ্ক।’ ফাঁকা গ্লাসটা আমার দিকে ঠেলে বললেন মহিলা, ‘আপনার কাছ থেকে কথা আদায় করার বদলে ড্রিঙ্ক জোটানো সহজ।’
‘আমার কাছ থেকে যা জানতে চেয়েছিলেন, তা তো জেনেই গেছেন।’ গ্লাসটা ভরতে ভরতে বললাম, ‘আপনি এখন জানেন, আমি আপনার স্বামীকে খুঁজছি না।’
এক চুমুকে গ্লাসটা খালি করে মহিলা দম নিলেন। তারপর বললেন, ‘রাস্টি চোর-জোচ্চোর ছিল না। যদি ওরকম কিছু ও করেও, তাহলে এই ক-টা পয়সা নিয়ে ও মাথা ঘামাবে না। ওর নিজের পনেরো হাজার ডলার ছিল। ও যখন গায়েব হয়, তখনও সেই টাকাটা ওর কাছেই ছিল। সস্তা ব্ল্যাকমেইলিঙের চক্করে পড়ার লোক ও নয়।’
‘আমি পরে ফোন করব।’ বলে আমিও উঠে দাঁড়ালাম, ‘আপনি আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাইলে আমার অ্যাপার্টমেন্ট হাউসে একটা ফোন করে বলে দেবেন।’
দরজা অবধি ওঁকে এগিয়ে দিলাম। অন্যমনস্কভাবে মহিলা জানতে চাইলেন, ‘বাবা ঠিক কী নিয়ে আপনাকে ডেকেছিলেন, সেটা…’
‘আগে ওঁর অনুমতি নিই।’
দরজায় এক হাত রেখে মহিলা খাম থেকে ফটোটা আবার বের করলেন। সেটা দেখতে দেখতে বললেন, ‘ওর ফিগারটা কিন্তু চমৎকার, তাই না?’
‘হুঁ।’
আমার দিকে সামান্য ঝুঁকে মহিলা গম্ভীর গলায় বললেন, ‘আমারটাও কিন্তু খারাপ নয়।’
‘দেখার ব্যবস্থা করা যায়?’
মহিলা হেসে উঠলেন। হাসিটায় আনন্দ ছিল না, স্রেফ ছুরির ধার ছিল। দরজা পেরিয়ে করিডোরে দাঁড়িয়ে, মাথাটা আমার দিকে সামান্য বেঁকিয়ে মহিলা বললেন, ‘আমার দেখা সবচেয়ে ঠান্ডা রক্তের প্রাণী আপনিই, মিস্টার মার্লো। নাকি আপনাকে ‘ফিল’ বলে ডাকব?’
‘যা খুশি।’
‘আপনি আমাকে ভিভিয়েন বলে ডাকতে পারেন।’
‘অবশ্যই, মিসেস রেগান।’
‘জাহান্নমে যান!’ মহিলা গট গট করে হেঁটে বেরিয়ে গেলেন। আর পেছন ফিরে দেখলেনও না।
আমি দরজা বন্ধ করলাম। গ্লাসগুলো ধুয়ে যথাস্থানে রাখলাম। তারপর ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির অফিসে ফোন করে বার্নি ওল্্স-কে চাইলাম।
‘আমি বুড়োকে আর জ্বালাইনি।’ প্রথমেই বললেন ওল্্স, ‘বাটলার বলল, হয় সে নইলে দুই মেয়ের কেউ-না-কেউ ওঁকে পরে জানাবে। ওয়েন টেলর গ্যারেজের লাগোয়া একটা ঘরে থাকত। আমি ওর জিনিসপত্র ঘেঁটে তেমন কিছু পাইনি। ছোকরার বাবা-মা আইওয়া-তে থাকেন। ওখানকার পুলিশ চিফকে বলেছি ওঁদের জানাতে। পারলৌকিক কাজকর্মের খরচ স্টার্নউডরাই দেবে।’
‘সুইসাইড?’
‘বলা মুশকিল। ছেলেটা কোনো নোট লিখে যায়নি। ওর গাড়িটা নিয়ে বেরোনোর কথাও ছিল না। মিসেস রেগান ছাড়া বাকিরা সবাই বাড়িতেই ছিল। মিসেস রেগান লাস ওলিন্ডাস-এ ল্যারি কব নামের এক লক্কা পায়রার সঙ্গে জুয়ো খেলছিলেন। ওখানে আমার চেনা একজনের কাছে খোঁজ নিয়েছি, কথাটা সত্যি।’
‘জুয়োর আড্ডায় আপনার চেনা লোকও থাকে?’
‘কার থাকে না, শুনি! যাকগে, কাজের কথা বলি। ছেলেটার মাথায় ওই দাগটা আমাকে ভাবাচ্ছে, মার্লো। তুমি একদম নিশ্চিত যে এই ব্যাপারে তুমি কিছু জান না?’
‘একদম নিশ্চিত।’
আর দুয়েকটা আলগা কথা বলে ফোন রাখলাম। হল অফ জাস্টিস গিয়ে নিজের গাড়িটা বের করলাম। বিকেলের খবরের কাগজগুলো কিনে তন্নতন্ন করে খুঁজেও গাইগারের নাম পেলাম না। বাড়ি ফিরে নীল নোটবইটা নিয়ে আবার বসলাম– তাতেও নামধামগুলো দুর্বোধ্যই রয়ে গেল।
