মরণ ঘুম – ২৯
২৯
গ্যারেজটা অন্ধকার হয়ে ছিল। তুমুল বৃষ্টির জল জমে হাইওয়ে আর ফার্মহাউসের মাঝের জমি দিয়ে কলকল করে বইছিল। আমার টুপিটা গ্যারেজেই পড়ে গেছিল বলে মাথা ভিজিয়ে জল গড়াচ্ছিল নাক-চোখ ছুঁয়ে। ক্যানিনো আমার মতো ওটাকেও ফার্মহাউসে তুলে নিয়ে গেলে এভাবে ভিজতে হত না। অবশ্য ক্যানিনো ফিরে এসে আমাকে এই অবস্থায় পেলে সামান্য বৃষ্টি নিয়ে ভাবতে হবে না। একটা গুলি, তারপর পেছনের পাহাড়ের কোনো একটা গর্তে আমাকে ফেলে দিলেই গল্প শেষ।
আমার রেইনকোটের বোতামগুলো বন্ধ করা যায়নি। হাত আটকা বলে কিছু করতেও পারছিলাম না। ওভাবেই রাস্তায় এসে উঠলাম। গাড়িগুলো একটু দূর দিয়ে সাঁ সাঁ করে চলে যাচ্ছিল। জল ছিটকে আসছিল আমার দিকে। গাড়িটা যেখানে রেখে গেছিলাম সেখানেই ছিল, তবে এবার দুটো চাকাই দেখলাম মেরামত করে রাখা রয়েছে। কে জানে, আমার একটা ‘বন্দোবস্ত’ করার পর আর্টকে দিয়ে আমার গাড়িটাও রং-টং করিয়ে অন্য নামে পাচার করা হত কি না। টুলব্যাগটা দেখে মনে হল, ক্যানিনো অ্যান্ড কোং ওটার তল্লাশি নিতে ভুলে গেছে। ব্যাগ থেকে আমার নিজের বন্দুকটা বের করে কোটের ভেতরে গুঁজলাম।
হঠাৎ একটা গাড়ির উজ্জ্বল আলো আমাকে ধুয়ে দিল। হুড়মুড়িয়ে রাস্তার পাশে গভীর খাতের জল-কাদার মধ্যেই ঝাঁপ দিলাম। গাড়িটা স্পিড না কমিয়ে রাস্তা থেকে বাঁক নিল, তারপর নুড়ি আর কাদার ওপর দিয়ে ফার্মহাউসের দিকে গেল। আমি মাথা না তুলে আওয়াজগুলো শুনলাম। গাড়ি থামল, পায়ের শব্দ সরে গেল। সাবধানে সোজা হয়ে দেখলাম, গাছের পেছনে বাড়িটার দরজা খুলে বাইরে আলোর ঝলক এসে পড়ল। তারপর আবার দরজা বন্ধ হয়ে গেল, তবে বাড়িতে আলো জ্বলে রইল।
ভেজা ঘাস আর কাদার ওপর দিয়ে দৌড়ে গেলাম বাড়িটার দিকে। নিজেকে গাড়িটার আড়ালে রেখে বন্দুকটা বের করে নিলাম, তারপর দু-হাত দিয়ে ওটাকে ধরে কান পেতে রইলাম। বৃষ্টির ফোঁটা গাড়ির ছাদে আর বাড়িটার নানা জায়গায় পড়ে বিচিত্র শব্দ তুলছিল। ভেতরে আলো জ্বলছিল, তবে নড়াচড়ার আভাস পাচ্ছিলাম না। গাড়ির ভেতরটা দেখলাম তখনও উষ্ণ হয়ে আছে, চাবির গোছাও ঝুলছে। বাড়ির ভেতরে গলার আওয়াজ পাচ্ছিলাম না, তবে ওর আর মিসেস মার্সের মধ্যে কী কথাবার্তা হচ্ছে, তা আমি বিলক্ষণ বুঝতে পারছিলাম। মহিলা ওকে বোঝানোর চেষ্টা করছেন যে আমি এই ব্যাপারে নাক গলাব না কথা দেওয়ায় উনি আমাকে যেতে দিয়েছেন। ক্যানিনোর পক্ষে এটা হজম করা একেবারেই সম্ভব হবে না। ও একটু পরেই বেরিয়ে আসবে আমার সন্ধানে, তবে এবার মিসেস মার্সও ওর সঙ্গে থাকবেন। সেটা আমার পক্ষে সমস্যা তৈরি করবে।
বন্দুকটা সাবধানে নীচে নামিয়ে রেখে কিছু আলগা নুড়ি আর মাটির ঢেলা তুলে নিলাম। দু-হাত বাঁধা বলে সেগুলো খুব একটা জোরে ছোড়া গেল না। তবু সেগুলো ওই নিস্তব্ধ রাতে জানলার কাচে আর শেডে একঝাঁক গুলির মতোই আছড়ে পড়ল। গাড়ির পেছনে লুকিয়ে পড়ে তাকালাম। বাড়ির ভেতরে আলো নিভে গেছিল ওই সময়ের মধ্যেই। জানতাম, ক্যানিনো কোনো ঝুঁকি নেবে না। গাড়ির পাশে ওর জন্য অপেক্ষা করে লাভ হবে না। মরিয়া হয়ে আমি সোজা হলাম, তারপর পেছনদিকে বেঁকে গাড়ির খোলা জানলা দিয়ে নিজেকে ঢুকিয়ে দিলাম। ওভাবে ঢুকিয়েছিলাম বলেই স্টিয়ারিং-এর পেছনে আবার কোনোভাবে সোজা হতে পারলাম। এবার ইগনিশনের চাবিটা ঘুরিয়ে স্টার্টার বোতামটা হাতড়ে হাতড়ে বের করে চাপ দিতেই ইঞ্জিন গর্জে উঠল। সেই শব্দের আড়ালে দরজা খুলে নেমে আমি নিঃশব্দে গাড়ির পেছনদিকে গিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম।
পরিকল্পনাটা ছিল খুব সহজ। ক্যানিনোর কাছে আমার মৃত্যুর চেয়েও এই গাড়িটা বেশি জরুরি। ওটা বেহাত হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে ও আর বড়োকর্তা, মানে এডি মার্সের সঙ্গে আলোচনা করবে না। যা করার তা ও নিজেই করবে। ঠিক সেটাই হল। আলোর সামান্য হেরফের থেকে বুঝতে পারলাম, অন্ধকার বাড়িটার বাইরের ঘরের একটা জানলা অতি সাবধানে খুলে যাচ্ছে— ইঞ্চি ইঞ্চি করে। পরক্ষণেই জানলাটায় আগুনের শিখা দেখা গেল বেশ কয়েকবার। শব্দগুলোও বোমার মতো আছড়ে পড়ল চরাচরে। গাড়িটার সামনের কাচ ভেঙে পড়ার আওয়াজের সঙ্গেই আমি আর্তনাদ করে উঠলাম। যন্ত্রণার্ত চিৎকারটা রক্ত উঠে আসার গলগল আওয়াজের সঙ্গে মিশে ক্ষীণ হয়ে গেল।
নিজের কণ্ঠনৈপুণ্যে নিজেই মোহিত হয়ে গেলাম।
ক্যানিনো হেসে উঠল। ওর নীচু, নরম, বিষাক্ত গলার বদলে একটা খোলা গলার হাসি ভেসে এল জানলা থেকে। তারপর সব চুপচাপ হয়ে রইল কিছুক্ষণ— শুধু বৃষ্টির শব্দ, আর গাড়ির মৃদু গর্জন ছাড়া। তারপর বাড়িটার দরজা খুলে গেল। অন্ধকারের মধ্যে আরও ঘন অন্ধকারের মতো দেখাল ঘরটা। সেখান থেকে কেউ বেরিয়ে এল। তার গলায় ঝিকিয়ে ওঠা একটা হার, মাথার রুপোলি চুল, আর পুতুলের মতো নিষ্প্রাণ ভঙ্গি বলছিল, মানুষটি মিসেস মার্স। তার ঠিক পেছনেই নীচু হয়ে একতাল অন্ধকারের মতো বেরিয়ে এল ক্যানিনো।
মহিলা গাড়ির দিকে এগোলেন ঠিক পুতুলের মতো করেই। একটু এগিয়ে অসহায়ভাবে উনি বলে উঠলেন, ‘কাচগুলো সব ধোঁয়াটে হয়ে আছে। ভেতরে কে আছে কী করে দেখব?’
উত্তরে কোনো কথা শুনলাম না। মহিলার শরীরটা একটা ঝাঁকুনি খেয়ে আবার সোজা হল। ওই ভাষাটা আমি বুঝি। একটা বন্দুক ওঁর শরীরে চেপে ধরা হয়েছে। মহিলা গাড়ির আরও কাছে এলেন। ওঁর পেছনে ক্যানিনোর শরীরটা আমি এবার স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছিলাম।
‘এই তো!’ মহিলা সুরেলা গলায় আর্তনাদ করে উঠলেন, ‘ও স্টিয়ারিং-এর পেছনে রয়েছে! ওর গুলি লেগেছে ল্যাশ।’
এক ধাক্কায় মহিলাকে সরিয়ে গাড়ির ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল ক্যানিনো। ওর বন্দুক আরও তিনবার মৃত্যু বৃষ্টি করল। কাচ ভেঙে পড়ল। একটা গুলি আমার পাশ দিয়ে বেরিয়ে গিয়ে একটু দূরের গাছে বিঁধল। ভেতরে নিরীহ শক্তিশালী ইঞ্জিনটা মৃদু গর্জন তুলে চালু রইল এর মধ্যেও।
ক্যানিনোর মুখটা অন্ধকার, বৃষ্টিভেজা আকাশের পটভূমিতে ধূসর দেখালেও আমি এবার ওকে খুব খুব ভালোভাবে দেখতে পাচ্ছিলাম। মোট ছ-বার গুলি চালিয়েছিল ও। এমনিতে ওর বন্দুকে আর গুলি থাকার কথা নয়, তবে বাড়িটা থেকে বেরোনোর আগে ও যদি আবার গুলি ভরে থাকে তাহলে অন্য কথা। ব্যাপারটা অনিশ্চিত থাকলে মুশকিল। তাই আমি নিরীহভাবে প্রশ্ন করলাম, ‘হল?’
গুলি খাওয়ার মতো করেই আমার দিকে ঘুরল ক্যানিনো। ওর বন্দুকে আরও গুলি আছে কি না তা দেখার বা ওকে আরও ক-টা গুলি চালানোর সুযোগ দেওয়ার ইচ্ছে বা অবস্থা কোনোটাই আমার ছিল না। তা ছাড়া হাতকড়া পরা অবস্থায় বন্দুকটা ধরে থাকতে গিয়ে বাঁ-হাতে বড্ড টান লাগছিল। পর পর চারটে গুলি করলাম।
ক্যানিনোর হাত থেকে বন্দুকটা আগে পড়ল। তারপর ওর শরীরটা বেঁকে গেল। নিজের পেটের কাছে হাত দিয়ে ও কিছু একটা ধরতে চাইল, তারপর সোজা হওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু শেষমেষ কিছুই হল না। হাওয়ায় ক’টা আঁচড় কেটে মুখ থুবড়ে কাদামাটির ওপর পড়ে রইল ল্যাশ ক্যানিনো।
মিসেস মোনা মার্স পুতুলের মতো কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আমি জানতাম, আপনি আসবেন।’
বৃষ্টিভেজা আকাশের নীচে ক্যানিনোর শরীর, পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে থাকা মহিলা, আর হ্যারি জোনসের অদৃশ্য শরীরটার কথা ভেবে আমার, কেন জানি না, খুব হাসি পেল। পাগলের মতো হাসতে শুরু করলাম আমি। মহিলা নীচু হলেন। ক্যানিনো-র পকেট হাতড়ে একটা চেন আর তাতে লাগানো চাবি নিয়ে আমার দিকে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ওকে মারা কি সত্যিই খুব জরুরি ছিল?’
দম দেওয়া পুতুলের দম ফুরিয়ে যাওয়ার মতো করে আমার হাসিটা থেমে গেল। মহিলা আমার হাতকড়াটা খুলতে খুলতে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘বুঝেছি। দরকার ছিল।’
