মাকড়সা-ভূতের গপ্পো – নবনীতা দেবসেন
মাকড়সা—ভূতের গপ্পো
এক গ্রামের এক শিবমন্দিরে একটা ভূত ছিল। যে সে ভূত নয়, মাকড়সা—ভূত! সে দিনের বেলায় এমনি নিরীহ ছোট্ট মাকড়সাটি, আর রাত্রির হলেই ভয়ংকর হিংস্র ছ’পেয়ে ভূত। দিনের বেলায় সে কেবল পোকামাকড় ধরে খায়। আর রাত্রে ধরে জীবজন্তু, পাখি—পাখালি—এমনকি মানুষ পর্যন্ত তার যাদুর ফাঁদে ধরা পড়ে যায়। সে তাদের হাড়গোড় পর্যন্ত খেয়ে ফেলে। চিহ্ন থাকে না। সেই শিবমন্দিরে কেউ আর পুজো দিতে যায় না। বেচারা শিবঠাকুর—না আছে তাঁর পুরোহিত, না ভক্ত। ভূতের ভয়ে এক শিবঠাকুরটি ছাড়া সকলেই পগার পার। শিবঠাকুর একেই ভূতনাথ, ভূতেদের নাথ, তাদেরই প্রভু। ভূতপ্রেতই তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গো। ভূতেরা শিবকে মন্যিকে—গণ্যি করে খুব। তায় তিনি তো মানুষ নন, ঠাকুর। কে না জানে ঠাকুর দেবতারা ভূতকে ভয় করেন না।
ওই পোড়ো মন্দিরে তাই কেউ যেত না পুজো দিতে। কেউ দিত না ওই শিবলিঙ্গকে নৈবেদ্য—ভোগ, কী ফলমূল, কী অন্ন—মিষ্টি—শিবঠাকুর তো ভুখাই থাকতেন। মাকড়সা তো মানুষ নয় যে সে শিবঠাকুরকে যত্ন—আত্তি করবে। ওই মন্দিরের ব্যাপারটা কী জানতে চেয়ে একের পরে এক যুবক প্রবেশ করেছে, আর তারা বেরোয়নি। অনেকগুলি কৌতূহলী ছেলেই ওই শিবমন্দিরে ঢুকে হাওয়া হয়ে মিলিয়ে গিয়েছে। তারা আর মন্দির থেকে ফিরে আসেনি। দিনের বেলায় ঢুকে উঁকিঝুঁকি মেরেও তাদের মন্দিরে খুঁজে পাওয়া যায়নি। মন্দিরে কেউ ঢোকে না। ধুলোয় ভরা বন—জঙ্গলের মতো ঘন হয়ে চারদিকে মাকড়সার জাল জড়িয়ে আছে। আবার উলটোটিও সত্যি। চারদিকে মাকড়সার জাল বলেই হয়তো ইদানীং বাদুড়, চামচিকেরা পর্যন্ত মন্দির ত্যাগ করেছে। মন্দিরের বাসিন্দা কেবলই মাকড়সা আর মাকড়সা।
দীপু গিয়েছিল ব্যাপারটা কী জানতে।
দীপুর বাবা ছিলেন শিবমন্দিরের পুরোহিত। একদিন তিনি আর ফিরলেন না।
দীপুর বাবাকে কোথাও খুঁজেও পাওয়া গেল না। শুধু খড়মদুটো পড়েছিল মন্দিরের সিঁড়ির সামনে।
দীপুর মা দিনরাত কাঁদেন। দীপুর বাবার পরে দীপুরই পুরোহিত হওয়ার কথা! কিন্তু মা বাধা দিলেন। বললেন,—ওই মন্দিরের পুজো আর করতে হবে না দীপুকে। দীপু পড়ছে পড়ুক, অন্য কোনও কাজ করবে। অন্য পুরোহিত আনুক মন্দিরের কমিটি। দীপু করবে না।
কিন্তু পুরোহিত আর পাওয়াই গেল না। পাওয়া না যাওয়ার কারণ ওই দীপু। দীপু গিয়েছিল মন্দিরে, ব্যাপারখানা কী সেটা জানতে। কিন্তু দীপুও ফিরল না। দীপুকে আর খুঁজে পাওয়া গেল না। ওর বাবার মতন উধাও হয়ে গেল দীপু।
দীপুর বন্ধুরা—হাতকাটা সত্যেন, বাবাই, ঘণ্টু—তিনজনে মিলে দল বেঁধে গিয়েছিল দীপুকে খুঁজতে। দিনের বেলাতে। তিনজনেই ফেরেনি।
সেই থেকে মন্দিরটা পোড়ো হয়ে গেছে। একটা কুকুর কেবল ওর দাওয়াতে শুয়ে থাকে। ঘণ্টুর কুকুর রামু। রামুকে খাবার দিয়ে আসে গ্রামের লোকেরা। ঘণ্টু না ফেরা অবধি রামু ওখানেই শুয়ে থাকবে, ঘণ্টুর জন্যে অপেক্ষা করবে।
মাকড়সা—ভূত তাকে কিছু বলে না, কেননা রামু কখনও ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করেনি, ঢুকলেই তাকেও খেয়ে ফেলত। ঘণ্টু, বাবাই, সত্যেন, দীপু, দীপুর বাবা, ভৈরবীদিদিমা—এবং এক মন্দিরভর্তি চামচিকেকে খেয়ে ফেলেছে মাকড়সা—ভূত। ওই মন্দিরের জন্যে গ্রামের অর্ধেক পরিবারে আনন্দের রং জ্বলে গেছে।
দীপুর বোন রূপুর বয়েস বেশি নয়, কিন্তু এর মধ্যেই রূপু ভীষণ দুঃসাহসী হয়ে উঠেছে। রূপু রোজই বলে, —মা, আমি বাবা আর দাদার খোঁজ করতে যাব।
মা বলেন, খবরদার যাবে না। পড়াশুনো করো ভালো করে। মন্দিরের রহস্য সন্ধান করতে হবে না। ভূতের সঙ্গে মানুষ কখনও পারে না। ভূতকে চ্যালেঞ্জ করে নাকি কেউ?
রূপু ঠিক করল শিবঠাকুরকেই ওর দলে নেবে। রোজ—রোজ মনে মনে শিবঠাকুরকে বলে,—ঠাকুর, আমার বাবা, দাদা, দাদার বন্ধুরা সব গেল কোথায় ঠাকুর? তোমারই মন্দিরে তোমার চোখের সামনে তোমার ভূতেরা এমন যা—তা করবে? আমি যাব একদিন, মাকড়সা মারার বিষ নিয়ে স্প্রে করে দেব—সব ভুতুড়ে বজ্জাতি বের করে দেব। তুমি ওদের ফেরত দিয়ে দাও। বলতে বলতে রূপু ক্লাস সেভেনে উঠে গেল।
একরাত্রে সত্যি—সত্যি রূপু একটা বড় শিশি কীটপতঙ্গ মারার বিষ স্প্রে—তে ভর্তি করে নিয়ে আর একটা ঝাঁটা নিয়ে মন্দিরে গিয়ে ঢুকল। ওর দুই ছোট—ছোট ভাইবোন টিপু আর অপুকে বলল,—তোরা ভোরবেলায় মন্দিরের বাইরে থাকবি। সকালে আমি যদি বেঁচে থাকি, তোরা গ্রামের লোকদের নিয়ে ভেতরে ঢুকবি। আমি যদি বেঁচে থাকি তবে মন্দিরের ঘণ্টাটা ঢং করে বাজিয়ে দেব, তক্ষুনি তোরা সবাইকে নিয়ে ঢুকে আসবি।
রূপু প্রথমে তো ঝাঁটা দিয়ে মাকড়সার জাল ঝেড়ে ঝেড়ে পথ কাটতে—কাটতে ঢোকবার জায়গা করে নিতে—নিতে ঢুকল। শিবঠাকুরের বেদীর কাছে গিয়ে রূপু করল কি, শুকনো ফুল—বেলপাতার ঢিপির নিচে লুকিয়ে রইল। সেখানে বসেও কোথাও একটা চোখ ওর দিকে তাকিয়ে আছে বলে ওর মনে হতে লাগল।
হঠাৎ দেখল—তাই তো, ঝাঁটা দিয়ে যে অত মাকড়সার জাল ছিঁড়ে স্তূপ করেছে মেঝেতে, তার ওপরে বড়—সড় একটা মাকড়সা বসে ওর দিকে তাকিয়ে রয়েছে। রূপুও চুপচাপ ওর দিকে তাকিয়ে থাকে। আর মনে—মনে বলে, —আমি তো বোকা নই। তুমিও টিকিটিকি নও, যে ওরকম করে তাকিয়ে—তাকিয়ে আমাকে ভয় দেখিয়ে বশ করবে। একবার এদিকে এসো, তোমাকে আমি স্প্রে করে দিচ্ছি।
মাকড়সাটা কিন্তু নড়ছে না।
রূপু হঠাৎ লক্ষ করল মাকড়সাটার সামনের পা একটা নেই, হাত কাটা। আর চোখটা যেন কাঁদো—কাঁদো।
একটু পরে রূপু দেখল তার ওপাশে আর দু—তিনটে মাকড়সা। তারা সবাই চুপ করে ওর দিকে একদৃষ্টে চেয়ে বসে আছে। ছেঁড়া জালের ওধারে। ওকে তো ওরা কিছুই বলছে না? ওকে কী ওরা বশ করছে? রূপুর মাথায় যেন গোলমাল হয়ে গেল—এদের মধ্যে কোনটা ভূত?
ভূত—মাকড়সা কোনটা? নাকি সবকটাই? মাকড়সা—ভূতটা একাই হয়তো অতজনের মতো রূপ নিয়েছে। তাহলে রূপু একলা কী পারবে অতজনকে স্প্রে করতে? আর স্প্রে যদি গায়ে না লাগে? হঠাৎ একজন পুরোহিত এলেন ফর্সা লম্বা লাল রঙের ধুতি—চাদর পরা। মাথায় জটাজূট। তিনি এসে পুজোয় বসলেন। পুজোর সময়ে পুরোহিতের শাঁখ বাজানোর শাঁখটাকে দেখে অবাক রূপু। ছুঁলেই সে প্রবল জোরে বাজছে, ফুঁ দিতে হচ্ছে না। কাণ্ড দেখে রূপু বুঝল এ পুরোহিত নয়, ভূতই হবে। তাছাড়া ঢুকল কোথা দিয়ে? মনে হতেই রূপু ঝাঁটা আর স্প্রে হাতে লাফিয়ে বেরুল বেলপাতার স্তূপ থেকে। ওকে দেখে হেসে ফেলে পুরোহিত বললেন,—আমাকেই তুমি ভূত ভেবেছ? আমি পুরোহিত, এ গ্রামের কেউ তো পুরোহিত হল না, তাই অন্য গ্রাম থেকে আমাকে ঠিক করেছে মন্দির কমিটি। এই নাও চরণামৃত নাও—বলে পুরোহিত ওকে যত্ন করে চরণামৃত এগিয়ে দিলেন। তাই তো—পুরোহিত তো! রূপুর খুব লজ্জা করল। কিন্তু দুটো থেকে তো জোড়া, একহাতে স্প্রে, অন্যহাতে ঝাড়ু।
ঝাঁটা নামিয়ে যেই রূপু হাতটা বাড়িয়েছে অমনি পুরোহিতের হাতটা লোমশ মাকড়সার হাত হয়ে গেল। আর বিরাট একটা জালের মধ্যে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গেল রূপু।
জাল আর ছাড়ানো যাবে না বুঝে, রূপু স্প্রেটা জোরে জোরে স্প্রে করে দিল মাকড়সার হাতটার ওপরে—মাকড়সাই হয়ে গিয়েছে ততক্ষণে সেই ফর্সা পুরোহিত। দৈত্যের মতো বিশাল একটা টকটকে লাল মাকড়সা। জোরে জোরে স্প্রে করতেই কিন্তু হঠাৎ শক লাগার মতো করে মুহূর্তের মধ্যে শুকিয়ে গেল দৈত্য মাকড়সা। শুকিয়ে গুটিয়ে একটা শুঁটকো সরু মাকড়সা হয়ে গেল। জালগুলো উবে গেল। রূপু চেয়ে দেখে এবার ওই চার—পাঁচটা মাকড়সাও গুটি—গুটি ওর দিকে এগিয়ে আসছে। দেখেই ভয় পেয়ে দূর থেকেই মাকড়সাগুলোর ওপরে জোরসে স্প্রে করতে শুরু করে দেয় রূপু—ফুচ…ফুচ…ফুচ…ফুচ… ফুচ…।
ওমা! মাকড়সাগুলো তো স্প্রে লাগা মাত্রই শুকিয়ে শুঁটকো হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু তারপর? তারপর যা হচ্ছে, সেটা ম্যাজিক! স্প্রে গায়ে লাগতে—না—লাগতেই ওই বীভৎস মাকড়সাদের রূপ বদল হয়ে যাচ্ছে। মাকড়সার শরীর থেকে একে একে বেরিয়ে এল দীপু, সত্যেন, বাবাই, ঘণ্টু। আর সেই হাতকাটা মাকড়সাটাই ছিল হাতকাটা সত্যেন। বাবা? দীপু—রূপুর বাবা কই? ভৈরবী দিদিমা? তাঁরাও আছেন। কিন্তু এ ঘরে নয়।
পেছনের একটা ঘরে ভূতের মায়াজালে আটকে আছেন। এবার ঘণ্টা বাজিয়ে দিল রূপু ঢং—ঢং—ঢং—।
গ্রামসুদ্ধু লোক হইহই করে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে এল। পিছনের ঘরে দেখা গেল দুটা মোটা মোটা মাকড়সা বসে বসে জাল বুনছে। রূপু তাদের গায়ে স্প্রে করে দেওয়া মাত্রই মাকড়সার শরীর শুকিয়ে গিয়ে গ্রামের বুড়ি ভৈরবী দিদিমা, আর রূপুর বাবা পুরুতমশাই বেরিয়ে পড়লেন।
সবাই মিলে আনন্দ করতে করতে মিছিল করে চলল নদীর ঘাটে স্নান করতে —বাব্বাঃ! এতদিনের মাকড়সার জাল! এত ধুলো! ঈ—শ, ধুতে হবে না।
শিবঠাকুরও খুশি। এবার আবার পুজোআচ্চা হবে।
মাকড়সা ভূতের গল্প ফুরুল
গরম দুধের বাটি জুড়ুল।