মরণ ঘুম – ১৮
১৮
‘কী হে?’ ওলস শান্ত গলায় ছেলেটাকে জিজ্ঞস করলেন, ‘ব্রোডিকে তুমিই গুলি করেছ বুঝি?’
সোফায় হেলান দিয়ে বসে ছিল ক্যারল। ও উত্তর হিসেবে আবার কয়েকটা ছাপার অযোগ্য শব্দ উপহার দিল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ওল্্স আমার দিকে ফিরলেন। আমি বললাম, ‘ওর বন্দুকটা আমার কাছে আছে।’
‘তবু ভালো।’ আমার দিকে ফিরে ওল্্স বললেন, ‘আমি ওয়াইল্ডকে বলে রেখেছি। চলো, যাওয়া যাক। আমার গাড়িতে এই মক্কেলকে নিয়ে যাচ্ছি। তুমি পেছনে এসো, যাতে আমার ওপর হামলা করে পালানোর ফন্দিফিকির এর মাথায় না আসে।’
‘ঘরটা দেখলেন?’
‘দেখলাম। ওয়েন মারা গেছে, একদিক দিয়ে ভালোই হয়েছে। নইলে গাইগারের মতো কাউকে খুন করার দায়ে ওকে গ্যাস চেম্বারে পাঠাতে হলে আমারই ভালো লাগত না।’
আমি মোমবাতি নিভিয়ে দিলাম। ততক্ষণে ওল্্স ক্যারলকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলেন। সব আলো নিভিয়ে আমরা বেরিয়ে এলাম। দরজা তালাবন্ধ করে গাড়িতে বসলাম। তারপর রওনা দিলাম।
ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি ট্যাগার্ট ওয়াইল্ড ফোর্থ আর লাফায়েত পার্কের কোণে একটা বাড়িতে থাকেন। আমরা যখন ওঁর বাড়ির সামনে পৌঁছোলাম তখন সামনের ড্রাইভওয়েতে একটা বড়ো সেডান আর একটা পুলিশের গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল। আমি আর ওল্্স গাড়ি থেকে নামলাম। সেডানের ড্রাইভার হেলান দিয়ে সিগারেট খাচ্ছিল। ওল্্স গাড়িতে বসানো ক্যারলের দিকে ইঙ্গিত করে ড্রাইভারকে কিছু বললেন। সে কাঁধ ঝাঁকাল। আমরা ঘণ্টি বাজালাম। দরজা খুলে দেওয়ার পর আমরা সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে ওয়াইল্ডের স্টাডিতে হাজির হলাম। ওয়াইল্ড লস এঞ্জেলসের বনেদি বাসিন্দা, ওর বাড়ির সর্বত্র রুচি আর আভিজাত্যের একটা হালকা গন্ধ ছড়িয়ে ছিল। তবে আমার সেদিকে নজর ছিল না।
ওয়াইল্ডকে আমি চিনতাম। মাঝবয়সি, মোটাসোটা, নীল চোখে একটা হাসি হাসি ভাব ফুটিয়ে রাখেন বলে ভদ্রলোককে দেখলেই বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ মনে হয়। তবে ভেতরে ভেতরে উনি যে কী জিনিস, তাও আমি জানতাম। সামনে এক কাপ কালো কফি আর আঙুলের ফাঁকে চুরুট নিয়ে ওয়াইল্ড আমাদের স্বাগত জানালেন। ওঁর পাশে বসে থাকা রোগা, ধারালো মুখের ভদ্রলোককে চিনতে পারলাম না।
‘শুভ সন্ধ্যা, ক্রোনিয়েগার।’ একটা চেয়ার টেনে বসতে বসতে বললেন ওল্্স, ‘আপনার সঙ্গে বোধ হয় ফিলিপ মার্লো-র আলাপ নেই। ও একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভ, তবে এই মুহূর্তে ও একটু ঝামেলায় পড়েছে।’
ক্রোনিয়েগার আমার আপাদমস্তক যেভাবে দেখলেন, সেভাবে লোকে সিনেমার পোস্টার দেখে। ঘরের আবহাওয়াটা ঝোড়ো হয়ে উঠছে দেখে ওয়াইল্ড বললেন, ‘বসুন, মার্লো। ক্যাপ্টেন ক্রোনিয়েগারের সঙ্গে আপনার আলাপ-বিলাপ পরে হবে। আগে ব্যাপারটা ভালোভাবে বুঝে নিই।’
আমি বসে একটা সিগারেট ধরালাম। ওল্্স ক্রোনিয়েগারকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘রান্ডাল প্লেস-এ খুনের ব্যাপারে কিছু পেলেন?’
ক্রোনিয়েগার নিজের আঙুলগুলো মটকালেন। কট করে আওয়াজটা আমরা সবাই শুনলাম। তারপর ভদ্রলোক বলতে শুরু করলেন।
‘একটা লাশ, তাতে দুটো গুলি। দুটো বন্দুক, তবে তার থেকে কোনো গুলি চালানো হয়নি। একটু দূরে রাস্তার ওপর এক সোনালিচুলো মহিলা অন্য একজনের গাড়ি চালানোর চেষ্টা করছিলেন। ওঁর নিজের গাড়িটা একই মডেলের, সেটা তার পেছনেই রাখা ছিল। আমাদের লোকজন ওঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করার চেষ্টা করায় উনি আরও নার্ভাস হয়ে আবোল-তাবোল বকতে থাকেন। বাধ্য হয়ে আমরা ওঁকে পুলিশ স্টেশনেই নিয়ে আসি। সেখানে, একটু ধাতস্থ হলে উনি বলেন যে খুনের সময় উনি ওই ঘরেই ছিলেন, তবে খুনিকে দেখেননি।’
‘ব্যস?’ ভ্রূ কুঁচকে বললেন ওলস্।
‘ঘণ্টাখানেক আগেই হয়েছে ব্যাপারটা।’ ক্রোনিয়েগারের ভ্রূও কুঁচকে গেল, ‘এর মধ্যে আর কী জানা যাবে?’
‘খুনি কেমন দেখতে, অন্তত এটুকু তো বলতে পারবেন।’
‘লেদার জার্কিন পরা একটা লম্বা লোক— এটুকুই জেনেছি।’ ক্রোনিয়েগার চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, ‘এতে আপনার কাজ চলবে?’
‘লোকটা বাইরে, হাতকড়া লাগানো অবস্থায় আমার গাড়িতে বসে আছে।’ কোটের পকেট থেকে অটোমেটিক বের করে বললেন ওল্্স, ‘মার্লো ওকে ধরেছে। এই হল ওর বন্দুক। গুলির সঙ্গে মিলিয়ে দেখে নেবেন।’
ক্রোনিয়েগার বন্দুকটা দেখলেন, কিন্তু ছুঁলেন না। ওয়াইল্ড মুচকি হাসলেন। ওল্্স শান্তভাবে বললেন, ‘এর সঙ্গে আরও গোটা দুয়েক খুন জড়িয়ে আছে।’
ক্রোনিয়েগারের চোখগুলো জ্বলে উঠল। ওল্্স একইভাবে বললেন, ‘লিডো জেটি থেকে আজ সকালে একটা গাড়ি তোলা হয়েছে। তাতে একটা লাশও পাওয়া গেছিল। শুনেছেন নিশ্চয়?’
‘না।’ ক্রোনিয়েগারের মুখটা বেঁকে যাচ্ছিল।
‘মৃত ব্যক্তি একটি খানদানি পরিবারের ড্রাইভার ছিল।’ ভ্রূক্ষেপ না করে বলে চললেন ওল্্স, ‘ওই পরিবারের প্রধান তাঁর এক মেয়ের আচরণের জন্য ব্ল্যাকমেইলিং-এর শিকার হন। তিনি আমাদের কাছে এই ব্যাপারে সাহায্য চেয়েছিলেন। মিস্টার ওয়াইল্ড আমাকে বলেন, আমি যেন তাঁকে মার্লোর কথা বলি। মার্লো অবশ্য আমাদের কাছে এই নিয়ে মুখ খোলেনি।’
‘চমৎকার।’ ক্রোনিয়েগার দাঁত খিঁচোলেন, ‘খুনের মামলায় প্রাইভেট ডিটেকটিভ মুখ বন্ধ রেখেছে, আর আপনি তার এত তারিফ করছেন!’
‘করছি।’ ওল্্স অলসভাবে বললেন, ‘কারণ ও আপনাদের কাজ এগিয়ে রাখছিল।’
‘আমাদের কাজ?’ ক্রোনিয়েগারের প্রশ্নটা সাপের হিসের মতো শোনাল।
‘আলবাত। ওই ড্রাইভার কাল রাতে আপনার এলাকায় একটা খুন করেছিল। খুন হওয়া লোকটা হলিউড বুলেভার্ডের ওপর সাজানো দোকান থেকে পর্নোগ্রাফিক বইয়ের ব্যাবসা চালাত। বাইরে গাড়িতে যে বসে আছে, সেই ছেলেটা ওই লোকটার সঙ্গে থাকত। সঙ্গে— মানে একেবারে বিশেষরকম ‘সঙ্গে’ আর কি— বুঝতে পারছেন তো?’
‘পারছি।’ ক্রোনিয়েগারের দৃষ্টিটা স্বাভাবিক হয়ে আসছিল, ‘এ তো রীতিমতো কেচ্ছা!’
‘যেকোনো খুনের মামলাই কেচ্ছা হয়ে দাঁড়ায়, ক্যাপ্টেন।’ ওল্্স আমার দিকে ফিরে বললেন, ‘বলো।’
আমি সব বললাম। শুধু দুটো জিনিস, কেন জানি না, চেপে গেলাম। ব্রোডি-র ঘরে কারমেনের যাওয়ার ব্যাপারটা চেপে গেলাম ক্লায়েন্টকে বাঁচানোর জন্য। কিন্তু গাইগারের বাড়িতে এডি মার্সের উপস্থিতির কথাটা কেন আমি বললাম না, নিজেই বুঝিনি। পুরো সময়টা ক্রোনিয়েগার আমার চোখের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। আমার কথা শেষ হল। ক্রোনিয়েগার পেছনে হেলান দিয়ে পায়ের ওপর পা তুলে ভীষণ শান্তভাবে আমাকে বললেন, ‘তাহলে আপনি বিশেষ কোনো অপরাধ করেননি। শুধু কাল রাতে হওয়া একটা খুনের ব্যাপারে কাউকে কিছু জানাননি। আর আজ সারাদিন এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়িয়েছেন যাতে ওই ছেলেটা আর একটা খুন করতে পারে। তাই তো?’
‘হ্যাঁ।’ আমি স্বীকার করলাম, ‘আমার ভুল হয়েছিল, মেনে নিচ্ছি। আসলে আমি আমার ক্লায়েন্টকে বাঁচাতে চেষ্টা করছিলাম। তা ছাড়া ছেলেটা ব্রোডি-কে মারতে যাবে, এটা ভাবার মতো কোনো কারণ ছিল না তো।’
‘ওইভাবে কার্যকারণ বিশ্লেষণ করে ভাবার কাজটা পুলিশের।’ ক্রোনিয়েগার বললেন, ‘আপনি যদি কাল রাতেই ব্যাপারটা আমাদের জানাতেন, আজ সকালে বইগুলো সরানোর সুযোগ কেউ পেত না। বইয়ের পিছু নিয়ে ব্রোডি-র সন্ধানও ছেলেটা পেত না। মেনে নিচ্ছি, ব্রোডি আজ না হোক কাল মরতই। কিন্তু আজ ওর খুন হওয়ার দায়টা আপনার ওপরেই বর্তাবে।’
‘তা ছাড়া,’ ওয়াইল্ড সামনে ঝুঁকে আমার দিকে তাকালেন, ‘আপনি কীভাবে নিশ্চিত হচ্ছেন যে ওই ওয়েন-ই গাইগারকে খুন করেছে? হতে পারে যে ওই গাড়িতে পাওয়া বন্দুকের গুলিতেই গাইগার মরেছে। কিন্তু বন্দুকটা যদি অন্য কেউ রেখে থাকে? ধরুন… ব্রোডি! যদি ব্রোডিই খুনটা করে থাকে, তাহলে কাল রাতে ওয়েন যখন কিছুক্ষণের জন্য অজ্ঞান হয়ে গেছিল, তখন তো বন্দুকটা ব্রোডিও গাড়িতে রেখে থাকতে পারে। এটা সম্ভব কি না?’
‘সম্ভব।’ আমি বললাম, ‘কিন্তু অবাস্তব। আমি ব্রোডি-র সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা বলেছিলাম। ব্রোডি চোর-জোচ্চোর হতে পারে, কিন্তু খুনি নয়। ওর ঘরে দুটো বন্দুক ছিল, কিন্তু ও নিজের কাছে একটাও রাখেনি। অ্যাগনেসের কাছ থেকে ও গাইগারের কারবারের সম্বন্ধে জেনেছিল। সেটাতে ঢুকতে চাইছিল বলেই ব্রোডি গাইগারের ওপর নজর রাখছিল। সেই বইগুলোর লোভে ও গাইগারকে খুন করবে, তারপর ওয়েন টেলরের গাড়িতে বন্দুকটা রেখে ওকে গাড়িসুদ্ধ লিডো জেটি থেকে নীচে ফেলে দেবে— এগুলো ওর চরিত্রের সঙ্গে একেবারেই খাপ খাচ্ছে না। বরং ওয়েন টেলরের কথা ভাবুন। কাল রাতে ও ওই গাড়িটা নিয়ে বেরিয়েছিল কারমেনের পিছু নিয়ে। ওয়েন কারমেনকে ভালোবাসত। গাইগার কী করছে সেটা দেখার পর খুনের মোটিভ হিসেবে ওর ঈর্ষা আর রাগের ব্যাপারটা অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য। তা ছাড়া গাইগারকে খুন করার সুযোগও ওর কাছেই ছিল। কারমেনের সামনে ও গাইগারকে খুন করেছিল, কিন্তু ব্রোডি ও জিনিস করার মতো সাহসই পেত না।’
ওয়াইল্ড মুচকি হাসলেন। ক্রোনিয়েগার নাক ঝাড়ার মতো একটা শব্দ করলেন, কিন্তু কিছু বললেন না। ওয়াইল্ড আবার আমার দিকে ঝুঁকে বললেন, ‘গাইগারের লাশটা গুম করা হল কেন?’
‘ছেলেটা এখনও মুখ খোলেনি।’ আমি বললাম, ‘কিন্তু ও-ই লাশটা সরিয়ে রেখেছিল— আমি এ ব্যাপারে নিশ্চিত। যখন কারমেনকে ওর বাড়ি নিয়ে যাচ্ছিলাম, তখনই ছেলেটা লাভার্ন টেরেসে ফিরেছিল। গাইগারকে ওই অবস্থায় দেখেও ও পুলিশকে জানাতে পারেনি। ও কেন ওই বাড়িতে থাকে সেই নিয়ে প্রশ্ন উঠতই। তাতে গাইগার আর ওর সম্পর্কটা জানাজানি হলে বিপদ হত। তাই ও তখনকার মতো গাইগারের লাশটা সরিয়ে দেয়। কার্পেটের ওপর দাগ দেখে আমার মনে হয়েছিল, গাইগারের শরীরটা টেনে সদর দরজা দিয়ে বের করে পাশের গ্যারেজে নিয়ে যাওয়া হয়। ক্যারল, মানে ছেলেটা প্রথমে নিজের জিনিসপত্র নিয়ে পালাতেই চেয়েছিল। কিন্তু পরে নিশ্চয় ওর মনে হয় যে গাইগারের প্রতি ওর শেষ আচরণটা ঠিকঠাক হয়নি।’
‘আজ সকালে দোকানে গিয়ে ছেলেটা নিশ্চয় কিছু বুঝতে দেয়নি।’ ওয়াইল্ড মাথা নেড়ে বললেন, ‘কিন্তু চোখ-কান খোলা রেখেছিল বলে ব্রোডি’র কীর্তিটা ও দেখে ফেলে। স্বাভাবিকভাবেই ও ভেবে নেয়, এই বইগুলো তথা ব্যাবসাটা দখল করার জন্য ব্রোডিই গাইগারকে খুন করেছে। হয়তো ব্রোডি আর অ্যাগনেসের ব্যাপারটাও ও আগে থেকেই জানত। দুয়ে দুয়ে চার… আর তারপরেই খুন! আপনার কী মনে হয়, ওল্্স?’
‘আমরা এগুলো সবই জেনে-বুঝে নেব।’ ওল্্স ধীরে-ধীরে মাথা নাড়লেন, ‘তবে ক্রোনিয়েগারের সমস্যা ওটা নয়। ওঁর এলাকায় হওয়া খুনের ব্যাপারে কেন ওঁকে এত দেরিতে জানতে হল— এটাই ওঁকে জ্বালাচ্ছে, তাই না ক্যাপ্টেন?’
‘সেই জ্বালা মেটানোর একটা ব্যবস্থা করা যেতেই পারে।’ আমার দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত ঘষে বললেন ক্রোনিয়েগার।
‘আপনার কাছে কী কী আছে, দেখি এবার।’ পাত্তা না দিয়ে বললেন ওয়াইল্ড।
আমি পকেট খালি করে টেবিলে পর পর সাজিয়ে দিলাম তিনটে প্রমিসরি নোট, জেনারেল স্টার্নউডকে পাঠানো গাইগারের কার্ড, কারমেনের ফটো আর ওই গাইগারের বাড়িতে পাওয়া নীল নোটবুকটা। ওর বাড়ির চাবিটা ইতিমধ্যেই ওল্্সকে দিয়ে দিয়েছিলাম। নোটগুলোয় আলতো টোকা মেরে ওয়াইল্ড বললেন, ‘এগুলো স্রেফ খোঁচানোর জন্য ছিল, তাই না? জেনারেল টাকাটা দিয়ে দিলে শুরু হত আসল জিনিসের জন্য চাপ। সেই আসল জিনিসটা কী হতে পারে, আপনি জানেন মার্লো?’
আমি মাথা নেড়ে ‘না’ বোঝালাম।
‘আপনি সবটা বলেছেন তো?’
‘আমি কয়েকটা ব্যক্তিগত জিনিস বলিনি, মিস্টার ওয়াইল্ড। ওগুলো আমি বলবও না।’
ক্রোনিয়েগার ঘেন্না আর রাগ মেশানো একটা আওয়াজ করলেন। ওয়াইল্ড কিন্তু গলাটা নীচু রেখেই জানতে চাইলেন, ‘কেন?’
‘কারণ আমার ক্লায়েন্টের ওটুকু নিরাপত্তা প্রাপ্য। গ্র্যান্ড জুরির সামনে আমি সেগুলো বলতে বাধ্য। কিন্তু তার আগে অবধি ‘‘প্রাইভেট’’ ডিটেকটিভ লাইসেন্সের সুবাদে মুখ বন্ধ রাখার অধিকার আমার আছে। এই মুহূর্তে হলিউড ডিভিশনের হাতে দুটো খুনের মামলা আছে, কিন্তু দুটোরই মীমাংসা হয়ে গেছে। খুনের কারণ, অস্ত্র, খুনি— সবই রয়েছে তাদের হাতে। এই ব্ল্যাকমেইলের ব্যাপারটা এর মধ্যে আনার কোনো দরকার নেই।’
‘কেন?’ ওয়াইল্ড আবার বললেন।
‘পুলিশ একজন ‘‘প্রাইভেট’’ ডিটেকটিভের হুকুমের চাকর বলে বোধ হয়।’ গলায় বিষ মিশিয়ে বললেন ক্রোনিয়েগার।
‘কারণটা আমি দেখাচ্ছি।’ বলে আমি উঠে দাঁড়িয়ে ঘর থেকে বেরোলাম। সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে নিজের গাড়ি থেকে বইটা নিলাম। পুলিশের গাড়ির ড্রাইভারটি ওলসের গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। গাড়িতে বসে থাকা ক্যারলের দিকে ইশারা করে আমি ড্রাইভারটিকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ও কিছু বলেছে?’
‘যা বলেছে,’ ড্রাইভারটি একদলা থুতু ফেলে বলল, ‘সেটা নিয়ে আমি এখনকার মতো মাথা ঘামাচ্ছি না।’
আমি স্টাডিতে ফিরে গিয়ে ওয়াইল্ডের টেবিলে বইটা রাখলাম। কাগজের মোড়ক খুলে দিলাম। ক্রোনিয়েগার ডেস্কের অন্য প্রান্তের ফোনটা থেকে কাউকে কিছু বলছিলেন। তিনিও ফোনটা রেখে বসে পড়লেন। ওয়াইল্ড স্থির মুখে বইটা উলটে-পালটে দেখলেন, তারপর ওটাকে ক্রোনিয়েগারের দিকে ঠেলে দিলেন। ক্রোনিয়েগার বইটা খুলে কয়েক পাতা উলটেই সেটা বন্ধ করে সরিয়ে দিলেন। ভদ্রলোকের গালে কয়েকটা লালচে ছোপ ধরেছিল এর মধ্যেই।
‘বইয়ের একদম শুরুতে যে কাগজটা আছে, তাতে স্ট্যাম্প মারা তারিখগুলো দেখুন।’ আমি ক্রোনিয়েগারকে বললাম। ক্রোনিয়েগার ওই অংশটা খুলে উৎসুক হয়ে আমার দিকে তাকালেন।
‘দরকার হলে,’ আমি বললাম, ‘শপথ নিয়ে বলব যে ওই বইটা গাইগারের দোকানে ছিল। অ্যাগনেস, যে ইতিমধ্যেই আপনাদের হেফাজতে রয়েছে, বলবে ওই দোকানে কী ব্যাবসা হত। যে কেউ বুঝবে যে ওই দোকানটা আসলে দেখনসার আর তার আড়ালে অন্য কিছুর ব্যাবসা চলত। হলিউড পুলিশ যেকোনো কারণে সেই ব্যাবসাটা চলতে দিয়েছে। গ্র্যান্ড জুরি ওই কারণগুলো জানতে চাইবে।’
‘তা চাইবে।’ ওয়াইল্ডের বত্রিশ পাটি বেরিয়ে এল এবার, ‘ওঁরা এইসব প্রশ্ন করতে বড্ড ভালোবাসেন।’
ক্রোনিয়েগার এক ঝটকায় উঠে দাঁড়ালেন। মাথায় টুপিটা চাপিয়ে বললেন, ‘এই ঘরে আমি যে সংখ্যালঘু, সেটা দেখতেই পাচ্ছি। আমি হোমিসাইডের লোক। গাইগার পর্নোগ্রাফির ব্যাবসা করলে তাতে আমার নিজের কিচ্ছু আসবে-যাবে না। তবে হ্যাঁ, এই নিয়ে কথা উঠলে সেটা হলিউড ডিভিশনের পক্ষে ভালো হবে না। তা… আপনারা কী চান?’
ওয়াইল্ড ওল্্সের দিকে তাকালেন। ওল্্স উঠে দাঁড়িয়ে শান্ত গলায় বললেন, ‘আমরা একজন কয়েদিকে আপনার হাতে তুলে দিতে চাই। চলুন।’
একেবারে জ্বালাময়ী চোখে ওল্্সকে দেখলেন ক্রোনিয়েগার, তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। ওল্্স তাঁর পেছনে গেলেন। দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল।
‘একজন পুলিশ অফিসারের পক্ষে এটা হজম করা কত কষ্টকর, বুঝতে পারছেন নিশ্চয়।’ ওয়াইল্ডের নীল চোখ জোড়া আমার মুখের ওপর এঁটে বসল, ‘আপনাকে সব কথা বলে স্টেটমেন্ট দিতে হবে— অন্তত ফাইলের খাতিরে। দুটো খুনকে আলাদা রাখা যাবে বোধ হয়। জেনারেল স্টার্নউডের নাম দুটো কেসের কোথাও আসবে না। তবু, আপনার চামড়া নিয়ে এখনও টানাটানি হয়নি কেন বলুন তো?’
‘জানি না। সত্যি বলতে কী, আমি সব কিছুর জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিয়েই এসেছিলাম।’
‘এই ‘‘কেস’’ থেকে আপনি কত পাচ্ছেন?’
‘দিনে পঁচিশ ডলার, আর অন্য খরচা।’
‘মানে এখনও অবধি পঞ্চাশ ডলার, আর তেলের দাম।’
‘হ্যাঁ।’
‘এই ক-টা টাকার জন্য আপনি নিজেকে এমন ঝামেলায় ফাঁসিয়েছেন?’
‘এমন নয় যে আমি স্বেচ্ছায় এই হাড়িকাঠে গলা দিয়েছি।’ আমি বললাম, ‘কিন্তু আমি আর কী করতে পারি বলুন? আজ রাতে যা বলেছি, তার জন্যও জেনারেল স্টার্নউডের সঙ্গে কথা বলে নেওয়া উচিত ছিল হয়তো। আর পুলিশের কথা বলছেন? আপনি আমার চেয়েও ভালো জানেন, পুলিশের লোকেরা নিজেদের বন্ধু বা আত্মীয়দের বাঁচানোর জন্য অহরহ কত কথা চেপে যায়। সেখানে আমি তো আমার ক্লায়েন্টকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছি শুধু।’
‘ক্রোনিয়েগার আপনার লাইসেন্স বাতিল করলে সেটুকুও পারবেন না।’ ওয়াইল্ড মুচকি হেসে বললেন, ‘যে ‘‘ব্যক্তিগত’’ ব্যাপারটা নিয়ে আপনি মুখ খুললেন না, সেটা কী?’
‘আমার লাইসেন্স এখনও আছে, মিস্টার ওয়াইল্ড।’ আমি ওয়াইল্ডের চোখে চোখ রেখেই বললাম।
‘বুঝি বুঝি।’ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন ওয়াইল্ড, ‘আমার বাবা জেনারেল স্টার্নউডের বন্ধু ছিলেন। ভদ্রলোকের জন্য আমিও অনেক করেছি। কিন্তু ওঁর দুই মেয়ের জন্যই উনি শেষ হয়ে যাবেন। বিশেষ করে ওই ছোটোটাকে ঘরে আটকে রাখা উচিত। ও যে কী জিনিস…! তবে একটা কথা আপনাকে সোজাসুজি বলছি। জেনারেল আপনাকে এই কাজটা দেওয়ার সময় নির্ঘাত ভেবেছিলেন, ওঁর গুণধর জামাই এই ব্ল্যাকমেইলে জড়িয়ে আছে— তাই না?’
‘আমি রেগানের সম্বন্ধে যতটুকু শুনেছি, তাতে ওকে কিন্তু ব্ল্যাকমেইলার বলে মনে হয়নি। বরং জেনারেল রেগানকে পছন্দ করতেন, এমনটাই মনে হয়েছে।’
‘পছন্দ!’ ওয়াইল্ড নাক কুঁচকে বললেন, ‘তাতে কি আর লোকের স্বভাব বদলানো যায়? আপনি কি জানেন, জেনারেল রেগানকে খুঁজছিলেন?’
‘উনি আমাকে বলেছিলেন, রেগান কোথায় আছে, কেমন আছে— এগুলো উনি জানতে চান। রেগান ওঁকে কোনো কথা না বলে বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ায় ওঁর কষ্ট হয়েছিল।’
‘হুঁ।’ ওয়াইল্ডের গলার আওয়াজটা অন্যরকম শোনাল। সামনে রাখা জিনিসগুলো ঘেঁটে গাইগারের নীল নোটবইটা উনি একপাশে আলাদা করে রাখলেন। বাকি সব কিছু আমার দিকে ঠেলে দিয়ে ওয়াইল্ড বললেন, ‘এগুলো আমার কোনো কাজে লাগবে না। আপনি ওগুলো রাখতে পারেন।’
