মরণ ঘুম – ৩
৩
ঘরটা বিশাল। ছাদটা বড়ো বেশি উঁচু, দরজাগুলো বড়ো বেশি লম্বা। এক দেওয়াল থেকে অন্যটা অবধি ছড়িয়ে থাকা কার্পেট দুধ-সাদা রঙের। বিশাল বড়ো সব আয়না, এদিকে-ওদিকে ক্রিস্টাল, হাতির দাঁতের আসবাব, তার মাঝে ক্রোমিয়ামের হঠাৎ আলোর ঝলকানি। জানলা দিয়ে পাহাড়ের নীচের এবড়ো খেবড়ো জায়গাটা দেখা যাচ্ছিল। তবে আমি তাকিয়ে ছিলাম মিসেস রেগানের দিকে।
একটা আইভরি কুশনে ভর দিয়ে আরামকেদারায় কাত হয়ে বসে ছিলেন মহিলা। ওঁর দিকে তাকানোর কিছুক্ষণের মধ্যেই নজর পায়ের সূক্ষ্ম সিল্ক স্টকিংস বেয়ে আপনা থেকেই ঊর্ধ্বমুখী হয়ে যায়। মাখনের মতো নরম পায়ের হাঁটু, মাংসপেশি, গোড়ালি– সবই কবিদের মনে কবিতা আর আমার মতো লোকের মনে অন্যরকম ভাব জাগানোর উপযুক্ত। মনে হচ্ছিল, মহিলার দীর্ঘ শরীর জুড়ে যেন একটা বিপজ্জনক স্রোত খেলে বেড়াচ্ছে। একমাথা ঢেউ-খেলানো কালো চুল মাঝখান দিয়ে ভাগ করা। সুন্দর মুখ, নিটোল চিবুক, মানানসই ঠোঁট। তবে সব ছাপিয়ে যাচ্ছিল একজোড়া উষ্ণ চোখ, যা আমি ইতিমধ্যেই পোর্ট্রেটে আর গ্রিনহাউসে দেখে এসেছি।
‘তাহলে আপনি একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভ।’ নিজের হাতে ধরা গ্লাসের ওপর দিয়ে আমার দিকে তাকালেন মহিলা, ‘আমার ধারণা ছিল তাদের শুধু গল্পের বইয়েই দেখতে পাওয়া যায়।’
এই কথার উত্তরে আমার কিছুই বলার ছিল না, বলিওনি। মহিলা গ্লাসটা রাখলেন। হাতের মুক্তোটা দেখে, নিজের চুলে হাত বুলিয়ে নিলেন। তারপর বললেন, ‘বাবাকে কেমন লাগল?’
‘ভালো।’
‘রাস্টিকে বাবা’র খুব পছন্দ ছিল। রাস্টি কে, জানেন নিশ্চয়।’
‘জানি।’
‘রাস্টি সব অর্থেই মাটির মানুষ ছিল। রুক্ষ, নিরেট, বাস্তববাদী। সবচেয়ে বড়ো কথা, ও বাবাকে খুব ভালো রাখত। ওর ওভাবে চলে যাওয়া উচিত হয়নি। বাবা-র মন ভেঙে গেছে বুঝি, তবে উনি কিছু বলেন না। নাকি বলেন?’
‘বলেন।’
‘আপনাকে খুব একটা মিশুকে বলে মনে হচ্ছে না, মিস্টার মার্লো। আচ্ছা, বাবা রাস্টিকে খুঁজে বের করতে চান, তাই না?’
‘হ্যাঁ এবং না।’
‘তার মানে? আপনি ওকে খুঁজে বের করতে পারবেন কি না?’
‘চেষ্টা করব না, এমন তো বলিনি। তবে এই ধরনের কাজের জন্য মিসিং পার্সনস ব্যুরো-ই কিন্তু আদর্শ। ওদের লোকবল আর অন্য সুযোগসুবিধা অনেক অনেক বেশি।’
‘বাবা এর মধ্যে পুলিশকে জড়াবেন না।’
মহিলা গ্লাস ফাঁকা করে সেটা পাশের টেবিলে রেখে ঘণ্টি বাজালেন। এক মাঝবয়সি পরিচারিকা ঘরে ঢুকলে মিসেস রেগান তাঁর সামনে গ্লাসটা নাড়লেন। মহিলা একটা ড্রিঙ্ক বানিয়ে গ্লাস আবার ভরে বেরিয়ে গেলেন। আমার দিকে তাকালেনও না।
দরজা বন্ধ হলে মিসেস রেগান বললেন, ‘আপনি কী করবেন এই ব্যাপারে?’
‘কবে থেকে নিখোঁজ হলেন উনি?’
‘বাবা আপনাকে বলেননি?’
আমি মাথাটা একদিকে হেলিয়ে দাঁত বের করে হাসলাম। মহিলার ফর্সা গালগুলো লাল, আর চোখজোড়া ঠিকমতো গরম হল এতক্ষণে।
‘সোজাসুজি উত্তর দিলে কি গায়ে ফোসকা পড়ে?’ মহিলা ঝাঁঝিয়ে উঠলেন, ‘আপনার আচার-ব্যবহারই-বা এরকম কেন?’
‘আপনিও তো ভদ্রতার পরাকাষ্ঠা দেখছি।’ আমি বললাম, ‘মন দিয়ে শুনুন। আমি আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাইনি। আপনি আমাকে ডেকে পাঠিয়েছেন। আমার আচার-ব্যবহার আপনার ভালো না লাগলে আমার কিছু যায় আসে না। আমি জানি, আমার ব্যবহার খারাপ। দয়া করে আমাকে জেরা করার চেষ্টা করে নিজের সময় বরবাদ করবেন না।’
মহিলা এত জোরে গ্লাসটা টেবিলে রাখলেন যে গ্লাস উলটে গিয়ে মদে পাশের কুশনটা ভিজে গেল। মেঝেতে পা নামিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন তিনি। ওঁর চোখগুলো একেবারে ধকধক করছিল।
‘আমার সঙ্গে কেউ এভাবে কথা বলে না।’ মহিলার গলার স্বর ভারী শোনাচ্ছিল।
আমি আগের মতোই দেঁতো হাসিটা উপহার দিলাম। মহিলা ধীরে ধীরে নিজের খোলা মুখটা বন্ধ করলেন। মদে ভিজে যাওয়া কুশনটা দেখলেন। আরামকেদারার কিনারায় সোজা হয়ে বসে গলাটা নরম করে বললেন, ‘আপনার চেহারা যেমন সুন্দর, ব্যবহার তেমনই খারাপ।’
‘আপনি ঠিক কীসের, বা কাকে ভয় পাচ্ছেন মিসেস রেগান?’
মহিলার চোখ মুহূর্তের জন্য একেবারে সাদা হয়ে গেল। তারপর সেখানে কালোর ভাগটা এমন করে ফিরে এল যে আমি ভাবলাম, চোখের মণি ছাড়া ওখানে কিছুই নেই।
‘এবার বুঝলাম।’ মহিলার গলা আগের তুলনায় শান্ত হলেও সেখান থেকে রাগ পুরোপুরি যায়নি, ‘বাবা আদৌ রাস্টি’র ব্যাপারে আপনাকে ডাকেনইনি। তাই না?’
‘ওঁকেই জিজ্ঞেস করুন।’
‘বেরিয়ে যান!’ মহিলা আবার ফেটে পড়লেন, ‘বেরিয়ে যান বলছি!’
আমি উঠে দাঁড়ালাম। ‘বসুন!’ চিৎকার করলেন মিসেস রেগান। আমি আবার বসে পড়লাম।
‘প্লিজ।’ আদেশ নয়, এবার অনুনয়ের সুর শুনলাম মহিলার গলায়, ‘যদি বাবা আপনাকে বলে থাকেন তাহলে কি আপনি রাস্টিকে খুঁজে বের করতে পারবেন?’
‘উনি কবে নিখোঁজ হলেন?’
‘মাসখানেক আগে। একদিন বিকেলে ও নিজের গাড়ি চালিয়ে বেরিয়ে গেল। আমাদের কাউকে কিচ্ছু বলেনি। ওরা গাড়িটা একটা প্রাইভেট গ্যারেজে পেয়েছিল। ব্যস।’
‘ওরা? কারা?’
‘তাহলে বাবা আপনাকে বলেননি!’ মহিলার চোখে মুখে চালাকির ভাবটা ফিরে এল। মনে হচ্ছিল, যেন উনি বুদ্ধির খেলায় আমাকে হারাতে পেরেছেন। হয়তো পেরেছেন। বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকু জানি?
‘উনি আমাকে মিস্টার রেগানের ব্যাপারে বলেছেন। তবে ওই নিয়ে উনি আমাকে ডেকে পাঠাননি। আপনি কি আমার মুখ থেকে এটাই শুনতে চাইছিলেন?’
‘আপনি কী বললেন, তাতে আমার কিসু যায় আসে না।’
‘তাহলে সময় নষ্ট করে কী হবে?’ আমি উঠে দাঁড়ালাম, ‘যাওয়া যাক।’
উনি আর কিছু বললেন না। ঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়িমুখো হওয়ার সময় একঝলক পেছনে ঘুরে ওঁকে দেখে নিলাম। মহিলা অন্যমনস্কভাবে নিজের ঠোঁট চিবোচ্ছিলেন।
নীচে নরিস আমার টুপিটা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
‘আপনি ভুল করেছিলেন।’ আমি টুপিটা মাথায় চাপিয়ে বললাম, ‘মিসেস রেগান আমার সঙ্গে কথা বলতে চাননি।’
‘মাফ করবেন স্যার।’ নিজের রুপোলি হয়ে যাওয়া মাথাটা দেখিয়ে নরিস ভদ্রভাবে বললেন, ‘ভুলভ্রান্তি হয়েই যায়।’
আমার পেছনে দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল। আমি বাইরে দাঁড়িয়ে সিগারেট খেতে-খেতে স্টার্নউডদের সম্পত্তির ওপর নজর বোলালাম। টেরেস, ফুলের বাগান, লন, ট্রিম করা সুন্দর গাছেদের সারি– এসব ছাড়িয়ে তাকালে দূরে, অনেক দূরে দেখা যায় পুরোনো কাঠের ডেরিকগুলো। স্টার্নউড পরিবারের ঐশ্বর্যের জন্য ওই তেলের কুয়োগুলোই দায়ী। বাকি প্রায় পুরো এলাকাটা পার্ক হিসেবে জনগণের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।
সরু একটা রাস্তা ধরে অনেকটা হেঁটে গাড়িতে পৌঁছোলাম। দূরে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল। বৃষ্টি এল বলে! গাড়ির ঢাকনাটা টানতে টানতে মহিলার দুই পা আর তাঁর বাবা’র চোখজোড়া আমার মাথায় ঘোরাফেরা করছিল। দু-জনেই আমাকে বাজিয়ে দেখছিলেন বলে মনে হয়। যদি এই গাইগার একজন ব্ল্যাকমেইলার হয়েও থাকে, তাহলেও তার সঙ্গে বোঝাপড়া করার জন্য একজন উকিলই ঠিক লোক। আর রাস্টি রেগান? তার আসলে কী হয়েছে?
মনে হচ্ছিল, আমি যা দেখছি তার নীচে আরও অনেএএএক কিছু আছে এই কেসে।
গাড়ি চালিয়ে হলিউড পাবলিক লাইব্রেরি গেলাম। ‘ফেমাস ফার্স্ট এডিশনস’ বলে একটা বিশাল বই নিয়ে বেশ কিছুটা সময় কাটাতেই খিদে পেয়ে গেল।
