মরণ ঘুম – ৩০
৩০
রোদ ঝলমলে দিনটা জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে হাসছিল। মিসিং পার্সনস ব্যুরো-র ক্যাপ্টেন গ্রেগরি মাইলসের মুখে অবশ্য হাসি ছিল না। ভোঁতা আঙুলগুলো দিয়ে পাইপটা বন্দুকের মতো বাগিয়ে, একটা বড়ো শ্বাস ফেলে আজকের আলাপ শুরু করলেন ভদ্রলোক।
‘তাহলে আরও একটা ঝামেলায় জড়িয়েছিলেন এর মধ্যেই?’
‘আপনি শুনেছেন?’
‘হেহ!’ ধূর্ত চোখজোড়ার নীচে একটা ভোঁতা হাসির ভাব ফুটে উঠল এবার, ‘লোকে ভাবে, আমার বুদ্ধিশুদ্ধি কিচ্ছু নেই। সে না থাকতেই পারে, কিন্তু চোখ-কান ঠিকঠাক আছে। ক্যানিনোকে যা করেছেন, বেশ করেছেন। তবে হোমিসাইডের ছেলেপুলে এবার আপনার ওপর চটে যাচ্ছে।’
‘আমার চারপাশে দনাদ্দন লাশ পড়ছে, সে তো দেখতেই পাচ্ছি। কিন্তু আমি ওই একটিই…’
হাসলেন মাইলস্, তারপর বললেন, ‘ওই মহিলা যে এডি মার্সের বউ— এটা আপনাকে কে বলল?’
আমি সবটাই বললাম। পাইপ টানার ফাঁকে ধৈর্য ধরে সবটা শুনলেন ভদ্রলোক। তারপর বললেন, ‘আপনি নির্ঘাত ভাবছেন, আমি কেন মহিলাকে খুঁজে পাইনি?’
‘ভাবছি ক্যাপ্টেন।’
‘আমাকে অপদার্থ ভাবছেন। বা ভাবছেন,’ বুড়ো আঙুল আর তর্জনী আমার নাকের সামনে ঘষলেন মাইলস, ‘আমি এডি মার্সের পোষা আর পাঁচটা পুলিশের মতোই একজন।’
‘না।’ আমি সত্যি করেই ভাবলাম, ‘এডি-র বউকে খুঁজে বের না করার অন্য কোনো কারণ থাকতেই পারে। কিন্তু আপনি ওর পয়সা খেয়ে চুপচাপ ছিলেন— এমনটা আমি ভাবিনি।’
মাথা ঝাঁকিয়ে ধোঁয়া ওড়ালেন মাইলস। তারপর বললেন, ‘এই লাইনে যতটা সৎ থাকা যায়, আমি ততটাই সৎ মিস্টার মার্লো। খুচরো ক-টা লোককে জেলে পুরে বা মেরে আমাদের বোঝানো হবে যে আইন জিতছে, এদিকে আসলে এডি মার্সের মতো লোকেরাই জিতবে বার বার— এটা আমি হজম করতে পারি না। আমি আজ আপনাকে ডেকেছি এই কথাটা বলার জন্যই।’
কিছু না বলে চুপচাপ রইলাম। এগুলোর কোনোটাই আমার কাছে নতুন নয়। মাইলস বলে চললেন।
‘তবু বলব, রাস্টি রেগানকে এডি মার্স খুন করেনি, বা করায়নি। কাল রাতে ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি ওকে গরম তাওয়ায় সেঁকার পর আমি আমার মতো করেও একটু সওয়াল-জবাব চালিয়েছিলাম। মার্স অনেক কিছুই বলেছে। ও বলেছে যে আলাদা-থাকা বউকে লুকিয়ে রেগানের নিরুদ্দেশকে একটা অন্যরকম অ্যাঙ্গল দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। মার্সের দাবি, ল্যাশ ক্যানিনোকে ও স্রেফ ওর বউয়ের দেহরক্ষী হিসেবে আর লোকজনকে ভয় দেখানোর জন্য কাজে লাগিয়েছিল। ও স্বীকার করেছে যে ও গাইগারকে চিনত, কিন্তু ওর ব্যাবসার সঙ্গে নাকি ওর কোনো যোগাযোগ ছিল না। ব্রোডিকে ও চিনত না। হ্যারি জোনসের ব্যাপারটা ও একেবারেই জানত না। আপনি এগুলো সবই জানেন হয়তো।’
‘জানি।’ সংক্ষেপে বললাম।
‘রিয়্যাল্টোতে পুলিশকে সব বলে আপনি বুদ্ধিমানের কাজ করেছেন।’ পাইপটা ঠুকে ছাই ঝাড়তে ঝাড়তে বললেন মাইলস, ‘লোকে বন্দুকের সঙ্গে গুলি মিলিয়ে দেখে আজকাল। পরে আবার গুলি-টুলি চালাতে হলে আপনি বিপদে পড়ে যেতেন।’
‘আমি বুদ্ধিমান।’ এর বেশি বলার ইচ্ছে হল না। মাইলস আমাকে আড়চোখে দেখলেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, ‘মহিলার এখন খবর কী?’
‘জানি না।’ আমি সত্যি কথাই বললাম, ‘ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি, রিয়্যাল্টোর শেরিফ, আর হোমিসাইড— এই তিনজনের জন্য আমাদের দু’জনকেই মোট তিন সেট বয়ান দিতে হয়েছিল। সেসবে সইসাবুদ হয়ে যাওয়ার পর থেকে আমি আর মহিলাকে দেখিনি।’
‘মহিলাকে দেখে তো ভালোই মনে হয়।’ চিন্তিত মুখে বাইরে তাকিয়ে বললেন ভদ্রলোক।
‘মহিলা ভালোই।’ এর বেশি কিছু বলার পেলাম না। মাইলস আবার আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘শুনুন, আপনার ওপর যত লোকের যতই রাগ থাকুক না কেন, আমার ধারণা আপনি একটি সত্যিকারের ভদ্রলোক। কিন্তু আপনি যেখানেই হাত দেন, সেখানেই কেঁচো খুঁড়তে কেউটে বেরোয়। একটা কথা বলব? আপনি যদি সত্যিই স্টার্নউডদের ভালো চান, ওদের থেকে দূরে থাকুন।’
‘ঠিক বলেছেন, ক্যাপ্টেন।’ আমি উঠে দাঁড়িয়ে দরজার দিকে হাঁটা দিলাম। দরজার হাতলটা ধরে প্রায় মোচড় দিয়েই ফেলেছি, তখনই পেছন থেকে মাইলসের গলাটা আবার ভেসে এল, ‘কথা বলাটাই পণ্ডশ্রম হল, তাই না? আপনি এখনও ভাবছেন, আমরা রেগানকে পাওয়ার আগে আপনি ওকে খুঁজে পাবেন?’
‘না, ক্যাপ্টেন।’ আমি ঘুরে ভদ্রলোকের চোখে চোখ রেখে বললাম, ‘আমি জানি, আমি রেগানকে খুঁজে পাব না। আমি ওকে খোঁজার চেষ্টাই করব না। তাহলে হবে তো?’
‘এর উত্তরে আমার কী বলা উচিত, মার্লো?’ মৃদু হেসে মাথাটা ঝাঁকালেন মাইলস, ‘দরকার-টরকার হলে বলবেন। ভালো থাকবেন।’
ভদ্রলোককে ধন্যবাদ দিয়ে বেরিয়ে এলাম।
সিটি হল থেকে বেরিয়ে নিজের গাড়িটা নিলাম, তারপর ঘরে ফিরলাম। একটা পাইপ ধরিয়ে নিজেকেই বললাম, ‘লোকটা কিছু একটা জানে, কিন্তু বলছে না।’
পাইপ শেষ হয়ে গেল। আমি বাইরের পোশাক পরেই বিছানায় লম্বা হলাম, কিন্তু ঘুম এল না। বরং আগের রাতে যা যা করেছিলাম সেই দৃশ্যগুলোই আবার ভিড় করে এল চোখের সামনে।
তুমুল বৃষ্টির মধ্যে আমি গাড়ি চালাচ্ছিলাম। এককোণে চুপ করে বসে ছিলেন রুপোলি পরচুলা পরা মহিলা। পুরো রাস্তা আমরা একটাও কথা বলিনি, ফলে লস এঞ্জেলস পৌঁছোতে পৌঁছোতে আমরা দু’জনেই আবার অচেনা হয়ে গেছিলাম। ওখানেই একটা দোকান খোলা পেয়ে আমি বার্টি ওল্্স-কে ফোন করে বলেছিলাম, আমি রিয়্যাল্টোতে একজনকে খুন করেছি, আর তখন মিসেস মার্সকে নিয়ে ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি-র বাড়ি যাচ্ছি। ওল্্সের ফোন জায়গামতো চলে গেছিল। ডিএ ওয়াইল্ড মুখে একটা তিক্ত হাসি ঝুলিয়ে, হাতে সিগার নিয়ে আমাকে অভ্যর্থনা করেছিলেন। ওল্্স ছিলেন, শেরিফের অফিসের একজন ছিলেন, আর ছিল হোমিসাইডের দু-জন। আমি সব বলেছিলাম। মিসেস মার্স চুপচাপ ঘরের এককোণে বসে ছিলেন। ফোনের-পর-ফোন গেছিল এদিকে-ওদিকে। তারপর আমি আবার গাড়িতে বসেছিলাম, এবার হোমিসাইডের একজন আমার সঙ্গেই ছিল। ফুলওয়াইডার বিল্ডিং-এর সেই ঘরটায় শুকনো বমি আর বাদামের গন্ধ, আর হ্যারি জোনসের চোখ ঠিকরে বেরিয়ে আসা শরীরটা আমাদের স্বাগত জানিয়েছিল। তারপর মেডিক্যাল এগজামিনারের অফিস থেকে একজন এল। এল এক ফিংগারপ্রিন্ট এক্সপার্ট। তার সৌজন্যেই ড্রয়ারের একধার থেকে পাওয়া গেল ক্যানিনো-র আঙুলের ছাপ। তারপর আমরা আবার ফিরে এলাম ওয়াইল্ডের বাড়িতে। সেখানে বয়ান টাইপ করা হল। আমি সই করলাম। তখনই, একটা চকচকে কালো সুট পরে, একদম ঝকঝকে চেহারায় ঘরে ঢুকেছিলেন এডি মার্স।
ঘরের কোণে মোনা মার্সকে দেখে এডি-র মুখের হাসিটা একদম খাঁটি ছিল— এটা আমাকে মানতেই হবে। সেভাবেই উনি বলেছিলেন, ‘আরে! এখানে কতক্ষণ?’
মহিলা উত্তর দেননি। তারপর সব্বাই বেরিয়ে গেল ঘর থেকে, শুধু রয়ে গেলাম আমরা দু-জন— ড্রেসিং গাউন পরে, হাতে নিভন্ত চুরুট ধরা এক ক্রুদ্ধ ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি, আর এক অতি সামান্য প্রাইভেট ডিটেকটিভ।
‘এই শেষবার, মার্লো।’ দাঁতে দাঁত ঘষে বলেছিলেন ওয়াইল্ড, ‘আর একবার এইরকম কীর্তি করলে আমি হোমিসাইডকে বলব আপনাকে নিয়ে যা খুশি করতে। তাতে কার কত দুঃখ হবে, তাতে আমার কিস্সু যাবে-আসবে না! কথাটা বুঝতে পেরেছেন?’
পেরেছি কি? যদি পেরেই থাকি, তাহলে ক্লান্ত, কালশিটে-পড়া শরীরটা ঘুমোচ্ছে না কেন? কেন এই ছবিগুলো আমার চোখের সামনে ঘুরপাক খাচ্ছে? তখনই ফোনটা বেজে উঠল। নরিস ওপাশ থেকে ঠান্ডা, পালিশ-করা গলায় বললেন, ‘বাড়িতে ফোন করতে হল বলে ক্ষমা চাইছি, মিস্টার মার্লো। আসলে কাল সন্ধে থেকে আপনাকে অফিসে ধরার চেষ্টা করেও পাইনি। আপনি কি আজ সকালে জেনারেলের সঙ্গে একবার দেখা করতে পারবেন?’
‘আমি কাল থেকে বাইরেই ছিলাম।’ আমি বললাম, ‘জেনারেল কেমন আছেন?’
‘আজ উনি অনেকটা ভালো আছেন। তাহলে আপনি কি আসছেন?’
‘আসছি।’ বলে আমি উঠে পড়লাম।
স্নান করে তৈরি হলাম। সাজগোজ করার সময় কারমেনের ছোট্ট পিস্তলটাও পকেটে ভরে নিলাম। সোয়া এগারোটা নাগাদ স্টার্নউডদের বাড়ির ঘণ্টি বাজানোর সময় হঠাৎ একটা জিনিস খেয়াল হল। মাত্র পাঁচ দিন আগে আমি প্রথমবার এই ঘণ্টিটা বাজিয়েছিলাম, কিন্তু এর মধ্যেই মনে হচ্ছে যেন আমি জীবনভর এই বাড়ির চারপাশেই চক্কর কেটে চলছি।
এক পরিচারিকা দরজা খুলে দিল। আমি সেই ঘোরানো সিঁড়িওলা ঘরটায় গিয়ে পোর্ট্রেটগুলোকে দেখে কিছুটা সময় কাটালাম। তারপর নরিস এসে আমাকে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে শুরু করলেন। ঈর্ষাতুর দৃষ্টিতে ভদ্রলোককে দেখছিলাম। মনে হচ্ছিল, এই পাঁচদিন বিশ্রাম-টিশ্রাম নিয়ে ওঁর বয়স বছর কুড়ি কমে গেছে। সেখানে আমি যেন একেবারে বুড়িয়ে গেছি।
ভিভিয়েনের ঘরের উলটোদিকে কিছুটা এগোতে একটা বিশাল দরজা পড়ল। নিঃশব্দে সেটা খুলে নরিস আমাকে ভেতরে যেতে বললেন। জেনারেল স্টার্নউড বালিশে ভর দিয়ে বিছানায় আধশোয়া হয়ে ছিলেন। আমাকে দেখে দুর্বল, কিন্তু স্থির গলায় ভদ্রলোক বললেন, ‘বসুন, মিস্টার মার্লো।’
খাটের পাশে একটা চেয়ার টেনে বসলাম আমি। নরিস নিঃশব্দে দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে বেরিয়ে গেলেন। বন্ধ, বদ্ধ ঘরটার ভেতরে ছড়িয়ে ছিল বয়স, অসুখ, ওষুধ মেশানো একটা হালকা গন্ধ।
অনেকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন জেনারেল স্টার্নউড। একটা হাত তুলে সেদিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন— হয়তো নিজেকে এটা বোঝাতে যে উনি হাত-পা নাড়াতে পারেন, তারপর সেটা আবার নামিয়ে আনলেন। অবশেষে ভদ্রলোক বললেন, ‘আমি আপনাকে আমার জামাইকে খোঁজার ভার দিইনি, মিস্টার মার্লো।’
‘কিন্তু আপনি চেয়েছিলেন যে আমি খুঁজি।’
‘আমি আপনাকে এমন কিচ্ছু বলিনি। তা সত্ত্বেও আপনি এই কথাটা ধরে নিলেন?’
আমি কিছু বললাম না। জেনারেল সেই নীচু, স্থির গলায় বলে চললেন, ‘আপনার বকেয়া মিটিয়ে দেওয়া হয়েছে। ওই টাকায় কিছু যায়-আসে না। কিন্তু আমার ধারণা, ইচ্ছেয় হোক বা অনিচ্ছেয়, আপনি আমার বিশ্বাসভঙ্গ করেছেন।’
ভদ্রলোক চোখ বন্ধ করলেন। আমি বললাম, ‘এইজন্য আমাকে ডেকেছিলেন?’
ধীরে, খুব ধীরে চোখ খুললেন ভদ্রলোক। মনে হল, ওঁর চোখের পাতাজোড়া বোধ হয় সিসে দিয়ে বানানো। আস্তে আস্তে ভদ্রলোক বললেন, ‘আপনি কি আমার কথায় অসন্তুষ্ট হলেন?’
‘আপনি বরং টাকাটা ফেরত নিয়ে নিন, জেনারেল।’ আমি মাথা নেড়ে বললাম, ‘আপনার কাছে ওই টাকার কোনো মূল্য নেই। আমার কাছে আছে, তবু আমি ওটা ফেরত দিতে পারব। তাতে এটাই বুঝব যে কাজটা যেভাবে হওয়া উচিত ছিল, সেভাবে করতে পারিনি আমি।’
‘এমন ‘‘অসন্তোষজনক’’ কাজ আপনি প্রায়ই করেন বুঝি?’
‘মাঝে মাঝে। সবারই হয়।’
‘ক্যাপ্টেন গ্রেগরির কাছে কেন গেছিলেন আপনি?’
চেয়ারে হেলান দিয়ে ভদ্রলোকের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। বোঝার চেষ্টা করছিলাম, ঠিক কী উত্তর দিলে মানুষটাকে আরও আঘাত পাওয়ার হাত থেকে বাঁচানো যায়। বললাম, ‘আমি জানতাম যে গাইগারের ওই চিঠি আর নোটগুলো আপনি আমাকে দিয়েছেন একটা পরীক্ষা হিসেবে। আপনার আশঙ্কা ছিল, হয়তো রেগান এই ব্ল্যাকমেইলিং-এর ব্যাপারটায় জড়িত থাকতে পারেন। ক্যাপ্টেন গ্রেগরির সঙ্গে কথা না বললে আমি রাস্টি রেগান সম্বন্ধে নিশ্চিত হতে পারতাম না। ওঁর সঙ্গে কথা বলেই আমি বুঝি, রেগান ওইরকম লোক নন।’
‘এটা আমার প্রশ্নের উত্তর নয়।’ জেনারেলের চোখগুলো আমার মুখের ওপর স্থির হয়ে ছিল।
‘প্রথম যেদিন আপনি আমাকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন, সেদিন আপনার সঙ্গে দেখা করে গ্রিনহাউস থেকে বেরিয়ে আসার পরেই মিসেস রেগান আমাকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। ওঁর ধারণা ছিল, আপনি আমাকে দিয়ে রাস্টি রেগানকে খুঁজে বের করতে চাইছেন। সেটা উনি চাইছিলেন না। তবে কথায় কথায় উনি বলেন যে ‘ওরা’ রেগানের গাড়িটা খুঁজে পেয়েছিল। এই ‘‘ওরা’’ একমাত্র পুলিশ হতে পারে। আপনি পুলিশকে জড়াতে না চাইলেও গাড়িটা যদি ওদের হাতে আসে তাহলে ওরা খোঁজ নেবেই। আপনাদের ড্রাইভারের নামের পাশে যেহেতু একটা দাগ আগে থেকেই ছিল, তাই ওরা এতে নাক গলাবেই। তখনই আমি মিসিং পার্সনস ব্যুরোর ব্যাপারটা ভাবি, কারণ রেগানের ব্যাপারে খোঁজাখুঁজি করতে হলে ওরাই করবে। তা ছাড়া…’
‘তা ছাড়া?’
‘ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির বাড়িতে গাইগারকে নিয়ে সেই রাতে একটা ছোটোখাটো কনফারেন্সই হয়েছিল। তার ফাঁকে মিস্টার ওয়াইল্ড আমাকে নিভৃতে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আপনি যে রেগানকে খুঁজছেন সেটা আমি জানি কি না। আমি বলেছিলাম, আপনি এটা জানতে পারলে খুশি হতেন যে রেগান কোথায় আছেন। এতে মিস্টার ওয়াইল্ড যেভাবে আমার দিকে তাকিয়েছিলেন তাতে স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিলাম যে ইতিমধ্যেই পুলিশ, অর্থাৎ মিসিং পার্সনস ব্যুরো রেগানকে খুঁজছে। তাই আমি ক্যাপ্টেন গ্রেগরির সঙ্গে দেখা করি। তখনও আমি ওঁকে এমন কিছুই বলিনি যা উনি জানেন না।’
‘আপনি কি গ্রেগরিকে বুঝিয়েছিলেন যে আপনি রেগানকে খুঁজেছিলেন?’
‘বলিনি। তবে হ্যাঁ, আমার আচরণ থেকে উনি সেটাই বুঝেছিলেন।’
‘এই আচরণটা কি ন্যায়সংগত হয়েছিল বলে আপনার মনে হয়?’
‘হ্যাঁ।’ আমি স্পষ্ট গলায় বললাম, ‘মনে হয়।’
‘আমি আপনার কথা বুঝতে পারলাম না, মিস্টার মার্লো।’ জেনারেল গায় স্টার্নউডের চোখজোড়া কালো আগুনের মতো আমার দিকে চেয়ে রইল।
‘আপনি কি আমায় ক্যাপ্টেন গ্রেগরির কাছে যেতে বারণ করেছিলেন, জেনারেল?’
‘না।’ বুড়োর মুখে একটা খুব খুব হালকা হাসির আভাস দেখা দিল, ‘সেটা করা বোধ হয় সহজ ছিল না, তাই না?’
‘আপনার বাটলার তথা আপ্তসহায়ক নরিস ভেবেছিলেন যে গাইগারের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে মামলা শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু আমার সেটা আদৌ মনে হয়নি। গাইগার কে? একটি গোলমেলে চরিত্র, যে আরও কয়েকটি গোলমেলে চরিত্র আর কিছু দুর্নীতিগ্রস্ত পুলিশের ছায়ায় থেকে কারবার চালায়। আপনার কাছে প্রমিসরি নোট আর চিঠি পাঠিয়ে টাকা চাইবার সাহস তার হয় কীভাবে? এর অর্থ একটাই হয়। গাইগার জল মাপছিল। ও বুঝতে চাইছিল, আর কেউ ইতিমধ্যেই আপনার ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে কি না। যদি আপনি চাপে থাকতেন, হয়তো টাকা দিয়ে দিতেন। যদি এমন কোনো চাপ না থাকত, আপনি টাকা দিতেন না। কিন্তু আপনি চাপে ছিলেন। রাস্টি রেগান আপনার আপনজন হয়ে উঠেছিলেন বলেই আপনি ভাবছিলেন, যদি আসলে তিনি অন্যরকমের মানুষ হন।’
ভদ্রলোক কিছু বলতে গেলেন। আমি ওঁকে থামিয়ে বললাম, ‘আপনার কাছে ওই ক’টা টাকার মূল্য ছিল না, এখনও নেই। এমনকী নিজের মেয়েদেরও আপনি মোটামুটি খরচের খাতায় ফেলে দিয়েছেন। কিন্তু রাস্টি রেগান আপনার কাছে স্পেশাল। সেজন্যই গাইগারের এই চিঠির পেছনে আরও কিছু আছে কি না জানতে চেয়ে আপনি আমাকে কাজে লাগিয়েছিলেন।’
‘আপনি বড়ো বেশি কথা বলেন, মিস্টার মার্লো।’ তিতকুটে গলায় বললেন ভদ্রলোক, ‘তাহলে এখন আপনি কী করবেন? রেগানের খোঁজ চালিয়ে যাবেন?’
‘না।’ আমি স্পষ্টভাবে বললাম, ‘আমাকে বারণ করে দেওয়া হয়েছে। হোমিসাইড আমাকে নিয়ে উত্ত্যক্ত হয়ে গেছে। তাদের ধারণা আমি হাত বাড়ালেই লাশ পড়ে। সেজন্যই বলছি, আপনি বরং টাকাটা ফেরত নিয়ে নিন। আমি কাজটা ঠিকমতো শেষ করতে পারিনি।’
‘তাহলে এবার কাজটা শেষ করুন।’ বুড়োর নীচু গলায় একটা অদ্ভুত ধার এসে গেছিল, ‘আমি আপনাকে আরও হাজার ডলার দেব, মিস্টার মার্লো। রাস্টিকে ফিরে আসতে হবে না। এমনকী ও কোথায় আছে, এটাও আমাকে জানাতে হবে না। আমি বুঝি, এই বাড়ি থেকে যদি ওর মন উঠে গিয়ে থাকে তাহলে নিজের মতো করে বাঁচার পুরো অধিকার ওর আছে। শুধু আমাকে এটুকু জানান যে ও যেখানেই থাকুক, ভালো আছে। আর হ্যাঁ, যদি ওর টাকার দরকার হয়, তাহলে আমি ওকে টাকা দেব— যা লাগে, যেভাবে লাগে। আপনার কাজটা বুঝতে পেরেছেন তো?’
‘হ্যাঁ, জেনারেল।’
কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন ভদ্রলোক। তারপর আমার দিকে যখন তাকালেন তখন মানুষটার চোখে অনন্ত ক্লান্তির ছায়া ছাড়া কিচ্ছু দেখতে পাচ্ছিলাম না। সেভাবেই ভদ্রলোক বললেন, ‘আমি জানি আপনি কী ভাবছেন। আপনি ভাবছেন, বুড়ো এই বয়সে এসে এত সেন্টিমেন্টাল হয়ে পড়েছে যে সব ছেড়ে এক অজ্ঞাতকুলশীলকে খুঁজে পেতে চাইছে। হ্যাঁ, মিস্টার মার্লো, আমার জন্যই আপনি রাস্টি রেগানকে খুঁজে বের করুন। পারবেন তো?’
‘হ্যাঁ, জেনারেল। এখন দয়া করে ঘুমোন।’
বেরিয়ে আসার সময় দরজাটা ভেজাতে গিয়ে আরেকবার খাটের দিকে তাকালাম। দেখলাম, মানুষটা এর মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়েছে!
