মরণ ঘুম – ২৬
২৬
সন্ধে সাতটা নাগাদ বৃষ্টি ধরে এল। সান্তা মনিকায় জল ড্রেন ছাপিয়ে রাস্তা দিয়েও কলকলিয়ে বইছিল। পেছল ফুটপাথ ধরে সাবধানে হেঁটে আমি ফুলওয়াইডার বিল্ডিং-এর সরু লবিতে ঢুকলাম। অনেকটা ভেতরে একটা আলো জ্বলছিল। নোংরা দেওয়াল, নোংরা সব কিছু, বেশিরভাগ অফিসঘরের পাশে কারো নাম না থাকা, যেগুলো আছে সেগুলোতেও আসলে কী কাজ হয় সেই নিয়ে প্রশ্ন— সব মিলিয়ে বাড়িটাকে এড়িয়ে যেতে পারলেই খুশি হতাম। লিফটের ভেতরে একটা টুলে বসে এক লিফটম্যান মুখ হাঁ করে ঘুমোচ্ছিল। তার পোশাক আর লিফটের অবস্থা— দুটোর কোনোটাই ঠিক ভরসা জাগাল না। নোংরা আর গুমোট সিঁড়ি বেয়ে চারতলায় উঠে শ্বাস নিতে পারলাম।
আঁশটে গন্ধে ভরা মলিন করিডোর ধরে এগিয়ে কোনার কাছে একটা অফিসে তিনটে দরজা দেখলাম। তার মধ্যে একটা ফ্রস্টেড কাচ বসানো দরজার ওপর ‘এল ডি ওয়ালগ্রিন— বিমা’ লেখা একটা ফলক আঁটা ছিল। একটা গাঢ়রঙা দরজা বন্ধ ছিল। অন্যটার ওপর ‘প্রবেশ’ লেখা আছে দেখে সেটা খুলে ভেতরে ঢুকলাম। রিসেপশনের অংশটা অন্ধকার ছিল। ভেতরের ঘরের দরজা বন্ধ থাকলেও সেখানে জ্বলা উজ্জ্বল আলোয় হ্যারি জোনসের সিল্যুয়েট দেখা যাচ্ছিল। সরু গলায় ও বলছিল, ‘ক্যানিনো? হ্যাঁ, আমি আপনার নাম শুনেছি তো।’
আমি থমকে গেলাম। এবার অন্য একটা গলা ভেসে এল। একটা খুব শক্তিশালী ইঞ্জিনের শব্দ দেওয়ালের ওপাশ থেকে যেমন শোনাবে, তেমন একটা অদ্ভুত ঘড়ঘড়ে ভঙ্গিতে কেউ বলে উঠল, ‘আমিও তাই ভেবেছিলাম।’
গলাটাতে একটা দারুণ বিপদের আভাস ছিল। হ্যারির পাশাপাশি এবার আরেকটা মানুষের চেহারা দেখা দিল— বেলুনের মতো, অন্ধকারসর্বস্ব। খেয়াল হল, আমার সঙ্গে কোনো বন্দুক নেই!
নিঃশব্দে পিছিয়ে এসে ভেতরের ঘরের পাশের অন্য ঘরটায় যাওয়ার চেষ্টা করলাম। সেটার দরজা তালাবন্ধ থাকলেও ফ্রেম থেকে কাঠ একটু আলগা হয়ে ছিল। আমি চাবির হাতলটা যথাসম্ভব জোরে চাপ দিয়ে পেছনে ঠেললাম। তারপর ফ্রেম আর কাঠের মধ্যের ফাঁক দিয়ে আলতো করে আমার ড্রাইভিং লাইসেন্সের ওপরের শক্ত প্লাস্টিকটা ঢুকিয়ে হাতল আর দরজার ফাঁকে রাখলাম। তারপর দরজার হাতলটা ঘোরালাম। বাধা পাওয়ার মতো কিছু না পেয়ে তালাটা খুলে গেল। একটা খুব হালকা কিন্তু স্পষ্ট ‘ক্লিক’ করে আওয়াজ হল। আমি পাথরের মতো স্থির হয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। কেউ আমার দিকে ছুটে এল না। আমি দরজাটা নিঃশব্দে খুলে ভেতরে ঢুকলাম। সামনে একটা টেবিল, তার ওপর কালচে স্তূপের মতো একটা টাইপরাইটার, তার ওপাশে পাশের ঘরে যাওয়ার দরজা। আমি সাবধানে সেদিকে এগিয়ে কান পাতলাম।
‘আরেকজন লোক কী করছে, কোথায় যাচ্ছে— এগুলো জানার ইচ্ছে সবারই হয়।’ ঘড়ঘড়ে গলাটা আগের চেয়ে মসৃণ শোনাচ্ছিল, ‘তুমি সেভাবেই ওই ডিটেকটিভকে দেখলে কারো কিচ্ছু আসত-যেত না। কিন্তু একটা ভুল করে ফেলেছ, হ্যারি। আজই ওর সঙ্গে দেখা করতে গেলে কেন? কাল রাতেই ও মিস্টার মার্সকে বলেছিল যে কেউ নাকি ওর পিছু নিয়েছে। তাই মিস্টার মার্স কে-কেন-কোথায়— এইসব প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইছেন।’
‘এর মধ্যে মিস্টার মার্স আসছেন কোত্থেকে?’ জোনসের গলায় একটা চাপা হাসির ভাব মিশে ছিল। লোকটার সত্যিই সাহস আছে!
‘সেটা জানা তোমার কাজ নয়, হ্যারি। তুমি আমার প্রশ্নের উত্তর দাও।’
‘আমি তো আপনাকে বলেইছি একবার। ঠিক আছে, আবার বলছি। অ্যাগনেস এখান থেকে চলে যেতে চায়। কিন্তু তার জন্য টাকা লাগবে। আমি মার্লোর কাছে গেছিলাম সেটার জোগাড় করতে।’
‘আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিয়ো না।’ গলাটা ধারালো হয়ে উঠল, ‘গোয়েন্দারা কাউকে এমনি এমনি টাকা দেয় না। আসল কথাটা বলো।’
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে জোনস বলল, ‘যে রাতে ব্রোডি খুন হয়, সেই রাতে মার্লো ওখানে ছিল। ব্রোডি কারমেন স্টার্নউডের একটা ফটো কাজে লাগিয়ে কিছু কামানোর চেষ্টা করছিল। মার্লো সেটা ঠেকাতেই ওখানে গেছিল। ওই সময় কারমেন নিজেও ওখানে যায়, একটা গুলিও চালায়— তবে সেটা কারো গায়ে লাগেনি। এই ব্যাপারটা মার্লো পুলিশের কাছ থেকে বেমালুম চেপে গেছিল ক্লায়েন্টকে বাঁচানোর জন্য। আমি আর অ্যাগনেস ভেবেছিলাম, সেটা নিয়ে আমরাও চুপচাপ থাকার জন্য ওর কাছ থেকে কিছু আদায় করা যাবে।’
‘মার্লো এই কথা শুনে কী বলল?’
‘ও টাকা দেবে। কাল।’
‘তাহলে এর সঙ্গে এডি মার্সের কোনো সম্পর্ক নেই?’
‘একেবারেই না।’
‘তাহলে মিস্টার মার্সের সঙ্গে একবার এই নিয়ে কথা বলতে হবে। কিন্তু তার আগে বলো, অ্যাগনেস এখন কোথায় আছে?’
‘এটা তো বলা যাবে না, ক্যানিনো।’
‘এখানে বললে তোমার পক্ষেই ভালো হত। নইলে কথাটা বের করার জন্য তোমাকে যাদের হাতে তুলে দিতে হবে, তাদের ব্যবহার তোমার একেবারেই ভালো লাগবে না।’
‘পারব না, ক্যানিনো। এখন অ্যাগনেসের দায়িত্ব আমার ওপর। আমি ওকে এসবের মধ্যে আনতে চাই না।’
সব কিছু চুপচাপ হয়ে রইল কিছুক্ষণ। বাইরে বৃষ্টির বেগ বেড়েছিল, জানলায় তারই শব্দ পাচ্ছিলাম শুধু। দরজার ফাঁক দিয়ে সিগারেটের কটু গন্ধ আসছিল। আমার খুব কাশি পাচ্ছিল, তাই মরিয়া হয়ে রুমালটা কামড়ে ধরে নিজেকে সামলে নিলাম।
‘আমার হাতের জিনিসটা দেখতে পাচ্ছ?’ ঘড়ঘড়ে গলাটা শান্তভাবে বলে উঠল, ‘কেন ছেলেমানুষি করছ? বলে দাও ও কোথায় আছে। আমি কথা বলে নিচ্ছি।’
‘ও জিনিস আমি আগেও দেখেছি।’ জোনসের গলাটা ঈষৎ কেঁপে গেল, ‘আপনার যা ইচ্ছে তাই করুন।’
অদ্ভুত একটা হাসির শব্দ পেলাম দরজার ওপাশ থেকে। তারপর সব চুপচাপ রইল কিছুক্ষণ। জোনস একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘নাহ, আমি নিজেকে যতটা সাহসী ভাবতাম ততটা বোধ হয় নই। বেশ, শুধু কথা বলতে চাইলে… বাংকার হিলের ওপরে আঠাশ নম্বর কোর্ট স্ট্রিট একটা অ্যাপার্টমেন্ট হাউস। তিনশো এক নম্বর ঘরে ও আছে।’
‘এই তো।’ ঘড়ঘড়ে গলাটা মসৃণ, স্নেহশীল শোনাচ্ছিল, ‘শুধু শুধু আমাকে চটাচ্ছিলে কেন? তাহলে চলো, আমরা ওখানে গিয়ে অ্যাগনেসের সঙ্গে কথা বলি। আমার মনে হচ্ছে ও মেয়ে তোমাকেও ঘোল খাওয়াচ্ছে। সে তোমার আর ওর ব্যাপার। ইচ্ছে হলে গোয়েন্দাটির মাথায় হাত বুলিয়ে যা কামানোর, সে তুমি কামিয়ে নিয়ো। কিন্তু এখন এই নিয়ে মন খারাপ কোরো না। তোমার কাছে গলা ভেজানোর মতো কিছু আছে?’
‘আছে।’ চেয়ার পেছনে ঠেলার শব্দ পেলাম, ‘ওই ড্রয়ারে।’
‘বাব্বা!’ যেন খুব মজা পেয়েছে এই ভঙ্গিতে গলাটা বলে উঠল, ‘এই খাইয়ে বিমা করানো হয় বুঝি?’
তরল ঢেলে দুটো গ্লাস টেবিলে রাখা হল। বড়ো কয়েকটা ঢোঁক গেলার আওয়াজ পেলাম। তারপরেই জোনস কেশে উঠল। ধুপ করে একটা ভারী গ্লাস নীচে পড়ার, তারপর আবার কাশির মতো একটা আওয়াজ পেলাম। নিজের অজান্তেই রেইনকোটটা আঁকড়ে ধরেছিলাম সেই মুহূর্তে— হয়তো নিজেকে স্থির রাখতেই।
‘এক চুমুকেই বেহেড হয়ে গেলে, হ্যারি?’ গলাটা বলে উঠল।
সাড়া এল না। টেনে টেনে শ্বাস নেওয়ার শব্দ কমে গেল একটু পরেই। আবার চেয়ার ঠেলার শব্দ পেলাম। গলাটা বলে উঠল, ‘আসি তাহলে?’
ক্লিক করে একটা শব্দের পর ঘরটা অন্ধকার হয়ে গেল। দরজা খুলল, বন্ধ হল। তারপর ভারী, নিশ্চিন্ত পায়ের শব্দটা করিডোর হয়ে বাইরে মিলিয়ে গেল।
আমি নিঃশব্দে পাশের ঘরে ঢুকলাম। টেবিলের ওপাশে একটা চেয়ারে হ্যারি জোনসের শরীরটা অন্ধকারেও দুমড়ে বসে ছিল। সেদিকে না গিয়ে আগে করিডোরের লাগোয়া দরজাটার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। লিফট নেমে যাওয়ার পিং শব্দটা ভেসে এল।
হাতে রুমাল জড়িয়ে সুইচ টিপলাম। মাথার ওপর বড়ো আলোটা জ্বলে উঠল। হ্যারি জোনসের শরীরটা আমার দিকে তাকিয়ে রইল। ওর চামড়ার নীলচে রং আর পোশাকে লেগে থাকা বমি বুঝিয়ে দিচ্ছিল, মৃত্যুর কারণ বিষক্রিয়া। মাটিতে পড়ে একদিকে গড়িয়ে যাওয়া গ্লাসটা তুলে খুব সাবধানে শুঁকলাম। বুর্বঁ-র পোড়া পোড়া গন্ধর তলায় বাদামের হালকা গন্ধ বলছিল, বিষটা সায়ানাইড। এক ঝলক এদিক-ওদিক তাকিয়ে দ্বিতীয় গ্লাসটা খুঁজে পেলাম না।
চেয়ারটাকে পাশ কাটিয়ে টেবিল হাতড়ে টেলিফোন ডাইরেক্টরি বের করলাম। ফোনটা তুলে, টেবিল থেকে যতটা পারা যায় দূরে সরে গেলাম। তারপর ইনফরমেশনে ফোন করে বললাম আঠাশ নম্বর কোর্ট স্ট্রিটের তিনশো এক নম্বর অ্যাপার্টমেন্টের নম্বরটা দিতে। বাদামের তিতকুটে গন্ধটা আমার স্নায়ুতে ছড়িয়ে পড়ছিল। তার মধ্যেই ফোনের ও-প্রান্ত বলে উঠল, ‘বাড়ির নাম গ্লেনডাওয়ার অ্যাপার্টমেন্টস। নম্বর হল ওয়েন্টওয়ার্থ দুই-পাঁচ-দুই-আট।’
ধন্যবাদ জানিয়েই আমি নম্বরটা ডায়াল করলাম। তিনবার রিং হওয়ার পর কেউ একজন ফোন তুলল। রেডিয়োর চড়া সুর ছাপিয়ে একটা হেঁড়ে গলা শুনতে পেলাম, ‘হ্যালো!’
‘অ্যাগনেস আছে?’
‘অ্যাগনেস!? কত নম্বর চাইছেন?’
‘ওয়েন্টওয়ার্থ দুই-পাঁচ-দুই-আট।’
‘নম্বর ঠিক। কিন্তু নারীর বদলে আনাড়ি জুটল যে!’
লোকটার খ্যাঁক খ্যাঁক শুনতে শুনতে ফোন নামিয়ে রাখলাম। ডাইরেক্টরি হাতড়ে গ্লেনডাওয়ার অ্যাপার্টমেন্টস-এর ম্যানেজারের নম্বর খুঁজে বের করলাম। ডায়াল করতে করতেও বুঝতে পারছিলাম, সময় ফুরিয়ে আসছে। ক্যানিনো-র হাত ধরে মৃত্যু এগিয়ে যাচ্ছে ওই বাড়িটার দিকে।
‘গ্লেনডাওয়ার অ্যাপার্টমেন্টস। ম্যানেজার স্কিফ বলছি।’
‘আমি পুলিস আইডেন্টিফিকেশন ব্যুরো থেকে ওয়ালিস বলছি। আপনাদের ওখানে অ্যাগনেস বলে কেউ থাকেন?’
‘আপনি কে?’
মাথা ঠান্ডা রেখে ‘পরিচয়’ আর প্রশ্ন— দুটোরই পুনরাবৃত্তি করলাম।
‘আপনার নম্বরটা দিন। আমি খোঁজ নিয়ে দেখছি।’
‘ইয়ার্কি মারবেন না!’ পাক্কা পুলিশি কায়দায় খিঁচিয়ে উঠলাম, ‘তাড়া আছে বলেই ফোন করছি। ওরকম কেউ আছেন, না নেই?’
‘নেই।’ আড়ষ্ট ভঙ্গিতে উত্তর এল।
‘তাহলে সোনালি চুলের কোনো মহিলা, যাঁর চোখজোড়া সবুজ…’
‘শুনুন!’ এবার স্কিফও গরম হল, ‘এটা কী ধরনের জায়গা বলে আপনি মনে করেছেন? এখানে ভদ্রমহিলা আর ভদ্রলোকেরা থাকেন। তাঁদের সম্বন্ধে এইরকম প্রশ্ন…’
‘আমাকে জায়গা চেনাবেন না, মিস্টার স্কিফ।’ আমার গলাটা ঠান্ডা হয়ে গেল, ‘এখনই যদি আপনার ওখানে ভাইস স্কোয়াড পাঠাই তাহলে ক’জন ভদ্রলোক আর ক-জন ভদ্রমহিলা পাওয়া যাবে— তা হাতে গুনে বলা যায়। তারপর আমি আপনাকে চেনাব…’
‘চটছেন কেন?’ স্কিফের গলাটা মোলায়েম হয়ে গেল, ‘পুলিশের সঙ্গে সহযোগিতা করাই তো আমাদের কর্তব্য। হ্যাঁ, সোনালি চুলের মহিলা কয়েকজন আছেন ঠিকই, তবে তাঁদের চোখের রং দেখিনি। আপনি যাঁকে খুঁজছেন, তিনি কি একাই থাকেন?’
‘একা, তবে একজন সঙ্গীও থাকতে পারেন। তিনি বেঁটেখাটো, চোখগুলো উজ্জ্বল। মুশকিল হল, আমাকে বলা হয়েছিল মহিলা তিনশো এক নম্বরে থাকেন। কিন্তু সেখানে ফোন করে এক হাঁড়িচাচার সঙ্গে আলাপ হল।’
‘তিনশো এক-এ এক গাড়ির সেলসম্যান থাকে। ওখানে কোনো মহিলা থাকেন না।’
‘তাহলে গিয়েই দেখি।’
‘আসুন, তবে দয়া করে ব্যাপারটা চুপচাপ রাখবেন। বোঝেনই তো। সোজা আমার ঘরে চলে আসুন, তারপর খোঁজাখুঁজি করবেন না হয়।’
স্কিফকে ধন্যবাদ দিয়ে টেবিলের দিকে ফিরলাম। হ্যারি জোনসের উদ্দেশে বললাম, ‘শেষ মুহূর্তেও ধাপ্পাটা ভালোই দিলে হ্যারি। মিথ্যে বললে, তারপর গ্লাসে কী আছে তা জেনেও চুপচাপ খেয়ে নিলে। তোমাকে আর যাই বলি, ফালতু লোক বলতে পারব না কক্ষনো।’
ওর খানাতল্লাশি নিলাম। কাজটা করতে ভয়ানক খারাপ লাগছিল, কিন্তু আমার কোনো উপায় ছিল না। মিস্টার ল্যাশ ক্যানিনো একজন সাহসী পুরুষ। তিনি অকুস্থলে ফিরে এসে ওকে ঘেঁটে অ্যাগনেসের কোনো সন্ধান পেলে হ্যারি-র মৃত্যুটা অনর্থক হবে। আলো নিভিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিলাম, ঠিক তখনই ফোনটা বেজে উঠল। আমি নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম কিছুক্ষণ, তারপর পিছিয়ে এসে, আলো জ্বেলে ফোনটা তুলে বললাম, ‘বলুন।’
‘ওখানে হ্যারি আছে?’ এক মহিলা’র গলা পেলাম। গলাটা চিনতে পারলাম।
‘না, অ্যাগনেস।’
কিছুক্ষণ সব চুপচাপ থাকার পর ও প্রান্ত সরব হল, ‘কে বলছেন?’
‘মার্লো। ভুলে যাননি তো?’
‘হ্যারি কোথায়?’ তীক্ষ্ণ গলায় প্রশ্নটা এল।
‘আমি ওকে দু-শো ডলার দিতে এসেছিলাম। বিনিময়ে ওর আমাকে কিছু কথা জানানোর ছিল। সেই প্রস্তাবটা এখনও আছে অ্যাগনেস। টাকা আমার সঙ্গেই আছে। আপনি কোথায় আছেন?’
‘ও বলেনি?’
‘না।’
‘তাহলে ওকেই জিজ্ঞেস করুন।’
‘উপায় নেই। আপনি ক্যানিনো বলে কাউকে চেনেন?’
শিউরে ওঠার শব্দটা ফোনের মধ্যে দিয়েই ভেসে এল। আমি বললাম, ‘আপনার কি দু-শো ডলার দরকার, অ্যাগনেস?’
‘দরকার। খুব খুব জরুরি দরকার।’
‘তাহলে বলুন, আমাকে কোথায় আসতে হবে।’
‘আমি… আমি… হ্যারি কোথায়?’
‘এখানে নেই। বোধ হয় পালিয়েছে। আপনি যেখানে বলবেন আমি সেখানেই পৌঁছে যাব টাকা নিয়ে। বলুন, কোথায় আসব আমি?’
‘আমি আপনাকে বিশ্বাস করি না। আপনি… ফাঁদ পাতছেন।’
‘তাতে আমার লাভ? আমি আপনাদের ফাঁসাতে চাইলে অনেক কিছুই করতে পারতাম। কিন্তু তাতে আমার কী লাভ? ক্যানিনো কোনোভাবে হ্যারি-র খবর পেয়েছে, তাই হ্যারি উধাও হয়েছে। তাই আমাকে আপনার কাছ থেকেই জিনিসটা জানতে হবে। কেন, আপনি কি আমাকে মার্সের দালাল ঠাউরেছেন নাকি?’
‘না-আ।’ গলাটা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। হ্যারি জোনস টেবিলের পেছনে বসে রইল। তারপর গলাটা আবার সরব হল, ‘আপনি আধ ঘণ্টার মধ্যে বুলক’স, উইলশায়ারের পার্কিং লটে ঢোকার পুবদিকের গেটের পাশে আসুন।’
‘আসছি।’
ফোনটা নামিয়ে রাখলাম। শুকনো বমি আর বাদামের গন্ধ মেশা বাতাস আমাকে ছুঁয়ে গেল। আলো নিভিয়ে করিডোরে বেরিয়ে এসে দরজা বন্ধ করলাম। শুনশান করিডোর পেরিয়ে লিফটের কাছে গেলাম। বোতাম টিপলাম। লিফট উঠতে শুরু করা মাত্র দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে এলাম। তারপর বৃষ্টির ছাঁট মুখে নিয়ে গাড়ির দিকে এগোলাম।
