পঁচিশ – হুইস্কিটাউন
রাত দেড়টায় রেনো-র একটা ফোন এল। কথা বলে এসে রেনো বলল, ‘যাওয়া যাক।’
কিচেনের দিকের দরজা দিয়ে অধিকাংশ লোক বেরিয়ে গেল। রেনো দোতলা থেকে একটা ভারী, কালো ব্যাগ নিয়ে এল। সেটা আমাকে ধরতে দিয়ে বলা হল, ‘বেশি লোফালুফি করবেন না।’
আমরা সাতজন সদর দরজা দিয়ে বেরোলাম। বাইরে ও’মারা একটা টুরিস্ট কোচ নিয়ে অপেক্ষায় ছিল। রেনো সামনে, ও’মারার পাশে বসল। আমি বাকিদের সঙ্গে পেছনে চেপেচুপে বসলাম। ব্যাগটা আমার দু’পায়ের ফাঁকে রইল। আমরা রওনা দিলাম। প্রথম ক্রসিং-এ একটা গাড়ি আমাদের সঙ্গে যোগ দিয়ে আগে আগে চলতে লাগল। কিছুক্ষণ পর আরেকটা গাড়ি আমাদের পেছনে এল। তিনটে গাড়িই এমন গতিতে ছুটছিল যাতে সময় কম নষ্ট হয়, আবার কারো চোখে না পড়তে হয়।
আমরা গন্তব্যের কাছে পৌঁছেই গেছিলাম প্রায়। তখনই অনেক কিছু ঘটতে শুরু করল।
শহরের দক্ষিণ প্রান্তে একতলা কয়েকটা ঝুপড়ি টাইপের বাড়ি পার হচ্ছিলাম আমরা তখন। দরজা দিয়ে মুখ বের করে একটা লোক শিস দিল। পেছনের গাড়িতে একটা বন্দুক গর্জে উঠল। লোকটা পড়ে গেল।
পরের মোড়ে গুলিবৃষ্টির মধ্য দিয়ে যেতে হল।
‘ব্যাগে গুলি লাগলে আমাদের আর খুঁজে পাওয়া যাবে না।’ রেনো আমার দিকে ঘুরে বলল, ‘ওটা খুলে রাখুন। পৌঁছোনোর পর আমরা বেশি সময় পাব না।’
একটা অন্ধকার তিনতলা বাড়ির সামনে থামল গাড়িটা। আমি ব্যাগটা খুলতে খুলতে লোকজন গাড়ি থেকে নেমে পড়ল। ব্যাগ থেকে বেরোল একগাদা কাঠের গুঁড়ো দিয়ে সিল করা দু-ইঞ্চি লম্বা পাইপ-বোমা। বোমাগুলো ভাগ বাঁটোয়ারা হয়ে গেল। ততক্ষণে গাড়িতে গুলি এসে লাগছিল একের-পর-এক।
রেনো একটা বোমা নিয়ে এগিয়ে গেল। ওর গালে একটা লাল দাগ ফুটে উঠতে দেখলাম। কিন্তু সেটার তোয়াক্কা না করে ও বোমাটা ছুড়ে দিল দরজার দিকে। কান-ফাটানো আওয়াজ আর আগুনে জায়গাটা ভরে গেল। বৃষ্টির মতো চারদিকে ছিটকে গেল কাঠ আর লোহার টুকরো।
ইটের গায়ে অন্ধকার গর্তটা বুঝিয়ে দিচ্ছিল, ওখানে আর কোনো দরজা নেই।
রেনো-র দলের একজন একটা বোমা প্রাণপণে ছুড়ে দিল খোলা দরজাটা দিয়ে। একটু পরে একতলার জানলাগুলো দিয়ে ভাঙা কাচ আর আগুনের লকলকে শিখা বেরিয়ে এল।
আমাদের পেছনে যে গাড়িটা ছিল, সেটা ততক্ষণে স্থির হয়ে আশপাশ থেকে আসা গুলির জবাব দিচ্ছিল। সামনের গাড়িটা আমাদের ছেড়ে এগিয়ে গেছিল। বাড়ির অন্য দিক থেকে গুলির মুহুর্মুহু আওয়াজ বুঝিয়ে দিচ্ছিল, ওদিকের দরজা দিয়ে বেরোনোর রাস্তা আটকে দিয়েছে ওই গাড়িটা।
রাস্তার মধ্যে দাঁড়িয়ে ও’মারা বাড়িটার ছাদ লক্ষ করে একটা বোমা ছুড়ে দিল। বোমাটা ছাদে গিয়ে পড়ল, কিন্তু ফাটল না। পরমুহূর্তেই ও’মারা নিজের গলা চেপে ধরে মাটিতে পড়ে গেল। পাশের কাঠের বাড়িটা থেকে আসা গুলিতে আমাদের আরও একজন ধরাশায়ী হল।
রেনো শান্ত গলায় প্রচুর গালি দিল। তারপর ফ্যাট নামের একটা ছেলেকে বলল, ‘আপদ বিদেয় করো তো।’ ছেলেটা একটা বোমা হাতে নিয়ে তাতে থুতু দিল, আমাদের গাড়ির পেছনে আশ্রয় নিল, তারপর গায়ের জোরে ওটা ছুড়ে দিল পাশের বাড়িটার ভেতরে। বিস্ফোরণের দাপট থেকে বাঁচার জন্য আমাদের মাটিতে লম্বা হতে হয়েছিল। মাথা তুলে দেখলাম, বাড়িটা আর ঠিক দাঁড়িয়ে নেই। তার সেই কাত হওয়া শরীরের আনাচে কানাচে আগুন জিভ বের করছে।
‘আর আছে?’ রেনো খুশিয়াল গলায় জানতে চাইল। বুঝলাম, আমাদের দিকে আর গুলি আসছে না, এই ব্যাপারটা ও বেশ উপভোগ করছে।
‘এই যে,’ ফ্যাট একটা বোমা বাড়িয়ে দিল, ‘এটাই শেষ।’
সামনের বাড়িটার ওপরের তলা দিয়ে ততক্ষণে আগুন মুখ বাড়িয়েছে। রেনো সেটা দেখে ফ্যাটের কাছ থেকে বোমাটা নিল। তারপর বলল, ‘ওরা এবার বেরোবে। পিছিয়ে যাও সবাই।’
আমরা পিছিয়ে গেলাম। বাড়ির ভেতর থেকে একটা ভারী গলা চেঁচাল ‘রেনো!’ বলে।
গাড়ির পাশের ছায়ায় গা মিশিয়ে রেনো উত্তর দিল, ‘শুনছি!’
‘অনেক হয়েছে।’ গলাটা বলে উঠল, ‘আমরা বেরিয়ে আসছি। গুলি কোরো না।’
‘আমরা মানে?’ রেনো-র প্রশ্নটা আমার মাথাতেও এসেছিল।
‘আমি পিট।’ ভারী গলায় উত্তর এল, ‘আমরা মোট চারজন আছি।’
‘তুমি আগে বেরোও!’ রেনো চেঁচাল, ‘হাত যেন ওপরে থাকে। তোমার সঙ্গীদের বলো, তোমার পেছনে লাইন দিয়ে আসতে। আধ মিনিট পর পর বেরোবে, একজন করে।’
আমরা অপেক্ষা করলাম। একটু পরে, বোমায় উড়ে যাওয়া দরজার সামনে পিট দ্য ফিন-কে দেখা গেল। ও দু-হাত দিয়ে নিজের টাকটা চেপে রেখেছিল। পাশের বাড়ির আগুনে ওর ক্ষতবিক্ষত মুখ আর ছিন্নভিন্ন পোশাক দেখা যাচ্ছিল। ধ্বংসস্তূপ সাবধানে পেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে রাস্তায় দাঁড়াল পিট।
প্রথমে কয়েকটা বাছাই করা শব্দ, আর তারপর চারটে গুলি দিয়ে রেনো ওকে স্বাগত জানাল। পিট পড়ে গেল। আমার পেছনে একটা লোক হেসে উঠল।
রেনো শেষ বোমাটা দরজা দিয়ে ভেতরে ছুড়ল।
আমরা হুড়মুড়িয়ে গাড়িতে উঠলাম। কিন্তু গাড়িটা চলল না। ইঞ্জিনে গুলি ঢুকে ওটাকে অচল করে দিয়েছিল। রেনো হর্ন বাজাতে লাগল। রাস্তার কোণে আর বাড়ির পেছনে যে গাড়ি দুটো থেমে ছিল, সেগুলো আমাদের নিতে এল। মুশকিল হল, সেগুলোতে ইতিমধ্যেই অনেকে ছিল। আমরা প্রায় ঝুলে রইলাম। সেই অবস্থাতেই গাড়ি দুটো রওনা হল।
আমি দেখেছিলাম, রাস্তার ধারের বাড়ি থেকে মুখ বের করে আমাদের কয়েকজন দেখলেও আক্রমণ চালানোর মতো কেউ ছিল না। কিন্তু অবস্থাটা বদলে গেল একটা ব্লক পরেই।
পাশের একটা রাস্তা থেকে একটা লিমুজিন বেরিয়ে এল। সেটা আমাদের দিক বরাবর কিছুটা এগোল। তারপর তেরছা হয়ে থেমে গেল। ওটা থেকে আমাদের দিকে ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি ছুটে এল তারপরেই। লিমুজিনটাকে পাশ কাটিয়ে আরও একটা গাড়ি ধেয়ে এল একটু পরেই। সেটা থেকেও গুলির ঝাঁক আমাদের চারদিকে এসে আছড়ে পড়ছিল।
আমরা যথাসাধ্য জবাব দিচ্ছিলাম। মুশকিল হল, দু-জনের মাঝে চিঁড়েচ্যাপটা হয়ে, একজনকে কোলে বসিয়ে গুলি চালানোটা সহজ কাজ নয়। বিশেষ করে যখন তারাও গুলি চালাচ্ছে, তখন চোখ আর কান দুটোই খারাপ হয়ে যায়, মাথার কথা তো বলছিই না। আমাদের দ্বিতীয় গাড়িটা পিছিয়ে এসে একটু দল ভারী করল। কিন্তু ততক্ষণে অন্যদিকে আরও দুটো গাড়ি এসে গেছে! বুঝলাম, হুইস্পারের দলের হামলা ভালো বা মন্দভাবে শেষ হয়ে যাওয়ায় পিটের স্পেশাল ফোর্স এখন আমাদের আক্রমণ করেছে।
‘এভাবে হবে না!’ আমি রেনো-র উদ্দেশে চেঁচালাম, ‘আমরা ক-জন রাস্তার ধার থেকে গুলি চালাই। নইলে ওদের সঙ্গে পেরে উঠবেন না।’
আমার প্রস্তাবটা রেনো’র মনে ধরল। ও চটপট আমাকে আর আরও ক’জনকে নেমে যেতে বলল। আমি সবচেয়ে আগে নামলাম। রাস্তার ধারে একটা অন্ধকার গলিকে টার্গেট করেছিলাম। ফ্যাট আমার পেছন পেছন আসছিল।
‘নিজের জায়গা দেখুন।’ আমি দাঁত খিঁচোলাম ওর উদ্দেশে, ‘একই জায়গায় ঢুকলে আমরা কিস্সু করতে পারব না। পাশের বাড়ির বেসমেন্টের দিকে একটা নীচু জায়গা আছে। ওখান থেকে গুলি চালান।’
ফ্যাট রাজি হয়ে ওদিকে এগোল। তিন পা চলার পরেই বেশ কয়েকটা গুলি ওকে শুইয়ে দিল।
আমি গলিটা দেখলাম। ফুট বিশেক লম্বা সরু একটা জায়গা, যার অন্য প্রান্তে রয়েছে একটা লোহার রেলিং আর তার মাঝে একটা তালা দেওয়া গেট। একটা আবর্জনা ফেলার ড্রাম উপুড় করে, তাতে চড়ে আমি রেলিংটা টপকালাম।
ওপাশে একটা বাঁধানো পথ পেলাম। তার ধারের বেড়া টপকে আরেকটা বাড়ির ভেতরে পৌঁছোলাম। সেখানে একটা কুকুর প্রবল চেঁচামেচি করে আপত্তি জানাল। আমি কুকুরটাকে গালাগাল দিয়ে অন্যদিকের বেড়াটা পেরোলাম। পথে গোটা দুয়েক কাপড় টাঙানোর দড়িতে পেঁচিয়ে গেলাম। আরও দুটো বাড়ির আঙিনা পেরোলাম। একটা জানলা দিয়ে কেউ চিৎকার করে আমাকে ধমক-ধামক দিল। একজন একটা বোতল ছুড়ে মারল। তবে শেষ অবধি আমি একটা পাকা রাস্তায় এসে পৌঁছোলাম।
গুলিগোলা আমার থেকে ততক্ষণে অনেকটাই দূরে ছিল। তাও আমি ঝুঁকি নিলাম না। সেই রাতে আমি যতগুলো রাস্তা হেঁটে পেরিয়েছিলাম ততগুলো বোধ হয় ডিনা’র খুনের রাতে স্বপ্নেও দেখিনি।
এলিহু উইলসনের বাড়ির সামনে যখন আমি পৌঁছোলাম তখন রাত সাড়ে তিনটে।
