মরণ ঘুম – ১৯
১৯
গাড়ি পার্ক করে যখন হোবার্ট আর্মস-এর সামনে পৌঁছোলাম, তখন রাত এগারোটা বেজে গেছে। চাবি দিয়ে দরজাটা খুলতে হল। ভেতরে শুনশান লবিতে একটা লোক বসে একটা কাগজের সান্ধ্য সংস্করণ পড়ছিল। আমাকে ঢুকতে দেখে লোকটা উঠে দাঁড়াল। পাশে রাখা টুপিটা মাথায় চাপিয়ে বলল, ‘বড়োসাহেব তোমার সঙ্গে কথা বলতে চান। অনেক দেরি করিয়ে দিয়েছ। এখন চলো।’
আমি লোকটার তুবড়ে যাওয়া নাক আর কানের দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘কী নিয়ে কথা?’
‘তাতে তোমার কী?’ লোকটার ডান হাত ওর কোটের ওপরদিকে উঠে এসেছিল, ‘তোমাকে সহজ প্রশ্ন করা হবে। তুমি তার সহজ উত্তর দেবে। কেউ চোট পাবে না। ব্যস।’
‘আমার গায়ে পুলিশের গন্ধ লেগে আছে।’ আমি বললাম, ‘আমি ক্লান্ত। এত ক্লান্ত যে কথা বলতে পারব না। এত ক্লান্ত যে খেতেও পারব না। তাই এডি মার্সের হুকুম মানা আমার পক্ষে এখন এক্কেবারে অসম্ভব। তোমার অন্যরকম কিছু মনে হলে পকেট থেকে হাত বের করার আগে তোমার একটা কান আমি উড়িয়ে দেব।’
‘ইয়ার্কি মেরো না।’ লোকটার দুটো ভ্রূ জোড়া লেগে গেল প্রায়, ‘তোমার কাছে বন্দুক নেই।’
‘ছিল না।’ আমি বললাম, ‘এখন আছে।’
‘বেশ।’ লোকটা আলগাভাবে হাত নেড়ে বলল, ‘এখনকার মতো তুমিই জিতলে। গুলিগোলা চালাতে হবে— এ কথা আমাকে কেউ বলেনি। তবে তোমাকে ওঁর সঙ্গে কথা বলতে হবে। শিগ্্গিরি।’
‘দেখা যাবে।’ বলে আমি লোকটার দিকে ঠায় চেয়ে রইলাম। লোকটা ধীরেসুস্থে আমাকে পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে গেল। আমি লিফটে চেপে নিজের ঘরের দিকে গেলাম। ঘরে গিয়ে কারমেনের বন্দুকটা বের করে হাসিই পাচ্ছিল। অত ছোটো জিনিস একটা হাতিয়ার পকেটে রেখে অমন দশাসই এক গুন্ডাকে ভয় দেখানোর চেষ্টাটা নেহাত বোকামো ছিল। একটা ড্রিঙ্ক বানিয়ে আমি বন্দুকটাকে তেল দিয়ে পরিষ্কার করছিলাম আপন মনে। তখনই ফোন বাজল।
‘হঠাৎ বীরপুরুষ হওয়ার সাধ জাগল কেন?’ ওপাশ থেকে এডি মার্সের গলা ভেসে এল।
‘কারণ আমি বীর এবং পুরুষ। আপনার জন্য কী করতে পারি?’
‘ওখানে পুলিশ থিকথিক করছে। আমাকে ওই ঝামেলায় জড়াননি তো?’
‘কেন জড়াব না?’
‘কারণ, আমি ভালো তো ভালো, আর মন্দ হলে ভীষণ মন্দ।’
‘আপনি মন দিয়ে শুনছেন তো? আমার দাঁতকপাটি লেগে যাচ্ছে কিন্তু!’
একটা শুকনো হাসির শব্দ পেলাম। তারপর নীচু, ক্রূর গলাটা বলল, ‘আমাকে জড়িয়েছেন, না জড়াননি?’
‘জড়াইনি।’ আমি সত্যি কথাই বললাম, ‘কেন জড়াইনি, আমি নিজেই জানি না। হয়তো আপনাকে ছাড়াই ব্যাপারটা বড়ো বেশি জটিল হয়ে গেছিল বলে আপনার কথা বলিনি।’
‘ধন্যবাদ। কিন্তু খুনটা কে করল তাহলে?’
‘খুনি এমন কেউ যাকে আপনি চেনেন না, হয়তো নামও শোনেননি। এর বেশি এখন জানতে চাইবেন না।’
‘যা বলছেন তা যদি সত্যি হয়, তাহলে আমি আপনার একটা উপকার করতে পারি।’
‘পারেন। ফোনটা রেখে দিন। আমি ঘুমোতে যাই।’
শুকনো হাসিটা আবার পেলাম। তারপর আবার সেই প্রশ্নটা এল, ‘আপনি রাস্টি রেগানকে খুঁজছেন, তাই না?’
‘অনেকেই সেরকম ভাবছে, মিস্টার মার্স। কিন্তু আমি ওকে খুঁজছি না।’
‘যদি খোঁজেন, তাহলে সমুদ্রের ধারে আমার ডেরায় একবার আসুন। যেকোনো সময়। এলে সত্যিই খুশি হব।’
‘হয়তো আসব।’
‘দেখা হবে তাহলে।’
ফোনটা কেটে গেল। আমি কিছুক্ষণ ওটা হাতে নিয়ে ভেতরে-ভেতরে ফুটলাম। তারপর স্টার্নউডের বাড়িতে ফোন করলাম। চারবার রিং হওয়ার পর ওপাশ থেকে বাটলার নরিস পালিশ-করা গলায় বললেন, ‘জেনারেল স্টার্নউডের বাড়ি থেকে বলছি।’
‘আমি মার্লো। আমাকে মনে আছে? আপনার সঙ্গে গত শতাব্দীতে— না, গতরাতেই দেখা হয়েছিল।’
‘হ্যাঁ, মিস্টার মার্লো। আমার মনে আছে।’
‘মিসেস রেগান বাড়ি আছেন?’
‘আছেন। আপনি কি তাঁর সঙ্গে…’
‘না।’ আমার মাথায় অন্য একটা ভাবনা এল বলে মাঝপথেই বলে উঠলাম, ‘আপনিই বরং ওঁকে একটা কথা বলে দেবেন। ওঁকে বলবেন, আমার কাছে সবক’টা ছবি আছে। এও বলবেন যে সব ঠিক আছে।’
‘হ্যাঁ…কী…’ এই প্রথম গলাটা কেঁপে গেল, ‘আপনার কাছে সবকটা ছবি আছে, আর সব ঠিক আছে। হ্যাঁ, স্যার। আর… আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।’
পাঁচ মিনিটের মধ্যে আবার ফোন বাজল। ততক্ষণে ড্রিঙ্কটা শেষ করে আমার একটু একটু খিদে পাচ্ছিল। ফোন না ধরে বরং খেতে গেলাম। যখন ফিরলাম, তখনও ফোন বাজছিল। রাত সাড়ে বারোটা অবধি প্রতি পাঁচ মিনিট পর পর ফোন বেজে গেল। আমি আলো নিভিয়ে, জানলা খুলে, কাগজ গুঁজে ফোনের ঘণ্টিটাকে যথাসম্ভব মৃদু করে দিয়ে শুয়ে পড়েছিলাম তার আগেই।
পরদিন সকালে ব্রেকফাস্টের ফাঁকে তিনখানা খবরের কাগজ পড়ে শেষ করলাম। কোনো কাগজেই লিডো জেটিতে ‘আত্মহত্যা’ করা ওয়েন টেলরের সঙ্গে লরেল ক্যানিয়নের ধারে হওয়া খুনের কোনো যোগসূত্র স্থাপন করা হয়নি। ওয়েন টেলর একটি ধনী পরিবারের ড্রাইভার ছিল— এ কথা বলা হয়েছে। গাড়ির ফটোতেও নাম্বার প্লেটটা ঝাপসা করে দেওয়া হয়েছে। অসুখ বিসুখ আর হতাশায় নাকি ভুগছিল ওয়েন। ও আদতে ডুবুক-এর বাসিন্দা বলে শেষকৃত্যের জন্য ওর মৃতদেহ সেখানেই পাঠানো হবে। কোনো ইনকোয়েস্ট হবে না।
স্টার্নউড পরিবার, বার্নি ওল্্স বা আমার কোনো উল্লেখ কোথাও ছিল না।
হলিউড ডিভিশনের ক্যাপ্টেন ক্রোনিয়েগার দুটো খুনেরই সমাধান করেছেন চমকপ্রদ গতিতে। তাঁর বক্তব্য, খুনগুলো হয়েছিল টাকাপয়সা নিয়ে। গাইগার নাকি হলিউড বুলেভার্ডে নিজের বইয়ের দোকানের মাধ্যমে টাকা পাঠানো আর পাওয়ার একটা ব্যাবসা চালু করেছিল। সেই টাকা নিয়ে ব্রোডি আর গাইগারের মধ্যে ঝামেলা হয়। সেই নিয়ে ব্রোডি গাইগারকে খুন করে। বদলা নেওয়ার জন্য ক্যারল লুন্ডগ্রেন ব্রোডিকে গুলি করে। সে স্বীকারোক্তি দিয়েছে। পুলিশ গাইগারের সেক্রেটারি অ্যাগনেস লজেলকেও সাক্ষী হিসেবে রেখেছে।
এ সব পড়ার পরেও লোকে আলাদা করে গল্পের বই কেনে? কেন?
