সুবিচার – নবনীতা দেবসেন
সুবিচার
বাওয়াকাস নামে আলজিরিয়াতে এক রাজা ছিলেন। তিনি শুনেছিলেন, দেশে একজন কাজি আছেন যিনি মুহূর্তের মধ্যে সত্যমিথ্যা যাচাই করতে পারেন। যাঁর কাছ থেকে কোনো দোষী রেহাই পায় না। রাজা বাওয়াকাস ঠিক করলেন সেই কাজিকে স্বচক্ষে দেখতে যাবেন। এক বণিকের সঙ্গে পোশাক বদল করে রাজা ঘোড়ায় চড়ে কাজির শহরের দিকে রওনা দিলেন।
শহর ঢোকার মুখে একজন খোঁড়ালোক এসে তাঁর কাছে ভিক্ষে চাইল। বাওয়াকাস তাকে টাকা দিলেন। কিন্তু যেই তিনি রওনা হবেন, খোঁড়া ভিখিরি তাঁর জামা টেনে ধরল।
”আবার কী চাও? তোমাকে তো টাকা দিয়েছি!”
”ভিক্ষে দিয়েছো ঠিকই, এবার আমাকে তুমি একটা অনুগ্রহ করো। তোমার ঘোড়ার পিঠে চড়িয়ে আমাকে শহরের মধ্যিখানে চাঁদনিচকে নিয়ে চল, নইলে পথের ঘোড়ারা আর উটেরা আমাকে মাড়িয়ে দেবে।”
তাই শুনে, বাওয়াকাস খোঁড়াকে তুলে ঘোড়ায় বসিয়ে, চাঁদনিচক পর্যন্ত নিয়ে গেলেন। সেখানে ঘোড়া থামলেন, কিন্তু ভিখিরি কিছুতেই নামল না।
”এই তো শহরের মধ্যিখানে এসে গেছি, এবার নাম?”
”বারে, কেন নামব?”—ভিখিরি উত্তর দিল, ”এটা তো আমারই ঘোড়া। তুমি যদি আমার ঘোড়া আমাকে ফেরত না দাও, তাহলে তো কাজির কাছে যেতে হয়!”
তর্কাতকি শুনে বাজারের অনেক লোকজন জড়ো হয়ে গেল। ছদ্মবেশী রাজাকে তো কেউ চেনে না—সবাই চেঁচাল—”কাজির কাছে যাও, তোমরা কাজির কাছে যাও। তিনিই বিচার করবেন।”
খোঁড়াকে নিয়ে বাওয়াকাস কাজির সভায় গেলেন। সেখানে আরও অনেকে বিচারের আশায় গিয়েছিল। একজন একজন করে কাজি তাদের ডেকে নিচ্ছিলেন। বাওয়াকাসের আগে ছিল এক চাষী আর একজন পণ্ডিত। তাদের সমস্যা একটা মেয়েকে নিয়ে। চাষী বলছে মেয়েটা তার বউ, পণ্ডিত বলছে, তার। কাজি দুজনের কথাই শুনলেন, তারপর বললেন, ”আজ বউকে এখানে রেখে যাও। কাল সভায় এসে, বিচার পাবে।”
ওরা চলে যেতে, একজন কসাই আর একজন তেলি এসে হাজির। কসাইয়ের গা—ময় রক্ত, তেলির গা—ময় তেল। কসাই একহাতে কিছু টাকা ধরে আছে আর তেলি কসাইয়ের হাতটা চেপে ধরে আছে।
কসাই বললে, ”আমি লোকটার কাছে তেল কিনছিলাম, যেই দাম দিতে টাকার ব্যাগটা বের করেছি তেলি আমার ব্যাগসুদ্ধ সব টাকা কেড়ে নেবার চেষ্টা করেছিল—তাই আমরা এভাবেই এসেছি—আমি ব্যগটা চেপে ধরে রয়েছি, ও আমার হাতটা চেপে ধরে আছে—টাকাটা কিন্তু আমারই—ও একটা চোর।”
তেলি বলল, ”হুজুর কসাই তেল কিনতে এসেছিল, আমি এক পাত্র ভর্তি করে তেল দিলাম, ও তখন আমাকে একটা স্বর্ণমুদ্রা ভাঙিয়ে দিতে বলল। যেই আমি আমার টাকার থলে বের করেছি, কসাই ওটা নিয়ে পালাচ্ছিল। তাই আমি ওর হাত চেপে ধরে আপনার কাছে এনেছি—টাকা আমার।”
কাজি বললেন, ”বেশ টাকাটা এখানে রেখে যাও। কাল সভায় এসো, বিচার পাবে।”
বাওয়াকাসের ডাক পড়তে তিনি কাজিকে জানালেন ঠিক কী ঘটেছিল। কাজি সব শুনলেন, তারপর ভিখিরিকে ডাকলেন।—”সব মিথ্যে কথা।” ভিখিরি বলল, ”ও মাটিতে বসেছিল, আমি ঘোড়ায় চড়ে যাচ্ছিলাম, ও বলল ওকে তুলে নিতে। ওকে তুলে নিয়ে ও যেখানে যেতে চাইল সেখানে যখন নামিয়ে দিচ্ছি, ও নামতে রাজি তো হলই না উলটে বলছে ঘোড়াটা নাকি ওর। এমন মিথ্যেবাদী।”
কাজি একটুক্ষণ চিন্তা করলেন। তারপর বললেন, ”ঠিক আছে, ঘোড়াই আজ আমার কাছে থাকুক, কালকে সভায় এসো, বিচার পাবে।”
পরদিন সকালে কাজির দরবারে খুব ভিড়, সবাই এসেছে কী বিচার করলেন জানতে।
প্রথমে এল চাষী আর পণ্ডিত।
”তোমার বউকে নিয়ে যাও”—কাজি বললেন পণ্ডিতকে। আর চাষীর কপালে পঞ্চাশ ঘা বেত!”
পণ্ডিত তার বউকে নিয়ে চলে গেল, চাষীর জুটলো পঞ্চাশ ঘা বেতের চাবকানি।
তারপর কাজি কসাইকে ডাকলেন।
”নাও তোমার টাকা।” তারপর তেলির দিকে তাকিয়ে নির্দেশ দিলেন,—”পঞ্চাশ ঘা বেত!”
তারপর তিনি বাওয়াকাসকে আর খোঁড়া ভিখিরিকে ডাকলেন।
”কুড়িটি ঘোড়ার মধ্যে তুমি কি তোমার নিজের ঘোড়াটা চিনে নিতে পারবে?”
বাওয়াকাস বললেন, ”নিশ্চয়ই পারব।”
”আর তুমি?” তিনি ভিখিরিকে প্রশ্ন করলেন।
”অবশ্যই পারব।” ভিখিরি বলল।
তাঁরা আস্তাবলে গেলেন।
বাওয়াকাস এক মুহূর্তে নিজের ঘোড়াটিকে চিনিয়ে দিলেন কুড়িটি ঘোড়ার মধ্যে।
কাজি তারপরে ভিখিরিকে ডাকলেন আস্তাবলে।
সেও ঘোড়াটাকে ঠিকঠাক দেখিয়ে দিল। কাজি তখন তাঁর দরবারে ফিরে গিয়ে বাওয়াকাসকে ডাকলেন।
”নিয়ে যাও তোমার ঘোড়া। আর ভিখিরিকে পঞ্চাশ ঘা চাবুক মারা হোক।”
কাজি যখন দরবার থেকে উঠে বাড়ি ফিরছেন, বাওয়াকাস তাঁর পিছু নিলেন।
”আবার কী চাই?” কাজি বললেন, —”তুমি কি আমার বিচারে খুশি হওনি?”
”আমি খুব খুশি।” বাওয়াকাস বললেন, ”কিন্তু আমার কিছু প্রশ্ন আছে। আমি জানতে চাই আপনি কেমন করে বুঝলেন কে কার বউ ছিল? কেমন করে বুঝলেন টাকাটা কসাইয়েরই ছিল? আর কেমন করেই বা বুঝলেন যে ঘোড়াটা ওর নয় আমার?”
কাজি উত্তরে বললেন—
”মেয়েটার ব্যাপারে এমনি করে বুঝলাম। সকালে উঠে ওকে একটা দোয়াত দিয়ে বললাম, ”যাও দোয়াতে কালি ভরে আনো।” সে তক্ষুনি যত্ন করে দোয়াতটা ধুয়ে টুয়ে এনে, চটপট কালি ভরে ফেলল। ওর কাজের ধরন দেখেই আমি বুঝে গেলাম দোয়াতে কালি ভরা ওর অভ্যেস আছে। চাষির বউয়ের তো সেটা থাকার কথা নয়, পণ্ডিতের বউয়ের পক্ষেই স্বাভাবিক। এইভাবে ওদের ব্যাপারটা মীমাংসা হল।
আর কসাইয়ের টাকা? টাকাটা রাত্রে জলে ভিজিয়ে রেখেছিলাম। সকালে উঠে দেখলাম জলের ওপর তেল ভাসছে কিনা। তেলির জমানো টাকা হলে তাতে তেল লেগে থাকবেই—সেই তেল জলের ওপর ভেসে উঠত। জলে কোনো তেল ভাসছিল না। তাতেই বুঝলাম কসাইয়ের কথাই সত্যি।
তোমার বেলায় আরেকটু কঠিন ছিল, কেননা খোঁড়া ভিখিরিও ঘোড়াটা শনাক্ত করতে পেরেছিল। কিন্তু আমি তো আসলে তোমাদের ঘোড়া চেনাতে নিয়ে যাইনি। আমি দেখছিলাম ঘোড়া তার মালিককে শনাক্ত করে কিনা। তুমি যেই কাছে গেলে ঘোড়া তোমার দিকে মুখ ফেরাল, ঘাড়টা লম্বা করে এগিয়ে দিলে তোমার দিকে। কিন্তু যখন খোঁড়া ভিখিরি ওর গায়ে হাত রাখল, ঘোড়ার কানদুটো পিছনদিকে চলে গেল, আর ও একটা ক্ষুর উঁচিয়েছিল—তাতেই আমি বুঝে গেলাম ঘোড়ার মালিক কে, কাকে ও চেনে।”
বাওয়াকাস তখন কাজিকে বললেন, ”আমি বণিক নই, আমি এদেশের রাজা বাওয়াকাস। তোমার সুবিচারের গুণের কথা যা শুনেছি তা সত্যি কিনা পরীক্ষা করতে এসেছিলাম। দেখলাম তুমি সত্যি সত্যি খুব জ্ঞানী মানুষ। তোমার কী পুরস্কার চাই বলো, আমি তোমাকে তাই দেব।”
নমস্কার করে কাজি বললেন, ”দেশের রাজা আমাকে ‘সুবিচারক’ বলেছেন, এরচেয়ে বড়ো পুরস্কার আর কী হতে পারে?”