Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    রঙ্কিণীর রাজ্যপাট এবং অন্যান্য – নবনীতা দেবসেন

    August 30, 2025

    আনা ফ্রাঙ্ক-এর ডায়েরি

    August 30, 2025

    আগাথা ক্রিস্টি রচনা সমগ্র ১ (অনুবাদ : নচিকেতা ঘোষ)

    August 30, 2025
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • 🔖
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    Subscribe
    সাইন ইন
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    রঙ্কিণীর রাজ্যপাট এবং অন্যান্য – নবনীতা দেবসেন

    নবনীতা দেবসেন এক পাতা গল্প168 Mins Read0

    কাজল সায়রের জাদুগর আর পিকলু টুকলু – নবনীতা দেবসেন

    কাজল সায়রের জাদুগর আর পিকলু টুকলু

    টুকলু আর পিকলু দুই ভাই।

    দুজনেই খুব সুন্দর গান গায় আর বাঁশি বাজায়, আর মাঠে ছাগল চড়িয়ে বেড়ায়।

    ওরা যে গ্রামে থাকে, তার কাছেই মস্ত একটি দিঘি আছে। দিঘি তো নয় সমুদ্দুর বলাই ভালো। তার নাম কাজল সায়র। সায়র মানে তো সাগরই—সাগর মানে তো সমুদ্দুরই, তার মানেই দিঘিটার আসল নাম কাজল কালো সমুদ্দুর। আর আহা কি চেহারা সেই কাজল সায়রের। কালো টলটলে জল, এপার ওপার দেখা যায় না, যদ্দূর দেখবে শুধু ঐ জল আর জল। কিন্তু জলে আর ঢেউ খেলে না। বাতাসে ঝিরঝির করে শিউরেও ওঠে না সেই জল। যেন কাঠের তৈরি। সেই স্তব্ধ কালো জলের মধ্যে সবুজ, সাদা, নীল রঙের পদ্মফুলেরা ফুটে আছে—যেন রঙিন বুটিদার কালো ঢাকাই শাড়িটি বিছিয়ে রেখেছেন ঈশ্বর ওদের মাঠের পারে। আর যখন সূয্যি ওঠেন আর সূয্যি ডোবেন, তখন কিন্তু কাজল সায়রের রঙটি আর কাজল থাকে না—লাল সোনালি গোলাপি গেরুয়া কমলা কত রকমের রঙের খেলা চলতে থাকে—রোজ—রোজই সূয্যিঠাকুরের সঙ্গে কাজল সায়রের যেন হোলিখেলার হুল্লোড়। কিন্তু ঢেউ নেই। যেন আরশিটি।

    টুকলু পিকলু এইসব দ্যাখে আর খুশি হয়ে গান গায়। বাঁশি বাজায়। মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে পদ্মফুলগুলো তুলতে। কিন্তু ওই এক মুশকিল। কাজল সায়রের জলে নামা বারণ। ওই জলে স্নান করা বারণ। ওই জল আঁজলা ভরে খেয়ে তেষ্টা মেটানোও বারণ। এমনকি কেউ ওই জলে নেমে একটু মুখে—চোখে জলছিটে দেবে—উঁহু, তাও বারণ। এমনকি ছাগলরাও ওদিকে যায় না।

    কাজল সায়র তার অতখানি জল নিয়ে, পদ্মফুলের শোভা নিয়ে একা একা পড়ে থাকে। দিনের বেলা সূয্যিঠাকুর, রাত্তিরে চন্দ্রতারকা, এঁরাই কেবল ওকে ছুঁতে পারেন। ওঁরা তো ঠিক মর্তবাসী নন, ওঁরা আকাশবাসী, তাই পারেন ছায়া দিয়ে ছুঁতে। সে ছোঁওয়াও তো আলগোছের।

    টুকলু বলে পিকলুকে—”আচ্ছা পিকলু, ওরা যদি ছায়া দিয়ে ছুঁতে পারে, তবে তো আমরাও পারি ছায়া দিয়ে ছুঁতে? চল তো দেখি কেমনভাবে জলে ছায়া ফেলা যায়? তাহলেও একরকম ছোঁয়াই হল?”

    ”কিন্তু ওরা তো মানুষ নয়, ওদের তো জীবন নেই, ওদের কথা আলাদা। আমাদের ওসব করে টরে কাজ নেই ভাই—কি থেকে কী হয়ে যাবে। থাক।”

    কাজল সায়রের পদ্মফুলগুলোর একটা বিশেষ গুণ ছিল—তারা ফুটতো, কিন্তু মরতো না। ফুটেই থাকতো। ফুটেই থাকতো। যদি ভ্রমর মৌমাছিরা মধু খেতে উড়ে গিয়ে ফুলের বুকে বসত, পদ্মফুলেরা ম্যাজিক করে বুজে যেত—ব্যাস, গুনগুন ভ্রমরটি বন্দী। তারপর ফুলটি আবার ফুটত, পাপড়িরা আবার খুলত। কিন্তু ভ্রমরটিকে আর দেখা যেত না। কী হত তার? কোথায় যেত সে? কেউ জানে না।

    অত সুন্দর পদ্মফুল দেখেও গাঁয়ের ছোট ছেলে—মেয়েরাও কেউ ফুল তুলতে যেত না। ওই জল জাদু করা—একটু ছোঁওয়াও বারণ যে! মেয়ে—বউরা অনেক দূরের মিতলি নদী থেকে জল আনতে যেত। কাজল সায়রটি জলে টুপটুপ করছে—কিন্তু কলসী ডোবানো মানা। গাঁয়ের লোককে কাজল সায়র শুধু একটাই জীবন পাঠাতো। শীতল বাতাস। সন্ধ্যেবলায় সায়রের ওপর দিয়ে ভেসে আসত বাতাস—সারা গাঁয়ের শরীর জুড়িয়ে দিত, ঘুম পাড়িয়ে দিত, যেন জাদুর পাখা।

    আর তখন সেই কাজল সায়রের পদ্মফুলেরা উঠে আসতো সবুজ মাঠে। তাদের পরনে থাকতো পাতলা জলের শাড়ি, সবুজ চুলে মুক্তোর ঝুরির মালা, পদ্মফুলেরা জলকন্যা হয়ে নাচতো পিকলু টুকলুর ছাগল চরানোর মাঠে।

    কিন্তু কে—উ জানত না।

    জগতের কে—উ জানত না সে খবর। একমাত্র দুজন ছাড়া। হুতোম আর লক্ষ্মী। দুই প্যাঁচা আর প্যাঁচানী, তারা সারাদিন ঘুমোয় আর সারারাত্রি জাগে। ওই কাজল সায়রের ধারে একটা মস্ত উঁচু জামগাছ ছিল—সেই গাছে তারা বাসা বেঁধে থাকতো। পদ্মফুলেরা যখন জলকন্যা হয়ে নাচত গাইত, তখন তাদের সঙ্গে উঠে আসতো একদল শ্যামলা রঙ সুন্দর জলপুত্র—তাদের নড়নচড়ন যেন সাপের মতন হিলহিলে। নাগপুত্র তারা।

    শুকতারা ফুটতে না ফুটতেই ওরা সবাই আবার নেমে যেত কাজল সায়রের জাদুজলে। মাঠ ফাঁকা। একদিন খুব সক্কালবেলায়, ঘুমঘুম চোখে ঝিমোতে ঝিমোতে লক্ষ্মী প্যাঁচা জিজ্ঞেস করল হুতোমকে—”আচ্ছা তুমি তো আদ্যিকালের বদ্যিবুড়ো, সব কিছুই জানো, বলো দেখি কাজল সায়রের জল ছোঁয় না কেন?”

    —”ছোবে কি? ছুঁলেই তো মেয়েরা পদ্মফুল আর ছেলেরা ঝাঁঝি হয়ে যাবে।”

    —”কেন? কেন”?

    —”ও জলে যে জাদুমন্ত্র করা আছে।”

    —”তাই? তারপর?”

    —”তারপর পদ্মফুলেরা হয় জলকন্যা আর ঝাঁঝিরা হয়ে যায় নাগপুত্তুর। কোনো মানুষ ওই জলটি ছুঁলেই তারা মানুষদের গভীর জলে টেনে নেয়”—

    —”ইশ!” লক্ষ্মী প্যাঁচা বললে—”সেই মানুষদের কী হয় তারপরে?”

    —”তারপরে তারা আবার হয় পদ্মফুল। নয় ঝাঁঝি হয়ে কাজল সায়রের জলেই ডুবে থাকে। মানুষের মধ্যে আর ফেরা হয় না তাদের। কত ছেলে—বউ, কত বুড়ো—বাচ্চা যে এভাবে হারিয়ে গেছে। কোনও দিনই ফিরতে পারবে না আর।”

    —”তারা? সেইসব মানুষেরা?”

    —”পারবে। তার জন্যে একটা কঠিন কাজ করতে হবে।”

    —”কী কঠিন কাজ?”

    —”সে খুবই কঠিন।”

    —”কত কঠিন?”

    —”সে ভীষণ কঠিন কাজ।”

    —”কত ভীষণ? আমরা পারব না?”

    —”আমরা? আমরা তো পেচক পক্ষ্মী—আমরা কিছু পারি?” হুতোম হুমহুম করে হাসে।

    —”কেন পারব না?” লক্ষ্মী বলে, ”তুমি বুড়ো মানুষ—তুমি না পারো আমি তো পারি। আমি অনেক কঠিন কঠিন কাজ পারি। সারা পৃথিবী চক্কর দিতে পারি উড়ে উড়ে। বলো না কী করতে হবে।”

    হুতোম বলল—’লক্ষ্মী, এখনই, ভোরের আলো ফুটবে—সূয্যি উঠে পড়বে—ঘুমোও দেখি এবারে, আর কথা নয়।”

    লক্ষ্মী বলল—”বেশ, বাকিটা তবে কাল।”

    এখন হয়েছে কি, আগের দিন রাত্তিরবেলায় একটা ছাগলছানা হারিয়ে গিয়েছিল। তাকে খুঁজতে খুঁজতে পিকলু এসে পড়েছিল জামতলায়। তারপরেই যেই না দিয়েছে কাজল সায়রের বুক জড়ানো জাদু—বাতাস অমনি ঘুমিয়ে পড়েছে। এক্কেবারে ঘুমিয়ে ঘাসপাতা। কিন্তু ভোরবেলাতে, জলকন্যাদের নাচের শেষে, তারা যখন জলে মিশে গিয়ে পদ্মফুল হয়ে ফুটে উঠেছে—তখনই ঘুম ভেঙে গেল পিকলুর।

    আর পিকলু শুনতে পেল জামগাছের ডালে বসা হুতোম প্যাঁচা আর লক্ষ্মী প্যাঁচানীর আলাপ।

    এতদিনে তবু বোঝা গেল কাজল সায়রের রহস্যটা।

    ওঃ, হো! তাহলে ব্যাপারটা এই। কিন্তু সবটা শোনা হল না।

    পিকলু ছুটতে ছুটতে বাড়িতে গিয়েই টুকলুকে সব কথা বলল। ওরা ভেবেচিন্তে ঠিক করল দুজনে মিলে আজ রাত্রে জামতলাতে গিয়েই ঘুমোবে। যেমন ভাবনা তেমনি কাজ। খেয়ে দেয়ে দুই ভাই তো জামতলায় গেছে। যেই রাত বাড়লো অমনি কাজল সায়র থেকে ভেসে এল জাদু—মলয়—শীতল করে দিল শরীর মন। দুই ভাই ঘুমিয়ে পড়ল।

    ভোরবেলা দুজনের ঘুম ভাঙলো হুতোম আর লক্ষ্মীর গলা শুনে।

    লক্ষ্মী বলছে—”আজ বলো বাকিটুকু।”

    হুতোম বলল—”তবে শোনো। বাকি মানে, গোড়াটাই তো বলিনি। এই কাজল সায়র কি চিরকাল এমন জাদুর পুকুর ছিল? এখানে কত মানুষ স্নান করত, মেয়েরা কলসী ভরে জল নিয়ে যেত, বাচ্চারা জলে সাঁতার খেলত, হাঁস, সারস, বকেরা আসত ঝাঁকে ঝাঁকে। রুই কাতলা, কালবোস থাকত গভীর জলে। নৌকা বাইত, বাইচ খেলত ছেলেরা। কত গরু, ছাগল, মহিষ, ঘোড়া জল খেত এখানে। দিঘিটা চিরকাল এমন ছিল না, প্রাণে ভরপুর ছিল।”

    ”তবে কেন হল এমনটি?”

    ”হল। একবার জাদুগর এসে এই গাঁয়ের জমিদারের সুন্দর মেয়েটিকে বিয়ে করতে চাইল। তার বয়সের গাছপাথর নেই। তার দাঁতগুলো হলদে, তার দাড়ির রঙ হলদে। হাঁটু পর্যন্ত দাড়ি—মাথায় টাক চকচক করছে রুপোর টাকার মতন। তার সঙ্গে কেউ মেয়ের বিয়ে দেবে?”

    যেই জমিদার বলেছে ”না”—

    ব্যাস! অমনি রেগে সে এমনই জাদু করে দিল, সবগুলো নদীর স্রোত ঘুরে গেল অন্যদিকে। সবগুলো দিঘির জল শুকিয়ে গেল। মানুষের কষ্টের শেষ রইল না। জমিদারের মেয়েটি বলল—”বাবা আমিই যাব, বিয়ে করব ওকে। মানুষের এত দুঃখু আর দেখতে পারি না।”

    বলে মেয়ে নিজে—নিজেই জাদুগরের বাড়িতে গেল। জাদুগর তখন কী করলে বল তো? মেয়েটিকে নিয়ে টুপুস করে এই কাজল সায়রে ডুব দিল। অমনি সব দিঘিতে জল টলটল করতে লাগলো। সব নদীর স্রোত ছুটলো। শুধু কাজল সায়রের জলে আর ঝোড়ো বাতাসের ঢেউ ওঠে না—যেন কাচের তৈরি, স্থির। তারপর সেখানে ফুটলো অতি সুন্দর, অতি সুগন্ধী এক জলপদ্ম—অভিশাপের সেই শুরু।”

    —”ওরে বাবা! ভারি দুষ্টু জাদুগর তো? এখন বলো দেখি কী করলে ওর জাদু কাটবে?”

    —”রোজ রাত্তিরে যখন জলকন্যাদের নাচগান হয় এই মাঠে তখন যদি কেউ এসে তাদের গান শুনিয়ে মোহিত করতে পারে তাহলেই জলকন্যাদের এই জাদু কেটে যাবে। কিন্তু সেটা তো অসম্ভব। যে মানুষ এদিকে আসবে সেই ঘুমিয়ে পড়বে, একেবারে নিশ্চিত। কারুর পক্ষেই জেগে থাকা সম্ভব নয়, জাদু বাতাসটি গায়ে লাগলে। তাই কেউ গানবাজনা করতেও পারবে না। ওদেরও মুক্তি হবে না।”

    —”কিন্তু ঐ জাদুবাতাসটা গায়ে না লাগানোর কোনো উপায় নেই হুতোম প্যাঁচা? কম্বলটম্বল মুড়ি দিয়ে?”

    —”আছে। যদি কেউ এই গাছের বিশাল কোটরটার মধ্যে ঢুকে লুকিয়ে থাকে—ওর মধ্যে জাদু হাওয়া ঢুকতে পারে না—ওতে যে অলরেডি ব্রহ্মদত্যির জাদুমন্ত্রের বাঁধন দেওয়া আছে!”

    —”ও বাবা, বেহ্মদত্তি? তবে মুক্তি দেবে কে ওদের?”

    ”আমরা দেব।” একসঙ্গে বলে উঠল টুকলু, পিকলু, ”আমরা ঢুকব ব্রহ্মদত্যির কুঠুরিতে। ব্রহ্মদত্যি রাখালদের কিছু বলে না। খুব ভালোবাসে। মাঝে মাছে বরং বেলটা, তালটা পেড়েও দেয়। আহা বুড়ো মানুষ, একা একা থাকে, একটা কথা বলার লোক নেই। তাই মাঝে মাঝে খিটখিটেপনা করে। আসলে বেহ্মদত্যি লোকটি ভালো। আমরা ওকে চিনি জানি।”

    হুতোম বিরক্ত হয়ে লক্ষ্মী প্যাঁচাকে বললে—”হল তো? জগৎসুদ্ধ লোক অন্যের কথা শুনবে বলে কান পেতেই আছে। বোঝ ঠেলাটা। বলেছিলাম আস্তে কথা বলো, এখন গেল আমাদের সব প্রিভেসি নষ্ট হয়ে। সব গোপন কথাগুলো রাখাল ছেলে দুটো জেনে ফেলেছে।”

    —”তাতে কী হয়েছে? ভালোই তো।” বলল ধবধবে সাদা মিষ্টিতম লক্ষ্মী প্যাঁচাটি, ”ওরাই তো বলছে, কঠিন কাজটা ওরা করতে পারবে। তুমি ওদের একটু দ্যাখোই না, অভিশাপ যদি কাটানো যায়? লক্ষ্মীই এবার ওদের জিজ্ঞেস করলো—”বলো তো বাছারা, পারবে, তোমরা নিশি—বাতাস গায়ে না লাগিয়ে রাত জেগে থাকতে? কেমন করে পারবে?”

    —”পারবো। ব্রহ্মদত্যি আমাদের বন্ধু, ওর কোটরে আমাদের ঠাঁই দেবে।”

    —”সে তো না হয় হল। তারপরেরটা? গানবাজনা?”

    —”সেও পারবো।” পিকলু বলল—”আমি বাজাবো আকাশী সুরের বাঁশের বাঁশি। টুকলু গাইবে খোলা মাঠের গান। সেই গান, সেই বাঁশি ওরা কখনো শোনেনি।”

    —”আর যদি না পারো? তাহলে কী হবে জানো তো? হুমহুম গুনগুন গলায় এবারে হুতোম বলে ওঠে—”জাদুকরী জলকন্যেরা তোমাদের শামুক—গুগলি বানিয়ে জলের তলায় পাঁকের মধ্যে গুঁজে রেখে দেবে।”

    —”ও বাবা—” লক্ষ্মী প্যাঁচানী ভয় পেয়ে গেল।

    —”তবে থাক গে!”

    কিন্তু টুকলু পিকলু একসঙ্গে তাকে অভয় দিয়ে বলে উঠলো—”ভয় নেই লক্ষ্মী পিসি। ভয় নেই হুতোম খুড়ো। আমাদের কেউ গুগলি শামুক বানাবে না, আমরাই বরং তাদের পাঁক থেকে টেনে বের করে আনবো, তোমরা দেখো।”

    লক্ষ্মী প্যাঁচানী বললে, ”আহা তাই যেন হয়।”

    আর তক্ষুণি তথাস্তু মুনিও আকাশ দিয়ে ভেসে যাচ্ছিলেন। তিনিও বলে ফেললেন—”তথাস্তু।”

    সন্ধ্যেবেলাতেই মুড়ি বাতাসা পেট ভরে খেয়ে, ঠাকুরের নাম নিয়ে দুই ভাই জামতলাতে এসে গেল। সঙ্গে এক বোতল খাবার জল, আর একটি বাঁশের বাঁশি, আর একখানা নতুন গামছা। বেম্মোদত্যি দাদুর জন্য গিফট। বেম্মোদত্যিদের গামছা—টামছা লাগে। সিদে বাঁধে। ছাঁদা বাঁধে। জামগাছের কোটরে ঢুকতে তাদের কোনও অসুবিধেই হল না। ব্রহ্মদত্যি বেশ খুশিখুশি মনে এক দমকা হাওয়া হয়ে গামছাটা উড়িয়ে নিয়ে গেলেন।

    হাওয়াটাই বলল, ”থ্যাঙ্ক ইউ টুকলু পিকলু! গুড লাক!”

    গাছের কোটরে কত কী থাকে। কাঠপিঁপড়ে, মাকড়সা, তক্ষক, গিরগিটি, সাপখোপ, বিছে, কতরকম পোকা—কিন্তু বেম্মোদত্যির এই প্রাইভেট কোটরটি ঝকঝকে পরিষ্কার। যেন ঠাকুরঘর। এমনই মন্তর পড়া আছে, প্রাণজুড়নো জাদুর বাতাসটিও যেমন এখানে ঢুকতে পায় না, তেমনি পোকামাকড়, সাপখোপও না। কোটরের ঠাণ্ডা মেঝেয় শ্যাওলার মোটা সবুজ কার্পেট পাতা। দুই ভাই আরামসে সেখানে বসে রইল। কানখাড়া। চোখ খোলা। হুতোম আর লক্ষ্মীর কাছে তারা শুনেছে, রাত্রে এখানে কী কী কাণ্ড হয়। নাচ গান হয়, খাওয়াদাওয়া হয়, সে এক বিপুল ব্যাপার। ভোরের আলো ফোটার আগেই সবাই ফিরে যায়—জাদুর সায়রে। ভোরের পাখিরাও তাদের দেখতে পায় না—দেখতে পায় কেবল শুকতারাটি।

    রাত বাড়তেই জলকন্যাদের উঠে আসা শুরু হল। আর আসছে গুনগুন করে সুর ভেঁজে নাগপুত্রের ঝাঁক। আরও আসছে—রুপোর থালা করে রকম—বেরকমের খাবার, সোনার কলসী করে নানা রকমের শরবৎ…

    নাচ গান খাওয়া দাওয়া শুরু হয়ে গেল—আকাশে হঠাৎ যেন জ্যোৎস্নাটাও একশগুণ বেড়ে গেল—চোখে যেন সয় না—ঠিক এমন সময়ে পিকলু বাঁশিতে সুর লাগালো। আকাশী সুর। জাদু—রাত্তির আকাশ। নিশি জাদুর বাতাস, সবকিছুকেই যেন জাদু করে ফেলল পিকলুর রাখালিয়া বাঁশির মন—কেমন—করানো আকাশী সুর। পিকলু যত মনপ্রাণ দিয়ে বাঁশি বাজায় ওদের নাচগান যেন ততই ঝিমিয়ে আসে—ওদের ভিতরে ভিতরে কি যেন একটা বদল ঘটতে থাকে—কী একটা কষ্ট পর্দা ছিঁড়ে বেরোতে চায় ভেতর থেকে, —কিন্তু ওরা পিকলুকে দেখতে পায় না—ওরা দুজনে তো গাছের কোটরের মধ্যে বসে আছে। পিকলুর বাঁশির সঙ্গে এবার গলা মেলালো টুকলু—খোলামাঠের গান, খোলা মাঠের গলা—তার ধরনই আলাদা। হু হু করে উঠলো মাঠ আর আকাশের বুক। জ্যোৎস্নাও কান পাতলো। পিকলু—টুকলুর গানের সুরে বাঁশির সুরে জামগাছটা পর্যন্ত শিউরে উঠে একগাদা ফল ঝরিয়ে দিল মাটিতে। আস্তে আস্তে কাঁপন জাগলো কাজল সায়রের স্ফটিক—স্থির জলে, প্রাণের ঢেউ উঠলো তাতে, গানের জাদুতে কোথায় যেন মিলিয়ে গেল জাদুগরের মায়া—মিলিয়ে গেল নাগপুত্রের দল, জলে কেবল পদ্মফুল আর ঝাঁঝি আর লাল পদ্মফুলে আবার গুনগুন করছে কালো ভ্রমণ গুচ্ছ।

    আস্তে আস্তে সে দৃশ্যও বদলে গেল। পদ্ম নেই, ঝাঁঝি নেই। জল থেকে উঠে আসতে লাগলো গ্রামের যত হারিয়ে যাওয়া ছেলে বুড়ো মেয়েরা, বাচ্চারা। ঠিক যেমনটি হারিয়েছিল তেমনটি।

    সবার শেষে এলে, কে?

    জমিদারের সেই সাহসী, সুন্দরী কন্যেটি— যে জলের অভাবে প্রজাদের কষ্ট দেখতে না পেরে নিজেই গিয়ে ধরা দিয়েছিল জাদুবুড়োর কাছে। তার একপিঠ চুল, আর একমুখ হাসি। পায়ের নূপুর ঝুমুর ঝুমুর, হাতের কাঁকন ঝিনিক ঝিনিক, আর সেই কাঁকনপরা রাঙা হাতে কী ওটা? একখণ্ড হলুদ রঙের পাথর।

    কেন পাথর ? কিসের পাথর?

    সেই যে দুষ্টু জাদুগর, পিকলু—টুকলুর ওই আকাশ ঝরানো বাতাস ভরানো প্রান্তর ছড়ানো প্রাণের সুরের মন্তরটি তার অঙ্গে যেই লেগেছে, অমনি আপনা আপনিই সে পাথর হয়ে গিয়েছে। জন্মের শোধ পাথর। দুষ্টু জাদুগরের জলের তলার রাজত্বি শেষ।

    গ্রামের মানুষদের জাদু করে ধরে নিয়ে গিয়ে দাসদাসী করে রাখা খাটাখাটনি করানো—এবার স—ব খতম। আ—র কখনো কোনো কুকম্মো তার দ্বারা হবে না।

    —”চল পাথরটাকে আমরা মিতালি নদীর স্রোতে ছুঁড়ে ফেলে দিই—” বলে উঠলো পিকলু—টুকুলু।

    —তারপরে?

    —তারপরে গাঁ সুদ্ধু লোক, আর পিকলু টুকলু, নাচতে নাচতে গাইতে গাইতে গিয়ে লক্ষ্মীসোনা জমিদার—কন্যেটিকে তার মা—বাবার কোলে পৌঁছে দিল, অমনি গেটের ঘণ্টা বেজে উঠলো, ঘরের শঙ্খ বেজে উঠলো। মেয়েকে কোলে নিয়ে একবার মা কাঁদেন আনন্দে আর একবার বাবা কাঁদেন আহ্লাদে। খুশির বন্যা বইতে লাগল! আর পিকলু—টুকলু?

    তারা হয়ে গেল সারা গাঁয়ের প্রাণ, আদরের নয়নের মণি। গাঁয়ের মানুষ তাদের আর কোনকিছুর অভাব রাখলো না—না চাইতেই তাদের ঘরে থরে থরে চাল, ডাল, দুধ, ঘি, ধুতি, গামছা। আমের সময় আম, ইলিশের সময় ইলিশ, ফুলকপির সময়ে ফুলকপি এসে পৌঁছে যায়। সবাই যেন পাল্লা দিয়ে ওদের দুই ভাইকে আদর করে।

    এসব কাণ্ড দেকে পিকলু—টুকলু জামতলায় গিয়ে বললে—”থ্যাঙ্ক ইউ হুতোম খুড়ো, ভাগ্যিস তুমি খবরটা জানিয়েছিলে? পেন্নাম হই লক্ষ্মী পিসি, ভাগ্যিস মনে বল দিয়েছিলে।”

    সেই না শুনে, এক কান নেড়ে, এক চোখ তুলে, এক চোখ বুজে, হেসে হেসে হুতোম বলল লক্ষ্মীকে—

    হুম হুম হুম,

    দেখছো কী করলুম?

    লক্ষ্মীও অমনি পাখা দুটি কাঁপিয়ে মিটিমিটি হেসে বললে,

    ”—দেখেছি হুতুম।

    তাই তো এমন খোকাদুটি

    কোলেতে পেলুম।”

    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleআনা ফ্রাঙ্ক-এর ডায়েরি
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Demo
    Most Popular

    রঙ্কিণীর রাজ্যপাট এবং অন্যান্য – নবনীতা দেবসেন

    August 30, 2025

    অনুরাধা

    January 4, 2025

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    রঙ্কিণীর রাজ্যপাট এবং অন্যান্য – নবনীতা দেবসেন

    August 30, 2025

    অনুরাধা

    January 4, 2025

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025
    Our Picks

    রঙ্কিণীর রাজ্যপাট এবং অন্যান্য – নবনীতা দেবসেন

    August 30, 2025

    আনা ফ্রাঙ্ক-এর ডায়েরি

    August 30, 2025

    আগাথা ক্রিস্টি রচনা সমগ্র ১ (অনুবাদ : নচিকেতা ঘোষ)

    August 30, 2025
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2025 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    Sign In or Register

    Welcome Back!

    Login below or Register Now.

    Lost password?

    Register Now!

    Already registered? Login.

    A password will be e-mailed to you.